চেকমেট ২ পর্ব ২৭
সারিকা হোসাইন
ভোরের আলো ফুটেছে কিছুক্ষন আগে।এখনো সূর্যের তেজি কিরণ আকাশ ফুঁড়ে ধরণীতে পতিত হয়নি।চারপাশে ঠান্ডা মৃদু বাতাস বইছে সেই সাথে কিচির মিচির করে ডেকে চলেছে নাম না জানা বাহারি পাখির দল।এঞ্জেলো কে নিয়ে গাছপালায় ঘেরা বিশাল খোলা সরু প্রশস্ত রাস্তা ধরে দৌড়ে চলেছে শাহরণ।গত কয়েক দিনের অসুস্থতায় শরীরে যেনো জং ধরে গিয়েছে।তাই শরীর টাকে চাঙ্গা করা বড্ড জরুরি।
লম্বা পায়ে দৌড়ানোর কারনে চিবুক গড়িয়ে ঘাম ঝরছে সুদর্শন এই পুরুষের।ফুলে উঠছে হাতের বাইসেপ মাসেল।ভেজা চুল গুলো কপাল জুড়ে লেপ্টে রয়েছে সেই সঙ্গে লাল হয়ে উঠেছে কান দ্বয়।দীর্ঘ সময় দৌড়ে একটা বেঞ্চে বসলো শাহরান।হৃদপিণ্ড জোরে জোরে ধুকপুক করছে।সামান্য রেস্ট প্রয়োজন।হাতে থাকা পানির বোতল থেকে এক ঢোক পানি নিয়ে গলা ভেজালো সে।এরপর কিছুটা দম নিয়ে আবারও ছুটতে চাইলো।কিন্তু পারলো না ।দুচোখ স্থির হয়ে রইলো সামনে সেই সংগে আটকে এলো শ্বাস।বুকের ছাতিতে সজোরে পেটাচ্ছে কেউ।এই বুঝি পাঁজর ভেঙে যায়।নিজেকে স্বাভাবিক প্রমাণ করতে হাতের আঁজলায় মুখ মুছলো শাহরান এরপর এঞ্জেলো কে নিয়ে উল্টো দিকে হাঁটা ধরলো।
শাহরান কে চমকে দিয়ে তার সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড়ে চললো রুদ্র রাজ কন্যা। যেনো ইচ্ছে করেই পণ করেছে – আজ সারাদিন তোমায় খুব করে জ্বালাবো।
শাহরান এর পাশাপাশি দৌড়াতে দৌড়াতে রোদ বলে উঠলো –
“পালাচ্ছেন যে?”
শাহরান জবাব দিলো না।নিজের মতো ছুটতে লাগলো।সুযোগ বুঝে খপ করে শাহরানের বাহু চেপে ধরলো রোদ।ছুটতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে ঘাসের গালিচায় পরে গেলো শাহরান।এরপর এক ঝটকায় রোদের হাত ছাড়িয়ে জোরে ছুটতে লাগলো।এদিকে বেচারা এঞ্জেলো যেনো বড্ড বেকায়দায় ফেঁসে গেছে আজ।দৌড়াতে দৌড়াতে পায়ের জোড়া ছুটে যেতে চাইছে এই অবুঝ প্রাণীটির।অবস্থা এমন – “ছেড়ে দে ভাই কেঁদে বাঁচি।”
রোদ গলা উঁচিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলো –
“এমন করছেন কেনো?”
শাহরান দাঁত চিবিয়ে বলে উঠলো –
“তোমায় কোলে নিয়ে নাচবো?”
