Tell me who I am 2 part 20
আয়সা ইসলাম মনি
প্রাচীন মেহগনি আর কৃষ্ণচূড়ার সারিতে ঘেরা সরু পথটায় যখন কালো রঙের গাড়িটা এসে থামল, টায়ারের তীব্র ঘর্ষণে চারদিকের নীরবতা খানখান হয়ে গেল। কারান দ্রুত গাড়ি থেকে নামল। তার দুই হাতে সযত্নে ধরা শুভ্র ডেইজি আর বেগুনি গ্লাডিওলাসের বিশাল দুটো তোড়া। সামনের দিকের সদর রাস্তা দিয়ে ঘুরে আসতে গেলে পথ অনেক বেশি, তাই সময় বাঁচাতে এই পেছনের শর্টকাটই বেছে নিয়েছে সে। গাড়িটা এখানেই ফেলে রেখে যেতে হবে। কারণ সামনের পথ এতটাই সরু যে গাড়ি ভেতরে ঢোকানো অসম্ভব। আর একবার ভেতরে ঢুকে পড়লে সে আর ফুল নিতে গাড়ির দিকে ফিরে আসার সময় পাবে না। কারণ এদিকে আসতেও তার পঁচিশ মিনিট খরচ হবে। তাই চরম উৎকণ্ঠার মাঝেও সে তোড়াগুলো হাতে তুলে নিয়েছে।
তার অবচেতন মনে তখনো ক্ষীণ আশাবাদ কাজ করছিল। কারণ সেবারও তো বাড়ির সবাই এক ঘরে ফোন রেখে অন্য ঘরে আড্ডায় মেতেছিল, যার জন্য কারানকে অহেতুক দুশ্চিন্তার আগুনে পুড়তে হয়েছিল। সেবার সবার ওপর বেশ রাগও করেছিল সে। আজকেও যে সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে না, তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে?
ফারহানও গাড়ি থেকে নামল। তার এক হাতে দামি শপিং ব্যাগের মধ্যে রাখা রুবি রেড রঙের সেই বেনারসি ওড়না আর প্রিমিয়াম চকলেট; অন্য হাতে ধরা একগুচ্ছ টকটকে লাল গোলাপের তোড়া। ফারহানের মুখাবয়ব ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কেন জানি আজ তার বুক অতিরিক্ত ধুকপুক করছে। সে অসহায় দৃষ্টিতে কারানের দিকে তাকাল। কারান শুধু মাথা নেড়ে তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল, যদিও কারানের নিজের চেহারায়ও তখন উৎকণ্ঠার বিষাদ স্পষ্ট।
তারা সামনে এগোতে থাকলো, কিন্তু এক পর্যায়ে এই মন্থর গতিতে হাঁটাটা কারানের জন্য অসহনীয় হয়ে দাঁড়ালো। সে এবার ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় দিল। ফারহানও তার পিছু নিল। বাড়ির সেই বিশাল ভিক্টোরিয়ান আর্কিটেকচারের কারুকাজ করা গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকেই কারান উচ্চস্বরে ডাকতে শুরু করল, “মিরা? মিরাআআআ? হোয়্যার আর ইউ?”
তার কণ্ঠস্বর বাড়ির প্রতিটি কোণায় প্রতিধ্বনিত হলো। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে ফ্রেশ কেক বেকিংয়ের মায়াবী সুগন্ধ ভেসে আসছিল। কারানের চিৎকার শুনে মিরা দ্রুত পায়ে সদর দরজায় এসে দাঁড়াল। তার পরনে সাধারণ কমলা শাড়ি, চুলে আলগা হাতখোঁপা, আর তার ফরসা হাতে তখন ভ্যানিলা ক্রিমের সাদা আস্তরণ লেগে আছে। কারানকে দেখেই মিরার চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে একগাল হেসে বলল, “কারান! তুমি… তুমি এত আর্লি চলে আসলে? আমি তো ভেবেছিলাম, তোমার আসতে অন্তত রাত দশটা বাজবে!”
কারানকে জড়িয়ে ধরতে মিরা সোল্লাসে এগিয়ে আসছিল, কিন্তু তার আগেই কারান ক্ষিপ্রগতিতে গিয়ে তাকে দুই বাহুর বন্ধনে পিষে ধরল। আচমকা এই আক্রমণে মিরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পেছনের দিকে হেলে পড়ছিল, কিন্তু কারানের বলিষ্ঠ হাত তাকে সজোরে আগলে রাখল। মিরা অনুভব করতে পারল, কারানের হার্টবিট যেন কোনো উন্মত্ত ঘোড়ার মতো ছুটছে। কারানের তপ্ত ও দ্রুত নিশ্বাস মিরার ঘাড়ের ওপর আছড়ে পড়ছে। একটা অদ্ভুত দুশ্চিন্তা কারানের সারা মুখমণ্ডল গ্রাস করে রেখেছে।
মিরা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করে বলল, “কি… হয়েছে, কারান? আর ইউ ওকে? তুমি এত কাঁপছ কেন?”
কারান কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু চোখ বুজে এই অস্তিত্বকে অনুভব করতে চাইল। তার আত্মাটা যেন আরেকটু হলেই শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। প্রায় দশ মিনিট এই নিথর আলিঙ্গনের পর সে চোখ খুলে মিরার মুখটা দুহাতে আগলে ধরল। বহু নির্ঘুম প্রহর পর এই মুখটা দেখে তার চোখের তৃষ্ণা যেন মিটতেই চাইছে না। সে পরম মমতায় মিরার ললাটে এক দীর্ঘ, আর্দ্র চুম্বন আঁকল। এরপর তার অধরে, চিবুকে, সারা মুখে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াতে থাকল। মিরা কারানের এই ব্যাকুল ভালোবাসার আতিশয্যে শিউরে উঠল। এই কয়দিন তারও সারা শরীর কারানের চিন্তায় কাঁপছিল, কিন্তু এই স্পর্শের আবেশে তার মন অলৌকিক শান্তিতে ভরে গেল।
অবশেষে কারান তার চিবুক আলতো করে তুলে ধরে বরফশীতল কণ্ঠে বলল, “হোয়াই ডিডন্ট ইউ পিক আপ মাই কলস, সুইটহার্ট?”
কারানের বুড়ো আঙুল তখন মিরার কোমল গালে অস্থিরভাবে বিচরণ করছিল। মিরা অনুতপ্ত ভঙ্গিতে হাতের উলটো পাশ দিয়ে নিজের কপাল চাপড়ে বলল, “ইশশ, দেখেছ! আরে তুমি যখন বললে না, আজ আমার কিউট ননদ তরু আর ফারহানের অ্যানিভার্সারি, তখন আমি এতটাই এক্সাইটেড হয়ে পড়েছিলাম যে সাথে সাথেই কিচেনে গিয়ে কেক বানাতে লেগে পড়লাম। যেন ফারহান আসার আগেই সব প্রস্তুত করে ফেলতে পারি। সাথে ফুপিজান ছিল হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে। এই দেখো, হাতে এখনো কেকের ক্রিম লেগে আছে। আর তুমি তো জানোই, টেক্সট করার সময় আমি ফোন সাইলেন্ট করে রাখি, মেসেজটা পড়েই তাড়াহুড়ো করে নিচে চলে এসেছিলাম। ফোনটা যে সাইলেন্ট মোডেই রয়ে গেছে, একদম খেয়াল ছিল না। আই’ম রিয়ালি সরি। দ্যাট ওয়াজ সো স্টুপিড অফ মি। খুব করে সরি, হানি!”
মিরা ক্রিমমাখা হাত দুটো দিয়ে অনুতপ্ত হয়ে কানে ধরল। তার কানে হালকা ক্রিমের অংশ লেগেও গেল। কারান অনুভব করল, এই পবিত্র লজ্জিত মুখটার ওপর সে চাইলেও রাগ করতে পারবে না। কয়েক দিনের বিচ্ছেদ আর এই মুহূর্তের মানসিক দহন তাকে আরও বেশি তৃষ্ণার্ত করে তুলেছে। তার খুব ইচ্ছে করছে, মিরাকে আরও কিছুক্ষণ নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে নিজের হৃৎস্পন্দনের অস্থিরতাটুকু শান্ত করতে।
তাই কারান আবার মিরাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, এক হাতে তার মাথার পেছনটা আগলে রেখে আকুল স্বরে অভিযোগ করল, “একটুখানি প্রশান্তি কি তুমি আমাকে দেবে না? তোমার এই চরম বেখেয়ালি স্বভাব আমাকে প্রতিটা মুহূর্তে দগ্ধ করছে। আমাকে প্রতিক্ষণ উৎকণ্ঠার বিষে নীল রেখে তোমার কি খুব আনন্দ হয়? আজ আমি ম’রণপণ যন্ত্রণার শিখরে দাঁড়িয়ে ছিলাম মিরা, অথচ এতদিনেও তুমি আমার ভালোবাসাটা ঠিকভাবে অনুভবই করলে না। তোমার এই অবহেলার কী শাস্তি হওয়া উচিত, বলো? ঘণ্টার পর ঘণ্টা তোমাকে বুকের পাঁজরে পিষ্ট করে তোমার শরীরে ব্যথার নীল দাগ এঁকে দেব? নাকি সহস্র চুম্বনে তোমার শরীরের সমস্ত শক্তি শুষে নিয়ে তোমাকে একদম নিঃস্ব করে দেব? কোন শাস্তি দিলে আমার এই অশান্ত আত্মাটা কিছুটা শান্ত হবে, বলবে কি?”
মিরা কারানের বুকের ওপর থেকে মুখ তুলে দুষ্টু হাসল। সে ফিসফিস করে বলল, “এখানে না থাকলে বলতাম কী পানিশমেন্ট দেবেন, আমার সোয়ামি!”
“আই অ্যাম নট ইন এ ফানি মুড, মিরা। অথচ তোমার ওপর রাগও দেখাতে পারছি না। ইউ আর সো ক্রুয়েল!”
মিরা কারানের অবস্থাটা বুঝতে পেরে পরম মমতায় তাকে আরও জোরে জাপটে ধরল। কিছুক্ষণ পর সে পা উঁচিয়ে কারানের গালে একটা আলতো চুমু খেল। এরপর তার নাকটা টেনে দিয়ে আদুরে গলায় বলল, “এই সুন্দর ফুলগুলো কার জন্য, মিস্টার?”
কারান তো প্রায় ভুলেই গিয়েছিল ফুলের তোড়া দুটোর কথা। সে ক্লান্তভরা হাসি নিয়ে ডেইজি তোড়াটা মিরার হাতে দিতেই মিরা মুগ্ধ হয়ে ঘ্রাণ নিল। মিরার হাতে সাদা ভ্যানিলা ক্রিমের দিকে তাকিয়ে কারান হঠাৎ তার হাতটা খপ করে ধরল। মিরা বিস্মিত হয়ে তাকাতেই কারান তার সেই ক্রিমমাখা আঙুলগুলো একে একে নিজের ঠোঁটের সান্নিধ্যে নিয়ে এলো, এবং অত্যন্ত আবেশে আঙুল থেকে সেই সুস্বাদু ক্রিমগুলো নিজের মুখে পুরে নিতে নিতে শীতল স্বরে বলল, “বাকিরা কোথায়?”
মিরার সারা শরীরে তখন প্রগাঢ় শিহরনের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। কারানের জিভ আর তপ্ত ওষ্ঠের স্পর্শে তার সমস্ত চেতনা যেন অবশ হয়ে আসছে। তার আঙুলগুলো এখন পুরোপুরি পরিষ্কার। সে কাঁপাকাঁপা স্বরে অস্ফুট কণ্ঠে বলল, “স… সবাই ভেতরেই আছে। আচ্ছা, তুমি না বললে ফারহানও আসবে? সে কোথায়?”
