Home না চাইলেও তুমি শুধু আমারই না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৬

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৬

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৬
মাইশা জান্নাত নূরা

পিহু, নির্ঝর আর অনু এসে দাঁড়ালো অভিনব ও নীরার ঠিক পিছনে। পিহু ও অভিনব একে-অপরের জন্য সম্পূর্ণ নতুন। নির্বাণ নীরার কাঁধ থেকে মুখ তুলে সামনে তাকাতেই বাকিদের দেখে হাসিমুখে বললো….
—”নি নি ঝোল মামা, নি নি ঝোল মামা…!”
নির্ঝর ওর মুখ অন্যপাশে ঘুরিয়ে বিরবিরয়ে বললো….
—”কন্ট্রোল নির্ঝর,,কন্ট্রোল।”
অনু আর পিহু ঠোঁট চেপে হাসি নিয়ন্ত্রণ করছে। পরক্ষণেই নির্ঝর দ্রুতপায়ে এগিয়ে এসে নীরার কোল থেকে নির্বাণকে টেনে নিজের কোলে নিয়ে বললো….
—”ভাগ্নে আমার, আমি তোমার কোন জন্মের পাঁকা ধানে মই দিয়েছিলাম বলো তো! এভাবে কেনো যেখানে-সেখানে আমার নামের ফালুদা বানাও তুমি হ্যাঁ!”
নির্বাণ ওর চোখের আকৃতি হুট করেই এমন ছোট করে নিলো যেনো নির্ঝরের বলা সব কথা ও বুঝে নিয়েছে। পরক্ষণেই খপ করে নির্ঝরের দুই কান নিজের দুই হাত দ্বারা টেনে ধরলো নির্বাণ। নির্ঝর ওর দাঁতে দাঁত চেপে বললো…..

—”আআআআ, ছাড় ছাড় লাগছে রে বাপ। সেদিন আমার নাকের দফরফা করেছিস আজও সেই কাঁ*ম*ড়ের দাগ জ্বল জ্বল করছে এখন আবার আমার কান ধরেছিস! কান টেনে হাতির কানের মতো ঝোলঝোলা বানানোর নিয়ত করেছিস নাকি! ছাড় বাপ!”
নীরা হাসতে হাসতে শেষ হয়ে যাচ্ছে যেনো এদের মামা-ভাগ্নের কান্ডকারখানা দেখে। একহাতে পেট চেপে ধরে পাশেই রাখা বেন্ঞ্চের উপর বসে পড়েছে নীরা। এগিয়ে এসে যে নির্বাণকে নির্ঝরের থেকে সরাতে হবে সেই খেয়াল আর নীরার মাঝে নেই। তখুনি পিছন থেকে অনু এগিয়ে এসে নির্বাণকে নিজের কোলে নিলো। নির্ঝর দু’হাত দ্বারা ওর দু’কানে সমানে হাত বুলাতে শুরু করলো। অনুর কোলে যাওয়া মাত্র নির্বাণ শান্ত হয়ে গেলো। দু’হাতে অনুর গলা জড়িয়ে ধরে ওর কাঁধে নিজের মাথা ঠেকালো। পিহু এগিয়ে এসে বললো…..

—”দেবর মশাই আমার কি মনে হয় জানো আগের জন্মে তুমি মীরজাফর ছিলে আর আমাদের ছোট্ট সোনা নির্বাণ ছিলো নবাব সিরাজুদ্দৌলা। আগের জন্মে তো সিরাজ জাফরের থেকে বদলা নিতে পারে নি তাই এই জন্মে নিয়ে নিচ্ছে বিভিন্ন কায়দা ব্যবহার করে।”
নির্ঝর সঙ্গে সঙ্গে বললো…..
—”ভাবী দোহাই লাগে, তুমি অন্তত এসব বলে এদের সবার দলে যোগ দিয়ে আমায় নিঃস্ব করে দিও না।”
অনু আর পিহু শব্দ করে হেসে উঠলো। নির্বাণ কি বুঝলো! সেও সবার হাসি দেখে নিজের মুখের উপর এক হাত রেখে হাসতে শুরু করলো। অভিনব এতোসময় নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিলো। এতোসময় পর অভি বললো…..
—”আব নির্ঝরকে দেবরমশাই বলে সম্বোধন করছেন যে উনি! মাঝখানে শুনেছিলাম সারফারাজ ভাই ঘরোয়া ভাবে বিয়ে করেছেন। উনিই কি তাহলে সারফারাজ ভাইয়ের বউ, নীরা?”
অভির প্রশ্নে করিডোরের হাস্যরসাত্মক পরিবেশ শান্ত হয়ে গেলো। নীরা উঠে দাঁড়িয়ে বললো….

