Home চোখের আড়ালে ভালোবাসি চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ১৫+১৬

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ১৫+১৬

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ১৫+১৬
আয়াত বিনতে নূর

রাতের শহরটা তখন প্রায় নিস্তব্ধ। দূরে-দূরে ক’টা স্ট্রিট লাইট ছাড়া যেন পুরো পৃথিবী অন্ধকারে ডুবে আছে। সেই অন্ধকার ভেদ করে চৌধুরী ভিলার গেটের সামনে এসে থামে ফারিস ওয়াহিদের চকচকে কালো মার্সিডিস।
ফারিসের দিনের ক্লান্তি চোখে মুখে জমে আছে, কিন্তু মনটা অন্য দিকেই ব্যস্ত—সে সারাদিন অদ্ভুতভাবে অস্থির ছিল, আর সেই অস্থিরতার নাম—নিশিতা। ফারিসের গাড়ি চালিয়ে আসাটাও যেন শুধু বাড়ি ফেরার জন্য নয়—তার অস্থিরতা, টান, চিন্তা সব মিলিয়ে তার মনের অশান্ত পরিবেশ তৈরি করছে। ফারিস গাড়ি পার্ক করে গভীর একটা নিঃশ্বাস নিলো। বাড়ির নীরবতা আজ যেন আরও ঘন। ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে মূল দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই তার পদশব্দটাই যেন বাড়িটাকে জানান দিচ্ছে—সে ফিরেছে।

সে সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। ফারিসের রুমের পাশেই রিয়ার রুম, আর তার পরেই নিশিতার রুম। যেই মুহূর্তে সে নিশিতার রুমের সামনে পৌঁছলো, ঠিক তখনই যেন সমস্ত ক্লান্তি এক মুহূর্তে থেমে গেল।
মাথার ভেতর ঝড়ের মতো ফিরে এলো—নিশিতা।
ফারিস দরজার সামনে থেমে গেল। তার চোখে এক ধরনের টান—যেটাকে সে নিজেও ঠিক নাম দিতে পারে না।
তার পকেট থেকে বেরিয়ে এলো ছোট্ট একটা ধাতব চাবি… নিশিতার রুমের ডুপ্লিকেট চাবি।
ফারিসের নিজের মধ্যেই একটা দ্বন্দ্ব আছে—সে জানে না কেন সে এত টান অনুভব করে। কিন্তু চাবিটি বের করার মাধ্যমে বোঝা যায়, এই টান নতুন নয়; সে আগে থেকেই চায় নিশিতাকে কাছে থেকে বুঝতে, দেখতে, জানতেই।
ধীরে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই ঘরটা মৃদু অন্ধকারে ঢাকা। জানালার ফাঁক দিয়ে হালকা আলো এসে পড়েছে।
বিছানার উপর এলোমেলোভাবে শুয়ে আছে নিশিতা—গভীর ঘুমে। তার পরনে টি-শার্টটি নাভির অনেক উপরে উঠে আছে।তার চোখ আঁটকে যায় সেই দিকে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

তার নিঃশ্বাসের শান্ত শব্দ, তার মুখের নিষ্পাপ ভঙ্গি, পুরো ঘরটাকে অন্যরকম কোমলতায় ভরিয়ে রেখেছে। ফারিসের দৃষ্টি স্থির হয়ে যায় তার দিকে।
এটা কোনো অহেতুক দৃষ্টি না—বরং বহুদিনের দমিয়ে রাখা অনুভূতির চাপ। কিন্তু সে নিজেকে থামিয়ে রাখে। ফারিস আস্তে কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল।
তার চোখে আরেক ধরনের উষ্ণতা—যেটা সে যতই অস্বীকার করুক, তার মনের গভীরে নিশিতার জন্য আলাদা জায়গা তৈরি হয়ে গেছে অনেক আগেই।
সে হালকা মুচকি হাসলো নিজের অজান্তে।
তারপর ফারিস হাত বাড়িয়ে নিশিতার এলোমেলো হয়ে থাকা টি-শার্টটা ঠিক করে দিলো—খুবই নরম, সতর্কতার সঙ্গে।

