Tell me who I am 2 part 19
আয়সা ইসলাম মনি
গ্রামের মাতব্বররা গোল হইয়া বসল, কী বিচার করন যায়। হুট কইরাই নিয়ম অনুযায়ী সবাই ইট-পাথর কুড়াইয়া আম্মার শরীরে মা’রতে শুরু করল। শাস্ত্র মতে যদি পরকীয়া শাস্তিও হয়, তবে তো দুইজনারই হওয়ার কথা। কিন্তু না, আব্বা খুব সাবধানে আফজালরে আড়াল কইরা সামনে থেইকা সরাইয়া নিলেন। আর তহনই আম্মার মগজে সন্দেহের বীজ বুনলো। যেহেতু বাসায় তিনি আর আব্বা ছাড়া তৃতীয় কোনো পক্ষ আছিল না, আর ঘরের চাবিও মাত্র দুই জোড়া—একটা আম্মার কাছে, অন্যটা আব্বার কাছে। তাইলে ওই জা*নোয়ার ঘরে ঢুকল ক্যামনে? সব পরিষ্কার! আম্মার তীক্ষ্ণ মগজ ধরতে দুই সেকেন্ড সময়ও নিল না যে, এইসবই আব্বার সাজানো নাটক।
ততক্ষণে আম্মার দুধের মতন সাদা শরীরটা র*ক্তে রঞ্জিত হইয়া গেছে। কপাল থেইকা র*ক্তের ধারা চোখের ভ্রূতে আইসা জমা হইছে। কাদা, ময়লা আর র*ক্তে একাকার তার রাজকীয় অবয়ব। যদি তিনি স্বয়ং আম্বিয়া জমাদ্দার না হইতেন, তবে হয়ত জনতা তারে লাথি-ঘুঁষি মাইরাই শ্যাষ কইরা দিত। কিন্তু উনার প্রভাব আছিল আলাদা, উনার ওই চাহনি দেইখা র*ক্তের মাঝেও কেউ গায়ে হাত দেবার সাহস পাইলো না। আম্মা যহনই সব ছক মিলাইয়া নিলেন, আর এক মুহূর্তও দেরি করেন নাই। ওই র*ক্তাক্ত দেহ নিয়াই ভিড় ঠেইলা ঘরের ভিত্রে ঢুকলেন।
রান্নাঘর থেইকা ধারালো আঁশ-বঁটিটা নিয়া বিদ্যুতের মতন গতিতে বাইরে আসলেন, এবং জনসমক্ষে আব্বার ঘাড় থেইকা মাথাটা আলাদা কইরা দিলেন। আব্বার মাথা ছাড়া শরীরটা তহনও দুলতেছে, আর গলার ফিনকি দিয়া র*ক্ত ভলভলাইয়া চারদিকে ছিটকাইয়া পড়তেছে। এমনকি ওই র*ক্ত আম্মার মুখেও আইসা লাগছে। আব্বার নিথর দেহটা ধপ কইরা মাটিতে পইড়া উঠান র*ক্তে র*ক্তাক্ত কইরা দিল। অথচ আম্মার চোখে কোনো অনুশোচনা নাই, একদম শীতল পাথর যেন!
এই বীভৎস দৃশ্য দেইখা উপস্থিত জনতা আতঙ্কে আর্তনাদ শুরু করল, দিগ্বিদিক পালানোর চেষ্টা করল। তহন আম্মা সেই র*ক্তমাখা বঁটি উঁচাইয়া গম্ভীর গলায় চিৎকার দিয়া উঠলেন, ‘আমার কথা শেষ হওয়ার আগে এই উঠানের বাইরে যার এক পা পড়ব, আমি আম্বিয়া জমাদ্দার কথা দিচ্ছি, তার পা দুইটাই কাইটা আমার ঘরের আলমারিতে সাজাইয়া রাখব!’
কথাটা শুইনা যে যেইখানে আছিল, ঠিক তেমনেই থাইমা গেল। সবার কপালে ভয়ের ঘাম, হৃৎপিণ্ড যেন বাইরে আসবার চায়। আম্বিয়া জমাদ্দার সাহসী, এইটা সবাই জানত; কিন্তু তিনি যে এমন প্রলয়ংকরী ভৈরব রূপ ধারণ করতে পারেন, সেইটা ওইদিন পুষ্পানগরবাসী প্রথম দেখল। আম্মা এইবার ওই নরাধম আফজালের দিকে ফিরলেন, যে ইতোমধ্যে আম্মার রুদ্রমূর্তি দেইখা ভয়ে প্যান্ট ভিজাইয়া ফেলছে। আম্মা ফুঁসতে ফুঁসতে কোমরে শাড়ির আঁচলটা শক্ত কইরা বান্ধলেন। এরপর ওই র*ক্তাক্ত বঁটি নিয়া জা’নো’য়ারটার সামনে গিয়া দাঁড়াইলেন। আফজাল তহন আম্মার পায়ের সামনে বইসা কুকুরের মতন কানতেছে আর ক্ষমা চাইতেছে। কিন্তু আম্মা ওরে সময় দিলেন না, নিমিষেই ওর দুই হাত দুই কাঁধ থেইকা বিচ্ছি’ন্ন কইরা দিলেন।
আম্মা গর্জে উঠলেন, ‘এখুনি সত্যিটা কবুল করবি, নাকি তোর এই নোংরা শরীরের আরও কোনো অঙ্গ বাদ দিমু?’
আম্মার ভয়ে আফজাল সব গড়গড় কইরা স্বীকার করল। ওই দিন আম্মার প্রতি গ্রামের মাইনষের যেমন চরম আতঙ্ক জন্মাইলো, তেমন শ্রদ্ধাও কয়েক গুণ বাইড়া গেল।”
মিরার বুকটা ধক করে উঠল। সে দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না। পুষ্পানগরের এই গুমোট অন্ধকার ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় যেন তার স্নায়ুর ভেতরে অ্যাড্রেনালিন রাশ তৈরি করছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাতিমার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার কাঁপাকাঁপা হাত দুটো নিজের দুই হাতের ভেতর নিয়ে দৃঢ় গলায় বলল, “আমি তবে আমার দাদিশাশুড়িরই যথার্থ প্রতিচ্ছবি!”
মিরা কেন এমন গূঢ় অর্থ বহনকারী কথা বলল, ফাতিমা তার তল খুঁজে না পেলেও বিষয়টিকে লঘু চালে উড়িয়ে দিলেন। তিনি স্নিগ্ধ হাসিতে মিরার মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে মৃদু স্বরে বললেন, “আমার বাড়ির মাইয়াগুলা সব এক একটা তেজি, জেদি, রাগিণী। মেজাজে ত্যাজ থাকা ভালো মিরা, আমি তো মনে মনে চাই আমার মাইয়াটাও যদি তোমার মতন তেজি হইত!”
মিরা তাল মিলিয়ে হাসল। তাদের পায়ের নিচে শুকনো পাইন পাতার মচমচে শব্দ হচ্ছে। সে হাঁটতে হাঁটতে বলল, “তরু আসলে জীবনের কঠিন ধাক্কাগুলো এখনো খায়নি, ফুপি। সময়ের সাথে সাথে ও সব এমনিতেই শিখে যাবে।”
“উঁহুঁ, তুমি মাঝেসাঝে ওর কয়েকটা ক্লাস নিও, তাইলে দেখবা ঠিক লাইনে চইলা আসছে,” ফাতিমা কৌতুকপূর্ণ সুরে বললেন।
মিরা প্রশস্ত হাসল। তারা দুজন গল্পে মশগুল হয়ে বাগানের আরও কিছুটা গভীরে প্রবেশ করল। বনজ বৃক্ষের ঘ্রাণ আর আসন্ন রাত্রির শীতলতা তাদের সাংসারিক আলাপে প্রশান্তিময় আবহ তৈরি করল।
অন্যদিকে অদূরেই তারান্নুমের অবস্থা করুণ। টানা হাঁটার পরিশ্রমে তার চরণে হালকা ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। দূর থেকে ফাতিমা আর মিরার অবয়ব ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে আসছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল, এরা সত্যিই র*ক্তমাংসের মানুষই তো? এত দ্রুত হাঁটে কী করে!
“ধ্যাত! এই দুইজনের পা কি মেশিন নাকি আল্লাই জানে। থাক, ভাবিরে নাহয় পরেই দেখামু, আগে ফয়সাইল্লার পোলারে দেখাই। এমনিতেই চারপাশ অন্ধকার হইয়া আসতেছে,” নিজের ফ্যাসফ্যাসে গলায় আপনমনেই কথাগুলো আওড়াল সে। তবে পরক্ষণেই ফারহানের কথা মনে পড়তেই তার গালে লাবণ্যময় আর’ক্তিম আভা ফুটে উঠল। আজকের এই বিশেষ সাজে ফারহান তাকে দেখলে কী প্রতিক্রিয়া দেবে, সেই ভাবনায় সে কিছুটা বিচলিত।
তপ্ত নিশ্বাস ফেলে সে ফোনটা হাতে নিল। ইচ্ছা ছিল ফারহানের সাথে কথা বলতে বলতেই বাগান থেকে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু স্ক্রিন স্পর্শ করার আগেই হঠাৎ একটা কানফাটা আর্তচিৎকারে তারান্নুমের হৃৎপিণ্ড যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে ত্বরিত গতিতে পেছনে ফিরল।
পার্শ্ববর্তী ঝোপঝাড় আর প্রাচীন মহীরুহগুলোর মাঝখান থেকে আসা সেই ধ্বনিটি তার স্নায়ুর ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করল। “কোনো বাচ্চার আওয়াজ শুনলাম মনে হয়।”
কিন্তু চারদিকে তাকাতেই একটা বিশ্রী ভীতি তার মেরুদণ্ড দিয়ে নেমে গেল। এই বাগান তার শৈশব-কৈশোরের চেনা পথ, অথচ আজকের এই জমাটবদ্ধ অন্ধকার আর ঝিঁঝিঁ পোকার সমবেত কলতান যেন কোনো অশুভ সংকেত বহন করছে। বাতাসের শো শো শব্দে পাইন পাতার কম্পন এক প্রকার ভৌতিক আবহ তৈরি করেছে। তারান্নুমের অন্তঃকরণ দুরুদুরু কাঁপছে। এক পা সামনে এগোবে কি না, সেই দ্বিধায় সে যখন আড়ষ্ট, ঠিক তখনই পুনরায় সেই তীক্ষ্ণ চিৎকারটি প্রতিধ্বনিত হলো। চিৎকারটি আরও তীব্র, আরও যন্ত্রণাকাতর শোনালো। এবার আর কোনো সংশয় রইল না। তারান্নুম অবশ দেহটাকে টেনে হিঁচড়ে শব্দের অভিমুখে নিয়ে চলল।
তার মস্তিষ্কের যৌক্তিক অংশ কেবল একটি প্রশ্নই বারবার আওড়াচ্ছে, “উঁহুঁ, কোনো ভুল নাই। কিন্তু… এই নির্জন বাগানের গভীরে এত রাইতে বাচ্চা আসব কোত্থেকে?”
অন্ধকারের ঘনত্ব বাড়ছে, আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বনের নিস্তব্ধতা।
তৃতীয়বারের মতো সেই বুকফাটা আর্তচিৎকারটি যখন তারান্নুমের কর্ণকুহরে প্রবেশ করল, তখন মনে হলো তার শ্রবণেন্দ্রিয় বুঝি এখনই বিদীর্ণ হয়ে যাবে। অন্ধকারের সেই নিবিড় অরণ্যের গভীরে শব্দের উৎস লক্ষ্য করে সে উন্মত্তের মতো দৌড়াতে শুরু করল। তার বক্ষপিঞ্জরের ধুকপুকানি এখন কোনো ঘোড়ার থেকেও তীব্রবেগে ছুটছে, আর ফুসফুস জোড়া অক্সিজেনের তীব্র সংকটে ঘন ঘন ওঠানামা করছে।
বেশ খানিকটা পথ অতিক্রম করার পর হঠাৎ করেই সেই বিভীষিকাময় চিৎকারটি স্তিমিত হয়ে গেল। চারপাশ এখন অস্বাভাবিকভাবে স্তব্ধ। তারান্নুম দুই হাঁটুর ওপর হাত রেখে নুয়ে পড়ে হাঁপাতে লাগল। তার ললাট বেয়ে ঘাম ঝরছে।
“এইটাহ… কোন দিকে আইসা পড়লাম! হে আল্লাহ! আমি পথ হারাইলাম না তো? আর… আর ওই চিৎকারের শব্দ থাইমা গেল যে?”
