Home না চাইলেও তুমি শুধু আমারই না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৫

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৫

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৫
মাইশা জান্নাত নূরা

আতুশিকে বড় বড় চোখ করে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নির্বাণ ওর ডান হাতটা মুষ্ঠ করে মুখের কাছে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থাকলো। অতঃপর হুট করেই নির্বাণ ওর দু’হাত তুলে ধরলো আতুশির দিকে। এমনভাবে হাসছে সে যেনো বহুদিন ধরে আতুশিকে চিনে।আতুশি নির্বাণের এরূপ কাজে খানিক থমকে গেলেন। বাদামের খোসা ছাড়ানোর কাজ তার থেমে গিয়েছে তখনই। ফুটফুটে, গুলুমুলু নির্বাণের ডান গাল আলতো করে ছুঁয়ে আতুশি বললো….
—“এই..এই বাচ্চাটা কে?”
পরপরই আতুশির নজর পড়লো মূল দরজার দিকে। মীরা, সারফারাজ, পিহু, ওর সাথে আরো ২জন নতুন মুখের কম বয়সী মেয়ে, নির্ঝর আর তেজ এদিকেই আসছে। তখুনি নির্বাণ ওরছোট্ট হাত দ্বারা আতুশির হাঁটুতে ভর দিয়ে তার কোলে উঠার চেষ্টা করলো। কিন্তু আতুশির সাহায্য ব্যতিত একা উঠে পড়া ওর জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। আতুশির কোলের উপর রাখা ছেলা বাদামের বাটিটার দিকে তাকিয়ে নির্বাণ আধো আধে কন্ঠে বললো….

—“এতা..এতা কি? আমি কাবো! তাও তাও। কাবো।”
নির্বাণের কথাগুলো অস্পষ্ট হলেও আতুশি ঠিকই বুঝতে পারলেন। যৌথ পরিবার খান পরিবার। সারফারাজ, তেজ, নির্ঝর, নীরা এদের সবাইকে ওদের মা, চাচীরা একসাথে মিলেমিশে বড় করে তুলেছেন তাই এই টুকু অভিজ্ঞতা তাদের সবারই আছে কমবেশি৷ আতুশি তার ঠোঁটে হালকা হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বললো….
—“আরে, বাচ্চাটা খেতে চাইছে যে! কি করবো আমি?”
আতুশি নীরার দিকে তাকালেন। নীরা খানিক দূরে দাঁড়িয়ে পড়েছে। নীরার সামনে-পিছনে, পাশাপাশি বাকিরা দাঁড়িয়ে আছে। নীরার বুকের ভেতরটাতে সে হালকা কম্পন ভাব অনুভব করছে। এই মুহূর্তটার অপেক্ষা সে কতদিন ধরেই না করেছে! আতুশি নীরার পানে চাইলেন অজান্তেই। তাদের মা-মেয়ের চোখে চোখ পড়তেই সময় যেন আপনা-আপনি নিজের গতি থামিয়ে দিলেন। নীরার চোখজোড়া ছলছল করছে। নীরা মাথা নাড়লো উপর-নিচ।
আতুশির ঠোঁটজোড়া মৃদুভাবে কেঁপে উঠলো। তিনি বললেন….

—“ও…ও!”
আতুশি নীরার অশ্রুতে টলমল চোখ দেখে কম্পিত কন্ঠে আবারও বললেন…..
—“ও কি আমার নাতি? নির্বাণ?”
নীরা আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। ওর চোখ দিয়ে টপটপ করে গড়িয়ে পড়লো কয়েক ফোঁটা অশ্রু। আতুশির বুঝতে আর এক মুহূর্ত দেরি হলো না। তিনি তৎক্ষনাৎ ঝুঁকে নির্বাণকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিয়ে বললেন….
—“আমার নাতি! আমার রক্ত বইছে ওর শরীরে! আমার কলিজার ধনকে আমি আমার বুকে নিতে পারলাম অবশেষে।”
আতুশির দু’চোখ বেয়েও গড়িয়ে পড়লো অশ্রুরা। নির্বাণ বেশ অবাক হয়েছে হঠাৎ ওকে এভাবে বুকে টেনে নিয়েছে বুঝে। কিন্তু ওর ছোট মস্তিষ্ক ও মন কি যে বুঝলো! ছোট্ট হাতজোড়া দিয়ে নির্বাণ হাসতে হাসতে জড়িয়ে ধরলো আতুশির গলা। আতুশি এবার শব্দ করেই কেঁদে ফেললেন।
ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে একপ্রকার তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে এলেন তাহমিনা খান আর শিউলি খান। তাহমিনা সরল কন্ঠে বললেন….

