না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৮ (৩)
মাইশা জান্নাত নূরা
সারফারাজ ফুড কোর্টের ভিতর প্রবেশ করে ওদের সবার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বললো….
—”অর্ডার করেছো তোমরা?”
নীরা বললো….
—”হ্যা, মেজো ভাইয়া করে দিয়েছে। বসো তুমি বড় ভাইয়া।”
সারফারাজ পিহুর পাশের চেয়ারটা টেনে সেখানে বসে বললো….
—”অনু কোথায়? ওকে দেখছি না যে?”
ইলমা বললো….
—”ওয়াশরুমে গিয়েছে।”
—”একা যেতে দিলে কেনো? এতো বড় একটা সপিং মল। ওর কাছে তো কোনো ফোনও নেই। দিক হারিয়ে ফেললে সমস্যা হয়ে যাবে।”
নির্ঝর আগে-পিছে না ভেবে নির্লজ্জের মতো বললাম….
—”আমি যেতে চেয়েছিলাম ওনাকে এগিয়ে দিতে। দরকার হলে সিকিউরিটি গার্ডের মতো ওয়াশরুমের বাহিরে পাহাড়াও দিতাম। কিন্তু উনি আমায় মুখের উপর না করে দিয়েছিলেন জন্যই….!”
সারফারাজ ওর দু’ভ্রুর মাঝে কয়েকটা ভাঁজ ফেলে গম্ভীর স্বরে বললো….
—”তোকে কেনো যেতে হবো? ইলমা, নীরা ওরা তো ছিলোই। অনু ছোট হলেও কি একজন এডাল্ট পুরুষের সাথে ওয়াশরুম পর্যন্ত যাওয়ার বিষয়ে কম্ফোর্ট ফিল করবে? গর্দ*ভ কোথাকার।”
বড় ভাইয়ের ধমক খেয়ে নির্ঝরের মুখ শুকিয়ে গেলো। ইলমা বললো….
—”অনু বললো ও নাকি এর আগেও এখানে কয়েকবার এসেছিলো। আশপাশটা ওর দেখা আছে। তাই আর জোর করি নি আমিও যাওয়ার জন্য। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমাদের কারোর যাওয়া উচিত ছিলো।”
তেজ বললো…..
—”এক্ষুণি তো গেলো। একটু অপেক্ষা করি আমরা। আসতে না পারলে তখন সবাই মিলে না হয় খুঁজার মিশনে নামবো।”
ওদের কথপোকথন এর মাঝেই ওয়েটার খাবার দিয়ে গেলেন। নির্ঝর একটু পর পর আঁড়চোখে দরজার দিকে তাকাচ্ছে অনু আসলো কি না তা দেখতে। পিহু আর ইলমা সবার প্লেটে খাবার পরিবেশন করে দিতে শুরু করলো যত্নের সহিত। নির্ঝরের প্লেটে দিতে নিলে নির্ঝর হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে বললো…..
—”তোমরা সবাই খাওয়া শুরু করো। আমি আসছি।”
এই বলে নির্ঝর কাউকে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়েই এক ছুটে ফুড কোর্ট থেকে বেড়িয়ে গেলো। ইলমা বললো….
—”উনার আবার কি হলো!”
সারফারাজ বললো….
—”শুরু করো তোমরা। এসে যাবে ও।”
ফুড কোর্ট থেকে বের হওয়ার পর নির্ঝরের হাঁটার গতি অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গিয়েছে। ঐ ফ্লোরেই হাতের ডানপার্শে যেই ওয়াশরুমে নির্বাণকে নিয়ে ঝামেলায় পড়েছিলো নির্ঝর তার পাশের ওয়াশরুমটাই হলো লেডিসদের জন্য। সে সরাসরি লেডিস ওয়াশরুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। এভাবে ভিতরে ঢোকা সম্ভব না জন্য তাই নির্ঝর অপেক্ষা করতে লাগলো ভেতর থেকে কারোর বেড়িয়ে আসার। মিনিট পাঁচেক পর একজন মধ্যবয়সের মহিলা বের হয়ে আসলে নির্ঝর তাকে থামতে বললো। নিজের ফোনটা বের করে অনুর লুকিয়ে তোলা কিছু ছবি থেকে একটা ছবি তাকে দেখিয়ে বললো…..
