চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৫
আয়াত বিনতে নূর
রাত প্রায় একটা ছুঁইছুঁই। চারদিকে গভীর রাতের নীরবতা বিরাজ করছে। গলির কুকুরগুলোও এখনো জেগে আছে। মাঝেমধ্যে তারা হুংকার তুলে ডাকছে, যেন সেই নিস্তব্ধ রাতকে আরও রহস্যময় করে তুলছে।
ঢাকা শহরের বেশির ভাগ মানুষ তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তবে কেউ কেউ এখনো জেগে আছে। ব্যস্ততম এই শহরের ব্যস্ততা যেন কখনোই পুরোপুরি শেষ হয় না। রাত হোক কিংবা দিন—মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকে।
কিন্তু আজকের পরিবেশটা যেন অন্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি নিস্তব্ধ। চারপাশে কোথাও কোনো মানুষের উপস্থিতি নেই। আর সেই গভীর নীরবতাকে চিরে ফারিসের কালো মার্সিডিজ এসে থামল চৌধুরী বাড়ির সামনে।
টায়ারের ঘর্ষণে সৃষ্টি হওয়া কর্কশ শব্দ মুহূর্তেই রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে চারদিকে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল।
গাড়ির থামার সঙ্গে সঙ্গেই আবারও চারপাশ অদ্ভুত এক নীরবতায় ছেয়ে গেল। ফারিস ধীর পায়ে গাড়ি থেকে নেমে এলো। এক হাতে কোটটা তুলে নিয়ে চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। কোথাও কেউ নেই। সবাই হয়তো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
আর বেশি কিছু না ভেবে বাড়ির ভেতরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সামনে এগিয়ে গেল সে। মেইন দরজার সামনে এসে থামল। পরমুহূর্তেই প্যান্টের পকেট থেকে চাবি বের করে দরজার তালা খুলল।
বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতেই হালকা এক ঝাপটা বাতাস ফারিসকে ছুঁয়ে গেল। সে সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দিল না। তবে তার মনে হলো, বাইরের তুলনায় বাড়ির ভেতরটা যেন আরও বেশি নিস্তব্ধ, আরও বেশি নীরব।
বাড়ির সব লাইট নিভিয়ে রাখা। শুধু করিডোরে একটি মৃদু হলুদ আলো জ্বলছে। মনে হচ্ছে, কেউই আর জেগে নেই। পুরো বাড়িটাজুড়ে যেন এক অদ্ভুত নীরবতা ঘনীভূত হয়ে আছে।
ফারিস গভীর একটা শ্বাস নিল। সবাই ঘুমিয়ে আছে ভেবে খানিকটা স্বস্তি পেল। কারণ এই অবস্থায় কেউ তাকে দেখলে কী হতে পারে, তা সে খুব ভালো করেই জানে।
ফারিস সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। রাতের নীরবতা যেন প্রতি মুহূর্তে আরও গভীর হয়ে উঠছে। তার হালকা পদচারণার শব্দটুকুও যেন এই নীরবতার মাঝে অস্বাভাবিক ভারী শোনাচ্ছে।
নিজের রুমের সামনে এসে সে থেমে গেল। মুহূর্তের জন্য দ্বিধায় পড়ে গেল—ভেতরে ঢুকবে, নাকি একটু অপেক্ষা করবে? যদি নিশিতা এখনো জেগে থাকে? যদি তাকে এই অবস্থায় দেখে ফেলে? তখন সে কী জবাব দেবে?
সে কি বলবে, সে একজনকে খুন করে এসেছে?
