Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৮

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৮

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৮
আরোবা চৌধুরী আরু

সময় যেন সত্যিই ডানা মেলে উড়ে যায়… দেখতে দেখতে ছয়টা মাস কেটে গেছে। এই ছয় মাসে শুধু সময়ই না মানুষ, সম্পর্ক, অনুভূতি… সবকিছুই যেন একটু একটু করে বদলে গেছে।
প্রথমে সায়ফান আর জারিন…
ওদের রিসেপশন করার প্ল্যানটা ঠিকই হয়েছিল। দুই পরিবার মিলে সুন্দরভাবে সব কিছু আয়োজন করার কথাও ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবকিছু আর পরিকল্পনা মতো হয়নি।
জারিনকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর, ওর পরিবার ধীরে ধীরে অন্য রূপ দেখাতে শুরু করে। বাইরে থেকে যতই স্বাভাবিক থাকুক, ভেতরে ভেতরে তারা একটাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—এই বিয়েটা তারা মেনে নেবে না। চেষ্টা ছিল, যেভাবেই হোক সায়ফান আর জারিনের মধ্যে ডিভোর্স করানো। কিন্তু তারা একটা জিনিস ভুলে গিয়েছিল,
সায়ফান কে।

সে এমন মানুষ না, যে নিজের ভালোবাসার মানুষকে এত সহজে ছেড়ে দেবে। তার উপর, যে মানুষটা একবার ভালোবাসতে শিখেছে… সে জানে, ভালোবাসার মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখা মানে নিজের শ্বাস বন্ধ করে রাখা। আর সব থেকে বড় কথা সাইফান এর অমৃত হাওয়া থেকে বাধা দিতে চাইছে তা কি আর মেনে নেওয়া যায় কোনভাবে।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টা শুধু পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
মিডিয়ার সামনে ব্যাপারটা এমনভাবে উঠে আসে—যেন জারিনকে জোর করে আটকে রাখা হয়েছে, তাকে তার স্বামীর কাছে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। এক নিমিষেই সোশ্যাল মিডিয়া উত্তাল হয়ে ওঠে।
চারদিকে সমালোচনা, প্রশ্ন, অভিযোগ… প্রভাবশালী পরিবার হওয়ার কারণে জারিনদের পরিবার আরও বেশি চাপে পড়ে।
আর রাশিদ পরিবারের নাম জড়িয়ে যাওয়ায় মিডিয়াও একদম ছাড় দেয়নি। শেষমেশ… আর উপায় না দেখে, ছোট করে হলেও, কোনো রকমে—জারিনকে সায়ফানের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয় তারা।

এই পুরো ঝামেলার মধ্যেই আরেকটা সুন্দর ঘটনা ঘটে— জারিফ আর রাইমার বিয়ে ঠিক হয়ে যায়।
মজার ব্যাপার হলো, এত ঝামেলা, এত দৌড়ঝাঁপের মাঝেই কখন যে দুজন একে অপরকে মন দিয়ে ফেলেছে—তারা নিজেরাও ঠিক বুঝতে পারেনি।

অন্যদিকে…
আকাশ আর রিশা— ওদের ছোট্ট একটা সংসার গড়ে উঠেছে। সেখানে বড় কোনো আড়ম্বর নেই, নেই বিলাসিতা… কিন্তু আছে শান্তি।আকাশ, তার বাবা আর রিশা—এই তিনজনের ছোট পরিবার। আকাশ নিজের জবের পাশাপাশি একটা ছোট ব্যবসা শুরু করেছে।
রিশা বারবার মানা করেছে—
“আমাদের এত কিছুর দরকার নেই… তুমি যেমন আছো, যেভাবে রাখো, আমি তাতেই খুশি।”
তার কাছে টাকার চেয়ে বড়—ভালোবাসা। আর আকাশ সেই ভালোবাসাটাই তাকে দিতে চায় প্রতিদিন, নিজের সবটুকু দিয়ে।

আরেকদিকে…
রায়হান আর রুহি— ওদের ভালোবাসা এখন আর শুধু দুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ওদের ভালোবাসার চিহ্ন হয়ে আসছে নতুন একটা জীবন। রুহি এখন পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। বর্তমানে তারা চট্টগ্রামে আছে। ওদের সাথে আছে সাবিহা খালেদাও— মেয়ের মতো করেই রুহির খেয়াল রাখছেন।