এটা কোনো ভুল ইচ্ছা থেকে নয়—বরং গভীর মমতা ও দায়িত্ববোধ থেকে।
ফারিস খুব আস্তে বলল,
“দূরে থাকলেও কতটা কাছে টানিস আমাকে… সারাদিন মাথায় ঘুরে বেড়াস তুই। তোর ইগনোর করাটাও সহ্য করতে পারি না। তুই কি করেছিস আমাকে…?”
তার কণ্ঠে স্বীকারোক্তির মতো অসহায়ত্ব।
ফারিস নিশিতার মাথায় হাত বুলিয়ে খুবই নরমভাবে তার কপালে একটা চুমু দিল—যেটা ছিল ভরপুর শুভকামনা, স্নেহ আর অজানা অনুভূতির মিশ্রণ। তারপর চাদরটা ঠিক করে দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

নিজের রুমে গিয়ে সে শাওয়ার নিল দীর্ঘক্ষণ—কিন্তু পানির নিচেও তার চিন্তা ঘুরে ফিরে একই জায়গায় এসে থামছে—নিশিতা।
শুয়ে পড়লেও ঘুম আসছে না। সে শুধু এপাশ-ওপাশ করছে।

সূর্যের আলো জানালা ভেদ করে নিশিতার মুখে পড়তেই সে ধীরে চোখ খুলে।
তার নাকে একটা তীব্র কিন্তু পরিচিত পুরুষালী গন্ধ এসে লাগে… তার শ্বাস থেমে যায় এক মুহূর্ত।
নিশিতা ফিসফিস করে বলল,
“ফারিস ভাই… আবার এসেছিলেন? কিন্তু… কেন?”
তার মনে নানা প্রশ্ন জমতে থাকে—আর চিন্তার সাথে সাথে ঘুম পুরোটা উড়ে যায়।
ঠিক তখনই ফোন বেজে ওঠে—অহনার কল।
দেখে নিশিতা চমকে যায়—৯টা ১০ বাজে!
ওদের তো আজ কলেজে জরুরি কাজ আছে! অনুষ্ঠানের জন্য প্রিপারেশন নেওয়া বাকি।
তারপর তরি ঘরি কর কল ধরতেই
অহনা রেগে বলে,

“কই তুই? তাড়াতাড়ি আয়! দেরি হয়ে গেছে।”
নিশিতা হুটহাট বলতে থাকে,
“যাচ্ছি রে, রিয়াকে নিয়ে আসছি। আর রেডি হচ্ছি।”
অহনা তখন মনে করিয়ে দেয়—
“আজ প্র্যাকটিস আছে! আমি নাম দিয়ে ফেলেছি—আমি, তুই, রিয়া।”
নিশিতা অবাক হলেও রাজি হয়ে ফোন কাটে।
ফোন রেখে নিশিতা নিজের মনে আবার ফারিসের কথা ভাবতে থাকে— কাল রাতে তার জন্য অপেক্ষা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল সে নিজেই জানে না।

নিশিতা তাড়াহুড়ো করে ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে রিয়ার রুমে ঢোকে। রিয়া তখনো ঘুমে।
নিশিতা পানির ছিটা দিতেই রিয়া লাফিয়ে উঠে—
“কে? কে? চোর?!”
নিশিতা হেসে বলে,
“চোর না, আমি! ওঠ তাড়াতাড়ি!”
ওরা দ্রুত রেডি হয়ে নিচে নামে।
নিচে নামতেই নিশিতার মা বলেন —
— ‘খাবার দিচ্ছি খেয়ে নে”।
নিশিতা একবার মায়ের দিকে তাকিয়ে, কিছু বলতে যাবে। রিয়া বলে উঠে—