কারান পরম মমতাভরে মুখ তুলে মিরার আরক্তিম মুখচ্ছবির দিকে চেয়ে রইল। তার কানের লতিতে লেগে থাকা ক্রিমটুকু মুছে দিয়ে, সিল্কের মতো মসৃণ ও অবাধ্য চুলগুলো যত্নসহকারে কানের পাশে সরিয়ে দিতে দিতে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল, “হি ইজ জাস্ট অ্যা লিটল বিট ফার অফ। আমি ওকে এখনই নিয়ে আসছি। যাক, অবশেষে জানলাম যে সবাই সেফ অ্যান্ড সাউন্ড আছে…”
এক দীর্ঘ প্রশান্তির নিশ্বাস কারানের বুক চিরে বেরিয়ে এলো। এরপর সে নিজের ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা ক্রিমি ফ্রস্টিংয়ের অবশেষটুকু বুড়ো আঙুলে তুলে নিয়ে অত্যন্ত আদুরে ভঙ্গিতে সেটা মিরার ঠোঁটের অন্দরে পুরে দিল। মিরা নিঃসংকোচে সেই মিষ্টি স্বাদ গ্রহণ করল, তার লাজুক হাসিতে যেন মুক্তো ঝরে পড়ছে। কারান মুহূর্তকাল স্তব্ধ থেকে কৌতূহলী কণ্ঠে পুনরায় শুধালো, “ভেতরে কে কে আছে?”
মিরা একটু অবাক হয়েই উত্তর দিল, “কে আবার? যারা ইউজুয়ালি থাকে তারাই। তালহা ভাইয়া আর সোফিয়া তো অলরেডি চলে গেছে। দাদিজান তার ঘরে বসে শান্তিতে তিলাওয়াত করছেন। তুব্বা কোনো এক গল্পের বইয়ে ডুবে আছে। আর ফুপি তো যাকে বলে হাইপার-অ্যাকটিভ! তার মেয়ে জামাই আসবে বলে কথা, সেই সন্ধ্যা থেকেই ডিনার প্রিপারেশনে একদম জান লড়িয়ে দিচ্ছেন। রান্নাঘর থেকে ডাইনিং টেবিল—সব জায়গায় এলাহি কারবার! মেন্যুতে মাছের কালিয়া, গরুর কালাভুনা, মাটন কারি থেকে শুরু করে পিঠেপুলি, সবই রাখা হয়েছে। স্পেশালি ফারহানের ফেভারিট ডিশগুলো। আচ্ছা, কেকটার ওপর ‘গোবরচারিনী প্লাস বজ্জাত ব্যাটা’, এটা লিখে দিলে কেমন হয়?”
কথাটা শেষ করেই মিরা খপ করে হেসে উঠল। কারান এতক্ষণে যেন বাস্তবে ধাতস্থ হলো। সে পকেট থেকে ফোনটা বের করে ফারহানের উদ্দেশ্যে দ্রুত টাইপ করল: “সবাই ভেতরেই আছে, ডোন্ট প্যানিক। আমি ভেতরটা একবার ফাইনালি চেক করে এসে তোকে রিসিভ করব। জাস্ট ওয়েট আ ফিউ মিনিটস।”
ফোনটা ডেনিমের পকেটে চালান করে কারান এক গাল হেসে বলল, “আমার সুন্দরী বউটা দেখছি আজ অনেক হার্ড ওয়ার্ক করেছে। অথচ এসব আমার করার কথা ছিল। বেশি টায়ার্ড হয়ে গেলে কি, সোনা?”
মিরা তার ডাগর ডাগর চোখ নেড়ে আশ্বস্ত করল যে, ক্লান্তি নয় বরং প্রিয়জনদের জন্য কিছু করার পরম তৃপ্তিই তাকে ঘিরে আছে। কারান তার উজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবল, মিরা তো এমনিতেও বসে থাকার মেয়ে নয়—কর্মতৎপরতার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা খুঁজে পায় সে। সে আবার ঝুঁকে এসে মিরার ওষ্ঠাধরে এক নিবিড় ও দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিল। তার মনে হচ্ছিল এই মুহূর্তটা যদি থমকে যেত, তাহলে সে সারাজীবনই মিরাকে এভাবে ভালোবেসে যেত! মিরা নিঃশব্দে সেই ভালোবাসা গ্রহণ করলেও লজ্জায় নিজে খুব একটা সাড়া দিল না। কারান আলতো করে মিরার ঠোঁটের আর্দ্রতাটুকু তর্জনী দিয়ে মুছে দিয়ে বলল, “ওকে দেন, তুমি ভেতরে যাও। আমি ফারহানকে নিয়ে আসি…”
“আচ্ছা, ফারহান কি আমাদের এই রোমান্টিক মুহূর্তটা দেখতে পাচ্ছে?” মিরা দুষ্টুমির ছলে জিজ্ঞাসা করল।
কারান মাথা নেড়ে অসম্মতি জানাতেই মিরা চপল হরিণীর মতো হঠাৎ করেই কারানের ঠোঁটে একটা আলতো চুম্বন দিয়ে দ্রুত সরে দাঁড়াল। তার মুখে তখন বিজয়ের হাসি। “থ্যাংকস আ লট, হাজব্যান্ড! ফুলগুলো জাস্ট গর্জাস। এতদিনের অপেক্ষার পর এই গিফটটা কিন্তু সত্যিই আমার মন জয় করে নিয়েছে।”
এবার কারান পকেট থেকে চকলেট দুটো বের করে দিতেই মিরার খুশিতে যেন ডানা গজালো। “উফফ! এবার তো একদম আইসিং অন দ্য কেক! তুমি জলদি ফ্রেশ হয়ে নাও, আমি তুব্বাকে একটা চকলেট দিয়ে আসি। আচ্ছা, তোমার ওই বাম হাতের গ্লাডিওলাস ফুলের তোড়াটা কার জন্য? দাদিজানের জন্য নাকি? ধুর, তোমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে আমি কখন থেকে বকবক করছি! আচ্ছা, তোমরা ভেতরে এসো, আমি ডিনার সার্ভ করার ব্যবস্থা করছি।”
মিরা চঞ্চল পায়ে ভেতরের দিকে পা বাড়াতেই কারানের নজর পড়ল তার বাম হাতে ধরা গ্লাডিওলাস তোড়াটার দিকে। একটা অব্যক্ত শঙ্কায় তার বুকটা আবারও ধক করে উঠল। সে গম্ভীর গলায় ডাকল, “মিরা…”
মিরা পেছন ফিরে তাকাল। “হুম, বলো?”
“তরু কোথায়? সেই ব্যাপারে তো ডিটেইলসে কিছু বললে না।”
“কোথায় আবার? নিজের রুমেই থাকবে।”
কারানের কণ্ঠস্বর এবার কিছুটা তীক্ষ্ণ আর সন্দিগ্ধ শোনাল। সে স্থির দৃষ্টিতে মিরার দিকে চেয়ে প্রশ্ন করল, “আর ইউ হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর?”
কারানের তীক্ষ্ণ প্রশ্নের মুখে মিরার কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল। রাতের নির্জনতায় দূর থেকে ভেসে আসা প্যাঁচার ডাক অস্বস্তি আরো বাড়িয়ে তুলছে। সন্ধ্যার দিকে বাগান থেকে ফাতিমার সাথে ফেরার পর থেকেই তারা দুজনে নামাজ আর নৈশভোজের আয়োজনে এতটাই মগ্ন ছিল যে, পারিপার্শ্বিক জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। সেই যে গোধূলির শুরুতে তারান্নুম চোখের আড়াল হলো, তারপর সন্ধ্যা থেকে গত তিন ঘণ্টা তার আর কোনো হদিস নেই! যে চঞ্চল মেয়েটার পদচারণায় পুরো বাড়িটা সারাক্ষণ মুখরিত থাকে, তার এই দীর্ঘ নীরবতা সচরাচর ঘটে না। কোনো অশুভ সংকেত না তো? বিষয়টি মিরার স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করল।
“কী হলো? চুপ করে আছো কেন?” কারানের কণ্ঠে এবার দুশ্চিন্তার আবাস ফুটে উঠল।
মিরা কোনো প্রত্যুত্তর দিল না। কারানের উৎকণ্ঠিত চেহারার দিকে একবার তাকাতেই তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। তার শুষ্ক কণ্ঠনালী বেয়ে অস্ফুটভাবে একঢোক গিলতে গিলতে সে দ্রুতপায়ে ভেতরের বারান্দার দিকে এগোতে লাগল। মিরার এই আকস্মিক মৌনতা আর তড়িঘড়ি ছুটে চলা দেখে কারানের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হলো; সেও দীর্ঘ পদক্ষেপে মিরার পিছু নিল।
এদিকে সদর দরজার বাইরে, কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়ায় অপেক্ষারত ফারহান চরম বিরক্তিতে নিজের গোড়ালি চুলকাচ্ছিল। চারপাশের ঝোপঝাড় থেকে ধেয়ে আসা মশার উপদ্রব তাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। সে বিড়বিড় করে আপনমনেই গালি ছুঁড়ল, “শালারপো কারান আমাকে প্রপারলি ওয়েলকাম না করলেও, এই ব্লাড-সাকিং মশাগুলো ঠিকই তাদের মালকিনের হবু জামাইকে কামড়ে কামড়ে বরণ করে নিচ্ছে!”
হাতের তালু দিয়ে বাতাসে একটা চড় কষিয়ে সে মশা তাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করল। এরপর খানিকটা রসিকতার সুরে বিড়বিড়াল, “সবকিছু তোরাই খেয়ে ফেলিস না ভাই, আমার অভুক্ত বউটাও তো খাবে নাকি? তোদের সাথে ব্লাড গ্রুপটা মিলে গেলে তো আবার সমস্যা। পরে যদি আমার কুইন তোদেরকেই আমার বাচ্চা ভেবে নেয়! ব্যাপারটা বেশ চিন্তার দেখছি!” এই বলে সে ঠোঁট উলটে এমন এক ভঙ্গি করল, যেন আসলেই সে মহাচিন্তায় নিমজ্জিত।
একটু পর সামনে দৃষ্টি প্রসারিত করেও কারানের দেখা পেল না সে। বিরক্তিটা এবার সন্দেহে রূপ নিল।
“ওর ওই সব টেক্সট-ফেক্সটে আমার আর ট্রাস্ট নেই। যতক্ষণ না নিজের চোখে আমার বউকে দেখছি, শান্তি পাচ্ছি না। আমাকে এখানে মশার কামড় খাওয়ার জন্য ফেলে রেখে হা’রামিটা ডেফিনেটলি ভেতরে রোমান্স করতে গেছে। ওর নিকনেম পাল্টে এবার ‘বউ-পা’গলা’ রাখব ভাবছি। একবার যদি বউয়ের গর্তে ঢুকে পড়ে, তবে লেজ ধরে টানলেও শালাকে বের করা ইম্পসিবল! আর আমার কুইনটাকে দেখো, এসে যে জামাই বরণ করবে তার নামগন্ধ নেই; কে জানে, কার বা’ল ছিঁড়ছে! ফোনটাও ধরছে না ইডিয়ট মেয়েটা। একবার তোমাকে জাস্ট সামনে পাই, সোজা ছাদনাতলায় নিয়ে যাবো!”
একাকীত্বের একঘেয়েমি কাটাতে সে গুনগুনিয়ে গানের সুরে তাল মেলাল:
“ও জান, ও বেবিইই
সোনার ময়নার পাখিইই…
কবে তুমি হবে আমার, আসবে বুকে?”