—“কি হয়েছে? কে কাঁদছে?”
কথা শেষ করতে না করতেই তাদের দু’জনের চোখ গিয়ে আটকালো আতুশি আর তার কোলে থাকা ছোট্ট নিষ্পাপ আদুরে বাচ্চা নির্বাণের দিকে। আতুশিকে নির্বাণকে জড়িয়ে কাঁদতে দেখে ও বাকিদের তাদের দিকে তাকিয়ে স্মিত ভাবে হাসতে দেখে তাহমিনা আতুশির দিকে এগিয়ে এসে বললেন….
—“এই বাচ্চা..!”
শিউলি বিস্ময়ে তাকিয়ে আছেন। নীরা নম্রতা ও আবেগভরা কন্ঠে শুধু ‘বড় মা’ বলে উঠলো। তাহমিনা নীরার কন্ঠ শুনে ওর দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলেন এই শিশু বাচ্চাটি আর কেউ না এ তাদের আদুরে কন্যা নীরার ছেলে নির্বাণ। তাহমিনার দু’চোখও তৎক্ষণাৎ ভিজে উঠলো। শিউলি বিস্ময় ভরা কন্ঠে শুধালেন….

—“ও আমাদের নীরার ছেলে?”
সারফারাজ ছোট্ট করে ‘হ্যা মেজো চাচী’ বলতেই শিউলি তার নিজের মুখে হাত চেপে ধরে বললেন….
—“আল্লাহ…! এতো বড় হয়ে গিয়েছে?”
তাহমিনা আর দেরি করলেন না। তিনি এগিয়ে এসে নির্বাণের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন…..
—“মাশাআল্লাহ, আমাদের বংশের ১ম নাতি ও। যুগ যুগ বেঁচে থাকো তুমি নানুভাই।”
নির্বাণ আতুশির গলা ছেড়ে দিয়ে নিজের সুবিধামতো ভঙ্গিতে তার কোলের উপর বসে পড়লো। কখনো সে গভীর মনোযোগে তাকাচ্ছে আতুশির মুখের দিকে, আবার মুহূর্তেই চোখ ঘুরে যাচ্ছে তাহমিনা আর শিউলির দিকে। ওর ছোট্ট মনের ভেতর যেন প্রশ্ন জাগছে, ‘ওর আশেপাশে থাকা এই আদুরে মানুষগুলো এভাবে কাঁদছে কেনো?’
অতঃপর হঠাৎই সবাইকে অবাক করে দিয়ে নির্বাণ ওর ছোট্ট হাত দু’টো বাড়িয়ে আলতো করে আতুশির গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুগুলো মুছে দিতে লাগলো। তারপর ওর পাশেই ঝুঁকে থাকা তাহমিনার চোখের পানিও একইভাবে মুছে দিলো নির্বাণ নিজের নরম হাত দিয়ে।
এরপর নির্বাণ দু’হাত মুঠো করে মুখের কাছে নিয়ে পিটপিট করে তাকিয়ে রইলো ওদের সবার দিকে। এতে সব মুখশ্রীতেই তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো। তখুনি পিহু ইলমা আর অনুকে উদ্দেশ্য করে ফিসফিসিয়ে বললো….