—”হুম, উনি আমাদের সারফারাজ ভাইয়ের প্রিয়তমা স্ত্রী মিসেস.প্রহেলিকা পিহু খান। সবার জন্য উনি ভাবী হলেও কেবল আমার জন্য ভাবীপু।”
অভি ছোট্ট করে ‘ওও’ বললো। অতঃপর শ্বাস ফেলে নিজের ভিতরটা হালকা পরিষ্কার করে অভি বললো….
—”অনু, ভিতরে এসো তাহলে। তোমার চেক-আপটা করিয়ে নেই!”
অনু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। নীরা অনুর থেকে নির্বাণকে নিতে চাইলে নির্বাণ আরো শক্ত করে অনুর গলা জড়িয়ে ধরে বললো….
—”না, না আমি যাবো না। আমি অনুর কাচে তাকবো। যাবো না, যাবো না।”
নির্ঝরের মুখ হা হয়ে গেলো মূহূর্তেই। এই ১ম কেবল অনুর নামটা একদম সঠিক ও স্পষ্ট ভাবে উচ্চারণ করলো নির্বাণ। ওভাবে থেকেই নির্ঝর বললো….
—”বাহ ভাগ্নে বাহ, তুমি তো দেখছি এই বয়সেই শেয়ানাগিরির উপর টপ ডিগ্রি নিয়ে ফেলেছো। সকালে সরসর করে তেজ ভাইয়ের কোল থেকে ইলমার কাছে চলে গেলে। তার গলা জড়িয়ে ধরে কি সোহাগ-ই না দেখালে আর এখন অনুর নাম একদম সঠিক ভাবে উচ্চারণ করে ওর গলাও একই ভাবে জড়িয়ে রেখেছো! এমনি এমনি কি আর ব্রিটিশ বাচ্চা নাম দিয়েছি তোমার! বাংলাদেশী প্রডাক্ট হয়ে বিট্রিশদের দেশে জন্ম নিলে কেমন ফলন হবে তা হারে হারে বোঝা হচ্ছে। সব নিমোখ*হা*রা*মি খালি এই সর্বপিটানো ঢোল নি নি ঝোলের সাথে হচ্ছে হোক।”
নীরা আদুরে স্বরে নির্বাণকে বললো….

—”এমন করতে হয় না সোনা, এখন কিছুক্ষণের জন্য কোলে আসো আমার। একটু পর আর অনু তোমায় নিবে কোলে।”
কিন্তু নাহ্! কোনো বুঝ-ই নিতে রাজি না নির্বাণের ছোট্ট মন এইমূহূর্তে। সে যখন মনঃস্থির করেছে এখন অনুর কাছে থাকবে তখন থাকবেই। অনু বললো….
—”নির্বাণ সোনা যখন আমার কাছেই থাকতে চাইছে যখন থাক নীরা আপা। জোর করে নিও না৷ কান্না করবে আবার।”
নীরা অভির দিকে তাকিয়ে বললো….
—”অনুর কোলে বাবু থাকলে চেকআপে কোনো সমস্যা হবে না তো অভি ভাইয়া!”
অভি বললো….
—”না। আজ তেমন কোনো কিছুর প্রয়োগ করবো না অনুর উপর। টুকটাক জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ঔষধগুলো সেবনের পর কোনো পারিপার্শ্বিক সমস্যা বুঝেছে কিনা এসব শুনবো। এই যা।”
নীরা হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে বললো….