গানের কলি শেষ করে নিজেই নিজের কাণ্ড দেখে কিছুটা আরক্ত হলো ফারহান। তার মতো শক্তপোক্ত মানুষের এমন লজ্জা পাওয়াটা সত্যিই বেশ হাস্যকর। অন্তত আয়লা থাকলে নিশ্চয়ই এখন তার এই ছেলেমানুষি আচরণ নিয়ে মারাত্মক ট্রল করত। অবধারিতভাবেই আয়লার স্মৃতি তার মস্তিষ্কের কোণে কড়া নাড়ল। ফারহানের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। পকেট থেকে ফোনটা বের করে ছবির ভাণ্ডারে জমানো পুরোনো মুহূর্তগুলো দেখতে লাগল সে।
ডিজিটাল পর্দায় ভেসে উঠল অতীতের প্রাণবন্ত কিছু স্মৃতি—কোথাও আয়লা তাকে বরফের গোল্লা ছুঁড়ে মারছে, কোনোটিতে দুষ্টুমি করে লাথি মারার ভঙ্গি করে তাকে শাসাচ্ছে, আবার কোনোটিতে দুজনে মিলে পুরোদস্তুর কুস্তি লড়ছে! ছবিগুলো দেখতে দেখতে ফারহানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলেও চোখের কোণ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। আজকের এই আনন্দঘন লগ্নে ‘পাত্রপক্ষ’ হিসেবে যদি কাউকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হতো, তবে সে নিঃসন্দেহে আয়লা। যদিও সে থাকলেও উলটো ফারহানেরই বদনাম করত আর তারান্নুমের পক্ষ নিয়ে তার পিণ্ডি চটকাত, তবুও আয়লার অভাবটা আজ তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে।
না, আর ভাবা যাচ্ছে না। নস্টালজিয়া তাকে কাবু করে ফেলছে। যদি এখন কান্না আটকে রাখতে না পারে, তবে তার কুইন তাকে দেখে কী ভাববে? ফারহান নিজেকে সবসময় একজন কঠোর মানুষ হিসেবে চেনে, যে কারো পরোয়া করে না। কিন্তু এই মেয়েটা তাকে যেভাবে আবেগতাড়িত করে তুলেছে, তাতে সে লজ্জিত নয়, বরং আয়লার প্রতি তার গর্ব হলো। সে কোনোদিন ভাবেনি তার পাথুরে হৃদয়ে অনুভূতির কোনো জায়গা আছে, অথচ আয়লা অবলীলায় সেই দেয়াল ভেঙে তাকে কাঁদতে বাধ্য করেছিল।
আয়লা নামের সেই মেয়েটি তাকে সত্যি বদলে দিয়েছে। সে পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখটা মুছে নিল। ফোনটা পাঞ্জাবির পকেটে চালান করে দিয়ে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। কারণ এখন যদি কান্নাকাটি করে চোখের চারপাশ লাল করে ফেলে, তবে শ্বশুরবাড়ির সবার সামনে সেটা হবে চরম এমব্যারাসিং। রাতের শীতল বাতাসে সে তার উত্তপ্ত মস্তিষ্কটা কিছুটা শান্ত করার চেষ্টা করল। সামনের এই সুন্দর মুহূর্তগুলোতে কোনো বিষণ্নতার ছায়া পড়তে দেওয়া যাবে না, বিশেষ করে শ্বশুরবাড়ির আভিজাত্যের সামনে নিজেকে একদম নিঁখুত আর আত্মবিশ্বাসী রাখাটা এখন তার প্রধান কাজ। ভেতরে যাওয়ার সংকেতের অপেক্ষায় সে আবার সোজা হয়ে দাঁড়াল।
কারান আর মিরা ঝড়ের বেগে তারান্নুমের শয়নকক্ষে প্রবেশ করল। ঘরটা নিস্তব্ধ, বাতাসের ঝাপটায় কেবল জানালার সিল্কের পর্দাগুলো দুলছে। পড়ার টেবিলে একটি অর্ধসমাপ্ত ডায়েরি আর তার পাশেই অবহেলায় পড়ে আছে কয়েকটা অবশিষ্ট বিস্কুটসহ একটি খোলা প্যাকেট, শুধু নেই তারান্নুম। কারান এক মুহূর্তের জন্য চোখ জোড়া শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল, যেন হৃৎস্পন্দনের তীব্র বেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মিরার বুকের ভেতরটা তখন দুরুদুরু কাঁপছে। সে হন্তদন্ত হয়ে কারানের দিকে তাকিয়ে রুদ্ধশ্বাসে বলল, “ওয়াশরুমে… ওয়াশরুমে আছে হয়ত!”
সে দ্রুত স্নানঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে উঁকি দিল। কিন্তু সেখানেও কেবল শূন্যতা আর ঠান্ডা মেঝের নিস্পৃহ স্তব্ধতা। এবার মিরার অস্থিরতা ভয়ের চরম সীমায় পৌঁছে গেল। সে কম্পিত পায়ে ফিরে এসে কারানের সামনে দাঁড়াল, এবং নেতিবাচকভাবে মাথা নাড়ল। কারান কোনো সময় নষ্ট না করে দাদি আম্বিয়া বেগমের কক্ষের দিকে পা বাড়াল। সে জানে, আম্বিয়া যখন পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতে মগ্ন থাকেন, তখন তার চিত্তের একাগ্রতায় বিঘ্ন ঘটানো তিনি একেবারেই অপছন্দ করেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কারানের কাছে শিষ্টাচারের চেয়ে প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পাওয়াটা বেশি জরুরি।
সে আম্বিয়ার ঘরে ঢুকে পড়ল। আম্বিয়া জমাদ্দার তখন রেহালের ওপর ঝুঁকে তিলাওয়াত করছিলেন; হঠাৎ আদরের নাতিকে দেখে তার ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠলেও তিনি পাঠ থামালেন না। এই পারাটা শেষ করেই তিনি তার ‘মানিকচাঁদের’ সাথে কুশল বিনিময় করবেন। কারান মুখে কোনো বাক্য ব্যয় না করে পুরো ঘরটা তন্নতন্ন করে খুঁজল, এমনকি বেলকনির অন্ধকার কোণগুলোও বাদ দিল না। কারান যখন নিশ্চিত হলো তারান্নুম এখানেও নেই, তখন তার উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হলো। মিরা ছায়ার মতো তার অনুসরণ করছিল। তারা সচেতনভাবেই রান্নাঘরের দিকে গেল না, কারণ ফাতিমা তাদের এই হন্যে হয়ে খোঁজাখুঁজি দেখলে দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়বেন। তবে মিরা অত্যন্ত কৌশলে একবার উঁকি দিয়ে দেখে এসেছে। সেখানে ফাতিমা পরম উৎসাহে ফারহানের পছন্দের ট্রেডিশনাল ডিশ তৈরিতে ব্যস্ত। না, সেখানেও তারান্নুমের উপস্থিতি নেই।
পুরো বাড়ি খুঁজেও যখন তারান্নুমের দেখা মিলল না, মিরা নিজ কক্ষে ফিরে এসে অবসন্ন শরীরে বিছানার ওপর ধপ করে বসে পড়ল। তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। মেয়েটা কি তবে কর্পূরের মতো বাতাসে মিলিয়ে গেল?
কারানের ভেতরের অস্থিরতা মিরার চেয়েও বহুগুণ বেশি, কিন্তু সে তার কাঠিন্য বজায় রাখল। মিরার কাঁধে আশ্বাসের হাত রেখে সে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল, “ও হয়ত নদীর পাড়ে একাকী বসে আছে, দ্যাটস হার ইউজুয়াল স্পট। তুমি একদম প্যানিক করো না, মিরা। আমি আর ফারহান দেখছি। আর… বাড়ির কাউকে এই মুহূর্তে কিছুই জানিও না, অযথাই বাড়ির বয়স্করা হাইপারটেনশনে পড়বে।”
কারান দাঁতে দাঁত চেপে যোগ করল, “একবার শুধু ওকে খুঁজে পাই, বেয়াদব মেয়েটার গাল থাপড়ে আমি লাল করে দেব। এত বড়ো হয়েছে, অথচ এতটুকু সেন্স গ্রো করেনি যে এত রাতে বাইরে থাকাটা কতটা রিস্কি!”
মিরা অশ্রুভেজা চোখে কারানের সেই কঠোর অথচ শান্ত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে করুণ স্বরে শুধালো, “তরু ঠিক থাকবে তো, কারান? ওর কোনো বিপদ হয়নি তো?”
মিরার অশ্রুসজল চোখের মণিকোঠায় তখন জমাটবদ্ধ উৎকণ্ঠা আর এক চিলতে প্রত্যাশার দোলাচল। স্ত্রীর এমন বিপর্যস্ত কণ্ঠস্বর কারানের হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধল। পুরুষালি সেই কাঠিন্যের অন্তরালে মুহূর্তের জন্য এক পশলা দুর্বলতা উঁকি দিতে চাইল। কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সংযত করে নিল; কারণ সে জানে, এই ক্রান্তিলগ্নে সে যদি নিজের মানসিক স্থিরতা হারিয়ে ফেলে, তবে মিরাকে আগলে রাখার মতো আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।
তাছাড়া কারানের অবচেতন মন বারবার এই যুক্তিই দিচ্ছে যে, ভেঙে পড়ার মতো কোনো ঘটনাই এখনো ঘটেনি। তারান্নুমের কোনো ক্ষতি হতে পারে—এমন ভাবনাকে সে প্রশ্রয় দিতে নারাজ। অশুভ কোনো ছায়া তাকে স্পর্শ করতে পারে না, অন্তত কারান জীবিত থাকতে তা এক প্রকার অসম্ভব। তাই সে কেবল মাথা নাড়িয়ে নিঃশব্দে মিরাকে আশ্বস্ত করল।
তারপর দ্রুতপায়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসে ফারহানের দিকে না তাকিয়েই কারান আদেশের সুরে বলল, “তরুর লোকেশন ট্র্যাক কর! রাইট নাউ!”
এই বলেই কারান উন্মত্তের মতো নদীর তীরের দিকে দৌড়াতে শুরু করল।
বাইরে ফারহান তখন অস্থিরভাবে পায়চারি করছিল। কারানের কণ্ঠের সেই তীক্ষ্ণতা শুনে ফারহানের কলিজা যেন ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। সে বুঝতে পারল পরিস্থিতি মোটেও স্বাভাবিক নয়। তবুও অস্ফুট স্বরে নিশ্চিত হতে চাইল, “কুইন… কুইন কি ঘরে নেই?”
কারান তখন অনেকটা দূরত্ব অতিক্রম করে ফেলেছে। কিন্তু পেছনে ফারহানের সেই কম্পিত কণ্ঠ শুনে সে থমকে দাঁড়াল। অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে শুকনো গলায় উচ্চারণ করল, “তরু নির্ঘাত কোনো ট্রাবলে পড়েছে।”
কথাটা শেষ করেই কারান পুনরায় অন্ধকার নদীর ধারের দিকে দৌড়াতে শুরু করল। তার ওই একটি বাক্যই যথেষ্ট ছিল ফারহানের স্থিরতা কেড়ে নিতে। তার পায়ের তলার মাটি যেন সরে যাচ্ছে। তার সারা শরীর অসার হয়ে এলো, মস্তিষ্কে কেবল কারানের কথাটাই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, ‘তরু নির্ঘাত কোনো ট্রাবলে পড়েছে।’
সে কাঁপাকাঁপা হাতে ফোন বের করে দ্রুত গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম চেক করার চেষ্টা করল। কিন্তু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তার মুখ ছাইয়ের মতো সাদা হয়ে গেল।
শুকনো গলায় সে আর্তনাদ করে উঠল, “ওর ফোন অফ, কারান! সিগন্যাল পাওয়া যাচ্ছে না!”
