চেকমেট ২ পর্ব ২৬
সারিকা হোসাইন
শাহরানের মুখ থেকে গেট আউট শোনার পরপরই রোদ চূড়ান্ত লজ্জা আর ভয়ে গুটিয়ে গেলো।তার সর্বাঙ্গ থরথর করে কাঁপতে লাগলো।গাড়ির দরজা কি করে খুলতে হয় সেটা ভুলে গেলো ।মেয়েটাকে আরও খানিক অস্বস্তি ঢেলে দিয়ে শাহরান বলে উঠলো –
“দিনে দিনে চরিত্রের এতো অধঃপতন হয়েছে?শেষমেশ একটা ছেলেকে?”
রোদ আর শুনতে চাইলো না কিছু।কোনো মতে গাড়ির দরজা খুলে হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে দুই কান চেপে ধরে দৌড়ে চললো বাড়ির ভেতর। রোদ যেতেই জোর করে বন্ধ করে রাখা শ্বাস ফসফস শব্দে নির্গত করলো শাহরাণ।এরপর হাতের করপুটে মুখ চেপে ধরলো। সব কিছু কেমন স্বপ্নের মতো।দুঃস্বপ্ন নাকি সুখের স্বপ্ন তা ঠাহর করতে পারলো না এই পুরুষ।হৃদযন্ত্রে ধড়াস ধড়াস করে হাতুড়ি পেটাচ্ছে কেউ ।এই বুঝি ধুকপুক করতে করতে লাফিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে তা।বুকের খাঁচায় শক্ত করে চেপে ধরলো শাহরান।কেমন অদ্ভুত এক অনুভূতি।কোনো মতে স্টিয়ারিং হুইল ঘুরিয়ে বাড়ির দিকে চলতে শুরু করলো।সেই উষ্ণ কোমল ঠোঁটের স্পর্শ বার বার শরীরে শিহরণ ছড়াচ্ছে ক্রমশ আগ্নেয়গিরির লাভার ন্যায় উত্তাপ বাড়ছে শরীর জুড়ে।চূড়ান্ত পিপাসায় গলা শুকিয়ে উঠছে।মরুভূমির পিপাসার্ত বেদুঈনের মতো দিশাহারা লাগছে সবকিছু ।গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে শাহরান কীভাবে নিজের বাড়ি পর্যন্ত এলো সে নিজেও জানেনা।বিশাল উঠানের মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে টলতে টলতে হেঁটে চললো ঘরের দিকে।হাঁটু ভেঙে বার বার পরে যেতে চাইছে সে শরীর যেনো নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই।
বাড়ির ভেতরের প্রধান দরজা দুই হাতে খোলে এলোমেলো পা ফেললো শাহরণ।সামনে রাখা বৃহত আর্টিফিশিয়াল গাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে গাছ সহ উপুড় হয়ে মেঝেতে পড়লো।
আকস্মিক শব্দে দৌড়ে বেরিয়ে এলো সরফরাজ।এসে দেখতে পেলো মেঝে থেকে হামাগুড়ি দিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে শাহরান।গত রাতে ছেলে প্রচন্ড জ্বরে ভুগেছে সেই দুশ্চিন্তায় ছেলের কাছে দৌড়ে এসে সরফরাজ ব্যস্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো –
“তুমি ঠিক আছো?”
গাছ খানা তুলে বোকার মতো হেসে শাহরান বলে উঠল –
“আম অল রাইট।”
বলেই নেশাক্ত মাতালের ন্যায় হেলেদুলে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলো।প্রথম ধাপে পা দেয়ার আগেই হাঁটু মুড়ে বেকায়দায় বসে গেলো শাহ।সরফরাজ এই দৃশ্যে তপ্ত শ্বাস ফেলে ভ্রু কুচকালো।কেমন একটা সন্দেহের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে চারপাশে ছেলের এই পতন , এলো মেলো হাঁটার ধরন এটা অসুস্থতা নয় ।এটা অন্য কিছুর আভাস।যেই আভাস সরফরাজ নিজেও পার করে এসেছে নিজের ত্রিশ বছর বয়সে।ছেলের দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে সরফরাজ সন্দিহান গলায় বলে উঠলো –
“have you had your first kiss?”
