Home Tell me who I am 2 Tell me who I am 2 part 18

Tell me who I am 2 part 18

Tell me who I am 2 part 18
আয়সা ইসলাম মনি

“2H2 + O2 → 2H2O
এটি কী ধরনের বিক্রিয়া?
এখানে কোনটি জারক এবং কোনটি বিজারক?
বিক্রিয়াটি কি উষ্মাধর্মী না তাপশোষী?”
শ্বেত কাগজের পৃষ্ঠায় নিপুণ কলমের আঁচড়ে সমীকরণটি লিখতে লিখতে কাব্য গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্নগুলো ছুঁড়ে দিল। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পরও যখন কোনো প্রত্যুত্তর এলো না, তখন সে বাধ্য হয়েই সম্মুখপানে দৃষ্টিপাত করল। কাঠের চেয়ারে উপবিষ্ট ইলিজা দুই হাত বুকের ওপর শক্ত করে গুটিয়ে একপ্রকার অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তার পানেই তাকিয়ে আছে। তার ঘন ঘন নাসারন্ধ্র স্ফুরণ আর ললাটের কুঞ্চন বলে দিচ্ছে, ভেতরে রাগের লাভা উদ্‌গিরণ হওয়ার অপেক্ষায়।

কাব্য মুহূর্তকাল তার দিকে তাকিয়ে থেকে চেয়ারে হেলান দিল। ভাবলেশহীন শান্ত গলায় আওড়ালো, “এভাবে বাঘিনির মতো তাকিয়ে থাকলেও আজ আপনার রক্ষা নেই। কালকেই বলেছিলাম এই বিষয়গুলো আয়ত্তে রাখতে। এখন যদি উত্তর দিতে না পারেন, তবে বেতের বারি একটাও কিন্তু বাইরে পড়বে না, মিস।”
ইলিজার ধৈর্যের বাঁধ এবার চূর্ণ হলো। তার অবাধ্য ভ্রূযুগল আরও কুঁচকে গেল। তপ্ত স্বরে সে বলল, “তাই বুঝি? আসুন না, মা’রুন দেখি আজ কে কয়টা মারতে পারে! আমি কিনা মিরু আপুকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আপনাকে প্রাইভেট টিউটর হিসেবে রাজি করালাম যাতে একটু শান্তিতে থাকা যায়। অথচ আপনার অত্যাচারে আমার ঘুম হারাম হয়ে গেছে। গত এক সপ্তাহে একবারও ফোন ধরার টাইম পাইনি। এত পড়ে কী করব শুনি? শেষে তো আপনার ঘরের বাসনই মাজতে হবে!”

কাব্যের ওষ্ঠাধরে ক্ষণিকের জন্য হাসির রেখা ফুটে উঠেই পুনরায় গম্ভীর আবরণে ঢাকা পড়ল।
“আপা নিজেই আমাকে এই গুরুভার দিয়েছেন—পড়াশোনায় ফাঁকিবাজি করলেই যেন আপনার পিঠের চামড়া তুলে ফেলা হয়। তবে আমার হৃদয় কিঞ্চিৎ দয়ার্দ্র, তাই অত কিছু করব না; কেবল হাতের তালুতে কয়েকটা বারি দেব। তবে… যদি সব পারেন, তাহলে কিন্তু একটা দারুণ গিফটও আছে।”
“ওই গিফট আপনার পকেটে ভরে রাখুন, শ’য়তান লোক! আমারই ভুল ছিল, নাহলে কেউ নিজে থেকে বিপদ ডেকে আনে!” ইলিজা অভিমানভরে জানালার ওপাশে দৃষ্টি ফেরাল। শ্রাবণের বিকেলের এক চিলতে রোদ তখন তার মুখে খেলা করছে, কিন্তু তার হৃদয়ের কোনো এক নিভৃত কোণে সুপ্ত কৌতূহল উঁকি দিল, কাব্য তাকে ঠিক কী উপহার দিতে চাচ্ছে?

আসলে বর্তমান অস্থির সামাজিক প্রেক্ষাপটে বহিরাগতদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে OWL-দের সেই অপ্রীতিকর ঘটনার পর মিরার পরিবার আরও বেশি শঙ্কিত ও সতর্ক হয়ে গেছে। কাব্য এই পরিবারের পূর্বপরিচিত এবং নির্ভরযোগ্য। ইলিজা যখন জানাল কাব্যও টিউশনি করায়, তখন বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠরা দীর্ঘ বিচার-বিশ্লেষণ শেষে সম্মতি দিলেন। যদিও এর পেছনে ইলিজার এক গূঢ় অভিপ্রায় ছিল, শখের পুরুষটিকে সারাক্ষণ চোখের সামনে দেখা যাবে আর বাহিরে যাওয়ার দৈহিক পরিশ্রমটাও লাঘব হবে।
তবে বড়ো আপু মিরার সম্মতি ব্যতিরেকে এত বড়ো সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ইলিজার মনে একটু দ্বিধা কাজ করছিল। ছোটোবেলা থেকেই পরিবার আর নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রতি তার আলাদা সম্মান ছিল। তাই সে ঠিক করল, যেভাবেই হোক, আপুকে বিষয়টা বুঝিয়ে বলতে হবে। ইলিজার প্ররোচনায় মিরা শেষ পর্যন্ত কাব্যের সাথে বাক্যালাপের সিদ্ধান্ত নিল। ফোনে কাব্যের বাচনভঙ্গি এবং শিষ্টাচার এতটাই মার্জিত ও পরিশীলিত ছিল যে, মিরার কঠোর মনও একটু নরম হয়ে এসেছিল। তবে কেবল বাহ্যিক আচরণে মুগ্ধ হয়ে ছোট বোনকে কারো কাছে প্রাইভেট পড়তে দেওয়া ঠিক হবে না ভেবে, মিরা কাব্যের পারিবারিক পটভূমি এবং চারিত্রিক সততা সম্পর্কে বিস্তর অনুসন্ধান চালাল। কাব্যের পড়াশোনার আগ্রহ আর বুদ্ধিমত্তার কথা জানার পর মিরা ধীরে ধীরে ভরসা পেল।

অবশেষে কাব্য মিরাকে আশ্বাস দিল—সে ইলিজাকে নিজের দায়িত্বে যত্ন নিয়ে পড়াবে, পরিশ্রম করাবে, আর সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে তাকে একদিন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রাঙ্গণে নিজের সুযোগ্য জুনিয়র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেই ছাড়বে।
“অনেক রাগ দেখানো হয়েছে, ম্যাডাম। এবার সবগুলো উত্তর লিখতে শুরু করুন।” ইলিজার হাতের পিঠে কলম দিয়ে আলতো একটু টোকা দিয়ে কাব্য তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল। জানালার বাইরে তখন দূর আকাশে কয়েকটা শঙ্খচিল চক্রাকারে উড়ছে।
ইলিজা মুখভার করে হাতের পিঠটা মৃদু ডলতে ডলতে বলল, “আগে বলুন কী গিফট দেবেন?”
কাব্য তার প্রিয়তমার চঞ্চল মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে সম্যক অবগত। মেয়েটি এখন একটি ঢিলেঢালা ওভারসাইজড গেঞ্জি আর প্লাজো পরিহিত, গ্রীবাদেশে অযত্নে জড়ানো ওড়না। এই অতি সাধারণ বেশভূষায়ও তাকে অপার্থিব সৌন্দর্যের অধিকারিণী মনে হচ্ছে। কাব্য আড়চোখে তার হবু জীবনসঙ্গিনীকে কয়েকবার নিরীক্ষণ করলেও ইলিজার মনোযোগ যেন বিচ্যুত না হয়, সেদিকে সজাগ থাকল। সে কিঞ্চিৎ ঝুঁকে নিচু কণ্ঠে শুধালো, “তুমিই বলো ফ্রিসিয়া, তোমার কী চাই?”

আবার ‘তুমি’! কাব্যের গম্ভীর অথচ মোহনীয় কণ্ঠস্বর থেকে নিঃসৃত এই একটিমাত্র সম্বোধনই ইলিজার হৃৎস্পন্দনের গতি বাড়িয়ে দিতে যথেষ্ট। তার অন্তরালে যেন শত শত বর্ণিল প্রজাপতি ডানা মেলছে, অদ্ভুত শিহরনে গাল দুটি আরক্তিম হয়ে উঠল। অধরপ্রান্তে ফুটে ওঠা সেই লাজুক হাসির রেখাটি কাব্যের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়াল না। কাব্য মনে মনে বেশ আমোদ অনুভব করলেও অবয়বে কঠোরতা বজায় রাখল; পাছে তার এই ‘চঞ্চলা’ চঞ্চল পায়ে পলায়ন না করে। ইলিজা নিজের কম্পিত আবেগ সংবরণ করার প্রচেষ্টায় ওড়নার প্রান্তটি আঙুলে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে অনুচ্চস্বরে শুধালো, “ফ্রিসিয়া তো একটা ফুলের নাম, তাই না?”
কাব্য কেবল নিঃশব্দে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল।
“তাহলে ওটার একটা চারাগাছই দিয়েন নাহয়।”
“হুম, প্রস্তাব মন্দ নয়! তবে এখন অনুগ্রহ করে উত্তরগুলো লিখে ফেলুন, মিস। রসায়নের এই জটিল পাঠ চুকিয়ে আমাদের জীববিজ্ঞানের তত্ত্বে প্রবেশ করতে হবে।”
ইলিজার দু-চোখ কপালে উঠল। সে বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলে বলল, “ও মা গো! আবার বায়োলজি? আমাকে কি আজকেই ইহলোক ত্যাগ করাতে চান নাকি? নাকি একদিনেই আইন্সটাইন বানিয়ে ছাড়বেন? আমি এত পড়াশোনা করতে পারব না। ইশশ, কতক্ষণ হলো গেম খেলি না, হাতটা আমার নিশপিশ করছে। ফোনটা যে বারবার ডাকছে আমাকে!”

কাব্যের ওষ্ঠাধরে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে পাশের টেবিলে রাখা মসৃণ বেতটির দিকে ইঙ্গিত করে বলল, “বেতটাও কিন্তু বারবার আমাকে ডাকছে।”
ইলিজা আকাশ থেকে পড়ার ভান করে বলল, “ছি ছি! আমি এতটা অভদ্র নই যে আপনাকে মার’ব। শিক্ষক তো গুরুজন হয়, তাকে কি মা’রা শোভা পায়?”
কাব্য এবার সোজা হয়ে বসে গম্ভীর কণ্ঠে শাসন করল, “লাঠিটা আমাকে ডাকছে, যাতে আপনাকে দু-চারটে উত্তম-মধ্যম দেওয়া যায়। এখন আজেবাজে কথা বন্ধ করে দ্রুত লিখতে বসুন।”
ইলিজা দন্ত কিড়মিড় করে কিছুক্ষণ কাব্যের দিকে তাকিয়ে রইল। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে সে অবশেষে অনিচ্ছাসত্ত্বেও খাতার পাতায় কলম ছোঁয়াল। তবে মাঝেমধ্যে কাব্যের দিকে হিংস্র দৃষ্টিতে তাকাতেও ভুলল না। কাব্য তার এই মান-অভিমানের রসায়নটুকু বেশ উপভোগ করলেও বাহিরে অবিচল ও জ্ঞানদীপ্ত গাম্ভীর্য বজায় রাখল।