“ড্যাম ইট! ফা’কিং শি’ট!” কারান হিংস্রভাবে গালি দিয়ে উঠল। তার দুশ্চিন্তা এখন ক্রোধে রূপান্তরিত হয়ে টগবগ করে ফুটছে। রাতের নিস্তব্ধতা চিরে তারা দুজনেই ছুটে চলল সেই অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে, যেখানে হয়ত কোনো আলো বা অন্ধকার তাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
রাত তখন সাড়ে নয়টা অতিক্রম করেছে। কালরাত্রির নিবিড় অন্ধকার যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে চারপাশকে। কারান মিরার সম্মুখে নিজের কাঠিন্য বজায় রাখলেও তার অন্তরাত্মা কুডাক দিচ্ছে। সে জানে, তারান্নুম স্বভাবজাতভাবে অত্যন্ত সহজ-সরল হলেও এতটা কাণ্ডজ্ঞানহীন নয় যে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া এই নিশীথ রাতে একা বাইরে অবস্থান করবে। সাধারণত সে নদীর তীরে আসে দুটি উদ্দেশ্যে—হয় ফারহানের সাথে দীর্ঘ আলাপে মগ্ন হতে, নয়তো অন্তরের গহীনে জমা কোনো ক্ষোভ প্রশমিত করতে। কিন্তু আজ এর কোনোটিই ঘটেনি। তবে মেয়েটা গেল কোথায়?
কারান আর ফারহান হন্যে হয়ে নদীর প্রতিটি বাঁক আর অববাহিকা তন্ন তন্ন করে খুঁজলো, কিন্তু কোথাও তার চিহ্ন মিললো না। ফারহানের সারা শরীর বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ধারা হয়ে নামছে। ওদিকে লেদার জ্যাকেটের নিচে কারানের শুভ্র শার্টটিও ঘামে ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। ফারহান ঘন ঘন শ্বাস ফেলে হাতের ঘড়িটা খুলতে খুলতে রুদ্ধকণ্ঠে বলল, “কারান, তুই… তুই এগুলো ধর। আমি নদীতে ঝাঁপ দিচ্ছি। এমনও তো হতে পারে, ও অসাবধানতাবশত ব্যালেন্স হারিয়ে পানিতে পড়ে গেছে!”
কারান সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশের ঘন অরণ্যের ওপর ফোনের উজ্জ্বল আলোকছটা ফেলছিল। চারদিকে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, আজ যেন সেই অন্ধকারের ঘনত্ব একটু বেশিই মনে হচ্ছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক পর্যন্ত থেমে গেছে, বাতাসও থমকে আছে। কারান দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “পা’গলের মতো কথা বলিস না। তরু সুইমিং-এ এই অঞ্চলে ফেমাস। শি ইজ আ প্রো, ইভেন ও বাচ্চাদের ট্রেইন করেছে। এমন কোনো চান্সই নেই যে ও নদীতে পড়ে যাবে আর তীরে উঠতে পারবে না।”
কিন্তু ফারহানের মস্তিষ্ক তখন যুক্তি মানার অবস্থায় নেই। সে শুষ্ক ওষ্ঠপ্রান্ত জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নিয়ে ধরা গলায় বলল, “তবুও, ইটস আ পসিবিলিটি! হতেও তো পারে ও পড়ে গেছে, আর পানির নিচে কিছুতে পা আটকে গেছে বলে উঠতে পারছে না। আই কান্ট টেক এনি রিস্ক, কারান। আমি নদীতে নামছি।”
কারান ফারহানের বিধ্বস্ত ও উৎকণ্ঠিত মুখাবয়বের দিকে তাকাল। যে যুবকটি সন্ধ্যার প্রাক্কালে প্রফুল্ল মনে সংগীতের মূর্ছনায় ডুবে ছিল, তার এই আকস্মিক বিপর্যয় কারানকেও ব্যথিত করল। সে ফারহানের কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বলল, “ওকে, তুই তাহলে এদিকটা চেক কর। আমি পাহাড়ের ওই ঢালটার দিকে যাচ্ছি। আর ফোনটা অন রাখিস।”
ফারহান দ্রুত মাথা নেড়ে সায় দিল। সে নদীর পাড়ে গোলাপের স্তবক আর শপিং ব্যাগটা রাখলো। পাশে নিজের ঘড়ি ও ফোনটা রেখে এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে শীতল জলরাশিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পানির ঝপাৎ শব্দটা রাতের নিস্তব্ধতা চিরে দিয়ে মিলিয়ে গেল।
অন্যদিকে কারান দ্রুতপদে সেই অভিশপ্ত পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হলো। যেখানে একদা তার চোখের সামনেই এক নৃ’শংস ব্যক্তি লোহার নখ দিয়ে একটি শিশুর হৃৎপিণ্ড উপড়ে ফেলার দুঃসাহস দেখিয়েছিল। জায়গাটা তাদের নিজস্ব বাগান থেকে বেশ দূরে এবং জনমানবহীন। কারান জানে না অবচেতন মন কেন তাকে এই অশুভ স্মৃতিবিজড়িত স্থানে টেনে আনছে, তবে অন্য সব জায়গা খোঁজা শেষ বলে এটাই এখন তার শেষ ভরসা।
কারান দৌড়াতে দৌড়াতে উচ্চস্বরে “তরু! তরু!” বলে ডাকছে। চারপাশের প্রকাণ্ড মেহগনি আর বটগাছগুলো অন্ধকারের মাঝে প্রেতাত্মার মতো দাঁড়িয়ে আছে, মনে হচ্ছে তারা কারানের প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করছে। কারান ক্লান্তিতে হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে থমকে দাঁড়াল। তার ফুসফুস হাপরের মতো ওঠানামা করছে, বাতাসের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে তার বুক।
দীর্ঘ দুই ঘণ্টার বিরামহীন অনুসন্ধান তাকে শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সে কম্পিত কণ্ঠে বিড়বিড় করল, ”কোথায় তুই, তরু? একটাবার… জাস্ট একবার তোর ভাইয়ের ডাকে রেসপন্স কর!”
ক্লান্তিকে উপেক্ষা করে সে পুনরায় সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে ফোনের আলো জ্বালিয়ে খুঁজতে শুরু করল।
“তরু, আর ইউ হিয়ারিং মি? তরু!”
তার চিৎকার পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এলো নিজেরই কণ্ঠস্বর, কিন্তু কোনো মানবীর সাড়া পাওয়া গেল না। তার পা আর চলতে চাইছে না, তবুও এক অদৃশ্য টানে সে সেই দুর্ভেদ্য অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যেতে থাকল।
বাড়ির অন্দরমহলে তখন মিরার স্নায়বিক অবস্থা চরম সীমায় পৌঁছেছে। বসার ঘরের কার্পেটের ওপর তার পায়চারি থামছেই না। দেয়ালে ঝোলানো ভিক্টোরিয়ান ধাঁচের ঘড়িটার পেন্ডুলামের প্রতিটি দুলুনি যেন তার হৃৎস্পন্দনের সাথে পাল্লা দিচ্ছে; সময়টা তার কাছে মহাকালের মতো দীর্ঘ হয়ে উঠেছে। সে জানে, কিছুক্ষণ পরেই ফাতিমা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসবেন, আম্বিয়াও নাতনীর খোঁজ করবেন—তখন সবার জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সামনে সে কী কৈফিয়ত দেবে? অস্থিরতা দমন করতে না পেরে মিরা কাঁপা হাতে কারানকে ডায়াল করল।
পাহাড়ের পাদদেশে তখন বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর অন্ধকারের রাজত্ব। ফোনের স্ক্রিনে মিরার নাম জ্বলজ্বল করতে দেখে কারান এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। নিজের ঊর্ধ্বশ্বাসে চলা ফুসফুসকে শান্ত করতে সে কয়েকবার বুক ভরে নিশ্বাস নিল। ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মিরার উৎকণ্ঠিত কণ্ঠ ভেসে এলো, “কারান, পেয়েছ? তরুকে কি পেয়েছ?”
কারান বিভ্রান্তভাবে নিজের ঘাড় চুলকালো। সত্যটা প্রকাশ করা মানেই এই মুহূর্তে পুরো পরিবারে দাবানল জ্বালিয়ে দেওয়া। তাই সে সিদ্ধান্ত নিল, অন্তত আজ সারা রাত সে আর ফারহান মিলে তন্নতন্ন করে খুঁজবে; এর মধ্যে সন্ধান না মিললে তবেই বাড়িতে জানাবে। কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব স্বাভাবিক করার ব্যর্থ চেষ্টা করে সে ছোট করে উত্তর দিল,
“হ্যাঁ।”
মিরা বুকের ওপর হাত রেখে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, যা ফোনের ওপাশ থেকেও শোনা গেল। “উফফ, শুকরিয়া! চিন্তায় চিন্তায় আমি অলমোস্ট পা’গল হয়ে যাচ্ছিলাম। মেয়েটাকে ফোনটা দাও তো, ওর দাঁত আজ আমিই ভেঙে দেব! আচ্ছা, কেউ কি এভাবে মানুষকে টেনশনে রাখে? জানো, একটু আগেই দাদিজান এসে তোমার খোঁজ করছিলেন। আমি কোনোমতে একটা এক্সকিউজ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছি। এখন তোমরা কোথায়? আর তারান্নুমকে দাও তো, আচ্ছা করে দু-কথা শুনিয়ে দিই।”
মিরার কথাগুলো কারানের কানে সিসার মতো ভারী ঠেকল। সে চোখ জোড়া শক্ত করে বন্ধ করে মিথ্যেটাকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য জাল বুনল। “তরু এখন ফারহানের সাথে আছে। ওদের ফিরতে একটু লেট হবে।”
মিরা এবার মৃদু হেসে অনুযোগের সুরে বলল, “বাড়িতে এলেই তো পারে! আমরা কি ওদের ডিস্টার্ব করব নাকি? বাড়ির সবাই কী পরিমাণ প্রফুল্লতা নিয়ে ওয়েট করছে জানো? ফুপি যে পরিমাণ আয়োজন করেছেন, সেটা দেখলে ওরা নিশ্চিত অবাক হয়ে যাবে।”
কারান এবার দ্রুত একটা কল্পিত চিত্রনাট্য সাজাল, “আসলে ফারহান ওকে নিয়ে একটা লং ড্রাইভে যেতে চাচ্ছে। প্রথমবার মিট করেছে, ওদের কিছুটা প্রাইভেসি দরকার। এই জয়েন্ট ফ্যামিলিতে ওরা ফার্স্ট টাইম কথা বলার মতো প্রপার কোনো স্পেস পাবে না, সো আই থিঙ্ক দিস ইজ বেটার।”