—”না ছোট্ট আম্মু আমাদের আজকে কলেজে কাজ আছে। মানে আমাদের কলেজে আর ২দিন পর অনুষ্ঠান হবে তাই, ডান্স ক্লাস আছে। তাড়াতাড়ি বের হতে হবে। ”
এই বলে নিশিতার হাত ধরে নিঃশব্দে খাবার না খেয়েই বাইরে বের হয়ে যায়। এদিকে আমেনা বেগম আর রিয়ার মা পরস্পরকে বলে— “ওরা ডান্সে নাম দিয়েছে। ফারিস যেন না জানতে পারে।”
তখনই ফারিস রেডি হয়ে নিচে নেমে আসে। ফারিস নিচে নেমে ডাইনিং রুমের চারদিকে পরপর দুইবার চোখ বুলায়। তারপর চেয়ার টেনে বসতে বসতে মায়ের দিকে
তাকিয়ে বলে উঠে —
“সবাই কই? বাড়িটা ফাঁকা লাগছে।”
ছেলের কথা শুনে আফিয়া চৌধুরি গম্ভীরভাবে বলে,
“ওরা কলেজে গেছে।”
ফারিস কিছু না বলে টেবিলে বসে নাশতা শুরু করে। তার মুখের ভাব বুঝায়—সে কিছুটা বিরক্ত, কিছুটা ভাবনায়।

এদিকে রিয়া আর নিশিতা বাড়ি থেকে বের হতেই দেখলো রাজীব ভাই গেটের সামনে দাঁড়িয়ে।হয়ত বের হবে।
নিশিতা বলল,
“ভাইয়া, একটু নামিয়ে দিবেন?”
***নিশিতার কথা শেষ হতেই রিয়া রাজীবকে ব্যঙ্গ করে তাকিয়ে হেসে উঠল।
— “এই গাধা আবার আমাদের কলেজ পর্যন্ত ড্রপ দেবে? তুই কি পাগল নাকি নিশু?”
রিয়ার কথা শুনে রাজীব পাশে তাকিয়ে রিয়ার মাথায় হালকা করে একটা গাট্টা মেরে বলল—
— “হ্যাঁ, এই গাধাকেই তো তোদের সব কাজে লাগবে। এখন মুখ বন্ধ করে গাড়িতে উঠ, বেশি বকবক করবি না।”
রিয়া মুখ ফুলিয়ে বলল—

— “আরে!আমার গাধা ভাইয়া আবার গাট্টাও মারে––!”
নিশি হেসে ফেলল।
তিনজন মিলে গাড়িতে উঠে বসল।
গাড়ি চালু হতেই রিয়া একনাগাড়ে কথা বলা শুরু করল। গাড়ির ভেতরে রিয়ার বক বক শুরু। নিশিতাও চুপচাপ শুনছিলো।
রিয়ার বললো***
— “কাল রাতে যে সিরিজটা দেখছিলাম না, ওটা একদম অসাধারণ… আর রাফি তো আমাকে পুরো মাথা খারাপ করে দিচ্ছে…”
আর নিশির উত্তর—
— “হুম… হ্যাঁ… আচ্ছা… না…”
নিশির মন আজ একটু ফুরফুরে।

কিন্তু গাড়ি চালাতে চালাতে রাজীব সম্পূর্ণ চুপ। রিয়ার ধারাবাহিক কথা আর নিশির ছোট্ট উত্তর মিলিয়ে গাড়ির ভেতরে এক অদ্ভুত কোলাহল তৈরি হয়, তবু রাজীব চুপচাপ। তার চোখ সামনে—রাস্তায়। ঠিক তখনই তাদের গাড়ি ধীরে ধীরে ট্রাফিক জ্যামে থেমে গেল। ঢাকার রাস্তায় ট্রাফিক—রোজকার সঙ্গী।
রিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে মজা করে বলল—
— “এই যে শুরু হলো আমাদের প্রিয় জ্যাম। আজ নিশ্চয়ই দেরি হবেই।”
নিশি একটু ঝুঁকে বাইরের দিকে তাকাল।
হঠাৎ তার চোখে পড়ে সামনে একটা রিকশা…
আর রিকশায় বসে আছে অহনা।
মুহূর্তেই নিশি চিৎকার করে উঠল—

