Home না চাইলেও তুমি শুধু আমারই না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৭

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৭

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৭
মাইশা জান্নাত নূরা

লাইব্রেরি রুমে বসে অফিসের কিছু ফাইল দেখতে ব্যস্ত ছিলেন জামাল খান। সেইসময় নীরা দরজায় নক করে বললো….
—”ভিতরে আসবো বড় বাবা?”
জামাল তার দৃষ্টি ফাইলের উপরেই স্থির রেখে গম্ভীর স্বরে বললেন….
—”হুম এসো।”
নীরা জামালের সামনে এসে দাঁড়াতেই জামাল ইশারায় ওকে চেয়ারে বসতে বললে নীরা বসলো। জামাল ফাইলগুলো বন্ধ করে টেবিলের উপর দু’হাত ভাঁজ করে নীরার দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন….
—”তোমার ভবিষ্যত নিয়ে কি কোনো পরিকল্পনা আছে নীরা?”
নীরা ধীর স্বরে বললো….

—”আমার অগোছালো জীবনটাকে গুছিয়ে নেওয়ার জন্য এখন নির্বাণ আছে। নির্বাণের যোগ্য মা হয়ে ওকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে তৈরি করা ছাড়া আলাদা কোনো পরিকল্পনা নেই বড় বাবা।”
—”আমাদের সমাজে সিংগেল মাদারদের জীবন এতো সহজ হয় না নীরা। আর এখন পর্যন্ত আমাদের রিলেটিভ থেকে শুরু করে সমাজে যাদের সাথে সবসময় উঠা-বসা করা হয় তারা তো জানেন তুমি অবিবাহিত। তাই তোমার সিংগেল মাদার হয়ে থাকার সিদ্ধান্তটাকে তারা কেউই সম্মান করবে না। আশা করছি আমার কথার মানে তুমি বুঝতে পেরেছো!”
নীরা একবার ঢোক গি*ললো। প্রতিত্তুরে কিছু বলার ভাষা সে খুঁজে পাচ্ছে না। জামাল বললেন….
—”অতীতে তোমার সাথে যা হয়েছে এবং মাঝের এই ২ বছর তুমি নিজের পরিবার থেকে নিজেকে ও নিবার্ণকে আড়াল করে রেখেছিলে সব মাথায় রেখে আমরা সবাই চাইছি তুমি নতুন ভাবে নিজের জীবনটাকে সাজিয়ে নাও।”
এই বলে জামাল খান একটু থামলেন। নীরা চট করেই এবার তাকালো জামালের দিকে। জামাল আবারও বললেন….

—”তোমার যদি কোনো পছন্দ থেকে থাকে তাহলে নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে সে বিষয়েও বলতে পারো আর না থাকলে আমাদের পছন্দ করা ব্যক্তিটির সাথে সাক্ষাৎ-এ একবার কথা বলে দেখতে পারো।”
নীরা নির্বাকের ন্যায় তাকিয়ে আছে জামালের দিকে। কোনো প্রতিক্রিয়া করতেও যেনো ভুলে গিয়েছে সে। কয়েকসেকেন্ড ওভাবেই থাকার পর নীরা নিজেকে সামলে নেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে বললো….
—”বড় বাবা! আমার সম্পূর্ণ সত্য জানার পরেও কি আপনার মনে হয় কোনো ভালো বংশের, শিক্ষিত, মর্যাদাসম্পন্ন ম্যচিউর বয়সের ব্যক্তি আমাকে তার জীবনের অর্ধাংশ হিসেবে গ্রহন করবেন?”
—”দুনিয়ায় যেমন তোমার ক্ষতি করে মজা লুটে নেওয়ার মতো জঘন্য ব্যক্তির বাস রয়েছে তেমনই তোমার সাথে হওয়ার সকল অন্যায়কে ফুল হিসেবে গ্রহন করে সেই ফুল দ্বারা যেনো তোমার শরীরে কোনো টোকা না লাগে ও তোমাকে সর্বোচ্চ সুখ দেওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত থাকার মতো ভালো মানসিকতার ব্যক্তিরও বাস আছে, নীরা মা।”
নীরার ছলছল করতে থাকা নয়নজোড়া থেকে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দু’ফোঁটা অশ্রু। যা নীরা সঙ্গে সঙ্গে মুছে নিলো। জামাল আবারও বললেন….