ফারহানের থেকে কারান অবগত হয়েছিল যে, আয়লার আজন্ম লালিত একটা সুপ্ত বাসনা ছিল; তার জীবনের অন্তিম সময়টুকু শৈশবের সেই ধূলিমলিন আঙিনায় অতিবাহিত করা। শোকের জমাটবদ্ধ বিষণ্নতার আবহেও কারান নিজের কাঁধে তুলে নিল আয়লার শেষ ইচ্ছে পূরণের গুরুভার।
তুরস্কের ইস্তাম্বুল থেকে কিছুটা দূরে, মারমারা সাগরের নীল জলরাশির কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ‘বিউয়ুকাদা’ দ্বীপের এক নির্জন প্রান্তে আয়লার কবরের স্থান নির্বাচন করল কারান। জায়গাটা অত্যন্ত স্নিগ্ধ, যেখানে পাইন গাছের সারির মাঝ দিয়ে সমুদ্রের নোনা বাতাস বয়ে যায়। এখানেই একদা আয়লা তার পিতা-মাতার সাথে জীবনের শ্রেষ্ঠ অপরাহ্ণগুলো পার করেছিল; পরবর্তীতে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা RAW-তে যোগ দিয়ে সে হয়ে উঠেছিল এক দুর্ধর্ষ ফিল্ড এজেন্ট।
কারান কবরের চতুর্পাশে নিজ হাতে রোপণ করল অগণিত সাদা টিউলিপ আর ল্যাভেন্ডারের চারা। সেই স্নিগ্ধ বেগুনি আর শুভ্রতার মিশেলে কবরের চারপাশটা অপার্থিব সুবাসে আমোদিত হয়ে উঠল। কবরের শিরোভাগে একটি নিখুঁত ক্যারারা মার্বেল ফলকে অত্যন্ত যত্নসহকারে খোদাই করা হলো:

নাম: আয়লা দেমির (آئلہ دیمیر)
পরিচয়: মেহমেত দেমির এবং আয়শে দেমির-এর কন্যা (دختر: محمد دیمیر اور عائشہ دیمیر)
​জন্ম: ৫ জুন, ১৯৮৯ (تاریخِ پیدائش: ۵ جون ۱۹৮۹)
​মৃত্যু: ২৭ জানুয়ারি, ২০১৮ (تاریخِ وفات: ۲৭ جنوری ۲۰۱৮)
“সুকুন কি তালাশ মে ঘার লট আয়ি” (শান্তির খোঁজে ঘরে ফিরে এলো।)
কারান স্থানীয় একটা এতিমখানার সকল সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য রাজকীয় ভোজের আয়োজন করল, এবং আয়লার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনায় মিলাদ ও দোয়ার সুচারু ব্যবস্থা করল। কারান মজ্জাগতভাবে কিছুটা আবেগহীন হলেও, আয়লার প্রতি তার মস্তিষ্কপ্রসূত শ্রদ্ধাবোধ ছিল হিমালয়সম। তাই প্রতিটি কাজ সে নিখুঁতভাবে তদারকি করল, যেন কোনো ত্রুটি না থাকে।

আয়লার মৃ*ত্যুর পর বিগত সাতটি দিন যেন সাতটি শতাব্দীর মতো সুদীর্ঘ আর দুঃসহ হয়ে কারান ও ফারহানের ওপর চেপে বসেছে। এই এক সপ্তাহে জাগতিক প্রাত্যহিকতার সাথে ফারহানের প্রায় সকল সংযোগ ছিন্ন হয়ে গেছে। কারান নিয়মিত মিরার সাথে যোগাযোগ বজায় রাখলেও, ফারহান তারান্নুমের একটি কলেরও প্রত্যুত্তর দেয়নি। ফারহানের হৃদয়ে আয়লার প্রতি কোনো অভিযোগ নেই, তবে সেখানে ঘনীভূত হয়েছে আকাশচুম্বী অভিমান।
ফারহান বারান্দার ইজিচেয়ারে বসে দিগন্তবিস্তৃত সমুদ্রের প্যানোরামিক ভিউর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল, “আমি যখনই তোমাকে কোনো দামি গিফট দিতে চেয়েছি, কোনো লাক্সারি ওয়াচ বা তোমার পছন্দের কোনো জিনিস, তুমি জাস্ট একটা ম্লান হাসি দিয়ে সেটা ইগনোর করে গেছ। কেন নিজের জন্য কখনো কিছু ডিমান্ড করোনি? তুমি তো আমাকে সব দিয়ে গেলে, আয়লা দেমির—তোমার গোল্ডেন টাইম, তোমার আনকন্ডিশনাল ফ্রেন্ডশিপ, আর আমার পা’গলামি সামলানোর সেই অসীম ধৈর্য। অথচ আমি তোমাকে একটা প্রপার ‘থ্যাংক ইউ’ বলার সুযোগও পেলাম না। তোমাকে কি নিষ্ঠুর বলা উচিত?”

ফারহানের মনে হচ্ছিল, আয়লা যেন এক চিরস্থায়ী ঋণদাতা, যে শুধু দু-হাত ভরে দিয়েই গেল কিন্তু পাওনা বুঝে নেওয়ার আগেই জীবনের খাতা বন্ধ করে উধাও হয়ে গেল। এই অসমাপ্ত লেনদেনটাই ফারহানকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। সে ভাবছে, আয়লা হয়ত জানত যে সে বেশিদিন থাকবে না, তাই হয়ত সে ফারহানের স্মৃতিতে কোনো বস্তুগত চিহ্ন রাখতে চায়নি। সে চেয়েছিল শুধু অনুভবে বেঁচে থাকতে, এবং সে সফল!
মারমারা সাগরের নোনা বাতাসে তখন ল্যাভেন্ডারের মৃদু অ্যারোমা ভাসছে। ফারহান এখনো স্ট্যাচুর মতো বসে আছে, তার অশ্রুগ্রন্থি আজ শুষ্ক, চোখে কেবল এক অতল গহ্বরের মতো শূন্যতা খেলা করছে। সে জানে, তারান্নুম উদ্বেগ আর উৎকঠা নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে, কিন্তু আয়লার এই অনুপস্থিতি তাকে এতটাই গ্রাস করেছে যে, এখন কোনো ভালোবাসার আলো তার হৃদয়ে পৌঁছাতে পারছে না। মূলত তারান্নুমের কল রিসিভ না করার কারণ তার বর্তমান মানসিক অবস্থা; সে চায় না তার প্রিয়তমা এই শোকের ভাইরাসে আক্রান্ত হোক। তাই অত্যন্ত সুকৌশলে আয়লার মৃ*ত্যুর খবরটি গোপন রেখেছে সে।
ফারহান একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বিড়বিড় করল, “আই অ্যাম সরি তারা, বাট আই নিড সাম টাইম। তোমাকে ভালো রাখতেই আমি আজ এই সাইলেন্স মেইনটেইন করছি।”

তারান্নুম নদীর তীরে মখমলের ন্যায় নরম ঘাসের উপর অত্যন্ত বিষণ্ণচিত্তে বসে ছিল। অপরাহ্ণের ম্লান সূর্যালোকে নদীর স্থির জলরাশি তখন মায়াবী রূপ ধারণ করেছে। কারানের কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে মিরা ঘরের সীমানা ত্যাগ করতে পারেনি, ফলে এই নিঃসঙ্গ প্রহরে তারান্নুমের সঙ্গী হয়েছে কেবল নদীর শীতল হাওয়া। তারান্নুমের কচুপাতা রঙের সালোয়ার-কামিজের ওড়নাটি ঘাসের ওপর অবহেলায় লুটিয়ে আছে; তার এই চিরায়ত সাজে তাকে অপরূপা মনে হলেও চেহারায় লেগে থাকা বেদনার ছাপ তার চিরচেনা লাবণ্যকে কিছুটা ম্লান করে দিয়েছে। বিশাল কেশরাশি খোঁপার বাঁধনে থাকলেও, কিছু অবাধ্য চুল মৃদু হাওয়ায় তাঁর কপালে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে কোল থেকে ফোনটি তুলে নিল। না, ফারহান এবারও কল ধরছে না। তারান্নুম বিরক্তি আর অভিমানে ফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “আমিও দেইখা নেব, কদ্দিন আপনি এইভাবে আমার থেকে দূরে দূরে থাকেন!”

ক্রমাগত চেষ্টার পর ফোনটি পাশে রেখে সে হাঁটুর ওপর মাথা গুঁজে দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে সেই অতিপরিচিত, কিছুটা ভারি ও ভাঙা কণ্ঠস্বর তার কানে ভেসে এলো, “গোবরচারিণী!”
তারান্নুমের হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে দ্রুত মাথা তুলে দেখল ফারহান অবশেষে কলটি ধরেছে। তার আর্দ্র চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠলেও ঠোঁটে এক চিলতে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। ফোনটি কানে চেপে ধরে সে কৃত্রিম ক্রোধে ফেটে পড়ল, “ঘাট হইছে আমার! আর কোনোদিন যদি আপনারে কল করি! বিদ্যাশে যাইয়া আপনার অ্যাটিটিউড একদম পালটাইয়া গেছে। না জানি কোন সুন্দরী মেমসাহেব দেইখা আমারে ভুইলা গেছেন! থাকেন তাদের সাথেই, আমি আপনার কে-ই বা!”
গত দশ দিনের পুঞ্জীভূত অভিমান যেন এক নিমিষেই বিদীর্ণ হলো। ফারহান ওপ্রান্ত থেকে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ম্লান হাসল। তার কণ্ঠে ক্লান্তিকর বিষণ্নতা থাকলেও সে সেটা আড়াল করে বলল, “আমি কি আমার কুইনকে খুব বেশি কষ্ট দিয়ে ফেললাম?”

“না, একটুও না! আমার আবার দুক্কু-টুক্কু আছে নাকি! যান আপনি, কথা বলতে হইব না। রাখলাম!” তারান্নুমের গলায় তখন জেদের সুর স্পষ্ট।
“গ্লিমার?” ফারহানের ডাকটা ছিল খুব গভীর।
তারান্নুম ঠোঁট কামড়ে নীরবতা পালন করল। বিগত দশটি দিন তারান্নুমের হৃদয়ে যে নীরব হাহাকার চলেছে, ফারহান কি তার সামান্যতম আঁচও পেয়েছে? প্রাণের মানুষের সাথে একটি শব্দ বিনিময় না করার সেই দুঃসহ যন্ত্রণা তাকে তিলে তিলে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। তাই আজ তারান্নুমের ভেতরের জেদি মেয়েটি পণ করেছে—ফারহান যতই কণ্ঠস্বর কোমল করুক না কেন, যতক্ষণ না তার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে প্রিয়তমার অনুপস্থিতির অভাব স্পষ্ট হচ্ছে, ততক্ষণ সে এই মান-অভিমানের দেয়াল এক চুলও নড়তে দেবে না।
“কুইন? কথা বলো!” ফারহানের কণ্ঠে এবার কিছুটা আর্তি প্রকাশ পেল।
তারান্নুম অভিমানে ভেংচি কেটে ফোনটি ধরে রইল। ফারহান এবার তার প্রেমের ভাণ্ডার থেকে একে একে প্রিয়তমার সব নাম বের করতে লাগল।

“তারাজান?”
“আমার হৃদয়স্পর্শী?”
“মৃন্ময়ী? আর কত রাগ করে থাকবা?”
“নিয়ামা?” (আল্লাহর নেয়ামত)
“হেই অক্সিজেন? আমার তো নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তোমাকে ছাড়া। একটু কথা বলো না গো, অভিমানিনী!”
এত জেদ সত্ত্বেও ফারহানের সোহাগি সম্বোধনগুলো তারান্নুমের হৃদয়ের সবটুকু বরফ এক নিমেষে গলিয়ে দিল। তার ঠোঁটের কোণে সিক্ত হাসি ফুটে উঠল, যার ক্ষীণ শব্দ ওপ্রান্ত থেকে ফারহানও শুনলো। তারান্নুম এবার গাল ফুলিয়ে বলল, “হইছে! অনেক নাম আবিষ্কার কইরা ফেলছেন, আমার পারসোনাল সাইন্টিস্ট!”
এতগুলো দিনের সেই গুমোট বিরহ কাটিয়ে অবশেষে ফারহানের কণ্ঠে এবার চেনা চপলতা ফিরে এলো। সে তার গলার বিশেষ মাদকতা বজায় রেখে রসিকতার সুরে বলল, “সামান্য দেরি করে কথা বলেছি বলে আমার কুইনের এত অভিমান! বাসর ঘরে যদি একটু দেরি করে এন্ট্রি নিই, তবে তো দেখছি আমার গলাটাই কা’টা যাবে। তোমার থেকে বেশ সাবধানে থাকতে হবে দেখছি। আর শোনো বেইবি, বাসর রাতে বেশি লেয়ারড ড্রেস পরতে যেও না, আমার খুলতে অসুবিধে হবে। অযথা সময় নষ্ট করলে আমাদের রোমান্টিক সেশন শুরু করব কখন?”
হঠাৎ আলোচনার মোড় এভাবে ঘুরে যাওয়ায় তারান্নুমের চোখের মণি বিস্ময়ে বড়ো হয়ে গেল। তার ফরসা গাল আর কানের লতি মুহূর্তেই লজ্জার লাল আভায় রাঙিয়ে উঠল। সে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে কৃত্রিম রাগী সুরে উত্তর দিল, “আপনি কি কোনোদিন সিরিয়াস হইবেন না? সবসময় ফ্লার্ট করবার ধান্দায় থাকে, শালার ব্যাটায়!”

