Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১১

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১১

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১১
আরোবা চৌধুরী আরু

বিকেলের আকাশটা আজ যেন একটু বেশিই নরম।
সূর্যটা তখন পশ্চিমের দিগন্তে হেলে পড়েছে। আলোটা তেমন কড়া নয়, বরং একটা সোনালি রঙের পরশ চারপাশে ছড়িয়ে আছে। ।
দিবা।
আজকের বিকেলটা ঠিক তার নামের মতোই—ধীর, মৃদু, মায়াময়।
এইরকম এক বিকেলে, রাশিদ সাহেবের বাড়ির মূল গেটেরর স্তায় এসে থামে একটা সাদা রঙের টুকটুকে পরিষ্কার প্রাইভেট কার। দরজা খুলে নামল একটা মেয়েটি—চোখে বড় গ্লাস ফ্রেমের চশমা, পনিটেইলে বাঁধা চুল, । গাড়ি থেকে নামার সময় এক হাতে ব্যাগটা কাঁধে গলিয়ে নেয়, অন্য হাতে সামনের গেট ঠেলে ধীরে পা রাখে বাড়ির উঠোনে।
ওর নাম জারিন।

রিশার বেস্ট ফ্রেন্ড। সবসময় চশমা পরে, । জারিনের ব্যক্তিত্বেই একটা ভারিক্কি ভাব আছে, কিন্তু কথায়, আচরণে সে একেবারেই প্রাণবন্ত।
বাড়ির নিচতলার বারান্দায় বসে ছিলেন তিনজন নারী:
ইমা বেগম, আফিয়া বেগম,
আর , বিলকিস আরা, গল্প করছে ।এছাড়া —ওদের পাশে বসে আছে রাহিল। চুপচাপ, ফোন টিপছে, মাঝে মাঝে কথা বলছে।
জারিন বারান্দায় ঢুকতেই সবাই তাকিয়ে পড়ে। বিলকিস আরা চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে বলে ওঠেন—

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

— “কে এসেছে এতদিন পর ?”
“কেমন আছেন আপনারা সবাই আন্টিরা, আর দাদুমনি তুমি কেমন আছো?
আলহামদুলিল্লাহ ভালো সবাই একে একে বলে উঠলো ওদের সাথে কথা বলতে বলতে।
জারিন হাঁটতে হাঁটতে একদম সামনে এসে দাঁড়াল। হঠাৎ করেই রাহিলের গালে একটা চিমটি কাটল সে, বেশ হাসি মুখে।

— “আরে এ যে আমাদের রাহিল ভাই! কেমন আছেন? আপনার নাকি কাটিং সেটিং করা হয়েছে, এখন সব ঠিক আছে তো !”
রাহিল একটু লাজুক মুখে হেসে ফেলে। পাশে থাকা ওরা সবাই ওর কথার ভঙ্গিমা দেখে হাসিতে ফেটে পড়েন।
জারিন এবার বলে—
— “আন্টি, রিশা কোথায়?”
ইমা বেগম মুখে এক ঝলক হাসি এনে বলেন—
— “নিজের ঘরেই আছে। তুমি যাও, ও তো তোকে দেখলে খুশিতে লাফাবে!”
জারিন মাথা নেড়ে হালকা হেসে উপরে ওঠে।
জারিন উপরে উঠে করিডোরে পা রেখেই একটু থমকে যায়।
কারণ তার সামনে “রেডি”, ঠিক করিডোরের মাঝখানে শুয়ে আছে। বিশাল শরীর, এক চিলতে গোলাপি জিভ বের করে শান্তভাবে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। ওর গলায় একটা লাল বেল্ট, আর ঘাড়টা একটু উঁচু করে রাখা। ও এ বাড়িতে আসলেই রেডির থেকে দূরে থাকে। আছে একধলা বিলাই যে ষড়যন্ত্র করে রেডিকে ওর পিছনে লাগিয়ে দেয় মাঝে মাঝে।

জারিন রেডিকে দেখে একটু থমকে দাঁড়ায়। তারপর ধীরে ধীরে হেঁটে যায় তার পাশ দিয়ে। হঠাৎ অজানতে, তার পা পড়ে যায় রেডির লেজের উপর।
“ঘ্যাঁউউউ!!”
এক বিকট চিৎকারে রেডি উঠে বসে। শরীরটা কাঁপিয়ে গর্জে ওঠে।
জারিন চমকে যায়। ভয়ে শিউরে ওঠে।
— “আল্লাহ! আমি… আমি তো দেখিনি!যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়! ”
!”