—”ওয়াশরুমের ভিতরে কি এনাকে দেখেছেন আপনি?”
মহিলাটি ‘না’ বলে চলে গেলেন। নির্ঝর বিরবিরিয়ে বললো….
—”হয়তো অনু বের হওয়ার আগেই উনি বের হয়ে এসেছেন। আরেকটু অপেক্ষা করে দেখি উনি বের হন কিনা।”
এভাবেই নির্ঝর আরো প্রায় ১৫ মিনিট সেখানে দাঁড়িয়েই কাটিয়ে দিলো। কিন্তু অনুকে বের হতে দেখলো না সে। এর ভিতর আরো প্রায় ৪ জন মহিলা ভিতরে গিয়েছেন-এসেছেন। নির্ঝর ওর দাঁত দিয়ে ডান হাতের কনিষ্ঠা আঙুলের নখ কাটতে কাটতে বললো…..
—”একটা মেয়ের ওয়াশরুমে এতো সময় কিভাবে লাগতে পারে!”
পরক্ষণেই নির্ঝর ভাবুক স্বরে বললো…..
—”উনি কি তবে এই ওয়াশরুমে নেই? কিন্তু উনি তো বললেন এখানের প্রায় অনেককিছুই ওনার চেনা-জানা। তাহলে এই ফ্লোরেই ওয়াশরুম থাকতে অন্য ফ্লোরে ওনাকে কেনো যেতে হবে!”
নির্ঝর এবার খানিক হতাশ ভাব নিয়ে নিচের ফ্লোরের ওয়াশরুমটাও চেক করে আসলো। সেখানেও সে অনুর দেখা পেলো না। এভাবে করে উপরের আরো ২টা ফ্লোর দেখার পরও অনুর দেখা না পেয়ে নির্ঝর এর অনুকে নিয়ে চিন্তা আরো দৃঢ় হলো। সে এবার ছুটলো সারফারাজ, তেজ ও বাকিরা যে ফুড কোর্টে ছিলো সেখানে।
নির্ঝর ফুড কোর্টের সামনে আসতেই দেখলো ওরা সবাই খাওয়া শেষ করে বেড়িয়েছে বাহিরে। নির্ঝর ওদের কাছাকাছি এসে হাঁটুতে দু’হাত ঠেকিয়ে জোড়ে জোড়ে শ্বাস ফেলছে। পুরো সময়টা দৌড়ের উপরে থাকার কারণেই এখন ওর অবস্থা কিছুটা অস্বাভাবিক। তেজ বললো…..
—”কি রে কোথায় গিয়েছিলি? তোকে দেখে এমন মনে হচ্ছে কেনো যে, গরু চুরি করে ধরা পড়ার ভয়ে পালিয়ে এলি যেনো!”
পিহু বললো….
—”আহহ তেজ ভাই, এভাবে নির্ঝর ভাইয়ের পিছনে লাগছো কেনো তুমি? দেখছো তো কেমন হাঁপাচ্ছে! একটু স্থির হতে দাও। তারপর তো বলবেই কোথায় গিয়েছিলো খাওয়া-দাওয়ার পর্ব ছেড়ে।”
ইলমা আশপাশটা দেখে বললো….
—”অনুটাও সেই কখন গেলো ওয়াশরুমের কথা বলে এখনও এলো না। এতোসময় তো লাগার কথা না!”
নির্ঝর দ্রুত স্বরে বললো…..
—”উনি তাহলে এখানেও আসেন নি?”
ইলমা ভ্রু কুঁচকে বললো…..
—”মানে?”
বাকিরাও নির্ঝরের দিকে তাকিয়ে আছে। নির্ঝর নিজেকে প্রায় সামলে নিয়েছে ইতিমধ্যেই। এবার সে বললো….
—”তখন সারফারাজ ভাই ওভাবে বলার পর আমার মন মানছিলো না জন্য……….