—”তাহলে থাক।”
অভি বললো….
—”তোমরা সবাই এখানেই বসে অপেক্ষা করো। আর অনু তুমি এসো আমার সাথে চেম্বারে।”
পিহু, নীরা আর নির্ঝর বসলো বাহিরের সেই বসার স্থানে। এদিকে অনু ও ওর কোলে থাকা নির্বাণকে নিয়ে অভিনব চলে গেলো তার চেম্বারের ভিতরে।
অভিনব আর অনু মুখোমুখি বসে আছে। অনুর কোলে নির্বাণ বসে আছে। নির্বাণের কৌতুহলী দৃষ্টি অভিনব সহ পুরো রুমে ঘুরঘুর করছে। রুম জুড়ে থাকা বিভিন্ন উন্নত প্রযুক্তির মেশিন নির্বাণকে টানছে ছুঁয়ে দেখার জন্য। নির্বাণ অনুর কোল থেকে নামার চেষ্টা করতে করতে বললো….
—”আমি নামমো, অনু অনু, নামমো..নামমো।”
অনু আদুরে স্বরে বললো….

—”এখন নামে না সোনা। থাকো আমার কোলেই। একটু পরই আমরা মাম্মার কাছে চলে যাবো।”
নির্বাণ তবুও একই চেষ্টা নিয়ে ‘নামমো…নামমো..!’ বলছে দেখে অভি বললো….
—”নামিয়ে দাও। ছোট মানুষ তো, কখন কি মনে চলে তা বোঝা সম্ভব না।”
অগ্যতা অনু নির্বাণকে নামিয়ে দিলো। নির্বাণ ছুটে পাশেই থাকা টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। সেখানে একটা কাঁচের বড় বাক্সের উপর কঙ্কাল রাখা রয়েছে। নির্বাণ কঙ্কালটিকে নিখুঁত ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। অথচ এতোটুকু বয়সের বাচ্চার এসব দেখে ভ*য়ে সিটিয়ে থাকার কথা!
অভি অনুর সাথে ওর শারিরীক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলছে। অনুকে আজ গতদিনের চেকআপরের সময়ের থেকে অনেকটাই স্বাভাবিক লাগছে অভির কাছে। গত চেক-আপে অনু কেবল অভির প্রশ্নগুলোরই উত্তর করেছিলো। বেশির ভাগ উত্তর ‘হ্যা/না’ তেই সীমাবদ্ধ ছিলো কিন্তু আজকের উত্তরগুলো স্বাভাবিক উত্তর লাগছে দেখে অভি হাসিমুখে বললো….

—”একজন ডাক্তারের সফলতা কোথায় জানো অনু!”
অনু ভ্রু উঁচিয়ে বললো…..
—”তার অধিনে থাকা রোগীর সুস্থতায়!”
—”বাহ তুমি দেখছি সব জানো।”
—”এই তো টুকটাক-ই।”
—”তুমি আমার প্রদিত চিকিৎসায় পজেটিভ রেসপন্স করছো দেখে ভিষণ ভালো লাগছে। দ্রুত সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক হয়ে যাও এই কামনাই করছি।”
অনু ছোট্ট করে জ্বি বললো। অতঃপর অভি অনুর পুরোনো প্রেসক্রিপশনটাতে নজর বুলিয়ে সেখান থেকে কিছু ঔষধ মাইনেস করে, সময় বাড়িয়ে-কমিয়ে দিলো নতুন করে। আর বললো…..

—”এরপরের চেকআপ ১০ দিন পর করবো। ঠিক আছে?”
—”আচ্ছা।”
তখুনি পাশ থেকে ঠাস করে কিছু পড়ার শব্দ হলে অভি ও অনুর নজর সেদিকে পড়লো। নির্বাণের সামনে একটা কাঁচের ছোট বক্স ভে*ঙে পড়ে আছে মেঝের উপর। বক্স থেকে কিছু মৃত অন্য প্রজাতির পোকা বেড়িয়ে এসেছে।
নির্বাণ ছুটে অনুর কাছে আসতে নিলে অভি উঁচু গলায় বললো….
—”বাবু, বাবু থামো। অনু ওকে কোলে নিও না এই অবস্থায়।”
নির্বাণ কিছুটা ভয় পেয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। ঠোঁট উল্টে অনুর দিকে তাকিয়ে আছে সে। তৎক্ষনাৎ অভি উঠে ছুটে এসে নির্বাণকে নিজের কোলে তুলে নিলো। অনু বললো….
—”কি হলো ভাইয়া, আপনি আমাকে বাবুকে কোলে নিতে না করলেন কেনো?”
—”ও যে কাঁচের বোতলটা ভে*ঙে ফেলেছে ওর ভিতর থেকে কিছু মেডিসিন ওর শরীরে ছিঁটে এসেছে। আমার শরীরে এক্সট্রা এফ্রোন আছে আর হাতেও গ্লবস পড়া আছে। তাই আমি পরিষ্কার করিয়ে দিচ্ছি ওকে।”
নির্বাণ অভির কোলে থেকে নামার জন্য ও অনুর কাছে আসার জন্য ছটফট করছে। অনুর মায়া লাগছে তা দেখে। অনু খানিক কাছে এগিয়ে এসে বললো….

