Home না চাইলেও তুমি শুধু আমারই না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৮

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৮

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৮
মাইশা জান্নাত নূরা

—”আপনার কি মনে হয় আমরা সবসময় কোনো না কোনো গোল পাঁ*কিয়েই থাকি?”
কাশি থামার পর তেজ স্বাভাবিক হয়ে প্রশ্নটা করলো ইলমাকে। আর ইলমা স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বললো…
—”এই যে আপনি আর নির্ঝর মিলে আমাকে ও অনুকে নীরার কাছে থেকে সরিয়ে আনলেন এরপর কফি বানানো, আরো নানান বাহানা দেখিয়ে রুমে পাঠিয়ে দিলেন এগুলা তো এমনি এমনি করেন নি তাই না! কোনো একটা বিষয় আমাদের থেকে অথবা পরিবারের সবার থেকে গোপন করার জন্যই করেছেন।”
তেজ উঠে দাঁড়িয়ে বললো….
—”আপনার ভিতর থেকে সব বিষয়ে অতিরিক্ত সন্দেহ ও প্রশ্ন করার স্বভাব কি কখনও দূর হবে না ইলমা?”
—”সন্দেহ থেকে কেউ এতোটা মিল রেখে কথা বলতে পারে বলে আপনার মনে হয় তেজ?”
তেজ ইলমার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললো….

—”মানে?”
—”মানে টা খুব সহজ। আপনার কথামতো তখন আমি অনুকে নিয়ে রুমে ঠিকই গিয়েছিলাম কিন্তু আমার খচখচানি স্বভাবটা আমায় রুমে স্থির থাকতে দেয় নি। একটু পর বের হতেই শুনলাম আপনি ডাক্তার আঙ্কেল ও আপনার বাবাকে বললেন নির্ঝর কোথায় তা আপনি জানেন না। অথচ আপনি নিজেই নির্ঝরকে তার রুমে গিয়ে বিশ্রাম নিতে বলেছিলেন। এখন কি বলবেন এসবও আমি মিথ্যা বলছি?”
তেজ বুঝতে পারলো ইলমার থেকে লুকানোর চেষ্টা করে আর কোনো লাভ হবে না কারণ ইলমা ঘটনার অনেকাংশই অনুমান করতে পেরেছে। তেজ শব্দ করে একবার নিঃশ্বাস ফেলে বললো….
—”আর মিথ্যে বলে যে লাভ নেই তা আমি বুঝতে পেরেছি। তবে এখন সত্যটা শোনার পর কোনোরকম রিয়াক্ট করবেন না আপনি আর না এই বিষয়ে কাউকে কিছু বলবেন, অনুকে তো একদমই না। কথা দিন!”
এই বলে তেজ ওর ডান হাতটা মেলে বাড়িয়ে দিলো ইলমার দিকে। ইলমার ভ্রু’জোড়া কিন্ঞ্চিত কুঁচকে এলো। ইলমা কয়েকসেকেন্ড তেজের হাত ও ওর চোখের দিকে নীরবে তাকিয়ে রইলো। অতঃপর ‘বেশ করলাম প্রমীস’ বলে তেজের ডান হাতের তালু আলতো ভাবে স্পর্শ করে সঙ্গে সঙ্গেই সরিয়ে নিলো। তেজ আশেপাশে নজর বুলিয়ে ধীর স্বরে বললো…..

—”নির্ঝর অনুকে পছন্দ করে।”
তেজের এই ৪ শব্দের বাক্যটা শোনামাত্র ইলমার মাথায় যেনো ভাড়ি কোনো কিছু ভে*ঙে পড়লো। ফলস্বরূপ ওর মুখ হা হয়ে গেলো। চোখের আকৃতিও স্বাভাবিক এর তুলনায় বড় হয়ে গিয়েছে। তেজ আবারও বললো….
—”এইটুকু শুনেই এতো অবাক হলেন! বাকিটুকু শুনলে তো মনে হয় সেন্সলেস হয়ে যাবেন।”
ইলমা ওর মুখ বন্ধ করে নিয়ে একবার ঢোক গিললো। কিন্তু অবাক এর পাশাপাশি স্তব্ধ ভাব এখনও ওর মুখশ্রী জুড়ে ফুটে আছে। তেজ দম ফেলে বললো….
—”এখানে আসার আগে আপনাকে নিয়ে কফিশপে গেলাম অনু আর নির্ঝর বাংলো বাড়িতে একলা ছিলো মনে আছে আপনার?”
ইলমা উপর-নীচ মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দিলো। তেজ বললো….