নির্ঝর পুরো বিষয়টা খুলে বললো।
কোথাও ওনাকে না পেয়ে তোমাদের কাছে আসলাম। এখানেও উনি আসেন নি। তাহলে উনি কোথায় গেলেন! আমার মাথা কাজ করছে না।”
ইলমা বললো…..
—”ও কি তাহলে দিশা হারিয়ে ফেললো?”
তেজ বললো….
—”সারফারাজ ভাইকে পুরো বিষয়টা জানাতে হবে। আর ইমিডিয়েটলি পুরো মার্কেটে আমাদের ওকে খোঁজা উচিত।”
পিহু বললো…..
—”অনুর এই জায়গাটা চেনা বলেছিলো তো ও। তাহলে দিশা হারাবে কেনো? আর হারালেও পুরো মার্কেটে ঘোরাঘুরি করে আমাদের খোঁজার কথা না ওর। সরাসরি মেইন গেইটে যাবে নিশ্চয়ই।”
ওদের কথপোকথন এর মাঝেই সারফারাজ সেখানে এসে দাঁড়ালো। ফুড কোর্টের ম্যনেজার ওর পরিচিত ছিলো তাই বিল মিটানোর সময় কথা বলতে ব্যস্ত ছিলো এতোসময় সে। সারফারাজ বললো…..
—”তোমরা এখনও এখানে দাঁড়িয়ে যে! বলেছিলাম তো গাড়িতে গিয়ে বসতে। আর অনু কই?”
পিহু পুরো বিষয়টা সারফরাজকে খুলে বলতেই সারফারাজ বললো…..
—”পিহু তুমি ইলমাকে নিয়ে উপর তলাটা দেখে এসো। ২জন গার্ডস তোমাদের সাথে থাকবে সেফটির জন্য। আর নীরা তুই নিচতলাটা চেক দে। তোর সাথেও ২জন গার্ডস থাকবে। তেজ তুই পার্কিং সাইডটা দেখে আয়। পাশাপাশি গেইটে গেইটে থাকা সিকিউরিটি গার্ডসদের অনুর ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করবি তারা কোনো আপডেট দিতে পারে কিনা। নির্ঝর তুই নীরার থেকে নির্বাণকে নিয়ে আমার সাথে আয়।”
সারফারাজের কথানুযায়ী ওরা তেমনটাই করতে শুরু করলো। সারফারাজ নির্ঝরকে নিয়ে সরাসরি সপিং মলের অফিস রুমে চলে গেলো। সেখানের গার্ডসরা সারফারাজের পরিচয় পাওয়ামাত্র ওর পথ পরিষ্কার করে দিলো। কন্ট্রেল রুমের ভিতরে আগে থেকে ২জন লোক বসে ছিলো। সারফারাজকে ভিতরে আসতে দেখে তারা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন….
—”একি, আপনি কে? ভিতরে আসলেন কিভাবে? গার্ডস!”
সারফারাজ গম্ভীর স্বরে বললো…..
—”আমি এমপি সারফারাজ ইউসুফ খান।”
লোক দু’টো আমতা আমতা স্বরে বললো…..
—”ওওও সরি স্যার, আমরা আসলে বুঝতে পারি নি। বলুন স্যার কিভাবে সহায়তা করতে পারি আপনার!”
—”বিগত ২ঘন্টার পুরো মার্কেটের সিসিটিভি ফুটেজের রেকর্ড দেখতে চাই আমি।”
লোক দু’টো মাঝে একজন ‘ঠিক আছে স্যার’ বলে ওদের রেকর্ড গুলো দেখাতে শুরু করলো। সারফারাজ বললো….