মিরার কণ্ঠে এবার কিছুটা দুষ্টুমির আমেজ ফুটে উঠল। “তা খারাপ বলোনি। কিন্তু বাড়িতে এত আয়োজন করল… আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে আর ফোন দিতে হবে না। ফার্স্ট টাইম দুই লাভবার্ডস একসাথে হয়েছে, নিশ্চয়ই খুব হ্যাপি ওরা? আমার ননদটা কি লজ্জায় টকটকা লাল হয়ে গেছে? যদিও আমার এই রোমান্টিক সিনটা দেখতে খুব ইচ্ছে করছে, কিন্তু আমি তো আবার খুব সুশীল ভাবি—তাই এবারের মতো না হয় দূরেই থাকি। আর তুমি ওখানে ওদের মাঝে কাবাব মে হাড্ডি হয়ে দাঁড়িয়ে আছো কেন? এতদিন পর এসেছে, একটু কিনা বউয়ের কাছে আসবে, তা না।”
কারান ম্লান হাসিতে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল। “আসবো, সোনা। তুমি বাড়িতে সবাইকে জানিয়ে দাও যে তরু আর ফারহান টাউনে যাচ্ছে, আমি ওদের সাথেই আছি। কেউ যেন প্যানিক না করে। আমারও ফিরতে একটু দেরি হতে পারে। আফটার অল, ভাই হিসেবে আমার একটা রেসপন্সিবিলিটি আছে। গভীর রাতে ওদের এভাবে একা ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। তাই তুমি খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো…”
মিরা হেসে সম্মতি জানাল।
“জি মহাশয়, অনেক দায়িত্ব আপনার! সাবধানে যেও। আর… মিস ইউ, হানি। অনেকদিন তোমার বুকে মাথা রেখে ঘুমানো হয় না, আই রিয়ালি মিস দ্যাট।”
“মিস ইউ টু, বেইবি। ওকে, রাখছি তাহলে।”
কলটা কেটেই কারান দ্রুত ফোনটা ডেনিম পকেটে গুঁজে রাখল। সে কানের নিচে চুলকাতে চুলকাতে শূন্য দৃষ্টিতে অন্ধকারের দিকে তাকাল। বিড়বিড় করে বলল, “মিথ্যে তো বলে দিলাম, কিন্তু মেয়েটা আদতে কোথায়? হে খোদা, ওকে দেরিতে পেলেও যেন সুস্থ অবস্থায় পাই।”
কারান আবারো তার ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে পাহাড়ের গহীনে অনুসন্ধানে মগ্ন হলো। বুনো লতা আর কাঁটাঝোপের আঘাতে তার হাত-পা ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে, কিন্তু সেই যন্ত্রণার চেয়েও বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছে একটা অজানা আশঙ্কা।
নদীগর্ভের শীতল ও অতলান্ত জলরাশিতে দীর্ঘক্ষণ অনুসন্ধান চালিয়েও ফারহান তারান্নুমের কোনো হদিস পেল না। হিমাঙ্ক ছোঁয়া জল থেকে উঠে আসতেই রাতের হিমেল হাওয়া তার সিক্ত শরীরে বিঁধতে লাগল। তার ধবল শুভ্র পাঞ্জাবিটি শরীরের সাথে লেপ্টে থাকায় জ্যোৎস্নার আলোয় সুঠাম ও পেশিবহুল অবয়বটি ভাস্কর্যের মতো মূর্ত হয়ে উঠেছে। সিক্ত কেশরাশি থেকে চুইয়ে পড়া জলকণাগুলো তার ফরসা গ্রীবায় মুক্তোর দানার মতো চিকচিক করছে। ফারহান নদীর তটরেখা থেকে নিজের ফোনটি কুড়িয়ে নিয়ে ত্বরিত গতিতে কারানকে ডায়াল করল।
“ব্রো, নদীর এই কূল থেকে ওই কূল পর্যন্ত তন্নতন্ন করে সার্চ করেছি। কোত্থাও আমার তারার চিহ্ন নেই!” ফারহানের কণ্ঠে এক বুক হতাশা আর ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
কারান পাহাড়ের ওপর থেকে উত্তর দিল, “আমিও পাচ্ছি না। শোন, তুই ইমিডিয়েটলি আমার গাড়ির কাছে যা। ড্যাশবোর্ড থেকে হাই-পাওয়ারড টর্চ লাইটটা নিয়ে পাহাড়ের দিকে আয়। আমি আমাদের বাগানের সীমানা পর্যন্ত সব খুঁজেছি। বাট দিস ইজ আ হিউজ এরিয়া, একা কাভার করা ইম্পসিবল। তুই আমার জিপিএস লোকেশন ট্র্যাক করলেই আমাকে পেয়ে যাবি।”
“আচ্ছা আচ্ছা, আসছি। শোন!” ফারহান থামল।
“হ্যাঁ, বল?”
“তারা… আমার তারা ঠিক থাকবে তো?” ফারহান বড়ো একটা ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করল।
কারান দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকাল। তার দুশ্চিন্তা এখন পাহাড়ের উচ্চতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। স্থির গলায় বলল, “ইন শা আল্লাহ।”
কলটা কেটে কারান আবার চলতে শুরু করল। ঝোপঝাড় সরিয়ে সামনে এগোতেই হঠাৎ পায়ের সাথে কিছু একটা বাধল। সে নিচু হয়ে ফোনের আলো ফেলতেই দেখল, ঘাসের ওপর একটা মেয়েদের জুতো পড়ে আছে। তার কাছে যেন এক মুহূর্তের জন্য সময় থমকে গেল। তার বাম হাতে থাকা গ্ল্যাডিওলাস ফুলের স্তবকটি অবহেলায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কারান হাঁটু গেড়ে বসে জুতোটা হাতে তুলে নিল।
“এটা তো ত…তরুর জুতো!” কারানের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হলো। এই জুতো জোড়া সে নিজেই তারান্নুমকে বিশেষ কোনো উৎসবের দিন পরিধান করার জন্য উপহার দিয়েছিল। উপহারটি পেয়ে সেদিন তারান্নুমের মুখে যে স্বর্গীয় হাসি ফুটেছিল, তা কারানের স্মৃতিপটে বিদ্যুতের মতো ঝলকে উঠল। এবার তার হৃৎপিণ্ড যেন কোনো বন্য ঘোড়ার মতো ছুটছে। উত্তেজনায় তার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠেছে, সারা শরীর ঘামে এমনভাবে ভিজেছে যেন সে এখনই বৃষ্টিতে ভিজে এলো।
সে আর কালক্ষেপণ করল না। উন্মত্তের মতো চারপাশ চক্কর দিতে লাগল। “তরু! বোন তুই কই? তরু! এই তরু!”
এতক্ষণের ক্ষীণ আশাটাও যেন প্রদীপ নেভার মতো নিভে গেল। কারানের চোয়াল নিয়ন্ত্রণহীনভাবে কাঁপছে, চোখের মণি অস্থির, আর সারা শরীরে অশুভ শিহরন খেলে যাচ্ছে।
“তরু, এই তরু! জাস্ট একবার রেসপন্স কর!”
খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ আবার হোঁচট খেয়ে সে উপুড় হয়ে ঘাসের ওপর পড়ে গেল। হাত থেকে ফোনটা কয়েক হাত দূরে ছিটকে পড়ল। কারান ব্যথায় কঁকিয়ে উঠে দ্রুত ফোনটা কুড়িয়ে নিল। কীসের সাথে বাঁধা পেল তা দেখতে সে ফোনের আলো ফেলল পেছনের ঝোপটার দিকে। মুহূর্তেই তার সারা শরীর পাথর হয়ে গেল। শ্বাস-প্রশ্বাস যেন স্তব্ধ হয়ে এলো।
নিবিড় অন্ধকার ভেদ করে মাটির নিচ থেকে একটি র*ক্তাক্ত ও ক্ষ’তবিক্ষ’ত হাত উপরের দিকে উত্তোলিত হয়ে আছে। আর সেই হাতের কবজিতে নীল রঙের একটি প্রসাধন সামগ্রী চাঁদের আলোয় বিচ্ছুরিত হচ্ছে। কারান পঙ্গুর মতো হামাগুড়ি দিয়ে হাতটির নিকটে গেল। বারবার ঢোক গিলছে সে, থুতনি কাঁপছে প্রবলভাবে। ওষ্ঠপ্রান্ত কামড়ে ধরে সে নিজের কান্না রুদ্ধ করার চেষ্টা করছে। হাতের সেই পরিচিত অলঙ্কারটি দেখে তার মস্তিষ্কের নিউরনগুলো আর্তনাদ করে উঠল—এটা তো কৌশিকার দেওয়া সেই বিশেষ ব্রেসলেট!
কারানের দুচোখ আসন্ন কোনো চরম বিপদের শঙ্কায় অশ্রুসজল হয়ে উঠল। বক্ষপিঞ্জরের ভেতরে হৃৎপিণ্ডটি যেন কোনো ম’রণপণ যুদ্ধে লিপ্ত। সে দ্রুত জিভ দিয়ে নিজের শুষ্ক ওষ্ঠ সিক্ত করে পা’গলের মতো দুই হাত দিয়ে মাটি খুঁড়তে শুরু করল। নখ দিয়ে মাটি সরাতে গিয়ে আঙুল ফেটে র*ক্ত বের হচ্ছে, কিন্তু সেদিকে তার ভ্রূক্ষেপ নেই।
তবে রুক্ষ মাটি ভেদ করা খালি হাতে সম্ভবপর ছিল না। আশেপাশে অনুসন্ধান চালিয়ে সে একটি ধারালো ও সরু কাঠের খণ্ড জোগাড় করল। এরপর সমস্ত শারীরিক শক্তি নিয়োগ করে সেই উত্তোলিত হাতটির চারপাশের মাটি সরিয়ে ফেলতে লাগল। পরিশ্রম আর উৎকণ্ঠায় তার সারা শরীর বেয়ে ঘামের বন্যা বয়ে গেলেও সে থামল না। ঘন ঘন তপ্ত নিশ্বাস ফেলছে শুধু।
গর্তের গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে একটা পরিচিত অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল। যখনই সেই চিরচেনা মুখাবয়বটি ধুলো আর র*ক্তের প্রলেপে আবৃত অবস্থায় কারানের দৃষ্টিগোচর হলো, তার কণ্ঠ চিরে বুকফাটা চিৎকার বেরিয়ে এলো, “তরুউউউউ!”
কারানের সেই আকাশফাটা আর্তনাদ অরণ্যের নিস্তব্ধতাকে চিরে খণ্ডবিখণ্ড করে দিল। তার কণ্ঠস্বরের সেই তীব্রতা শুনে মনে হচ্ছিল, ফুসফুস ছিঁড়ে এখনই র*ক্তবমি হবে তার। যদি আশেপাশে কোনো জনমানবের উপস্থিতি থাকত, তবে সেই চিৎকারে হয়ত তাদের শ্রবণেন্দ্রিয় বিকল হয়ে যেত। বৃক্ষশাখায় যদি সুপ্ত পাখিরা থাকত, তবে প্রাণের ভয়ে ডানা ঝাপটিয়ে দিগিবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে উড়ে পালাত।
কারানের সম্পূর্ণ অবয়ব থরথর করে কাঁপছে। সে দ্রুত কম্পিত হাতে ফোনটি তুলে ধরল, এবং কর্দমাক্ত, র*ক্তাক্ত সেই মুখশ্রীর ওপর থেকে আলুথালু চুলগুলো সরিয়ে দিল। আলোর রেখা পড়তেই যা দেখল, তাতে তার ধমনীর র*ক্ত হিম হয়ে এলো। মূহূর্তেই কারানের পৃথিবীটা দুলতে শুরু করল। এ কী বীভৎস দৃশ্য! তারান্নুমের সেই মায়াবী চেহারার কোনো অস্তিত্ব নেই; সম্পূর্ণ বিকৃত। অক্ষিকোটরে আজ আর সেই চঞ্চল চোখ দুটো নেই, সেখানে কালো র*ক্ত জমাট বেঁধে আছে। ঝুলে পড়া ঠোঁট আর ছিন্নভিন্ন চিবুক দেখে চেনার উপায় নেই যে এটিই সেই প্রাণচঞ্চল মেয়েটি। লাল শাড়িটি অবিন্যস্তভাবে শরীরে জড়ানো থাকলেও তা ছিন্নভিন্ন এবং র*ক্তে রঞ্জিত; তারান্নুমের শরীরটা সম্পূর্ণ ঢেকেও নেই।
কারানের হৃদয়ে প্রলয়ংকরী হাহাকার জেগে উঠল। বাঁধভাঙা অশ্রু তার গলা বেয়ে সেই মৃ’তদেহের ওপর আছড়ে পড়ল।
“তরুউউ! তরু, বোন… এই বোন, ওঠ! এই তো আমি, তোর ভাই!”