না… কিছুতেই সেটা বলা সম্ভব নয়।
ফারিসকে এই প্রথম এত সামান্য একটি বিষয় নিয়েও এতটা দুশ্চিন্তায় পড়তে দেখা গেল। কয়েক মুহূর্ত নিজেকে সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে দরজাটা খুলল।
ঘরের ভেতরেও একই নিস্তব্ধতা। নাইট ল্যাম্পের মৃদু আলো ছাড়া পুরো ঘর আধো অন্ধকারে ডুবে আছে।
ফারিস নিশ্চিন্ত হলো।
ভেতরে ঢুকতেই তার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো ঘুমন্ত নিশিতার ওপর।
মেয়েটা এলোমেলো ভঙ্গিতে ঘুমিয়ে আছে। কী অপার্থিব নিষ্পাপ লাগছে তাকে! কোমর ছাড়িয়ে নামা লম্বা চুলগুলো বালিশজুড়ে ছড়িয়ে আছে। ছোট ছোট বেবি হেয়ারগুলো এসে পড়েছে মুখের ওপর। একদম ছোট্ট বাচ্চাদের মতো নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে সে। মাঝে মাঝে চুল মুখে লাগার কারণে ঘুমের মধ্যেই বিরক্তির ছোট্ট অভিব্যক্তি ফুটে উঠছে।
দৃশ্যটা দেখে অজান্তেই ফারিসের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।
মনে মনে সে শুধু একটাই কথা বলল—
“আমার পাগলিটা…”
হঠাৎই ফারিসের দৃষ্টি গিয়ে আটকাল নিশিতার উন্মুক্ত পেটের দিকে। এলোমেলোভাবে ঘুমানোর কারণে তার টি-শার্টটা খানিকটা ওপরে উঠে গিয়েছিল। এতক্ষণ বিষয়টা খেয়াল না করলেও এবার চোখ এড়াল না।
দৃশ্যটা দেখে ফারিস নিঃশব্দে একটা শুকনো ঢোক গিলল।
সে বুঝতে পারছে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শিহরণ ছড়িয়ে পড়ছে। তবুও সর্বশক্তি দিয়ে সেই অনুভূতিকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছে সে।
অনেক কষ্টে নিজের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নিল। তারপর নিজের ওপরই বিরক্ত হয়ে নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলল—
**”তোর বউ এখনো ছোট। নিজেকে কন্ট্রোল কর… কন্ট্রোল কর, ফারিস। কতটা কন্ট্রোললেস হলে সামান্য একটা ব্যাপারেই নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাস? মানুষ জানলে তোকে নির্ঘাত বউ-পাগল বলবে।
কন্ট্রোল, ফারিস… কন্ট্রোল।”**
ফারিস জোরে জোরে কয়েকবার শ্বাস নিল। এই মুহূর্তে নিজেকে কয়েকটা গালি দিতে পারলে হয়তো তারই শান্তি লাগত। ঘুমন্ত বউকে দেখেও যে শেষ পর্যন্ত সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসবে, ব্যাপারটা ভাবতেই যেন নিজেকেই চিনতে পারল না।
ফারিস আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। নিশিতার দিকেও আর তাকাল না। সোজা ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। গায়ে এখনো রক্ত লেগে আছে। সাদা শার্টটা যেন পুরোপুরি লাল রঙ ধারণ করেছে।
এই মুহূর্তে শাওয়ার না নিলে নিজেকে আর শান্ত করা যাবে না। আর নিজের নিয়ন্ত্রণ হারানোর জন্য এই পিচ্চি মেয়েটাও তো আছেই! সবকিছু ভাবতে ভাবতেই ফারিস ওয়াশরুমে প্রবেশ করল।
শাওয়ারের নিচে দাঁড়াতেই ঠান্ডা পানির ঝাপটা গায়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গেই এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করল সে। সারাদিনের ব্যস্ততা, ক্লান্তি আর দুশ্চিন্তা যেন পানির সঙ্গে ধুয়ে-মুছে যাচ্ছে। চওড়া, প্রশস্ত বুক বেয়ে টুপটাপ করে গড়িয়ে পড়ছে পানির ফোঁটাগুলো। শক্ত পেশিগুলো যেন আরও দৃঢ় হয়ে উঠেছে। তবে মাঝেমধ্যেই কিছু একটা ভেবে ফারিসের কপালে ভাঁজ পড়ছে।
শাওয়ার শেষে কোমরে তোয়ালে জড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো ফারিস। গায়ে তখনো ছোট ছোট পানির কণাগুলো স্পষ্ট। একবার নিশিতার দিকে তাকাল সে। মেয়েটা এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। যেন পৃথিবীর কোনো কিছুরই খবর নেই তার। সারাদিন পড়াশোনা শেষ করে ফারিসের জন্য অপেক্ষা করতে করতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে, তা সে নিজেও জানে না।
নিশিতার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে মনে মনে বলল,
“ঘুমিয়েও বুঝি কাউকে এত সুন্দর লাগে, জান? একদম আমার ঘুমন্ত পুতুল।”
ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সে। নিশিতা গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে। হয়তো এসি চলার কারণে একটু ঠান্ডা লাগছে। ফারিস আলতো করে কমফোর্টারটা তার গায়ের ওপর টেনে দিল। মুখের ওপর ছড়িয়ে থাকা চুলগুলোও যত্ন করে সরিয়ে দিল।
এরপর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে গভীর ভালোবাসায় একটি চুমু এঁকে দিল।
এই মুহূর্তে ফারিসের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্পাপ মানুষ যেন নিশিতাই।
চুমু দিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“পাগলিটা আমার… তুই জানিস, তোকে কতটা ভালোবাসি?”