লজ্জা পাবার ভান ধরে রোদ বললো –
“মন্দ হয়না কিন্তু।”
রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো শাহরান।গজগজ করে বললো –
“আচ্ছা নির্লজ্জ মেয়ে তুমি।অথচ কত ইনোসেন্ট ভাবতাম তোমায়।”
রোদ গায়ে মাখলো না অপমান।যাকে মন প্রাণ উজাড় করে ভালোবেসে ফেলা যায় তার কোনো অপমানই যেনো গায়ের চামড়ায় ফুটে না।রোদ ও তো এক সময় শাহরানকে যা নয় তাই বলে অপমান করেছিলো।কই শাহরান তো তাকে ঘেন্না করেনি।বরং হাসি মুখে সমস্ত অপমান সয়ে পিছু পিছু ছুটেছে।আজ না হয় পুরোনো ক্ষত সারতে রোদ মানুষটার পিছন পিছন ছুটলো।ক্ষতি কি?ভালোবাসা লাভ ক্ষতি দেখে হয় বুঝি?ওটা তো মনের ব্যাপার।মনে লাভ ক্ষতি চলে না।ওখানে শুধু ভালোবাসার আরাধনা চলে।ভালোবাসার কাঙাল সামান্য ভালোবাসা পেতে নিজেকে ধুলোয় মিশিয়ে চূর্ণ করে ফেলে।তাও যদি সেই মানুষটাকে নিজের করে পাওয়া যায়!
রোদ ঠোঁটে প্রশস্ত হাসি ঝুলিয়ে পায়ে শক্তি জুগিয়ে শাহরানের পাশে পাশে দৌড়াতে লাগলো।এমন সময় শাহরান দৌড় থামিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়ালো। রোদ ও থেমে গেলো।দাঁড়ালো একদম শাহরানের সামনে।চোখ মুখে কঠিন অভিব্যক্তি ফুটিয়ে শহরন জিজ্ঞেস করলো –
“তুমি কি চাও?”
রোদ নিজেদের দুরত্ব ঘুচিয়ে একদম শাহরানের বুক ছুঁই ছুঁই দাঁড়ালো।বললো –
“যদি বলি আপনাকে চাই,তবে কি করবেন?”
তাচ্ছিল্য হাসলো শাহরান।বললো –
“লাভ নেই।আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।খুব শীঘ্রই আমাদের চার হাত এক হবে।তুমি অযথা ঝামেলা পাকিয়ে আমার বিয়ে ভাঙতে চাইছো আর কিছুই নয়।এসব করো না।মেয়েটা আমাকে খুব ভালোবাসে।আমার সঙ্গে তোমাকে দেখলে তার মন ভেঙে যাবে।আমি বহু আগেই তোমাকে ভুলে গেছি।আমার ভেতরে সামান্য ফিলিংস টুকু নেই তোমাকে ঘিরে।ওসব অল্প বয়সের ভুল ছিলো।এখন আমরা দুজনেই ম্যাচিউর।অতীত ভুলে যাওয়া উচিত আমাদের।তুমি আমার কাছে শুধু একজন স্টুডেন্ট।অন্য কিছু নও।অনুরোধ থাকবে এভাবে আর বিরক্ত করবে না আমায়। যাও বাড়ি ফিরে যাও।”
বলেই শাহরান ছুটে চলে গেলো।স্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইলো রোদ।তার চোখের সামনে থেকে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে শাহরান।কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই।কানে একটা কথাই বেজে চলেছে বার বার –
“শাহরান এর জীবনে শীঘ্রই অন্য করো আগমন হতে চলেছে।”