—”২য় তলার ফুডকোর্টের রেকর্ড ও সেই ফ্লোরে থাকা ওয়াশরুম সাইডের রেকর্ডটা দেখান তো।”
লোকটা সেই রেকর্ড-ই বের করলেন। সারফারাজ আর নির্ঝর দেখলো অনু ওর কথা অনুযায়ী তখন ফুড কোর্ট থেকে বেড়িয়ে ঐ ফ্লোরেরই ওয়াশরুমে চলে গিয়েছে। মিনিট দুই যেতে না যেতেই ও আবার বের হয়ে ফুড কোর্টের দিকেই আসছিলো তখুনি কয়েকজন পুরুষ অনুর সামনে এসে দাঁড়ালো। অনু তাঁদের দেখে কিছুটা অবাব হয়েছে যে তার ভাব ও মুখশ্রী জুড়েই ফুটে উঠেছে। নির্ঝর বললো…..
—”ঐ তো অনু, কিন্তু ওর সামনে দাঁড়ানো লোকগুলো কে? চেহারা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।”
সারফারাজ বললো…..
—”পজ করুন এখানেই আর জুম করুন। লোকগুলোর চেহারা দেখা যায় কিনা দেখি।”
ভিডিওটা পজ করে জুম করলে সব গুলো লোকের চেহারা
স্পষ্ট দেখা না গেলেও তাদের পোশাক পরিধানের রুচি দেখে কন্ট্রোল রুম নিয়ন্ত্রণকারী লোকটা বললো…..
—”স্যার! সচরাচর এই ধরণের পোশাক পড়ে এখানে আসেন তারাই যারা গ্রাম অন্ঞ্চলে বাস করেন৷”
সারফারাজ বললো….
—”ভিডিওটা চালু করুন। আর অনু ঐ লোকগুলোর সাথে কতোসময় থাকে, কই যায় এরপর সেটা ফলো করুন।”
ভিডিওটা চালু করতেই ওরা দেখলো অনু স্বইচ্ছায় লোকগুলোর সাথে নিচের ফ্লোরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরলো। সেই ফুটেজে ঠিক অনুর সিঁড়িতে পা ফেলার সাথে সাথেই নির্ঝরকে ফুডকোর্ট থেকে বের হয়ে ওয়াশরুমের দিকে ছুটে যেতে দেখা গেলো। নির্ঝর তৎক্ষনাৎ চেয়ারের উপর ওর মুষ্ঠ করা ডান হাত দিয়ে বারি মে*রে বললো…..
—”সিট! কেনো যে আর একটু আগে আমি বের হলাম না!”
নির্বাণ তখনও নির্ঝরের কাঁধে মাথা রেখে গভীর ঘুমে ডুবে ছিলো। সিঁড়ি দিয়ে নামছে যখন তখনই লোকগুলোর মুখ কিছুটা স্পষ্ট ভাবে দেখা গেলো ক্যমেরাতে। লোকগুলোর বয়স ৩০-৩৫ এর ভিতরেই হবে। সবার শরীরে এক রকম পোশাক রয়েছে। চেক প্রিন্টে সাদা লুঙ্গী, হালকা হলদেটে রঙের ফতুয়া, গলায় লাল চেক প্রিন্টের গামছা ঝুলানো আর পায়ে সাধারণ স্যন্ডেল জুতা রয়েছে। নির্ঝর বললো….
—”এই লোকগুলো কি অনুর গ্রাম থেকে এসেছে!”
সারফারাজ গভীরভাবে ওদের পর্যবেক্ষণ করতে করতে বললো….
—”তেমনই কিছুই মনে হচ্ছে।”
এরপর দেখা গেলো লোকগুলোর সাথে অনু সরাসরি মার্কেটের বাহিরে চলে এলো। সেখানে আগে থেকেই দাঁড় করিয়ে রাখা একটা কালো রংয়ের পুরোনো মডেলের গাড়িতে ওরা সবাই উঠে বসলো। নির্ঝর বললো……
—”অনুতো গাড়িতে উঠে বসলো বড় ভাইয়া। ওরা তো অনুকে নিয়ে চলে যাবে মনে হচ্ছে। বড় ভাইয়া কিছু করো!”
—”নির্ঝর তুই শান্ত হ।”
বলতে বলতেই গাড়িটা স্টার্ট হলো। সারফারাজ লোকটাকে বললো…..