—”মানুষ ভালো নাকি খারাপ তা বোঝার জন্য তোমাকে তাদের সাথে মিশতে হবে। তাদের জানতে হবে। যদি তুমি নিজেকে আড়াল করে রাখতে চাও সবসময় তাহলে সেটা দিবে তোমার সবথেকে বড় নির্বুদ্ধিতার পরিচয়। শেষ একটাই কথা বলবো, নির্বাণের কথা একটাবার ভেবো। ওর তো কোনো দো*ষ নেই। বাবার স্নেহ ও বাবার পরিচয় থেকে ও কেনো বন্ঞ্চিত হবে? আজ বাবা কি জিনিস তা ও বুঝছে না ঠিকই কিন্তু ২দিন পর ও যখন বাহিরে যেতে শুরু করবে ছোট-বড় যেকোনো পরিবেশে আর ৫জন বাচ্চাকে তাদের বাবার থেকে আদর-স্নেহ পেতে দেখবে আর ওকে কেউ ওর বাবার কথা জিজ্ঞেস করবে তখন তোমার কাছে এসে ও প্রশ্ন করলে কি উত্তর করবে তুমি? আছে কোনো উত্তর তোমার কাছে?”
জামালের শেষ কথাগুলো যেনো ছু*রির মতো গেঁথে বসলো নীরার বুকের ভেতর। কানে বাজছে জামালের করা একটা প্রশ্ন ,”উত্তর আছে তোমার কাছে?”
নীরার ঠোঁটজোড়া মৃদুভাবে কাঁপছে। গলা এবার শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে। বুকের ভেতরটাতে হঠাৎ করেই কেমন ভারী ভারী অনুভব হলো নীরার। যেনো কেউ ওর বুকের উপর পাথর চাপিয়ে দিয়েছে। নীরা ধরে আসা গলা নিয়ে বলার চেষ্টা করলো….

—”আমি…আমি..!”
কিন্তু সে কথা শেষ করতে পারলো না। পরক্ষণেই নীরা ওর বুকের উপর এক হাত চেপে ধরলো। জোড়ে জোড়ে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে সে অতি কষ্টে। নীরা বললো….
—”বড় বাবা, আমার শ্বাস নিতে..শ্বাস…!”
জামাল খান সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন, “নীরা!” বলে।
নীরাও ওর চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই হোঁচট খেলো টেবিলের পায়ার সাথে। ওর চোখ দু’টো ঝাপসা হয়ে আসছে। মাথা ঘুরাচ্ছে। জামাল খান নীরার পাশে এসে দাঁড়িয়ে চিন্তিত কন্ঠে বললেন….
—”নীরা মা! কী হয়েছে তোমার?”
নীরা হাঁপাচ্ছে। কোনোভাবেই আর শ্বাস নিতে পারছে না সে। এবার নীরা দু’হাত দিয়ে ওর বুক চেপে ধরে কেমন ছটফট করতে করতে বললো….