—”অনু অসুস্থ ছিলো আগে থেকেই এরপর ওর অসুস্থতার মাত্রা আরো বেড়ে গেলে নির্ঝর আমাদের পারিবারিক ডাক্তারকেই দেখিয়েছিলো সেদিন অনুকে। ঐ ডাক্তার-ই আজ নীরাকে চেক-আপ করতে এসেছিলেন কিছুক্ষণ আগে। আর ফাঁকা বাড়িতে দু’জন নর-নারীর একসাথে থাকাটা হোক সেটা কোনো এক পক্ষের সমস্যা তবুও সমাজ তো তা স্বাভাবিক ভাবে নিতে চায় না। তাই সেদিন ডাক্তারের সামনে নির্ঝর অনুকে ওর হবু বউ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলো।”
এই কথা শোনামাত্র ইলমার একহাত অটোমেটিক ওর মাথায় চলে গেলো আর মুখ দিয়ে বেড়িয়ে এলো ‘আল্লাহ’ শব্দ। তেজ থেমে গেলো মিনিট খানেকের জন্য। ইলমা এই সময়ের মধ্যে নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বললো…..
—”অনু এ বিষয়ে কিছুই জানে না তাই না?”
তেজ এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়িয়ে ‘না’ সূচক জবাব দিলে ইলমা শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেলে বললো…

—”এই কারণেই তাহলে এতোসময় ধরে চলছিলো আপনাদের দুই ভাইয়ের রাখ-ঢাক।”
তেজ জোর পূর্বক হাসার চেষ্টা করে বললো….
—”কি করবো বলুন! শত দোষ-ভুল করলেও আমারই ছোট ভাই নির্ঝর। অসময়ে শুকনো কুয়োর ভিতর ধা*ক্কা দিয়ে কি করে ফেলতাম! বাঁচানোর এই ছোট্ট প্রচেষ্টা তাই করতেই হলো।”
—”কিন্তু এভাবে কতোদিন চলবে?”
—”কেনো? আপাতত তো পুরো বিষয়টা মেনেজ হয়েই গেলো। তাহলে আর কি ঝামেলা থাকছে এ নিয়ে?”
—”অনুর মানসিক অবস্থা সম্পর্কে তো আপনি খুব ভালো ভাবেই অবগত তেজ। আর সামনে সারফারাজ ভাইয়া ও পিহু ভাবীর বিয়ের অনুষ্ঠান করা হবে বড় করে। তখন তো আবারও আসবেন এই ডাক্তার আঙ্কেল সেখানে। আপনার পরিবারের সবার সাথে সাক্ষাৎ কালীন তো তিনি এই সব বিষয়ে কথা আবারও তুলতেই পারেন তাই না! তখন ঐ ভরা সমাজে সব সত্য কিভাবে চেপে রাখবেন আপনি?”
তেজ ইলমার কথা শুনে খানিক চিন্তায় পরে গেলো। ইলমা আন্দাজ করে যা বললো তা শতভাগই সত্যি। কিয়ৎক্ষণ নীরব থাকার পর তেজ হুট করেই বলে বসলো….