—”গাড়ির নাম্বার প্লেটটা দেখা যাচ্ছে পজ করে জুম করুন।”
লোকটা তেমনই করলো। সারফারাজ তৎক্ষনাৎ ওর ফোন দ্বারা ছবি উঠিয়ে নিলো। অতঃপর বললো….
—”এতোসময় আমাদের সহায়তা করার জন্য আপনাদের দু’জনকে ধন্যবাদ। নির্ঝর চল এখান থেকে৷”
পরক্ষণেই সারফারাজ আর নির্ঝর কন্ট্রোল রুম থেকে বেড়িয়ে এলো। নির্ঝর অস্থির স্বরে বললো……
—”বড় ভাইয়া! ওরা কারা? ওরা অনুর কোনো ক্ষ*তি করে দেয় যদি! আর ওরা অনু গ্রাম থেকে আসা লোক হলে অনু কেনো ওদের সাথে স্বইচ্ছায় গেলো! আমার মনে হচ্ছে ওরা অনুকে এমন কিছু বলেছে যার জন্য অনু ওদের কথার বশে পরে গিয়েছিলো। ভাইয়া আমার মাথা কাজ করছে না। কি হবে অনুর!”
সারফারাজ শান্ত কন্ঠে বললো…..
—”এভাবে অস্থির হোস না নির্ঝর। কিচ্ছু হবে না অনুর৷ একবার যখন অনুর খোঁজ কিছুটা পেয়েছি আমরা এবার খুব তাড়াতাড়ি অনুকে আবারও ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে।”
কিন্তু নির্ঝরের মন কোনোভাবেই মানছে না যেনো। সারফারাজ ওর ফোন থেকে প্রথমে পিহুকে এরপর নীরা ও তেজকে কল করে গেইটের বাহিরে আসতে বললো এক্ষুণি। অতঃপর ওরাও সেদিকে অগ্রসর হচ্ছে। গেইটে বাহিরে আসামাত্র তেজ যে আগে থেকেই ছিলো সেখানে সে বললো…..
—”ভাইয়া, অনুর কোনো খোঁজ কেউ দিতে পারেন নি। গার্ডসরা বললেন, এমন বয়সের ও চেহারার মিল আছে শত শত মেয়ে সপিং মলে আসছে আবার বেড়িয়ে যাচ্ছে তাই নির্দিষ্ট ভাবে কাউকে মনে রাখা তাদের পক্ষে সম্ভবপর হয়ে উঠে না।”
তখুনি পিহু, ইলমা, নীরা সেখানে উপস্থিত হলে সারফারাজ ওদের সবাইকে অনুর পাওয়া খোঁজ সম্পর্কে অবগত করলো। ইলমা অবাক ও চিন্তা উভয় মিশ্রিত স্বরে বললো…..
—”কিন্তু অনু এমনটা কেনো করলো? ও তো গ্রাম থেকে পালিয়ে এসেছিলো। তাহলে ও কেনো ওর গ্রামের পরিচিত লোকদের সাথে করে কোথাও যাবে!”
সারফারাজ বললো…..
—”সেই প্রশ্ন আমাদের সবারই। আর এই উত্তর কেবল অনুই আমাদের দিতে পারবে। তার জন্য অনুকে খুঁজে পাওয়াটা জরুরী।”
এই বলে সারফারাজ উপরমহলের লোকদের সাথে কথা বলবে বলে ঠিক করলো। পরিচিত আইজিপির সাথে কথা বললো সে। নির্ঝর আর তেজকে খোঁজার জন্য যেমন প্রসেস প্রয়োগ করেছিলো তেমনই করলো। আইজিপির হোয়াটসঅ্যাপে অনুর চলে যাওয়া ঐ গাড়ির নাম্বার প্লেটের ছবিটা পাঠিয়ে দিলো।
নীরা নির্ঝরের থেকে নির্বাণকে নিয়ে নিয়েছে নিজের কাছে। নির্ঝরকে কেমন যেনো দেখাচ্ছে এইমূহূর্তে। সারফারাজ বললো…..
—”তোমরা সবাই বাড়ি ফিরে যাও। আমি দেখছি অনুর বিষয়টা। কোনো আপডেট পেলে জানিয়ে দিবো।”
নির্ঝর তৎক্ষনাৎ বললো…..
