চিত্রাঙ্গনা শেষ পর্ব
ইশরাত জাহান জেরিন
স্টেজের চারপাশে ভিড় এখন জমেছে। আলো একটু মৃদু করা হয়েছে, শুধু স্পটলাইটটা পড়ে আছে ফিজার ছোট্ট মুখে। চিত্রা আলতো করে ফিজার হাতটা ধরে বলল, “মাম্মাম, কেক কাটবে না?”
ফিজা বড় বড় চোখ মেলে কেকের দিকে তাকিয়ে আছে। “তাটব। মাম্মা… এটা আমাল?”
ফারাজ নিচু হয়ে মেয়ের গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল, “সবটাই তোমার, প্রিন্সেস।”
চারপাশে সবাই গুনতে শুরু করল, “থ্রি… টু… ওয়ান…” ছোট্ট হাতটা ছুরি ধরে কেক কাটতেই, করতালিতে ভরে উঠল হলরুম। সবাই “হ্যাপি বার্থডে” গান গাইছে, ভিডিও করছে। ফারাজ…তাকিয়ে আছে মেয়ের দিকে। দেখতে দেখতে তিনটা বছর কেমন করে চলে গেল? এই তো সেদিন না তাদের ঘরে ফিজা এসেছিল? সেদিন না চিত্রার আর ফারাজের বিয়ে হলো? ফেলে আসা দিনে কিশোরগঞ্জের স্মৃতি তাকে বড্ড ভাবায়। ওমন কঠিন দিন তখন না এলে আজ এত সহজ, সুন্দর জীবন হতো না। হালাল এই জীবন এখন তাকে প্রশান্তি দেয়।
অতিথিরা নিজেদের মতো পার্টি এনজয় করছে। হঠাৎ ফারাজ আঙুল তুলে ইশারা করতেই একজন স্টাফ এগিয়ে এলো, হাতে তার একটা ভারী বক্স। কালো ভেলভেটে মোড়া সেই বক্স। চিত্রা ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “এটা আবার কী?” ফারাজ ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁক এনে বলল, “প্রিন্সেসের জন্য স্পেশাল কিছু।” সে বক্সটা ফিজার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “এখনই খোলো।” তবে ফিজা কি আর তা খুলতে পারে? ফারাজ নিজেই খুলল। ফিজা উত্তেজনায় চোখ বড় বড় করে তাকাল। ফারাজ নিজেই ফিতেটা টানল। বক্সটা খুলতেই, ফিজা দেখতে পেল ডায়মন্ড বসানো একটা ছোট্ট খেলনা পিস্তল। আর পাশে… ঠিক তেমনই চকচকে, খেলনা বোমা। চিত্রা প্রথমে বুঝতেই পারল না কী দেখছে। তারপর চোখ বড় হয়ে গেল,
“ফারাজ… আপনি সিরিয়াস?”
ফিজা কিন্তু উল্টো খুশিতে লাফিয়ে উঠল, “ওয়াও! পাপ্পাআআ… গান! পিজা গান পতন্দ তলে।” সে পিস্তলটা হাতে নিয়ে “পিউ পিউ” করতে শুরু করল। ঠিক তখনই পেছন থেকে ভারী গলায় শোনা গেল, “আমি ঠিক কী দেখছি?”
চয়ন কায়সার চোখ সরু হয়ে আছেন, “তুমি আমার নাতনিকে কি গিফট দিলে, জামাই বাবাজি?”
ফারাজ একটুও বিচলিত না হয়ে গ্লাসে চুমুক দিল, “খেলনা।”
“খেলনা?”
চয়ন এগিয়ে এলো, “ডায়মন্ড বসানো বন্দুক আর বোমা তোমার কাছে খেলনা?”
অভ্র পাশ থেকে হেসে ফিসফিস করল বজ্রকে, “শুরু হয়েছে…”
বজ্র ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে বলল, “আজকে জমবে।”
চিত্রা এবার এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল, “ফারাজ, এটা ঠিক হয়নি। আপনি ওকে দিনকে দিন এসব দিয়ে বিগড়ে দিচ্ছেন।”
“মেয়ের বাপের টাকা আছে। মেয়ে বিগড়ে গেলে সমস্যা নেই। আমার মেয়ে বিগড়াবেই। তোমার বাপের কি?”
চয়ন কায়সার হঠাৎ চিত্রাকে বলল, “ওর বাপের কি মানে? ওর বাপেরই সব। ওমা চিত্রা, দেখলি তোর বর বাচ্চা মেয়েটাকে কিসব শিখাচ্ছে?”
ফারাজ ধীরে ধীরে গ্লাস নামিয়ে রাখল। তারপর এক পা এগিয়ে এলো, “হাতে একদিন না একদিন তো ওটা ধরতেই হবে। আগেই শিখাচ্ছি। গান নেওয়ার জন্য আইনের লোক হতে হয় না কিংবা স্মাগলার বা গ্যাংস্টার। নিজের আত্নরক্ষার জন্য সব শেখা দরকার। ওর পাপা একশন পছন্দ করে, মাম্মাম করে। সে তো করবেই। আর তারচেয়ে বড় কথা ওর চৌদ্দ গুষ্টির সবাইও পারে। একজন নানাও তো আছে, গান চালাতে পারে। তবে কাজের কাজ না করে আরেকজনের পেছনে পিস্তল ধরে রাখে। যত্তসব ছোটলোকি কারবার।”
ফিজা সঙ্গে সঙ্গে বলল, টু মাচ চুটুনুকি কালবাল।”
চয়ন কায়সার তৎক্ষনাৎ বলে উঠল, “কার বাল?”
ছোট্ট ফিজা আবার বলল, “কাল বাল।”
“আহারে ফিজা এসব পঁচা কথা বলে না। তুমি নানাভাইয়ের নাতিন। আমার মতোই হবে। বাবার মতো হওয়া লাগবে না। এখন বলো তুমি বড় হয়ে কার মতো হবে?”