সরফরাজ এর প্রশ্নে শাহরানের চোখ বিস্ফারিত হলো।না চাইতেও লজ্জায় দুই কান লাল হয়ে গরম ভাপ বেরোতে চাইলো।রক্তিম গাল জোড়া দুই হাতে চেপে হো হো করে ফাঁকা হাসলো শাহরান।এরপর বাবার সন্দেহ মিথ্যা প্রমাণ করতে বলে উঠলো –
“ধুর,হুশ!এসব কি বলছো তুমি?আমায় কে চুমু খাবে?তুমিও না?”
বলেই তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালো সে।এরপর রেলিং ধরে দৌড়ে পালানোর প্রয়াস চালালো।কিন্তু শরীর কি আর সায় দেয়?সরফরাজ ছেলের যাবার পানে গলা উঁচিয়ে বলে উঠলো –
“তুমি মিথ্যে বলছো শাহ তোমার চোখ মুখ বলে দিচ্ছে রুদ্রের মেয়ে তোমায় চুমু খেয়েছে ।”
শাহরান থেমে দাঁড়ালো এই কথায়।এরপর বহু কষ্টে গলায় জোর এনে বলে উঠলো –
“যদি এমন কিছু সে করত তবে তার ঠোঁট কে টে নিতাম আমি ।”
সরফরাজ ঠোঁট উল্টে বললো –
“হয়েছে আর মিথ্যে বলতে হবে না।পুরুষ মানুষের জন্য এসব বড্ড কঠিন কাজ।এমন আলগা ভঙ্গি আমিও দেখাতাম একসময়।বাপ হই তোমার।অভিজ্ঞতা একটু হলেও বেশি।যাও রুমে গিয়ে লম্বা শাওয়ার নাও।রাতে ঘুম ভালো হবে।”
শাহরান বেকায়দায় অল্প হাসলো।এরপর দৌড়ে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে ধপাস করে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলো।মাথার চুলে, ঠোঁটে এখনো মেয়েটার স্পর্শ।শরীর জুড়ে দাবানল। শাহরান উপুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে বলে উঠলো –
“আ উইল কিল ইউ স্টুপিড।”
এদিকে নিজের কৃতকর্মে নিজেই বোকা হয়ে বসে রইলো রোদ।বাকি দিন গুলোতে কিভাবে সে শাহরানের সামনে যাবে ভেবেই মরে যেতে ইচ্ছে হলো তার।নিজ গালে নিজেকেই সপাটে চড়াতে ইচ্ছে হলো।মনের নিষিদ্ধ বাসনা কি দমিয়ে রাখা যেতো না?এহেন রাগী গম্ভীর মানুষকে কিস করা খুব জরুরি ছিলো? পরকক্ষনেই রোদের মন বলে উঠলো –
“যা করেছি বেশ করেছি।ভালোবাসা হয় আমার।চুমুই তো খেয়েছি।তাই বলে অপমান করে বের করে দিতে হবে?ইহ একসময় নিজেই ঘুরেছে চুমুর আবদার নিয়ে।আর আজ ভাব দেখানো হচ্ছে।”
রোদ মুখ বাকালো।এরপর প্রিয়ন্তী কে টেক্সট পাঠালো –
“মিস্টার শাহরান কে চুমু খেলাম।স্বাদ বোঝার আগেই গেট আউট করে দিলো। আনরোমান্টিক ভূত একটা।”
প্রিয়ন্তী এই টেক্সট দেখে আকাশ থেকে পড়লো ।তাৎক্ষনিক ডায়াল করল রোদের নম্বর।রিং হলো।রোদ কেটে দিলো।এরপর পুনরায় টেক্সট পাঠালো –
“বিরক্ত করো না ।সামনে দেখা করে অভিজ্ঞতা বলবো।”
ফোন ছুঁড়ে ফেলে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে শাহরান কে ভাবতে লাগলো রোদ।চুমুর মুহূর্ত মনে পড়তেই বালিশ দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললো।এরপর লম্বা শ্বাস টেনে চোখ বুজে বলে উঠলো –
“ভালোবাসি,ভীষণ রকমের ভালোবাসি।”
নিজের অসুস্থতা কাটিয়ে চারদিন পর ভার্সিটি এলো শাহরান।ক্লাসে ঢুকেই চশমার ফাঁক গলিয়ে এদিক সেদিক নজর বুলিয়ে রোদকে খুঁজলো।না বজ্জাত মেয়েটা কোথাও নেই।স্বস্তি পেলো শাহরান।সে ক্লাসে ফোকাস দিলো এমন সময় দরজা থেকে ভেসে এলো মিহি নাটকীয় স্বর –
“May I come in?”
