না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৮ (২)
মাইশা জান্নাত নূরা
কয়েক সেকেন্ডও কাটলো না হঠাৎই নির্বাণ জোরে কেঁদে উঠল। নির্ঝর নির্বাণের দু’হাত মজবুত ভাবে ধরে থাকায় নড়াচড়া করারও খুব একটা সুযোগ নেই নির্বাণের। কোমরের নিচ থেকে দু’পা মল দিয়ে মেখে যা-তা অবস্থা করে বসে আছে নির্বাণ। এমন দৃশ্য দেখে চাপা অস্বস্তি এমনিই কাজ করছিলো নির্ঝরের ভিতরে এরপর শুরু হলো নির্বাণের কান্না। নির্ঝরের যেনো মনে হচ্ছে বিগত জীবনে করা সব পা*পের শা*স্তি আজই ওর পাওয়া হয়ে যাচ্ছে ধাপে ধাপে।
নির্বাণের কান্না সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আরো বাড়ার কারণে নির্ঝর দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করবে বলে ঠিক করলো। তাই আর দেরি না করে নির্ঝর নির্বাণকে কোমডের পাশেই মেঝের উপর ওকে দাঁড় করালো। এরপর হালকা গরম পানি নিশ্রিত হওয়ার পাইপটা হাতে নিয়ে পাওয়ার আস্তে রেখে তা ছেড়ে দিতেই নির্বাণের শরীর থেকে মল গুলো ধুঁয়ে পরিষ্কার হতে শুরু হলো। পরপরই নির্বাণ কান্না থামিয়ে দিলো। নির্ঝরও খানিক স্বস্তি নিয়ে শ্বাস নিতে পারছে।
এরপর নির্ঝর খুব যত্ন করে নির্বাণকে পুরোপুরি পরিষ্কার করে দিলো। টিস্যু দিয়ে পানিভাব টুকু মুছে নিজের হাত ও প্যন্টে ছিঁটে আসা নির্বাণের মলগুলো পরিষ্কার করে ফেললো ভিষণ অস্বস্তি ও বিরক্তি নিয়ে। নির্বাণকে প্যন্ট পড়িয়ে দিয়ে ওকে কোলে নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হলো নির্ঝর। পরপরই দেখলো নির্বাণের মুখে সেই অস্বস্তি ভাব আর ফুটে নেই। ওর হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রী দেখে কেউ বলবেই না একটু আগেই ও কান্না করে পুরো ওয়াশরুম মাথায় তুলে ফেলেছিলো যেনো। নির্ঝর নির্বাণের পিঠে আলতো করে চাপড় মে*রে বললো…..
—“তুই আসলেই একটা মাল মামা।”
নির্বাণকে নিয়ে সামনের দিকে এগোচ্ছে নির্ঝর। শপিং মলের ভিড় আগের মতোই গমগম করছে। নির্ঝর বললো…..
—”আবার যদি কোনো উল্টো-পাল্টা করিস তাহলে কিন্তু তোরে সরাসরি ডাস্টবিনে ফেলে আসবো, মনে রাখিস।”
নির্বাণ নির্ঝরের কথাগুলো এমন ভাবে এড়াচ্ছে যেনো ও সবই বুঝছে তাই এসবের ধার ধারার প্রয়োজনও মনে করছে না। আরেকটু সামনে আসতেই নির্বাণ ডানদিকে একটু হেলে হাত ইশারায় কিছু দেখিয়ে বললো….
—“মামা…ওতাল…ওতাল কাবো…!”
নির্ঝর ভ্রু কুঁচকে বললো….
—”কি খাবি?”
নির্বাণ এক তালে ইশারায় দেখিয়ে বুঝানোর চেষ্টা নিয়েই ‘ওতাল…ওতাল…!’ করছে দেখে নির্বাণ সেদিকে তাকিয়ে সারি করে রাখা পানির বোতল গুলো দেখে বললো….
—”পানি খাবি?”
—”আলে ওতাল..ওতাল..!”