নিজেই আবার মৃদু হেসে বলল,
“তোকে ভালোবাসার কোনো সীমা আমার জানা নেই। মহাবিশ্বের যেমন কোনো সীমা নেই, ঠিক তেমনই তোর প্রতি আমার ভালোবাসারও কোনো সীমা নেই। শুধু সারাজীবন আমার হয়েই থাকিস, জান।”
ফারিস কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সে জানে, তার কোনো কথাই নিশিতা শুনতে পাবে না। তবুও কেন জানি সব বলে ফেলল। মানুষটা কখনো কারও সামনে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে না। কিন্তু আড়ালে তার ভালোবাসা ঠিক কতটা গভীর, তা কেউ জানে না।
ফারিস নিশিতার কাছ থেকে সরে এসে জামাকাপড় পরে নিল। পরদিন জরুরি মিটিং। তাই সব প্রস্তুতি আজই শেষ করতে হবে। না হলে সব এলোমেলো হয়ে যাবে।
ল্যাপটপ নিয়ে পাশের কালো সোফায় গিয়ে বসল সে। প্রতিটি প্রয়োজনীয় ফাইল আর তথ্য আবারও খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। নিজের ব্যবসার পাশাপাশি পারিবারিক ব্যবসাও সামলাতে গিয়ে কতটা পরিশ্রম করতে হয় তাকে! তবুও তার মুখে বিরক্তির কোনো ছাপ দেখা যায় না।
তবে একটা বিষয় তাকে খুব ভাবায়। এত দায়িত্বের ভিড়ে নিশিতাকে ঠিকমতো সময়ই দেওয়া হয় না। মেয়েটা সারাদিন তার অপেক্ষায় থাকে, আর ফারিস ফিরতে ফিরতে সে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়।
হঠাৎই ফারিসের ভাবনায় ছেদ পড়ল অস্পষ্ট কিছু কথায়।
ঘুমের ঘোরেই নিশিতা বিড়বিড় করে বলল,
“আপনি কোথায়… ফারিস ভাই…? ফারিস ভাই…”
কথা শেষ হওয়ার আগেই আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল সে।
ফারিসের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। মেয়েটা ঘুমের মধ্যেও তাকে খুঁজছে। বিষয়টা ভাবতেই অদ্ভুত ভালো লাগল তার।
যে ফারিস সবসময় গম্ভীর আর বদমেজাজি হয়ে থাকে, আজকাল নিশিতার কথা ভাবলেই যেন তার সব গম্ভীরতা উধাও হয়ে যায়। মনে হয়, এ যেন এক নতুন ফারিস।
ফারিস ল্যাপটপটা বন্ধ করে টেবিলের ওপর রাখল। উঠে দাঁড়িয়ে একবার ঘড়ির দিকে তাকাল। অনেক রাত হয়ে গেছে। এখন না ঘুমালে সকালে আর ওঠা হবে না। তার ওপর সকালে নিশিতার কলেজের পরীক্ষা। তাকেও কলেজে পৌঁছে দিতে হবে।
ফারিস ঘরের লাইট বন্ধ করে ঘুমন্ত নিশিতার পাশে এসে শুয়ে পড়ল। খানিকটা ঝুঁকে নিষ্পাপ, মায়াভরা মুখটার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বিড়বিড় করে বলল—
“Come on, Sweetheart!