— “অহনা! এই অহনা!”
তার ডাক শুনে রিয়াও জানালার দিকে তাকাল।
অহনাকে দেখে সে-ও হৈচৈ শুরু করল—
— “আরেহ অহনা! এইদিক! আমাদের সাথে আয়!”
তাদের দু’জনের ডাকাডাকিতে অবশেষে অহনা মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। চমকে ওঠা চোখ। তারপর হালকা হাসি। কিন্তু সে বুঝতে পারে না কী করবে।
নিশিতা হাত নেড়ে ডাকল—
— “এই অহনা! আমাদের সাথেই কলেজে যাবি! আয়, আয়!”
রিয়া তাড়াতাড়ি রাজীবকে বলল—

— “ভাইয়া, অহনাকে আজকে আমাদের সাথে যেতে দিও? প্লিজ?”
রাজীব কিছু বলল না। তার চোখ তখনো অহনার দিকে আটকে আছে— রিকশায় বসা মেয়েটার দিকে। কলেজ ড্রেসে অহনার চুল পিঠ পর্যন্ত বেণী করে নামানো, চোখে হালকা কাজল, ঠোঁটে ঝকঝকে লিপগ্লস… একটা সরল, সাদামাটা সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে। রাজীব তাকিয়ে থাকতে থাকতে আস্তে করে বিড়বিড় করে বলল—
— “এই মেয়েটা… এতো বড় হয়ে গেছে কবে?”
রিয়া আবার ডাকল—

— “ভাইয়া? শুনতেসো?”
রাজীব যেন ধ্যান থেকে ফিরল।
সে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
নিশিতস নির্দেশ দিল—
— “অহনা, তাড়াতাড়ি রিকশার ভাড়া দিয়ে আয়।”
রাজীব নিজের মানিব্যাগ খুলে ৮০ টাকা বের করে দিয়ে বলল—
— “এই নে। রিকশা ভাড়া দিয়ে অহনাকে নিয়ে আয় দ্রুত।”
তার কথা বলার ভঙ্গিটা একটু অগোছালো।
নিশি বিষয়টা ঠিক বুঝতে পারে না, ব্যস্ত হয়ে নিচে নেমে যায়। রিকশাওয়ালার ভাড়া মিটিয়ে অহনাকে নিয়ে তিনজন গাড়িতে বসে।
অহনা মাঝখানে বসতেই রিয়া আবার শুরু—

— “শোন, আজ ক্লাসে কিন্তু আমি স্যারকে জিজ্ঞেস করবো…”
নিশি—
— “না রে, জিজ্ঞেস করলি ঝামেলা হবে…”
অহনা হেসে—
— “তোরা দুজনই না!”
গাড়িতে এখন তিনজনের হৈচৈ। আর রাজীব শান্তভাবে ড্রাইভ করতে করতে মাঝে মাঝে লুকিং গ্লাসে চোখ রাখছে। অহনাকে।
বারবার। হঠাৎ অহনা লক্ষ্য করল…

লুকিং গ্লাসে তার চোখ রাজীবের চোখের সাথে দৃষ্টি মিলে যায়। দুই জোড়া চোখ কিছুক্ষণের জন্য আটকে রইল। অহনার বুক ধক করে উঠল।
তার মুখে বিস্ময়ের ছাপ। রাজীব দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিল।
অহনা ভ্রু কুঁচকে মনে মনে ভাবতে লাগল—
“সে আমাকে এভাবে দেখছিল কেনো? কোনো ভুল করলাম নাকি?” “না… অন্য কিছু?”
সে কিছুই ঠিক বুঝতে পারে না।
এর মধ্যেই গাড়ি কলেজের সামনে এসে থামল।
তিনজন নেমে হইচই করতে করতে কলেজের ভিতরে চলে গেল। অহনার ধীরে ধীরে হাঁটা…
আর পেছন থেকে রাজীবের তাকিয়ে দেখা…
অদ্ভুত এক অনুভূতি তার মুখে।
ঠিক তখনই রাজীবের ফোনে রিং বাজল।
স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই দেখল—
ফারিস কল করছে।
সে কল ধরে—