—”ওয়াটার!”
নির্বাণ মাথা নেড়ে ‘ওতাল, ওতাল’ করছে এখনও। নির্ঝর ঠোঁট কাঁমড়ে বললো….
—”ব্রিটিশের বংশধর ওয়াটারকে ওতাল বলতেছে! শালার এই জীবন নিয়ে বাঁচলেও খুব তাড়াতাড়ি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাবো বলেই মনে হচ্ছে।”
অতঃপর একটা পানির বোতল কিনে নির্বাণকে নিয়ে নির্ঝর পাশেই একটা ফুড কোর্টে বসলো। বোতলের মুখারিটা খোলা মাত্র নির্বাণ বোতলটা কেড়ে নিয়ে নিজের মতো করে মুখে লাগাতে গিয়ে অর্ধেক পানি নিজের গায়েই ঢেলে দিলো। ফলস্বরূপ নির্ঝরের প্যন্টটাও এমনভাবে ভিজে গেলো যে ও উঠে দাঁড়ালেই এই ভরাসমাজে ওর আর মান-সম্মান এতোটুকুও বাকি থাকবে না। ফুড কোর্ট থেকে পুরুষদের পোশাক পাওয়া যায় এমন দোকান যেতে মিনিমাম ২ মিনিট সময় লাগবে। মাঝখানে থাকা এই সবগুলো দোকানই মেয়েদের কসমেটিকস থেকে শুরু করে জুয়েলারী-জুতো-ব্যাগ ইত্যাদি জিনিসপত্র পাওয়া যায়। নির্ঝর ভে*ব*লা কান্তের মতো নির্বাণকে নিজের কোলের উপর রেখেই একদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বসে আছে। কিয়ৎক্ষণ আগের যু*দ্ধ শেষ করে এখন আবার আরেক যুদ্ধের মুখে ফেলেছে নির্বাণ নির্ঝরকে। তাই এখন কোনোরূপ রিয়াকশন দিতেও ভুলে গিয়েছে যেনো নির্ঝর। পারতো যদি এখানেই হাত-পা ছড়িয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেন্দে ফেলতে।
পরক্ষণেই নির্বাণ নির্ঝরের কোলের উপর উঠে দাঁড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আধো আধো স্বরে বললো…..
—”মামা, ঠাডা কচচে…ঠাডা…ভিজচে….ওতাল…
ওতাল…এই যে ভিজচে…ঠাডা!”
নির্ঝর নির্বাণের দিকে তাকিয়ে নাক টেনে ঠোঁট উল্টে ফেলে বললো….
—”এ তুই কি করলি বাপ! আমার ঐ জায়গাটাই কেন পানি দিয়ে ভিজিয়ে ফেললি তুই বল! এখন এতোগুলো লেডিস শপ পেরিয়ে তোকে নিয়ে পুরুষ সেকশনে কিভাবে যাবো আমি? শত শত মেয়ে সামনের দোকানগুলোতে কেনাকাটা করতেছে। সবাই তো এটাই ভাববে যে আমি ২৪ বছরের এক দামড়া বেডা কিনা প্যন্টেই প্রসাব করে ফেলেছি! ছিহ্ ছি ছি! ও আল্লাহ, আপনি আমায় উঠায় নিচ্ছেন না কেনো? কেনো? কেনো?”