ফারহান এবার সশব্দে হেসে উঠল। গত দশটি দিন সে তার এই সরলা হবু বউটাকে যথেষ্ট মানসিক শাস্তি দিয়েছে, তাই এখন একটু নিজের ফ্লার্টেশন স্কিল কাজে লাগিয়ে তার মন গলানোর চেষ্টা করছে। বলা বাহুল্য, কৌশলটি বেশ কার্যকর হলো। ফারহান তার এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে ব্যাকব্রাশ করতে করতে গুনগুন করে গেয়ে উঠল,
“ক্যা কারুঁ ও লেডিস!
ও ও…
ক্যা কারুঁ ও লেডিস,
ম্যায় হুঁ আদাত সে মাজবুর…”
তারান্নুমের মনের সবটুকু জেদ এই এক গানেই জল হয়ে গেল। তবে এই দীর্ঘ বিরহে সে একটা চরম সত্য উপলব্ধি করেছে, সে সত্যিই ফারহানকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসে ফেলেছে। এই কয়দিনের প্রতিটি মুহূর্ত সে শুধু ফারহানের চিন্তায়ই ডুবে ছিল। তবে সে মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে; খান বংশের পুত্রবধূ হওয়ার জন্য তাকেও এখন থেকে মানসিক ও বাহ্যিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে, যেন শ্বশুরবাড়িতে সে সর্বদা মাথা উঁচু করে চলতে পারে।

আরো আট দিন পর।
একটি নিভৃত ঘরের গুমোট পরিবেশে আগুনের শিখার ওপর কারানের হাতটি স্থির দেখে ফারহান আঁতকে উঠল। সে ক্ষিপ্রগতিতে কারানের হাতটি এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “এই কারান! কী করছিস এসব তুই? তোর মাথা কি ঠিক আছে?”
কারানের এই পাগ’লামিতে ফারহান যে খুব একটা অবাক হয়েছে তা নয়, তবে তার ভীষণ রাগ হচ্ছে। এভাবে নিজের শরীর পুড়িয়ে যন্ত্রণা দেওয়ার মানে কী?
“আমি মিরাকে মিস করছি, ফারহান। আর এই মুহূর্তে তো ওর কাছে যাওয়া পসিবল না। কতগুলো দিন আমার মহারানির থেকে দূরে আছি আমি! আমার ভেতরে অসহ্য রকম যন্ত্রণা হচ্ছে।” কারানের কণ্ঠে এক ধরনের হাহাকার ফুটে উঠল।
ফারহান কারানের সেই পোড়া হাতটি শক্ত করে চেপে ধরে ধমকের সুরে বলল, “সেদিন দেখলাম তুই নিজের হাত কা’টছিস! ম’রে যাওয়ার খুব শখ হয়েছে নাকি তোর?”

“আই নিড মিরা! তুই কি বুঝতে পারছিস না?” কারান এবার উন্মত্ত পশুর মতো গর্জে উঠল। রাগে তার চোখের সাদা অংশ লাল হয়ে গেছে। ললাটের শিরাগুলো নীল হয়ে ফুলে উঠেছে। তার দু-চোখের নিচে কালচে ডার্ক সার্কেল স্পষ্ট জানান দিচ্ছে যে সে দীর্ঘকাল নিদ্রাহীন।
ইব্রাহিম আর জেহেরের সাথে সেই র*ক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের ফলে তাদের দুজনের শরীরই এখন খুব দুর্বল। বিশেষ করে কারানের পৃষ্ঠদেশে নিক্ষিপ্ত সেই তীরের ক্ষ’তটি এখনো পুরোপুরি সারেনি; যদিও সৌভাগ্যবশত তাতে কোনো বিষ মেশানো ছিল না। কারান এই বিধ্বস্ত আর জখম হওয়া শরীর নিয়ে মিরার সামনে যেতে চায়নি বলেই এই কয়েক দিন নিজেকে আড়ালে রেখেছে। নাহলে মিরার হাজারটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হতো তাকে। বিজনেস ট্যুরে গিয়ে শরীরের এই অবস্থা কেন? কারান কি কোনো সত্য লুকাচ্ছে? এমন কত কী!
যে স্ত্রীর স্পর্শ ছাড়া কারানের কাছে প্রতিটি মিনিট এক একটি যুগের মতো দীর্ঘ মনে হয়, সেখানে নিজেকে শান্ত রাখার জন্য সে এই শারীরিক ব্যথার পথটিই বেছে নিয়েছে। যদিও তার শরীরে এখনো সেই লড়াইয়ের বেশ কিছু ক্ষ’তচিহ্ন রয়ে গেছে, তবুও সে এখন মানসিকভাবে নিজেকে অনেকটা সামলে নিয়েছে। অন্তত মিরাকে শান্ত করার মতো কিছু গল্প সে গুছিয়ে ফেলেছে।

ফারহান আর সহ্য করতে না পেরে কিঞ্চিৎ কর্কশ স্বরে বলে উঠল, “এমন তো নয় যে তুই কোনোদিন সিংগেল ছিলি না? তখন তো এসব আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড করিসনি?”
কারান তার দগ্ধ হাতের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত স্থির রইল, তারপর পাথুরে গলায় বলল, “কারণ তখন মিরা আমার জীবনে এক্সিস্ট করত না। আর এখন মিরাকে ছাড়া দূরে থাকা মানে হচ্ছে নিশ্বাস বন্ধ করে বেঁচে থাকার এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা।”
“তোর বর্তমান কন্ডিশন দেখে মনে হচ্ছে তুই সেরেফ পা’গল হয়ে যাচ্ছিস। জাস্ট একটা মেয়ের জন্য নিজেকে এভাবে ডেস্ট্রয় করার কোনো লজিক হয়?” ফারহানের কণ্ঠে এবার স্পষ্ট বিরক্তি ঝড়ে পড়লো।
“মিরা ছাড়া আমার হার্টবিট চলে না, ফারহান। সাধারণ কথাটা তোকে আর কতবার বোঝাব?”
“বা’লের কথা বলিস না তো! বউ কি দুনিয়ায় আর কারো নেই? নিজেকে শেষ করে ওকে আগলে রাখার এই অবসেশন আমি জাস্ট নিতে পারছি না।”
কথাটা শোনামাত্রই কারানের দাঁতে দাঁত চেপে ধরার শব্দ মুহূর্তেই ভয়ংকর গর্জনে রূপ নিল। তার ভেতরের সুপ্ত আগ্নেয়গিরি হঠাৎ ফেটে পড়ল। কারান ক্ষিপ্র গতিতে ফারহানের কলার চেপে ধরে তাকে পাশের টেবিলের ওপর সজোরে আছড়ে ফেলল। ফারহানের মুখচ্ছবি মুহূর্তেই বিবর্ণ হয়ে গেল। সে কল্পনাও করতে পারেনি যে, তাদের দীর্ঘদিনের হৃদ্যতা একটি মেয়ের কারণে এভাবে ভায়োলেন্ট মোড় নিতে পারে। তার মানে মিরা নামের মেয়েটি কারানের মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরন দখল করে নিয়েছে।

কারানের বুক তখনো রাগে হাপরের মতো ওঠানামা করছে। সাদা শার্ট আর ডেনিম প্যান্টে তাকে সাধারণত মার্জিত লাগলেও, এখন কেবল এক ক্ষুধার্ত শ্বাপদ মনে হচ্ছে। সে ফারহানের চোখের ওপর চোখ রেখে চাপা স্বরে বলল, “আর একবার মিরা সম্পর্কে আননেসেসারি কিছু বলার আগে সাবধান হয়ে নিস। কেবল জেনে রাখ, মিরা আমার জীবনে আসার আগে সম্পূর্ণ আনটাচড ছিল, ইভেন কোনো র‍্যান্ডম ছেলে ওকে দেখার সুযোগও পায়নি। তোর কি ওকে আর দশটা অর্ডিনারি মেয়ের মতো মনে হয়?”
কিন্তু বন্ধুর ভালোবাসার গভীরতা মাপার জন্য ফারহান তবুও নিজেকে শান্ত রেখে বলল, “ঠিক আছে। তুই যদি ওকে কুইট না করিস, তবে আমি তোর সাথে আর কোনো সম্পর্ক রাখব না। কারণ তোকে এভাবে তিলে তিলে ম’রতে দেখা আমার পক্ষে ইমপসিবল। আমাদের বিশ বছরের ব্রোম্যান্স এভাবে শেষ হোক, এটা নিশ্চয়ই তুইও চাস না।”
মিরাকে ছাড়ার প্রস্তাব শোনামাত্রই কারান হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। তার হাতের চাপ এবার ফারহানের কণ্ঠনালিতে ঘনীভূত হলো, এমনভাবে যেন এখনই ফারহানের র*ক্ত চলাচল বন্ধ করে দিবে। কারানের চোয়াল তখন সার্জিক্যাল ব্লেডের মতো ধারালো দেখাচ্ছে। সে তার বলিষ্ঠ মুষ্টি শক্ত করে ফারহানের দিকে তাক করল। ফারহান নিশ্চিত ছিল যে, কারান এখন তার মুখের মানচিত্র বদলে দেবে, তাই সে নিঃশব্দে চোখ বুজে নিল।

কিন্তু সেই প্রচণ্ড আ’ঘাতটি ফারহানের মুখে না পড়ে পাশের কাচের টেবিলের ওপর আছড়ে পড়ল। কাচের টেম্পারড গ্লাস চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। কারানের হাত কেটে র*ক্ত ঝরছে, ফোঁটায় ফোঁটায় সেই গাঢ় লাল তরল মেঝের সাদা টাইলসকে কলঙ্কিত করছে। কিন্তু যন্ত্রণার লেশমাত্র নেই ওর চোখে। তড়িৎ আক্রোশে কারান সেই ভাঙা কাচের ওপর আরও কয়েকবার উন্মত্তের মতো ঘুসি চালাতে থাকল।
অবশেষে সেই র*ক্তাক্ত হাত নিয়ে কারান ফারহানের কানের কাছে এসে হিমশীতল স্বরে আওড়ালো, “মিরাকে নিয়ে যদি আর একটা শব্দ উচ্চারণ করিস, তবে আমি নিজের হাতে তোর গলায় ছু’রি বসাব। জাস্ট কিপ দ্যাট ইন মাইন্ড!”
এই বলে কারান ঘর থেকে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল। বাইরে তখন গোধূলির আলো ম’রে গিয়ে বিষণ্ন অন্ধকারে ছেয়ে গেছে চারদিক। নিস্তব্ধ ঘরে ফারহান অনেক কষ্টে সোজা হয়ে ভাঙা টেবিলটার কঙ্কালসার ফ্রেমের ওপর বসল। চূর্ণ-বিচূর্ণ কাচের টুকরোগুলো তার পায়ের নিচে মটমট করে শব্দ তুলছে। কিছুক্ষণ পর সে উঠে গিয়ে বিছানায় ধপাস করে এলিয়ে পড়ল।

​সেখানে শুয়েই সে একটা বিস্বাদমাখা হাসি হাসল। তারপর শূন্য সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “মিসেস মিরা চৌধুরি, আমার জানের চেয়েও দামি আমার বেস্টফ্রেন্ডটাকে তুমি জাস্ট ছিনিয়ে নিলে! তুমি ঠিক কতটা ডেঞ্জারাস, তা আমার জানা নেই। তবে তুমি আমার কারানকে যেভাবে কন্ট্রোল করছ, আই থিংক আই শুড বি জেলাস অফ ইউ!”
​ফারহানের গলার চারপাশটা তখন কালচে র*ক্তবর্ণ ধারণ করেছে; কারানের বলিষ্ঠ আঙুলের প্রতিটি চাপের চিহ্ন সেখানে স্থায়ী এক ট্যাটুর মতো বসে গেছে। প্রতিটি শ্বাস নিতে তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে, যন্ত্রণায় কুঁচকে যাচ্ছে কপাল। কিন্তু বন্ধুর এই উন্মত্ত এবং অন্ধ ভালোবাসা দেখে তার বিস্ময়ের সীমা রইল না। সে বুঝতে পারল, কারান এখন আর সাধারণ কোনো মানুষ নয়; সে এখন মিরার প্রেমে এক ভয়ংকর মদমত্ত বন্য পশুতে রূপান্তরিত হয়েছে।