রেডি দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে, জারিনের দিকে সন্দেহভরা চোখে তাকিয়ে আছে। জারিন এক পা পেছনে সরায়। ঠিক তখনই পাশের একটা দরজা দেখতে পায়। , সামান্য খোলা।
হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে দরজাটা ঠেলে বন্ধ করে দেয়। দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকে জারিন ঠিক যেন প্রাণ ফিরে পেল। ভয়ে কাপা হাতে দরজার ছিটকিনি লাগিয়েই সে হাঁপাতে হাঁপাতে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়।
বাইরে ‘রেডি’র ভারী পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। ওর নিঃশ্বাস এখনো ঠিকঠাক স্বাভাবিক হয়নি। বুকের ভেতরটা ধক ধক করে কাঁপছে, একহাত বুকের উপর ঠেসে ধরে ও চোখ বন্ধ করে।

— “আল্লাহ রে! কুকুর তো কুকুরই… ঘরে রেখেও বাঘ বানাইছে! এই বাড়িতে প্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকাটাও যুদ্ধের সমান!”
ও কিছুক্ষণ দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে চোখ খুলে চারপাশটা একবার দেখে নিল।
ঘরটা চারিদিকে অগোছালো, বেডের একপাশে জামা কাপড়ের স্তুপ,, এক সাইডে পড়ে আছে একটা গিটার। আর টেবিলের ওপর রাখা আধ খাওয়া একটা কফির কাপ। এইসব দেখেও ভুরু কুঁচকালো। কিন্তু,
ঘরটা একদম তরুণ ছেলেদের মতো গন্ধ ছড়াচ্ছে—হালকা পারফিউম, শ্যাম্পু আর একটু ঘামের সাথে শরীরের পরিচিত একধরনের উষ্ণতার গন্ধ। জারিন একধারে তাকিয়ে দেখে দেয়ালে ঝুলে থাকা একটা ক্রিসেন্ট চাঁদের কাঠের শো-পিস, তার নিচে কালো মার্কারে লেখা—
ও মনে মনে ভাবে—

— “এটা কার ঘর?”
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা দরজার খোলার আওয়াজ।
জারিন চমকে যায়। চোখ বড় বড় করে তাকায় সামনের দিকে।
পেছনের ওয়াশরুমের দরজাটা একটু শব্দ করে খুলে যায়। ভেতর থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে, ভিজে ভিজে একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে—শ্যাম্পু আর গরম পানির।
আর সেই ধোঁয়ার ফাঁক গলে বেরিয়ে আসে এক ছেলেটা।
সায়ফান।
তার খালি গা থেকে তখনও পানি পড়ছে। ভেজা চুলগুলো এলোমেলো, কাঁধে থেকে পানির ফোঁটা টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে বেয়ার বুকে। নিচে শুধু সাদা রঙের একটা তোয়ালে পেঁচানো। সে এক হাতে চুল মোছার ভঙ্গিতে মাথা চুলকে আরেক হাতে ফোন কানে ধরে কথা বলছিল—