নির্বাণ চোখ ছোট ছোট করে নির্ঝরের দিকে তাকিয়ে রইলো কয়েকসেকেন্ড। পরপরই আবার আগের মতো চিল্লিয়ে কাঁদতে শুরু করলো। নির্ঝর আশেপাশে তাকাতেই দেখলো ফুড কোর্টের ভিতরে থাকা আরো প্রায় ২০-৩০ জন মানুষ ওদের দু’জনের দিকেই তাকিয়ে আছে।
নির্ঝর তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়িয়ে নির্বাণের দু’বোগলে হাত দিয়ে ওকে ঠিক নিজের কোমরের ঐ জায়গা থেকে ধরে একপ্রকার ঝুলিয়ে নিয়েই ভিজা অংশ ঢেকে রাখার চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে দৌড় লাগালো পুরুষ সেকশনের দিকে। আশেপাশে তাকানোর কোনো সময় এই মুহূর্তে ওর নেই। পুরুষ সেকশনে গিয়ে নির্বাণের ভিজা পোশাক পরিবর্তন করিয়ে দিলেই ওর কান্না যে থেমে যাবে তা নির্ঝর জানে। তাই এখন নির্বাণের কান্না থামানোর বৃথা চেষ্টায় সময় নষ্ট করলো না আর সে।
এখানে এসে সরাসরি ছোট ছেলে বাচ্চাদের পোশাক এর সারিতে গিয়ে নির্বাণের জন্য একসেট ও এরপর বড়দের সারিতে গিয়ে নিজের জন্য একসেট কাপড় নিয়ে সোজা ছুটলো ট্রেলার রুমের দিকে নির্ঝর। প্রথমে নির্বাণের পোশাক পরিবর্তন করে দিলো সে। সঙ্গে সঙ্গেই নির্বাণ কান্না থামিয়ে দিলো। পূর্বের ন্যায় এমন ভাবে হাসছে এখন নির্বাণ যেনো একটু আগে সে কান্নাই করে নি। নির্ঝরের নির্বাণের এমন গির*গি*টির থেকেও ফাস্ট ফাস্ট মুডের রং পরিবর্তন হতে দেখে ইচ্ছে করছে নিজের মাথার সব চুল একটা একটা ছিঁ*ড়ে এই রা*গ দমন করতে।
দাঁতে দাঁত চেপে নির্ঝর নিজের প্যন্ট ও শার্ট দু’টোই পরিবর্তন করলো। সামনেই থাকা আয়নায় নিজের বর্তমান লুক দেখে নির্ঝর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। হো হো করে হাসতে শুরু করলো। এরপর ধপ করে দু’হাঁটু ভাঁজ করে সেখানেই মেঝের উপর বসে পড়লো। তাড়াহুড়োতে সে নিজের থেকে প্রায় ২ সাইজ বড় মাপের একটা শার্ট নিয়ে ফেলেছে আর প্যন্ট নিয়েছে ১ সাইজ ছোট।
নির্ঝর বললো….
—”আমার বিয়ের শখ, বাচ্চার শখ আজ এই কয়েক ঘন্টাতেই মিটিয়ে দিয়েছে আল্লাহ। বাচ্চা পালা এতো সহজ ক্যান! এর মতো সহজ কাজ আর এই দুনিয়ায় নাই।”
নির্বাণ ওর ডান হাতটা মুঠো করে নিজের মুখের কাছে নিয়ে নির্ঝরের দিকে তাকিয়ে আছে কেমন যেনো নজরে। নির্ঝরের পোশাকের এই বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা দেখে নির্বাণেরও হয়তো ব*মি চলে আসছে।
ইতিমধ্যেই পিহু-সারফারাজের বিয়ের প্রায় ৩ ভাগ সপিং করা শেষ হয়ে গিয়েছে ওদের। এখন কেবল জুয়েলারি গুলো নেওয়া বাকি। সারফারাজ পিহুকে বললো….
—”স্বর্ণের জুয়েলারি পড়তে চাও নাকি ডায়মন্ড? তোমার যেটা ইচ্ছে হবে সেটাই কেনা হবে।”
পিহু হালকা হেসে বললো….
—”জীবনে যার নকল সোনা-রূপা পড়ার-ই সৌভাগ্য হয় নি সে এইসব স্বর্ণ ও ডায়মন্ডের কি মর্ম বুঝবে এমপি সাহেব! আপনারা যা ভালো মনে করবেন সেটাই কিনে দিয়েন না হয়। আমার কোনো আলাদা পছন্দ নেই।”
ইলমা আর অনু একে-অপরের দিকে তাকালো একবার। ইলমা পিহুর কাঁধে হাত রেখে বললো….