রোদ নিজেকে সামলাতে পারলো না।বুক ঠেলে চিৎকার করে কান্না পেলো তার।চোখের কুল গলিয়ে ইতোমধ্যে নোনতা বর্ষণ শুরু হয়েছে।একটা গাছে হেলান দিয়ে ধীরে ধীরে বসে গেলো রোদ।এরপর ঘাসের বিছানায় শরীর এলিয়ে কান্না ভেজা গলায় বলে উঠলো –
“আমি হেলায় তোমাকে হারিয়ে ফেললাম।”
ভার্সিটি যাবার জন্য নিজেকে তৈরি করে নিলো রোদ।মন সায় দিচ্ছে না তবুও যেতে হচ্ছে।কারণ ফাইনাল এক্সামের আর বেশি দেরি নেই।জীবন একবার বিপর্যয়ের মুখে পরে দুটো বছর শুষে নিয়েছে।বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে বেঁচে থাকাটাই মূল্যহীন হয়ে পড়বে।
নিজের বই খাতা নিয়ে হেলে দুলে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো রোদ।এরপর গাড়ি করে ভার্সিটি।ভার্সিটির গেটে ঢুকতেই রোদের চোখ গেলো দোতলার বারান্দায়।খুব সুন্দরী এক রমণীর সাথে হেসে হেসে কথা বলছে শাহরান।মেয়েটা বারবার ঢলে পড়ে যাচ্ছে শাহরানের বুকে।মানুষটাও নির্বিকার। যেনো খুব উপভোগ করছে ওই সুন্দরী মেয়েটার ছোঁয়া।এরপর সেই মেয়ের হাত ধরে নিচে নেমে এলো শাহরান।যত্নে খোলে ধরলো গাড়ির দরজা। মেয়েটা বসতেই ড্রাইভিং সিটে বসে শাহরান ইঞ্জিন চালু করলো। স্কেলেটর চেপে হুইল ঘুরিয়ে হাসি তামাশায় মশগুল হয়ে ছুটে চললো কোথাও।খেয়ালই করলো না মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা রোদশী অরোরা কে।
রোদের চোখ ছলছল করে উঠলো এই দৃশ্যে।বুকে কেমন চাবুকের আঘাত লাগলো।মুহূর্তে মুহূর্তে সেই আঘাতে রক্তাক্ত হতে আরম্ভ করলো হৃদপিণ্ড।কোনো মতে চোখের জল আড়াল করে রোদ ক্লাসে গেলো।ক্লাসে নিজের সিটে বসতেই ক্লাস জুড়ে হইচই শুনতে পেলো।সেই সংগে ফিসফাস আলাপন। শাহরানের সংগে নতুন মেয়েটাকে জড়িয়ে একেক জন একেক মন্তব্য শুরু করলো।কেউ কেউ ওভার কনফিডেন্স এর সহিত বলে উঠলো –
“আমি নিজ কানে শুনেছি তারা লাভার।”
অন্য জন বলে উঠলো –
“আমি নিজ চোখে তাদের কিস করতে দেখেছি।উফ মেয়েটা কি সুন্দর!”
রোদ আর বসে থাকতে পারলো না।তার সারা গায়ে জ্বালা ধরলো।বুকের খাঁচা় ভেঙে আসছে।শ্বাস নিতে বুক বিষিয়ে উঠছে।সেই সাথে বাঁধন হারা হতে চাইছে চোখের জল।বহু কষ্টে সমস্ত বিষাদ গিলে খেলো রোদ।এমন সময় ভোঁ ভোঁ করে তার ফোন বেজে উঠলো।স্ক্রিনে প্রিয়ন্তীর নম্বর। রোদ রিসিভ করে ফোন কানে তুললো।
“হ্যালো।”
“ফ্রি আছো আজ বিকেলে?”
“হ্যাঁ। কেনো?”