— “হ্যাঁ রাফিদ , আজকেই যাচ্ছি পার্টি অফিসে। সন্ধ্যার মধ্যে রিচ করবো। বলিস সবাই যেন টাইমলি আসে।”
ও ঘরের মধ্যে পা রাখতেই দরজার বন্ধ হওয়ার শব্দ পায়।
পেছনে তাকায়।
চোখাচোখি।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই চশমাওয়ালী মেয়ে। রিশার বান্ধবী। তার একহাত এখনো বুকের উপর, মুখে আতঙ্কের ছাপ। হাঁপাচ্ছে, যেন কিছু একটা থেকে সদ্য পালিয়ে এসেছে। চোখে চশমা, । পরনে হালকা গোলাপি রঙের একটা স্ট্রেইট কাট কুর্তি, তার ওপরে নীল কার্ডিগান টাইপের টপ, আর সাদা পালাজো প্যান্ট। তার মুখটা তখন লালচে—আধা ঘামের চাপে, আধা লজ্জায়।
সায়ফান তার দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে যায়।
ভুরু কুঁচকে বলে ওঠে—

— “এই চশমা! তুই আমার রুমে কি করস?”
তখনো ফোন তার কানে লাগানো, কিন্তু মনোযোগ সম্পূর্ণ অন্যখানে।
জারিন চুপচাপ। মুখে একটা বিভ্রান্তির ছাপ, আবার রেডি’র ভয়ে এখনো ঘেমে আছে।
সে অবশেষে কাঁপা গলায় বলে—
— “ওই কুকুরটা… মানে… ওই রেডি… আমার পা পড়ে গিয়েছিল… তো তাই…”
আরও কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই ঘটে যায় অপ্রত্যাশিত ঘটনা।
সায়ফান কিছুটা বিরক্ত হয়ে ওর দিকে দুই পা এগিয়ে আসে—আর তখনই, হঠাৎ তার কোমরে বাঁধা তোয়ালটা আলগা হয়ে পা ঘেঁষে মাটিতে পড়ে যায়!
এক সেকেন্ড…
দুই সেকেন্ড…
তিন সেকেন্ড…

“আআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআআ!!”
জারিন এক মুহূর্ত দেরি না করে ঠিক যেমন সিনেমায় নায়িকারা চিৎকার করে চোখ ঢেকে ফেলে , কিন্তু ও করল উল্টোটা ও মুখে হাত দিয়ে করে দাঁড়িয়ে যায়! বুকের ধুকপুকানি এমন পর্যায়ে যে মনে হচ্ছে পাশের বিল্ডিংও টের পাচ্ছে!
সায়ফান নিজের দিকে তাকিয়ে বুঝে যায় কী হয়েছে!
— “আব্বা গো…!! এই চশমা!! তুই চিল্লাচ্ছিস কেন? নিজের চশমা ছাড়া তো তুই কিছুই দেখিস না! এখন আবার জোকারের মত দাঁড়ায়ে চিৎকার করিস?”
ও দ্রুত টেবিল থেকে তোয়ালটা নিয়ে কোমরে বাঁধতে বাঁধতে বকা ঝাড়া শুরু করে—

— “চশমা খোলো, খোলো বলতেছি! কিছুই তো দেখিস না তুই, মুখটা না ঢেকে চোখে পাথর বেঁধে চিল্লাইতেসিস না হয় তোর চশমাটা খুলে ফেলছিস তাহলে তার কিছু দেখতিস না নিলজ্জ মেয়ে মানুষ ! এমন করে চাত চাত করে আমার ইজ্জত গিলে খাচ্ছিস কেন রে??!”
জারিন তখনও চোখ বন্ধ করে নিল, মুখে থেকে হাত সরিয়ে, —
— “আমার দোষ না… আমি তো জানতাম না এটা তোমার রুম! তোমার টাওয়াল তোমার মতো ঢিলা হয়ে পড়ে যাবে এটাও জানতাম না!”
সায়ফান থামল। ভ্রু কুঁচকে কাঁধ ঝাঁকালো—

— “তোর জীবন বড়ই ট্র্যাজিক চশমা! চল, এখন নাটক শেষ—বের হ! আর আমার ঘরে ঢুকলে তোর আমি… তো…”
জারিন দরজার দিক খুঁজে হাত বাড়িয়ে দেয়াল টিপে টিপে বের হতে থাকে।
এক হাতে চশমা ঠিক করতে করতে ও দরজার ছিটকিনি খুলে—
“আমি যাই! আমি যাই! তুমি টাওয়াল ঠিক রাখো, আমি জীবনে আর ঢুকব না এই ঘরে!”
বলেই দৌড়।
যাওয়ার সময় কানে ভেসে আসে সায়ফানের শেষ কথা—