—”আপনি একা নন ভাবী, আমরা দু’জনও আছি আপনার দলে। অতীত ভেবে কষ্ট পাওয়াটাকে বোকামী বলে। আপনি কেনো সেই বোকামীটা করবেন সারফারাজ ভাইয়ের মতো একজন স্বামী পেয়ে, খান পরিবারের মতো এমন শ্বশুরবাড়ি পেয়ে! হুম?”
নীরা বললো…..
—”ইলমা আপু একদম ঠিকটা বুঝেছে এবং বলেছে। ভাবী-পু এরপর যদি আর কখনও তোমার মুখ থেকে এমন ধরণের কথা শুনেছি তাহলে কিন্তু তোমার এই ছোট ননদের থেকেই শক্ত ব*কা খাবে তুমি।”
পিহু বললো….
—”ক্ষমা করো তোমরা আমায় সবাই। আর কখনও বলবো না এসব।”
সারফারাজ বললো…..
—”১ম এ স্বর্ণ জুলেয়ার্সে চলো সবাই। তারপর ডায়মন্ড সেকশনে যাবো আমরা।”
সবাই একসাথে আচ্ছা বললো। ইলমা আর অনু সারফারাজের সাথে আগে আগে যেতে শুরু করলো। তেজ যেতে নিলে নীরা ওকে ডেকে বললো….
—”মেজ ভাইয়া! ছোট ভাইয়াকে অনেকক্ষণ হলো দেখছি না। নির্বাণটা ওর কাছেই আছে। তুমি জানো কি ওরা কোন দিকে গিয়েছে?”
—”না তো, আমি তো সারফারাজ ভাইয়ের সাথে ছিলাম পুরো সময়টা। ফোন করে দেখ না হয় একবার। আশে হয়তো আশে-পাশেই কোথাও।”
নীরা ‘আচ্ছা’ বলতেই তেজ ইলমা, অনুদের কাছে চলে গেলো। নীরা ওর ফোনটা হ্যন্ড ব্যগ থেকে বের করে নির্ঝরকে কল করলো।
ফোন বাজার শব্দ কানে আসতেই নির্ঝর স্বাভাবিক হলো কিছুটা। ট্রায়াল রুমের মেঝেতে আগের মতোই বসে থেকে রিসিভ করলো সে নীরার কল। ওপাশ থেকে নীরা খানিক চিন্তিত স্বরে বললো…..
—”ছোট ভাইয়া কোথায় তুমি? অনেকক্ষণ হলো নির্বাণকে দেখছি না। ও ঠিক আছে তো?”
নির্ঝর ওর কান থেকে ফোনটা সরিয়ে নির্বাণের হাস্যোজ্জ্বল একটা ছবি তুলে নীরার হোয়াটসঅ্যাপে সেন্ড করে বললো….
—”হোয়াটসঅ্যাপ চেক কর।”
—”কেনো?”
—”তোর ছেলের আপডেট চাইলি তাই দিয়েছি দেখ।”
নীরা হোয়াটসঅ্যাপ ওপেন করে নির্বাণের ছবিটা দেখতেই ওর ঠোঁটে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠলো। নীরা বললো…
—”তুমি ওকে নতুন জামা কিনে দিয়েছো! এটা তো ওকে দারুণ মানিয়েছে। আর কোথায় তোমরা?”
—”আছি এক জায়গায়। তোরা কোথায় সেটা বল। আমি আসছি তোর প্রোডাক্টকে নিয়ে।”
—”ভাবী-পু কে নিয়ে ওরা সবাই জুয়েলারির দোকানে গেলো। এখানেই আসো তাহলে।”
—”আচ্ছা।”
এই বলে নির্ঝর কল কেটে দিলো। পরক্ষণেই নির্ঝর উঠে দাঁড়িয়ে নিজেকে আরেকটা আয়নায় দেখে নিয়ে বললো….