—“শান্ত হও সোনা! ডাক্তার মামা তোমায় পরিষ্কার করিয়ে দিবে। ঔষধ লেগেছে শার্টে দেখো। দেখো!”
অনুর হাত ইশারায় নিজের শার্টের দিকে তাকালো নির্বাণ। কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না সে। ওর টানাটানা বড় বড় চোখ জোড়া থেকে টপটপ করে গড়িয়ে পড়লো কয়েক ফোঁটা অশ্রু। অভি আর দেড়ি না করে নির্বাণকে নিয়ে চলে গেলো ওয়াশরুমের দিকে। ওয়াশরুমের ভিতরে আসামাত্র নির্বাণের ছটফট ভাব আরো বেড়ে গেলো। অভি নির্বাণের শরীরের থাকা শার্টটা খুলে দিতেই ওর বুকের ঠিক বাম পার্শে থাকা ছোট্ট দাগটা দেখে অভি স্তব্ধ হয়ে গেলো কয়েক সেকেন্ড এর জন্য। পরপরই কায়দা করে অভি নির্বাণের মাথা থেকে ছিঁড়ে নিলো কিছু চুল। নির্বাণ ব্যথা পেয়ে চিল্লিয়ে কেঁদে উঠলো। দ্রুত হাত-পা ছড়িয়ে অভিকে লা*থি-ঘুঁ*ষি মা*রছে নির্বাণ। অভি সামান্য পানি দিয়ে নির্বাণের শরীরটা মুছে দিলো ওভাবেই। বিরক্তি ভাব অভির চোখে-মুখে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। কিয়ৎক্ষণ পর নির্বাণকে নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে এলো অভি। সঙ্গে সঙ্গে অনুর কোলে দিয়ে দিলো অভি নির্বাণকে। অনুর কোলে যাওয়া মাত্র নির্বাণের কান্না থামতে সময় লাগলো না। নির্বাণের মাথার যেই অংশ থেকে অভি কিছু চুল ছিঁ*ড়ে নিয়েছিলো সেখানে নির্বাণ ওর ছোট্ট হাত দিয়ে রেখেছে। কান্না থামলেও এখন হিচকি উঠে গিয়েছে নির্বাণের। অনুর কাঁধে মাথা হেলিয়ে আস্তে করে শুধু বলছে….

—”আমাল তুল তুল, বেতা বেতা।”
অনু নির্বাণের পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করে দিতে দিতে বললো….
—”কাঁদে না সোনা, কাঁদে না। এই তো এখন তুমি তোমার অনুর কাছে আছো। আর কাঁদে না।”
নির্বাণের পরনে আপাতত একটা প্যন্ট রয়েছে। বুকটা খোলা। কারণ শার্টটা ওয়াশরুমেই রেখেছে অভিনব। অভি বললো….
—”শার্টটা ভিজিয়ে রেখেছি ডিটারজেন্ট দিয়ে। ক্লিনিক থেকে বের হয়ে একটা শার্ট কিনে নিতে বলিও বাবুর জন্য।”
অনু ‘আচ্ছা’ বলে বাবুকে নিয়ে অভির চেম্বারের বাহিরে চলে এলো। নির্বাণকে খালি শরীরে বের হতে দেখে নীরা দ্রুত বসা থেকে উঠে অনুর সামনে দাঁড়িয়ে বললো….
—”একি, বাবুর শরীরের শার্টটা কই অনু? আর বাবু ওমন হিঁচকি তুলছে কেনো? কেঁদেছে মনে হচ্ছে!”
এই বলে অনুর কোল থেকে নির্বাণকে নিজের কোলে নিয়ে নিলো নীরা। নীরার কোলে আসামাত্র নির্বাণ আগের ন্যায় নিজের মাথার সেই চুল তোলা অংশ দেখিয়ে বললো….