সে ভীতু চোখে চারদিকে দৃষ্টিপাত করল। তাদের সুবিন্যস্ত পারিবারিক বাগান বহু আগেই পিছনে ফেলে সে একটা নিষিদ্ধ অরণ্যে প্রবেশ করেছে। লতাগুল্মে ঘেরা এই বিজন প্রদেশে সচরাচর লোকালয়ের কেউ পা রাখে না। বনজ লতা আর বুনো ঝোপের কাঁটা তার দামি শাড়িতে আঁচড় কাটছে। ফোনের কৃত্রিম আলোটুকু না থাকলে এই গাঢ় তিমিরে তার হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া হয়ত এতক্ষণে বন্ধ হয়ে যেত। হঠাৎ বাতাসের শো শো শব্দের মাঝে এবার একটা করুণ কান্নার সুর ভেসে এলো। তারান্নুমের ষষ্ঠেন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল। সে অতি সন্তর্পণে পা ফেলে সামনে এগোতেই একটি জীর্ণ অট্টালিকা সদৃশ ঘর দেখতে পেল। শ্যাওলা ধরা সেই প্রাচীন দেয়ালগুলোতে কালচে-সবুজ ছোপ পড়েছে, যা দেখে মনে হয় যুগ যুগ ধরে এখানে সূর্যের আলো প্রবেশ করেনি।
“অদ্ভুত! এমন একখান জায়গায় এই ঘর কেমনে কি?” চিন্তার আবর্তে তারান্নুম একটি শুষ্ক ঢোক গিলল।
একবার তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক তাকে ফিরে যাওয়ার তাগাদা দিলেও সেই অবোধ শিশুর কান্নার বেগ তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল।
সতর্কভাবে এগোতেই সে দেখল ঘরের প্রবেশপথে দুজন যমদূতের মতো পাহারাদার দাঁড়িয়ে আছে। তাদের রুক্ষ অবয়ব আর পেশিবহুল দেহভঙ্গি বলে দিচ্ছে ভিতরে কোনো বেআইনি কাজ চলছে। তারান্নুমের ললাট কুঞ্চিত হলো। তবে সৌভাগ্যবশত পেছনের দিকটা অরক্ষিত। সম্ভবত এই গহিন অরণ্যে কেউ হানা দিতে পারে, এমন আশঙ্কা ওই ঘা’তকদের মস্তিষ্কে আসেনি।
সে মনে মনে নিজেকে সাহস জোগাল, “ভিতরে কী হইতেছে দেখুম কেমনে? উফ, এত চিৎকার! আমার মনে হইতেছে কান ফাইটা যাইব।”
দুই কানে হাত চেপে ধরে সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। কক্ষের পশ্চাদ্ভাগে কোনো জানালা নেই, কেবল বেশ খানিকটা উঁচুতে একটি ক্ষুদ্র ভেন্টিলেটর দেখা যাচ্ছে। আশেপাশে কোনো আসবাব বা কাষ্ঠখণ্ডও নেই যা অবলম্বন করে সে উপরে উঠতে পারে। কিছুটা দূরে একটি বৃক্ষের গুঁড়ি পড়ে থাকলেও সেটি টেনে আনার সময় শব্দ হলে ধরা পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। অগত্যা সে বাম দিকে এগোতেই একটি পরিত্যক্ত বাঁশের মই দেখতে পেল।
সে তার শাড়ির আঁচল কোমরে শক্ত করে গুঁজে নিল। তারপর অতি সন্তর্পণে মইটি উঁচু করে পেছনের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড় করাল। প্রতিটি ধাপ বেয়ে ওপরে ওঠার সময় তার হৃৎস্পন্দন যেন কান ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইল। ভেন্টিলেটরের সমান্তরালে আসতেই ভেতরের যে দৃশ্য তারান্নুমের নেত্রপটে ভেসে উঠল, তাতে তার কণ্ঠনালি শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।
কক্ষের অভ্যন্তরে টিমটিমে হলদেটে আলোয় যা ঘটছে, তা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও দুঃসাধ্য। একটি বছর দশেকের বালককে চেয়ারের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার চোখ দুটি নেই, কেবল দুটি শূন্য কোটর বেয়ে অবিরল ধারায় তপ্ত র*ক্ত চুইয়ে পড়ছে। পাশের একটি কাচের পাত্রে সেই তাজা চক্ষু জোড়া রাখা হয়েছে, পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে এটি কোনো আন্তর্জাতিক অঙ্গ পা’চারকারী চক্রের নৃ*শংস লীলাখেলা চলছে।
“ওর মুখটা খোলাই ভুল হইছে, চিল্লাইতেছে এমন যেন ওর মামা বাড়ি পাইছে,” সাতাশ কি আটাশ বছর বয়সি এক ফরসা যুবক বিরক্ত স্বরে বলে উঠল। তার পরনে দামি পোশাক থাকলেও চোখের দৃষ্টি ছিল পৈশাচিক।
তার পাশে দাঁড়ানো লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরিহিত একজন প্রৌঢ় লোক, যার চুলে পাক ধরেছে, তিনি যুবকটির মাথায় একটি চড় কষিয়ে কর্কশ গলায় বললেন, “মুখ না খুইল্যা ওর জিভ কাটবি কেমনে, চো*দনা?”
যুবকটি মাথা চুলকে উত্তর দিল, “আব্বা, গালি দেওয়া হইলে এবার কাজে লাইগা পড়ো। কালকেই ডেলিভারির লাস্ট ডেট। সময়মতো পোর্টে না পৌঁছাইলে সব পইচা নষ্ট হইব।”
“তোমার পা’ছায় এত ধার যখন, তুমিই কাটো। নেও,” এই বলে প্রৌঢ়টি একটি র*ক্তরঞ্জিত ছুরি যুবকটির হাতে বাড়িয়ে দিল। কক্ষে তখন আরও দুজন বলবান লোক শিশুটির হাত-পা চেপে ধরে আছে যাতে সে নড়াচড়া করতে না পারে। পাশে রাখা একটা বড়ো প্লাস্টিকের ইনসুলেটেড আইসবক্স, যা থেকে নাইট্রোজেনের হালকা ধোঁয়া বেরোচ্ছে।
তবে অসহায় শিশুটি বাদে সেই রুদ্ধদ্বার কক্ষে মোট পাঁচজন ঘাতক উপস্থিত। ভেন্টিলেটরের ওপাশে দাঁড়িয়ে তারান্নুম প্রত্যক্ষ করল একটি পাশবিক সত্য, যা তার সারা জীবনের চেনা জগৎটাকে এক নিমেষেই ওলটপালট করে দিল। তার অবশ হাত দুটো মইয়ের বাঁশটা কোনোমতে আঁকড়ে ধরে রইল। মনে হচ্ছে, এক চিলতে নিশ্বাসের আওয়াজ পেলেই ওই যমদূতেরা তার অস্তিত্ব টের পেয়ে যাবে।
তারান্নুমের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। তার হৃৎস্পন্দন এখন কণ্ঠনালিতে এসে ঠেকেছে। মইয়ের বাঁশটা কোনোমতে আঁকড়ে ধরে সে রুদ্ধশ্বাসে বিড়বিড় করল, “চে… চেয়ারম্যান চাচাহ!”
কক্ষের ভেতর যা ঘটছে, তার ভয়াবহতা তারান্নুমের সাধারণ বোধগম্যতার অতীত হলেও, এটুকু সে বুঝতে পারল যে সে একটা ভয়াবহ নরককুণ্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল শামসুজ্জামান এবং তার দুই যোগ্য উত্তরসূরি সেখানে উপস্থিত। ছোটো ছেলে শৌভিক পৈশাচিক উল্লাসে পিতার সহযোগী হিসেবে মত্ত, আর একপাশে আয়েশ করে চেয়ারে বসে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছে বড়ো ছেলে শৌর্য। এই শৌর্যকে তারান্নুম চেনে একজন মার্জিত, শিক্ষিত এবং ধীরস্থির যুবক হিসেবে। শহরের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত এই সুদর্শন ছেলেটির সাথে তাদের পারিবারিক সখ্যও ছিল প্রবল। এমনকি একসময় এই বাড়ি থেকেই তারান্নুমের বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল। শামসুজ্জামান চেয়েছিলেন তৎকালীন প্রভাবশালী চেয়ারম্যান পরিবারের সাথে র*ক্তের বন্ধন তৈরি করতে। কিন্তু আম্বিয়া জমাদ্দার কোনো একটা কারণে এই লোকটিকে কোনোদিনই বিশ্বাস করতে পারেননি; তার সহজাত প্রবৃত্তি বলছিল, এই লোকটির অতিশয় মিষ্টভাষের আড়ালে কোনো একটা গূঢ় অন্ধকার লুকিয়ে আছে। আজ সেই ঠান্ডা মেজাজের শৌর্যকে ঘাতকের ভূমিকায় দেখে তারান্নুমের শিরদাঁড়া দিয়ে হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল।
“না, না না… তরু ঘাবড়াইস না, পু… পুলিশরে কল দেওন লাগবো,” কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে নিজেকে সাহস জোগানোর চেষ্টা করল সে।
ফোনটা বের করে যখনই সে জরুরি নম্বর ডায়াল করতে যাবে, তখনই ঘরের ভেতর এক আগন্তুকের কণ্ঠস্বর তাকে বজ্রাহতের মতো স্তব্ধ করে দিল।
“আপনাদের কাজ কতদূর? স্যার কল করেছিলেন, আজ রাতেই চালানটা পাঠিয়ে দিতে পারলে ভালো হয়। বর্ডারের ক্লিয়ারেন্স রেডি।”
কণ্ঠস্বরটি তারান্নুমের অতি পরিচিত। সে বিস্ময় আর আতঙ্কে পুনরায় ভেন্টিলেটরের দিকে তাকাতেই দেখল, স্বয়ং স্থানীয় পুলিশ অফিসার সেখানে দণ্ডায়মান। রক্ষকই যখন ভক্ষক, তখন কার কাছে সে বিচারের আর্জি জানাবে? তারান্নুমের মস্তিষ্ক মুহূর্তের জন্য অসাড় হয়ে গেল। কারান আর ফারহানও দেশে নেই; দুবাইয়ের ব্যস্ততায় তারা অনেক দূরে। অসহায়ত্বের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে হঠাৎ তার মস্তিষ্কে একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সে কাঁপাকাঁপা হাতে ফোনের ক্যামেরা চালু করে কক্ষের ভেতরকার এই নারকীয় যজ্ঞ রেকর্ড করতে শুরু করল।
পুলিশ অফিসারটি বেরিয়ে যেতেই কক্ষের ভেতর পুনরায় কাজের ব্যস্ততা শুরু হলো। শৌভিক নীল রঙের সার্জিক্যাল গ্লাভ্স পরতে পরতে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “ইব্রাহিম আর জেহের তো শুনলাম আগুনে পুই’ড়া ম’রছে। ওদের গোডাউনে নাকি আগুন লাগছে। এখন এই মা’লগুলা বর্ডারে পুশ করবা কেমনে, আব্বা?”