কারান বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঘন ঘন তপ্ত নিশ্বাস ছাড়ছে। ক্রোধানলে তার সমস্ত শরীর রী রী করে কাঁপছে; মস্তিষ্কের প্রতিটি স্নায়ুতে তখন একটাই আদিম প্রবৃত্তি—ফারহানকে পিষে ফেলা। তার চোখের মণি ঈষৎ লালচে, অবিন্যস্ত চুলে তাকে বিকারগ্রস্তের মতো দেখাচ্ছে। কয়েকবার হাত দিয়ে কপাল ছাপিয়ে চুলগুলো পেছনে ঠেলল সে, যেন স্নায়বিক চাপ কিছুটা প্রশমিত করা যায়। পকেট থেকে আইফোনটা বের করে কাঁপাকাঁপা আঙুলে মিরার কন্টাক্টে ডায়াল করল।
ওদিকে মিরা তখন সবেমাত্র গোসল সেরে বেরিয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সিক্ত রূপ দেখছিল সে। ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা ফোনের স্ক্রিনে কারানের কল দেখে তার ফরসা মুখে আলতো হাসি খেলে গেল। দ্রুত ফোনটি কানে নিয়ে খুব আদুরে গলায় বলল, “হ্যালো, হানি!”
কারানকে চোখের দেখা না দেখে মিরার অবস্থাও শোচনীয়। যাকে প্রতি মুহূর্তে চোখের সামনে না দেখলে তার সকালটা ধূসর লাগে, সেই মানুষটার স্পর্শ ছাড়াই কেটে গেছে দীর্ঘ কয়েকটা দিন। মিরা চেয়েছিল তার হৃদয়ের সবটুকু হাহাকার উজাড় করে বলবে সে তাকে কতটা মিস করছে, কিন্তু তার আগেই অপরপ্রান্ত থেকে কারান গম্ভীর ও পাথুরে গলায় বলে উঠল, “কাল ফিরছি। নিজেকে প্রিপেয়ার করো। কালকের রাতটা তোমার জন্য বেশ দীর্ঘ হতে চলেছে।”

কথাটা বলেই উত্তরের অপেক্ষা না করে লাইনটা ডিসকানেক্ট করে দিল সে। মিরা কয়েক সেকেন্ড বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কারানের কথার গূঢ় অর্থ অনুধাবন করতে তার দেরি হলো না; তীব্র লজ্জা আর রোমাঞ্চের শিহরন তার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল। গালদুটো মুহূর্তেই র’ক্তিম আভা ধারণ করল। কিন্তু এই কামজ আবেশের মাঝেও তার মনে একটা খটকা উঁকি দিল—কারানের ভঙ্গিটা কেমন যেন অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কথা শুরু করতে না করতেই হুট করে ফোন কেটে দেওয়া, আর কণ্ঠে সেই চিরচেনা উষ্ণতার বদলে এক প্রকার অস্বাভাবিক রুক্ষতা ছিল। তবুও সে এসব নিয়ে অহেতুক ওভারথিংকিং করতে চাইল না। কারানকে সে চেনে, তার মেজাজ বোঝা অনেক সময় দায়। এখন তার কাছে শুধু কারানের শরীরী উপস্থিতিই কাম্য; পৃথিবীর বাকি সব সমীকরণ পরে ভাবা যাবে।

পরদিন ভোরে ফারহান নিজের হাতে কফি প্রস্তুত করেছে। রান্নায় সে আনাড়ি হলেও কফি বানানোর ক্ষেত্রে তার হাত বেশ জুতসই। মূলত কারানের মেজাজ শান্ত করতেই তার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। কাপে গাঢ় লিকুইডের উপরিভাগে সূক্ষ্ম ফেনা তুলে সে কারানের ঘরে ট্রে নিয়ে গেল। কফির কাপটি টেবিলে রেখে সে কিছুক্ষণ আড়ালে দাঁড়িয়ে তদারকি করল। কারান প্রথমে পাথরের মূর্তির মতো বসে থাকলেও কিছুক্ষণ পর অবজ্ঞাভরেই কাপটা তুলে চুমুক দিল। ফারহান দরজার আড়াল থেকে এসব পর্যবেক্ষণ করে মনে মনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
পরবর্তীতে ফারহান খুব সন্তর্পণে এসে কারানের পাশে দাঁড়ালো। সরাসরি ক্ষমা চাইল না ঠিকই, তবে তার চাওয়ার ভঙ্গিটা ছিল এক ধরনের আর্জি মেশানো অ্যাপলজি। ফারহান ভালো করেই জানে, কারানের ইগো হিমালয়সম; সেখানে বেশি নমনীয়তা দেখালে কারানের পা আর মাটিতে পড়বে না, আকাশেই থাকবে। সে কেবল প্রতিজ্ঞা করল যে আর কোনোদিন মিরার নামও তার মুখে আনবে না। কারান প্রথমে নির্বিকার থাকলেও ঘণ্টা দুয়েক পর হয়ত বন্ধুর মলিন, অবলা মুখ দেখেই তাকে মনে মনে মার্জনা করে দিল।

আয়লার স্মৃতিবিজড়িত এই শহরটির অলিগলি ঘুরে দেখার জন্য, বিগত কয়েকটা দিন তারা ইস্তাম্বুলেই ছিল। কারান একটা ছোট ব্যাগে করে আয়লার কবরের ওপর ঝরে পড়া একটি ল্যাভেন্ডার ফুল পরম যত্ন করে তুলে নিল। এটা কি কেবল স্মৃতিচারণ, নাকি মৃ’ত আত্মার প্রতি কোনো নীরব সহমর্মিতা, সেটা আবরার কারান চৌধুরীর রহস্যময় সত্তা ছাড়া কেউ জানে না।
২০১৬ সালের আগে যে মানুষটা ছিল পাষাণবৎ, যার হৃদয়ে আবেগের কোনো স্থান ছিল না, সেই কঠোর মানুষটার ভেতরেও আজ এক স্বল্প পরিচিতা তরুণীর জন্য করুণা জেগেছে। আয়লার আত্মত্যাগ এতটাই বিশাল ছিল যে, কারানের মতো রূঢ় মানুষকেও তা নাড়িয়ে দিয়েছে।
ইস্তাম্বুল থেকে বাংলাদেশে প্রাইভেট জেটে ফিরতে প্রায় ৮-১০ ঘণ্টা সময় লাগবে। যেহেতু তারা একটা লং-রেঞ্জ বিজনেস জেটে যাচ্ছে, তাই সকাল ১০টার মধ্যেই টেক-অফ করার পরিকল্পনা করেছে। লক্ষ্য একটাই, যাতে রাতের অন্ধকারের আগেই তারা স্বদেশের মাটি স্পর্শ করতে পারে।

ড্রয়িং রুমের মখমল সোফায় কারান অত্যন্ত ঋজু ও গাম্ভীর্যপূর্ণ ভঙ্গিতে উপবিষ্ট। তার পরনে একটি কাস্টম-মেড ব্ল্যাক লেদার জ্যাকেট, যার সুচারু কারুকাজ এবং সূক্ষ্ম ফিটিং তার প্রশস্ত কাঁধকে আরও বেশি পৌরুষদীপ্ত ও সংহত করে তুলেছে। ভেতরে পরিহিত তুষারশুভ্র শার্টের উপরিভাগের দুটি বোতাম খোলা।
সে তার কবজিতে লাগানো শ্বশুরের উপহার দেওয়া সেই বহুমূল্য টুডর ব্ল্যাক বে জিএমটি ঘড়িটির নীল-লাল পেপসি বেজেলের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালো। সময় এখন সকাল ৯টা ৭ মিনিট। ব্যক্তিগত জেটের রানওয়ে পর্যন্ত পৌঁছাতেও তো এক বিশাল সময়ের ব্যবধান অতিক্রম করতে হবে। ফারহানের কি সময়ের কোনো ন্যূনতম জ্ঞান নেই?

ধৈর্যের চরম সীমায় পৌঁছে কারান সোফা পরিত্যাগ করল, এবং ক্ষিপ্র পদক্ষেপে দোতলায় ফারহানের প্রকোষ্ঠের অভিমুখে অগ্রসর হলো। কক্ষের দ্বারটি উন্মুক্ত ছিল। ভেতরে পদার্পণ করতেই কারান এক অভাবনীয় ও কিম্ভূতকিমাকার দৃশ্যের সম্মুখীন হলো।
ফারহান কেবল আন্ডারওয়্যার পরে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শরীরের প্রদর্শনী করছে। একবার হেয়ার জেল দিয়ে চুলগুলো নিখুঁত করছে, তো পরক্ষণেই ক্লিন শেইভ করা চোয়ালের রেখার ওপর হাত বোলাচ্ছে। আবার কখনও পেটের সিক্স প্যাক পেশিগুলো টানটান করে কোনো নামি ফ্যাশন ম্যাগাজিনের কভার বয়ের মতো পোজ দিচ্ছে।
কারান দরজার ফ্রেমে গা এলিয়ে দিয়ে দাঁড়াল। তার একদিকের ভ্রূ কুঁচকানো, চাহনিটা এমন যেন সে কোনো নামি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলের ক্যামেরাম্যান হিসেবে চিড়িয়াখানার কোনো বিরল প্রজাতির প্রাণীর কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছে। অত্যন্ত নির্লিপ্ত গলায় সে মন্তব্য করল, “তোর কি চাল-ডাল কেনার টাকা ফুরিয়ে গেছে? তাই কি রিসেন্টলি আন্ডারওয়্যার ব্র্যান্ডের মডেল হিসেবে শুটিং শুরু করলি?”

ফারহান যেন আকাশ থেকে পড়ল! আয়নায় কারানের প্রতিবিম্ব দেখে চমকে উঠে হাত থেকে জেলের কৌটোটা প্রায় ফেলেই দিচ্ছিল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সে বিছানা থেকে হড়বড় করে প্যান্টটা টেনে নিল। এক পা কোনোমতে ঢোকালেও অন্য পা প্যান্টের জাঁতাকলে আটকে গেল। টাল সামলাতে না পেরে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে সে ধপাস করে বিছানায় আছাড় খেল, কিন্তু বীরের মতো প্যান্টের দখল ছাড়ল না। ওই অবস্থাতেই গলার রগ ফুলিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “দ্য গ্রেট ফারহান খানের দিনকাল খারাপ হতে পারে, কিন্তু এতটাও না যে আন্ডারওয়্যারের এ্যাডের মতো চিপ কাজ করবে! আর তুই কি ম্যানার্স শব্দটা ডিকশনারি থেকে পার্মানেন্টলি ডিলিট করে দিয়েছিস? হাহ! আমার তো একটা পারসোনাল প্রাইভেসি আছে নাকি?”
কারান ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। দুই হাত বুকের ওপর আড়াআড়ি রেখে সে আরও কিছুটা ভেতরে ঢুকে এলো। “আহ, রাইট! আচ্ছা, একবার আমার সামনেই কার যেন কোমর থেকে টাওয়েল খুলে পড়ে গিয়েছিল? ওটা কি তোর প্রাইভেসির অফিসিয়াল ট্রেলার ছিল?”