—”যদি নির্ঝর ওর মনের অনুভূতি গুলো আগেই অনুকে জানিয়ে দেয়! তারপর বাড়ির সবার সাথে কথা বলে একটা পজেটিভ ফয়সালা করে রাখা হয়! তাহলে তো আর নতুন করে ঝামেলা হবে না।”
—”আপনি কি শুনলেন না আমি কি বললাম? অনুর মানসিক অবস্থা এমনিতেই আনস্টেবল। হুট করেই অনু ওর নিজের উপরেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে পুরোনো স্মৃতি মনে করে। পুরোপুরি সুস্থ হতে তাই যথেষ্ট সময় প্রয়োজন ওর। আর ওর বয়সও মাত্র ১৬! এতো কম বয়সী একজন মেয়ে যার এমন ভয়াবহ একটা অতীত আছে সে সম্পর্কে আপনার পরিবার জানতে পারলে কি মেনে নিবে তারা অনুকে নির্ঝরের জন্য? সবথেকে বড় কথা হাতে সময়ই আছে কয়েকদিন। এর ভিতর এমন এমন ধাপগুলো পেরিয়ে সব পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা কি এতো সহজ বলে মনে হচ্ছে আপনার?”
তেজ আবারও ধপ করে বসে পড়লো সোফায়। দু’হাতে মাথার দু’পাশের চুলগুলো মুঠো করছে আর ছাড়ছে সে। এভাবে একই কাজের পুনরাবৃত্তি কয়েকবার করার পর তেজ চোখ তুলে ইলমার দিকে তাকিয়ে বললো….

—”তাহলে আপনিই একটা উপায় বলে দিন ইলমা। নয়তো অনেক বড় স*র্ব*নাশ হয়ে যাবে।”
—”আমাকে আগে নির্ঝরের সাথে কথা বলতে হবে।”
—”কি কথা বলবেন আপনি?”
—”জানতেই পারবেন।”
এই বলে ইলমা তেজকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে চলে গেলো নির্ঝরের রুমের উদ্দেশ্যে। তেজ ইলমার যাওয়ার পানে তাকিয়ে বললো….
—”নিজ্ঝরিয়ারে তোর নিজের জন্য খোঁড়া কবরে সবার আগে আমাকেই দাফন করা হবে বলে মনে হচ্ছে।”
এই বলেই তেজও উঠে ছুটলো ইলমার পিছু পিছু।
ইলমা নির্ঝরের রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে ভিড়িয়ে রাখা পর্দাটা দু’হাতে সরাতেই দেখলো নির্ঝর কেবল একটা হাফ প্যন্ট পড়ে গলায় টাওয়াল ঝুলিয়ে চোখ বন্ধ করে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে উড়াধুরা নাচছে। মাইক্রোফোন হিসেবে মুখের কাছে ধরে আছে নিজের ফোনটা। বিছানার উপর রাখা মিনি সাউনবক্সটাতে গান বাজছে সেই গানের তালে নিজের বেসুরা কন্ঠে নির্ঝরও গান করতেছে। গানটা হলো….

“বেলতলি সুলেমান ল্যংটা
দোহাই ল্যংটা, দোহাই ল্যংটা
কাটাকেল্লা কাটাকেল্লা
কেল্লায় করে আল্লাহ আল্লাহ
গুণিশাহ আর কান্দুশাহ
ভক্তে করে তোমার আশা
রাহখালি শাহ, সুবহান শাহ
তুমি ভক্তের মুশকিল গো আসান
গুলিস্তানের গোলাপ শাহ বাবা
চরণ ধুলি আমায় দিবা….”
তেজ ইলমার পিছনে এসে দাঁড়াতেই নির্ঝরের এমন অবস্থা দেখে সঙ্গে সঙ্গে নিজের পায়ে থাকা ঘরোয়া একটা জুতা খুলে সোজা ছুঁড়ে মারলো নির্ঝরের দিকে। যা গিয়ে লাগলো নির্ঝরের জায়গা বরাবর। নির্ঝর সঙ্গে সঙ্গে সেই জায়গা দু’হাতে চেপে ধরে ‘আহহহ মা গো আমার বংশের বাত্তি নিব্ভা গেলো গো’ বলে চিল্লিয়ে উঠে হাঁটু ভাঁজ করে মেঝের উপর বসে পড়লো। ইলমা সঙ্গে সঙ্গে ওর দু’চোখ ঢেকে নিয়ে বললো….