উল্লেখ্য যে, ইব্রাহিমের সাম্রাজ্য ধ্বংসের নীল নকশাটি কারান অত্যন্ত নিপুণভাবে তৈরি করেছিল। এমেকার মাধ্যমে ইয়ট আর গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডের খবরটি বিশ্বজুড়ে প্রচার করা হলেও, ফারহান পর্দার আড়ালে থেকে ইব্রাহিমের সমস্ত কুকীর্তি জনসমক্ষে ফাঁস করে দিয়েছিল, যাতে ওই অপরাধীদের জন্য কেউ শোক প্রকাশ না করে, উলটো চরম ঘৃণা করে।
শামসুজ্জামান কুটিল হাসি হাসলেন। তার দাঁতগুলো অন্ধকারের হলদেটে আলোয় বীভৎস দেখাচ্ছিল। “দুবাই কিং ম’রলে কি হইছে, বাংলাদেশ কিং তো আর ম’রে নাই। আমগো ট্যাকা হইলেই হইছে… তুই প্যাঁচাল বাদ দিয়া মা’লটারে তাড়াতাড়ি খালাস কর।”
শৌভিক এক ঝটকায় বাচ্চাটির জিহ্বা কর্তন করল। যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা শিশুটির কণ্ঠ দিয়ে এখন কেবল অস্ফুট গোঙানি বেরিয়ে আসছে। টকটকে লাল র*ক্তে তার মুখমণ্ডল প্লাবিত, যা চিবুক বেয়ে মেঝেতে চুইয়ে পড়ছে। এরপর শৌভিক একটি চকচকে ধারালো রামদা হাতে তুলে নিল। হঠাৎ করেই সে শিশুটির বক্ষপিঞ্জর লক্ষ্য করে সজোরে আ’ঘাত হানল। ফিনকি দিয়ে আসা তপ্ত র*ক্তে শৌভিকের মুখ ভিজে গেল; সে মূলত হৃৎপিণ্ডটি অক্ষত অবস্থায় বের করে আনতে চাইছে।
এই অবর্ণনীয় নৃ’শংসতা দেখে তারান্নুমের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে গেল। অজান্তেই তার মুখ দিয়ে একটি গোঙানির মতো শব্দ বেরিয়ে এলো, যা এই স্তব্ধ রাতে বারুদের মতো বি’স্ফোরিত হলো। ঠিক সেই মুহূর্তেই শৌর্য তড়িৎ গতিতে মাথা তুলে ওপরের ভেন্টিলেটরের দিকে তাকাল। তার শিকারি চোখের দৃষ্টি আর তারান্নুমের আতঙ্কিত নেত্রপল্লব এক বিন্দুতে মিলিত হলো।
স্বদেশের আকাশসীমা স্পর্শ করতে আর মাত্র আধঘণ্টার পথ বাকি। প্রাইভেট জেটের বিলাসবহুল কেবিনের স্নিগ্ধ অ্যাম্বিয়েন্ট লাইটে ফারহান তার দেহটা আরামদায়ক লেদার সিটে এলিয়ে দিয়ে একটা গভীর তৃপ্তির নিশ্বাস ছাড়ল। জানালার ওপারে মেঘের রাজ্যে তখন অন্ধকারের রাজত্ব। ফারহান আড়মোড়া ভেঙে কারানের দিকে তাকিয়ে আলতো করে বলল, “কারান, ল্যান্ড করার পর গাড়িতে ওঠার সময় আমাকে একবার রিমাইন্ড দিস তো। কুইনের জন্য বিশাল একটা রেড রোজ বুকে নিয়ে যাব। আর হ্যাঁ, ওর সেই রেড শাড়ির সাথে ম্যাচ করে একটা এক্সক্লুসিভ বেনারসি ওড়নাও পিক করতে হবে।”
কারান সবসময়ই নিজেকে ব্যস্ততার জালে আবদ্ধ রাখতে ভালোবাসে। গত কয়েকটা দিন অফিসের যাবতীয় অপারেশনস আরিয়ান আর ইমন সামলালেও, সিইও হিসেবে নিজের দায়িত্ব সে এক মুহূর্তের জন্যও ভুলে যায়নি। ইস্তাম্বুল থেকে এই দীর্ঘ যাত্রা শেষে তাদের প্রাইভেট জেটটি এখন বাংলাদেশের আকাশসীমায়। জানালা দিয়ে নিচে তাকালে হয়ত বাংলার সবুজ দিগন্ত কিংবা রুপালি নদীর আঁকাবাঁকা রেখা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এই পুরোটা সময় কারান অলসভাবে সময় পার করার বদলে তার ম্যাকবুকে বুঁদ হয়ে আছে। তার ডিকশনারিতে ‘সময় নষ্ট’ বলে কোনো শব্দ নেই।
সে তার ম্যানেজার ইমনকে একটি প্রফেশনাল ই-মেইল ড্রাফট করল:
”টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রির গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন এখন যে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাতে সামান্যতম বিচ্যুতি মানেই মাল্টি-বিলিয়ন ডলার লস। আরিয়ানকে বলো ভিয়েতনাম আর টার্কির শিপমেন্ট রিপোর্টগুলো যেন ইমিডিয়েটলি রি-চেক করে। বিশেষ করে আমাদের নতুন ইকো-ফ্রেন্ডলি পলিমার ব্লেন্ডের প্রোডাকশন লাইনে যেন কোনো টেকনিক্যাল গ্লিচ না থাকে। আমি ল্যান্ড করার আগেই ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্টের লেটেস্ট আপডেট চাই। জাস্ট রিমেম্বার, উই আর নট জাস্ট মেকিং ফ্যাব্রিক, উই আর ডিফাইনিং দ্য ফিউচার অফ ফ্যাশন টেকনোলজি।”
মেইলটি সেন্ড করে ম্যাকবুক থেকে চোখ না সরিয়ে কারান কিবোর্ডে আঙুল চালাতে চালাতেই বলল, “আর ইউ শিওর যে তুই কেবল এনগেজমেন্ট করতে যাচ্ছিস, বিয়ে করতে নয়? তোর প্রিপারেশন দেখে তো ডাউট হচ্ছে।”
ফারহান এক চিলতে হাসল।
“ওহ কাম অন ম্যান, আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর। আসলে আমি কুইনকে প্রমিজ করেছিলাম, যেদিন আমাদের দেখা হবে, সেই দিনটা হবে সবথেকে মেমোর্যাবল আর স্পেশাল। ওর জন্য লাইফে তো তেমন কিছুই করার অপরচুনিটি হয়নি কখনো। তাই ভাবলাম এই ছোটোখাটো গেসচারগুলো দিয়ে যদি দিনটাকে একটু ডিফারেন্ট করা যায়।”
কারানের ঠোঁটের কোণে একটা সূক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে উঠল, যা চট করে কারো নজরে আসার কথা নয়। সে জানালার কাচে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ভাবলেশহীন স্বরে বলল, “তোর ওই ডাকাত বউ চকলেট পছন্দ করে। ছোটোবেলায় আমার ভাগেরগুলোও ও চুরি করে সাবাড় করে দিত।”
“আই সি! তাহলে তো এক বস্তা চকলেটও লিস্টে অ্যাড করা দরকার,” ফারহান বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল।
বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই তারা সরাসরি একটি সুসজ্জিত ফ্লোরিস্ট শপে এসে পৌঁছাল। ফারহান দোকানের প্রায় সব ধরনর প্রিমিয়াম চকলেটের কয়েকটা করে পিস প্যাকিং করতে বলল। ওর ইচ্ছে ছিল গোটা শপটাই কিনে নেবে, কিন্তু কারান তাকে লজিক্যালি থামাল। সে মনে করিয়ে দিল যে, তারান্নুমের মতো চকলেট অ্যাডিক্ট যদি একবারে এতগুলো খেয়ে ফেলে, তবে ডেন্টাল প্রবলেম হওয়া নিশ্চিত। আর ফোকলা দাঁতের বউ নিয়ে জীবন কাটানোটা ফারহানের জন্য খুব একটা রোমান্টিক হবে না। সেই আশঙ্কায় ফারহান পরিমাণটা কিছুটা কমাল। তবে সুযোগ বুঝে কারানও গোপনে টাকা দিয়ে নিজের অর্ধাঙ্গির জন্য সন্তর্পণে দুটো ডার্ক চকলেট পকেটে চালান করে দিল।
ফারহান যখন বেছে বেছে সবথেকে সতেজ আর র’ক্তিম গোলাপগুলো দিয়ে একটি বুকে তৈরি করাচ্ছিল, কারান তখন উদাসীন ভঙ্গিতে দোকানের বাইরে পা বাড়াল। রাস্তার এক কোণে একজন বৃদ্ধা ঝুড়িভর্তি ফুল নিয়ে বসে আছেন। সেখানে হাজারো রঙের মেলা থাকলেও কারানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আটকে গেল একগুচ্ছ ধবধবে সাদা ডেইজি ফুলের ওপর। কৃত্রিম আলোর নিচে ওই শুভ্রতা যেন আলাদা প্রশান্তি ছড়াচ্ছে।
“কত এগুলো?”
বৃদ্ধা কিছুটা বিস্ময়ে তাকিয়ে উত্তর দিলেন, “সবগুলা নিবেন, সাহেব?”
“জি!”
“আটশ ট্যাকা।”
কারান ফুলের স্তবকটি হাতে নিল। ঠিক পাশেই ছিল রঙিন গ্লাডিওলাস। তার হঠাৎ মনে পড়ে গেল, শৈশবে তারান্নুম একবার এই গ্লাডিওলাস ফুল কানে গুঁজে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পোজ দিয়েছিল। স্মৃতির সেই ধুলোপড়া পাতা উলটে সে একগুচ্ছ গ্লাডিওলাসও তুলে নিল। সব মিলিয়ে যা মূল্য হলো, কারান তার তিন গুণ টাকা বৃদ্ধার হাতে গুঁজে দিল। বৃদ্ধা যখন ইতস্তত করছিলেন, কারান তখন বিনয়ের সাথে বলল, “আপনার ঝুড়ির সব ফুল এখন আমার। ওই যে দূরে যে বাচ্চাগুলোকে দেখছেন, বাকি ফুলগুলো ওদের মাঝে ডিস্ট্রিবিউট করে দিয়েন।”
বৃদ্ধার চোখদুটো কৃতজ্ঞতায় ভিজে এলো। কারান সেখান থেকে প্রস্থান করে দেখল ফারহানও ততক্ষণে বিশালাকার এক গোলাপের তোড়া নিয়ে শপ থেকে বেরিয়ে আসছে। এরপর তাদের গন্তব্য হলো একটি নামি টেক্সটাইল এম্পোরিয়াম।
বেনারসি ওড়নাটা হাতে নিয়ে কারান টিপ্পনী কাটল, “এটা তো বিয়ের শপিংয়ের সময় কিনলেও পারতিস।”
ফারহান ওড়নার কারুকাজ করা জরির ওপর হাত বুলিয়ে স্নিগ্ধ হাসল। “পারতাম, বাট আই থিংক এই ওড়নাটা ওর লাল শাড়ির সাথে একটা এলিগ্যান্ট লুক দেবে। কুইনকে এই গেটআপে দেখার জন্য আমি লিটারালি গত একটা বছর ওয়েট করেছি।”
“ওয়েট এ সেকেন্ড, আজ কি তোদের অ্যানিভার্সারি নাকি?”
“ইউ ক্যান সে দ্যাট,” ফারহান মৃদু হাসল।
“গড! তাহলে তো সেলিব্রেশনটা ইনকমপ্লিট থেকে যাচ্ছে। একটা কেক ছাড়া কি আর অ্যানিভার্সারি জমে?”
ফারহান কারানের কাঁধে হাত রেখে সায় দিল, “ওহ ড্যাম! ইউ আর অ্যাবসোলিউটলি রাইট, ডিউড। চল, তাহলে একটা ভালো বেকারি থেকে একটা স্পেশাল কেকও নিয়ে নেওয়া যাক।”
বিলাসবহুল বিপণিবিতানগুলোর প্রতিটি তলা প্রদক্ষিণ করে অবশেষে তারা একটি লিমিটেড এডিশন বেনারসি ওড়না খুঁজে পেল। ওড়নাটি যেমন আভিজাত্যপূর্ণ, তেমনি এর কারুকাজে ছিল ধ্রুপদী সরলতা, যা আধুনিক ফ্যাশন পরিভাষায় মিনিমালিস্টিক লাক্সারি হিসেবে পরিচিত। র’ক্তিম রেশমের ওপর সোনালি জরির সূক্ষ্ম কাজ দেখে যে কেউ বুঝতে পারবে, এটি দক্ষ কারিগরের দীর্ঘ শ্রমের এক অনন্য নিদর্শন।
ওড়নাটি সংগ্রহ করে তারা দ্রুতবেগে বেরিয়ে এলো। কারান ঘড়ির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, “তোর ভাবি চমৎকার কেক বানাতে পারে। আমি মিরার ফোনে টেক্সট করে দিচ্ছি যাতে ও একটা কেক প্রিপেয়ার করে রাখে। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে, এখন ট্র্যাফিকের যা অবস্থা তাতে আর সময় নষ্ট করা বোকামি হবে। তাছাড়া তুই চেয়েছিলি সারপ্রাইজ দিতে, তাই আগেই মিরাকে স্পেশাল ইনস্ট্রাকশন দিয়েছি যাতে ও তরুকে আমাদের ফেরার খবরটা লিক না করে।”
ফারহান প্রবল উচ্ছ্বাসে কারানের পিঠে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ চাপড় বসাল। “ফা’ক! দ্যাটস সো থটফুল অব ইউ, ইয়ার! এই জন্যই তো তোকে এত ভালোবাসি।”
কারান আড়চোখে একটা বিদ্রুপাত্মক আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিতেই ফারহান অপ্রস্তুত হয়ে চট করে নিজেকে শুধরে নিল। “আরে ভাই, ডোন্ট গেট মি রং—আই মিন, দিস ইজ পিওর ব্রোম্যান্স! ভালোবাসি মানে বন্ধুত্বের ওই অদ্ভুত টানটা আরকি। আর শালা, তোর কি সিরিয়াসলি আমাকে গে মনে হয়? ধুর বা’ল, এসব উইয়ার্ড কথা বাদ দেই। অবশেষে ভাবির সাথে তাহলে দেখা হচ্ছে, কি বলিস?”