সে উন্মত্তের মতো মাটি খুঁড়ে তারান্নুমের পুরো দেহটা বের করে আনল। বোনের এই নারকীয় বিকৃতি দেখে কারানের মনে হলো তার শরীরের সমস্ত পেশি অবশ হয়ে আসছে। সে দ্রুত নিজের লেদার জ্যাকেটটা খুলে তারান্নুমের অর্ধন’গ্ন ক্ষ’তবিক্ষ’ত দেহে জড়িয়ে দিল। তারান্নুমের হাঁটুর নিচ থেকে একটি পা নৃ’শংসভাবে বিচ্ছিন্ন, সেখানে জমাটবদ্ধ কালো র*ক্ত একটা বীভৎস ক্ষ’তের সৃষ্টি করেছে। রেশমি চুলগুলো র*ক্তের সাথে মিশে আঠার মতো গুচ্ছ গুচ্ছ হয়ে কপালে লেপ্টে আছে। উদরদেশ বিদীর্ণ, সেখান থেকে কিডনি অপসারিত। বক্ষপিঞ্জর উন্মুক্ত, যেখানে স্পন্দিত হওয়ার মতো কোনো হৃৎপিণ্ড অবশিষ্ট নেই। তার শরীরের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশগুলোও আজ ছিন্নভিন্ন। দুগ্ধফর্সা সারা শরীরে অসংখ্য কামড় আর আঁচড়ের চিহ্ন বলে দিচ্ছে, শেষ নিশ্বাস ত্যাগের আগে কী ভয়ংকর হরর আর ট্রমা দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে। যে মেয়েটির গায়ে একটি ফুলের আঁচড় লাগলে সে পুরো বাড়ি মাথায় তুলত, আজ সে নিস্তব্ধ, নিথর।
কারান তারান্নুমের মাথাটি নিজের কোলে তুলে নিল। পা’গলের মতো বলতে লাগল, “লক্ষ্মী বোন আমার, এই তো আমি। তোর ভাই এসেছি রে। বোন ওঠ, প্লিজ একবার কথা বল! ও তরু?”
কারানের চোখের নোনা জল টপ টপ করে তারান্নুমের র*ক্তাক্ত গালে পড়ছে। সে তার মাথাটা ধরে মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে বলতে লাগল, “তরু, এই বোন ওঠ। তোকে আর কখনো ঝাড়ি দেব না। তোর সব কথা মন দিয়ে শুনবো। আই প্রমিস। তোর চোখ লাগবে? আমি দেব আমার চোখ। কিডনি লাগবে? আমার তো দুটো আছে, একটা তোকে দিয়ে দেব। এখন ওঠ! জাস্ট ওয়েক আপ, তরু! ওঠ না, তরু!”
কারান তারান্নুমের ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া গাল দুটো ধরে আলতো করে চাপড় দিতে দিতে চিৎকার করে উঠল, “এবার কিন্তু আমার পেশেন্স ভেঙে যাচ্ছে। উঠতে বলছি তোকে! তোর ভাই… ভাইকে দেখ একবার। এবার কিন্তু সত্যি সত্যিই থাপড়ে তোর দাঁত ফেলে দেব আমি! অনেক হয়েছে। তরু, এবার ওঠ! আমার র*ক্ত নিলে যদি তোর গাল দুটো আবার লাল হয়, আমি শরীরের শেষ বিন্দু পর্যন্ত তোকে নিংড়ে দেব, তবুও উঠে একবার অভিযোগ কর! ও তরু?”
কারান ডেকেই চলল, কিন্তু সেই নিস্পন্দ দেহ কোনো সাড়া দিল না। তারান্নুমের কণ্ঠস্বর চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেছে। অরণ্যের জমাটবদ্ধ অন্ধকার যেন কারানের এই শোকগাঁথায় মূক দর্শক হয়ে রইল। তার চোখের জল তারান্নুমের গ্রীবার ক্ষ’তগুলোতে বেয়ে গড়িয়ে নামছে। তার অবচেতন মন এখনো বিশ্বাস করতে চাইছে না যে, যে মেয়েটা চৌধুরি বাড়ির প্রাণ ছিল, আজ সে চিরস্থায়ী মৌনতায় লীন হয়ে গেছে।
এখন থেকে ওই বাড়িতে আর কোনো চিৎকার শোনা যাবে না। কারানকে জ্বালিয়ে মারার জন্য কেউ থাকবে না। কারান চাইলেও আর তাকে ‘বেয়াদব’ বলে ধমক দিতে পারবে না। মিরার সাথে সারারাত জেগে আর হাসাহাসি, খুনসুটি করবে না কেউ। ছোট্ট তুব্বার সাথে যে দুষ্টুমি করে সে পুরো বাড়ি মাথায় তুলত, সেই চপলতা আজ স্তব্ধ। দাদিজান আম্বিয়া বেগমের তিলাওয়াতের সময় পাশে বসে অহেতুক বিরক্ত করার সেই আদুরে আবদার আর কোনোদিন ফিরবে না। ফাতিমার আঁচলের নিচে মাথা গুঁজে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়া সেই মেয়েটি আজ আপন নীড় খুঁজে নিয়েছে।
কারান জিভ দিয়ে নিজের শুষ্ক ওষ্ঠ সিক্ত করল। সে এবার তারান্নুমের মুখের একদম কাছে মুখ নিয়ে এলো। একদম শান্ত, ভয়ার্ত কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল, “বোন, উঠবি না? জেদ করছিস? কারান চৌধুরীকে কাঁদাতে তোর কি একটুও করুনা হচ্ছে না? তোর ভাই আজ তোর কাছে ভিখারি হয়ে দাঁড়িয়েছে রে, তরু… জাস্ট এক চিমটি নিশ্বাস ভিক্ষা চাইছি তোর কাছে।”
বলতে বলতে সে তারান্নুমকে নিবিড়ভাবে বুকের সাথে চেপে ধরল। নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে আগলে রাখল সেই হাড়হিম দেহটাকে। তারপর অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে বিড়বিড় করল, “আমার কলিজাটা উপড়ে নিয়ে তুমি তোমার জান্নাত সাজালে, ইয়া রব? আমার সাজানো সাম্রাজ্য যে আজ শ্মশান হয়ে গেল!”
কারান তার কম্পিত আঙুল দিয়ে তারান্নুমের ওষ্ঠপ্রান্ত থেকে চুইয়ে পড়া গাঢ় র*ক্তটুকু পরম মমতায় মুছে দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু প্রতিবার মোছার পর নতুন করে গাঢ় লোহিত র*ক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। কারান ঠিক বুঝতে পারল না—এই র*ক্ত কি তার বোনের শরীরের গভীর কোনো ক্ষ’ত থেকে ক্ষরিত হচ্ছে, নাকি তার নিজের বিদীর্ণ আত্মার গহিন থেকে চুঁইয়ে পড়ছে? সে আলতো করে বোনের ললাট স্পর্শ করল। সেই ললাট আজ হিমাদ্রিকেও হার মানানো শীতলতায় আচ্ছন্ন। কারান রুদ্ধকণ্ঠে ফিসফিস করে বলল, “তোর ভাই আজ জীবনের সমীকরণে খুব বাজেভাবে হেরে গেল রে, তরু।”
কারানের হাত দুটি এখন কাদা, মাটি আর তাজা র*ক্তে একাকার। শার্টের শুভ্রতা ঢেকে গেছে বোনের জমাটবদ্ধ র*ক্তে, তবুও তার ভেতরের সেই দাহ প্রশমিত হচ্ছে না। সে পুনরায় তারান্নুমের মুখটা নিজের চোখের সামনে তুলে আনল। অবিন্যস্ত কেশরাশি দুহাতে সরিয়ে অপলক চেয়ে রইল। তার কণ্ঠস্বর ক্রমশ জড়িয়ে আসছে, শব্দরা যেন আজ কারানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। তার মনে হচ্ছিল বুকের ওপর হিমালয় সদৃশ কোনো ভার চেপে বসেছে, যা তার শ্বাস-প্রশ্বাসকে স্তব্ধ করে দিতে চাইছে। শরীরের তাপমাত্রা হু হু করে বেড়ে তীব্র জ্বরের অনুভূতি জাগছে।
কারান আঙুলের ডগা দিয়ে বোনের বিকৃত মুখাবয়বটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছিল। এই বোনটি আর কোনোদিন তাকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করবে না, কোনো আবদার বা অভিযোগ নিয়ে তার পথ আগলাবে না। মেয়েটি বয়সে বড়ো হলেও যেন চিরকাল এক অবুঝ শিশু হয়েই রয়ে গেল। ঠিক শিশুদের মতোই সবাইকে ফাঁকি দিয়ে সে আজ পালিয়ে গেল—মা ফাতিমা, ভাবী মিরা, পরম শ্রদ্ধেয় নানি আম্বিয়া বেগম আর ছোট্ট তুব্বাকে অতলান্তিক শূন্যতায় নিমজ্জিত করে সে আজ একটা অজানা দেশে পাড়ি জমিয়েছে। আর ফারহান? তার প্রাণের চেয়েও প্রিয় সেই মানুষটিকেও সে একলা ফেলে চলে গেল।
কারানের মনে এক বিদারক চিন্তার উদয় হলো—মৃ’ত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে তারান্নুম নিশ্চয়ই তার পরিবারের সবার মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠতে দেখেছে। সে কি কারানকে শেষবারের মতো ডেকেছিল? মনে মনে কি বলেছিল, ‘ভাই, তুমি তোমার বোনকে এই হিংস্র নেকড়েদের মাঝে একা ফেলে কেন দুবাই গেলে?’ কারানের প্রতি কি তার এক আকাশ সমান অভিযোগ জমা হয়ে আছে? এসব দুঃসহ চিন্তায় কারানের চোখের অশ্রুও শুকিয়ে গেল। সে এখন একটা জীবন্ত মূর্তির মতো স্থির। তার নিজের ঠোঁট দুটোও এখন ফাঁক হয়ে আছে, ঠিক যেমন তারান্নুমের সেই ক্ষ’তবিক্ষত ও র*ক্তাক্ত ঠোঁট দুটো অবশ হয়ে পড়ে আছে। সে স্থির নজরে তাকিয়ে রইল তার অনিন্দ্যসুন্দরী বোনটির ধ্বংসাবশেষের দিকে।
ঠিক সেই মুহূর্তে বনের নিস্তব্ধতা চিরে ফারহানের ক্লান্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “কারান! পুরো জঙ্গল চষে ফেলেছি, কোথাও কুইনকে…”
বাকি কথাটুকু আর ফারহানের মুখ দিয়ে বেরোল না। তার হাত থেকে সেই সাধের শপিং ব্যাগ আর লাল গোলাপের স্তবকটি ধপ করে ধূল ধূসরিত মাটিতে পড়ে গেল। কারান তার স্থির, র*ক্তবর্ণ চোখ জোড়া তুলে ফারহানের দিকে তাকাল। ফারহানের সারা শরীরে যেন এক লহমায় হাজার ভোল্টের বিদ্যুতের শক লাগল। সে কতক্ষণ ওভাবে স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তার কোনো হিসেব নেই। হয়ত আধঘন্টা!