ফারহান সজোরে নিজের জিভ কামড় দিল। এই একটা স্মৃতি তার জীবনে বিষফোঁড়ার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারান গত কয়েক বছরে সম্ভবত দশবারের বেশি এই প্রসঙ্গ তুলে তার ডিগনিটি চূর্ণ-বিচূর্ণ করেছে। ‘একটামাত্র দুর্ঘটনা আর সারাজীবনের কান্না’—প্রবাদটি তার জীবনে অক্ষরে অক্ষরে ফলে যাচ্ছে।
কারান এবার শ্লেষের মাত্রা আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিল, “আর হ্যাঁ, তোকে আন্ডারওয়্যারের অ্যাডে না মানালেও, কোনো লো-বাজেট প*র্নস্টার হিসেবে কিন্তু দারুণ মানাবে। জাস্ট এ থট!”
ফারহান ক্রোধের চোটে ড্রেসিং টেবিল থেকে তার প্রিমিয়াম পারফিউমের বোতলটা কারানের নাসিকা লক্ষ্য করে সজোরে ছুঁড়ে মারল। কিন্তু কারান দক্ষ ফিল্ডারের মতো এক হাতেই শূন্যে উড়ন্ত বোতলটা ক্যাচ করে নিল। ফারহান দাঁতে দাঁত চেপে গরগর করে বলল, “ফা*কিং শালার ঘরের শালা! আমার মতো গুণে, রূপে আর চরিত্রে ধোয়া তুলসী পাতা এই যুগে দু’টো কেন, তুই গুগল করে সার্চ দিলেও পাবি না।”
কারান হালকা ভ্রূ উঁচিয়ে আর কিছু না বলে ফোনের স্ক্রিনে মনোযোগ দিল। কারণ হঠাৎ একটি বার্তা তার সম্পূর্ণ মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে।

কুইন ভিক্টোরিয়া: দাদিজান আপনার সাথে সামনাসামনি কথা বলার জন্য মরিয়া হয়ে আছেন, জাঁহাপনা।
মাই পারসোনাল চিতাবাঘ: আর আপনি?
কুইন ভিক্টোরিয়া: আজকাল কি কারো আমাকে নিয়ে ভাবার সময় আছে নাকি। পর হয়ে গেছি কিনা!
মাই পারসোনাল চিতাবাঘ: খুবই লেইম জোক ছিল, সুইটহার্ট।
মিরা ফোনের ওপাশে মুচকি হাসল। ড্রেসিং টেবিলের ওপর মাথা এলিয়ে দিয়ে সে খুব দ্রুত টাইপ করল, “জলদি এসো, যেন সুদে-আসলে তোমার ওপর সব রাগ ইনভেন্টরি খালি করে ঝাড়তে পারি।”
মাই পারসোনাল চিতাবাঘ: জাস্ট ওয়েট, আই উইল ফা*ক ইউ হার্ডার! আর আমার নাদান বউটা দেখি রীতিমতো ঘুসখোর হয়ে গেছে!

কুইন ভিক্টোরিয়া: জামাইয়ের ক্ষেত্রে সুদের ব্যাবসায় কোনো পাপ হবে না।
এদিকে ফারহান তার প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকে একবার মেপে নিল। তার পরনে ধবধবে সাদা কটন-সিল্কের পাঞ্জাবি। কলারের সূক্ষ্ম জরদোজি কাজ আর মুক্তোর বোতামগুলো সকালের আলোয় নরম দ্যুতি ছড়াচ্ছে। এই সেই বিশেষ পোশাক, যা তারান্নুম তাকে ভালোবেসে উপহার দিয়েছিল। সাদা পাজামার সাথে এই পাঞ্জাবিতে ফারহানের ফরসা গাত্রবর্ণ এবং জিম-ট্রেইনড সুঠাম কাঠামোতে এক অনন্য আভিজাত্য ফুটে উঠেছে। তাকে দেখতে এখন কোনো র‍্যাম্প মডেলের চেয়ে কম লাগছে না।
কারান আইফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে হঠাৎ ফারহানের দিকে তাকাল। তার ভ্রূ জোড়া কিছুটা কুঁচকে গেল, সাথে চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় ফুটে উঠলো। “তুই কি বিয়ে করতে যাচ্ছিস নাকি, ফা’কা’র? এই অসময়ে পাঞ্জাবি পরলি কার ম’রণে?”

ফারহান তার ব্যাকব্রাশ করা চুলগুলো আয়নায় শেষবারের মতো সেট করতে করতে বেশ তৃপ্তির সাথে বলল, “কাইন্ড অফ! বিয়ে করতেই যাচ্ছি মনে কর। যাই হোক, লুকটা কেমন লাগছে বল তো? ইজ ইট টু মাচ অর জাস্ট পারফেক্ট?”
কারান আপাদমস্তক একবার পরখ করে নিয়ে একটা ছোট নিশ্বাস ফেলল। “হুম, লাইফে প্রথমবার একটা গাধার প্রশংসা করতে হচ্ছে। নট ব্যাড, ভালোই লাগছে।”
“আজকে আর গালি দিয়ে মুখ খারাপ করব না, আমি মাসুদের মতো পিওর আর ভালো মানুষ হয়ে গেছি।” ফারহান পাঞ্জাবির হাতা গুটাতে গুটাতে বাঁকা হাসি দিয়ে বলল।
তারপর সে পকেট থেকে একটি ছোট নেভি-ব্লু মখমলের জুয়েলারি বক্স বের করল। বক্সের ওপরে সোনালি হরফে কোনো এক নামি ডিজাইনার ব্র্যান্ডের লোগো চকচক করছে। আংটির বাক্সটা খুলে কারানের চোখের সামনে ধরল। একরাশ প্রত্যাশা আর কিছুটা দ্বিধা নিয়ে ফারহান জিজ্ঞেস করল, “তোর বোনের পছন্দ হবে তো, কারান?”
রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে জানালার কাচ ভেদ করে আসা এক ফালি রোদে নীলকান্তমণির আংটিটি অপার্থিব সৌন্দর্যে ঝিকমিক করে উঠল। কারান বিস্ময়ভরা চোখে রত্নটির নিখুঁত কাটিং আর নীল আভার গভীরতা লক্ষ্য করলো। এটা যেমন ক্ল্যাসিক, তেমনই মডার্ন। রয়াল ব্লু স্যাফায়ারটির চারপাশে ক্ষুদ্র হীরেগুলো নক্ষত্রের ন্যায় জ্বলজ্বল করছে। মানতেই হবে, তার বাচাল বন্ধুর রুচি অত্যন্ত মার্জিত এবং রাজকীয়।

কারানের কণ্ঠে এবার বিদ্রুপের বদলে প্রচ্ছন্ন আবেগ ফুটে উঠল, “আর ইউ সিরিয়াস, ফারহান?”
“আবার জিগায়! ড্যাম সিরিয়াস, ব্রো!” ফারহান বুক ফুলিয়ে বলল। “কতগুলো দিন আমার ফিউচার ওয়াইফকে ওয়েট করিয়েছি, একবার ভেবে দেখেছিস? এখন আর আমার কুইনকে তোর বাড়ির ওই অখাদ্য খাবার আর মশার কামড় খাইয়ে কষ্ট দিতে একটুও রাজি নই আমি। ইটস টাইম টু টেক অ্যাকশন। এবার ঢাকা নেমেই সোজা পাকা দেখা করে আংটি পরিয়ে দেব। তারপর আমার বাবা-মা আর তোদের ফ্যামিলির সাথে অফিসিয়ালি বসে বিয়ের ডেট লক করব।”
কারান এক ভ্রূ উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, “বাট হোয়াই সো সাডেন?”
“হুট করে না রে ইয়ার, গত এক বছর ধরেই আমার সাবকনশাস মাইন্ডে এই মাস্টারপ্ল্যান চলছে।” ফারহান অত্যন্ত আয়েশ করে তার প্রিমিয়াম পাঞ্জাবির হাতা দুটো আরও কিছুটা নিখুঁতভাবে ফোল্ড করে নিল। “আর শোন, ও তোর বোন হতে পারে, কিন্তু আমার এই মিশনে তুই একদম ইন্টারফেয়ার করবি না। জাস্ট লেট মি ডু মাই থিং। তোর ফার্স্ট বেবি পৃথিবীতে ল্যান্ড করার আগেই আমি আমার ফোর-প্লে… আই মিন, চার-চারটে বাচ্চা ডাউনলোড দিয়ে দেব। আফটার অল, আই’ম আ স্ট্রং ম্যান উইথ আ ভেরি পাওয়ারফুল হার্ডওয়্যার, ইউ নো! আমার লাইটারটা একটু বেশিই উত্তপ্ত হয়ে আছে, এখন শুধু কুইনের ভেতরে আগুন জ্বালানো বাকি!”

​এই বলে সে কুটিল হাসি দিয়ে নিজের পৌরুষ জাহির করতে লাগল।
কারান এক চিলতে বাঁকা হাসল, কিন্তু এবার আর বন্ধুকে পাল্টা কোনো খোঁচা দিল না। ওটা ফারহানের জীবন, ওর কুইন—ও কখন কাকে আংটি পরাবে সেটা ওরই ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে কারান মনে মনে নিশ্চিত, তারান্নুম যখন এই সারপ্রাইজটা পাবে, সে আক্ষরিক অর্থেই শকড হবে। যাকে এখনো চাক্ষুষ দেখাই হলো না, সে কি না সরাসরি বিয়ের আংটি নিয়ে হাজির! যে-কোনো মেয়ের জন্যই এই আনএক্সপেক্টেড প্রপোজালটা হজম করা বেশ কঠিন।

বজ্জাত ব্যাটা: আজ কিন্তু কোনো লেম এক্সকিউজ শুনছি না, গ্লিমার। বিকেলের দিকে একদম সেজেগুঁজে সেই লাল শাড়িটা পড়বে। ইটস আ কমান্ড!
সুইট গোবরচারিনী: ক্যান? আমার বিয়া লাগছে বুঝি?
বজ্জাত ব্যাটা: (বাঁকা হাসির ইমোজি দিয়ে) লাগতেও পারে! কিন্তু এত আর্লি আপনাকে শাউড়ী আম্মার থেকে কেড়ে নিচ্ছি না কুইন, আমি বড্ড দয়ালু। আগে দেখা-সাক্ষাৎ হোক, আই-কন্টাক্ট হোক, কিছুদিন রোমান্টিক ডেটিং-ফেটিং হবে—তারপর না ঘরে তোলার ফাইনাল স্টেপ।
সুইট গোবরচারিনী: তাইলে ক্যান আবার এত সাজুগুজু করতে হইব? এমনিতেই সকাল থেকে গলাটা ভেঙে বসে আছে। কথা কইতে গেলে মনে হয় ভাঙা রেডিয়ো বাজতেছে, ফ্যাসফ্যাসে শব্দ ছাড়া কিছুই বুঝা যায় না।
বজ্জাত ব্যাটা: ওহ মাই গড! কীভাবে কী হলো, তারাজান? আর আজই কেন হতে হলো? আমি কিন্তু এখন লিটারালি ছোট বাচ্চার মতো হাত-পা ছুঁড়ে কান্না শুরু করব। যেভাবে পারো গলা ঠিক করো। আদা-জল খাও বা অন্য কিছু, জাস্ট গেট ওয়েল সুন!

তারান্নুম ঠোঁটের কোণে হাসি চেপে টাইপ করল, “আদা-জলে ঠিক হইবে না জনাব, যতক্ষণ না আপনার মাথাটা চিবাইয়া খাইতেছি, ততক্ষণ এই গলা পরিষ্কার হওয়ার কোনো চান্স নাই।”
ফারহান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে শব্দ করেই হেসে উঠল; তারান্নুমের এই ঝাঁঝালো উত্তরগুলোই তাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে।
বজ্জাত ব্যাটা: শয়’তানিতে আমার কুইন দেখি আমার থেকেও চার স্টেপ এগিয়ে! শোনো, আজ অনেক স্পেশাল একটা ডে। তাই তোমাকে স্পেশালি সাজতে বলেছি।
সুইট গোবরচারিনী: স্পেশাল ডে? আপনার বার্থডে নাকি আজ?
বজ্জাত ব্যাটা: উঁহুঁ, তার থেকেও মেমোরেবল কিছু! আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে তোমাকে আমি আমার লাইফে ফার্স্ট টাইম পেয়েছিলাম। সেই দিনটার কথা ভাবলে এখনো হার্টবিট বেড়ে যায়। আমার খুব ভালো করেই মনে আছে আমার কুইনের সেই অবাক করা ফেসটা। আচ্ছা, তোমার সেই মুরগির খোপটা কি এখনো আছে? যেটায় আমাকে বন্দি করে রাখতে চেয়েছিলে?