—”আমার কি এভাবেই যাওয়া উচিত ওদের সামনে? অন্তত সবাই দেখতো এই দেড় বছরের দেড় ফুটের বাচ্চা আমার মতো ২৪ বছরের ৫ ফুট ১১ ইন্ঞ্চির মানুষের মাত্র কয়েকঘন্টায় কি বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা করেছে!”
পরপরই নির্ঝর বললো….
—”না না, এভাবে যাওয়া সম্ভব না। ওখানে আমার ক্রাশ অনু আছে। এই জো*কারের মতো লুক নিয়ে ওর সামনে গেলে জীবনেও পাত্তা পাবো না আর ওর থেকে।”
অতঃপর নির্বাণকে কোলে নিয়ে নির্ঝর ওর মাপের শার্ট-প্যন্ট কিনে নিয়ে সেটা পড়ে নিলো। নির্বাণ আবারও ওর মামাকে পোশাক পরিবর্তন করতে দেখে বললো….
—”এতা সুন্দল।”
নির্ঝর নির্বাণের দিকে তাকিয়ে বললো….
—”আরে বাহ মামা, তুই সুন্দর – অসুন্দরের মধ্যকার পার্থক্যও বুঝিস দেখছি! একটু আগে যে পোশাক পড়ে ছিলাম তখন তো মনে হচ্ছিল পারতিস যদি বমিই করে ফেলতি চেহারার এক্সপ্রেশনই অন্য লেভেলের ছিলো। আর এখন সুন্দর বলছিস।”
নির্বাণ নির্ঝরের গলা দু’হাতে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা নোয়ালো। ওর এমন আদুরে স্বভাব দেখেই নির্ঝরের এতোসময়ের জমে থাকা চাপা রাগ-বিরক্তি-অস্বস্তিভাব সব এক নিমিষেই যেনো উধাও হয়ে গেলো। রক্তের টান হয়তো একেই বলে। যতো যাই করুক একটু ভালোবাসা দেখালেই পাথর মনও গলে যেতে সময় নেয় না। নির্ঝর ওর ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বিল মিটিয়ে সেখান থেকে বেড়িয়ে পাশেই থাকা জুয়েলারি শপগুলোতে আগে নজর বুলাতে শুরু করলো বাকিদের খুঁজতে।
স্বর্ণে ভরপুর বিশাল এড়িয়া জুড়ে থাকা জুয়েলারির দোকানটার ভিতরে ঢুকতেই যে কারোর চোখ ধাঁধিয়ে যাবে। কোটি কোটি টাকার অলংকার এখানে বাক্স বন্দি হয়ে আছে। একেকটার ডিজাইন একেকরকম। এখানে যেমন ১হাজার টাকায় একটায় পাতলা সোনার পানিতে ধোঁয়া সিটিগোল্ডের চেইন মিলা সম্ভব তেমনিই খাঁটি সোনায় পর্যাপ্ত খাঁদ মিশিয়ে দেশী-বিদেশী গুনীকারের হাতে তৈরি কোটি টাকার নেকলেসও আছে। যার যেমন সামর্থ্য হয় সে তেমনই ক্রয় করে। চারপাশে রয়েছে কর্মরত প্রায় ৩০ জন কর্মচারী। যারা সেখানে ভির করা সকল কাস্টোমারের চাহিদার দিকে নজর রেখে তাদের নিকট প্রোডাক্ট সেল করছে। আনাচে-কানাচেতে রয়েছে অনেক ক্যমেরা। কোথাও থেকে কোনো একটা জিনিস বা টাকার নড়িনামা কেউ করতে পারবে না এখানে।
পিহুকে, ইলমা আর অনুকে নিয়ে নীরা ব্রাইডাল কালেকশন গুলো দেখতে শুরু করলো। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলতে বলতেই পিহুর দিকে লক্ষ্য রাখছিলো সারফারাজ। পিহু খুব বাছাই করে করে হুট হাট কোনো একটা করে জিনিসে হাত রাখছে। কোনো জিনিসে হাত রাখার সময় যেমন ওর ঠোঁটে হালকা হাসি ও চোখে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছিলো তেমনিই কোনো জিনিস খানিক দূর থেকে দেখেই তা থেকে নজর সরিয়ে নিচ্ছিলো যা ওর পছন্দ না হওয়ার জানান দিচ্ছিলো। এভাবেই অনেকগুলো জুয়েলারি দেখার পর ২ সেট জুয়েলারি ওরা চূড়ান্ত করলো।
তেজ জুয়েলারি সেকশনেরই ডায়মন্ডের সাইডে কিছু একটা দেখতে ব্যস্ত ছিলো ওদের সবার আড়ালে। সারফারাজ বললো….