—”যান আপনার ভাইকে গিয়ে সামলান আপনি আমি আর এখানে থাকতে পারছি না।”
এই বলে ইলমা তৎক্ষণাৎ তেজের পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। তেজ রুমের ভিতরে প্রবেশ করে দাঁতে দাঁত চেপে বললো….
—”শুয়ো*** জাত, বাহিরে আমি জান হাতে নিয়ে পুরো বিষয়টা হেন্ডেল করলাম আর তুই রুমে এসে অর্ধ ল্যংটা হয়ে ল্যংটা শব্দ ওয়ালা গানে ডান্স করছিস?”
নির্ঝর ওর ব্যথা হজম করার চেষ্টা করে বললো….
—”তাই বলে সোজা আমার বংশের বাতির উপর জুতা ছুড়ে মারবে তুমি তেজ ভাই! একটুও দয়া হলো না তোমার? জানোই তো বাচ্চা-কাচ্চার কতো শখ আমার।”
—”চুপ শা*লা। আর একটা কথা বললে তোর এই মুখটা সোজা কমোডে চুবাবো আমি।”
—”মাফও চাই দোয়াও চাই। এই মুখ যদি কমোডে চুবাও তুমি তাহলে বিয়ের পর বউকে চুমু খাওয়ার জন্য আমার মুখটা আর পবিত্র থাকবে না।”

—”শা*লা তোর বিয়েই হবে না। বউকে চুমু খাওয়া আর বাচ্চা পয়দা করা তো বহুত দূরের বিষয়।”
—”শ*কুন রূপ নিয়ে এই গরুকে অভি*শা*প-টভি*শা*প পরে দিও। আগে আমায় ধরো। আহহহ, কি ব্যথা।”
এই বলে নির্ঝর ওর একহাত তেজের দিকে বাড়িয়ে দিলে তেজ তা ধরে জোড়ে টান দিয়ে উঠালো নির্ঝরকে। ফলস্বরূপ নির্ঝরের শরীর ঝাঁ*কুনি দিয়ে উঠলো আর ব্য*থার জায়গাটাতে আরো ব্য*থা অনুভব হলো। নির্ঝর ধাম করে বিছানার উপর বসে মুখ দিয়ে ব্যথায় উদ্ভট সব শব্দ বের করতে করতে বললো……
—”এখানে কি কোরিয়ান সিরিজের সুটিং চলছিলো তেজ ভাই? ওমন হ্যচকা ভাবে টেনে তুললে কেনো আমাকে? আমার জায়গায় কোনো মেয়ে থাকলে না হয় অন্য কথা ছিলো। টেনে তোলার সাথে সাথে সে তোমার বুকের উপর আছড়ে পড়তো, কয়েক সেকেন্ড চোখাচোখি হলে পর চুমু-টুমুও খাওয়া হতো।”
তেজ এবার মহাবিরক্তি নিয়ে এক পা তুলে নির্ঝরকে লা*থি মারার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে বললো…..
—”অপ্রয়োজনীয় আর একটা কথা বললে সারাজীবনের জন্য এবার তোর বংশের বাতি নিভিয়ে দিবো আমি।”
নির্ঝর সঙ্গে সঙ্গে ওর মুখ চেপে ধরলো একহাতে। ইশারায় বুঝালো সে আর একটা শব্দও আপাতত উচ্চারণ করবে না। তেজ ওর পা নামিয়ে নিলো।

নীরার জ্ঞান ফিরেছে অনেক আগেই। এখন অনেকটাই সুস্থ ও। জ্ঞান ফেরার পরপরই ওর মা-চাচীরা বসে থেকে নিজ দায়িত্বে ডাক্তারের বলা অনুযায়ী তরল খাবার খাইয়ে দিয়েছে নীরাকে। সেই তরল খাবার পিহু খুব যত্ন করে বানিয়ে দিয়েছিলো। এ বাড়ির কোনো একজন সদস্য হুট করে অসুস্থ হয়ে পড়লে তার যত্নের অভাব হয় না। এতো এতো যত্নেই সে সময়েই আগেই সুস্থ হয়ে উঠে। এমন পরিবার প্রতিটি মানুষের কামনাতেই থাকে হয়তো।
নীরাকে জড়িয়ে ধরেই ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট নির্বাণ। নির্বাণের নিষ্পাপ, শান্ত, মায়াবি মুখের দিকে তাকিয়ে নীরা শব্দ করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো….
—”তোর কি সত্যিই বাবার প্রয়োজন আছে নীর?”
একটু থেমে আবার বললো….