—”বড় ভাইয়া, প্লিজ আমাকে তোমার সাথে থাকতে দাও। আমিও তোমার সাথে অনুকে খোঁজার কাজে থাকতে চাই।”
তেজ বললো…..
—”ভাইয়া, আমি আর নির্ঝর থাকি তোমার সাথে। মেয়েরা বাড়ি ফিরে যাক!”
সারফারাজ আর ‘না’ সাধলো না। অতঃপর পিহু, ইলমা ও নীরাকে নিয়ে একটা গাড়ি করে চলে গেলো। সারফারাজ গার্ডসদের একটা গাড়ি ওদের গাড়ির সাথে পাঠিয়ে দিলো।
সারফারাজ, তেজ ও নির্ঝর ওর গাড়িতে উঠে বসলো। সারফারাজ নিজেই ড্রাইভ করছে। উদ্দেশ্য সরাসরি আইজিপির অফিসে যাওয়া।
এর ভিতর তেজ অনু ও ইলমার থাকার সেই ভাড়া বাসাতেও খোঁজ নিয়েছিলো ওর বন্ধু কফিশপের ম্যনেজার জাকিরকে কল করে। জাকির স্বয়ং সেখানে গিয়ে দেখে এসেছে অনু সেখানে যায় নি। নির্ঝরের বুকের ভেতরে তোলপাড় চলছে। কোনোভাবেই সে নিজেকে শান্ত করতে পারছে না।
আইজিপির অফিসে আসার পর সারফারাজ ওদের নিয়ে ভিতরে চলে এলো। আইজিপি সারফারাজকে দেখে বললেন…..
—”সারফারাজ, আমি এক্ষুণি তোমাকে কল করতে যাচ্ছিলাম। এসেছো যখন ভালোই করেছো। বসো এখানে তোমরা।”
সারফারাজ, তেজ ও নির্ঝর আইজিপির মুখোমুখি চেয়ারে বসলো। আইজিপি তার ল্যপটপটা থেকে প্রোজেক্টরের সাহায্যে দেওয়ালের উপর পড়া প্রতিচ্ছবির দিকে দেখতে বললেন। ওরা তাকাতেই আইজিপি বললেন…..
—”গাড়িটা মেইন রাস্তা থেকে পেরিয়ে খুব তাড়াতাড়িই গ্রামীণ এলাকার রাস্তায় নেমে গিয়েছে। আর এটা একটা প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকা৷ এখানে এখনও পুরোপুরি ভাবে কারেন্ট ব্যবস্থা পৌছায় নি। রাস্তাগুলো সব কাঁচা। তাই সিসিটিভি ফুটেজ কেবল ঐ রাস্তায় নামা পর্যন্তই দেখা গেছে। এরপর গাড়িটাকে ট্রেস করা সম্ভব হয় নি।”
নির্ঝর বললো…..
—”এটাই মনে হয় অনুর গ্রাম। অনুকে নিয়ে তাহলে ওরা ওর গ্রামে গিয়েছে! কিন্তু ঐ জায়গাটা তো অনুর জন্য একেবারেই অনিরাপদ।”
সারফারাজ তেজকে উদ্দেশ্য করে বললো…..
—”নির্ঝরকে নিয়ে গাড়িতে গিয়ে বোস তুই তেজ। আমি আসছি একটু পর।”
নির্ঝর বললো…..
—”কিন্তু ভাইয়া…!”
সারফারাজ বললো….
—”যেতে বললাম তো তোদের আমি!”
তেজ বললো….
—”চল, নির্ঝর।”
অতঃপর তেজ আর নির্ঝর সেখান থেকে বেড়িয়ে গেলো। আইজিপি সারফারাজকে বললেন….
—”কে এই মেয়ে সারফারাজ? আমাকে একটু পুরো বিষয়টা খোলাসা করে বলো তো। তাহলে ওকে খোঁজার কাজটা আরো সহজ হবে।”
সারফারাজ কিয়ৎক্ষণ নিজ ভাবনায় ডুবে রইলো। অতঃপর অনুর ছবি আইজিপিকে দেখিয়ে বললো…..