—”ঐ দু’টো রাখো ওখানেই। ঐ পাশে ডায়মন্ড থেকে শুরু করে আরো অনেক মূল্যবান পাথরের তৈরি অলংকার আছে। ওগুলো দেখো এখন তোমরা।”
পিহু ধীর স্বরে বললো….
—”২ সেট তো নেওয়া হচ্ছেই। আর কি করবো নিয়ে!”
—”দেখতে বলছি দেখো।”
নীরা বললো…..
—”চলো তো ভাবী পু। দেখি আমরা। বিয়ে তো সবার জীবনে ১বারই হয়। কিন্তু তুমি এক্ষেত্রে ভাগ্যবতী। ২য় বার একই মানুষের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবব্ধ হতে যাচ্ছো। তাই কোনোদিক থেকে বড় ভাইয়া ত্রুটি রাখতে চায় না। আমিও তার বোন হয়ে এমন কিছু হোক তা চাইবো না এটাই স্বাভাবিক নয় কি!”
পিহু নীরার কথায় হার মানলো। এরপর ওরা ৪ জন মিলে ডায়মন্ড সেকশন থেকে জুয়েলারি গুলো দেখতে শুরু করলো আগের ন্যায়। এদিকে সারফারাজ পিহুর পছন্দের নজরে স্পর্শ করা স্বর্ণালংকার সবগুলোই প্যক করে দিতে বললো সিক্রেটলি।
অতঃপর সারফারাজ পিহুর এখানের পছন্দের দিকটাতেও নজর রাখলো পুরো সময়টা। এবার মাত্র ১ সেট জুয়েলারি পিহু চূড়ান্ত করতে বললো। নীরা আরো নিতে জোড়া-জাড়ি করলেও পিহুকে মানাতে পারলো না। অতঃপর ওরা ঐ ৩ সেট জুয়েলারি নিয়েই সেখান থেকে বেড়িয়ে এলো। সারফারাজ ওদের সবাইকে সামনের ফুড কোর্টে গিয়ে বসতে বললো। তেজকে দায়িত্ব দিয়েছে ওদের ঠিক ভাবে বসিয়ে দেওয়ার। আগের ন্যায় এখানেও পিহু যা যা পছন্দের নজরে ছুঁয়েছিলো দামী দামী পাথরের তৈরি অলংকারগুলো সব প্যক করে নিয়েছে। বিল এসেছে মোটে ৭৫ লাখ টাকা। সম্পূর্ণ বিল সারফারাজ মিটিয়ে দিয়েছে।
কেনাকাটার মাঝেই সব ব্যগপত্র বহন করে পার্কিং-এ রাখা ওদের গাড়িতে রেখে আসার জন্য সারফারাজের পারসোনাল এসিস্ট্যান্ট কয়েকজন গার্ডস এনেছিলো। এখন তারাই সব জুয়েলারির প্যকেটগুলো নিয়ে চলে গেলো সঠিক জায়গায় রাখতে।
এদিকে নির্ঝর ওদের খুঁজছিলো অন্য জুয়েলারির দোকানগুলোতে। না পেয়ে যখন হতাশ হয়ে নীরাকে আবারও কল করতে নিয়েছে তখনই ফুড কোর্টের ভিতরে যেতে দেখলো নির্ঝর ওদের। নির্বাণ অনেকক্ষণ আগেই নির্ঝরের কাঁধে মাথা রাখা অবস্থাতেই ঘুমিয়ে গিয়েছে।
নির্ঝর ধীরপায়ে অগ্রসর হলো ফুডকোর্টের দিকে। ফুডকোর্টের ভিতরে আসতেই নির্ঝর ওরা সবাই বসলো যেই চেয়ারে সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললো….