—”শ্বাস নিতে পারছি না।”
পরপরই নীরা ঢলে পড়লে জামাল খান পাশেই থাকায় ওকে ওকে ধরে নিলেন এবং চিৎকার করে বলে উঠলেন….
—”কেউ আছে বাহিরে? তাড়াতাড়ি এসো!”
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তাহমিনা ছুটে এলেন লাইব্রেরি রুমের ভিতরে। জামাল ও তাহমিনার পাশের রুমটাই লাইব্রেরি রুম হওয়ায় দেড়ি হলো না তার আসতে। তাহমিনা নীরার গালের উপর হালকা ভাবে চাপড় মে*রে বললেন….
—”নীরা, ও মা! কি হয়েছে তোর! চোখ খোল মা!”
—”তুমি ওর পা জোড়া ধরো। ওকে শুইয়ে দিতে হবে। মনে তো হচ্ছে সেন্সলেস হয়ে গিয়েছে।”
তাহমিনা তেমনটাই করলেন। ওনারা দু’জনে ধরে নীরাকে তাদের রুমেই এনে বিছানায় শুইয়ে দিলেন। হঠাৎ তাঁদের রুম থেকে জোড়ে জোড়ে কথা বলার আওয়াজ আসায় আতুশি ও শিউলি ছুটে এলেন সেখানে। আসতেই বিছানায় নিজের মেয়েকে অচেতন অবস্থায় থাকতে দেখে আতুশি নীরার মাথার পাশে বসে বললেন….
—”কি হলো হঠাৎ আমার মেয়েটার! সেন্স হারালো কি করে?”
জামাল খান পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিলেন তাদের পারিবারিক ডাক্তারকে আসতে বলার উদ্দেশ্যে। তাহমিনা বললেন….

—”জানি না কি হয়েছে হঠাৎ ওর। ভালো মেয়ে ওনার সাথে কথা বলার জন্য লাইব্রেরি রুমে গেলো। এরপর হঠাৎ-ই উনি চিল্লিয়ে ডাকতে শুরু করলেন। গিয়ে দেখি নীরা ওর সেন্স হারিয়েছে।”
শিউলি বেডসাইড টেবিলের উপর থেকে পানির গ্লাসটা নিয়ে তাহমিনার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন….
—”ওর চোখে-মুখে একটু পানির ছিঁটা দাও তো বড় ভাবী। সেন্স ফিরে কিনা!”
তাহমিনা তেমনই করলেন। কিন্তু নীরার তরফ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া এলো না। ইতিমধ্যেই খান বাড়ির বাকি সদস্যরাও জমা হয়েছে জামাল-তাহমিনার রুমে। নির্বাণ নির্ঝরের কোলে ছিলো। ছোট্ট নির্বাণ নীরার বুঁজে থাকা মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। এই ভীর, সবার মলিন মুখ দেখে বোঝার চেষ্টা করছে কি হয়েছে এখানে! ইলমা, অনু একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। পিহু এগিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে আতুশির পাশে। জামাল গম্ভীর স্বরে বললেন…..
—”আমরা কথা বলছিলাম। হঠাৎ-ই নীরার শ্বাস নিতে কষ্ট হতে শুরু করলো। তার কয়েক সেকেন্ডের মাঝেই নীরা অজ্ঞান হয়ে গেলো। আমি ডাক্তারকে আসতে বলেছি। তোমরা সবাই শান্ত হও।”
নির্বাণ নির্ঝরের কোল থেকে ঝুঁকছে বিছানার দিকে। হাত ইশারায় বলছে…

—”মাম..মাম..আমি যাবো…মাম যাবো। নি নি ঝোল মামা নামাও, নামিয়ে দাও। মাম…মাম..!”
নির্ঝর বললো….
—”মাম এখন ঘুমাচ্ছে বাবা। এখন যেতে হবে না।”
নির্বাণ এবার জোড়াজোড়ি করতে শুরু করলে তাহমিনা বললেন….
—”আসতে দাও ওকে নির্ঝর। হয়তো ছেলেকে সংস্পর্শে পেলে নীরার সেন্স দ্রুত ফিরে আসবে।”
অগ্যতা নির্ঝর নির্বাণকে বিছানার উপর নামিয়ে দিলে নির্বাণ হাটু মোড়া অবস্থাতেই এগিয়ে এলো নীরার একেবারের কাছে। নীরার বুকের উপর মাথা নুইয়ে দিয়ে বললো….
—”মাম…ও মাম…মাম! উথো মাম…আমি আল দুত্তুমি কববো না। দেখো! মাম..মাম..!”