ফারহান যখন কিছুটা সংবিৎ ফিরে পেল, সে টলটলায়মান পায়ে নিচু হয়ে ফুলের তোড়া আর ব্যাগটি তুলে নিল। অতি কষ্টে এক ঢোক গিলে সে কারানের পাশে বসে পড়ল। তার হাতের টর্চলাইটটি পাশে মাটিতে রাখতেই তারান্নুমের ছিন্নভিন্ন দেহটি আলোর তীব্রতায় স্পষ্ট হয়ে উঠল। নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস! এই কি তবে তাদের প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ? ফারহান অনুভব করল, তার ‘কুইন’ আক্ষরিক অর্থেই অপার্থিব রূপসী ছিল। সে তারান্নুমের শরীরের দিকে তাকাল। কারানের কৃষ্ণবর্ণ জ্যাকেটের নিচে সেই লাল শাড়ির ছিন্ন অংশগুলো বিদ্রূপের মতো দেখা যাচ্ছিল। অবিন্যস্ত চুলের গভীরে ফারহানের দেওয়া সেই হীরের নেকলেসটি র*ক্তের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে।
কারান নিথর হয়ে ফারহানের দিকে চেয়ে রইল। ফারহানও স্তব্ধ হয়ে কারানের দিকে তাকাল। কারানের গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুর রেখাগুলো গালের সাথে শুকিয়ে গেছে। এই বিদীর্ণ মুহূর্তে বন্ধুকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা কারানের অভিধানে নেই।
ফারহান তার শুষ্ক ঠোঁট জোড়া অতি কষ্টে নাড়িয়ে অস্ফুট স্বরে কেবল দুটি শব্দ উচ্চারণ করতে পারল, “আ…আমার কু…কুইন?”
কারান অত্যন্ত ধীরলয়ে, যান্ত্রিকভাবে মাথা ওপর-নিচ করল। ফারহানের ওষ্ঠপ্রান্তে এক চিলতে বিষণ্ণ, ম্লান হাসি ফুটে উঠল; আজ ফারহানের হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, আছে কেবল এক বুক হাহাকার। সে অতি সন্তর্পণে শপিং ব্যাগ থেকে উজ্জ্বল রক্তিম বেনারসি ওড়নাটি বের করল। বাতাসের ঝাপটায় ওড়নার সোনালি জরির কাজগুলো ফ্যাকাশে চাঁদের আলোয় ঝিকমিকিয়ে উঠল। তার আঙুলগুলো থরথর করে কাঁপছে, তবুও পরম মমতায় সেই রেশমি ওড়নাটি তারান্নুমের গলার ক্ষ’তগুলো আড়াল করে জড়িয়ে দিল। সে তারান্নুমের কোমল ডান হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিল। যদিও তাকে আর ‘হাত’ বলে সংজ্ঞায়িত করা যায় না; পাশবিক নির্যাতনে হাতুড়িপেটা মাংসপিণ্ডের মতো র*ক্তাক্ত এক দলা মাংস শুধু। সেই অসাড় হাতের তালুর মাঝে ফারহান পরম যত্নে লাল গোলাপের তোড়াটি গুঁজে দিল। কিন্তু নিস্তেজ হাতটি মাধ্যাকর্ষণ মেনে পুনরায় ঘাসের ওপর লুটিয়ে পড়ল, পাশে পড়ে রইল নিষ্পাপ ফুলের তোড়াটি।
ফারহান তারান্নুমের কপালে ও গালে আলতো করে আঙুল বুলিয়ে দিল। তার দৃষ্টিতে এক ঘোর লাগা আবেশ। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করল, “কী অপূর্ব তুমি! হায় আল্লাহ, তুমি তো আজ আমার জান নিয়ে ছাড়বে, তারা। মনে হচ্ছে ব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাটা আমার এই নগণ্য দুই হাতে বন্দি হয়ে আছে!”
কারান কেবল প্রস্তরমূর্তির মতো তার বন্ধুর এই উন্মাদনা অবলোকন করছিল। এই দিনটি তো ফারহানের জীবনের সবচেয়ে মহিমান্বিত হওয়ার কথা ছিল, তাই না? অথচ নিয়তি তাকে আজ এই বিয়োগান্তক মঞ্চে এনে দাঁড় করাল।
ফারহান তারান্নুমের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ল। তার ললাটে এক দীর্ঘ, পবিত্র চুম্বন একে দিল। তারপর নিজের কাঁপাকাঁপা হাতটি তারান্নুমের এক গালে রেখে, একদম ওষ্ঠের সমান্তরালে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “কুইন? এই কুইন? শুনতে পাচ্ছ? আজ আমাদের এনগেজমেন্ট, আমাকে আংটি পরিয়ে দেবে না? এভাবে নিস্পৃহ হয়ে শুয়ে আছো কেন, কুইন? খুব টায়ার্ড? আমার চেয়েও বেশি? হুম?”
ফারহানের কণ্ঠস্বর ক্রমশ ভেঙে আসছিল। সে ব্যাকুল হয়ে ডাকতে লাগল, “কুইন ওঠো, আমি এসেছি। কথা বলো আমার সাথে।” এরপর কারানের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আধো-পা’গলের মতো বলল, “ওকে উঠতে বলছিস না কেন, ইয়ার? তুই ঠিকই বলতিস, মেয়েটা আসলেই বড্ড অবাধ্য! ও নাকি আমাকে সামনাসামনি দেখার জন্য ডেস্পারেট ছিল। অথচ এখন আমি সামনে, আর ও চোখই মেলছে না!”
হঠাৎ ফারহানের দৃষ্টি স্থির হলো তারান্নুমের চোখের সেই শূন্য কোটরে। মুহূর্তেই তার স্মৃতিপটে ভেসে উঠল অতীতের এক চঞ্চল কথোপকথন:
“না না, আপনার এইসব ভুজুংভাজুং কথা শুনতে চাই না। সবকিছু পছন্দ বললে তো হইবে না। আমার কোন জিনিসটা আপনার সবচেয়ে বেশি প্রিয়—ওইটা জলদি জলদি কন, মিস্টার?”
ফারহান সেদিন তারান্নুমের সেই উচ্ছ্বল কণ্ঠ শুনে মৃদু হেসে উত্তর দিয়েছিল, “তোমার ওই মায়াবী বাদামি চোখ দুটো। ওই গভীর চোখে হারিয়ে যাওয়ার মতো রোমান্টিক আর কিছু পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।”
ফারহান শুষ্ক জিহ্বা দিয়ে নিজের ওষ্ঠ সিক্ত করল। অত্যন্ত ধীরগতিতে তার কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো সেই চোখের শূন্য গর্তের কাছে নিয়ে গেল।
“কুইন, তোমার ফয়সালের ছেলে কিন্তু ঠিকই হাজির হয়েছে, দেখো। তুমি চোখ মেলতে পারছ না? নো প্রবলেম, আমার চোখ দিয়েই না হয় আমাকে দেখো! এই তো আমি চলে এসেছি। আই অ্যাম রিয়ালি সরি সোনা, আমি কি খুব বেশি দেরি করে ফেললাম? আমাকে শাস্তি দেবে না? দাও, আমাকে যা খুশি পানিশমেন্ট দাও! খুব কঠিন শাস্তি দিবে, বুঝেছ? এই গ্লিমার? আর ইউ লিসেনিং টু মি?”
ফারহান তারান্নুমের র*ক্তাক্ত, অসাড় হাতটি তুলে নিজের গালে ছোঁয়াল। সে টেরও পেল না কখন তার চোখ থেকে তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সেই অশ্রুর ফোঁটা তারান্নুমের হাতের ক্ষত বেয়ে নামতে শুরু করল। ফারহান ভ্রূ কুঁচকে নিজের দামি পাঞ্জাবির কোনা দিয়ে তারান্নুমের হাতটি সযত্বে মুছে দিল। যেন তার চোখের নোনা জলও তারান্নুমের এই পবিত্র র*ক্তাক্ত হাতকে অপবিত্র করতে না পারে।
হঠাৎ তার মনে পড়ল সেই বিশেষ আংটির কথা। পকেট থেকে মখমলের বাক্সটি বের করল। ভেতরে থাকা হীরক খচিত আংটিটি চাঁদের আলোয় অলৌকিক আভা ছড়াচ্ছিল। সেটি উন্মোচন করে তারান্নুমের র*ক্তমাখা আঙুলে আংটিটি পরিয়ে দিল। কারানের দিকে না তাকিয়েই সেই আঙুলটি জড়িয়ে ধরে করুন হাসি হেসে ফারহান বলল, “তুই ঠিকই বলেছিলি কারান, আমার বউটা সত্যিই অসম্ভব সুন্দরী! ওর আঙুলগুলো দেখেছিস, কী নিঁখুত আর শিল্পীসুলভ!”
বলতে বলতে সে সেই আংটিটির ওপর দীর্ঘ এক চুম্বন লেপন করল। কারান কেবল ফারহানের এই নিস্তেজ, ভঙ্গুর ভালোবাসা দেখে যাচ্ছিল। তার ভেতরকার সমস্ত আবেগ আজ ভস্মীভূত; সে কেবল এক প্রাণহীন পাথর।
ফারহান পুনরায় আর্তনাদ করে উঠল, “কুইন? দোহাই লাগে তোমার, একটা বার কথা বলো!”
তারান্নুমের সেই নিস্পন্দ র*ক্তাক্ত হাতটি নিজের বুকের বাম পাশে, যেখানে হৃৎপিণ্ড ধকধক করছে, সেখানে চেপে ধরে ফারহান পুনরায় প্রলাপ বকতে শুরু করল, “তারাজান, তাকিয়ে দেখো, তোমার সেই পছন্দ করে দেওয়া শ্বেতশুভ্র পাঞ্জাবিটা পরেই আজ আমি উপস্থিত হয়েছি। বলবে না আমায় কেমন লাগছে? ওই যে তুমি বলতে না—ঝাকানাকা, চরম, সেই লাগছে! আরও কী কী যেন বলতে, আজ কিচ্ছু বলবে না?”
ফারহান তার মুখটা তারান্নুমের কানের কাছে নিয়ে গেল, “আমার হৃদয়স্পর্শী? জবাব দাও?”
“মৃন্ময়ী? আর কতক্ষণ এই অভিমানের আবরণে নিজেকে লুকিয়ে রাখবে? একটু দেরি করে এসেছি বলে কি কেউ এভাবে কথা না বলে থাকে? আর কখনো এমন হবে না। প্রমিস করছি, প্রিয়তমা। শুনছ তুমি?”
সে তারান্নুমের গালের ক্ষতবিক্ষত চামড়ায় নিজের চিবুক ঘষল। “নিয়ামা? আমার ওপর রহম করো, একবার কথা বলো!”
“হেই, আমার অক্সিজেন? বিশ্বাস করো, আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তোমাকে ছাড়া। একটু কথা বলো গো, অভিমানিনী?”
রাতের দ্বিপ্রহর ঘনিয়ে এলো। বনের সেই নিস্তব্ধ প্রহরে কেবল ফারহানের হাহাকার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। কারান এতক্ষণ পাথরের মতো বসে ছিল, কিন্তু ফারহানের এই মানসিক বিপর্যয় তাকে আর স্থির থাকতে দিল না। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর, কারান তার অবশ হয়ে আসা হাতটি ফারহানের কাঁপতে থাকা পিঠে রাখল। পাথরচাপা কষ্টের অবাধ্য স্রোত ঠেলে সে অত্যন্ত ক্ষীণ ও ভগ্ন কণ্ঠে উচ্চারণ করল, “তরু নেই, ফারহান… আমাদের তরু আর নেই।”
কথাটি উচ্চারণের সাথে সাথে কারানের কণ্ঠনালী যেন সহস্র কাচের টুকরোয় বিদীর্ণ হয়ে গেল। তার চোখের কোণ বেয়ে পুনরায় তপ্ত এক ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফারহান যদি কারানকে এমন জরাজীর্ণ ও বিপর্যস্ত অবস্থায় দেখত, তবে সে নিজেই হয়ত কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যেত। বিগত দুই দশকে সে কখনো এই হিমশৈলতুল্য মানুষটিকে এতটা ধূলিসাৎ হতে দেখেনি।
কারান চৌধুরীর যে পৌরুষ আর গাম্ভীর্যের কথা সবার জানা, আজ তা কেবল এক পশলা করুণার স্রোতে ভাসছে। শৈশবের সেই আট বছরের কারান থেকে আজকের এই ত্রিশোর্ধ্ব কারান—ফারহান জানত এই মানুষটির হৃৎপিণ্ড গ্রানাইট পাথরে গড়া। কিন্তু আজ সেই পাথরও বিগলিত।
কারানের সেই করুণ কণ্ঠস্বর ফারহানের মোহগ্রস্ত মস্তিষ্ককে সজোরে ধাক্কা দিল। এতক্ষণের সেই অলীক কল্পনা আর ঘোর এক নিমিষেই কাচের দেয়ালের মতো ভেঙে পড়ল। এবার ফারহানের চোখের পানি আর কোনো বাধা মানল না। সে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে কারানের বুকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করে উঠল, “মিথ্যা কেন বলছিস তুই? তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?