“অনেক দিন দেখা হয়না।পার্পল গার্ডেনে এসো।জমিয়ে আড্ডা দেবো।”
বিষাদের এই দিনে প্রিয়ন্তীকে বড্ড দরকার ছিলো রোদের।বিধাতা বোধ হয় বুঝতে পেরেছিলেন তা।তাইতো এঞ্জেলের মতো মিলিয়ে দিলেন মেয়েটাকে। রোদ ফোন কেটে দিলো।আজ দুটো ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস আছে।সেই ক্লাস গুলো কোনো মতে শেষ করে বাসায় এসে একটু ঘুমুতে ট্রাই করলো।ঘুম ধরা দিলো না অক্ষিপটে।শুধু দুজনের হাসি মাখা চেহারা ভেসে ভেসে উঠলো।
ঘড়ির কাটা যখন চারের ঘরে গিয়ে থামলো তখন রোদ বিছানা ছেড়ে ওয়াশ রুমে পা বাড়ালো।দীর্ঘ সময় ভিজে শাওয়ার নিলো।এরপর বেরিয়ে এলো গায়ে বাথরোব পেঁচিয়ে।হেয়ার ড্রায়ারে আনমনে চুল শুকাতে শুকাতে রোদের অবচেতন মন তিরস্কার করে বলে উঠলো –
“আজকে এই মানুষটা তোর হবার কথা ছিলো।অথচ নিজ দোষে অন্য কারোর বাহুতে বন্দি।মানুষটাকে সুখে থাকতে দে।তার সুখে কাটা হয়ে বিধার কোনো অধিকার তোর নেই।মানুষটা ঠিকই বলেছে। তোদের মধ্যে স্টুডেন্ট টিচার বৈকি আর কোনো সম্পর্ক নেই এখন আর।তার হক আছে অন্য কাউকে বিয়ে করে সুখের সংসার করার।নিজের বিষাদের কালোমেঘে খামোখা তাকে কেনো মুড়িয়ে নিতে চাইছিস?”
নিদারুণ কঠিন কথা গুলো ভাবতে ভাবতে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো রোদ। কতো বোকাই না সে ছিলো।নিজ হাতে সুন্দর শুভ্র এক ভালোবাসা গলা টিপে হত্যা করেছে সে অনায়াসে।এবার আজীবন তার অনুশোচনায় দগ্ধ হবার পালা।
ড্রেসিং টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো রোদ।একটা কালো রঙের সালোয়ার কামিজে নিজেকে জড়ালো।হুট করেই বাঙালি সাজতে ইচ্ছে হলো।তার মা তাকে সব সময় বলেন –
“সাজলে মনের কষ্ট উবে যায়।মনের ব্যাথা উপশম হয়।ক্ষন কালের জন্য আলাদা জগতে বিচরণ করা যায়।”
রোদ সেই কথার সত্যতা প্রমাণ করতে চাইলো।বের করলো সাজ গোজের জিনিসপত্র।এরপর সাজতে আরম্ভ করলো মন খুলে।নীল মনির চোখের কোল ঘেঁষে টানলো মোটা কালো কাজলের প্রলেপ।ঠোঁটে নুড কালার লিপস্টিক কপালে ছোট টিপ।লম্বা চুল গুলো একটা বিনুনি পাকিয়ে বুকের সামনে ছেড়ে দিলো।হাত ভর্তি ম্যাচিং চুড়ি আর কানে ঝুমকা লাগিয়ে একটা হাত পার্স নিয়ে বাইরে এলো রোদ।
বিকেলের নাস্তা খাচ্ছিলো রুদ্র ড্রইং রুমে ।মেয়েকে আকস্মিক এহেন সাজে দেখে উঠে দাঁড়ালো সে । অপলক তাকিয়ে রইলো মেয়ের নিখুঁত আদলে।মানুষ কম পরীর টুকটুকে বাচ্চা লাগছে মেয়েকে।রুদ্র নাস্তা ফেলে মেয়ের সামনে এসে মাথায় হাত বুলালো।চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠলো। ভগ্ন গলায় রুদ্র বলে উঠলো –
“তোমাকে আমার মা মেহেরুন্নিসার মতো লাগছে।খুব সুন্দর।”
রোদ ঠোঁট টিপে দাঁড়িয়ে রইলো।রুদ্র বুকে জমানো কস্ট ফোস করে শ্বাস ফেলে বাইরে বের করলো।মায়ের মৃত্যুর দিন টা খুব করে মনে পড়ছে আজ।অথচ মানুষটার এখনো বেঁচে থাকবার কথা।রুদ্র পথ ছেড়ে দিলো।মেয়েকে জিজ্ঞেস পর্যন্ত করলো না সে কোথায় যাচ্ছে। রোদ বিদায় নিলো বাবার থেকে।রুদ্র মেয়ের যাবার পানে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠলো –
“আমার মেয়ের মাঝে বহু যুগ পরে তোমাকে খুঁজে পেলাম মা।খুঁজে পেলাম তোমায়!”