ফিজা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “পাপাল মুতুন।”
“কাম সারছে।”
ফারাজ চয়ন কায়সারের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকাল।
এবার চয়ন ঠান্ডা গলায় বলল, “ আমার নাতনি আইনের লোকই হবে।”
ফারাজ হালকা হেসে বলল, “আইন?” একটু ঝুঁকে ফিসফিস করল, “আপনার আইন তো আমায় বদলাতে পারেনি, চয়ন সাহেব। ভালোবাসা পেরেছে।”
চিত্রা এবার লজ্জা পেয়ে বলল, “হয়েছে হয়েছে ফারাজ থামুন। অতিথিরা সব চেয়ে আছে।”
ফারাজ সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। “কই আর হলো? একজন টাকলা লোকের জন্য তো আমার আর তোমার কিছুই হতে পারছে না।”
চয়ন কায়সার ফারাজের দিকে ভ্রু কুঁচকে বলল, “নাউজুবিল্লাহ।” তিনি চলে গেলেন। তিনি যেতেই ফারাজ চিত্রার কানের কাছে ঝুঁকে খুব আস্তে বলল, “প্রিন্সেসটা খুশি হয়েছে, দেখছো?”
চিত্রা কিছু বলার আগেই, ফিজা আবার দৌড়ে এসে বলল, “মাম্মা! দেখো… পিউ পিউ! ফিজা পাপ্পার দেওয়া গান পছন্দ করেছে ইয়েএএএএ।”
চয়ন মাথা নাড়িয়ে পেছনে সরে গেল, “অবিশ্বাস্য…”
অভ্র এবার আর চেপে রাখতে পারল না, “ভাই, আপনি একদম ঠিক করেন নি। কিন্তু আইডিয়াটা মারাত্মক। আমার আর্দ্রের কয়দিন পর জন্মদিন। ওর তো এখনি মেয়ে মানুষ পছন্দ। ওকে একটা বউ গিফট করব ভাবছি।”
ফারাজ অভ্রের দিকে তাকাতেই অভ্র বেচারা চুপ হয়ে গেল। স্টেজের সামনে এখনও ভিড়। কেক কাটা শেষ, এখন প্লেটে প্লেটে কেক তুলে দিচ্ছে স্টাফরা।
ফারাজ নিজেই একটা ছোট প্লেট নিয়ে দাঁড়িয়ে ফিজার জন্য কেক কাটছে খুব মন দিয়ে। হঠাৎ চয়ন কায়সার আবারও উড়ে এসে জুড়ে বসলেন। “এই যে… এত মন দিয়ে কেক কাটছো, বিষ মিশাওনি তো?”
“আরে বাপরে কেমন করে জেনে ফেললেন? ভাবছিলাম আপনাকে খাওয়াবো।” ফারাজ থামল না, কেকের টুকরোটা নিখুঁত করে প্লেটে রেখে বলল,
চয়ন ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “দেখো আমি কিন্তু সিরিয়াস।”
ফারাজ এবার তাকাল। ঠোঁটে কুটিল হাসি, “আমিও। এত বছর পরেও আপনি বেঁচে আছেন। এইটা কিন্তু আনফেয়ার শাশুরজি।”
“আমি মরি না কেন এটা নিয়ে কিছু লোকের যত জ্বালা।”
“ওমা তাই নাকি? ভালো কথা আপনাকে যে ব্যবসার আইডিয়াটা দিলাম। পরে সেটা নিয়ে ভেবে দেখেছেন?”
“কোনটা?”
পাশ থেকে অভ্র বলে উঠল, “আরে ওইযে গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবসা। আপনি যেই গ্যাস ছাড়েন। ওইগুলো বোতলে বন্দী করে বাংলাদেশ পাঠালেও হাজার মানুষের উপকার হতো। কিন্তু আপনি তো আর দেশের মানুষের উপকার করবেন না। কারন আপনি হলেন রাজাকার, দেশদ্রোহী, গাদ্দার একেবারে পাই টু পাই সব।”
চয়ন কায়সার কপাল কুঁচকে অভ্রর দিকে তাকাতেই সে চুপ হয়ে গেল। চয়ন কায়সার এবার একটা প্লেট তুলে নিলেন, কেকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এইটা কি কেক, না সোনা-রুপা গলিয়ে বানিয়েছো? আর আমায় এত বেশি দিলে যে?”
ফারাজ হেসে বলল, “আপনার জামাইয়ের ইজ্জত আছে, কম কিছুতে মানায়? ওত ছোটলোক আমি নই।”
“ইজ্জত?”
চয়ন কটমট করে তাকালেন, “তোমার ইজ্জত সম্পর্কে আমি খুব ভালো করেই জানি।”
ফারাজ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল, “জানেন বলেই তো মেয়ে দিয়েছেন।”
চয়ন রেগে গিয়ে বললেন, “আমি মেয়ে দেইনি, মেয়ে নিজেই গিয়ে পড়েছে!”
ফারাজ হেসে ফেলল, “এত হ্যান্ডসাম ছেলে দেখলে মেয়েরা এমনিতেও লোভ সামলাতে পারে না।”
চয়ন এক টুকরো কেক মুখে দিলেন, কিন্তু মুখটা এমন করলেন যেন বিষ খেয়েছেন, “উফ! এত মিষ্টি কেন?”
ফারাজ সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আপনার কথার ব্যালেন্স করার জন্য।”
অভ্র এবার হেসে কাশতে লাগল। বজ্র হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছে। চয়ন গম্ভীর হয়ে বললেন,
“দেখ, আমি কিন্তু ডায়াবেটিক…….।” পুরোটা শেষ করার আগেই ফারাজ খুব শান্ত গলায় বলল, “তাই তো মিষ্টি কথা সহ্য হয় না।”
“এই ছেলেটাকে আমি একদিন জেলে ঢুকাবো!”
“লাইনটা অনেক পুরোনো হয়ে গেছে, আপডেট করেন।”
চয়ন এবার সত্যি সত্যি রেগে গিয়ে বললেন, “তুমি আমাকে ট্রল করছো?”