ছোট্ট নির্বাণের মুখে আধোস্পষ্ট কথাগুলো শুনে সকলের ঠোঁটে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠলো। প্রায় আধঘন্টা পর খান বাড়ির পারিবারিক ডাক্তার এলেন নীরাকে চেক-আপ করার জন্য। তিনি নীরাকে চেক-আপ করছেন। এদিকে তার উপস্থিতি একজনের মধ্যে বড় ঝড় তুলে দিয়েছে যেনো। সেই একজন আর কেউ না এবাড়ির সুপুত্র নির্ঝর খান। কারণ বাংলোবাড়িতে থাকাকালীন অনু যখন অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলো তখন এই ডাক্তারের কাছেই নির্ঝর অনুকে ওর হবু বউ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো। আজ এখানে এ বাড়ির প্রায় সবাই উপস্থিত আছে, এমনকি স্বয়ং অনুও। যদি ডাক্তার মশাই সকলের মাঝে চেপে থাকা সত্যের হাড়িটা খোলাসা মনে ভেঙে দেন তাহলে নির্ঝরের জন্য যে এ বাড়ি ও বাহির দুই-জীবনই জাহান্নামে রূপ নিবে তা আর বলে বোঝাতে হবে না কাউকে। নির্ঝর ওর দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে তেজের পাশে এসে দাঁড়িয়ে ওর দিকে হালকা ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বললো…..

—”তেজ ভাই! ডাক্তার আঙ্কেল তো আমাকে মারার টিকিট নিয়ে হাজির হয়েছেন। কি করবো?”
তেজ হালকা বিরক্তি নিয়ে বললো….
—”তোর আবার কি হলো ডাক্তার আঙ্কেলকে নিয়ে?”
—”ভুলে গিয়েছো? লাস্ট টাইম বাংলো বাড়িতে কি গোল পাঁকিয়ে এসেছি আমি!”
তৎক্ষনাৎ তেজের পুরো বিষয়টা স্মরণ হলে তেজ দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললো….
—”এই মূহূর্তে আমার নিজেরই ইচ্ছে করছে চিল্লিয়ে তোর কির্তী ফাঁ*স করতে।”
নির্ঝর বললো….
—”তুমি যদি আমার কির্তী ফাঁ*স করো তাহলে আমিও বলে দিবো তলে তলে তুমি কোনো সাধু বাচ্চা না তুমি একজন গভীর জলের মাছ।”
—”কিহ! শেষ পর্যন্ত আমার তোর থেকেও ব্লাকমেইল হজম করতে হবে?”
নির্ঝর ওর ৩২ পাঁটি দাঁত বের করে হেসে বললো….

—”না, না তা করবে কেনো? আমি তো এমনিই বললাম।”
—”এখান থেকে বের হতে দে একবার এর হিসাব তোকে গাছের সাথে উল্টো লটকিয়ে প্যন্ট খোলা অবস্থায় কাটানোর ব্যবস্থা করাবো আমি।”
নির্ঝর সঙ্গে সঙ্গে নাক ছিটকালো তেজের কথা শুনে। পরপরই তেজ ইলমার পাশে দাঁড়িয়ে বললো….
—”অনুকে নিয়ে একটু বাহিরে আসুন তো।”
ইলমা ভ্রু উঁচিয়ে বললো….
—”কেনো?”
—”আসুন তারপর বলছি।”
অতঃপর ইলমা অনুকে নিয়ে বাহিরে এলো আর পিছন পিছন তেজও নির্ঝরকে নিয়ে বাহিরে চলে এলো। ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়াতেই অনু বললো….