তারান্নুম খপ করে হেসে ফেলে লিখল, “আপনার মতন এই অতিকায় দামড়া ব্যাটার জন্য ওই ছোট্ট খোপে কোনো জায়গা হবে না। তবে তারান্নুমের মনে কিন্তু একটা বিশাল স্পেস আছে, সেইখানে আপনার পার্মানেন্টলি থাকার ব্যবস্থা হইলেও হইতে পারে!”
ফারহানের ওষ্ঠাধরে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। যাক, অবশেষে তার ‘কুইন’ তার মতোই আদুরে ফ্লার্ট করার আর্টটা আয়ত্ত করে ফেলেছে। আইফোনের নীলচে আলোয় ভেসে উঠল তারান্নুমের পরবর্তী মেসেজ।
“আর আপনি যে ‘মা শা আল্লাহ’ বইলা বত্রিশ পাটি খুইল্যা দাঁত কেলাইছিলেন, সেইটাও আমার মনে আছে।”
ফারহানের চওড়া হাসি আরও প্রসারিত হলো। সে দ্রুত টাইপ করল, “আর কী কী মনে আছে, কুইন?”
সুইট গোবরচারিনী: আমি আপনার ফিয়ন্সে, মিস গোবরচারিনী। এমন কিছু কেউ একজন বলছিল।
ফারহানের মনে হলো মেয়েটা যেন চোখের সামনে দাঁড়িয়ে ভ্রূ নাচিয়ে কথাগুলো বলছে।
বজ্জাত ব্যাটা: আপনার মেমোরি তো বেশ শার্প গ্লিমার, একদম আমার ফিউচার ওয়াইফের পারফেক্ট কার্বন কপি। এত প্রশংসার গ্রেটিচিউড হিসেবে আমার কিন্তু কয়েকটা চুমু পাওনা রইলো!
সুইট গোবরচারিনী: ঝাঁটাটা কিন্তু আমার হাতের কাছেই আছে, অ’সভ্য লোক!
ফারহান শব্দ করে হেসে উঠল।

বজ্জাত ব্যাটা: আগে তুমি আমার একটা পার্মানেন্ট নাম ফিক্স করো। কখনও বজ্জাত, কখনও অসভ্য। আমার যে একটা লেজেন্ডারি নাম আছে, সেটা তো আমি নিজেই ভুলে যাচ্ছি তোমার এই বিশেষণে!
তারান্নুম স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছে, প্রফুল্লতায় তার দুচোখে শরতের কাশফুলের মতো শুভ্র মায়া জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু এই মেসেজের কোনো পালটা প্রতিক্রিয়া দেখাল না, ফারহানকে একটু অপেক্ষার স্বাদ দিতে চাইল। কিছুক্ষণ নীরবতার পর ফারহান নিজেই আবার আকুতি মিশিয়ে লিখল, “আমাকে কি ভালোবাসো, তারা? কতবার ডেসপারেটলি জানতে চাইলাম, কিন্তু তুমি একবারও মুখ ফুটে বললে না। প্লিজ একবার বলো, আর ওয়েট করতে ইচ্ছে করছে না। ইট’স কি’লিং মি!”
সুইট গোবরচারিনী: সেইটা কিন্তু আপনিও মুখে সরাসরি বলেন নাই মিস্টার, জাস্ট টেক্সট বক্সে একবার প্রোপোজাল দিছিলেন। ওইটা কি কাউন্ট হয়?
বজ্জাত ব্যাটা: তুমি কি শুনতে চাও? জাস্ট সে ইয়েস, আমি এখনই বলছি। ভয়েস নোট পাঠাব?
সুইট গোবরচারিনী: উঁহুঁ! আমরা এক্কেবারে সামনাসামনি আই-কন্টাক্ট কইরা কথাটা বলব। আই ওয়ান্ট টু ফিল দ্য মোমেন্ট।

বজ্জাত ব্যাটা: (বাঁকা হেসে) ডিল ডান, বেবি!
সুইট গোবরচারিনী: দেইখেন, আমাদের ফার্স্ট মিটটা একদম লাইফটাইম মনে রাখার মতন ইনক্রিডিবল হইবে।
ফারহান পরম আদরে মেসেজটিতে একটি ‘লাভ রিঅ্যাক্ট’ দিয়ে ফোনটা বুকের কাছে চেপে ধরল।
জেটের আল্ট্রা-লাক্সারি কেবিনে বসে সে এখন শুধুই সময়ের হিসাব কষছে।
কারান আর ফারহান ঘণ্টাখানেক হলো তাদের ব্যক্তিগত জেটে চড়েছে। গ্যালফস্ট্রিম জেটের টার্বোফ্যান ইঞ্জিনগুলো তখন ৩০,০০০ ফুট উচ্চতায় মায়াবী গুঞ্জন তুলছে। মেঘের সিক্ত চাদর ভেদ করে নীল আকাশের বুক চিরে জেটটি যখন বাংলাদেশের দিকে ধাবমান, কারান তখন ফারহানের এই গদগদ ভাব দেখে নিজের অজান্তেই হাসল। বিগত কয়েক বছরে ফারহানকে সে কখনোই এতটা প্রাণবন্ত আর উজ্জীবিত দেখেনি। আয়লার সেই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃ*ত্যুর বিষণ্নতা আর কয়েক দিনের নির্ঘুম রাতের প্রভাবে ফারহানের চেহারায় কিছুটা পাংশুটে ভাব এলেও, তার অন্তরের জ্যোতি সেই মলিনতাকে ছাপিয়ে গেছে। সকাল থেকে তার ঠোঁটের কোণ থেকে হাসি এক মুহূর্তের জন্যও মিলিয়ে যায়নি।

কারান মনে মনে এক বিশাল পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলেছে। তার নিজের বিয়েটা আকস্মিক আর সাদামাটা হলেও, আদরের ছোট বোন তারান্নুমের বিয়েটা সে একদম রাজকীয় স্টাইলে করবে। উৎসবের প্রতিটি ধাপ হবে আভিজাত্যে ঘেরা— অনুষ্ঠানের প্রথম ধাপ হবে গ্রামের স্নিগ্ধ প্রকৃতিতে, আর একবার করবে তিলোত্তমা ঢাকা শহরে ফারহানের বাড়িতে। এমনকি হানিমুনের জন্য সে বিশ্বের সবচেয়ে লাক্সারি কোনো আইল্যান্ড রিসোর্ট আগেভাগেই বুক করে রাখবে।
কারান জানে, তারান্নুমের হৃদয়টা একদম স্বচ্ছ কাচের মতো; সেখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই। তার বোনটা আসলে ভালোবাসার কাঙাল। তার জীবনে ফারহানের মতো একজন সৎ এবং দায়িত্বশীল জীবনসঙ্গী পাওয়া মানে জীবনের সবচাইতে বড়ো পরম পাওয়া। বোনের জন্য শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে নির্বাচন করতে পেরে কারান আজ এক ধরনের পরম তৃপ্তি অনুভব করছে। একদিকে নিজের ভালোবাসার মানুষ মিরাকে দেখার ব্যাকুলতা, মিরার সেই পরিচিত ঘ্রাণ আর স্পর্শ পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে বন্ধুর চোখে এই খুশির ঝিলিক—সব মিলিয়ে কারানের মনটা আজ অদ্ভুত প্রশান্তিতে ডুবে আছে। সবকিছু যেন এক অলৌকিক পূর্ণতার দিকে এগোচ্ছে।

কারান একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে জানালার বাহিরে মেঘের দিকে তাকালো। পাশে বসা ফারহানের মুখে তখনো এক চিলতে অমলিন হাসি লেগে আছে, যেন তারান্নুমের প্রতিটি টেক্সট তার ধমনিতে নতুন করে অক্সিজেন জোগাচ্ছে। কারান খানিকটা গম্ভীর মুখে, বন্ধুকে শেষবার পরখ করার মানসে একটি তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, “তরুকে কবে থেকে এতটা প্যাশনেটলি ভালোবাসতে শুরু করলি? আমি তো জানতাম তোর অভিধানে ‘ভালোবাসা’ শব্দটা একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট ইল্যুশন ছাড়া আর কিছুই না।”
কারানের কণ্ঠের তীক্ষ্ণতা ফারহানের কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই সে ফোনটা লক করে পাশে রাখলো। মাথাটা সিটের কুশনে এলিয়ে দিয়ে এক মুহূর্তের জন্য চোখ জোড়া বুজল। তারপর গভীর, প্রায় আধ্যাত্মিক স্বরে আওড়ে গেল, “A lover’s religion stands apart from the world, Karan. A true lover is eternally intoxicated—long before, and long after, any drop of alcohol could ever touch her lips.”
ফারহানের কণ্ঠের সেই অবাধ্য তৃষ্ণা আর সত্যতা কারানের অভিজ্ঞ নজর এড়ালো না। সেখানে কোনো আর্টিফিশিয়াল আবেগের স্থান নেই। তবে কারানের কাছে এই অনুভূতির সংজ্ঞায়ন হয়ত আরও বেশি মোহময় আর বিষাদঘেরা। সে মনে মনে মিরার প্রতিচ্ছবি কল্পনা করে ভাবল, “যেখানে তোমার চাহনির তীক্ষ্ণ ইশারায় আমার স্নায়ুর প্রতিটি কোষে দহন জাগে, সেখানে কাচের পাত্রে রক্ষিত সাধারণ মদ স্পর্শ করার সাধ্য কার? প্রেমিক মাত্রই আজন্ম এক নেশাখোর, যার নেশার উৎস প্রিয়তমার অস্তিত্বের গহিনে লুকিয়ে থাকা দুর্ভেদ্য মায়া।”

ফারহান এর আগে কখনো নিজ থেকে তারান্নুমকে সাজতে বলেনি, তাই আজ যেহেতু সে আবদার করেছে, তারান্নুমের প্রস্তুতিতে কোনো কার্পণ্য রাখা সাজে না। শপিং মল থেকে কেনা সেই লালবর্ণের পাতলা শিফন শাড়িটা সে আলমারি থেকে বের করল। শাড়িটা প্রথাগত বেনারসি না হলেও এর মডার্ন ডিজাইন আর সূক্ষ্ম কারুকাজ তার দুগ্ধশুভ্র তনুতে এক অনন্য বৈপরীত্য তৈরি করেছে। তার কোমর ছাপানো সেই নিবিড় কৃষ্ণকেশকে সে অত্যন্ত নিপুণভাবে একটি এলিগেন্ট খোঁপা করে বাঁধল, যা তার গ্রীবার শুভ্রতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
সোফিয়ার কাছ থেকে রপ্ত করা মেকআপ টেকনিকগুলো আজ সত্যিই সার্থক। গালে সামান্য পিচ-টোনড ব্লাশ-অনের ছোঁয়া, ওষ্ঠাধরে টকটকা লাল ক্রিমসন লিপস্টিক আর আয়ত চোখে গাঢ় আইলাইনারের সূক্ষ্ম টানে তারান্নুমকে অপার্থিব সুন্দরী লাগছে। তার সুডৌল চিবুক আর নাসিকার দুই পাশে কন্ট্রোলিংয়ের তুলি বুলিয়ে সে নাকটাকে আরও শার্প করে তুলল। হালকা ফিনিশিং পাউডার দিয়ে সে তার বেস মেকআপটা সেট করে নিল।

হঠাৎ তার মনে পড়ল মিরার দেওয়া সেই বিশেষ ইয়ার-রিংসগুলোর কথা। এনগেজমেন্টের জন্য কেনা সেই দুলজোড়া কানের লতিতে ধরতেই আয়নায় প্রতিফলিত হলো একটা শরতের পূর্ণিমার চাঁদ। তারান্নুমের ঠোঁটের কোণের হাসি আরও চওড়া হলো—দুলগুলো শাড়ির সাথে একদম পারফেক্টলি ম্যাচ করে গেছে। কিন্তু তার উন্নত গ্রীবা আর কণ্ঠদেশ কেমন যেন খানিকটা শূন্য শূন্য মনে হচ্ছিল। আশেপাশে তাকাতেই নজর পড়ল কারানের মাধ্যমে ফারহানের পাঠানো কারুকার্যখচিত নেকলেসটির দিকে। ওটা গলায় জড়িয়ে নিতেই তার সম্পূর্ণ লুকটা স্বর্গীয় পূর্ণতা পেল। আয়নায় নিজের নিখুঁত অবয়ব আর মেদহীন কোমরের ভাঁজ দেখে সে নিজেই বিমুগ্ধ। আক্ষরিক অর্থেই আজ সে ফারহানের ‘রয়্যাল কুইন’।