ফারহানের চোখের উচ্ছ্বাস আর প্রত্যাশা যেন উপচে পড়ছে।
কারান ফারহানের দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে অন্যদিকে চোখ ফেরালো। জিভ দিয়ে গাল ঠেলে চরম শীতলতায় উত্তর দিল, “এই জনমে অন্তত না।”
ফারহান কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ল। কারান তাকে গ্রাহ্য না করে দীর্ঘ পদক্ষেপে সামনে এগিয়ে যেতে থাকল। ফারহান খানিকটা ধাতস্থ হয়ে পিছু পিছু দৌড়াতে দৌড়াতে চেঁচিয়ে বলল, “তোর কোন পাকা ধানে মই দিয়েছি, ভাই? সবসময় আমার পেছনেই কেন লাগিস? হোয়াই ম্যান, হোয়াই?”
“কাঁচা ধানে হালচাষ করিসনি তাই,” গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে কারানের সংক্ষিপ্ত উত্তর আসলো।
ফারহান কপালে ভাঁজ ফেলে কিছুক্ষণ অংক মেলালো। তারপর প্রায় আর্তনাদ করে উঠল, “কী বললি? তার মানে ইনডাইরেক্টলি তুই আমাকে গরু বললি? হালচাষ তো গরু দিয়েই করায়!”
“ডিরেক্ট বলেছি,” কারান নির্লিপ্ত।
ফারহান হা হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।
গাড়ি চলতে শুরু করেছে। শহরের নিয়ন আলো ছাপিয়ে গাড়িটি যখন হাইওয়েতে উঠল, ফারহান তখন অদ্ভুত রোমান্টিক ঘোরের মধ্যে মিশে গেছে। সে গাড়ির প্রিমিয়াম অডিয়ো সিস্টেমে ভলিউম বাড়িয়ে দিয়ে নব্বইয়ের দশকের সেই জনপ্রিয় গানটি প্লে করল,
“লালগাঞ্জকে লালবাগসে লাল চুনারিয়া লায়ী,
চুনারি চুনারি… চুনারি চুনারি…
লালগঞ্জ কে লালবাগ সে লাল চুনারিয়া লায়ী,
লাল রং মে ডাল ডাল কে লাল লাল রাংওয়ায়ী,
চুনারি চুনারি… চুনারি চুনারি…”
তারান্নুমের জন্য কেনা সেই মহার্ঘ ওড়নাটি হাতে নিয়ে ফারহান এখন এক অন্য জগতের বাসিন্দা হয়ে উঠল।
সে অদ্ভুত সব রোমান্টিক ভঙ্গিমায় ওড়নাটি কখনো নিজের গলার চারপাশে আলতো করে জড়াচ্ছে, তো কখনোবা মাথার ওপর উঁচিয়ে ধরে গানের ছন্দে ঢেউ খেলিয়ে যাচ্ছে। তার উত্তেজনার মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তার পক্ষে আর সিটে স্থির থাকা সম্ভব হচ্ছে না; রীতিমতো হাত-পা ছুঁড়ে গাড়ির সংকীর্ণ কেবিনের মধ্যেই উরাধুরা নাচে মজে উঠল সে।
ফারহানের এই অপরিপক্ব শিশুসুলভ উল্লাস আর অনাবিল পা’গলামি দেখে কারানের মতো গম্ভীর মানুষেরও কঠিন মুখোশটা মুহূর্তের জন্য খসে পড়ল। সে স্টিয়ারিং হুইলে এক হাত রেখে অন্য হাত দিয়ে মুখ চেপে নিজের হাসি লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করল। বন্ধুর এই নিখাদ খুশি দেখে তার মনের কোণেও প্রশান্তি খেলে গেল।
কারান ড্রাইভ করার ফাঁকেই ফোনে টাইপ করল, “তোমার আদরের ননদিনীর জন্য একটা কেক বানিয়ে রেখো, সুইটহার্ট। আজ ফারহান আর তরুর অ্যানিভার্সারি।”
ওপাশ থেকে তাৎক্ষণিক প্রত্যুত্তর এলো, “ওকে, মাই লাভ!”
মিরার এই সম্বোধনটুকু কারানের কঠোর হৃদয়ে এক পশলা বৃষ্টির মতো কাজ করল। ঠিক সেই মুহূর্তে তালহার কল স্ক্রিনে ভেসে উঠল। কারান মিউজিকের শব্দ কমিয়ে দিয়ে এয়ারপড কানে লাগিয়ে কলটি রিসিভ করল।
“হ্যাঁ, তালহা?”
“মিরার কাছে শুনলাম তুই আজই ব্যাক করছিস,” ওপাশ থেকে তালহার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
“হ্যাঁ, এইতো আর ঘণ্টাখানেক লাগবে গন্তব্যে পৌঁছাতে। ঢাকা পেরিয়ে গেছি।”
“ওহ, দ্যাটস গ্রেট। আমি আসলে বেশ চিন্তায় ছিলাম।”
“চিন্তা কীসের?” কারান ভ্রূ কুঁচকালো।
“আসলে ভাই, সিচুয়েশনটা খুব সারডেন ছিল। আমি আর সোফিয়া আজ বিকেলেই সিডনির ফ্লাইটে উঠে পড়েছি। এখন মাঝ আকাশে আছি। বসের কাছ থেকে আর্জেন্ট মেসেজ এসেছিল, আমাদের জব নিয়ে প্রবলেম হতে পারে। তাই ইমিডিয়েটলি অস্ট্রেলিয়া ব্যাক করার ডিসিশন নিতে হলো। এদিকে সোফিয়ার মা-ও বেশ অসুস্থ, সবকিছু মিলিয়ে এই হুটহাট জার্নিটা এড়ানো গেল না। আমি অবশ্য বাড়িতে জানিয়েই এসেছি।”
তালহার কথাগুলো শোনার পর কারানের হৃৎপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য স্পন্দন হারিয়ে ফেলল। তার সুশৃঙ্খল মস্তিষ্কে ঝড়ের গতিতে খেলে গেল হাজারো অশুভ সম্ভাবনা। টায়ার আর পিচঢালা রাস্তার ঘর্ষণে তীব্র এক ঝাঁকুনিতে রাস্তার একপাশে গাড়িটা ব্রেক কষল। রুদ্ধশ্বাসে স্টিয়ারিং জাপটে ধরে সে চিৎকার করে উঠল, “হোয়াট? তার মানে এই মুহূর্তে বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ নেই?”
গাড়ির ভেতর ফারহানের আনন্দোচ্ছ্বাস আর চটুল নাচ মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল। সে তৎক্ষণাৎ মিউজিক সিস্টেম বন্ধ করে দিয়ে উৎকণ্ঠার সাথে জিজ্ঞেস করল, “হোয়াট হ্যাপেনড, ব্রো?”
ওপ্রান্তে তালহা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করে বলল, “আরে ভাই, তুই অযথা টেনশন নিচ্ছিস। আমি তো আসলাম মাত্র বছরখানেক হবে। এর আগে কি ওরা একা থাকেনি?”
কারানের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো, রাগে তার হাতের রগগুলো ফুলে উঠছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তুই কি স্টুপিড, তালহা? ইউ নো ভেরি ওয়েল যে বর্তমানে গ্রামে কী পরিস্থিতি চলছে! এই সিচুয়েশনে তুই কীভাবে সবাইকে একা ফেলে আসলি?”
”কিন্তু ওটা তো গত একুশ বছর ধরেই চলে আসছে। আর তাছাড়া মা আর নানি… মানে সবার পারমিশন নিয়েই তো আমি বের হয়েছি। সবাই তো যাওয়ার জন্যই এমফাসাইজ করল। আর তোর কি মনে হয়, সিকিউরিটি নিয়ে বিন্দুমাত্র রিস্ক থাকলে আমি আসতাম? ওরা তো ঘরের ভেতরেই থাকে, আর… আচ্ছা, আই’ম রিয়েলি সরি, ভাই। আমার এভাবে আসাটা হয়ত ঠিক হয়নি। আমি ক্যাব্বিকে ওর মায়ের কাছে পৌঁছে দিয়েই ফার্স্ট ফ্লাইটে ব্যাক করছি।”
“তার আর প্রয়োজন নেই, আমি পৌঁছাচ্ছি। আর শোন, ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করার ন্যূনতম যোগ্যতাও তোর নেই।”
কারান আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ফোনটা ডিসকানেক্ট করে দিল। টায়ারের তীব্র ঘর্ষণে পিচঢালা রাস্তায় কালো দাগ ফেলে সে গাড়িটিকে ক্ষিপ্র গতিতে ঘুরিয়ে নিল। তার চোখেমুখে এখন কেবল আসন্ন কোনো বিপদের আশঙ্কা স্পষ্ট।
অন্যদিকে মাঝ-আকাশে বিমানে বসে তালহা পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে রইল। কারানের সেই রূঢ় বাক্যগুলো তীরের মতো তার হৃদয়ে বিঁধছে। তার অবচেতন মন বারবার প্রশ্ন করছে, সে কি সত্যিই কোনো হিমালয়সম ভুল করে ফেলেছে? কারানের ওই অস্বাভাবিক উদ্বেগ তার কপালে চিন্তার গভীর ভাঁজ ফেলে দিল। সে আপনমনে বিড়বিড় করল, “কারান ভাই কি স্পেসিফিক কোনো থ্রেট জানে যার কারণে ও এত ডেসপারেট হয়ে উঠল? এতটা প্যানিকড হওয়ার কারণ কি?”
গ্রামাঞ্চলে ক্ষমতার লড়াই বা তুচ্ছ কারণে র*ক্তপাত অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু তাদের বংশগত প্রভাব আর রাজনৈতিক আধিপত্যের কারণে এতকাল কেউ তাদের বাড়ির দিকে আঙুল তোলার দুঃসাহস দেখায়নি। কিন্তু এবার যেন গাণিতিক সমীকরণগুলো মিলছে না। সোফিয়ার মা মৃ*ত্যুশয্যায়, এটিই ছিল তাদের এই আকস্মিক যাত্রার প্রধান কারণ। কিন্তু কারানের ওই শেষ কথাটা তাকে অপরাধবোধের গভীর গহ্বরে নিক্ষেপ করল। সে সিটে মাথা হেলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করল।
আনমনে বলে চলল, “আমার কি তবে শুধু ক্যাব্বিকে একা পাঠানো উচিত ছিল? কিন্তু একজন প্রেগন্যান্ট মেয়েকে এই ক্রিটিক্যাল অবস্থায় আমি কীভাবে একা ছাড়তাম? সারপ্রাইজ দেব বলে বাড়িতে ওর প্রেগন্যান্সির খবরটা পর্যন্ত রিভিল করিনি। ভেবেছিলাম ক্যাব্বির মাকে দেখে এসে সবটা সামলে নেব। আর এখন… ইশশ! খু’নাখু’নির এই ভায়োলেন্স আর অস্থিরতার মাঝেও আমি কীভাবে সব ফেলে চলে আসলাম! আই’ম সিরিয়াসলি রিগ্রেটিং দিস।”
পাশে বসা সোফিয়া তালহার বিমর্ষ মুখচ্ছবি দেখে বিচলিত হয়ে তার কাঁধে হাত রাখল। “হোয়াট হ্যাপেনড, ডার্লিং? ইজ এভরিথিং ওকে?”