পার্পল গার্ডেনের দুই পাশে স্ট্রিট ফুডের পশরা সাজিয়ে বসে আছে বিক্রেতারা।ধোঁয়া উঠা মোমো থেকে শুরু করে চিজে ভরা পিজ্জা পর্যন্ত এখানে পাওয়া যাচ্ছে।খাবারের গন্ধে চারপাশ মম করছে।গৌধুলি লগ্নে রোদ এসে উপস্থিত হলো পার্পল গার্ডেনে।প্রিয়ন্তী আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলো।রোদকে দেখেই জড়িয়ে ধরে গদ গদ গলায় বলে উঠলো –
“তোমাকে দেখে তো মানুষ হার্ট এটাকে মারা যাবে ভাই। এতো সুন্দর হওয়া খুব জরুরি ছিলো বুঝি?
ফিক করে হেসে ফেললো রোদ।বললো –
“তুমি কম কিসে?
প্রিয়ন্তী একটা টেবিল নির্দেশ করে বললো –
“চলো ওখানটায় বসি। এখানের মিট বক্স অনেক মজা।
রোদ সায় জানিয়ে প্রিয়ন্তী কে অনুসরণ করলো। মেন্যু দেখে কিছু খাবার অর্ডার করে প্রিয়ন্তী রোদের মুখোমুখি বসে জিজ্ঞেস করলো –
“এরপর বলো শাহরান কে ভালোবাসার কথা জানাতে পারলে?”
রোদ এই বিষয়ে কথা বলতে চাইলো না। প্রসঙ্গ পাল্টে বললো –
“সামনে এক্সাম নিয়ে অনেক প্যারায় আছি।তারপর বলো তোমার কি খবর?
প্রিয়ন্তী ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বললো –
“আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।আগামী মাসের নয় তারিখে আমার বিয়ে।অনেক দিন প্রাণ খুলে কথা হয়নি তোমার সাথে।সেদিনও অনেক বার ফোন দিলাম ধরলে না।”
প্রিয়ন্তীর বিয়ের খবরে কিছুক্ষন স্তব্ধ হলো রোদ।এরপর হাসির রেখা টেনে বললো –
“নতুন জীবনের জন্য শুভ কামনা।”
প্রিয়ন্তী দীর্ঘ শ্বাস ফেললো।বললো –
“বিয়ের পর আমি কানাডা চলে যাবো।আমার হাজব্যান্ডের ওখানে বিজনেস রয়েছে।
রোদ মাথা ঝাঁকালো।বললো –
“যোগাযোগ রেখো।
ওয়েটার খাবার নিয়ে এলো।প্রিয়ন্তী সুন্দর করে ট্রে থেকে নামিয়ে রোদকে খাবার গুলো সার্ভ করলো।এরপর ধোঁয়া উঠা মোমো সসে ভেজাতে ভেজাতে বলল –
“তুমি চাইলে শাহরানকে তোমার কথা বলতে পারি আমি।তোমার মনে তার জন্য ফিলিংস রয়েছে এটা সরাসরি তাকে খোলে বলবো আমি।
রোদ এই কথা শুনে কিছুক্ষন নিশ্চুপ রইলো।এরপর বললো –
“তার বিয়ে ঠিক হয়েছে।
প্রিয়ন্তী কপাল কুচকে বলে উঠলো –
“কে বলেছে তোমায় এই কথা?
“সে নিজেই বলেছে।
প্রিয়ন্তী ফিক করে হেসে বললো –
“তোমাকে জেলাস ফিল করাতে বলেছে।তার বিয়ে ঠিক হলে আমি জানবো না?
রোদ বিষ্ময়ে শুধালো –
“আচ্ছা তাই নাকি?