— “দাঁড়া তুই আমি আসছি,!
জারিন যেন কানেই শুনল না।
ও শুধু দৌড়ে সোজা চলে যায় রিশার ঘরের দিকে।
বুকের ভেতর তখনো ঢং ঢং করে বাজছে। মাথা গরম, মুখ লাল, শরীর গরম, এবং… আত্মসম্মান—যা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে।
মনে মনে ভাবলো “কোনো কিছুই দুর্ঘটনাবশত ঘটে না। সবই আল্লাহর ইশারা।”
জারিন দাঁড়িয়ে পড়ে, একবার ফুঁসে উঠে বলে—
— “ইশারা না কু-ইশারা! ছিঃ!!”
জারিন রিশার ঘরে ঢুকে এক দৌড়ে মেঝেতে বসে পড়ে, পিঠটা বিছানার গায়ে ঠেকিয়ে, মাথা পেছনে হেলিয়ে দেয়। চোখ বন্ধ করে হাপাচ্ছে সে। গলা দিয়ে শুধু ‘হু হু’ করে নিঃশ্বাস বের হচ্ছে—
রিশা ওর দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে বলে ওঠে—

— “জানু কি হলো তোর কখন এলি ?”
— “শ্বাস… নিতে… পারছি না…” — হাঁপাতে হাঁপাতে বলে জারিন।
ঘরে তখন নাফিসাও ছিল। বিছানার এক কোণে বসে ছিল সে। রিশা আর জারিনের কথাবার্তায় সে একটু গা ঝাড়া দিয়ে বসে পড়ে। জারিনের এই হাল দেখে ওর চোখ বড় বড় হয়ে যায়,
রিশা দ্রুত জারিনের সামনে পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে বলে—
— “পানি খা! কী হইছে বল তো আগে?”
জারিন পানি খেতে খেতে গলা সাফ করে। তারপর নিচু গলায় গম্ভীরভাবে বলে—
— “আমার আত্মা আজ ওর ঘরে পড়ে আছে রে! আমি শেষ!”
রিশা ওর কথায় অবাক—

— “কোন ওর ঘরে?”
জারিন উত্তর না দিয়ে চোখ মুখ ঘোরায়, তারপর ফিসফিস করে বলে—
— “তোর ভাইয়ের ঘরে!”
— “সায়ফানের?” — রিশা আঁতকে ওঠে।
নাফিসা আরেকটু আগিয়ে আসে, । রিশার জারিনের দিকে তাকিয়ে বলে—
— “কীভাবে গেলি ওই ঘরে?”
— “ওই রেডি কুকুরটা! ওর লেজে পা পড়ে গেছিল রে! আমি তো জানতামই না ওই ঘরটা কার দরজা ভিরানো ছিল, আমি শুধু বাঁচতে গিয়ে তারপর — সবকিছু খুলে বলল ! বাঁচতে গিয়ে সব গেল…”
ও কথা শেষ করেই কপালে হাত দিয়ে মাথা দোলাতে থাকে।
রিশা আর নাফিসা দুজনেই এবার মুখ চাপা দিয়ে হাসে। ওদের কানে কানে কিছু কথাবার্তা চলতে থাকে, আর জারিন ততক্ষণে বিছানার পাশে মাথা এলিয়ে দিয়েছে।
ঠিক তখনই—

ঘরের দরজায় শব্দ।
তারপর দরজা খুলে ঢোকে সায়ফান। ওর পরনে এখন একটা কালো ট্র্যাক প্যান্ট আর একটা হালকা নীল টি-শার্ট, ভেজা চুল টাওয়েল দিয়ে মুছে ফেলেছে, চোখে যেন ঝিলিক দিচ্ছে ক্ষোভ আর দুষ্টুমি ।
রুমে ঢুকেই ও হাঁটতে হাঁটতে রিশার পাশে দাঁড়িয়ে ওর ঘাড় পিঠ গলিয়ে এক পাশ জড়িয়ে হতাশ ভঙ্গিতে
বলে—