আমি তোমার জন্য জান দিতেও পারি, আবার জান নিতেও পারি, সুইটহার্ট।”
বাক্যটা ছোট হলেও, তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল সীমাহীন ভালোবাসা, গভীর আসক্তি আর অদ্ভুত এক অধিকারবোধ। যে ভালোবাসতে জানে নিঃশেষভাবে, আবার সেই ভালোবাসার জন্য নিজের ভেতরের অন্ধকারকেও জাগিয়ে তুলতে পারে।
আর কিছু বলল না ফারিস। ঘুমন্ত নিশিতাকে নিজের প্রশস্ত বুকের ভেতর আলতো করে টেনে নিল। নিশিতাও ছোট্ট বিড়ালের ছানার মতো নিশ্চিন্তে লেপ্টে রইল তার বুকে। যেন নিজের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়টা আবারও খুঁজে পেয়েছে।
সকাল হয়েছে অনেক আগেই। সূর্য তার আলো ছড়িয়ে দিয়েছে পুরো শহরজুড়ে। সূর্যের সঙ্গে সঙ্গেই ঢাকা শহর যেন আবার নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। চারদিকে মানুষের ব্যস্ততা, যানবাহনের কোলাহল আর কর্মচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে উঠেছে পরিবেশ। রাতের গভীর নীরবতাকে বিদায় জানিয়ে শুরু হয়েছে নতুন একটি দিন।
নিশিতা সকালেই ঘুম থেকে উঠেছে। পাশে ফারিসকে দেখে খানিকটা অবাক হয়ে গেল সে। এত রাত পর্যন্ত তার জন্য জেগে থেকেও দেখা হয়নি। অথচ সে ঘুমিয়ে পড়ার কিছুক্ষণ পরই ফারিস ফিরে এসেছে।
নিশিতার এই বিষয়টা নিয়েই সকাল থেকে একপ্রকার বিপাকে পড়েছে ফারিস। ঘুম থেকে উঠে কিছুই বুঝতে পারছে না বেচারা। তার বউয়ের হঠাৎ কী হলো? অন্যদিন হলে তো “ফারিস ভাই, ফারিস ভাই” বলে একেবারে পাগল করে দেয়, অথচ আজ সকাল থেকেই একদম চুপচাপ। তার সঙ্গে একটি কথাও বলল না। কিন্তু কেন? সে এমন কী করেছে?
এসব নিয়েই আনমনে ভাবছিল ফারিস। ল্যাপটপ অন থাকলেও তার সমস্ত মনোযোগ ছিল নিশিতার দিকেই।
এদিকে নিশিতা সেই সকাল থেকেই ফারিসের সঙ্গে কথা বলেনি। বলবেই বা কেন? কাল তাকে বাড়িতে রেখে যাওয়ার পর একবারও কি খোঁজ নিয়েছে? না, নেয়নি। সারাদিন শুধু কাজ আর কাজ। যেন বউয়ের কোনো প্রয়োজনই নেই তার!
“থাকুক না তাহলে কাজ নিয়েই। আমি কিছুতেই কথা বলব না। লোকটার দিন দিন সাহসই বেড়ে যাচ্ছে। এবার ঠিকই বাগে আনব।”
মনে মনে এমনই শপথ করে রেখেছে নিশিতা।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পরীক্ষার জন্য হিজাব পরছিল সে। মাঝেমধ্যে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময়ও দেখছিল। অলরেডি সাড়ে আটটা বেজে গেছে। পরীক্ষা শুরু হবে দশটায়। তাই একটু তাড়াহুড়ো করছিল।
এদিকে ফারিসের ভেতরটা অস্থির হয়ে আছে। তার বউ যে কেন রাগ করেছে, সেটাই বুঝতে পারছে না। গিয়ে কথা বলার সাহসও হচ্ছে না, নিশিতার গম্ভীর মুখ দেখে। নিজেরই অবাক লাগছে—সে-ই কি না এতটুকু মেয়ের সামনে এসে ভয় পাচ্ছে! সকাল থেকে কতবার কথা বলার চেষ্টা করল, তবুও নিশিতার মুখ থেকে একটি কথাও বের করতে পারল না।
অবশেষে ফারিস উঠে দাঁড়াল। যেভাবেই হোক, আজ বউয়ের রাগ ভাঙাতেই হবে।
ল্যাপটপটা পাশে রেখে ধীরে ধীরে নিশিতার দিকে এগিয়ে গেল।
বিষয়টা নিশিতার চোখ এড়ায়নি। তবুও সে এমন ভাব করল, যেন কিছুই দেখেনি।
ফারিস পেছন থেকে এসে আলতো করে নিশিতাকে জড়িয়ে ধরল। কোমর জড়িয়ে হিজাবের ওপরেই মুখটা রেখে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।
হঠাৎ এমনভাবে জড়িয়ে ধরায় নিশিতা খানিকটা চমকে উঠলেও কিছু বলল না। শুধু বিস্মিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ফারিস আর চুপ থাকতে পারল না। নরম গলায় বলল,
— “কী হয়েছে, জান? এমন করছিস কেন আমার সঙ্গে? কথা বলবি না?”