—”সব কেনাকাটা শেষ তোমাদের?”
সবাই ওর দিকে তাকালো। নীরা বললো….
—”হুম শেষ। এখন খাওয়া-দাওয়া সেরেই আমরা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হবো।”
তেজ ভ্রু কুঁচকে বললো…..
—”নির্বাণকে অনেক শান্ত দেখাচ্ছে। ঘুমিয়েছে নাকি?”
নির্ঝর বললো….
—”হুম ঘুমিয়েছে।”
নীরা হাত বাড়িয়ে বললো…
—”ওকে আমার কাছে দাও ছোট ভাইয়া।”
নির্ঝর সঙ্গে সঙ্গে নির্বাণকে যত্নের সহিত নীরার কাছে দিয়ে দিলো। ফলস্বরূপ নির্বাণ একটু নড়ে-চড়ে উঠলে নীরা সামলে নিলো ওর মতো করে। নির্বাণ আবারও গভীর ঘুমে ডুবে গেলো। নীরা বললো…
—”নির্বাণ তোমাকে খুব বেশি বিরক্ত করেছে তাই না ছোট ভাইয়া? আসলে বাচ্চা-কাচ্চার দেখা-শোনা করা এতো সহজ না। আর মায়েদের মতো ধৈর্যও কারোর মধ্যে থাকে না।”
নির্ঝর উপরের দিকে তাকিয়ে বিগত কয়েকঘন্টায় নির্বাণ যে যে ভাবে ওর জীবনটাকে ত্যনা-ন্যছড়া করে ছেড়েছে তার এক বার স্মৃতিচারণ করলো। পরপরই নির্ঝর জোর পূর্বক হেসে বললো…..
—”হুম বাচ্চা পালা সত্যিই অনেক সহজ। যদি সেই বাচ্চা হয় ব্রিটিশদের বংশধর তাহলে তো আরো কথাই নেই।”
নীরা নাক মুক কুঁচকে বললো….
—”ছোট ভাইয়া! তুমি আবার আমার ছেলেকে ব্রিটিশদের বংশধর বলছো!”
—”বেশ করছি বলছি। চুপ যা তুই।”
ওদের ভাই-বোনের একে-অপরের সাথে খোঁ*চা-খুঁ*চির মাঝেই অনু ওর চেয়ার ছেড়ে উঠে বললো……
—”আমি একটু ওয়াশরুম থেকে আসছি।”
পাশে বসে থেকেই ইলমা বললো…
—”আমিও যাই তোমার সাথে?”
—”না ইলমা আপা, লাগবে না। আমি এই জায়গায় এর আগেও কয়েকবার এসেছিলাম। তাই আমার সমস্যা হবে না।”
না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৮
—”কিন্তু!”
—”কোনো কিন্তু না। তোমরা মজা করো, আমি একটু পরই চলে আসবো।”
বাকিরা আর বাঁধ সাধলো না। অনু খানিক এগোতেই নির্ঝর পিছন থেকে ধীরস্বরে বললো….
—”আমি এগিয়ে দেই আপনাকে?”
—”লাগবে না নির্ঝর সাহেব। একা চলতে শিখে গিয়েছি আমি অনেক আগেই।”
অনু আর দাঁড়ালো না। চলে গেলো দ্রুত পায়ে। নির্ঝর মুখ কুঁচকে বললো…..
—”একটু সঙ্গ তো নেওয়া যেতোই। একেবারে মুখের উপর না করে দেওয়ার কি আছে? বিয়ের আগে তো আর আমি অধমের মতো ওয়াশরুম শেয়ার করতে বলতাম না।”