তালহা চোখ না খুলেই অস্ফুট স্বরে বলল, “আমার মনে হয় এই মুহূর্তে বিদেশে আসাটা আমার জীবনের সবথেকে বড়ো স্ট্র্যাটেজিক মিস্টেক ছিল। কারান ভাই যেন সুস্থভাবে দ্রুত বাসায় পৌঁছে যায়… হোপ এভরিথিং উইল বি অলরাইট।”
সোফিয়া তার স্বভাবজাত ভাঙা বাংলায় আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল, “খিন্তু চিন্তাটা খীসের? সন্ধ্যার দিখেও ঠো (তো) তারান্নুমের সাথে আমার টেক্সট হইছে।”
সোফিয়ার সান্ত্বনা তালহার অশান্ত মনকে বিন্দুমাত্র শীতল করতে পারল না। দীর্ঘকাল সে পারিবারিক দায়িত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিল; আজ যদি সত্যি কোনো অঘটন ঘটে যায়, তবে সেই অনুশোচনার দহন তাকে সারাজীবন দগ্ধ করবে।
গাড়ির ভেতরে পরিবেশ এখন অগ্নিগর্ভ। কারান ঝড়ের গতিতে স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছে, মিটারের কাঁটা বিপজ্জনক সীমা ছুঁয়ে ফেলেছে। ফারহান সিট বেল্ট শক্ত করে ধরে আর্তনাদ করে উঠল, “আরে ভাই, হয়েছেটা কী তা তো বলবি! এমন আনস্টেবল হয়ে ড্রাইভ করছিস কেন? যে-কোনো সময় বড়ো কোনো ক্যালামিটি হয়ে যেতে পারে!”
কারান দাঁতে দাঁত চেপে ললাটের ঘাম মুছে বলল, “বাড়িতে এই মুহূর্তে কেবল মেয়েরা আছে। আকবর কাকা গতকাল ঢাকা গেছেন গাড়ি মেরামতের কাজে। বাড়িতে একজনও সমর্থ পুরুষ নেই যারা ওদের প্রটেক্ট করতে পারে।”
কারানের মুখ থেকে পরিস্থিতির ভয়াবহতা শোনার পর ফারহানের মস্তিষ্কে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। দুশ্চিন্তার পারদ চড়ে আকাশচুম্বী হলো তার। সে অবলীলায় উচ্চারণ করল, “হো’লি শি’ট!”
ফারহান কালক্ষেপণ না করে নিজের আইফোনটি বের করল। ওদিকে কারান উন্মত্তের ন্যায় স্টিয়ারিং হুইল এক হাতে নিয়ন্ত্রণ করে অন্য হাতে ক্রমাগত মিরাকে ডায়াল করে যাচ্ছে। অথচ ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। কারান ধৈর্যের চরম সীমায় পৌঁছে স্টিয়ারিংয়ের ওপর সবলে করাঘাত করে চিৎকার করে উঠল, “ফা’ক! মিরা, ফোনটা তোলো!”
সেই বনেদি অন্দরমহলে যোগাযোগের মাধ্যম বলতে কেবল মিরার আইফোন, ফাতিমার পুরোনো হ্যান্ডসেট আর তারান্নুমের ফোনটিই ভরসা। আম্বিয়া বেগম বরাবরই যান্ত্রিক জটিলতা থেকে নিজেকে যোজন যোজন দূরে রেখেছেন; মাটির মানুষের কাছে এই কৃত্রিম যন্ত্রগুলো বড়োই তুচ্ছ। তারান্নুমকে তার বান্দা ফারহানই দেখে নেবে, এই বিশ্বাস কারানের মনে বদ্ধমূল ছিল, তাই সে মরিয়া হয়ে ফাতিমার নম্বরে কল করল। কিন্তু সেটি বর্তমানে ‘সুইচড অফ’। কারান এখন দিশেহারা, উত্তেজনায় সে নিজের চুল টেনে ছিঁড়তে চাইছে। গাড়ির স্পিডোমিটারের কাঁটা ইতোমধ্যে বিপজ্জনক সীমা অতিক্রম করে একশ আশি ছুঁইছুঁই, তবে এই দুই যুবকের কাছে তখন প্রাণের চেয়ে প্রিয়তমার সুরক্ষাই অধিক মূল্যবান।
তারান্নুম নিজের মুখ এক হাতে শক্ত করে চেপে ধরে দ্রুত অতি সাবধানে মইয়ের ধাপে বসল। তার হৃৎপিণ্ড যেন পাঁজরের হাড় চিরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। কক্ষের অভ্যন্তর থেকে তখন আব্দুল শামসুজ্জামানের কর্কশ স্বর ভেসে এলো, “কীসের শব্দ আইলো রে, শৌভিক?”
সেই কণ্ঠস্বর তারান্নুমের অন্তঃকরণে ভয়ের শীতল স্রোত বইয়ে দিল। সে নিঃশব্দে একটা শুষ্ক ঢোক গিলল। শৌভিক পিশাচের ন্যায় চারদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেও বিশেষ কিছু খুঁজে পেল না। শৌর্য তার আয়েশি আসন ত্যাগ করে জানালার পাশে দাঁড়াল। জানালার বাহিরে হাতের অর্ধদগ্ধ সিগারেট থেকে ছাই ঝেড়ে সে অবজ্ঞার সুরে বলল, “প্রতিটি কাজেই বড্ড বেশি সময় নষ্ট করো তোমরা। আবার নাকি চেয়ারম্যান হয়েছ!”
নিজের ঔরসের সন্তানের মুখে এমন তীক্ষ্ণ বিদ্রুপ শুনে শামসুজ্জামান রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে শৌভিককে সবলে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন। “তুমি আমার বা’লডা ছিঁড়বা, হো’গাটা নাচানো ছাড়া তো কোনো কাজের কাজ পারো না। সর এইখান থেকে।”
পরক্ষণেই তিনি পৈশাচিক ক্ষিপ্রতায় রামদা দিয়ে সেই অবোধ বালকের উদরদেশ চিরে ফেললেন। নিমিষেই টেবিল আর মেঝে তাজা র*ক্তে প্লাবিত হলো। মূলত অঙ্গ পাচারের নিষ্ঠুর প্রক্রিয়ায় বৃক্ক অপসারণ করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। বালকটি শেষবারের মতো একবার ছটফট করে নিথর হয়ে গেল; কাঁচা প্রাণটি অকালেই ঝরে পড়ল মানুষের রূপধারী জা’নো’য়ারদের লালসার বলি হয়ে।
ভেন্টিলেটরের ওপাশে দাঁড়িয়ে তারান্নুমের প্রাণ যেন ওষ্ঠাগত। সে দু-চোখ বুজে পরম করুণাময়ের কাছে আরজি জানাল, “উফফ! ভাগ্যিস বাঁচাইলা আল্লাহ! না না, আর এই জায়গায় দুই সেকেন্ডও থাকন যাইব না।”
জঘন্য এই হ*ত্যাকাণ্ডের দৃশ্য তার পাকস্থলীতে এক প্রবল মোচড় দিল। প্রমাণের স্বার্থে ভিডিয়ো রেকর্ড সম্পন্ন হয়েছে, তাই পলায়নই এখন একমাত্র যৌক্তিক পথ। সে অত্যন্ত সতর্কতায় মই দিয়ে নিচে নামতে শুরু করল। কিন্তু কপাল! ঠিক সেই মুহূর্তে তারান্নুমের ফোনে উচ্চশব্দে রিংটোন বেজে উঠল।
আতঙ্কে তারান্নুমের চোখ কপালে উঠল। হাত ফসকে ফোনটি নিচে পড়ে গেল, এবং সে নিজেও ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ল। গোড়ালি মচকে যাওয়ার তীব্র যন্ত্রণায় সে ককিয়ে উঠতে চাইলেও নিজের শাড়ির আঁচল কামড়ে ধরে আর্তনাদ দমন করল। যন্ত্রণায় তার নেত্রপল্লব সিক্ত, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। ঘামে তার ব্লাউজটি দেহের সাথে লেপ্টে আছে। কিছু দূরেই ফোনটি তখনও বেজে চলেছে।
তারান্নুম হামাগুড়ি দিয়ে ফোনটির দিকে এগোলো। কিন্তু তার আগেই তার দৃষ্টির সামনে দুটি পা এসে থামল। তারই ফোনের ওপর একটি র*ক্তাক্ত জুতো রাখা। ভয়ার্ত চোখে সে মুখ তুলতেই দেখল, শৌভিক পাশবিক হাসিতে তার দিকে চেয়ে আছে। তার রক্তা*ক্ত অবয়ব আর উন্মত্ত দৃষ্টি তাকে একটা নরকের প্রহরীর ন্যায় প্রতিভাত করল। তারান্নুম আর স্থির থাকতে পারল না; এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে ম*রণপণ দৌড় শুরু করল। আর পেছনে তখন প্রতিধ্বনিত হতে লাগল ঘাতকদের সেই অট্টহাসি।
অন্ধকারের বুক চিরে শৌভিকের পাশে এসে দাঁড়ালেন শামসুজ্জামান। তার চোখে তখন খু*নের নেশা। কর্কশ গলায় আদেশ দিলেন, “এখনো দাঁড়াইয়া আছিস ক্যান, হা’রামজা’দা? মাইয়াটারে ধর জলদি। প্রমাণসহ ভাগলে আমগো অস্তিত্ব থাকব না।”
শৌভিক অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সাথে দুই হাত উপরে তুলে আড়মোড়া ভেঙে শয়তানি হাসি হাসল। “আরে দাঁড়াও দাঁড়াও, জাস্ট চিল। কদ্দুর আর পালাইবো? আমার জানেমানের পা মচকাইছে, বেশিক্ষণ কুদাইতে পারব না। যাই, শালীরে টাইনা হিঁচড়া ডেরায় নিয়া আসি।”
এই বলে সে ছায়ামূর্তির মতো তারান্নুমের পিছু নিল। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সশস্ত্র রক্ষীদের দিকে তাকিয়ে শামসুজ্জামান অগ্নিশর্মা হয়ে গর্জে উঠলেন, “তোগো কি আলাদা কইরা নেমন্তন্ন কার্ড পাঠানো লাগব? মা*উগার পোলারা, যা ধর ওই মা*গীরে!”
আদেশ পাওয়া মাত্রই ওরা আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে বনের গভীরে অদৃশ্য হয়ে গেল। শামসুজ্জামান মাটিতে পড়ে থাকা তারান্নুমের ফোনটির দিকে তাকালেন। স্ক্রিনে তখন ‘বজ্জাত ব্যাটা’ নামটি জ্বলজ্বল করছে। তিনি ঘৃণাভরে ফোনটি তুলে পাশের একটা পচা জলজ উদ্ভিদপূর্ণ ডোবায় নিক্ষেপ করলেন। যন্ত্রটি এক মুহূর্তের জন্য আলো ছড়িয়ে অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেল।
গাড়ির ভেতরে ফারহানের অবস্থা এখন শোচনীয়। উদ্বেগের আতিশয্যে তার ললাট বেয়ে ঘাম ঝরছে। সে হতাশ গলায় বলল, “কুইনও ফোন তুলছে না, ব্রো। দিস ইজ গেটিং আউট অফ কন্ট্রোল। আমার মাথা আর কাজ করছে না।”
কারান স্টিয়ারিং হুইলটি এত জোরে আঁকড়ে ধরেছে যে তার হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। সে গিয়ারশিফ্টের ওপর হাত রেখে বারবার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করছিল। নিজেকে শান্ত রাখার এক আপ্রাণ চেষ্টায় সে বলল, “রিলাক্স, ফারহান। হয়ত ওরা সবাই একসাথে কোথাও গেছে বা ফোন সাইলেন্ট করে আড্ডায় মজেছে। অযথা ওস্ট-কেস সিনারিও চিন্তা করিস না।”
মুখে সান্ত্বনা দিলেও কারানের নিজের অন্তরাত্মা তখন কু ডাকছিল। কোনো একটা অশুভ অতিপ্রাকৃত শক্তি যেন তাকে সতর্ক করে দিচ্ছিল যে, তার সাজানো গোছানো পৃথিবীটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
বনের লতাপাতা আর কাঁটাঝোপ চিরে তারান্নুম প্রাণপণে ছুটছে। মচকানো পায়ের তীব্র যন্ত্রণা তার প্রতিটি পদক্ষেপকে নরক যন্ত্রণায় রূপান্তর করছে। শাড়ির দীর্ঘ আঁচল বারবার পায়ে জড়িয়ে তাকে ম’রণফাঁদে ফেলছে। পেছনে ধাবমান ঘাতকদের পদশব্দ এখন তার একদম কাছে। তারান্নুমের গাল বেয়ে অশ্রুধারা ঝরছে, যা ঘামের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে।
“হে আল্লাহ, কোনো একটা মিরাকেল ঘটাইয়া আমারে বাঁচাও। ও আল্লাহ…”
নিশ্বাসের শব্দটুকু গোপন করার জন্য সে একটি মহীরুহের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল। তার বক্ষপিঞ্জরের ধুকপুকানি বেড়েই চলেছে। সে নিজের শাড়িতে মুখ গুঁজে অস্ফুট স্বরে আর্জি জানাল, “ফারহান… ফারহান, আপনি কোথায়? প্লিজ আমারে বাঁচান!”