ফারাজ মাথা কাত করে বলল, “না, এন্টারটেইন করছি। অতিথিরা বোর হচ্ছিল।”
চারপাশে আবার হাসির রোল উঠল। চিত্রা এসে মাঝখানে দাঁড়াল, “দু’জনেই থামুন তো!”
চয়ন একটু থামলেন, তারপর গজগজ করে বললেন,
“আমি আর কিছু বলব না।” ফারাজ সঙ্গে সঙ্গে একটা কেকের টুকরো তুলে তার দিকে এগিয়ে দিল,
“এই নিন, শেষটা খান। রাগ কমবে।”
চয়ন তাকিয়ে রইলেন কয়েক সেকেন্ড।
তারপর বিরক্ত মুখে কেকটা নিলেন। “শেষবার খাচ্ছি।”
ফারাজ মুচকি হেসে বলল, “আপনি প্রতি বারই এইটা বলেন।”
চয়ন কিছু বললেন না। শুধু কেকটা খেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। অভ্র ফিসফিস করে বলল,
“দেখছিস? আবার হার মানলো।”
বজ্র হেসে মাথা নাড়ল, “ফারাজের কাছে কেউ জিততে পারলে তো?”
ফারাজদের সামনেই ফিজা আর আর্দ্র খেলা করছে। ফারাজ একটু পর পর মেয়ের দিকে তাকাচ্ছে। যদি পড়ে যায়? হঠাৎ আর্দ্র ফিজার হাত থেকে পিস্তলটা কেড়ে নিলো খেলতে খেলতে। “এই পিডা দেতো পিততল এখুন আমাল।”
ফিজা রাগে গাল ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, “দাও! এটা আমাল।”
আর্দ্র মাথা নেড়ে জেদি গলায় বলল, “না! আমি তেলব!”
ফিজার চোখ ভিজে উঠল, ঠোঁট কাঁপছে তার। “পাপাআআআআআআ…!” এই একটা শব্দই যথেষ্ট।
চিত্রা এগোতে যাচ্ছিল, কিন্তু ফারাজ যেন কোথা থেকে ছায়ার মতো এসে দাঁড়াল তাদের মাঝে। তার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তে বদলে গেল, শান্ত মানুষটা হঠাৎই তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “এই! কে আমার মেয়েকে কাঁদাচ্ছে? কালুর বাপ নিজের বাচ্চা সামলাও ঢং না করে।”
অভ্র কেক খাচ্ছিল। ফারাজের কথায় খাওয়া বন্ধ করে ভাবলেশহীন ভাবে তাকালো। আর্দ্র থমকে গেল, হাত ঢিলে হয়ে গেল। ঠিক তখনই অভ্র এগিয়ে এলো, হালকা হেসে বলল, “আরেহ, ওরা তো বাচ্চা খেলতে গিয়ে….” ফারাজ শুনছে, কিন্তু পুরোটা না। সে ইতিমধ্যে ফিজাকে কোলে তুলে নিয়েছে
এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছে, যেন কেউ তাকে ছিনিয়ে নিতে পারে। “কেউ কাঁদাবে না আমার মেয়েকে।”
ফিজা বাবার গলা জড়িয়ে ধরল, ছোট্ট আঙুলগুলো শক্ত করে আঁকড়ে বলল, “পাপা… ও আমালটা নিয়ে গিচ্চে…”
ফারাজ তার কপালে চুমু দিল। গলার স্বর মুহূর্তেই নরম হয়ে গেল, “কেউ কিছু নিতে পারবে না তোমার থেকে। আমি আছি। আর এই অভ্র তোর কালু আমার মেয়ের নামওটাও উচ্চারণ করতে পারে না। ফিজাকে পিডা বলে।”
অভ্র হঠাৎ বলল, “আরে ভাই, আপনি তো এমন রিঅ্যাক্ট করলেন যেন আর্দ্র আপনার বিজনেস দখল করে ফেলছে!”
ফারাজ ভ্রু তুলল, “আমার মেয়ের জিনিস কেড়ে নেওয়া মানে ওই লেভেলেরই অপরাধ।”
অভ্র এবার জোরে হেসে উঠল, “বুঝেছি… মানে আপনি এখন ফুলটাইম ‘ডেঞ্জারাস ড্যাড’!”
ফারাজ ঠান্ডা গলায়, “তুই বুঝবি না।”
“কেন বুঝব না? আমারও ছেলে আছে।”
“তোর ছেলে আছে, আমার মেয়ে আছে।”
অভ্র থমকে বলল, “এইটার আবার আলাদা লজিক কী?”
ফারাজ একটু ঝুঁকে, নিচু গলায়, “মেয়ের ব্যাপার আলাদা।”
অভ্র মাথা নেড়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, “ওহহ! বুঝেছি… মানে ‘প্রিন্সেস সিনড্রোম’!”
ফারাজ মুচকি হাসল, “না। এটা ‘আমার মেয়েকে কেউ ছুঁলেই শেষ’ সিনড্রোম।”
অভ্র হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে বলল, “আচ্ছা বাবা, রাগ করবেন না। কিন্তু একটা কথা বলি?”
“বল।”
“এই রেটেই যদি চলে, পরের বাচ্চা হলে কী করবেন?”
ফারাজ চোখ সরু করল, “মানে?”
অভ্র কাঁধ ঝাঁকাল, “আরেকটা যদি মেয়ে হয়? তখন তো আপনি ভাই আরো দজ্জাল হয়ে যাবেন।”
“ সমস্যা নেই।”
“কেন?”
“যতগুলো মেয়ে হবে, ততগুলো পাহারা দেওয়ার কারণ বাড়বে।”
অভ্র হো হো করে হেসে উঠল, “আপনি মানুষ না, সিকিউরিটি কোম্পানি!”