— “জি ভাইয়া?”
ফারিস বলল—
— “ওদের কলেজে ড্রপ করে দিছিস তো? ওরা ঠিকমতো ভেতরে ঢুকছে তো?”
— “জি ভাইয়া, ড্রপ করে দিলাম।”
— “ঠিক আছে, এখন তাড়াতাড়ি অফিসে আয়। একটা মিটিং আছে।”
রাজীব সোজা হয়ে বলল—
— “ঠিক আছে ভাইয়া, এখনই আসছি।”
এ কথা বলেই সে গাড়ি স্টার্ট দিল।
গাড়ি এগিয়ে চলে গেল। রিয়ার হাসি, নিশির কথা, অহনার বিস্মিত চোখ… সব মিলিয়ে গাড়ির ভিতর জমে থাকা সেই মুহূর্তগুলো রাজীবের মনে থেকে গেল।

নিশিদের ড্রপ করে রাজীব যখন অফিসে চলে গেলো, সকালটা ঠিক যেমন ছিলো তেমনই থেকে গেলো— গরম, ব্যস্ত, আর একই সাথে অদ্ভুত ভারী।
আজ কলেজে ঢোকার মুহূর্তেই নিশির বুকের ভেতর জানো এক ধরনের অস্বস্তি লেগে আছে।
কেন হচ্ছে—সে নিজেও জানে না… বা হয়তো জানে…হয়তো সেই মানুষটার কথা ভেবে, যাকে সে এড়িয়ে চলছে দিন কয়েক ধরে।

দেখতে দেখতে তিনটা পিরিয়ড শেষ হয়ে গেলো।
অনেকদিন পর নাভিদ এসেছে কলেজে। সেদিনের ঝামেলার পর সে আর কলেজে ঠিকমতো আসতো না—বিশেষ করে নিশির সামনে পড়বে এ ভয়েই।
তবে আজ এসেই ক্লাসে ঢুকলো, আর ঢুকে সবচেয়ে আগে যাকে দেখল…নিশি।
তার বুকের মধ্যে হঠাৎ কেমন একটা টান তৈরি হলো। অনেকটা অব্যক্ত, অপরাধবোধ মেশানো দুঃখের মতো।
কিন্তু নিশি? সে চোখ তুলে তাকালই না।
এমনভাবে চোখ নামিয়ে ফেলল যেন নাভিদ নামের কোনো মানুষকে সে চিনেই না।
এই আচরণটা নাভিদকে ভিতর থেকে পোড়াতে থাকে।

আজকে কলেজের আর কোনো ক্লাস হবে না।
কারণ পরশু এনো-ওয়াল ফাংশন।
সবার জন্য প্র‍্যাকটিস, সাজসজ্জা, রিহার্সাল—ভারি ব্যস্ততা।
তাই সবাই মিলে অডিটোরিয়ামে গেলো।
অডিটোরিয়ামের দরজা খুলতেই নানান শব্দ ভেসে আসছে—
গান চলছে, কেউ ডান্স স্টেপ মিলাচ্ছে, কেউ আবার স্টেজ সেট করছে। আলোর ঝিলিক, স্পিকারের কম্পন, আর ছাত্রছাত্রীদের উত্তেজনা—
সব মিলিয়ে অডিটোরিয়াম যেন ছোটখাটো ফেস্টিভ্যালের মতো।