তারান্নুমের লাবণ্যময় মুখমণ্ডলে লাজুক হাসি ফুটে উঠল। আয়নার দিকে তাকিয়ে সে চটপটে ভঙ্গিতে বলে উঠল, “আয়হায়! কী লাগছে তোরে, তরু! এক কথায় চরম, একদম ঝাক্কাস লুকে আছিস! নিজেরে দেইখা নিজেই তো অক্কা যাওয়ার জোগাড়। যারে বলে কিউটের ডিব্বা! চুম্মা তোরে।”
আঙুলগুলো একত্রে করে নিজের রাঙা ঠোঁটে ছুঁইয়ে সে নিজের প্রতিবিম্বকেই একটি কাল্পনিক চুম্বন উপহার দিল। পরক্ষণেই লজ্জায় লাল হয়ে শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে ফেলল। একটু পর নিজেকে সামলে নিয়ে বেশ আভিজাত্যভরা ভঙ্গিতে বিড়বিড় করল, “না, অহনই ওই শ’য়তান ব্যাটারে দেখানো যাইবে না। আগে মিরা ভাবিরে দেখাই। সে যদি গ্রিন সিগন্যাল দেয় যে সব পারফেক্ট, তহনই না হয় উনারে ভিডিয়ো কল দেওয়া যাইবে। আজকে তোমারে এই রূপের জাদুতে একদম সেন্সলেস করে ছাড়ব, মাই ফারহান জান্স!”
নিজের কথায় নিজেই দিশেহারা হয়ে সে ঘরে পায়চারি করতে লাগল। আয়নায় শেষবার নিজেকে চেক করে নিল, তার টানা টানা চোখ আর উজ্জ্বল চেহারায় অভাবনীয় এলিগেন্স আর স্মার্টনেস ঠিকরে বেরোচ্ছে। কিছুক্ষণ পর তারান্নুম তার হিল তোলা জুতো জোড়া পায়ে গলিয়ে মিরাকে খোঁজার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হলো। বাইরে তখন বিকেলের আলো কিঞ্চিৎ ম্লান হতে হতে মায়াবী গোধূলি-লগ্ন তার নীরব আগমনি জানান দিচ্ছিল, ঠিক যেমনটি শুরু হতে যাচ্ছে তারান্নুমের জীবনের নতুন এক অধ্যায়।

মিরা সকাল থেকেই একটা অস্থির মানসিক দোলাচলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল; কখন ফাতিমা একটু অবসর পাবেন, আর কখন সে তার মনের গহিনে জমে থাকা কুহেলিকাগুলো দূর করার সুযোগ পাবে। এই বাড়ির প্রতিটি দেয়াল যেন কোনো না কোনো ইতিহাসের সাক্ষী, যা সবার সামনে উন্মোচন করা বিপজ্জনক।
ফাতিমার ঘরের সামনে গিয়ে মিরা যখন মৃদু টোকা দিল, ফাতিমা তখন আসরের নামাজ শেষ করে জায়নামাজ গুটিয়ে নিচ্ছিলেন। মিরার বিষণ্ন অবয়ব দেখে তিনি এক টুকরো স্নিগ্ধ হাসি দিয়ে বললেন, “ভিত্রে আহো, বউমা।”
মিরা চৌকাঠের কাছে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার ভেতরে তীব্র দ্বিধা কাজ করছে, এই বংশের কোনো গোপন অধ্যায় নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা কতটা যৌক্তিক বা শিষ্টাচারসম্মত হবে, তা তার জানা নেই। ফাতিমা মিরার চোখেমুখের সেই অস্বস্তি লক্ষ্য করে কিছুটা বিচলিত হলেন। মমতার স্বরে বললেন, “কী হইলো, মা? বসতেছ না যে!”
মিরা একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে নিজের মনের সংশয়গুলোকে ঝেড়ে ফেলে সাহস সঞ্চয় করল। মৃদু স্বরে বলল, “আসলে… ফুপিজান, একটা বিশেষ কনফিউশন ছিল মনে। কিন্তু বুঝতে পারছি না ঠিক কীভাবে প্রশ্নটা করা উচিত!”
ফাতিমা ধীরপায়ে এগিয়ে এসে মিরার কাঁধে হাত রাখলেন। উচ্চতায় তিনি মিরার চেয়ে সামান্য খাটো হলেও তার ব্যক্তিত্বে আভিজাত্যপূর্ণ গাম্ভীর্য আর চেহারায় মাতৃত্বের একটা অপার্থিব আকর্ষণ বিদ্যমান। তিনি আশ্বস্ত করে বললেন, “কী প্রশ্ন, মা? তুমি একদম নির্দ্বিধায় জিগাইতে পারো।”
এবার মিরা সরাসরি ফাতিমার চোখের মণির দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিল, “দাদাজানের কি স্বাভাবিক মৃ*ত্যু হয়েছিল?”

অপ্রত্যাশিত এই প্রশ্নে ফাতিমা মুহূর্তের জন্য কিছুটা থমকে গেলেন, তবে নিজের আবেগকে সংবরণ করতে সময় নিলেন না। তিনি শুধু রহস্যময় স্বরে বললেন, “বাইরে হাঁটবা? তুমি তো আমগো বাড়ির পেছনের বাগানটার দিকটায় যাও নাই। ওই দিকটা এক্কেবারে শুনশান, জনমানবহীন। বিকালের স্নিগ্ধ বাতাস আর প্রকৃতির সান্নিধ্যে মনটা ভালা লাগবে। আহো!”
ফাতিমা তার শাড়ির আঁচলটি সযত্নে মাথায় তুলে দিয়ে সামনে এগোলেন। মিরা বুঝতে পারল, ফাতিমা চান না এমন কোনো স্পর্শকাতর রহস্য ঘরের ভেতরে আলোচিত হোক। বিশেষ করে তুব্বা আর তারান্নুম যেখানে এখনো এই অন্ধকারের খবর জানে না।

বাগানটি যেন সত্যিই অলৌকিক সৌন্দর্যের আধার। মিরা এর আগে একবার কারানের সাথে পাহাড় ভ্রমণের সময় এমন দৃশ্য দেখেছিল বটে, কিন্তু আজ এর ভেতর দিয়ে হাঁটা তার কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা মনে হচ্ছে। অপরাহ্ণের ম্লান সূর্যরশ্মি বিশাল বিশাল মেহগনি আর দেবদারু গাছের পাতার ফাঁক গলে মাটিতে সূক্ষ্ম আলপনা এঁকে দিয়েছে। পাখিদের ক্ষীণ কলকাকলি আর ঝরা পাতার মৃদু মর্মর শব্দে চারপাশটা প্রশান্তির আবেশে ভরে উঠেছে।
ফাতিমা পাইন গাছের সারি পার হতে হতে ধীরলয়ে বললেন, “আমি জানি না, তুমি এই বাড়ি সম্পর্কে কদ্দূর জানো। তবে আমার মনে হয়, বড়ো বউমা হিসাবে সবটাই জানার অধিকার তোমার আছে।”
মিরা তার পাশে হাঁটতে হাঁটতে উত্তর দিল, “দাদিজান একবার তার অতীতের কিছু অন্ধকার অধ্যায় নিয়ে কথা বলেছিলেন। তিনি কেন সেই সাতটা খু*ন করতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেটা আমি জানি। কিন্তু দাদাজানকে নিয়ে তিনি সবসময় নিশ্চুপ থেকেছেন, তাই তাকে সরাসরি কিছু জিজ্ঞেসও করিনি। আবার যদি কিছু মনে করেন…”
ফাতিমা স্থির দৃষ্টিতে অসীম শূন্যতার দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাকিটা তাইলে আমিই খোলাসা করি।”
প্রকৃতির এই শান্ত সমাহিত রূপের আড়ালে যে কত বড়ো কালবৈশাখি লুকিয়ে ছিল, তা শোনার জন্য মিরা নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে নিল।

ফাতিমা একটি দীর্ঘ ও ভারাক্রান্ত নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। মিরা তার সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ করে ফাতিমার দিকে পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করল, এবং তার মন্থর চরণের ছন্দের সাথে নিজের গতি মিলিয়ে নিতে লাগল।
ফাতিমা শুরু করলেন, “আমার বিয়ের বয়স তহন মাত্র ছয় মাস। এই বিশাল বড়ো বাড়িতে তহন আব্বা আর আম্মা ছাড়া কেউ থাকত না। ইসহাক আর আসাদ ভাই তহন ঢাকা শহুরে উচ্চশিক্ষায় ব্যস্ত, পড়াশোনার তাগিদে ওরা অনেক আগেই এই ভিটা ছাড়ছিল। ওই যে আম্মা একলা হাতে সাত-সাতখানা খু*ন করলেন, এরপর উনার সাহস আর আত্মবিশ্বাস যেন আকাশ ছুঁইলো। গ্রামের সাধারণ মানুষের চোখে আম্মা তহন আর র*ক্ত-মাংসের মানবী আছিলেন না, তিনি আছিলেন এক জাগ্রত দেবীর মতন! সেইবার আব্বা যহন স্থানীয় নির্বাচনে প্রত্যেকবারের মতন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ভাবতেছিলেন, আম্মাও তহন পর্দার আড়াল থেইকা নিজের ত্যাজ জাহির করতে শুরু করলেন। উনার যুক্তি আছিল অকাট্য—যদি এইবারও পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার দাপট চলে, তবে গ্রামের নারীরা কোনোদিনও আলোর মুখ দেখবার পারব না। সেই আমলে নারীশিক্ষা আছিল কল্পনাতীত, বাল্যবিবাহ আর গার্হস্থ্য নির্যাতন আছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। আম্মা চাইলেন এই প্রথাগুলা সমূলে নির্মূল করতে, যা অন্দরমহলে বন্দি থাইকা অসম্ভব। আম্মা সিদ্ধান্ত নিলেন, এই নির্বাচনে তিনিও লড়বেন; লড়বেন অবহেলিত নারীগো অধিকার আদায়ে। সেই যুগে নারীগো ভোটাধিকার তো দূরের কথা, পরপুরুষের সামনে আসাই আছিল সামাজিক পাপ। যদিও এইসব নিয়ম-কানুন পুরুষগুলাই নিজেগো স্বার্থে বানাইছিল, যাতে নারীরা ওদের কথার উপর রা না করবার পারে। কিন্তু আম্মা তার প্রখর মস্তিষ্ক খাটাইয়া গ্রামের সব গৃহবধূ আর মায়েদের একজোট করলেন। পুরুষরা যহন দুপুরের প্রখর রোদে কাজ করতে যাইত, আম্মা তহন বাড়ি বাড়ি গিয়া নারীগো সচেতন করতেন। তিনি বোঝাইতেন, গৃহকোণে যেমন মায়ের শাসন অপরিহার্য, সমাজের বৃহত্তর প্রাঙ্গণেও তেমন একজন মায়ের মমত্ব আর কঠোরতার দরকার আছে। আম্মার ত্যাজ, দুর্জয় সাহস আর হিমালয়সম সততা দেইখা সেই নির্বাচনে অবিশ্বাস্যভাবে আম্মাই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হইলেন। তারপর শুরু হইলো আম্বিয়া জমাদ্দারের স্বর্ণযুগ। গোটা গ্রাম উনার অঙ্গুলিহেলনে চলত, কারণ উনার নীতি আছিল আপোশহীন। উনার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিবৃত্তির কাছে নতি স্বীকার করত না—এমন কেউ আছিল না। আম্মা শুধু ন্যায়বিচারই করতেন না, কার মনের গহিনে কী কুটিল প্যাঁচ লুকাইয়া আছে, সেইটা মানুষের অবয়ব দেইখাই বুইঝা ফেলতেন।”