ফারাজ এবার খোঁচা ফিরিয়ে দিল, “আর তুই? নিজের ছেলেকে সামলাতে পারিস না, আমারে জ্ঞান দিস! কালুর বাপ কোথাকার। জমেলা বুড়ির থেকে তোর ইজ্জত বাঁচানোটাই ভুল হয়েছে।”
অভ্র সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা জবাব দিলো। “আপনি ভুল ছাড়া জীবনে আর কি করলেন।” দু’জনের চোখে চোখ একে ওপরে স্থির হলো। এক সেকেন্ড চুপ…
তারপর দু’জনেই হেসে ফেলল। চিত্রা দূর থেকে দেখে মাথা নাড়ল, “এরা দু’জন কোনোদিন বড় হবে না…”
আয়েশা হেসে বলল, “না, কিন্তু বাবা হিসেবে ওরা ডেঞ্জারাস কম্বিনেশন।” ওদিকে ফিজা আর আর্দ্র আবার দৌড়াচ্ছে আর এই দুই বাবা
নিজেদের অজান্তেই সবচেয়ে বড় বাচ্চা হয়ে আছে এখনও।
অনুষ্ঠানের শেষভাগ। একটা বল ডান্স দিয়েই আজকের এই অনুষ্ঠান এখানেই শেষ হয়ে যাবে। মাস্টার অফ সেরিমনি মৃদু কণ্ঠে ঘোষণা করতেই জুটিরা একে একে ফ্লোরে নামতে শুরু করল। অভ্র হাত বাড়াল আয়েশার দিকে। “ম্যাডাম, এই নাচটা কি আমার সাথে হবে?”
আয়েশা হেসে চোখ নামাল, তারপর তার হাত ধরল,
“আজ না বলার উপায় আছে?”
ওদিকে বজ্র একটু গম্ভীর মুখে নিরুর সামনে দাঁড়িয়ে হাত বাড়াল, “নাচতে পারো তো?”
নিরু ভ্রু তুলে তাকাল, “পারি না ভাবছো?”
“তা হলে প্রুভ করো।” এক চিলতে চ্যালেঞ্জিং হাসি ছুঁড়ে দিয়ে নিরু তার হাত ধরল। একে একে জুটিরা বল ডান্স শুরু করল। নাচের মাঝপথে শেষ জুটিটা এগিয়ে এল।
চিত্ররাজ আসতেই যেন আনন্দের মাত্রা বেড়ে গেল।চিত্রার পরনে গাঢ় কালো শাড়ি, আলোতে তার গায়ে ছায়া-আলোর খেলা। ফারাজ হাত বাড়াল।
“মে আই ?” চিত্রা তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। সেই দৃষ্টিতে দ্বিধা আছে, টান আছে… আর আছে এক অস্বীকার করা যায় না এমন টানাপোড়োন। তারপর ধীরে হাত রাখল তার হাতে। মিউজিক আবার উঠল।
ফারাজ চিত্রার কোমরে হাত রাখতেই তার নিঃশ্বাস আটকে গেল হালকা। দু’জন ধীরে, খুব ধীরে মুভ করতে লাগল। চারপাশের সব জোড়া যেন মিলিয়ে যাচ্ছে, ফ্লোরটা ছোট হয়ে আসছে… শুধু তারা দু’জন।
চিত্রা ফিসফিস করে বলল, “সবাই দেখছে…”
ফারাজ তার দিকে ঝুঁকে এলো, “দেখতে দাও।”
“ ইশ আপনি কখনোই বদলাবেন না, তাই না?”
“তুমি যদি বদলাতে না বলো… তাহলে না।”
চিত্রার চোখ কেঁপে উঠল। “আপনি জানেন, এটা ঠিক না…”
ফারাজ থামল না, বরং তাকে ঘুরিয়ে আবার নিজের কাছে টেনে নিল, “ঠিক-ভুলের হিসেব আমি অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছি, চিত্রা।”
“আর আমি?” তার কণ্ঠে হালকা কাঁপন। “আমাকেও হারিয়ে ফেলেছেন?”
ফারাজ এক মুহূর্ত থেমে তার চোখের দিকে তাকাল,
“তোমাকে হারানো যায় না।” সুরটা তখন তীব্র হয়ে উঠছে। চারপাশে ঘূর্ণনের গতি বাড়ছে।
ওয়াল্টজের তাল ধীরে ধীরে শরীর জড়িয়ে নিচ্ছে।
ফারাজের হাতে চিত্রার হাত। অন্য হাতটা তার কোমরে।
চিত্রা মাথা একটু কাত করে ফিসফিস করল,
“আপনি … ভয় কাকে বলে জানেন?”
ফারাজ ধীরে তাকে ঘুরিয়ে আবার নিজের কাছে টেনে নিল। “তোমাকে হারানোর চিন্তায় যে শূন্যতা বুকের ভেতর বাসা বাঁধে… সেটাই ভয়।” চিত্রার আঙুলগুলো শক্ত হয়ে উঠল তার হাতে। একটু থেমে আবার,
“বিশ্বাস?”
ফারাজ তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড “চোখ বন্ধ করেও তোমার হাত না ছাড়ার নামই বিশ্বাস।”
চিত্রার নিঃশ্বাস একটু ভারী হয়ে এল।
“দূরত্ব কাকে বলে?”
ফারাজ মৃদু হেসে বলল, “একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকেও তোমাকে ছুঁতে না পারার নামই দূরত্ব।”
সুরটা তখন একটু উঁচু হলো, তারা ধীরে ঘুরে গেল।
চিত্রা এবার খুব আস্তে, “আড়াল?”
ফারাজ মাথা একটু ঝুঁকিয়ে তার কানের কাছে বলল,
“হাসির আড়ালে যে কষ্টটা লুকিয়ে রাখো… সেটাই আড়াল।”
চিত্রার চোখ কেঁপে উঠল।
“মায়া?”
ফারাজ থামল না, “যাকে ছাড়তে পারো না, আবার পুরোপুরি পাওয়ারও সাধ্য নেই সেইটুকুই মায়া।” তাদের পায়ের তাল মিলছে, কিন্তু কথাগুলো তাল ভেঙে দিচ্ছে ভেতরের সবকিছু। চিত্রা গলা শুকিয়ে আসা স্বরে বলল,
“অধিকার?”