—”মাম…মাম…আমাল তুল তুল…বেতা..বেতা!”
অনু পুরো ঘটনা খুলে বললো পিহু, নীরা ও নির্ঝরকে। নীরা বললো….
—”এই কারণেই আমি ওকে ভেতরে যেতে দিতে চাই নি। কোনো ক্ষতিকর এসিড যদি থাকতো ঐ কাঁচের বক্সে! তাহলে এতোক্ষণে কি অঘ*টন টাই না ঘটে যেতো!”
পিহু নীরার মা হওয়ার খাতির থেকে নির্বাণের জন্য কাজ করা এই ভয় ভাবটা বুঝতে পেরে বললো….
—”ছোট্ট বাচ্চাদের সাথে সবসময় ফেরেস্তারা থাকেন নীরা। ওদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা করে রাখেন। বাবুর কিছু হয় নি এই কারণে আল্লাহর শুকুর আদায় করো।”
নীরা তেমনটাই করলো। অতঃপর নির্বাণের কপালে ছোট্ট করে চুমু খেলো নীরা। নির্ঝর বললো….
—”এখন তাহলে বের হই এখান থেকে আমরা!”

পিহু ছোট্ট করে ‘হুম’ বললো। অতঃপর ওরা সবাই ক্লিনিকের বাহিরে চলে আসতেই পার্কিং সাইড থেকে নির্ঝর গাড়িটা নিয়ে এলো। সবাই গাড়িতে উঠে বসলো। গাড়িতে রাখা নীরা ওর সাইড ব্যগ থেকে আরেকটা গেন্ঞ্জি বের করে নির্বাণকে পড়িয়ে দিলো। নির্ঝর ড্রাইভ করছে। পিহু আর অনু পিছন সিটে বসেছে। নীরা নির্বাণকে নিয়ে নির্ঝরের পাশের সিটে বসেছে। লুকিং গ্লাসটা ঠিকঠাক করে রাখলো নির্ঝর। একটু পর পর স্মিত হেসে নির্ঝর তাকাচ্ছে সেই লুকিং গ্লাসের দিকে। যেই গ্লাসে অনুর হাস্যোজ্জ্বল মুখটার স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি পড়েছে। অনু ব্যস্ত পিহুর সাথে নানান বিষয়ে গল্প করা নিয়ে। নির্বাণ ঘুমিয়ে গিয়েছে নীরার বুকে মাথা রেখে। নীরা এক দৃষ্টিতে বাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে।

অভি ওর এফ্রোন এর পকেট থেকে নির্বাণের মাথা থেকে ছেঁ*ড়া চুলগুলো বের করে একটা পলিতে ভড়লো। অতঃপর চুলগুলোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো…..
—”আমার সন্দেহ যদি ঠিক হয় তাহলে এই বিষয়টা বড় কোনো ঝামেলায় রূপ নেওয়ার আগেই একটা সমাধান করে ফেলতে হবে আমায়। নয়তো আমি সর্বহারা হবো।”
অতঃপর অভি ওর টেবিলের উপর থাকা বেলটা বাজাতেই একজন ওয়ার্ডবয় অভির কেবিনে প্রবেশ করলো। অভি তাকে নির্বাণের চুল রাখা পলিটা দিয়ে একটা দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলো।

খান ভিলায় প্রবেশ করতেই ড্রয়িংরুমে খুব পরিচিত কোনো পুরুষ কন্ঠ কর্ণপাত হলো পিহুর। থমকে দাঁড়ালো সে। বাকিরা এগিয়ে গেলো পিহুর থেকে খানিকটা সামনে। নীরা ঘুমন্ত নির্বাণকে নিয়ে সোজা নিজের রুমে চলে গেলো। ওকে শুইয়ে দেওয়াটা জরুরী। তাহমিনা ওদের দেখা মাত্র বললেন….
—”ঐ তো ওরা সবাই এসে পড়েছে।”
সবার নজর গিয়ে পড়লো মূল দরজার দিকে। নির্ঝর ও অনু একপার্শে এসে দাঁড়াতেই পিহু ও নতুন আগমন হওয়া ব্যক্তিটির একে-অপরের প্রতি দৃষ্টি স্থির হলো। পিহু ধীর স্বরে বললো….
—”বাবা!”
পাশেই নিরব ভঙ্গিতে বসে আছে সারফারাজ। পিহুর বাবা জবরুল মিয়া বসা থেকে উঠে পিহুর সামনে এসে দাঁড়িয়ে মাথা নত রেখে বললেন…..