আরিব…
সে অনেক দূরে চলে গেছে। জাপানে।কারণটা কেউ মুখে না বললেও সবাই বোঝে নাফিসা। হয়তো ভুলে যাওয়ার জন্য…
হয়তো নিজের অনুভূতিগুলো থেকে পালানোর জন্য… কিন্তু সে থেমে থাকেনি। হায়ার এডুকেশন শেষ করে, একদিন দেশে ফিরে—নিজের পরিবারের ব্যবসা সামলাবে, আর নিজের ডক্টরী পেশার মাধ্যমে গরিব মানুষদের সাহায্য করবে—এই স্বপ্ন নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে সে।

আর এইসব সম্পর্কের ভিড়ে… একজন এখনো একা।
রিদওয়ান।সবাইকে দেখে মাঝে মাঝে তার আফসোস হয়।
কারো না কারো কেউ আছে… এমনকি ছোট রাহিল—
এখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে, আর তারও একটা গার্লফ্রেন্ড আছে!
এই বিষয়টা নিয়ে রিদওয়ান মাঝে মাঝে নিজেই নিজেকে নিয়ে হাসে, আবার আফসোসও করে,
“আমার ভাগ্যে এখনো কেউ জুটল না!”

রুশা আর মিষ্টি মাঝে মাঝেই এই বাড়িতে আসে। বিশেষ করে নাফিসার সাথে দেখা করার জন্য। সব মিলিয়ে…সবাইয়ের জীবন মোটামুটি ভালোই চলছে।
কিন্তু এই সব কিছুর মধ্যে, সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা এসেছে নাফিসার জীবনে। এখন সে নয় মাসের ভরা পেট। পেটটা আগের চেয়ে অনেক বড় হয়ে গেছে। ডাক্তার আগেই জানিয়েছে—টুইন্স।
এই খবরটা যেমন আনন্দ নিয়ে এসেছে, তেমনই এনেছে ভয়, দুশ্চিন্তা। এতটুকু নরম মেয়েটা… কীভাবে একসাথে দুইটা বাচ্চাকে পৃথিবীতে আনবে? তার উপর শরীরের অবস্থাও খুব একটা ভালো না।
তবুও,তার চোখে এখন একটা অন্যরকম আলো।মায়ের আলো।
আর সেই আলোকে আগলে রাখতে, সায়মান এখন তার পাশে ছায়ার মতো থাকে… প্রতিটা মুহূর্তে।
ইদানিং, বিশেষ করে রাতগুলো…
রাতে নাফিসার সমস্যা বেশি হয়। কখনো হঠাৎ ব্যথা, কখনো অস্বস্তি, কখনো নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার মতো অনুভূতি। এই জন্যই আফিয়া বেগম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন,আজ রাতে নাফিসা তার কাছেই থাকবে।যেন তিনি নিজে খেয়াল রাখতে পারেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি অসন্তুষ্ট যে মানুষটা, সে হলো সায়মান।
কারণ, এখন সে বউ ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারে না।

অফিসের জরুরী কাজ থাকাই শেষ করে অনেক রাত করে বাসায় ফিরল সায়মান। তাড়াতাড়ি করে বউকে দেখার জন্য নিজের রুমের দিকে ছুটলো রুমে ঢুকেই থমকে গেল সে। পুরো রুম ফাঁকা।
বিছানা খালি… বালিশে কোনো ভাঁজ নেই… যেন কেউ শুয়েইনি সেখানে।সায়মানের ভ্রু কুঁচকে গেল। বিরক্তি আর অস্থিরতা একসাথে চেপে ধরল তাকে। ঠিক তখনই সকালে মায়ের কথা মনে পড়ল,
“আজকে নাফিসাকে আমার কাছে রাখব।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। কিন্তু তবুও মনটা মানতে চাইছে না।
ডিএসপি সায়মান তাহের রাশিদ—যে মানুষটা একসময় দিনের পর দিন নির্লিপ্ত থাকতে পারত…এখন সেই মানুষটাই বউ ছাড়া এক পলক থাকতে পারে না। নিজেকে কেমন শূন্য শূন্য লাগে।
সে দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিল।তারপর একটা ঢিলেঢালা টি-শার্ট পরে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে এল।মাথাটাও ঠিক করে মুছেনি। এত পরিপাটি হয়ে ঘুরে বেড়ানো মানুষটা এখন বউয়ের পিছনের ছুটতে গিয়ে নিজের খেয়াল রাখায় ভুলে গেছে। সোজা হাটা শুরু করল, নাফিসার রুমের দিকে।
করিডোরে হালকা আলো। চারপাশে নিস্তব্ধতা। ঠিক তখনই কারো সাথে সায়মান ধাক্কা খেল,