ওখানে একটা কোণার বেঞ্চে বসে আছে নিশি, অহনা আর রিয়া।
রিয়া উৎসাহে ভরপুর, অহনা চিন্তায় ডুবে আর নিশি…
তার মুখে উদাস ভাব।
অহনা বললো,
— “আমরা তো সেভাবে নাচতে পারি না। কিন্তু তুই পারিস নিশু… তুই প্রথমে একা নাচবি, তারপর আমরা দু’জন নাচবো। তারপর তিনজন একসাথে।”
রিয়া মাথা নেড়ে বলল,

— “কিন্তু কোন গান দিবো? আমি তো আগে কখনো স্টেজে নাচি নাই… ভয় লাগতেছে।”
অহনা রিয়াকে কনুই মেরে বলল,
— “তুই ভয় পাস কেন? নিশু আছে না!”
কিন্তু নিশি কোনো উত্তর দিচ্ছে না।
তার মন এসব নিয়ে নেই—সে যেন হাজার মাইল দূরে কোথাও চিন্তায় হারিয়ে গেছে।
অহনা বিরক্ত হয়ে নিশিকে ধাক্কা দিয়ে বলল,
— “নিশু! শুনছিস?”
নিশি চমকে উঠে বলল,
— “হ্যাঁ শুনছি।”
রিয়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
— “তুই আজ অন্য জগতে আছিস নাকি? আয়— প্রথমে তুই প্র‍্যাকটিস কর।”
তারা তিনজন দাঁড়ালো।

নাচ শুরু হওয়ার সাথে সাথে পুরো অডিটোরিয়াম যেন নিশির দিকে তাকিয়ে রইল।
মিউজিক বাজতেই তার শরীরের হালকা দুলুনি, হাতের ভঙ্গিমা, চোখের অভিব্যক্তি— সবকিছু এত নরম, এত গ্রেসফুল যে তাকিয়ে থাকা যায় না।
অহনা ফিসফিস করে বলল,
— “মাইরি… এই মেয়ে মানুষ না, পরী।”
রিয়া হেসে মাথা নেড়ে বলল,
— “এত সুন্দর নাচে কীভাবে? আমি হলে পা জড়িয়ে যেত।”
কিন্তু কেউ টের না পেলেও
এক জোড়া চোখ নিশির উপর একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। নাভিদ। তার চোখের পলক পড়ে না। সেদিনের ঘটনার পর নিশির এভাবে তাকে এড়িয়ে যাওয়া… তার বুকের ওপর হাজারটা পাথরের মতো চাপ ফেলে। সে নিশিকে বলতে চেয়েছিল,
“ক্ষমা করে দে…”
কিন্তু নিশি ভরসা হারিয়েছে—আর তার সামনে দাঁড়ায় না। এই চিন্তা তাকে পুড়িয়ে দিচ্ছে।

প্র‍্যাকটিসের মাঝেই হঠাৎ নিশির ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে “Amma”— আমেনা চৌধুরীর নাম দেখে নিশির মনটা কেঁপে উঠল।
সে ফোন ধরলো।
— “আসসালামু আলাইকুম আম্মু।”
— “ওয়ালাইকুম আসসালাম।”
তারপর আমেনা চৌধুরীর তাগড়া, চিন্তিত কণ্ঠ ভেসে এলো।
— “দেখবি কয়টা বাজে? তিনটা…! সকাল বেলা কিছু খেয়ে বের হোস, এখনো কিছু খাসনি, আমি জানি। রাজীব অফিস থেকে আসার পথে তোদের নিয়ে আসবে। তাড়াতাড়ি বাসায় আয়।”
নিশি ছোট্ট করে বলল,
— “আচ্ছা আম্মু।”
ফোন কেটে নিতেই রিয়া মুখ বাঁকিয়ে বললো,
— “চল তাহলে যাই। আজ আর কিছু হবে না।”