— “বোন, আমি শেষ হয়ে গেছি রে! সব শেষ! আমার আত্মসম্মান, আমার শান্তি, আমার টাওয়াল—সব লুটে নিছে তোর ওই চশমা বান্ধবী!
রিশা ভুরু কুঁচকে ফেলে, সায়ফান আবার আগের ভঙ্গিতে বলতে থাকে,
হাই হাই… আমার ইজ্জত চোখ দিয়া গিলা খাইয়া ফেলাইছে রে বোন !
ভাবলাম, দুই চোখ দিয়া গিললে হয়তো টিকে যাইতাম…
কিন্তু না! চশমা আপা আমারে চারচোখ দিয়া গিলা খাইছে, চিবাইছে, হজম কইরা ঢেকুর তুলছে—
‘উফ, আজকে তো মনে হয় ডায়েটে ছিল, এত ইজ্জত খাইয়া গ্যাস্ট্রিক হইছে !’ 😩
আমি তখন মাটির দিকে চাইতেছি—
মাটি বলতেছে,
‘এখনও তরে নিতে পারুম না, জায়গা ফুল্ল!’
আকাশে চাই,
আকাশ কয়,
‘তোকে তো আগেই ব্লক মারছি!’

তাই এখন আমি আছি—ভাসমান ইজ্জতহীন আত্মা,
যে চারচোখের আতঙ্কে প্রতিদিন মরতেছে। 🥲”**
বাঁচার রাস্তা খুইজা দেখি— তোর চশমা বান্ধবী আমারে দাঁড়ায়া ঠান্ডা হাই তুলে কইলো,
‘আবার আসিও।’ 🥲😵‍💫
রিশা আর নাফিসা এবার আর চুপ থাকতে পারে না। ওরা এমন হাসতে শুরু করে যে বিছানার চাদর ঝাঁকুনি খায়। আর জারিন তখন একদম বিছানার গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে রাখে—মুখের রঙ যেন তামাটে থেকে টকটকে লাল হয়ে গেছে।
সায়ফান ওর দিকে আঙুল তাক করে বলে—

— “দেখছিস? এই দেখ! এখনো মুখে হাত দিয়ে বসে আছে, নাটক চলছে বুঝলি? যেন কিসের বলি হইসে!”
রিশা হাসতে হাসতে বলে—
— “তোর ইজ্জত তোর টাওয়ালের সাথে বাঁধা থাকলে এই সমস্যা হতোই রে ভাইয়া!”
সায়ফান একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলে—
— “তুই হাস! হাস মা তো! কিন্তু আমার আর এই চশমার যুদ্ধে আজ শুরু হইসে! Wait and watch!”
জারিন ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে বলে—
— “আমি কাউরে কিছু করিনি… আমি তো শুধু বাঁচতে চেয়েছিলাম…”
ওর এই বলার ভঙ্গিমা দেখে রুমে আবার হেসে ওঠে সবাই।
সায়ফান ওদের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল কিছুক্ষণ। রুম জুড়ে হাসির রোল পড়ে গেলেও তার চোখে তখন শুধু বিরক্তির ঝিলিক। কিন্তু হঠাৎই তার নজর পড়ে এক কোণে বসে থাকা নাফিসার দিকে—। সে একটু আগেও হেসেছিল মিস মিস করে।
সায়ফান মুখ কষে বলে ওঠে—