“চোখ কান খোলা রেখে হাঁটতে পারো না? আর এত রাতে এইখানে কি? ” —গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন মাহবুব রাশিদ।
সায়মান থেমে গেল। একটু মাথা তুলে বাবার দিকে তাকাল, তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,
“আপনি যেটার জন্য এসেছেন… আমিও ঠিক সেটার জন্যই এসেছি।”
মাহবুব রাশিদ ভ্রু কুঁচকে তাকালেন,
“কি বলতে চাও?”
সায়মান এবার এক পা এগিয়ে এল। গলায় নির্লিপ্ত ভঙ্গি বললো,
“সোজা কথা, আপনি আপনার বউকে কোলে তুলে আপনার রুমে নিয়ে যাবেন… আর আমি আমার বউকে।”
মাহবুব রাশিদ রেগে বলল,
“মুখটা আজকাল একটু বেশি চলছে তোমার। নিজে এত বড় একটা অফিসার আবার দিনকে দিন বুড়ো হচ্ছ তবু কথাবার্তা শিখলে না এখনো। ভুলে যেও না, আমি তোমার বাবা।”
সায়মান একটু হালকা মাথা কাত করল।

“ভুলে যাই কিভাবে? আপনি তো আমার মায়ের বউ-পাগল স্বামীটা।”
এক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা…
“বেয়াদব!” ধমকে উঠলেন মাহবুব রাশিদ।
সায়মানের “বেয়াদব!” শোনার পরও মুখের কোণে হালকা হাসিটা চাপা রইল। আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে সে সোজা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল,
“আম্মু…” —ডাক দিলো একটু নরম গলায়।
বিছানার পাশে হেলান দিয়ে বসে থাকা আফিয়া বেগম চমকে তাকালেন। তারপর উঠে বসে বললেন,
“তেহু? কখন আসলি? কিছু লাগবে নাকি?”
সায়মান গম্ভীর মুখে এগিয়ে এলো। চোখটা একবার ঘুমিয়ে থাকা নাফিসার দিকে গিয়ে থেমে গেল, তারপর আবার মায়ের দিকে ফিরল।

“আব্বু বাইরে ওয়েট করছে। তোমাকে ডাকছে… আর আমি পিচ্চি পুতুলটাকে আমাদের রুমে নিয়ে যাচ্ছি।”
আফিয়া বেগম ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
“ওমা কেন? আমি তো তোর ভালোর জন্যই ওকে এই রুমে নিয়ে আসছি। রাতে তোর ঘুম হয় না, ওরও কষ্ট হয়… আমি থাকলে একটু খেয়াল রাখা যায়।”
সায়মান একদম শান্ত স্বরে বলল,
“কোন সমস্যা নাই। আমি খেয়াল রাখতে পারব। তুমি যাও… আব্বু বাইরে ডাকছে।”
আফিয়া বেগম একটু বিরক্ত হলেন।
“কেন? তোর বাবাকে তো আমি বলে আসলাম, আমি আজ এখানে থাকব। তাও আবার—”
কথা শেষ করার আগেই সায়মান ঠোঁটের কোণে হাসি রেখে গম্ভীর সুরে বলল,
“আম্মু… তুমি যদি এখানে থাকো, আর আব্বু তার বউয়ের শোকে কান্না করুক আর আমি কিন্তু ওই কান্নার দায় নিব না।”
এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেলেন আফিয়া বেগম। তারপর চোখ বড় বড় করে তাকালেন ছেলের দিকে।