কলেজ ছুটি হলো। রাজীব এসে দাঁড়ালো।
রিয়া আর নিশি চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসল—আজ অদ্ভুত ক্লান্তি। গাড়ি চলছে…
কিন্তু দু’জনের কারো মাথায় নেই গান, গল্প, হাসি—
সবাই চুপ। কিছু মুহূর্তের মধ্যে গাড়ি চৌধুরী ভিলার সামনে এসে দাঁড়ালো। নামার সাথে সাথেই নিশির নজর পড়লো। কালো মার্সিডিস।
ফারিসের গাড়ি। তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
যে মানুষটা থেকে সে পালিয়ে চলে যেতে চায় …
যার ছায়া থেকেও নিজেকে সরিয়ে রাখতে চায়…
সে মানুষটাই আজ বাড়িতে। ফারিসের কথা মনে পড়তেই নিশির বুকটা আঁটসাঁট হয়ে গেল।
মনে পড়লো তার সেই বলা কথাগুলো—যেগুলো আজও নিশির নিঃশ্বাস আটকে দেয়।

“তুই নষ্টামি করতে কলেজে যাস…”
এই কথাটা ভাবলেই নিশির বুক জ্বলে যায়, আর চোখে পানি এসে যায়। রিয়ার ডাক না দিলে নিশি
দাঁড়িয়ে থাকতো আরও কিছুক্ষণ।
— “চল না! কি হলো তোর?”
নিশি তাকিয়ে দেখল ফারিস সামনে নেই।
সে দ্রুত উপরে গিয়ে রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চায়—
বিশেষ করে আজ। স্নান করে, নীল থ্রি-পিস পরে, চুল শুকিয়ে নিজেকে যতটা সম্ভব শান্ত করার চেষ্টা করল… কিন্তু বুকের ভিতরের ঝড় থামলো না।
ঠিক তখনই রিয়া দরজায় টোকা দিলো।
নিচে নামতে বলল। নিশি একটু ভয় পেল—

ফারিস ভাই নিচে থাকলে ?
কিন্তু বাধ্য হয়ে নিচে গেলো।আর যা ভয় করেছিল, তাই হলো। ফারিস টেবিলে বসে আছে।
নিশির পা যেন আটকে গেল। রিয়া হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসালে তবেই সে বসল—
এমনভাবে যেন মনে হচ্ছে তার বুকের ভেতর কেউ ছুরি বসাচ্ছে। ফারিস একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
নিশি চোখ নামিয়ে নিলো। তার ভীষণ অস্বস্তি করছে।

ডাইনিং টেবিলে আলাপ চলছে—
তনয়ার কথা, দুই বোনের তুলনা, পড়াশোনা…রিয়া আর নিশিতার কথা চলতে থাকে। আরাফাত চৌধুরী যখন বললেন —হোমটিউটর আনবেন—একজন ভালো ছেলে—
তখন ফারিসের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
তার দৃষ্টি নিশির দিকে গিয়ে আটকে রইল।
একটা অদ্ভুত রাগ, ঈর্ষা আর দখলদার ভাব তার চোখে। হঠাৎই সে চিৎকার করে উঠল,
— “কোনো ছেলে এই বাড়িতে পড়াতে আসবে না! বলেছি!”
সবাই থমকে গেল। ফারিস খাবার না খেয়ে গটগট পায়ে উপরে চলে গেল।

নিশির আর খাওয়া হল না। সে সোজা রুমে গিয়ে দরজা ঠাস করে বন্ধ করে দিলো। উড়নাটা ছুঁড়ে দিয়ে বিছানায় বসতেই বুকের ভেতর জমে থাকা
কথাগুলো একসাথে বের হয়ে এলো—
“কেনো এমন করেন ফারিস ভাই?
আমার দোষটা কি? আমি তো আপনাকে ভুলে গেছি… তবু কেনো আমাকে কষ্ট দেন?”
তার চোখ ভিজে উঠলো।কিছুক্ষণ পর সে পড়তে বসল।কিন্তু মন পরে আছে ফারিস ভাইয়ের দিকে।