—”কি হলো আপা হঠাৎ এখানে আনলে যে!”
তেজ আর নির্ঝর ওদের পিছনে এসে দাঁড়ালো। তেজ বললো….
—”নির্ঝরের নাকি মাথা ব্যথা করছে খুব।”
ইলমা আর অনু ওদের দিকে তাকালো। নির্ঝর হাসিমুখেই দাঁড়িয়ে ছিলো তেজের কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে দু’হাতে নিজের মাথা চেপে ধরে বললো…..
—”আহহ, হ্যাঁ আমার মাথাটা মনে হচ্ছে ফেঁটে যাবে। কি ব্যথা!”
বলতে বলতেই নির্ঝর গিয়ে বসলো সোফায়। তেজ বললো….
—”ইলমা, আপনি তো খুব ভালো কফি বানাতে পারেন। একটু কড়া করে এক কাপ কফি বানিয়ে দিবেন বেচারাটার উপকার হতো।”
নির্ঝর আঁড়চোখে অনু ও ইলমার দিকে তাকাচ্ছে আর এক হাতে নিজের মাথা চাপছে। ইলমা বললো….
—”হঠাৎ এমন অসহনীয় মাথা ব্যথা করছে যখন তখন ডাক্তারকে দেখিয়ে নিলেই ভালো হবে মনে হচ্ছে। ডাক্তার তো এসেছেনই নীরাকে চেক-আপ করতে।”
নির্ঝর দ্রুত স্বরে বললো….

—”না- না, তার দরকার নেই। আপনি বরং তেজ ভাইয়ের কথাটাই মেনে নিন ইলমা। কষ্ট করে এক কাপ কফি বানিয়ে দিন আমায়। এতেই সেরে যাবে হয়তো মাথাব্যথাটা।”
ইলমা আর কথা বাড়ালো না। রান্নাঘরে চলে গেলো কফি বানানোর উদ্দেশ্যে। অনু বললো….
—”আমার কি কাজ এখানে!”
তেজ বললো….
—”তুমি তো ইলমাকে ছাড়া এ বাড়ির কোথাও তেমন কম্ফোর্ট ফিল করো না। তাই ইলমা তোমাকেও এনেছে নিজের সাথে।”
নির্ঝর বেহায়ার মতো বললো….
—”অনু! যদি আপনি কিছু মনে না করেন তাহলে আমার মাথাটা একটু টিপে দিবেন! খুব ব্যথা করছে জন্যই বললাম নয়তো বলতাম না।”
অনু খানিক অবাক হয়ে বললো….

—”আমি!”
—”হ্যাঁ, আপনিই। তেজ ভাই তো পুরুষ মানুষ। আর ওর হাতটাও শক্ত। ওমন শক্ত হাতে মাথা টিপে নিলে মনে হবে মাথার উপর কেউ ড্রিল মেশিন চালাচ্ছে। ব্যথা কমার বদলে আরো বেড়ে যাবে। আপনি তো মেয়ে মানুষ। বয়সও কম। আর হাতটাও নিশ্চয়ই নরম হবে।”
শেষ ২টো লাইন খুব আস্তে বললো নির্ঝর। যা অনু শুনতে পারলো না। কিন্তু তেজ ঠিকই বুঝতে পেরেছে কি বলতে পারে নির্ঝর। দাঁতে দাঁত চেপে বিরবিরিয়ে বললো…..
—”সুযোগে সৎ ব্যবহার করছিস কর। একবার একলা পাই এই শক্ত হাত দিয়েই তোর গলাটা টি*পে দিবো আমি শালা শুয়ো**।”
অনু আর উপায় না পেয়ে নির্ঝরের পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললো….
—”ভালো ভাবে হেলান দিয়ে বসুন। আর মাথাটা ঠেকান সোফার সাথে। আমি টিপে দিচ্ছি।”
নির্ঝর তেমনই করলো। অনু নির্ঝরের কপাল স্পর্শ করতেই ওর সর্ব শরীর যেনো শিরশির করে উঠলো। চোখ বন্ধ করে নিলো নির্ঝর। অনু খুব সুন্দর ভাবে নির্ঝরের মাথাটা টিপে দিচ্ছে।

আতুশি চিন্তিত কন্ঠে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলেন….
—”ডাক্তার ভাই, আমার মেয়েটার কি হইছে?”
ডাক্তার শান্ত স্বরে বললেন…
—”আপনারা একটু শান্ত হন। ওভার স্ট্রেসের কারণে নীরার প্যানিক অ্যাটাক হয়েছে।”
ডাক্তারের কথায় সবাই কিছুটা অবাক হলেন। আতুশি বললেন….
—”নীরার এমন সমস্যা তো ছিলো না আগে। তাহলে হঠাৎ!”
তাহমিনা শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেলে বললেন….
—”আগে তো ওর জীবনে কোনো সমস্যা ছিলো না আর না কোনো বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা-ভাবনা করতে হয়েছিলো ওকে। নীরা মা সবসময়ই হাসিখুশি থাকতো।”
ডাক্তার বললেন…