—”আমায় ক্ষমা করে দে মা। অনেক অ*ন্যায় করে ফেলেছি আমি তোর সাথে। তোর মা’কে হারিয়ে তুই দিন দিন সৎ মা ও সৎ বোনের অ*ত্যাচার সহ্য করেছিস আর আমি তাঁদের কথাই বিশ্বাস করে তোরে অবহেলা করেছি। এই অ*বিচারের বোঝা বইতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে মা আমার। তুই যদি আজ আমায় ক্ষমা না করিস তাহলে বিশ্বাস কর গলায় দ*ড়ি দিয়ে আত্ম*হ*ত্যা করা ছাড়া কোনো উ…..!”
জবরুল তার পুরো কথা শেষ করতে পারলেন না। পিহু তৎক্ষনাৎ জড়িয়ে ধরলে জবরুলকে। হু হু করে কেঁদে ফেললো পিহু। যেনো আজই ১ম দিন পিহু ওর মা’কে হারিয়েছে। বয়স ওর সেই সময়ের মতো মাত্র বছর ৯ হবে! জবরুল নিজেও কেঁদে ফেললেন। অতি আদরে পিহুর মাথায় হাত বুলাতে শুরু করলেন তিনি। এইভাবে যদি আরো আগেই বুকে টেনে নিতেন জবরুল পিহুকে তাহলে পিহুর শৈশব ও কৈশর বয়সের স্মৃতিগুলো এতো বিষাদে ভরপুর হতো না। তা খুব ভালো ভাবেই অনুভব করতে পেরেছেন জবরুল আজ।
বাবা-মায়ের এই মিলন মেলা খান ভিলার পুরো পরিবেশকে এক অন্য রকম রূপ দিলো যেনো। এরপর ঠিক হলো জবরুলও এখন থেকে এখানেই থাকবেন। সামনে যেহেতু পিহু ও সারফারাজের বিয়ে উপলক্ষে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে তাই বাবা হিসেবে জবরুল মিয়ার দায়িত্ব কিন্তু কম না এমনই বলেছেন তাকে বাড়ির সিনিয়র সদস্যগণরা।

পরেরদিন সকালবেলা……
নাস্তার টেবিলে খান ভিলার সকল সদস্যরা ও ইলমা, অনু এবং জবরুল মিয়া বসেছেন নাস্তা করার উদ্দেশ্যে। নির্বাণও আজ সকাল সকাল উঠে পড়েছে। মা নীরার কোলে নয় বরং নিজের জন্য বরাদ্দ করেছে সে আলাদা একটি চেয়ার। নির্বাণের পাশের চেয়ারে ইলমা ও অনু পাশাপাশি বসেছে। ইলমা যত্ন নিয়ে নির্বাণের প্লেটে থাকা পাউরুটির ফালাটা ছিঁড়ে ছোট ছোট করে দিচ্ছে। যেনো ও নিজ থেকে নিয়ে খেতে পারে।
তখুনি জামাল খান গম্ভীর স্বরে বললেন…..
—”বিয়ের জন্য যাবতীয় কেনাকাটা আজ থেকেই শুরু করে দাও তোমরা। হাতে সময় খুব কম।”
সারফারাজ বললো….

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৫

—”ঠিক আছে বাবা, আমি সবাইকে নিয়ে সপিংমলে যাবো আজই।”
জামাল বললেন…
—”জায়েদ, জাবির অফিসের কাজগুলো সেরে নিয়ে দ্রুতই বাড়ি ফিরে আসিস আজ তোরা। আমি আজ যাবো না অফিসে। আর নীরা মা! খাওয়া শেষ করে একবার আমার রুমে এসো একা। কথা আছে।”
নীরা ‘আচ্ছা বড় বাবা’ বলল শুধু। অতঃপর সবাই নিজ নিজ মতো খাওয়া শেষ করলো।

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৭