কথাটা শুনে মিরার ভ্রূ কিছুটা উঁচু হলো, সাথে ওষ্ঠাধরে এক চিলতে বিস্ময় মেশানো হাসি ফুটল। আম্বিয়া জমাদ্দার যে সত্যিই রূপ, গুণ আর শৌর্য-বীর্যে অনন্য ছিলেন, তার অকাট্য প্রমাণ মিলল। রক্ষণশীল যুগে একজন নারী হয়ে চেয়ারম্যান হওয়ার মতো বিপ্লবী কাজ করা সত্যিই অকল্পনীয়। মিরার মনে হলো, এই বংশের প্রতিটি কোষে তেজের সাথে রাজকীয় কৌশলগত বুদ্ধিমত্তাও সমানভাবে বহমান।
ফাতিমা আর মিরা কথা বলতে বলতে বাগানের নিভৃত কোনো প্রান্তে চলে গেছেন। এদিকে লাল শাড়ির আভিজাত্যে মোড়ানো তারান্নুম মিরাকে চমকে দিতে তার ঘরে গেল, কিন্তু ঘরটি শূন্য। ভেবেচিন্তে নিশ্চিত করল, মিরা নিশ্চয়ই ফাতিমার সাথে আছে—তাই সে ফাতিমার কক্ষে পা বাড়াল। কিন্তু সেখানেও জনমানবের অনুপস্থিতি দেখে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল।

“ওমা! এই বাড়ি থেইকা মানুষ ভ্যানিশ হওয়া শুরু করল কবে থেইকা? দুইজনে গেল কই?” সে বিড়বিড় করে উঠল।
হঠাৎ তার নজর কাড়ল পশ্চিমের জানালাটির দিকে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে আসছে, তাই প্রথা অনুযায়ী জানালা বন্ধ করতে সে সামনে এগোলো। তখনই তার দৃষ্টিসীমার অনেকটা দূরে ফাতিমা আর মিরার অস্পষ্ট অবয়ব ধরা পড়ল। তারান্নুম তাদের ডাকতে চাইল, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর আজ সম্পূর্ণ অকেজো। মূলত ল্যারিঞ্জাইটিস এবং তীব্র অ্যাসিড রিফ্লাক্সের কারণে তার ভোকাল কর্ডের অবস্থা শোচনীয়। গতকাল অতিরিক্ত মশলাযুক্ত খাবার খাওয়ায় পাকস্থলীর অ্যাসিড উজান ঠেলে গলায় উঠে আসায় এই বিপত্তি ঘটেছে। তার ওপর তুব্বার সাথে উচ্চৈঃস্বরে বিবাদ করে সে তার গলার ড্যামেজ চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
সে ফ্যাসফ্যাসে গলায় ডাকল, “মা, ও মা! ভাবিইই, কই যাও তোমরা? ও মা?”
কিন্তু তার আওয়াজ কক্ষের দেয়াল ভেদ করে বাইরে যাওয়ার আগেই মিলিয়ে গেল। নিরুপায় হয়ে তারান্নুম মিরার ফোনের নাম্বারে ডায়াল করল, কিন্তু সেই মুহূর্তেই বিছানার ওপর রাখা ফোনটি বেজে উঠল। দেখল মিরা আর ফাতিমা তাদের ফোন রুমে ফেলে রেখেই বাগানে ঘুরতে বেরিয়ে পড়েছেন।

তারান্নুম হতাশায় কপালে করাঘাত করে বলল, “আমারে সবাই ভুলামনা বইলা অপবাদ দেয়, আর এই যে দুই গিন্নি ফোন ফালাইয়া বাগানে হাওয়া খাইতে গেল, তাদের বেলায় তো কেউ কিছু বলব না!”
অগত্যা সে নিজেই সেই কুহেলিকাময় বাগানের পথে তাদের পশ্চাদধাবন করতে শুরু করল। মাঝে কয়েকবার ক্ষীণ স্বরে ডাকার চেষ্টা করলেও তার সেই অবদমিত আওয়াজ অতদূর পৌঁছানোর কোনো অবকাশ ছিল না।
মিরার চোখে-মুখে তখন একরাশ বিস্ময় আর কৌতূহল ফুটে উঠলো।
“তার মানে দাদিজান একসময় কার্যত গোটা পুষ্পানগর শাসন করেছেন! অবিশ্বাস্য!”

ফাতিমার ঠোঁটের কোণে একটি ম্লান ও বিষাদগ্রস্ত হাসির রেখা ফুটে উঠল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “তা কইতেই পারো, বউমা। কিন্তু এই সুখের আয়ু আছিল খুব অল্প। চেয়ারম্যান হওয়ার মাস দুই পরের ঘটনা। আব্বা জানপ্রাণ দিয়া চেষ্টা করছিল আম্মারে ওই গদি থেইকা সরাইতে। পুরুষতান্ত্রিক অহংকারে তার বাধত; যে রাজত্বে সে এত বছর একচ্ছত্র আধিপত্য চালাইছে, সেখানে তার নিজের ঘরের স্ত্রী শাসন করবে, এইটা সে মানতে পারে নাই। তার ওপর আম্মার ওই সততা আব্বার জন্য কাল হইয়া দাঁড়াইছিল। আব্বার কিছু গোপন ব্যাবসা আছিল, গোপন লেনদেন আছিল—যা আম্মার কঠোর শাসনের কারণে একদম বন্ধ হইয়া গেছিল। আম্মার ওই বাঘিনির মতন তীক্ষ্ণ নজর এড়াইয়া কেউ কোনো ইললিগ্যাল কাজ করবার সাহস পাইত না। আরও ছয় মাস কাইটা গেল, আব্বা কোনোমতেই আম্মারে গদি থেইকা নামাইতে পারলেন না। শ্যাষম্যাষ সে এক বিভীষিকাময় পথ বাইছা নিল…”
মিরা হঠাৎ উৎকণ্ঠার সাথে ফাতিমার কথা থামিয়ে দিয়ে কপাল কুঁচকে বলল, “এক মিনিট ফুপি, একটু থামুন!”
“কী হইছে, বউমা?” ফাতেমা অবাক হয়ে তাকালেন।
“আপনি বললেন দাদাজানের গোপন ব্যাবসা ছিল, সেটা ঠিক কী ধরনের ব্যাবসা? দাদিজান কি সেই সম্পর্কে কিছু জানতেন?”

ফাতিমা মাথা নাড়লেন। “না, আম্মা সরাসরি কিছু জানতেন না। আর ওইটা কীসের ব্যাবসা আছিল, সেই রহস্যের জট আজও খুলে নাই। কিন্তু আম্মা হয়ত কোনো অবৈধ কারবারের ইঙ্গিত পাইছিলেন, তবে সঠিক প্রমাণ তিনি পান নাই।”
মিরা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হলো। এই রাজকীয় বংশের ইতিহাসের আড়ালে যে এত অন্ধকার গলি লুকিয়ে আছে, তা সে কল্পনাও করেনি। সে নিজেকে সামলে নিয়ে আওড়ালো, “তারপর কী হলো?”
ফাতিমা এবার এক বুক কষ্টের নিশ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করলেন, “আব্বার ডান হাত আছিল এক লোক, নাম তার আফজাল জামশেদ। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হইয়া আব্বা তহন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। আম্মারে সরাইতে তিনি এতটাই মরিয়া আছিলেন যে, হয়ত আম্মারে পৃথিবী থেইকা সরাইয়া দিতেও আব্বার হাত কাঁপত না। কিন্তু তিনি খু*নের পথ নিলেন না, তিনি ভাবলেন তার থেইকাও জঘন্য একটা ম্যানিপুলেশন। একদিন আম্মা পুকুর ঘাটে গোসল সাইরা কেবল নিজের ঘরে ঢুকছেন। ঘরে পা রাখতেই আম্মা দেখলেন, উনারই নিজের বিছানায় শার্টের বোতাম খোলা অবস্থায় নির্লজ্জের মতন শুইয়া আছে ওই আফজাল!

আম্মা মুহূর্তের মধ্যে পেছন ফিরা বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠলেন, ‘আফজাল! আমি জানতে চাই না তুমি এই ঘরে ক্যান আইছো, আর এই কুৎসিত সাহস তুমি কই পাইলা। কিন্তু এখুনি যদি আমার চোখের সামনে থেইকা দূর না হও, তবে চেয়ারম্যান আম্বিয়া জমাদ্দারের দ্বিতীয় রূপ দেখতে বাধ্য হইবা!’
কিন্তু ওই লম্পট আফজাল দমল না। ও আম্মার দিকে আগাইয়া আইসা কুৎসিত ইঙ্গিত দিয়া কইল, ‘আপনার একটু সেবা করতে আইছি, ভাবিজান। চেয়ারম্যানের সেবা যদি রাজকীয় স্টাইলে না করি, তবে তো আমার এই গোলামি জীবনেই দাগ লাইগা যাইব।’

বইলাই ও আম্মারে পেছন থেইকা অ’সভ্যের মতন জড়াইয়া ধরল। আম্মার রাগে তখন র*ক্ত টগবগ করতেছে। তিনি দ্রুত ঘুইরা ওই জা*নোয়ারটারে সজোরে চড় কষাইতে যাইবেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই আম্মার চুলের মুঠি ধইরা হিড়হিড় কইরা টানতে শুরু করলেন আমার বাপ! তিনি যেন আগে থেইকাই ওত পাইতা আছিলেন। তিনি অত্যন্ত জঘন্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করলেন, ‘একটা বিষধর কালসাপরে এতদিন আমি দুধ দিয়া পুষলাম! আমারই লোকের লগে পরকীয়া চো*দাও তুমি? তোমার শরীরের সব ঝাঁঝ আজকে আমি চিরতরে মিটাইয়া দিমু!’
এক হাতে আম্মার চুলের মুঠি আর অন্য হাতে আফজালের কলার ধইরা তিনি টানতে টানতে ঘরের বাইরে নিয়া গেলেন। কিন্তু আম্মা একটা শব্দও করেন নাই, চিৎকারও করেন নাই। কারণ আম্মা তো জানত সে কতটা শুদ্ধ, কতটা নিষ্পাপ। কিন্তু ওইদিন পুষ্পানগরের আকাশ-বাতাস যেন একটা ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের সাক্ষী হইয়া রইল।”
ফাতিমা পাইন গাছের দীর্ঘ ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে ধূসর বাকলযুক্ত কাণ্ডে গা এলিয়ে দিলেন। মিরাও তার ঠিক বিপরীতে থাকা অন্য একটি পাইন গাছের ডালপালার ছায়ায় গা এলিয়ে দিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়ালো। তার সমস্ত মনোযোগ এখন ফাতেমার প্রতিটি শব্দের ওপর নিবদ্ধ।

Tell me who I am 2 part 17 (4)

গোধূলির সেই ম্লান রক্তিম আভা তখন দিগন্তরেখা ছাপিয়ে মিলিয়ে গেছে; বনের নিস্তব্ধতা চিরে ঝিঁঝি পোকার একঘেয়ে তীক্ষ্ণ ডাক শুরু হয়েছে। ফাতিমা আবার শুরু করলেন, “এইদিকে আব্বার চিৎকার শুইনা চৌধুরি বাড়ির সদর দরজার সামনে গ্রামশুদ্ধ মানুষের ভিড় জইমা গেল। আব্বা আম্মা আর ওই জা’নোয়া’র আফজালরে হিড়হিড় কইরা টাইনা উঠানের মাঝখানে আছড়াইয়া ফেললেন। ওইদিকে আম্মা পাথর হইয়া গেছেন; একফোঁটা চোখের পানিও তার গাল দিয়া পড়ে নাই অবধি। তিনি শুধু তার ওই বাঘিনি চোখে আব্বার দিকে স্থির তাকাইয়া ছিলেন। তহন ইসহাক আর আসাদ ভাই বাড়তে নাই, আম্মারে যে একটু আগলাইয়া রাখবে, তেমন কেউ আছিল না।
আব্বা জনসমক্ষে গর্জে উঠলেন, ‘ওরে যা শাস্তি দিতে মন চায়, আপনারা দেন। আমি আর এই কলঙ্কিনীরে ঘরে তুলব না, এইটাই আমার শেষ কথা!’

Tell me who I am 2 part 19