শাহরান দরজার দিকে তাকালো।দরজায় দাঁড়িয়ে আছে রোদ।আকস্মিক শাহরণের নজর পড়লো মেয়েটার ঠোঁটের দিকে। শাহরান স্তব্ধ তাকিয়ে রইলো ।উত্তর দিতে ভুলে গেলো।শাহরণের নজরে রোদের বুক ধক করে উঠলো। লজ্জায় চোখ নুইয়ে গেলো তার।নিজের অস্বস্তি কাটাতে রোদ জিভ দিয়ে শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে কামড়ে ধরলো ।সেই দৃশ্য দেখে শাহরণের বুকে তোলপাড় শুরু হলো। রোদ মাথা নিচু রেখে পুনরায় জিজ্ঞেস করলো –
“স্যার আসবো?”
তাৎক্ষনিক শাহরান ধমকে বলে উঠলো –
“নো।বাইরে দাঁড়িয়ে থাকুন।”
বলেই টাইয়ের নট ঢিলে করে বুকের কাছের শার্টের বোতাম খুলে ডেস্কের সামনে গিয়ে বলে উঠলো –
“কাল আপনাদের সিটির রেজাল্ট দেয়া হবে।যারা ভালো করেছেন তাদের জন্য আছে পুরস্কার।আর যারা ফেইল তারা পাবেন তিরস্কার।”
বলেই রোদের দিকে তাকিয়ে দাঁত কটমট করে বলে উঠলো –
“আপনি পাবেন ক্লাস থেকে বহিস্কার।ক্লাসের সব চাইতে অবাধ্য আর বেয়াদব মেয়ে আপনি।”
বলেই নিজের লেকচারে মনোযোগ দিলো শাহরান । রোদ বিমর্ষ মনে একাকী বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল ক্লাস শেষ হবার।মানুষটার সাথে কোনো ভাবেই যেনো তার মিলছে না।বার বার চেষ্টা করেও দুজন দুই মেরুর বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছে।তবে কি তাদের অদৃষ্টে মিলন লেখা নেই?
রোদ তাৎক্ষনিক মাথা নাড়লো। কীসব ভয়ানক আবোলতাবোল ভাবনা ভাবছে সে।এমনটা কখনোই হবে না। রোদ হতে দেবে না।বহুদিন বাদে যেহেতু মানুষটাকে খুঁজে পেয়েছে সে,অবশ্যই এবার কঠিন বাঁধনে ধরে রাখবে সে।দরকার পড়লে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখবে।
রোদের বিশাল ভাবনার মাঝেই শেষ হলো শাহরানের ক্লাস।গটগট পায়ে রোদকে মাড়িয়ে চলে গেলো শাহরান।পাশে কেউ একজন মুগ্ধ চোখে তাকে পরখ করছে তা আমলেও নিলো না।মানুষটার এহেন কঠোর আচরনে রোদের মন আরও খানিক ভার হলো।সে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ক্লাসে ঢুকে নিজের সিটে গিয়ে বসলো।অপেক্ষা করতে লাগলো পরবর্তী ক্লাসের।
টানা দুই ঘন্টা ক্লাস শেষ করে হাপিয়ে উঠলো রোদ।শরীরে কঠিন আলস্য হানা দিচ্ছে।দুচোখের পাতায় আকস্মিক ভর করলো দারুণ ঘুম।সেই ঘুম কাটাতে লাইব্রেরী তে গেলো রোদ।কিছু ম্যাথ প্রব্লেম সলভড করা বিশেষ জরুরি।
লাইব্রেরির এক কোণে বসে নোট খাতা বের করলো রোদ।বিশেষ মনোযোগের সহিত মেলাতে লাগলো অংক।হঠাৎ একটা অংকে এসে বেশ করে আটকে গেলো সে।কোনো ভাবেই সূত্র মেলাতে পারছে না।নেক্সট ক্লাসেই এটা নিয়ে নিশ্চিত শাহরান তাকে শায়েস্তা করার চেষ্টা করবে।