নিশিতা কিছুক্ষণ চুপ থেকে অভিমানী কণ্ঠে বলল,
— “কিছু হয়নি। ছাড়ুন আমাকে। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
একই উত্তর শুনে এবার ফারিস বিরক্ত হলো।
— “তুই যতক্ষণ না বলবি তোর কী হয়েছে, আমি তোকে ছাড়ছি না। না মানে না। গট ইট? এতে তুই পরীক্ষা দিতে না পারলেও আমি ছাড়ব না।”
নিশিতা এবার রাগী গলায় বলে উঠল,
— “কেন? কেন ছাড়বেন না? আপনার বউ লাগে নাকি? সবসময় কাজ আর কাজ। যান, কাজ নিয়েই থাকুন। বাজে লোক একটা!”
কথাটা বলেই নিজেকে ছাড়িয়ে চলে যেতে চাইলে ফারিস সঙ্গে সঙ্গেই তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আবার কোমর জড়িয়ে নিজের কাছে টেনে নিল।
এবার আর বুঝতে বাকি রইল না—তার বউ কেন এত রেগে আছে।
আর নিশিতা যখন বুঝতে পারল কী হচ্ছে, তখনই ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু যতই চেষ্টা করুক, ফারিসকে একচুলও সরাতে পারল না। বরং ফারিস তাকে আরও শক্ত করে আগলে রাখল।
শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল নিশিতা।
সে থামতেই ফারিস স্বাভাবিক গলায় বলল,
— “এই ব্যাপারটা নিয়েই রেগে আছিস তাহলে, সুইটহার্ট?”
নিশিতা কোনো উত্তর দিল না।
তার নীরবতাই যেন সব উত্তর দিয়ে দিল।
ফারিস ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম এক হাসি ফুটিয়ে বলল,
— “তুই একটু আগে কী বলছিলি? আমার বউ লাগে না… তাই তো?”
নিশিতা এবারও মাথা নিচু করে রইল।
ফারিস আবার বলল,
— “তোর কী মনে হয়, তোর বর অক্ষম? নাকি এতদিনেও আমাকে চিনতে পারিসনি?”
কথার অর্থ বুঝতেই লজ্জায় নিশিতার মাথা আরও নিচু হয়ে গেল। সে তো কথাটা ওই অর্থে বলেনি। কিন্তু ফারিসের কথায় এখন মনে হচ্ছে মাটির নিচে লুকিয়ে যায়।
নিশিতার অবস্থা দেখে ফারিস ঠোঁট কামড়ে মৃদু হাসল। এতদিন পরেও মেয়েটা এমন লজ্জা পাবে, সত্যিই ভাবেনি।
তারপর একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
— “কী হলো? মনে আছে তোর জ্বরের সময়ের কথা? ওই যে ব্যথা পেয়েছিলি বলে বাচ্চাদের মতো কাঁদছিলি? মনে নেই? আচ্ছা, আমি মনে করিয়ে দিই। ওই যে লেকের ধারে গাড়িতে…”
কথা শেষ হওয়ার আগেই নিশিতা তাড়াতাড়ি তার মুখ চেপে ধরে বলল,
— “চুপ! একদম চুপ! অসভ্য, বেয়াদব, নির্লজ্জ লোক! আপনার কি লজ্জা বলতে কিছু নেই? এভাবে এসব কথা বলেন কী করে?”
ফারিস মনে মনে হেসে তার হাতটা আলতো করে সরিয়ে বলল,
— “যে পুরুষ নিজের বউয়ের সামনে লজ্জা পায়, সে আবার কেমন পুরুষ, বল তো?”
কথা শেষ হওয়ার আগেই নিশিতা প্রায় চিৎকার করেই বলল,
— “দয়া করে থামুন! আমারই ভুল হয়েছে আপনার ওপর রাগ করে। প্লিজ, আর আমাকে লজ্জা দেবেন না।”
এবার ফারিস হেসে উঠল। বুঝতে পারল, তার বউয়ের রাগ অনেকটাই কমে গেছে।
নিশিতাকে আরও একটু কাছে টেনে এনে মুচকি হেসে বলল,
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৪
— “ওকে, ম্যাডাম। এবারের মতো চুপ হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এখন অন্তত একটা কিস তো চাইতেই পারি, তাই না?”
এতক্ষণে নিশিতার রাগ প্রায় উধাও। তবুও মুখ গোমড়া করে বলল,
— “আমি এসব পারব না। ছাড়ুন আমাকে। সত্যিই দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
ফারিস আর কোনো উত্তর দিল না। হঠাৎ করেই আলতো করে তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
অপ্রত্যাশিত এই মুহূর্তে নিশিতা বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল। আচমকা স্পর্শে তার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন সময়ও থমকে দাঁড়াল।