—”যেই বাবা ছাড়া পুরো প্রেগ্ন্যাসির জার্নি পার করলাম। এতো যন্ত্রণা সহ্য করে তোকে জন্ম দিলাম। দেড় বছর বয়সে এসে দাঁড়িয়েছিস এখন তুই। তাহলে আগামীতে কেনো লাগবে তোর কোনো বাবাকে? একটা পিতৃপরিচয় ছাড়া কেনো চলা সম্ভব না তোর জন্য? বড় জানতে চাইলেন সমাজ কি বলবে যখন সবাই তোর কথা জানবে! আমি কোনো উত্তর কেনো দিতে পারলাম না? আমি কেনো বলতে পারলাম না, সমাজে ধার আমি ধারি না। এই সমাজেরই তো কোনো এক কু*কু*র আমায় অচেতন করে তার কু*পুরুষত্ব খাঁ*টিয়ে দেহের জ্বা*লা মিটিয়ে গিয়েছিলো সেদিন। তাহলে এই সমাজের অধিকার হয় কিভাবে আমার চরিত্রের দিকে আঙুল তোলার? তোর জন্ম পরিচয় নিয়ে তোকে খোঁ*টা দেওয়ার?”
নীরার দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো নোনাজলেরা। নীরা তা মুছলো না। পড়তে দিলো। কয়েক সেকেন্ড থেমে আবার বললো….

—”এই জীবনে কোনো পুরুষকে ঠাঁই দেওয়ার পর যদি সেই পুরুষও ঐ কু*কু*রের মতো স্বভাবের হয়ে থাকে তখন কি হবে? ভালোটা হতে গিয়ে আরো খারাপটা কি হয়ে বসবে না তখন আমার সাথে? তুই তো বাবা পাবি না তখন।”
নীরা নিজ হাতে ওর নিজের কপাল আলতো ভাবে টিপতে শুরু করলো। চোখ-মুখ হালকা কুঁচকে নিয়েছে। আজকে হওয়া প্যনি*ক অ্যা*টা*ক এর আগেও বেশ কয়েকবার হয়েছিলো নীরার। সেটা কানাডা থাকাকালীন সময়েই। যখন নির্বাণ ওর গর্ভে ছিলো। প্যনি*ক অ্যা*টা*ক থেকে একটু রিলিফ পাওয়ার পরই মাথাটা য*ন্ত্র*ণা করে ওর অতিরিক্ত। আজও তার ব্যতিক্রম কিছু হচ্ছে না। নির্বাণকে ভালোভাবে শুইয়ে দিয়ে নীরা সোজা হয়ে বসলো। অতঃপর বললো….

—”সব পুরুষ কি কু*পুরুষ হয়? কিছু পুরুষ তো আমার বাবা-চাচা, ভাইদের মতো সুপুরুষও হয়। তাদের মতো কাউকে কি পাওয়া সম্ভব এই পো*ড়া কপাল নিয়ে? যে আমার থেকেও বেশি নির্বাণকে ভালোবাসবে। আপন করে নিবে ওকে। কখনও যেনো নির্বাণের এমনটা মনে না হয় সে ওর জন্মদাতা পিতা নয়!”
তখনই নীরার রুমে প্রবেশ করলো পিহু। পিহু বললো….
—”পুরুষ জাতিকে এক সময় ঘৃ*ণা আমিও করতাম নীরা। কিন্তু তোমার ভাই ঝড়ের মতো কোনো বার্তা ছাড়া আমার জীবনে এসে সব ভুল ধারণাকে দূরে সরিয়ে পুরুষ জাতির প্রতি বিশ্বাস-ভরসা করা যায় যে সেটা মানতে বাধ্য করেছে। তাই কেবল খা*রাপ চিন্তাগুলোকে মনে জায়গা দিও না। একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে ভালোটা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে দেখো একবার। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার বান্দাদের সব দিক থেকে দুঃখী করেন না। ভরসা রেখো তাঁর উপর।”
নীরা নিরব রইলো।