নিজেকে বাঁচানোর তাগিদে চোখ বন্ধ করে কলম কামড়াতে লাগলো রোদ।দুর থেকে কেউ এই দৃশ্যে কাবু হয়ে জ্ঞান হারাতে চাইলো।রোদের সূত্র মেলানোর ভাবনা যখন তুঙ্গে তখন টুং শব্দে মেসেজ এলো ।ভাবনা ফেলে মেসেজ ওপেন করতেই একটা ভিডিও দেখা গেলো।প্রিয়ন্তী পাঠিয়েছে। রোদ ভ্রু গুটিয়ে কানে হেডফোন গুজলো।এরপর আলগোছে সেই ভিডিও প্লে করলো।
ধীরে ধীরে চলছে ভিডিও।গাড়িতে বসে আছে দুটো ছেলে মেয়ে।চারপাশে ঘোর অমানিশার রাত।ছেলেটি পরম ভালোবাসায় মেয়েটির হাত জড়িয়ে তাতে চুমু খেলো।এই দৃশ্যে রোদের চোখ বিস্ফারিত হলো।পরবর্তী কি হয় তা দেখার জন্য আকাঙ্ক্ষা জন্মালো।বুক ধরফর করে উঠলো।দাঁত দিয়ে নখ কামড়ে নিজের অস্থিরতা কমাতে চাইলো।
এদিকে ওপাশের ব্যক্তি মেয়েটির চোখ মুখে মুহূর্তে মুহূর্তে পরিবর্তন দেখে খানিক চিন্তিত হলো।তার খায়েশ জাগলো পড়াশোনা ফাঁকি দিয়ে কি এমন দেখছে মেয়েটি যা তার মুখের রঙ পাল্টে দিচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে?
ভিডিও চলছে ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে ছেলে মেয়ে। বদ্ধ গাড়িতে তাদের ভালোবাসাময় মুহূর্ত চূড়ান্তে।মেয়েটি ছেলেটির শার্টের কলার টেনে ধরলো।ছেলেটি অন্ধ মোহে মেয়েটিকে চুম্বন করতে উন্মাদ হলো।সুযোগ বুঝে মেয়েটি ব্যাগ থেকে ধারালো চাকু বের করে ছেলেটির বুকে গেঁথে গেলো।
শিহরন জাগানো মুহূর্তে এহেন লোমহর্ষক দৃশ্যে কেঁপে উঠলো রোদ ।কান থেকে টেনে হেডফোন খুলে পাশে তাকাতেই আরেক দফায় চমকে চিৎকার করতে চাইলো রোদ। শাহরান একদম ঝুঁকে তার কাঁধের কাছে এসে ফোনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।রোদ নিজেকে সামলে ফিসফিস করে বলে উঠলো –
“আপনি কি করছেন এখানে?”
নিজেকে সামলে শাহরান বলে উঠলো –
“দেখলাম মেয়ে মানুষের ভালোবাসা কতোটা ভয়ংকর।ছেলেরা যতই এদের সবটা উজাড় করে দিক না কেন,এরা শেষ সময়ে এসে হৃদপিণ্ডে চাকু বসাবেই।ক্যারেক্টার টা একদম তোমার সঙ্গে মিলে গেছে।ওই মেয়ের জায়গায় তুমি থাকলে সিনারি টা আরও ভালো করে ফুটে উঠতো।”
কথা গুলো বলে শাহরান চলে যেতে পা বাড়ালো।থামলো তখনই। অবিশ্বাস্য চোখে রোদের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুচকে বলে উঠলো –
চেকমেট ২ পর্ব ২৫
“কোথাও সেদিন আমাকে মারার জন্য এমন কিসিং কিসিং খেলা খেলো নি তো?”
রোদ লজ্জায় লাল হয়ে টেবিলের নিচে মাথা ঢুকিয়ে রাখলো।আর মনে মনে প্রিয়ন্তীর চৌদ্দ গোষ্ঠীর পিণ্ডী চটকালো। শাহরান খুকখুক করে কেশে গলা পরিষ্কার করে বলে উঠলো –
“এসব ফেলে পড়াশোনায় সিরিয়াস হও কাজে দেবে।মেয়ে মানুষের চরিত্র এমন লুজ হলে সমস্যা।”