ও জাস্ট ঘুমিয়ে আছে। এক্ষুণি উঠে পড়বে ও। সরে যা তুই এখান থেকে!”
ফারহান ঝটপট কারানের কোল থেকে তারান্নুমের সেই ক্ষতবিক্ষত মাথাটি নিজের কোলে টেনে নিল। অবিন্যস্ত চুলের গভীরে আঙুল চালিয়ে সে ডুকরে কেঁদে উঠল, “এই কুইন, এই তারা… আমার আকাশের উজ্জ্বল ধ্রুবতারা, লক্ষ্মীটি এবার উঠে পড়ো! জাস্ট একবার উঠে কারানকে দেখিয়ে দাও যে তুমি কেবল প্র্যাঙ্ক করছিলে। তারা, উঠছ না কেন? আমার কিন্তু এবার সত্যি রাগ হচ্ছে। আমার ব্রেদিং প্রবলেম হচ্ছে, তারা, ওঠো! তুমিই তো বলতে যে আমাকে ছাড়া তোমার এক মুহূর্ত চলে না, তবে আজ কেন এই অন্ধকার নরকে আমাকে একা ফেলে তুমি মাটির গহীনে চিরস্থায়ী ঘর বাঁধতে যাচ্ছ? এই তারা, ওঠো না! আমার কলিজার ভেতরটা আজ পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে, তুমি কি সেই দহন আর পোড়া গন্ধ পাচ্ছ না?”
ফারহানের এই হাহাকার আর উন্মাদনা দেখে কারান তাকে জাপটে ধরতে চাইল, তাকে এই দুঃসহ বাস্তবতার মুখোমুখি করতে চাইল। কিন্তু ফারহান কারানের হাত সজোরে ছিটকে সরিয়ে দিয়ে আর্তনাদ করে উঠল, “খবরদার! আমার কুইনের কিচ্ছু হয়নি। তুই একদম আমাকে আজেবাজে বুঝিয়ে ম্যানিপুলেট করতে আসবি না। তারা, ও তারা, ওঠো, আমাকে ঝাড়ি দাও। ও গোবরচারিনী, উঠছ না কেন? তোমার সবথেকে অপছন্দের নামে ডাকলাম তো, এখন তো উঠে এসে আমাকে বকবে, রাগ করবে না? আচ্ছা, একটু ফ্লার্টিং করলে কি তুমি উঠবে? বলো না সোনা, ঠিক কী করলে তুমি এই চিরনিদ্রা ভেঙে ফিরে আসবে আমার কাছে?”
ফারহানের শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে কান্নায়। কারানেরও নিজের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছে। সে থরথর করে কাঁপতে থাকা ফারহানের কাঁধে হাত রেখে করুণ স্বরে ডাকল, “ফারহান… ফারহান, আমার দিকে তাকা!”
ফারহানের প্রতিটি কোষ যেন অস্বীকার করছিল এই নিষ্ঠুর সত্যকে। সে তারান্নুমের শীতল দেহটাকে ঝাঁকাচ্ছে, ডাকছে, অনুনয় করছে, যেন তার প্রেমের শক্তিতেই প্রকৃতির নিয়ম ভেঙে তার ‘কুইন’ ফিরে আসতে পারে। কারান বুঝতে পারল, এই প্রলাপ বন্ধ না করলে ফারহানের মস্তিষ্ক এই ভয়াবহ চাপের মুখে বিদীর্ণ হয়ে যাবে।
“ফারহান!” কারান গগণবিদারী চিৎকার করে ফারহানের গালে সপাটে একটা চড় বসিয়ে দিল। সেই শব্দের প্রতিধ্বনি পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এলো। ফারহানের ফরসা গালে কারানের পাঁচ আঙুলের রক্তিম চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠল। ফারহান এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল, তার চোখের মণি কাঁপছে। সে এক অসহায় বালকের মতো কারানের দিকে তাকাল।
কারান ভাঙা গলার প্রতিটি বর্ণে বিষাদ ঢেলে দিয়ে বলল, “কেন রিয়েলাইজ করতে পারছিস না তুই? ত…তরু, আমার আদরের বোনটা আজ সত্যিই আকাশের তারা হয়ে গেছে। ও আর ফিরে আসবে না। গন, ফারহান। শি ইজ গন ফরএভার!”
এই চূড়ান্ত নির্দয় সত্যটা এবার তীরের মতো ফারহানের হৃৎপিণ্ড ভেদ করে গেল। ফারহান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে কারানের বুক জাপটে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
“ভাই, এক কাজ কর, তুই আমাকে মে’রে ফেল। অথবা আমি নিজেই নিজেকে শেষ করে দিই। আমার… আমার বুকে অসহ্যরকম পেইন হচ্ছে রে। আই কান্ট টেক দিস এনিমোর! আমি কী করব, কারান? আমার কী করা উচিত? আমি ম’রে যাই… আমাকে জাস্ট ফিনিশ করে দে। আমার… আমার কুইন একা কীভাবে ওতটা মাটির নিচে ঘুমাবে? ওর দম বন্ধ হয়ে আসবে না?”
কারান আর ফারহানকে আলিঙ্গন করল না; তার দৃষ্টি তখন দিগন্তরেখার কোনো এক বিন্দুতে স্থির। দুই নয়ন বেয়ে কেবল নোনা জল বিরামহীনভাবে গড়িয়ে পড়ছে। ফারহানের কাঁধে এক হাত রেখে কারান অস্ফুট এক ঢোক গিলল। তার ভেতরে তখন প্রশান্ত মহাসাগরের সমান হাহাকার। ফারহান পুনরায় কারানকে ছেড়ে তারান্নুমের বিকৃত দেহটাকে নিজের বুকের পাঁজরে পিষ্ট করতে চাইল।
“তারাজান, ও তারা, তারাসোনা আমার… আমাকে এভাবে এই নির্দয় পৃথিবীতে পা’গল করে রেখে চলে যেও না! দেখো তারা, আমি সত্যিই পা’গল হয়ে যাচ্ছি। এই তুমি না বললে আমি সামনে এলে ‘ভালোবাসি’ বলবে? আমি এসেছি প্রিয়তমা, এবার বলো? আমার তারা, আমার কুইন? এই কারান, বল না—ওই নিষ্ঠুর আকাশ কি এতটাই কাঙাল হয়ে গিয়েছিল যে আমার জ্যান্ত তারাটাকে হাতের মুঠো থেকে এভাবে ছিনিয়ে নিতে হলো?”
সে তারান্নুমের কপালে কপাল ঠেকিয়ে বিলাপ করতে লাগল, “আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি, অনেক ভালোবাসি কুইন। আই হ্যাভ নো ওয়ার্ডস টু এক্সপ্রেস হাউ মাচ আই লাভ ইউ। আমাদের তো এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে, তারা। আমায় বিয়ে করবে না? মিথ্যাবাদী! তুমি একটা মিথ্যেবাদী! তুমি কথা দিয়ে কথা রাখছ না। একবার তাকাও, দেখো তোমার এই উন্মাদ ফারহানকে। ও আল্লাহ, আমি আমার জ্যান্ত কলিজাটাকে কোন মাটিতে পুঁতব? আমি… আমি তোমায় আমার বুকের বাম পাশে কবর দেব! আমাকে অন্ধ করে দাও খোদা, তবুও একবার ওকে কথা বলতে দাও!”
দীর্ঘক্ষণ এই হৃদয়বিদারক আহাজারির পর ফারহান হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। চারপাশের অরণ্য তখন ভৌতিক নীরবতায় নিমজ্জিত। কারানও স্তব্ধ। দুজনই অপলক দৃষ্টিতে ওই নিস্পন্দ মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে রইল। ঝাউগাছের পাতার মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতল বাতাসে ফারহানের সিক্ত শরীর শিউরে ওঠার কথা ছিল, কিন্তু সে আজ সমস্ত জাগতিক অনুভূতির ঊর্ধ্বে। কারানও এখন একটা অনুভূতিহীন প্রস্তরখণ্ড।
এক ঘণ্টা পর ফারহান কারানের দিকে তাকিয়ে একদম শান্ত, হিমশীতল গলায় বলল, “তোকে একটা গুরুদায়িত্ব দিচ্ছি, কারান। আমাকে আর তারাকে একসাথে কাফনে জড়িয়ে একই কবরে শুইয়ে দিবি। কথা দে!”
ফারহানের দীর্ঘশ্বাসগুলো এতই অনিয়মিত যে মনে হচ্ছে তার ফুসফুস যেকোনো মুহূর্তে কাজ করা বন্ধ করে দেবে। নাসারন্ধ্রে জমানো জল আর অশ্রুর লোনা স্রোতে ফারহানের সেই রাজপুত্রসম মুখটা এখন সিঁদুরের মতো লাল হয়ে আছে, যা তাকে এক মুমূর্ষু রোগীর মতো দেখাচ্ছে। কারান নির্বাক দৃষ্টিতে তার বন্ধুর দিকে তাকিয়ে রইল। তার কি সত্যিই তার পরম বন্ধুকে এই ম’রণ-কামনায় সায় দিয়ে উপকার করা উচিত?
Tell me who I am 2 part 19
কারানের কাছ থেকে কোনো প্রত্যুত্তর না পেয়ে ফারহান নিজেই কারানের হাতটা খপ করে ধরল, যেন নিজের ওপর রেখে তাকে কসম করাতে পারে। কিন্তু সে কারানের হাতটি নিজের হাতের ওপর স্থাপন করার আগেই, নিস্তব্ধ অরণ্যের কিছুটা দূর থেকে এক অতি পরিচিত, কম্পিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “মানিকচাঁদ!”
অন্ধকার ভেদ করে হারিকেন হাতে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং আম্বিয়া জমাদ্দার। বৃদ্ধার কাঁপা হাত থেকে হারিকেনটা ধপ করে পাথরের ওপর পড়ে গেল। কাচের টুংটাং শব্দে নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে গেল। হারিকেনের অন্তিম শিখার আলোয় দেখা গেল, আম্বিয়া জমাদ্দারের কোঁচকানো গাল বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ সেই র*ক্তাক্ত লাল শাড়ি জড়ানো নিথর দেহটির দিকে।

Ai part ta sotti heart touching chilo
Akhono toh onk kichu jante parlam er pore ki kono part nei please next part ta din🙏🙏
Khub pochondo hoyeche eta .
তরুকে এভাবে মৃত্যু না দিলেও পারতেন আর এখনো অনেক কিছু জানার বাকি প্লিজ তারাতাড়ি পরের পর্ব দেন প্লিজ প্লিজ প্লিজ । তরুকে এভাবে কেনো মৃত্যু দিলেন আহারে বেচারা ফারহান 🥹🥹🥹🥹😅
Ai part ta pore to ame tromai chila gaselam ato kanna korse ji jor choila aschilo 3 din por thik hoise . Writer ata na korlao parto atota nisthur kivabe hoilo .