সন্ধ্যেবেলা…….
খান বাড়ির সব জুনিয়র সদস্যরা রেডি হয়ে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত হয়েছে মাত্রই। বিকেল বেলা সপিং-এ যাওয়ার কথা ছিলো ওদের। কিন্তু নীরার শরীরটা খারাপ থাকায় ওকে বিশ্রাম নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় সারফারাজ দিয়েছিলো। এখন নীরা পুরোপুরি সুস্থ বোধ করছে বিধায় সবার সাথে সপিং-এ যাওয়ার অনুমতি পেয়েছে।
নীরা নির্ঝরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে কোলে থাকা নির্বাণকে ওর দিকে এগিয়ে দিলে নির্ঝর নিয়ে নিলো। নীরা বললো…..
—”ছোট ভাইয়া, আজ সপিং করার পুরো সময়টাতে নির্বাণকে সামলানোর দায়িত্ব তোমার। তখন আমি না তোমাকে চিনবো আর না এই বাঁ*দর ছেলেকে। বুঝলে!”
নির্ঝর আহ্লাদী স্বরে বললো….
—”হেহ্ যা যা। আমার ভাগ্নে কখনও আমার কাছে বেশি হবে না। তুই সারাজীবন নিজের কাছে না নিতে চাইলেও ওকে আমিই পেলে-পুষে বড় করতে পারবো।”
নীরা ভেং*চি কেটে বললো….

—”তার প্রমাণ আজই পাবো।”
নির্বাণ ওর হাতে থাকা প্লেন খেলনা নিয়ে খেলতে ব্যস্ত ছিলো জন্য আপাতত কোল বদল নিয়ে ওর কোনো সমস্যাই ছিলো না। অনু আর ইলমা ১ম এ ওদের সাথে যেতে চাইছিলো না কিন্তু পিহুর কথায় যেতে হচ্ছে ওদেরও। বাড়ির সিনিয়র মহিলা সদস্যরা বলেছেন, ‘তাঁদের যা কেনা-কাটা করার তারা অনলাইন অর্ডার করেই নিয়ে নিবেন। এই বয়সে সপিংমলে ঘুরে ঘুরে সপিং করার ধৈর্য আর তাদের কারোর মাঝে নেই।’ পিহুর বাবা এ বাড়িতেই তার জন্য বরাদ্দকৃত রুমে বিশ্রামে আছেন। পায়ে লাগা গু*লির জায়গাটার ব্য*থা সারে নি পুরোপুরি। বেশি হাঁটাচলা বা বেশি সময় কোথাও বসে থাকাটা তার জন্য অনেক কষ্ট কর হয়ে উঠে। আর এক্ষেত্রে ডাক্তারের নিষেধাজ্ঞাও আছে।
অতঃপর সবার থেকে বিদায় নিয়ে খান ভিলা থেকে বেড়িয়ে পড়লো ২ টো গাড়ি নিয়ে। সারফারাজ, পিহু, নির্ঝর-নির্বাণ এক গাড়িতে। অন্য গাড়িতে তেজ, ইলমা, অনু ও নীরা যাচ্ছে। একটা গাড়ি সারফারাজ ড্রাইভ করছে আর অন্যটা তেজ।

প্রায় ৪০ মিনিটের রাস্তা অতিক্রম করার পর ঢাকার সবথেকে বড় সপিংমলে সামনে এসে গাড়ির ব্রেক কষলো ওরা। সবাই গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো। সারফারাজ আর তেজ পার্কিং সাইডে গাড়িটা রাখতে চলে গেলো। একটু পর ওরা আসতেই সবাই একসাথে সপিংমলের ভিতরে প্রবেশ করলো। এর আগেও পিহু একবার এখানে এসেছিলো সারফারাজের সাথে। যখন কলেজ থেকে পিহুকে উঠিয়ে নিয়ে সারফারাজ সপিং মলে এনে ওকে শত প্রকার বোরখা-হিজাব-থ্রিপিচ ইত্যাদি জিনিস কিনে দিয়েছিলো ওর অনিচ্ছা স্বত্তেও।
সেইদিনের স্মৃতি মনে হতেই পিহুর ঠোঁটে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠলো। দিনগুলো কিভাবে যেনো কেটে গেলো! রুচি বদলালো, পছন্দ বদলালো। যেই সারফারাজকে পিহু সহ্য করতে পারতো না বললেই চলে আজ ২য় বার তাঁর সাথেই সেই একই স্থানে এসেছে তাঁদেরই বিয়ের সপিং করতে।