অসহায়ত্বের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে সে গাছ ঘেঁষেই আস্তে আস্তে মাটির ওপর বসে পড়ল। কান্নার বেগে তার সারা শরীর কাঁপছে। এই নিবিড় তিমিরে বনের কোনো একটি পাখির ডাকও শোনা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে, পুরো প্রকৃতি এই পৈশাচিকতার নীরব দর্শক হয়ে তার দিকে অবজ্ঞার সাথে তাকিয়ে আছে। সে মনে মনে কারানকে স্মরণ করল, “কারান ভাই… কারান… একবার, কেবল একটাবার চইলা আসো তুমি। তোমার তরুর তোমারে খুব প্রয়োজন।”
“কুইন?”
পরিচিত কণ্ঠস্বরটি কানে আসতেই তারান্নুমের শরীরের সমস্ত স্নায়ু সজাগ হয়ে উঠল। সে ত্বরিত মস্তকে ওপরে তাকাল। আবছা আলোয় ফারহানের অবয়ব দেখে তার ম্রিয়মাণ চোখে বাঁচার একটা তীব্র আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠল। সে এক প্রকার উন্মাদনায় দাঁড়িয়ে ফারহানের বুকে আছড়ে পড়ল। দুই হাতে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “এতটা দেরি করলেন ক্যান, হ্যাঁ? আর… আর কয়েক সেকেন্ড দেরি করলেই তো আমি ম’ইরা যাইতাম…”
তারান্নুমের কথা শেষ হওয়ার আগেই একটা শীতল কণ্ঠস্বর তার কানের কাছে বিষ ঢালল, “নট সো ফাস্ট। আপনাকে মা’রতে আমি বেশ সময় নেব, হার্ট ইটার!”
শব্দগুলো ফারহানের কণ্ঠের মতো মনে হলেও তাতে ছিল গা ছমছমে কাঠিন্য; যা তারান্নুমের হৃৎপিণ্ডকে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিল। তারান্নুম শিউরে উঠে বুঝতে পারল, সে পরম নির্ভরতায় যাকে আঁকড়ে ধরেছে, সে বনের এই আদিভৌতিক অন্ধকারের একটা নিষ্ঠুর বিভ্রম। শৌর্য তার কাঁধ শক্ত করে ধরে আছে, আর তার ঠান্ডা চোখের দৃষ্টি এতই ভয়ানক, যেন তারান্নুমের হৃৎপিণ্ড পর্যন্ত খুবলে খেতে চাইছে। তারান্নুম এক বুক আতঙ্ক নিয়ে ধীরে ধীরে মাথা তুলে ওপরের দিকে তাকাতেই দেখল, কোনো প্রকার উত্তেজনা ছাড়াই পাথরের মতো নিস্পৃহ চোখে তার দিকে চেয়ে আছে শৌর্য। ছেলেটা তাকে ‘কুইন’ বলে সম্বোধন করেছে, তার মানে সে তারান্নুম এবং ফারহানের মধ্যকার গোপন প্রণয় এবং সংকেতগুলো সম্পর্কে পূর্ণ অবগত! ঘুটঘুটে অন্ধকারে কেবল সাদা শার্ট আর কালো প্যান্টের অবয়ব দেখে এবং সেই চিরচেনা ডাক শুনে মতিভ্রমের শিকার হয়েছিল তারান্নুম। অবচেতন মন ফারহানকে এতটাই তীব্রভাবে কামনা করছিল যে, শৌর্যকে সে ভুল করে নিজের রক্ষাকর্তা ভেবে বসেছিল।
চাঁদের ম্লান আলোয় শৌর্যের সেই ধ্রুপদী সুদর্শন অথচ পাষাণ অবয়ব দেখে তারান্নুমের শরীর মৃগী রোগীর মতো কাঁপতে লাগল। শৌর্য তার দীর্ঘ, শীতল আঙুল দিয়ে তারান্নুমের চিবুক স্পর্শ করে কিঞ্চিৎ উপরে তুলল। সেই স্পর্শে মনে হলো কোনো বিষধর সরীসৃপ তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। শৌর্য তারান্নুমের ওষ্ঠাধরের একদম সন্নিকটে মুখ নামিয়ে এনে অত্যন্ত নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল, “বড্ড সুন্দরী আপনি। ওই আকাশে যে ফুল মুনটা দেখছেন, আপনি তার চেয়েও বেশি প্রভাময়ী।”
তার অতিরিক্ত ঠান্ডা কণ্ঠের প্রতিটি শব্দ যেন তারান্নুমের শ্বাসনালি চেপে ধরছে। শৌর্যের চোখে তখন লোলুপতা আর কামুকতা স্পষ্ট। তারান্নুম সর্বশক্তি দিয়ে ওকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে পুনরায় দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে দৌড়াতে শুরু করল। তার এই নিষ্ফল প্রচেষ্টা আর ভয়ার্ত চাহনি দেখে শৌর্যের ওষ্ঠপ্রান্তে বক্র হাসি ফুটে উঠল।
তবে নিয়তি তার জন্য আরও বড়ো ফাঁদ পেতে রেখেছিল। কিছুদূর যেতেই তারান্নুম দেখল সামনে সেই বীভৎস চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শৌভিক। তারান্নুম আর্তনাদ করতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। সে পিছু হটতে শুরু করল, কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আবিষ্কার করল যে সে চারদিক থেকে ঘেরাও হয়ে গেছে। ঘাতক বাহিনীর বেষ্টনী ভেদ করার আর কোনো পথ অবশিষ্ট নেই। একটা অসহায় হরিণীর মতো সে ডানে-বামে তাকাচ্ছে, কিন্তু মুক্তির প্রতিটি দুয়ার এখন অবরুদ্ধ।
তারান্নুমের পা ধরে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো সেই অভিশপ্ত কক্ষের দিকে। বনের কর্কশ মাটি, ভাঙা ডালপালা আর তীক্ষ্ণ প্রস্তরখণ্ড তার সুকোমল ত্বককে ক্ষতবিক্ষত করে দিল। সে মাটি খামচে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, চিৎকার করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু তার ভাঙা গলার গোঙানি বনের নিস্তব্ধতা চিরে বেশি দূর পৌঁছাতে পারল না।
অবশেষে তাকে র*ক্তরঞ্জিত একটা কাঠের টেবিলের ওপর শুইয়ে হাত-পা আর মুখ শক্ত করে বেঁধে ফেলা হলো। ওদিকে শৌর্য জানালার পাশে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছে। তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা বা উত্তেজনা নেই; বরং সে আইফোনে কোনো একটা গেম খেলায় মত্ত।
তারান্নুম টেবিলের ওপর মাছের মতো আছাড়িপিছাড়ি খাচ্ছে। তার অস্থিরতা এতটাই তীব্র যে, ভারী টেবিলটাও থরথর করে কাঁপছে। তার হাতের বাঁধনগুলো চামড়া ভেদ করে নীলচে হয়ে গেছে; চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে, যা ঘাম আর র*ক্তের সাথে মিশে বীভৎস রূপ নিয়েছে।
শামসুজ্জামান সেখানে দাঁড়িয়ে রাগে ফুঁসছিলেন। তিনি কর্কশ কণ্ঠে বললেন, “এই মা’লটারে নিয়া এখন কী করন যায়? ওর নানি আমগো যেমনে জ্বালাইছে, তার একখান শোধ তবে তুইলা ছাড়মু। বে*শ্যা মা*গী চেয়ারম্যান হইয়া আমারে আর আমার বাপরে কম নাচান নাচায় নাই!”
শৌভিক তার লোলুপ জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট চাটতে চাটতে পৈশাচিক উল্লাসে বলল, “অনেকদিন ধইরা এই জিনিসটার ওপর আমার নজর ছিল, আব্বা। ওর নানির পাওয়ারের জন্য নাগাল পাই নাই। আজ যখন হাতের মুঠোয় পাইছি, এখন একখান ভোগ না দিলে আমার শান্তি নাই। আগে আমি আমার ক্ষুধা মিটামু, তারপর মা’ল কাটমু।”
একদিকে পাশবিক লালসা আর অন্যদিকে অঙ্গ পাচারের ব্যাবসায়িক নিষ্ঠুরতা—এই দুইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে থাকা তারান্নুম কেবল করুণ নয়নে ওপরের ঘুলঘুলির দিকে তাকিয়ে রইল, যদি কোনো অলৌকিক উপায়ে কারান বা ফারহান সেখানে আবির্ভূত হয়। কিন্তু সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, আর শৌভিক তার দিকে ক্রমশ এগিয়ে আসছে।
শৌভিক লালসায় মত্ত হয়ে নিজের পরিধেয় শার্টটি ছুঁড়ে ফেলল। তার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি ছিল অশ্লীলতায় ভরপুর। যখনই সে চূড়ান্ত লালসা চরিতার্থ করার জন্য প্যান্টের চেইন উন্মোচন করল, টেবিলের ওপর শায়িত তারান্নুমের ছটফটানি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেল। তার সুকোমল কবজি এবং চরণের চারপাশের রশিগুলো টানটান হয়ে র*ক্তাক্ত বর্ণ ধারণ করেছে; হাতের বাঁধনগুলো চামড়া চিরে মাংসের ভেতরে বসে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে সে তার অস্থি-মজ্জার সমস্ত শক্তি দিয়ে এই শক্ত বাধন ছিন্ন করে ফেলবে।
কিন্তু প্রকৃতির এক বিচিত্র পরিহাসে, শৌভিক আবিষ্কার করল যে তার বিকৃত কাম’নার যন্ত্রটি অবশ হয়ে পড়েছে। চূড়ান্ত মুহূর্তে নিজের পু’রু’ষত্বের এই ব্যর্থতায় সে দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকেই একটা কদর্য গালি দিয়ে বসল।
শামসুজ্জামান তার কনিষ্ঠ পুত্রের এই অক্ষমতা দেখে ক্রোধে ফেটে পড়লেন। তিনি ঘৃণাভরে কপালে ভাঁজ ফেলে গর্জে উঠলেন, “তোমার ওই হে’ডার ধো*ন আসল কামের সময় চলে না। সর এইখান থেইকা! নষ্ট মেশিন নিয়া আকাম করতে আইছোস? তার চেয়ে এইটার চোখ দুইটা আগে উপড়াইয়া বের কর। এর প্রতিটি অঙ্গ আমি একদম ফ্রেশ আর পিওর কন্ডিশনে চড়া দামে ডেলিভারি দিমু।”
শৌভিক অপমানে নীল হয়ে উত্তর দিল, “আমি তাইলে হাত দিয়াই এর মজা লুটমু। তুমি একটু ওপাশে সরো তো, আব্বা!”