ওদিকে ফারিস দুই ঘণ্টা সাওয়ার নিয়ে রুমে এসে—
নিজেকে আয়নায় দেখে নিজের সাথেই কথা বলে উঠল।
“কেন আমাকে এভাবে ইগনোর করছিস নিশি?
তোকে নিজের করে নিতে চাই…
কিন্তু সময় এখনো আসেনি।
একদিন তুই ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরী হবি।
চাস বা না চাস।”
তার চোখে কঠোরতা…কিন্তু ভিতরে জ্বলছে পাগল হয়ে যাওয়া ভালোবাসা।

ফারিস নিচে নামার আগে নিশির কান্না শুনে থমকে গেল। তার বুক যেন কেউ চেপে ধরল।
সে থেমে গেল কিছু মুহূর্ত। তারপর দরজায় নক করলো। নিশি দরজা খুলতেই—
ফারিস তাকে দেখল উড়না ছাড়া।
তার চোখ মুহূর্তেই অন্ধকার হয়ে উঠল।
সে নিশির হাত শক্ত করে ধরল—
এত শক্ত যে নিশি ব্যথায় কেঁপে উঠলো।
— “কি চাস তুই? Attraction?
উড়না না নিয়ে কার সামনে যাচ্ছিস?
বাড়িতে দুইজন যুবক আছে—ভুলে গেছিস?”
নিশির চোখ ছলছল করে উঠল।
তার কণ্ঠ কাঁপছিল।

— “আমি ভেবেছিলাম রিয়া এসেছে… ভুলে গেছি… ছাড়েন আমাকে ফারিস ভাই… ব্যথা পাচ্ছি…”
ফারিস থেমে গেল। হাত ছেড়ে দিল।
আর কোনো কথা বললো না।
সরাসরি নিজের রুমে চলে গেলো।
নিশি দরজা বন্ধ করে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
“কেনো এমন করেন ফারিস ভাই…
আপনি তো আমাকে অপমান করেন…
তারপরও আমি আপনাকে ভুলতে পারি না কেনো…”

কান্না থামাতে পারেনি নিশি। শুধু উড়না মাথায় নিয়ে ছাদে চলে গেল। পূর্ণিমার আলোতে ছাদটা যেন স্বপ্নের মতো লাগছে।
হাওয়া বইছে… গোলাপের গন্ধ…
গাছপালার নড়াচড়া… নিশির মনটা একটু শান্ত হলো। তার ইচ্ছে হলো নাচ করতে।
অনেক বছর পর… সে নিজের সব ভয় ভুলে
চাঁদের আলোয় নাচতে শুরু করল। তার নাচ যেন বাতাসকেও থামিয়ে দিল।আর অনুষ্ঠানের জন্য নিজের মতো করে নাচতে থাকে।।

ফারিসের জরুরি কল আসায় সে রুম থেকে বের হয়ে ফোনে কথা বলতে বলতে কখন যে ছাদে চলে এসেছে সে জানেনা।
ঠিক তখন—
ফারিস ছাদের দরজার কাছে এসে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছাদের মাঝখানে তাকাতের —
তার বুকের ভেতর কেমন করে উঠলো।
চাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে চুল উড়ছে…
হাওয়ায় ওড়না দুলছে… তার শরীরের হালকা দোল… চোখের মায়াবী ভঙ্গি…
ফারিস নিঃশ্বাস নিলো ধীরে।
মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে বলল—
“আমার নীলাম্বরী…”মাই লিটল হার্টবিট।।।।
তার চোখে রাগ নেই,

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ১৩+১৪

শুধু অসহায় ভালোবাসা। ফারিসের চোখে আজ অন্যরকম ঝিলিক দেখা গেলো……..
কিন্তু এদিকে নাচতে থাকা নিশিতার কোনো
হেল দুল নেই যে কে এত রাতে তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছে………….
যদি ফারিসের চোখের মুগ্ধতে, ফারিসের নীীলাম্বরী দেখতে পেত তাহলে কি সব কিছু ঠিক হয়ে যেত????

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ১৭+১৮