ইলমা-অনু-নীরা পিহুর জন্য বিয়ের বেনারসি দেখতে শুরু করেছে প্রথমে। পিহুকে অবশ্য সারফারাজ জিজ্ঞেস করেছিলো সে কি পড়তে ইচ্ছুক! শাড়ি নাকি লেহেঙ্গা! পিহু শাড়ির কথাই বলেছিলো সরাসরি। কথাতেই আছে শাড়িতেই নারী। আর সে যদি হয় বাঙালি তাহলে তো কোনো সন্দেহ ছাড়া শাড়িই বেছে নিবে।
তেজ সারফারাজকে নিয়ে শেরওয়ানি কালেকশন গুলো দেখছিলো। এদিকে নির্ঝর বেচারা সেই বাসায় থাকাকালীন সময় থেকে হাত বদল করে করে নির্বাণকে কোলে রেখে এখনই ক্লান্ত বোধ করছে। হাত ঝিম লেগে লেগে আসছে ওর। এই পরিবেশে ওকে কোল থেকে নামিয়ে দেওয়াটাও নিরাপদ মনে করছে না জন্য নামায় নি।
প্রায় ঘন্টাখানেক পর…..
নির্বাণ নির্ঝরের দিকে তাকিয়ে আধো আধো স্বরে বললো….

—”মামা, সি সি।”
নির্ঝর প্রথমে বুঝলো না। জিজ্ঞেস করলো আবারও….
—”কি সি সি!”
—”আমাল সি সি পেয়েচে নি নি ঝোল মামা।”
এবার বুঝতে পেরে নির্ঝর তৎক্ষনাৎ নির্বাণকে নিয়ে ছুটলো ওয়াশরুমের দিকে। ওয়াশরুমে এসে ওকে কোমডের উপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললো…..
—”নে কর সি সি।”
—”আলে প্যন্ত কুলো।”
নির্ঝর ওর কপাল চাপড়ে প্যন্টটা পুরো খুলে দিলো। নির্বাণ সি সি করার পর পরই বললো….
—”আমি হাক্কুও কববো।”
নির্ঝর দাঁতে দাঁত চেপে বললো…
—”বাসা থেকে করে আসতে কি হয়েছিলো তোমার বিট্রিশের বংশধর!”
নির্বাণ বললো…..

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৭

—”এখানে কববো না হাক্কু। এতা পতা।”
—”এখানে না করলে কই করবি?”
—”না না এখানে কববো না। মামা, খুব হাক্কু পেয়েচে। আমি হাক্কু কববো। এখানে না।”
—”ওহহ আল্লাহ, এখন আমি একে নিয়ে কই যাবো!”
নির্বাণ ওর পিছন চেপে ধরলো নিজের ছোট্ট দু’হাত দিয়ে। আর বললো…..
—”মামা, হাক্কু হাক্কু পললো….পললো!”
বলতে বলতেই ঐ দাড়ানো অবস্থাতেই নির্বাণ কাজ সেরে ফেললো। ফলস্বরূপ কিছুটা ছিঁটে নির্ঝরের প্যন্টে এসেও লাগলো। নির্বাণের পা ও অনেকটা মেখে গিয়েছে। নির্বাণের এমন কর্মকাণ্ড দেখে নির্ঝরের মুখ হা হয়ে গেলো। এই স*র্ব*নাশা কান্ড যে ঘটালো নির্বাণ এবার এসব পরিষ্কার কে করবে?

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৮ (২)