—”হয়তো মানসিক এই চাপটা নতুন তৈরি হয়েছে। তাই এমনভাবে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়েছিলো। আর এরপর সেন্সলেস হয়ে গিয়েছে নীরা । এখন আর চিন্তার কিছু নেই। আমি কিছু ঔষধ লিখে দিয়েছি ঘন্টাখানেকের মধ্যে ওর সেন্স আপনা-আপনিই ফিরে আসবে। তখন তরল কিছু খাবার খাইয়ে ঔষধগুলো খাইয়ে দিবেন ওকে। ইনশাআল্লাহ ঠিক হয়ে যাবে নীরা।”
আতুশি কান্না ভেজা গলায় বললেন…
—”ভবিষ্যৎ-এ ওর কোনো বড় সমস্যা হবে না তো?”
—”না, তবে ওকে এখন থেকে মানসিকভাবে একদম প্রেসার দেওয়া যাবে না। খেয়াল রাখবেন ও যেনো কোনো বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় না করে। ওর পাশে সবসময় কেউ একজন অবশ্যই থাকবেন। আর যতোটা সম্ভব ওকে শান্ত পরিবেশে রাখবেন।”

ইলমা কফি বানিয়ে এনে নির্ঝরকে দিলো। নির্ঝর সোজা হয়ে বসে তা পান করতে করতে বললো….
—”সত্যিই আপনার বানানো কফির স্বাদ অসাধারণ ইলমা।”
অনু নির্ঝরের পিছন থেকে সরে ইলমার পাশে এসে দাঁড়ালো। তেজ বললো….
—”নির্ঝর! এখন রুমে যা তুই। বিশ্রাম নেওয়া দরকার তোর।”
নির্ঝর তেজের দিকে তাকালে তেজের ইশারা বুঝতে পেরে বললো….
—”হুম, হুম। আমার তো মাথা ব্যথা ছিলো। যাই গিয়ে বিশ্রাম করি।”
এই বলে নির্ঝর ছুটলো ওর রুমের দিকে। তেজ ইলমাকে বললো….
—”আপনিও অনুকে নিয়ে রুমে যান ইলমা। অনুরও বিশ্রাম প্রয়োজন।”
অনু বললো…
—”নীরা আপুর অবস্থা কেমন হলো শুনতাম একটু!”
—”আমি জানিয়ে দিবো। ডাক্তার চেক-আপ করছেন তো, ওখানে বেশি ভীর না করাই ভালো।”
ইলমা আর কথা বাড়ালো না। ওরা চলে গেলো ওদের জন্য বরাদ্দকৃত রুমের উদ্দেশ্যে। তেজ যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচলো। সোফার উপর গা ছেড়ে দিয়ে বসলো সে।
পরক্ষণেই ডাক্তার সাহেব জামাল খানের সাথে বেড়িয়ে এলেন নীরাকে রাখা তাদের রুম থেকে। ড্রয়িংরুমে তেজকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে ডাক্তার বললেন….
—”কি খবর তোমার তেজ বাবা?”
তেজ তৎক্ষনাৎ ঠিকঠাক ভাবে বসে হাসিমুখে বললো….