এই বলে সে লোলুপ দৃষ্টিতে তারান্নুমের শাড়ির আঁচলে হাত দিল। তারান্নুমের নেত্রপল্লব তখন আতঙ্কে বি’স্ফোরিত, বক্ষপিঞ্জরের ওঠা-নামা যেন কোনো দ্রুতগামী ইঞ্জিনের ছন্দকেও হার মানাচ্ছে। কিন্তু শাড়িটি পুরোপুরি উন্মোচনের পূর্বেই কক্ষের এক কোণ থেকে শৌর্যের সেই গম্ভীর আর নিরুত্তাপ কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো, “হাত সরা!”
বড়ো ভাইয়ের সেই শীতল আদেশে শৌভিক থমকে গেল। সে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “তুই আমার পর চান্স নিস না হয়, ভাই।”
”হাত সরাতে বলেছি তোকে!” এবার শৌর্যের কণ্ঠ আরো গম্ভীর আর বিপজ্জনক শোনাল।
শৌর্যের এই প্রচ্ছন্ন হুমকিতে শৌভিক আর সাহস পেল না। সে আড়চোখে পিতার দিকে তাকালে শামসুজ্জামান ইশারায় তাকে সরে যেতে বললেন। শৌভিক দাঁতে দাঁত চেপে বিরক্তি নিয়ে পিছু হটল।
শৌর্য পুনরায় শান্ত কিন্তু কর্তৃত্বব্যঞ্জক স্বরে আদেশ দিল, “ওর মুখ খুলে দাও।”
পাশেই দণ্ডায়মান এক দেহরক্ষী দ্রুত তারান্নুমের মুখের বাঁধনটি আলগা করে দিতেই এক আকাশ-ফোটানো বিদীর্ণ চিৎকার কক্ষের দেয়ালগুলোতে প্রতিধ্বনিত হলো। দীর্ঘক্ষণ মুখ বন্ধ থাকায় তার ঠোঁটের দুপাশ র*ক্তবর্ণ হয়ে গেছে। তারান্নুম মাথা তুলে উন্মত্তের ন্যায় আর্তনাদ করে বলতে লাগল, “চাচা, চেয়ারম্যান চাচা! আমি তো আপনার মাইয়ার মতন। আমারে ছাইড়া দ্যান, চাচা! ও চাচা… চাচা, বাঁচান, আমি কাউরে কিচ্ছু বলব না, আমি কসম কাটতেছি। আমি আপনারে বাবার মতন সম্মান করি, আমারে দয়া করুন! ছাইড়া দ্যান, চাচা।”
শামসুজ্জামান কুটিল হাসি হেসে তারান্নুমের মুখের কাছে ঝুঁকে এলেন। তার নিশ্বাসে তামাকের উৎকট গন্ধে তারান্নুমের নাক কুঁচকে এলো। তিনি ফিসফিস করে বললেন, “তোর ওই সতীপনা আর ঢং পরে মা’রাইস, বে*শ্যা! যখন তোর এই চাচাই তোরে চো*দাইবে, তখন আর এইসব নীতিকথা মুখ দিয়া বের হইব না, তখন অন্য কোনো শব্দ বের হইব!”
এই লোমহর্ষক উক্তিটি শোনার পর তারান্নুমের অন্তরের শেষ আশাটুকুও নির্বাপিত হলো। এতক্ষণ যে ভয়টি তাকে কুঁকড়ে রেখেছিল, তা মুহূর্তেই প্রচণ্ড অগ্নিস্ফুলিঙ্গে পরিণত হলো। যে লোকটিকে সে আজীবন গুরুজন হিসেবে সম্মান করেছে, যার জন্য তার পরিবার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার মুখ থেকে এমন নীচতা সে কল্পনাও করতে পারেনি। তারান্নুমের জানামতে, এই লোকটা এক সময় শ্রদ্ধেয় আম্বিয়ার হাতের অন্নও গ্রহণ করেছে; যার হাতে খেয়ে বড়ো হয়েছে, আজ সে-ই সেই বংশের র*ক্ত পিপাসায় মত্ত। কৃতজ্ঞতার ন্যূনতম লেশমাত্র নেই এই পাষণ্ডের অন্তরে।
অপমান আর ঘৃণার তীব্রতায় তারান্নুমের ধমনিতে এখন আগ্নেয়গিরির লাভা প্রবাহিত হচ্ছে। যদি এই মুহূর্তে তার হাত-পায়ের অবমাননাকর বাঁধনগুলো আলগা থাকত, তবে সে বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে পাশে পড়ে থাকা ওই র*ক্তলিপ্ত রামদা-খানা তুলে এই জা’নো’য়ারের কণ্ঠনালি ছিন্নভিন্ন করে দিত। তারান্নুমের সারা শরীর রি রি করে উঠল। সে সর্বশক্তি সঞ্চয় করে শামসুজ্জামানের মুখে সজোরে থুতু নিক্ষেপ করল।
“তোর মুখে কু’ত্তা মুইতা দিক, জা’নো’য়ার! আমার ভাই আর স্বামী যদি জানতে পারে, তবে তোদের রাস্তার মাঝে উলঙ্গ কইরা জুতাপেটা করবে। তোদের কাইটা বাঘের খাবার বানাইবে, শু’য়ো’রের বাচ্চা! সাহস থাকলে আমার হাত খুইল্যা দে, তোর ওই নামমর্দ অঙ্গটা আমি নিজের হাতে কাইটা ফেলব, বাইনচো*দ! কু’ত্তার বাচ্চারা, খোল আমারে!”
শান্ত-শিষ্ট তারান্নুমের মুখে এমন রুদ্ররূপ আর নিজের মুখে লাঞ্ছনা সহ্য করতে না পেরে শামসুজ্জামান একটা প্রচণ্ড থাপ্পড় কষালেন তারান্নুমের সুকোমল গালে। তারান্নুমের ঠোঁটের পাশ ফেটে ফিনকি দিয়ে র*ক্ত বেরিয়ে এলো, কিন্তু অদ্ভুতভাবে সে কাঁদল না। বরং তার চোখে তখন প্রতিশোধের আগুন জ্বলছিল। আজ সেই চিরচেনা ভীরু বালিকা মৃ*ত্যুকে তুচ্ছ করে রণরঙ্গিণী মূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছে। এদিকে শৌর্য অদ্ভুত কৌতূহল নিয়ে তার এই রূপান্তরের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারান্নুমের এই অভাবনীয় দুঃসাহস এবং অবজ্ঞা দেখে শামসুজ্জামানের ধমনিতে যেন অগ্নিস্রোত প্রবাহিত হতে লাগল। তিনি আক্রোশে মেয়েটির রেশমি চুলগুলো মুঠোয় পুরে সজোরে প্যাঁচিয়ে ধরলেন। যন্ত্রণায় তারান্নুমের মুখ থেকে তীক্ষ্ণ আর্তনাদ বের হলো। শামসুজ্জামান হিংস্র পশুর ন্যায় ফুঁসতে ফুঁসতে, তারান্নুমের মাথাটি ধরে টেবিলের শক্ত কাঠের ওপর আঘাত করতে করতে গর্জে উঠলেন, “ওরে চো*দমারানি, তোরও দেখছি তোর নানির মতনই সা*উয়ার মধ্যে তেজ ভরা! তোর ওই অহংকার যদি আজকে আমি গুঁড়া গুঁড়া না করছি, তবে আমিও আফজাল জামশেদের ছেলে না।”
টেবিলের উপর্যুপরি আঘাতে তারান্নুমের মাথার পশ্চাদ্দেশ ইতোমধ্যে ফুলে উঠেছে, ফেটে গিয়ে সেখান থেকে উষ্ণ র*ক্ত চুইয়ে চুলে লেপ্টে যাচ্ছে। চুলের গোড়া বেয়ে র*ক্ত ও ঘামের মিশ্রণ কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। সে কেবল আর্তনাদ করে যাচ্ছিল, “ও নানিইইই! নানি গো, কই তুমি? তোমার আদরের তরুরে বাঁচাও!”
যন্ত্রণার প্রাবল্যে তার নয়নযুগল থেকে অশ্রুধারা অবিরল ধারায় গালে গড়িয়ে পড়ছে।
হঠাৎ একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল। শৌর্য দ্রুত এগিয়ে এসে শামসুজ্জামানের হাতটি শক্ত করে চেপে ধরল। নিজের ঔরসের সন্তানের এই ধৃষ্টতা দেখে শামসুজ্জামান ক্ষিপ্ত ও বিস্মিত নেত্রে শৌর্যের দিকে তাকালেন। কিন্তু শৌর্যের চোখের সেই হিমশীতল দৃষ্টির সামনে একটা অদ্ভুত কারণে তিনিও যেন মুহূর্তের জন্য কুঁকড়ে গেলেন।
শৌর্য অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটি টেবিলের একপাশে রাখল। এরপর সে তারান্নুমের রাগী অথচ অশ্রুসিক্ত, অসহায় চোখের দিকে দৃষ্টিপাত করল। তারান্নুমের অবচেতন মনে একটা ক্ষীণ আশার আলো জ্বলে উঠল, এই লোকটা কি তবে এদের মতো জা’নোয়ার নয়? সে একরাশ অসহায়ত্ব নিয়ে শৌর্যের দিকে চাইল; যন্ত্রণায় আর অব্যক্ত প্রার্থনায় তার অধরপুটি আর থুতনি থরথর করে কাঁপছে।
শৌর্য তারান্নুমের মনের অলিগলি যেন পড়তে পারল। সে অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল, “কারেকশন। ‘না-হওয়া’ স্বামী। ফারহান খানকে আপনি এখনও লিগালি বিয়ে করেননি, মিস।”
তারান্নুমের কণ্ঠ দিয়ে কেবল একরাশ কান্না আর আকুতি বেরিয়ে এলো, “আপনি… প্লিজ… আমারে বাঁচান… প্লিজ!”
সেই চোখের মায়া আর আর্তি এতটাই গভীর ছিল যে, কোনো বুনো জা’নো’য়ারও হয়ত সেখানে বশ মেনে যেত। কিন্তু শৌর্যের প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অতিপ্রাকৃত। সে তারান্নুমের গাল বেয়ে পড়া এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু নিজের তর্জনীতে ধারণ করল, এবং অত্যন্ত ধীরলয়ে তা নিরীক্ষণ করতে লাগল, যেন সে কোনো মূল্যবান রত্ন পর্যবেক্ষণ করছে। পরক্ষণেই সে আঙুলটি নিজের ওষ্ঠাধরে তুলে সেই নোনা জলটুকু আস্বাদন করল। তারান্নুম এই বিকৃত আচরণে শিউরে উঠল, তার সারা শরীর ঘৃণায় আর অজানা আতঙ্কে রি রি করে উঠল।
শৌর্য তার বুড়ো আঙুল দিয়ে তারান্নুমের লাল ঠোঁটের কোণে আলতো চাপ দিল। ঘর্ষণে ঠোঁটের লিপস্টিক একপাশে লেপটে গিয়ে বিভীষিকাময় সৌন্দর্যের সৃষ্টি করল। সে হাড়হিম করা ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করল, “ফারহান কি আমার থেকেও বেশি জেন্টেলম্যান, হার্ট ইটার?”
তারান্নুম লোকটার কথার কোনো গূঢ় অর্থ উদ্ধার করতে পারল না। কেবল এক বিশাল ঢোক গিলে অবশ হয়ে যাওয়া শরীরটাকে আড়াল করার চেষ্টা করল। কক্ষের ভেতরে তখন তামাকের উগ্র গন্ধ, র*ক্তের ছড়াছড়ি আর শৌর্যের রহস্যময় ব্যক্তিত্ব মিলে তার সমস্ত অস্তিত্বকে বিষিয়ে তুলছে। অথচ বাইরে পাইন বনের মধ্য দিয়ে ঝোড়ো বাতাস বয়ে যাচ্ছে। শৌর্যের চোখের সেই তীক্ষ্ণতা তারান্নুমের আত্মাকে বিদ্ধ করছিল; সে বুঝতে পারল এই লোকটা দয়া নয়, বরং আরও গভীর কোনো নারকীয় খেলার পরিকল্পনা করছে।
“আমারে ছুঁবেন না! সইরা যান, সইরা যান বলছি!”