—”এই সেই মেয়ে। নাম অনু। বয়স ১৫-১৬ এর মাঝামাঝি। আমাদের বাসাতেই থাকছে কিছুদিন হলো। আমার ছোট বোন হিসেবে গ্রহন করেছি ওকে আমরা। যে গ্রামে গেলো গাড়িটা ঐ গ্রামেই ওর জন্ম হয়েছে এবং এতোবছরের বেড়ে উঠা। কিছুদিন আগে একটা এক্সিডে*ন্টাল ঘটনায় অনুর বাবা-মা দু’জনের মৃ*ত্যু হলে অনু ঢাকায় চলে আসে। বয়স কম হওয়া স্বত্ত্বেও বাঁচার তাগিদে গার্মেন্টসে চাকরি নিয়েছিলো।”
—”কিভাবে মা*রা গিয়েছেন ওর মা-বাবা?”
—”এ বিষয়ে ডিটেইলস-এ পরে আপনাকে জানাবো। আপাতত আমাদের ঐ গ্রামে যাওয়াটা জরুরি।”
—”ঠিক আছে। আমি আমার নিয়ন্ত্রণে থাকা বিশেষ ফোর্সদের রেডি হতে বলছি। আধঘন্টার মধ্যেই আমরা এখান থেকে বের হতে পারবো। গ্রামটা খুব বেশি দূরে না। তাই ওখানে পৌঁছাতে খুব একটা বে*গ আমাদের পেতে হবে না।”
—”সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে অলরেডি।”
—”হুম।”
—”আমি গাড়িতে গিয়ে বসছি। আপনি আসুন।”
—”আচ্ছা।”
অত:পর সারফারাজ আইজিপির অফিস থেকে বের হলো। সরাসরি বাহিরে আসতেই নির্ঝর আর তেজকে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললো…..
—”আধঘন্টার ভিতরে আমরা এখান থেকে বের হবো। আইজিপি আর স্পেশাল ফোর্স নিয়ে রওনা করবেন অনুর গ্রামের উদ্দেশ্যে।”
নির্ঝর আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। তৎক্ষণাৎ সে সারফারাজের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। সারফারাজ আর তেজ নির্ঝরের এরূপ কাজে অবাক হলো। নির্ঝর সারফারাজের দুই পা জড়িয়ে ধরে আকুতি ভরা স্বরে বললো……
—”বড় ভাইয়া, প্লিজ! আমার অনুকে তুমি অক্ষত অবস্থায় খুঁজে এনে দাও। আমি ওকে ছাড়া থাকতে পারবো না। আমি সত্যিই পারবো না।”
নির্ঝরের দু’চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। এই নির্ঝরকে আজ চেনাই যাচ্ছে না যেনো! সবসময় হাসি-মজাতে মেতে থাকা, জীবনকে সিরিয়াস ভাবে না নেওয়া সেই ছেলেটা কিনা আজ একটা দু’দিন হলো পরিচয় এমন মেয়ের জন্য পায়ে ধরে কান্না করছে ফিরে পাওয়ার জন্য! নির্ঝর বললো….
না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৮ (২)
—”আমার বুকের ভিতরটাতে মনে হচ্ছে সবকিছু ভেঙেচুরে আসছে ভাই। বিশ্বাস করো আমি যে অনুকে এতোটা ভালোবেসে ফেলবো ভাবি নি। ওনার এই কিছুসময়ের জন্য নিখোঁজ থাকা আমার সহ্য হচ্ছে না। কলিজাটা পুড়ছে আমার। এই য*ন্ত্র*ণা সহ্য হচ্ছে না। যদি তুমি ওকে এনে দিতে না পারো তাহলে আমার জন্য এখনই কব*র খুঁ*ড়ে রাখো। আমি হাসতে হাসতে সেই কবরে নিজেকে দাফন করতে রাজি আছি কিন্তু ওনাকে ছাড়া বাঁচতে রাজি নই।”