— “ওই ছটু ! তুইও হাসছিস? আমি ভাবলাম, তুই অন্তত আমাকে একটু বুঝবি। আমার দুঃখ, আমার যন্ত্রণা, আমার লজ্জার এই পরিণতি! তা না… তুই-ও হাসছিস?”
নাফিসা চমকে ওঠে। মুখের হাসিটা মিলিয়ে যায় এক নিমিষেই। ছোট ছোট করে চোখের পাতা নাড়িয়ে, জড়োসড়ো হয়ে বসে পড়ে। চুপচাপ গলা নামিয়ে বলল—
— “সরি ভাইয়া… আমি তো… আমি বুঝি নাই আপনি এমন রাগ করবেন…”
সায়ফান ততক্ষণে পেছন ঘুরে দরজার দিকে হাঁটছে। হঠাৎই থেমে বলে—
— “না না, এখন আর ‘সরি’ লাগবে না। আরাম করে হাসো! পুরো মজা নাও। মনে রেখো, এবার মেলায় হারিয়ে গেলে তোকে আর খুঁজে আনবো না। নিজের মতো পথ খুঁজে নিস।”
এই বলে সে দরজা খুলে চলে যায়। দরজার খোলার শব্দ, হালকা হাওয়া, আর সাথে ভেসে আসে তার জুতার শব্দ, যা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় করিডোরে।
রুমের ভেতর একটা থমথমে নিস্তব্ধতা নেমে আসে।
নাফিসার মুখটা ম্লান হয়ে যায়। দৃষ্টি বিছানার চাদরের কোনায় আটকে থাকে।
রিশা এবার পাশে এগিয়ে এসে ওর কাঁধে হাত রাখে—

— “মন খারাপ করিস না নাফু, ভাইয়া তো এমনই। মজা করছে। তোরে দুঃখ দেওয়ার জন্য না, বুঝলি?”
নাফিসা চোখ তুলে তাকায় রিশার দিকে। মুচকি একটা হাসি ফুটে ওঠে ওর মুখে,!
ঠিক তখনই পাশ থেকে নরম গলায় কথা বলে ওঠে আরেকজন—জারিন। সে এবার ধীরে ধীরে উঠে আসে নাফিসার পাশে, পাশে বসে ওর গালের একপাশে আঙুল দিয়ে হালকা টান দেয়—
— “ওয়াও, ইউ আর সো কিউট! রিশু যেমন বলেছিল তার থেকেও কিউট তুমি! এত মিষ্টি মুখ যে দেখে মনেই হয় না কখনো মন খারাপ করতে পারে।”
নাফিসা কিছুটা হকচকিয়ে যায়। চোখ বড় বড় করে চেয়ে থাকে এই চশমাওয়ালী মেয়েটার দিকে। ওর তো মনে নেই, কোনোদিন দেখা হয়েছে এমন কারও সঙ্গে!
জারিনের দিকে তাকিয়ে একটু লজ্জা পেয়ে বলে—

— “আপনি… আপনি আমার কথা জানেন?”
রিশা তখন হেসে বলে ওঠে—
— “এই যে! তোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিই এখন। নাফু, এই হচ্ছে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড জারিন! শর্টকাটে আমি ওকে ‘জানু’ বলে ডাকি। তোর কথা আমি ওকে আগেই বলেছিলাম—তুই কেমন, কী করিস, তুই কতো কিউট—সব কিছু!”
জারিন হাসিমুখে মাথা নাড়ে—
— “রিশা আমার কান ঝালাপালা করে ফেলেছে তোমাকে নিয়ে কথা বলে বলে। তুমি না নাকি ‘সাইলেন্ট সুইটহার্ট’ টাইপ!”
নাফিসা একটু হেসে পড়ে, তারপর মাথা নিচু করে ফেলে লজ্জায়। মনে মনে ভাবতে থাকে, খুব মজার আর ফ্রেন্ডলি একজন লাগছে আপুটাকে তার অনেক ভালো লাগেছে ।”
“আপু আপনি অনেক সুন্দর।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১০

— “আরে ধুর! এই ‘আপু আপু’ করো না তো! তুমি যদি রিশার মতো হয়েই আমার বন্ধু হও, তাহলে ‘আপু’ শুনে আমি বুড়ি হয়ে যাবো! জানু বল, অথবা জারিন বল! OK?”
নাফিসা হেসে মাথা ঝাঁকায়—নতুন এক বোনের মতো সম্পর্ক গড়ে উঠতে শুরু করে তাদের মধ্যে।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১২