“তা নয়তো কি?আংকেল ধরে বেঁধে ওকে বিয়ে দিতে পারছে না ইভেন একটা মেয়ের সামনে পর্যন্ত ওকে নেয়া যাচ্ছে না।সেখানে আচমকা বিয়ে ঠিক হলো কি করে?
রোদ ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষন ভেবে বলে উঠলো –
“ভার্সিটিতে তাকে একটা মেয়ের সঙ্গে দেখেছি আজ।
“মেয়েটা দেখতে কেমন?
“খুব সুন্দর!কোকড়ানো বাদামী চুল।অনেকটা বিদেশিদের মতো।
প্রিয়ন্তী কিছুক্ষন ভেবে নিজের ফোন থেকে একটা ছবি বের করলো।ছবিতে নিনাদ,প্রিয়ন্তী, শাহরান আর সেই মেয়েটি।সবাই এক ফ্রেমে।ছবিটা দেখে রোদ অবাক চোখে মুখে বললো –
“হ্যাঁ এই মেয়েটি।
প্রিয়ন্তী রোদের কপালে টোকা দিয়ে বললো –
“এটা ইয়ং আংকেলের মেয়ে এ্যনা ।ও আর শাহরান ক্লোজ ফ্রেন্ড।ভাই বোনের সম্পর্ক ওদের।
রোদের বুকের উপর জমানো পাথরের স্তূপ মুহূর্তেই সরে গেলো এই কথায়।নিজের বোকামোতে নিজেই হাসলো।এরপর প্রিয়ন্তির সংগে নানান আলাপ চারিতায় মজে উঠলো।ধীরে ধীরে সময় গড়ালো।প্রিয়ন্তী একটা ট্যাক্সি বুক করে আজকের মতো বিদায় নিলো। রোদ কিছুক্ষন গার্ডেন জুড়ে হাঁটাহাঁটি করলো।চারপাশে প্রেমিক প্রেমিকা ঘুরে বেড়াচ্ছে হাত ধরে।এই মুহূর্তে তারও খুব করে শাহরানের হাতের স্পর্শ পেতে ইচ্ছে করলো।কিন্তু কোথায় আছে মানুষটা?
আকস্মিক আকাশের রং পাল্টালো।ঠান্ডা ভারী বাতাস বইছে।সকলের মধ্যে বাড়ি ফেরার তাগাদা দেখা দিলো।বৃষ্টি আসবে বোধ হয়। রোদ কোনো তাড়াহুড়ো করলো না। এখান থেকে তার বাসা হেঁটে গেলে আধ ঘণ্টার মতো।ইচ্ছে হলো খুব করে বৃষ্টিতে ভিজতে। রোদ গার্ডেন ছেড়ে বেরিয়ে এলো।পায়ের জুতো খুলে হাতে নিলো।এরপর ফর্সা পা কংক্রিটের মসৃণ রাস্তায় ফেলে হাঁটতে লাগলো।
ধীরে ধীরে বৃষ্টি ঝরতে লাগলো।প্রথমে গুড়ি গুড়ি।এরপর ঝুমঝুম ধারায়। রোদ দুই হাত মেলে ধরলো বৃষ্টির মাঝে।বৃষ্টির ঠান্ডা জল তার সমস্ত বিষাদ ধুয়ে মুছে সাফ করে দিচ্ছে। আনমনে একাকী ভেজা পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে রোদ।আকস্মিক তার সামনে এসে থামলো ব্র্যান্ড নিউ রেঞ্জ রোভার।চমকে দু কদম পিছনে সরে দাঁড়ালো রোদ।গাড়ি আর তার দুরত্ব এক হাতের কম।গাড়িতে বসে আছে শাহরান।চোখে মুখে উদ্বিগ্নতার ছাপ। রোদ ভেজা ঠোঁট গুলো টিপে শাহরণের শক্ত চোয়ালের দিকে তাকালো।মানুষটা এই মুহূর্তে কি নিয়ে ভেবে চলেছে তা ঠাহর করতে পারলো না রোদ।সে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলো।কিন্তু তাৎক্ষনিক গাড়ি থেকে নেমে তার হাত চেপে ধরলো শাহরান ।এরপর দাঁত চিবিয়ে বলে উঠলো –
“সারাক্ষন পড়া ফাঁকি দেবার ধান্দা?