তারান্নুমের এই আতঙ্কিত চিৎকার শৌর্যের কাছে যেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কৌতুক বলে মনে হলো। সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। সেই হাসির শব্দে তারান্নুমের হৃৎস্পন্দনের গতি অশ্বারোহীর মতো ছুটতে শুরু করল। সামনের লোকটাকে এবার শয়তানের চেয়েও ভয়াবহ প্রতিভাত হলো।
শৌর্য হুট করেই তারান্নুমের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট স্থাপন করল। কিন্তু সেই চুম্বন মোটেও স্বাভাবিক বা রোমান্টিক ছিল না; তা ছিল উগ্র, পাশবিক এবং দমবন্ধ করা। এতটা নৃ’শংসভাবে সে তারান্নুমের ওষ্ঠাধর দখলে নিল যে, পূর্বের ক্ষতস্থানটি পুনরায় ফেটে গিয়ে সেই চুম্বনের ফাঁকেই র*ক্ত গড়িয়ে তার চিবুক প্লাবিত করল। যন্ত্রণায় তারান্নুমের চোখ উলটে যাওয়ার উপক্রম হলো, সারা শরীর অবশ হয়ে কুঁকড়ে গেল। দীর্ঘ সাত মিনিটের সেই নারকীয় আগ্রাসনের পর শৌর্য ঠোঁট সরিয়ে নিল। তার মুখে বিকৃত, তীর্যক হাসি ফুটে উঠলো। সে বুড়ো আঙুল দিয়ে নিজের এবং তারান্নুমের ক্ষতবিক্ষত ঠোঁটের র*ক্ত মুছে নিল।
এই পাশবিক চুম্বনেই তারান্নুমের শ্বাস-প্রশ্বাস প্রায় রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। চোখ দুটো জবার মতো লাল হয়ে গেছে। সে চিৎকার করে কিছু বলার জন্য মুখ খোলার আগেই শৌর্য অত্যন্ত জোরে তার বাম হাত দিয়ে তারান্নুমের মুখ চেপে ধরল। অন্য হাতের তর্জনী নিজের ঠোঁটে ছুঁইয়ে কটমট করে বলল, “একটা গালিও যেন আপনার ওই সুন্দর মুখ থেকে না বের হয়, মিস। তাহলে আপনার ওই নরম, কোমল ঠোঁট দুটো আমি কা’মড়ে ছিঁ’ড়ে ফেলব!”
তারান্নুম ক্রমাগত ছটফট করেই যাচ্ছে, তার প্রতিটি পেশি যেন মুক্তির জন্য হাহাকার করছে। শৌর্য তীক্ষ্ণ, কদর্য হাসি হেসে তারান্নুমের আপাদমস্তক একবার নিরীক্ষণ করল। তারপর রহস্যময় স্বরে যোগ করল, “আপনাদের বাড়ির সব মেয়েগুলোই কি এমনই তেজস্বিনী? আচ্ছা, কারানের বউটা কেমন?”
সে একটু থামল। তারপর এক ভ্রূ উঁচিয়ে ধীরে ধীরে যোগ করল, “শুনেছি ওকে নাকি কেউ দেখেইনি। নামটা… আআ, ইয়েস, মিরা, রাইট? ও কি আপনার থেকেও অপরূপা? আরও বেশি টেস্টি? হুম?”
মিরার নাম উচ্চারণ করা মাত্রই তারান্নুমের ধমনিতে প্রতিবাদের যে অগ্ন্যুৎপাত শুরু হলো, তা দড়ির প্রতিটি তন্তুকে ছিঁড়ে ফেলার উপক্রম করল। তার দুর্ধর্ষ রাগ আর ঘৃণার তীব্রতা শৌর্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল।
শৌর্য অত্যন্ত ধীরলয়ে এক হাতে নিজের শার্টের বোতামগুলো উন্মোচন করতে শুরু করল। তার লোলুপ দৃষ্টি তখন তারান্নুমের বক্ষদেশ থেকে শরীরের নিম্নাংশে বিচরণ করছে। হঠাৎ এক হ্যাঁচকা টানে সে তারান্নুমের বুক থেকে শাড়িটা সরিয়ে ফেলল। শয়তানি নজরে সে তারান্নুমের উন্মুক্ত বক্ষদেশের দিকে তাকিয়ে জিভ দিয়ে নিজের শুষ্ক ওষ্ঠাধর সিক্ত করল।
পরক্ষণেই সে শাড়ির কুচির অংশটাও অসংলগ্নভাবে খুলে ফেলল। পাশে দাঁড়িয়ে শৌভিক আর শামসুজ্জামান যেন লালসার কোনো নরককুণ্ডে অবগাহন করছিল; তাদের জিভ চাটবার কিঞ্চিৎ শব্দে তারান্নুম বারবার কেঁপে উঠলো।
শৌর্যের হাতের চাপ সরতেই তারান্নুম তার সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে আকাশফাটা চিৎকার দিয়ে উঠল, “আমার পবিত্র ভাবির নাম মুখে নিছোস, তুই জা’নোয়ার! তোর ওই নোংরা মুখ আমি—আআআ!”
কথা শেষ হওয়ার আগেই এক বিদীর্ণ আর্তনাদ কক্ষের দেয়ালগুলোতে প্রতিধ্বনিত হলো। শৌর্য শৌভিকের হাতে থাকা সেই তীক্ষ্ণ রামদা টেনে নিয়ে তারান্নুমের এক পা কে’টে দিল। গড়গড় করে তপ্ত র*ক্ত গড়িয়ে মেঝেতে জমাট বাঁধতে শুরু করল। শৌর্য তারান্নুমের ব্যথাতুর মুখের কাছে ঝুঁকে এসে সেই র*ক্তরঞ্জিত শাড়ি দিয়েই পুনরায় তার মুখ বাঁধতে বাঁধতে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “আপনাকে আগেই ওয়ার্নিং দিয়েছিলাম না, হার্ট ইটার? এখন আর কোনো সোফিস্টিকেটেড ট্রিটমেন্ট হবে না। যা হবে সব ওয়াইল্ড আর ব্রুটাল।”
এখন কেবল তারান্নুমের কণ্ঠরোধ করা গোঙানি আর ‘উম উম’ শব্দ শোনা গেল। তার চোখের মণি দুটো যেন যন্ত্রণার ভারে ফেটে বেরিয়ে আসবে। শৌর্য তারান্নুমের বক্ষস্থলে হাত রাখল, তারান্নুমের মনে হলো তার বুকে পাথর বসানো হয়েছে। প্রথমে শৌর্য আলতোভাবে হাত বুলালেও, হঠাৎই পাশবিক ক্ষিপ্রতায় তার স্ত*নদ্বয় সজোরে মুচড়ে ধরে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “আপনি তো ফো’রসাম সম্পর্কে কোনো ধারণা রাখেন না মিস, আজ আপনাকে প্র্যাকটিক্যালি সেই লেসন দেব।”
এই বলেই সে তারান্নুমের গ্রীবায় একটা পৈশাচিক কা’মড় বসাল। যন্ত্রণায় তারান্নুমের শরীরটা টেবিলের ওপর ধনুকের মতো বেঁকে উপরে উঠে গেল। সেই ক্ষতস্থান থেকে র*ক্ত চুইয়ে তার বক্ষদেশ প্লাবিত করল। দৃশ্যটি দেখে শামসুজ্জামান আর শৌভিকও সেই পাশবিক উৎসবে মত্ত হলো। পবিত্র সেই শরীরটাকে একদল ক্ষুধার্ত শকুন ছিঁ’ড়ে খে’তে শুরু করল। কারো চুম্বন, কারো নখের আঁচড়—সব মিলিয়ে তারান্নুমের মনে হলো সে কোনো জঘন্য মাংসের বাজারে পড়ে আছে। তারান্নুমের চেতনার প্রতিটি তন্তু তখন অবশ হয়ে আসছিল, অথচ তার ঝাপসা চোখের মণিকোটরে তখন কেবল ফারহানের মুখচ্ছবি ভাসছে। তার মনে হচ্ছে, ফারহানের সেই সযত্নে রাখা ‘কুইন’-এর অস্তিত্বকে আজ নরপশুরা ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে।
হঠাৎ শৌর্য তার সেই অর্ধেক জ্বলা সিগারেটটি তুলে তারান্নুমের বক্ষ-ভাঁজে সজোরে চেপে ধরল। আগুনের সেই নারকীয় দহন তারান্নুমের স্নায়ুকে এমনভাবে আঘাত করল যে, সে বাইন মাছের মতো টেবিলের ওপর আছড়াতে লাগল। পোড়া মাংসের উৎকট গন্ধে বাতাস বিষিয়ে উঠল। লাল পোড়া দাগটি ধীরে ধীরে কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করল, আর শৌর্য অত্যন্ত তৃপ্তির সাথে সেই দগ্ধ ক্ষতস্থানেই নিজের ওষ্ঠাধর ডুবিয়ে দিল।
ওদিকে শৌভিক উন্মাদের ন্যায় তারান্নুমের স্প’র্শ’কাতর অঙ্গে নিজের আঙুলগুলোর অনধিকার প্রবেশ ঘটাল। তার তীক্ষ্ণ নখগুলো বন্য বিড়ালের মতো তারান্নুমের শরীরের গভীরে আঁ’চড় কাটছিল, যার ফলে প্রতিটি ঘর্ষণে দুই পা বেয়ে তপ্ত র*ক্তধারা মেঝেতে উপচে পড়ল।
একই সময়ে শামসুজ্জামান, যিনি এক সময় তার অভিভাবকের আসনে আসীন ছিলেন, তিনিও এই পাশবিক উল্লাসে যোগ দিলেন। তারান্নুমের উদরদেশের কোমল অংশে তিনি নিজের লালাময় জিভ লেহন করতে থাকলেন, যা তারান্নুমের কাছে কোনো বিষধর সরীসৃপের স্পর্শের চেয়েও বেশি কদর্য মনে হচ্ছিল। তীব্র ঘৃণায় তারান্নুমের অন্তর থেকে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে চাইল, তাকে কেন মে’রে ফেলা হচ্ছে না? এই মুহূর্তের এই লাঞ্ছনার চেয়ে মৃ*ত্যুও ছিল পরম কাঙ্ক্ষিত। একবারে তার বুক চিরে হৃৎপিণ্ড বের করে নিলেও হয়ত সে এত কষ্ট পেত না, যতটা পাচ্ছে ফারহানের জন্য তুলে রাখা এই পবিত্র ভালোবাসার দেহটিতে জা’নোয়ারদের নখর আর ওষ্ঠের স্পর্শে। সে কেবল প্রার্থনা করছিল—হয় ফারহান এসে তাকে এই জাহান্নাম থেকে ছিনিয়ে নিক, নয়তো মাটির বুক ফেটে সে অতলে হারিয়ে যাক।
শৌর্য নিজের প্যান্টের চেইন উন্মুক্ত করতে করতে আর তারান্নুমের ব্লাউজের হাতা টেনে নামাতে নামাতে এক মুহূর্তের জন্য থামল। সে নেশালো চোখে কপট করুণা মিশিয়ে তারান্নুমের নেত্রপল্লবের দিকে ঝুঁকে বলল, “আই… লাভ… ই…”
Tell me who I am 2 part 18
সে একটু থামল, তারপর তারান্নুমের কানের একদম গহ্বরে প্রলয়ঙ্কারি স্বরে উচ্চারণ করল, “ইয়োর বডি!”
তারান্নুমের মস্তিষ্কে তখন শেষবারের মতো পরিবারের সবার মুখগুলো বিদ্যুতের মতো ভেসে উঠলো। সে বুঝতে পারল, তার আয়ু দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তবুও শেষ মুহূর্তের একটা অলৌকিক আশায় সে প্রার্থনা করল, যেন কারান আর ফারহান একবারের জন্য হলেও তাকে এই নরক থেকে উদ্ধার করে। তার কত কী বলার ছিল ফারহানকে! একটা বার অন্তত তাকে ‘ভালোবাসি’ বলা হলো না।
যখন তার পবিত্র শরীরটি জানোয়ারদের করাল গ্রাসে নিঃশেষ হচ্ছিল, তখন তারান্নুম চোখ বন্ধ করে শেষবারের মতো অন্তরের অন্তস্থল থেকে কেবল একটি বাক্যই জপে গেল, “আমি আপনাকে ভালোবাসি, ফারহান খান।”