—”সামনে চলো। সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেই তোমাদের।”
অনু ইলমার হাত শক্ত করে চেপে ধরে বললো….
—”আমার ভয় করছে আপা।”
পিহু বললো….
—”চলো দু’জনেই সব ভ*য় কেটে যাবে দেখিও।”
পিহু ইলমার হাত ধরে টেনে সামনে আনলো। কান টানলে মাথা আসার মতো ইলমার সাথে অনুও চলে এলো। ওদের চোখে-মুখে সংকোচের ছাপ স্পষ্ট ফুটে আছে। পিহু তাহমিনাকে উদ্দেশ্য করে বললো…..
—“মা, ও হলো ইলমা আর ও অনু। আমাদের বাড়ির নতুন অতিথি।”
ইলমা মাথা নিচু করে নম্রস্বরে সালাম দিলো তাহমিনাকে। অতঃপর অনুও একইভাবে সালাম দিলো। তাহমিনা মুচকি হেসে বললেন….
—“ওয়ালাইকুম আসসালাম, মা। ভাড়ি মিষ্টি দেখতে তো তোমরা, মাশাআল্লাহ।”
শিউলি বললেন—
—“এত দূরে দূরে দাঁড়িয়ে ছিলে কেনো হুম? এই বাড়িটাকে নিজেদের বাড়ি মনে করিও বুঝলে!”
আতুশির কোল থেকে নির্বাণ নেমে ইলমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে ওর ওড়নার নিচের অংশ ধরে টানতে টানতে বললো….

—”ইম্মা, কোনে কোনে। ও ইম্মা! ইম্মা!”
ইলমা নির্বাণকে কোলে তুলে নিতেই নির্বাণ ইলমার গলা জড়িয়ে ধরে ওর কাঁধে মাথা রাখলো। তাহমিনা, আতুশি, শিউলি অবাক হলেও বাকিরা অবাক হলো না নির্বাণের এমন কাজে। কারণ বাকিরা জেনে গিয়েছে নির্বাণের সবথেকে পছন্দের মানুষ এইমূহূর্তে ইলমা। রক্তের সম্পর্ক না থাকলে একজন মানুষের সাথে অপর মানুষের আত্মার সম্পর্ক তৈরি হতে সময় লাগে না।
সারফারাজ সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললো…
—“ওরা কিছুদিন আমাদের সাথেই থাকবে এখানে।”
তাহমিনা বললেন….
—“এটা তো খুব ভালো খবর!”
শিউলি বললেন….
—“বাড়িতে যতো মানুষ বাড়বে ততো ভালো। মনে হয় পরিবারটা পূর্ণ হয়েছে এবার।”
আতুশি বললেন—

—“মেজো ভাবী একদম ঠিক কথা বলেছে। এতোদিন তোমরা ছিলে না কেউ মনে হয়েছিলো বাড়িটা প্রাণশূন্য হয়ে পড়ে আছে। এখন তোমাদের সাথে সাথে এই মিষ্টি মেয়েদের উপস্থিতিতে এই বাড়িটা আগের থেকেও জমজমাট হয়ে উঠবে।”
ইলমা আর অনু অবাক চোখে একে-অপরের দিকে তাকালো একবার। যে ভয়, যে সংকোচ নিয়ে ওরা এই বাড়িতে প্রবেশ করেছিলো তার বিন্দুমাত্রও অবশিষ্ট নেই আর ওদের মাঝে। পিহু মৃদু হাসি দিয়ে বললো….
—“দেখলে? বলেছিলাম না ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”
অনুর চোখে-মুখে একটু স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠলো। ইলমাও হালকা হাসলো। তাহমিনা এগিয়ে এসে ইলমা ও অনুর মাথায় হাত রেখে বললেন….
—“কিছু লাগলে নিঃসংকোচে আমাদের বলবে তোমরা, ঠিক আছে?”
শিউলি বললেন—
—“আমাদের নিজের মানুষ ভেবো। কারণ এ বাড়িতে যখন নতুন কেউ আসে তখন তারা আর পর থাকে না আমাদের।”
ইলমা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
সন্ধ্যেবেলা…..