ফারাজ এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “যেখানে দাবি করার সাহস থাকে না… তবুও হারানোর ভয় থাকে সেটাই অধিকার।”
চিত্রা চোখ নামিয়ে ফেলল। “অপরাধবোধ?”
ফারাজের আঙুল তার হাতে একটু শক্ত হলো, “তোমার চোখে জল দেখেও কিছু না বলতে পারার নামই অপরাধবোধ।” একটা নিঃশ্বাস জমে রইল মাঝখানে।
চিত্রা এবার তাকাল সরাসরি ভাবে, “অপূর্ণতা?”
ফারাজ ধীরে তাকে ঘুরিয়ে নিজের বুকের কাছে নিয়ে এলো, “যেখানে সবকিছু থাকার পরও তুমি থাকো না… সেটাই অপূর্ণতা।”
চিত্রা খুব নিচু গলায় বলল,
“ভুল?”
ফারাজ চোখ নামিয়ে আবার তুলল, “তোমাকে ঠিক সময়ে না পাওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় ভুল।”
চিত্রার ঠোঁট কাঁপল। “আমরা…?”
ফারাজ থেমে গেল এক মুহূর্ত।
তারপর একদম কাছে ঝুঁকে বলল, “আমরা একটা গল্প…যার কোনো সমাপ্তি নেই বিবিজান।”
হঠাৎ ফারাজ চিত্রার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।
“চলো।”
“কোথায়?” চিত্রা বাক্য শেষ করার আগেই সে তাকে টেনে নিয়ে গেল ফ্লোরের বাইরে। ঝলমলে আলো পেছনে পড়ে রইল, সামনে অন্ধকার করিডোর… তারপর দরজা ঠেলে তারা বেরিয়ে এলো বাইরে। বিরাট ফল আর ফুলের বাগান এখানে। চিত্রা আর ফারাজ ভিড় আর কোলাহল ঠেলে নিজেদের জন্য একান্ত সময় বের করতে এই বাইরের জগৎটাকেই বেছে নিয়েছে। তারা দু’জন পাশাপাশি হাটছে। হঠাৎ ফারাজ চিত্রাকে জিজ্ঞেস করল, “এলাহী বাড়িতে কল করো নি? নদী ভাবিকে না কল দেওয়ার কথা ছিল?”
“ওদের সময় আর আমাদের সময় কি ম্যাচ করে? এসব ঝামেলা শেষ হোক, সবাই চলে গেলে রাতে একেবারে ফ্রেশ হয়েই কল দিবো ওদের।”
“তিনটা বছর চোখের দেখায় কেমন করে চলে গেল তাই না ফিজার আম্মু?”
“হ্যাঁ। নদী ভাবীর এখন একটা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে। নিজের একটা ছোট খাটো ফ্যাক্টরী আছে। অনলাইনে কত চাহিদা ওনার ডিজাইন করা জামা গুলোর তাই না বলুন?”
“হুম। আর এলাহী বাড়ির সবাইও তো ভালো আছে। সোহাগ আর মার্জিয়া ওই বাড়িতে থাকায় তাও একাকিত্ব কম লাগে। সোহাগ কত সুন্দর করে ব্যবসাটা সামলাচ্ছে। ঘর সামলাচ্ছে। আগের সোহাগ আর এখনকার সোহাগে কত তফাৎ।”
“এবার দেশে গেলে ভাবছি নদী ভাবীরও একটা গতি করব আর ওই সোহাগটারও।”
“এত কষ্ট করার কি আছে? দু’টোই বিয়ে পরিয়ে দাও না। ঝামেলা শেষ। যাই হোক সবার দিকে তো খেয়াল রাখলে এবার একটু আমার দিকেও ফোকাস দাও। আর আমাদের ফিজা ওর দিকেও। মেয়েটার যে একটা ভাই লাগবে আর আমার যে আরেকটা এলাহী লাগবে সে খেয়াল আছে?”
চিত্রা কিছু বলল না। ঠিক তখনই বৃষ্টি নামল। প্রথমে টুপটাপ… তারপর ঝমঝমিয়ে নামতে শুরু করল। রাতের অন্ধকারে গার্ডেনের লাইটগুলো ভিজে গিয়ে ঝাপসা হয়ে গেছে। মাটিতে পানির ছিটা, বাতাসে সোঁদা গন্ধ। “ওমা বলা নেই, কওয়া নেই হঠাৎ বৃষ্টি? চলুন ফারাজ ভেতরে যেতে হবে।” চিত্রা ভেতরের দিকে চলে যেতে নিলেই ফারাজ চিত্রার হাত ধরে তাকে থামিয়ে দিলো। চিত্রা বৃষ্টি দেখে ভেতরে চলে যেতে নিলে ফারাজ তার হাত ধরে তাকে থামিয়ে দিলো। চিত্রা অবাক হয়ে তাকাল, “ফারাজ! আপনি পাগল নাকি? বৃষ্টি হচ্ছে।” কথা শেষ হওয়ার আগেই ফারাজ তাকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এলো। দু’জনই ভিজে যাচ্ছে। চুল ভিজে কপালে লেগে গেছে চিত্রার, শাড়ি ভারী হয়ে শরীরের সাথে মিশে গেছে। ফারাজের চোখ তার উপর স্থির। একদম নড়ছে না। “এই মুহূর্তটা…”
সে ধীরে বলল, “আমি অনেকদিন ধরে চুরি করে রাখতে চেয়েছি।”
চিত্রার বুক কাঁপছে। “আপনি সবকিছু এত জটিল করে দেন কেন?”