“এইসব কথা তুই কবে শিখলি? সাইফানের সাথে বেশি বেশি সময় কাটাস নাকি আজকাল?”
সায়মান আফিয়া বেগমের কথার উত্তর না দিয়ে আবার বলে উঠলো,
” দরজার বাইরে আব্বু ওয়েট করছে তুমি তাড়াতাড়ি যাও!”
আফিয়া বেগম মাথা নাড়িয়ে হালকা লজ্জা পেলেন। তারপর উঠে দাঁড়ালেন।
“আচ্ছা, আমি যাচ্ছি…আমার মেয়েটার খেয়াল রাখিস। ”
দরজার কাছে গিয়ে আবার থামলেন। পিছনে ফিরে নরম গলায় বললেন,
“কিছুক্ষণ আগে ঘুমিয়েছে। এখন এই রুমেই থাক… ঘুম ভাঙলে নিয়ে যাস।”
সায়মান মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো।
আফিয়া বেগম বাইরে বের হতেই করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা মাহবুব রাশিদকে দেখলেন। ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“এই যে নেতা সাহেব, বুড়ো বয়সে ছেলেদের সামনে একটু আমার সম্মান রাখতেন! আপনাকে না বলে আসলাম আমি এখানে থাকব—তবুও কথা শোনেন না কেন?”
মাহবুব রাশিদ কোনো উত্তর না দিয়ে হঠাৎই এগিয়ে এসে আফিয়া বেগমকে কোলে তুলে নিলেন।

“এই কি করছেন আপনি! নামান আমাকে!” —চমকে উঠলেন আফিয়া বেগম।
মাহবুব রাশিদ ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে ফিসফিস করে বললেন,
“চিৎকার করো না, আমার বেগম সাহেবা… তোমার আর একটা ইতর মার্কা ছেলে আছে। সে যদি দেখে, আমাদের যতটুকু মান-সম্মান আছে, সেটুকুও থাকবে না। আস্ত দুইটা বাঁদর জন্ম দিয়েছো তুমি।”
আফিয়া বেগম রাগ দেখানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু মুখের কোণে হাসিটা লুকাতে পারলেন না। করিডোর জুড়ে নরম হাসির একটা আবেশ ছড়িয়ে পড়ল।
আর ভেতরে…
সায়মান ধীরে ধীরে দরজাটা বন্ধ করে দিল। নিঃশব্দে এসে বসে পড়ল নাফিসার পাশে। তার এলোমেলো চুলগুলো কানে সরিয়ে দিয়ে খুব আস্তে বলল—
“একটু দূরে রাখলেই কেমন ফাঁকা লাগে জানো… পিচ্চি পুতুল…”
দীর্ঘ সময় নাফিসার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল সেদিকে খেয়াল নেই।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ায় সায়মান পাশে হাত দিয়ে দেখল নাফিসা নেই পাশে। সেকেন্ডের মধ্যে চমকে উঠে এক লাফ দিয়ে উঠে বসলো তারপর সামনে তাকিয়ে দেখল।নাফিসা উঁচু পেট ধরে হাঁটতেছে ধীরে ধীরে, সায়মান ওর হাঁটা দেখে উঠে না নাফিসার কাছাকাছি দাঁড়ালো,
কি ব্যাপার বউ, একা একা হাঁটছো কেন?
নাফিসা হঠাৎ বলে উঠলো,
কোলে নাও তোমার কোলে উঠবো।
সায়মান কথা শুনে বেশ অবাক হলো, সাধারণত এভাবে সরাসরি কোলে নেওয়ার কথা বলার মতো মেয়ে না নাফিসা তাহলে, তারপর বুঝলো প্রেগনেন্সির সাইড ইফেক্ট।
এখন তো বাবু আছে পেটের ভিতরে।
কোলে নিলে বাবু ব্যথা পাবে, আমার পিচ্চি বউ।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৭

নাফিসা মুখ ফুলিয়ে বললো,
তাহলে আমাকে কোলে নিবেন কখন?
সায়মান নাফিসার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি রেখে বললো,
বাবু যখন পেটের ভিতর থেকে বের হয়ে আসবে, তখন তোমাকে আর বাবুকে একসাথে কোলে নিবো।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৯