বাড়ির পুরুষ সদস্যরা সবাই এসেছেন। খান বাড়ির ড্রয়িংরুমে আড্ডার আসর বসেছে। ইলমা আর অনুর সাথে বাকি সবার পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তাহমিনা। রান্নাঘরে সবার জন্য চা-নাস্তা বানানোর কাজ সম্পন্ন করলেন পিহু, আতুশি ও শিউলি মিলে।
অতঃপর চা-নাস্তার ট্রে নিয়ে আসতেই সারফারাজের বাবা জামাল খান বললেন…..
—”অনেক দিন তো পেরিয়ে গেলো, আমাদের অপূর্ণ পরিবারটাও মাশাআল্লাহ পূর্ণ হয়েছে তাই এবার একটা অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করতে চাইছি।”
জামালের এরূপ কথা শুনে সকলের আগ্রহী দৃষ্টি তার উপর স্থির হলো। জামাল গলা পরিষ্কার করে বললেন….
—”আগামী মাসের ৭ তারিখ পিহু আর সারফারাজের বিয়ে পুনরায় দেওয়া হবে আনুষ্ঠানিক ভাবে। পরিচিত সকল আত্মীয়-স্বজনরা থাকবেন সেখানে। আয়োজনে কোনো ত্রুটি রাখা হবে না।”
পিহু খানিক লজ্জা পেলো। তবে খুশিও হয়েছে। কারণ সেদিন সে অফিসিয়ালি তার এমপি সাহেবের স্ত্রী হতে পারবে। সবাই জানবে এমপি সারফারাজ ইউসুফ খানের স্ত্রীকে।
সারফারাজ বললো….

—”তাহলে তো হাতে খুব বেশি সময় নেই বাবা। আগামীকাল থেকে সকল আয়োজন শুরু করতে হবে।”
জায়েদ বললেন….
—”তুমি তো সব বিষয়েই নজর রাখো, দায়িত্ব নিয়ে সব কাজ সম্পন্ন করো সারফারাজ বাবা। এবার তোমাদের বিয়ের আয়োজনের দায়িত্ব না হয় তোমার ২ গুণবান ভাইয়ের উপরের বর্তে দিতে দাও। তারাও শিখুক দায়িত্বের বোঝার ভার কেমন হয় আর তা কিভাবে সঠিক সময়ে পালন করতে হয়। নয়তো কতোদিন এভাবে বসে শুয়ে ভবঘুরেদের মতো কাটাবে নিজেদের লাইফ ওরা!”
জাবির জায়েদের তালে তাল মিলিয়ে বললেন…..
—”হ্যা ঠিক বলেছো। আমাদেরও তো বয়স হয়েছে। এবার কোম্পানির দায়-দায়িত্বও ওদের ২জনকে বুঝে নিতে হবে।”
তৎক্ষনাৎ তেজ বলে উঠলো…..

—”ওতো বড় কোম্পানির দায়িত্ব আমরা কিভাবে সামলাবো চাচা!”
জাবির বললেন….
—”সারফারাজ বাবা দেশ ও দশের দায়িত্ব সামলাচ্ছে আর তোমরা সামান্য কোম্পানির দায়িত্ব সামলাতে পারবে না!”
সারফারাজ বললো….
—”পারবে না কেনো? অবশ্যই পারবে। দায়িত্ব একবার কাঁধে পড়লে তা সামলে নিতে হবে এই বোধও জাগ্রত হবে তখন ওদের মাঝে।”
নির্ঝর কেবল তব্দা লোগে বসে শুনছে সবার কথা। কিছু বলার ভাষাই যেনো খুঁজে পাচ্ছে না সে। তেজ আর কথা বাড়ালো না। কারণ সারফারাজ যখন বলেছে তখন, দায়িত্ব পড়লে তা সামলেও নিতে হবে ওদের। এ থেকে আর রেহাই পাবে না।
পরের দিন সকালবেলা…..
সকালের নাস্তার শেষে সিনিয়র পুরুষ সদস্যরা নিজ নিজ কাজের উদ্দেশ্যে আগেই চলে গিয়েছেন। সারফারাজও বেড়িয়ে গিয়েছে জরুরী মিটিং এর উদ্দেশ্যে। এখন জুনিয়র বাকি সদস্যরা একসাথে খাবার টেবিলে বসেছে। বাড়ির সিনিয়র মহিলা সদস্যরা নিজ নিজ ঘরে চলে গিয়েছেন আগেই। তাই পিহু সবাইকে স্বযত্নে খাবার পরিবেশন করে দিয়েছে। নির্বাণ এখনও ঘুম থেকে উঠে নি। নীরা একাই এসে খেতে বসেছে তাই। ইলমা খেতে খেতে তেজকে বললো…..