রোদ চোখে মুখে দুষ্টুমির ছাপ ফেলে বললো –
“আমি স্কুল কলেজের বাচ্চা নই মাস্টার মশাই।আমার লেখা পড়া নিয়ে আপনার এতো না ভাবলেও চলবে।”
আকস্মিক গাড়ির সাথে চেপে ধরলো রোদকে শাহরান।রোদের মুখের দিকে ঝুঁকে বলে উঠলো –
“সামনে এক্সাম আর তুমি জ্বর বাধানোর জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছ বৃষ্টির মধ্যে?
“আমার জ্বর হোক বা রেজাল্ট খারাপ হোক তাতে আপনার কি?আপনার তো বৌ আছে।আপনি তাকে নিয়ে ভাবুন না।”
সহরান একটা ভ্রু উচালো।মেয়েটার সাহস লাগাম হিন।আজকাল কথার খই ফুটে পান থেকে চুন খসলেই।রোদের হাত থেকে জুতো জোড়া নিজের হাতে নিয়ে এক ঝটকায় রোদকে কোলে তুলে গাড়ির ভেতরে বসালো শাহরণ ।এরপর সিট বেল্ট বেঁধে দিতে দিতে বলে উঠলো –
“হাজার হলেও আমার কাজিন তুমি।তোমাকে তোমার মন খুশি মতো যা নয় তাই করতে দিতে পারি না আমি।বড় ভাই হিসেবে একটা দায়িত্ব আছে তাই না?”
মুখ বাকালো রোদ।শাহরান গাড়িতে উঠে টিস্যু দিয়ে নিজের মাথা মুছতে মুছতে রোদের দিকে কয়েকটা টিস্যু এগিয়ে বললো –
“মুছে নাও।নয়তো ঠান্ডা লেগে যাবে।”
টিস্যু ছেড়ে শাহরণের শার্টের কলার চেপে ধরলো রোদ।এরপর গলায় আঙ্গুলির নরম ছোঁয়ার বিচরণ চালিয়ে বলে উঠলো –
“আবার যদি দেখেছি কোনো মেয়েকে নিয়ে হেসে হেসে ঢলাঢলি করতে , তবে একদম মে রে বালি চাপা দিয়ে দেবো।”
বলেই শাহরানের গলা টিপে ধরলো।বাকা হাসলো শাহরন।রোদের হাত চেপে বলে উঠলো –
“পার্পল গার্ডেনে কত ছেলে তোমায় গিলে খেলো আমি কিছু বলেছি?আর দুদিন বাদে বিয়ে করবো,বৌ নিয়ে ঢলাঢলি না করলে বৌ থাকবে আমার কাছে?”
রোদ চোখ সরু করলো।ইচ্ছে মতো ছবক শেখাতে ইচ্ছে করলো এই বজ্জাত লোকটাকে।ছোট ছোট চোখে কিছু ভাবলো রোদ।এরপর দুই হাতে জাপ্টে ধরলো শাহরানকে।বেচারা জোকার মতো মুচড়ে উঠলো। ছাড়াতে চাইলো রোদের হাত।পারলো না।রোদ আরোও শক্ত করে শাহরানের বুকের ভেতর জড়িয়ে রইলো। শাহরান রোদের কব্জি চেপে বলে উঠলো –
চেকমেট ২ পর্ব ২৬
“একা একটা ছেলেকে বৃষ্টির মধ্যে শ্লীলতাহানি।ছিঃ!
শাহরানের ঠোঁটের দিকে এগুলো রোদ।ফিসফিস করে বললো –
“আজকে রাস্তায় লজ্জা হরণ করছি কাল বাসায় গিয়ে করে আসবো।পারলে ঠেকিয়ে দেখাবেন।”