ফারাজ এগিয়ে এল আরও কাছে, “কারণ তুমি সহজ নও।” বৃষ্টির ফোঁটা দু’জনের মাঝখানে পড়ে ভেঙে যাচ্ছে। শব্দগুলো চাপা হয়ে যাচ্ছে পানির আওয়াজে।
চিত্রা নিচু গলায় বলল, “ভিতরে চলুন… সবাই”
“আজ কাউকে দরকার নেই।” ফারাজ থামিয়ে দিল।
“আজ শুধু তুমি… আর আমি।”
এক মুহূর্তে দুজনের নিঃশ্বাসের দূরত্ব কমল। “ফারাজ…”
ফারাজ হাত বাড়িয়ে তার ভেজা চুল কানের পেছনে সরিয়ে দিল।”
দু’জন পাশাপাশি হাঁটছে। একপাশে একটা চাউনি আছে। ফারাজ চিত্রাকে টেনে এনে ছাউনির নিচে থামাল। তবু বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ছে তাদের গায়ে। অল্প অল্প, কিন্তু যথেষ্ট শরীরের উত্তাপ দূর করার জন্য। ” বৃষ্টি কাকে বলে জানেন?”চিত্রা ফারাজকে প্রশ্ন করল..
ফারাজ একটু হাসল, ভেজা চোখে তাকাল,
“যে কান্নাটা কেউ দেখে না… আকাশ সেটাই ধার করে নামায়। ওটাই বৃষ্টি।”
চিত্রা তাকিয়ে রইল তার দিকে। তার চোখে জল, নাকি বৃষ্টির ফোঁটা বোঝা যায় না। “সারাজীবন পাশে থাকা মানে কী?”
ফারাজ এবার একদম কাছে এলো, “একসাথে থাকা না… বরং দূরে থেকেও কাউকে কখনো ছেড়ে না দেওয়া। এইটাই সারাজীবন পাশে থাকা।”
চিত্রার কণ্ঠ আরও নরম হয়ে এলো, “ভালোবাসা… শেষ পর্যন্ত থাকে?”
ফারাজ চোখ নামাল না, “ভালোবাসা থাকে…
মানুষটা থাকুক কিংবা নয়।”
চিত্রা অনেকক্ষণ কিছু বলল না। বৃষ্টির ফোঁটা ছাউনির কিনারা বেয়ে ঝরে। ফারাজ আবার হঠাৎ বলল, “আমার আরো অনেকটা জীবন তোমার সাথে কাটানো বাকি। যখন তুমি বৃদ্ধ হবে, কপালে ভাঁজ পড়বে, চুল সাদা হয়ে যাবে। তখনও একই মুগ্ধতায় তোমার দিকে তাকিয়ে থাকা এখনো বাকি।”
চিত্রার ঠোঁট কেঁপে উঠল। “আমি তখন যদি সুন্দর না থাকি?”
ফারাজ হেসে উঠল খুব আস্তে। “ তোমায় আমি সৌন্দর্য দেখে ভালোবাসিনি বিবিজান। তোমার স্বামী ভালোবাসার কাঙাল, সৌন্দর্যের নয়। আমার তুমি হলেই চলবে, সৌন্দর্যের পূজারি ফারাজ এলাহী নয়। আর তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অভ্যাস…
যাকে একবার ভালোবেসে ফেললে আর ছাড়া যায় না। অভ্যাস হয়ে বুকে জড়িয়ে আছো, আর সৌন্দর্যের অজুহাতে ছাড়ব ভাবছো?”
চিত্রা চোখ নামিয়ে বলল, “জীবন তো সহজ ছিল না আমাদের।”
“সহজ হলে হয়তো এত সত্যি হতো না। যে ভালোবাসা আগুনে পুড়ে শক্ত লোহার ন্যায় হয়, তার মতো সত্য দুনিয়ায় আর কিছু নেই।”
চিত্রার গলা কেঁপে উঠল। “ভালোবাসার আগে কি পাপ বড় না?”
ফারাজ এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,
“যে কামনা মানুষকে নিচে নামায়, সেটা পাপ। যে ভালোবাসা মানুষকে সত্যি করে, শুদ্ধ করে, ধৈর্য শেখায় সে তো পাপ না বিবিজান।”
চিত্রার চোখ ভিজে উঠল। “তবু যদি খোদা জিজ্ঞেস করেন এত ভালোবেসেছিলে কেন?”
ফারাজ হাসল। “আমি বলব, আপনিই তো হৃদয় বানিয়েছেন, আপনিই তো এই ভালোবাসার সৃষ্টিকর্তা। এত সুন্দর সৃষ্টি আপনার, ভালো না বেসে থাকা যায়?”
বৃষ্টি আরও বাড়ল। বাতাসে কাঁপল চিত্রার আঁচল। “আমরা কি শেষ পর্যন্ত একসাথে থাকব?” চিত্রা জিজ্ঞেস করল।
ফারাজ তার দুই হাত নিজের বুকে চেপে ধরল। “শেষ পর্যন্ত না… শেষেরও পরে।”
চিত্রা নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল। ফারাজ বলল,
“আমি চাই একদিন বার্ধক্যে তুমি আমাকে ডেকে বলবে, ‘শুনছেন, ওষুধ খেয়েছেন?’ আমি ভান ধরব ভুলে যাওয়ার, কেবল তোমার বকুনি শোনার জন্য।”
চিত্রার গাল বেয়ে জল নেমে এলো। “আর মৃত্যু? মৃত্যু এলে তো বিচ্ছেদ নিশ্চিত।”
ফারাজ এবার তার খুব কাছে ঝুঁকল। “মৃত্যু দরজা, বিচ্ছেদ না। ওপারে মিলন হওয়ার দরজা। সেখানে গেলে বিচ্ছেদ নয় আরেকটা জন্ম হয় অন্ততকাল একসাথে থাকার জন্য।”
চিত্রা কেঁপে উঠল। “ওপারের ভিড়ে যদি হারিয়ে ফেলি আপনাকে?”