—”এইতো ভালো আছি আঙ্কেল।”
—”তোমাকে দেখে তো আমি প্রথমে চিনতেই পারি নি। পোশাক পড়ার ধরণ পরিবর্তন করেছো জন্য একেবারেই অন্যরকম লাগছে তোমায়।”
জামাল বললেন….
—”আজকাল-কার জেনারেশনের ছেলে-মেয়েদের মন ও রুচির পরিবর্তন হতে সময় লাগে না ডাক্তার।”
—”হুম ঠিক বলেছেন জামাল ভাই। তবে এই বেশেই তেজ বাবাকে বেশি ভালো লাগছে। স্মার্ট লাগছে।”
তেজ কেবল স্মিত হাসলো কিছু বললো না। ডাক্তার আবারও বললেন….
—”নির্ঝর বাবাকে দেখছি না যে! কোথাও ও?”
জামাল বললেন….
—”একটু আগেও তো ছিলো নীরার ওখানে। এরপর কই গিয়েছে জানো তুমি সে বিষয়ে কিছু তেজ?”
তেজ ওর ভ্রু’দ্বয়ের মাঝে হালকা ভাঁজ ফেলে ঠোঁট কাঁমড়াতে কাঁমড়াতে বললো….
—”জানি না বাবা। কই যে গিয়েছে!”
ডাক্তার বললেন….

—”সেদিন বউমার সাথে পরিচয় করা হয় নি। সে বিষয়ে খোলাসা করে কথাও বলা হয় নি। তো কবে হচ্ছে ওদের বিয়ে!”
ডাক্তারের সরাসরি করা এমন প্রশ্নে তেজের মুখ হা হয়ে গেলো। এতোসময় ধরে এতো তোরজোর চললো যেই বিষয় নিয়ে তা বুঝি এবার জামালের সামনেই খোলাসা হয়ে যায়! তেজ মনে মনে বললো….
—”কি করবো এখন? কি বলবো? কি করা যায়! কি করা যায়!”
তখুনি পিছন থেকে তাহমিনার কন্ঠ ভেসে এলো…..
—”শুনছেন! বাবা আপনাকে ডাকছেন।”
জামাল সেদিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে ‘আসছি’ বললেন। ডাক্তার বললেন….
—”আপনি যান জামাল ভাই। দেখো জেঠা মশাই কি বলেন।আমাকে আর এগিয়ে দিতে হবে না।”
—”বউমার সাথে পরিচয় হতে চাইলেন এতোসব ঝামেলার মধ্যে আর তা করানো হলো না৷ আসুন আরেকবার এদিকে। বউমা নীরার কাছেই আছে।”
তেজ মনে মনে বলছে…

—”না বলুন ডাক্তার আঙ্কেল, দ্রুত না বলুন। আর কেটে পড়ুন এখান থেকে।”
ডাক্তার বললেন…
—”না ভাই, আজ থাক। ১ঘন্টার ভিতর আমায় ক্লিনিকে যেতে হবে। একটা অপারেশন আছে। অন্য আরেকদিন পরিচয় হওয়া যাবে না হয়।”
—”আচ্ছা ঠিক আছে।”
অতঃপর ডাক্তার খান ভিলা থেকে বেড়িয়ে গেলেন আর জামাল চলে গেলেন নীরার কাছে। তেজ ওর বুকের উপর হাত রেখে শব্দ করে বারকয়েক নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো….
—”জানটা মনে হয় হাতের উপর রাখাছিলো এতোসময়। বের হয়ে যায় নাকি ভিতরে আসে দু’য়ের মাঝে ঝুলছিলো। অবশেষে বাঁচলাম। এই নির্ঝরটার জন্য অল্পবয়সেই আমাকে দুনিয়া ছাড়তে হবে যা বুঝতেছি।”
এই বলে তেজ টি-টেবিলের উপর থেকে পানির বোতলটা নিয়ে কেবল একবার পানি মুখে নিয়েছিলো তখুনি ইলমা সেখানে এসে ধীর স্বরে বললো….

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৬

—”কি গোল পাঁকিয়েছেন আপনারা দুই ভাই মিলে তেজ? কি নিয়ে এতো রাখ-ঢাক চলছে আপনাদের?”
ইলমার প্রশ্ন শোনামাত্র সব পানি তেজের নাকে-মুখে উঠে গেলো। তেজ কাশতে শুরু করলে ইলমা এগিয়ে এসে তেজের মাথায় ও পিঠে হালকা হাতে মালিশ করতে শুরু করলো।

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৮