—”তেজ! অনুকে নিয়ে ডাক্তার অভিনবের কাছে যেতে হতো যে!”
অনু মাথা তুলে তাকালো ইলমা ও তেজের দিকে। পরপরই সে দৃষ্টি নামিয়ে নিয়েছে। তেজ বললো….
—”ঠিক আছে খাওয়া শেষে যাওয়া হবে না হয়!”
ইলমা বললো….
—”আমাকে কফিশপে যেতে হতো। গতকালও যাওয়া হয় নি।”
নীরা তৎক্ষনাৎ বললো….
—”আমি তো ফ্রী আছি তেজ ভাই। অনুকে নিয়ে আমিই চলে যাই অভিনব ভাইয়ার চেম্বারে! তুমি ইলমা আপাকে কফিশপে ছেড়ে আসো।”
তেজ বললো……
—”এতো বছর পর বাংলাদেশে ফিরেছিস তোর একার হালে অনুকে ছাড়বো না। আর নির্বাণও আছে। ২জনের দেখাশোনা করতে গিয়ে নাজেহাল হয়ে যাবি।”
অনু ঠোঁট কাঁমড়ে বললো….

—”আমি কি নির্বাণের মতো বাচ্চা তেজ ভাইয়া! আমাকে কি সামলাতে হবে!”
নির্ঝর বললো…..
—”আমাকে কি চোখে দেখছো না তুমি তেজ ভাই? আমার মতো দায়িত্ববান পুরুষের কাছে তো ছাড়তে পারোই তুমি অনুকে আর নীরাকে!”
তেজ ভ্রু উঁচিয়ে তাকালো নির্ঝরের দিকে। কথা যখন হচ্ছে অনুর নিরাপত্তা নিয়ে তখন নির্ঝর যে সে বিষয়ে ফুললি সতর্ক থাকবে তা তেজ কেনো এখানে উপস্থিত বাকিরাও জানে। পিহু বললো….
—”তেজ ভাই, তুমি ইলমাকে নিয়ে যাও কফিশপে। এদিক থেকে আমি, নির্ঝর, নীরা-নির্বাণ মিলে অনুকে নিয়ে যাবো চেক-আপ এর জন্য। ঠিক আছে!”
তেজ বললো….
—”এইবার ঠিক আছে। এইবার আমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারবো। ভাবী যাবে বলেছেন যখন তখন কোনো ঝামেলা হওয়ার প্রশ্নই আসে না।”

নীরা আর নির্ঝর একসাথে মুখ কুঁ*চকালো। যেনো তেজ ওদেরই মিন করে বললো, ‘তোরা একেকটা ঝামেলা সৃষ্টি কারী বো*মা। যেখানেই যাবি কোনো না কোনো অ*ঘটন ঘটিয়েই ছাড়বি।’
ঘন্টাখানেকের মধ্যে ওরা সবাই খান ভিলা থেকে বেড়িয়ে পড়লো। ইলমাকে নিয়ে তেজ বাইকে করে চলে গেলো কফিশপের উদ্দেশ্যে আর অনুকে নিয়ে পিহু, নীরা-নির্বাণ, নির্ঝর বাড়ির গাড়ি করেই তেজের দেওয়া ঠিকানা ‘অভিনবের চেম্বার’ এর উদ্দেশ্যে রওনা করলো। গাড়িটা নির্ঝরই ড্রাইভ করছে।
যথাসময় পর পিহুরা অভিনবের প্রাইভেট ক্লিনিকে এসে পৌঁছালো। একে একে সবাই গাড়ি থেকে নামলো। নির্বাণ নতুন জায়গা দেখলেই ওর সেই জায়গা ও সেখানের সবকিছু সম্পর্কে জানার, চেনার আগ্রহ সবসময় পরিপূর্ণ ভাবে কাজ করে। এখনও তার ব্যতিক্রম হলো না। নির্বাণ নীরার কোল থেকে একপ্রকার অস্থির হয়ে নেমে সোজা ছুটে চলে গেলো ক্লিনিকের ভিতরে। নীরা বললো…..