ফারাজ ফিসফিস করে বলল, “আমি হারাব না।
হাশরের ময়দানের ভিড়ের মাঝেও আমার হৃদয়টা তোমার চোখের ঠিকানা ঠিকই খুঁজে নিবে। তারপর খোদার সামনে দাঁড়িয়ে বলব, দুনিয়ায় আপনার যেই সৃষ্টিকে এত কষ্টে পেয়েছি, এপারের দুনিয়াতেও আমার তকদীরে আপনি খোদা তাকে লিখে দিন।”
চিত্রা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তাকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে। ফারাজ চোখ বন্ধ করে বলল,
“শোনো বিবিজান…
এই দুনিয়ায় তুমি আমার ভালোবাসা।
বার্ধক্যে তুমি আমার অভ্যাস।
মধ্যরাতে হলে তাহাজ্জুদের কারণ।
আর আখিরাতে খোদার কাছে,
তুমি আমার একমাত্র চাওয়া।”
চিত্রা মুচকি হাসল। হঠাৎ ফারাজ পুনরায় বলল, “শুনছো! মেয়ের কিন্তু এবার একটা ভাই লাগবে। বারবার বলছি। মেয়েটা আর কতকাল একা থাকবে?”
“মেয়ের ভাই লাগবে নাকি আপনার আরেকটা বাচ্চা লাগবে?”
“তা তো আমার এমনিতেও আরো দশ বারোটা লাগবেই। জোড়া জোড়া হলে আরো ভালো হয়।”
“আরেকটু কাছে আসুন।” ফারাজ আরো কাছে চলে এলো। চিত্রা এবার ফারাজের হাতটা নিজের পেটের ওপর রেখে মৃদু কন্ঠে সুধাল, “আরেকজন এলাহী আসতে চলেছে।” ফারাজ প্রথমে যেন কথাটার মানে ধরতেই পারল না। কিছু সেকেন্ড শুধু চিত্রার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি নামল নিজের হাতের নিচে। চিত্রার পেটের ওপর থেমে থাকা হাতটায়। যেন হঠাৎ পুরো পৃথিবী থেমে গেছে, আর শুধু বুকের ভেতর হৃদস্পন্দনটা জোরে জোরে শোনা যাচ্ছে।
“কি… কী বললে তুমি?”
চিত্রা লাজুক হেসে চোখ নামাল। “যেটা শুনেছেন।”
ফারাজের ঠোঁট কাঁপল। তারপর এমন এক হাসি ফুটল মুখে। সে হঠাৎ দু’হাতে চিত্রার মুখ তুলে ধরল।
“বিবিজান… সত্যি?”
চিত্রা মাথা নেড়ে হালকা হেসে বলল, “হুম… সত্যি।”
“আমি আবার বাবা হব?”
“হ্যাঁ।”
“আবার?” সে নিজেই হেসে উঠল, “মানে…আরেকটা? আমাদের বাচ্চা?” কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছিল উত্তেজনায়। তারপর হঠাৎ সে চিত্রাকে কোমর জড়িয়ে তুলে ঘুরিয়ে ফেলল বৃষ্টির মাঝখানে।
চিত্রা চমকে উঠল। “ফারাজ! নামান… পড়ে যাব!”
চিত্রাকে নামিয়ে দিয়েই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে। দু’হাত আলতো করে রাখল চিত্রার পেটে। চোখে জল চিকচিক করছে। “এই যে শুনতে পাচ্ছো পাপাকে? আমি তোমার পাপা। তোমার মাম্মা তোমার পাপাকে এত বড় বড় উপহার যে দেয় পাপা এই ঋণ গুলো চুকাবে কেমন করে? প্রথমে তোমার বোন, এখন তুমি। ঋণ যে পাপার বেড়েই চলল।”
“কিছু ঋণ তোলা থাকুক।” ফারাজ উঠে দাঁড়িয়ে কপালে ঠোঁট ছুঁলো। তারপর হঠাৎ জোরে চিৎকার করে উঠল বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে,
“আমি আবার বাবা হচ্ছি! ওয়েট এখনি ঘোষণা দিচ্ছি।”
“উঁহু। পরে। এখন আমাদের একান্ত সময় কাটানোর পালা। “
হঠাৎ কারো একটা ডাকে ফারাজ চোখ মেলে গেটের দিকে তাকাল। দেখতে পেল ছাতা হাতে কে যেন দাঁড়িয়ে। চিত্রাও সেদিকে তাকালো। বলল, “ওটা ন্যানি দেখছি।”
ন্যানিকে এদিকে আসতে বললে সে এগিয়ে আসে। তার কোলে আবার ফিজা। ফারাজ ফিজাকে দেখা মাত্রই বলে উঠল, “আরে পাপার পিন্সেস নাকি? তুমি এই বৃষ্টির মধ্যে মা বের হয়েছে কেন? ঠান্ডা লেগে যাবে তো। ন্যানি তুমি তো আর ছোট না। ওকে এখানে কেন এনেছো? বাইরে কেমন করে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে দেখছো? ফিজা বাচ্চা মানুষ ভয় পাচ্ছে না?”
চিত্রা ফারাজকে সাথে সাথে বলল, “আচ্ছা বাদ দেন না।”
ন্যানি তখন বলল, “ফিজা আপনাদের কাছে যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করছিল। জিদ ধরছিল। শেষে না এনে পারলাম না।”
“যাও মা তুমি ন্যানির সাথে ভিতরে যাও। আমরা আসছি।” চিত্রা বলল।
ফিজা আবারও ঠোঁট ফুলিয়ে কান্না ধরল। “আমি দাবো না। আমিও ভিডব।”
“উঁহু মাম্মার জ্বর আসবে।” চিত্রার এই কথা শুনে ফিজা আরো জোরে কান্না করে দিলো। তা দেখে ফারাজ মেয়েকে ভিজা শরীরেই নিজের কোলে নিয়ে বলল, “তুমি চলে যাও। সমস্যা নেই আমাদের কাছেই থাকুক। মেয়ের চোখের জল দেখার থেকে তাকে ভিজতে দেওয়া বেটার।”
“আরে ফারাজ ফিজার তো ঠান্ডা লাগবে।” চিত্রা ফারাজকে বলল। ফারাজ মেয়েকে গাল পেতে দিয়ে বলল, “চুমু দাও তো।” ফিজা বাবার গালে চুমু দিলো। ফারাজও মেয়ের গালে চুমু দিয়ে বলল, “একদিন ভিজলে কিছু হবে না।” ফিজা হঠাৎ চিত্রার দিকে বলল, “টুমিও দাও।”
“কী দিবো?”