—”দেখো গেলো ছেলেটা আমার ভিতরে। তোমরা এসো, আমি দেখি কই গেলো বাঁ*দরটা।”
এই বলে নীরাও ছুটলো নির্বাণের পিছন পিছন। নির্ঝর গাড়িটা পার্ক করতে চলে গিয়েছে। পিহু আর অনু নির্ঝরের আসার অপেক্ষাই করছে। নির্বাণ ছুটতে ছুটতে অনেকটা ভিতরে আসতেই একজনের সাথে হুট করে ধা*ক্কা খেয়ে করিডোরের মেঝের উপর বসে পড়লো। ছোট্ট করে ‘আহহহ’ বলে উঠলো নির্বাণ। চোখ তুলে সামনে তাকাতেই একজন লম্বা-চওড়া, সুঠাম দেহের অধিকারী, ডাক্তারি পোশাক পরিহিত সুদর্শন অপরিচিত লোককে দেখতে পেলো নির্বাণ। লোকটির গলায় ঝুলানো রয়েছে একদি স্টেথোস্কোপ।
লোকটি হাঁটু ভাঁজ করে নির্বাণের সামনে বসতেই নির্বাণ বসে থেকেই একটু পিছিয়ে গেলো। লোকটি হাসিমুখে বললো….

—”কে তুমি? কার সাথে এসেছো বাবু? এভাবে ছুটাছুটি করছো এখানে! ব্যথা পেয়েছো?”
নির্বাণ কিছুটা ভ*য় পেয়ে গিয়েছে। ওর চেহারায় সেই ছাপ লক্ষণীয়। লোকটি নির্বাণকে কোলে নেওয়ার উদ্দেশ্যে হাত বাড়ালে নির্বাণ বললো…..
—”না না যাবো না, তুমি পতা। আমি ব্যতা পাইচি।”
—”আমি একজন ডাক্তার। আমার নাম অভিনব। তোমার সব ব্যথা আমি সারিয়ে দিবো। এসো আমার কোলে এসো।”
নির্বাণ তবুও এগোলো না নিজ থেকে অভির কোলে আসার জন্য। অভি এবার একপ্রকার জোর করেই নির্বাণকে কোলে তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালে নির্বাণ ছোটাছুটি শুরু করলো কোল থেকে নামার জন্য। আর বলছে….
—”ছালো, ছালো। আমি নামমো। ছালো আমায়। নামমো, নামমো।”
তখুনি সেখানে চলে আসলো নীরা। নীরা খানিক দূর থেকে নির্বাণের কন্ঠ শুনেই বললো….
—”নীর বাবা! কই তুমি?”
অভির চোখ গেলো সামনে। নীরাকে দেখে চিনতে একটু সময় লাগলো ওর। নির্বাণ নীরাকে দেখামাত্র ওর কাছে যাওয়ার জন্য আরো ছটফট করতে করতে বললো…

—”মাম, মাম। ছালো ছালো আমায়। আমি মাম যাবো। মাম, মাম।”
অভি অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে এইমূহূর্তে। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। নির্বাণের কথা ওর কানে পৌঁছাচ্ছে না যেনো এইমূহূর্তে। নীরা এগিয়ে এসে বললো…..
—”অভিনব ভাইয়া না তুমি!”
অভির ধ্যন ভাঙলো। গলা খাকরি দিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে বললো….
—”হ্যা, আর তুই নীরা! তেজের সেই ছোট বোন!”
নীরা হাসিমুখে বললো….
—”হুম। কিন্তু এখন আর ছোট্টটি নেই। এই যে আমার ছেলে হয়ে আমায় বড় বানিয়ে দিয়েছে।”
এই বলে নীরা অভির কোল থেকে নির্বাণকে নিজের কাছে নিলো। নির্বাণ এবার শান্ত হয়ে গেলো। অভি যেনো একপ্রকার ধাক্কা খেয়েছো নীরার এরূপ কথা শুনে। অবাক স্বরে বললো…..

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৪(৩)

—”তোর বিয়ে হলো কবে? আবার এতো বড় বাচ্চাও আছে!”
অভিকে নীরার বিষয়ে সবকিছু গতবার অনুকে চেকআপ করাতে আসার পর বলেছিলো তেজ। তবুও সে নীরার সামনে কোনোকিছু না জানার ভান ধরছে যেনো। নীরা হালকা হেসে বললো…..
—”সে অনেক বড় ঘটনা, সময় করে তেজ ভাইয়ের থেকেই শুনে নিও না হয়।”
অভি আর কিছু বললো না। নির্বাণের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অভি।

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৬

1 COMMENT

Comments are closed.