“আমাতে টুমু।”
চিত্রা হেসে মেয়ের গালে চুমু দিতেই ফিজা আবার বলল, “এবাল পাপাকে।”
চিত্রা লজ্জা পেল। ফারাজের দিকে একবার চাইতেই ফারাজ বলল, “মেয়েও বাপের চিন্তা করে দেখেছো? খালি বউটাই বুঝল না রে।”
চিত্রা ফারাজকে পাত্তা না দিয়ে ফিজার দিকে চেয়ে বলল, “কিন্তু তোমার পাপা তো গাল পাতছে না। কি করি এখন?”
“ডোল কলে দাও।”
চিত্রা ফারাজের দিকে তাকাতেই ফারাজ গাল এগিয়ে দিলো। চিত্রাও লজ্জায় রক্তজবা মুখখানা এগিয়ে তার গাল ছুঁয়ে দিলো।”
“মজাই লেগেছে। আরেকটা দাও না।”
“ইশ আপনিও না৷ এই বয়সে কী যে বলেন।”
“বুড়ো বললে নাকি? কোন দিক থেকে বুড়ো লাগে? আমার তো কিছুই পাকেনি। উপরে নিচে সব কাঁচা। “
“ইশ যান তো, আস্ত একটা ঠোঁটকাটা পুরুষ।”
বৃষ্টির গতি আরো বাড়ল। চিত্রা মেয়েকে নিয়ে দৌড়ে বৃষ্টিতে ভিজতে লাগল। ফারাজ তাদের পেছন পেছন গেল। ফিজা খুশিতে আত্মহারা। “জানো মা, তোমার মাম্মাম তোমার জন্য খেলার সঙ্গী আনতে চলেছে। তুমি খুশি তো?” ফারাজ মেয়েকে বলল। ফিজা তা শুনে জবাব দিলো, “পিজা তুব থুতি।”
“পিজা না মা ফিজা। তোমার একটা ভাই চাই নাকি বোন?”
“ভাই।”
“বিবিজান ফিজার বাবা তো আমায় করলে,এবার একটা ফাইয়াজ এলাহী চাই। তাই না মা?”
“হু।” তিনজনকেই বৃষ্টি ভিজিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ ফারাজ ফিজাকে আবারও চুমু খেয়ে চিত্রার পেছনে এসে দাঁড়িয়ে কোমড় জড়িয়ে ধরে বলল,
“গল্পের পাতা জুড়েছে গল্পে,
জেগেছে উন্মাদনা।
মনের অসুখে দুস্থ আমি
রোগের প্রতিকার তুমি চিত্রাঙ্গনা……”
চিত্রা মেয়েকে একটা চুমু খেয়ে ফারাজের দিকে আড়চোখে চেয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “আমি তো আপনাকে দিলাম। আপনি দিবেন না?”
ফারাজ ভাবলেশহীন ভাবে বলল, “দিলাম তো।”
“কি?”
ফারাজ এবার বৃষ্টির মধ্যে মেয়ে এবং চিত্রাকে একসাথে জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে গেয়ে উঠল,
~এক বুক ভালোবাসা,
তোমায় দিলাম।
প্রিয় থেকে প্রিয়জন,
করে নিলাম।
হবো আমরা দুজন,
এক প্রান এক মন।
সপ্ন দেখে ছিলাম।~
চিত্রা মাথা রাখে ফারাজের বুকে। ফারাজ চোখ বন্ধ করে দু’জনকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
এই মুহূর্তটা… এই ভেজা রাত… এই দুটো মানুষ এটাই তার দুনিয়া। এটাই তার দুনিয়ায় পাওয়া স্বর্গ। ভালোবাসা সবসময় নিখুঁত হয় না। ভালোবাসা সবসময় সহজও হয় না। মানুষ দু’টোকে যত্নের মাধ্যমে নিখুঁত করে নিতে হয়, সহজ করে গড়ে নিতে হয়। চিত্ররাজের গল্পটা তেমনই। অন্ধকার থেকে আলোয় ওঠার গল্প,
পাপ আর অনুতাপ পেরিয়ে পবিত্রতায় পৌঁছানোর গল্প,
হারিয়ে গিয়ে আবার খুঁজে পাওয়ার গল্প। তাদের ভালোবাসায় ভুল ছিল, ভয় ছিল, দূরত্ব ছিল কিন্তু সবকিছুর পরেও ছিল এক জেদ… একটা অদম্য টান, তা হলো, “তুমি ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ।”
আজ তারা পূর্ণ। কারণ তারা একে অপরকে পেয়েছে শুধু নয় একে অপরকে ধরে রেখেছে, আগলে রেখেছে।
ফিজার হাসির শব্দ আবার ভেসে আসে।
চিত্রা তাকায়, ফারাজ তাকায়। ফারাজ খুব আস্তে বলে ওঠে, “বিবিজান… আমরা কিন্তু এখনো শুরুতেই আছি।” চিত্রা হেসে চোখ বন্ধ করে।
চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯৬
হ্যাঁ, এটাই শেষ নয়।
এটাই তাদের অনন্তের শুরু।
চিত্ররাজের ভালোবাসার কোনো সমাপ্তি নেই।
নেই অন্তত এই জীবনে
নেই অন্তত এই জন্মে…
আর যদি জন্ম ফুরিয়েও যায়
তবুও তারা খুঁজে নেবে একে অপরকে,
হয়তো পরকালে, কিংবা হাশরের অগণিত ভিড়ে।
সমাপ্ত

To much fabulous☺️☺️💝💝💝🥰🥰🥰🥰🥰
আমার অনেক ভালো লেগেছে❤️❤️ হ্যাপি এন্ডিং দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ, একটু একটু কষ্টই লাগছে কারণ প্রত্যেক সপ্তাহে অপেক্ষা করতাম প্রত্যেকদিন অপেক্ষা করতাম একটা এপিসোডের এখন আর আসবে না, তার অনেক খুশি,🤗🤗🩷🩷🩷
happy ending dewar jonno tnx .