Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২৫ (২)

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২৫ (২)

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২৫ (২)
আরোবা চৌধুরী আরু

স্টেজের আলো ঝলমল করছে, চারপাশে দর্শকের উচ্ছ্বাস, সঙ্গীতের হালকা ছন্দ বাতাসে ভেসে আসছে। এই উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তে, রাইমা এগিয়ে এসে সায়মানের দিকে তাকাল। সে ব্ল্যাক কালারের লেহেঙ্গা পরেছে; পাতলা ওড়নার কারণে পেটের আকৃতি হালকা ঝলমল করছে। চোখে ছোট্ট অনুরোধের দৃষ্টি।
——— দাভাই, আমার সাথে ডান্স করবে? ——— রাইমা বলল, কণ্ঠে উদগ্রীবতা।
কিন্তু সায়মান কোনো দিকে তাকাল না। তার গম্ভীর স্বভাব , মুখে কোন ভাবমূর্তি ছাড়াই উত্তর দিল,
———— না।
——— প্লিজ দাও, ভাই! —— রাইমা আবার বলতে উঠল, আশা ও অনুরোধ মিলিয়ে।
সায়মানের চোখে একধরনের কঠোরতা ফুটে উঠল। এক ধমক দিয়ে বলল,

—— আমি না বলেছি না।
রাইমার মুখ কালো হয়ে গেল। সে কিছু বলতে পারল না। ধীরে ধীরে সরে গিয়ে স্টেজের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নাফিসার দিকে তাকাল, মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল।
তাহমিদ ইকবাল সায়মানের পাশে এসে ফিসফিস করে বললেন,
—— তুমি যদি এখন ডান্স করার জন্য না যাও, তোমার পাখিকে কিন্তু অন্যজন উড়িয়ে নিয়ে যাবে। সাবধান।
সায়মান চুপচাপ কিছুক্ষণ স্থির থাকল। তারপর, যেন অজান্তে, নাফিসার দিকে এগিয়ে গেল। তার হাত ধরে ধীরে ধীরে স্টেজের দিকে টেনে নিতে লাগল।
নাফিসা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। হালকা উত্তেজনা, আর অল্প অস্থিরতা—সবই মিশে তার শরীর ভারী হয়ে উঠল। চারপাশে মানুষ , সঙ্গীতের ছন্দ, ———সবই যেন মুহূর্তটিকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলছে।
নাফিসা ধীরে ধীরে তাল মিলিয়ে যেতে লাগল।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

—— কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন…?
সায়মান চুপচাপ এগোচ্ছে,কিছুক্ষণ পর গম্ভীর স্বরে বলল,
——— ডান্স করব…।
নাফিসা ধীরে ধীরে জবাব দিল,,
——পারিনা…আমি…
আমি শিখিয়ে দিব,——— ছোট্ট করে উত্তর দিল সায়মান।
স্টেজের চারপাশে আলো ঝলমল করছে, বাতাসে হালকা বাদ্যের ছন্দ ভেসে আসছে। সঙ্গীতের ধ্বনি, দর্শকদের দৃষ্টির হাওয়া, ছোট ছোট নিঃশ্বাসের শব্দ——— সব মিলিয়ে এক রোমান্টিক আবহ সৃষ্টি হয়েছে । ডান্সের জন্য যে কয়জন কাপল আছে, তারা একে একে স্টেজে উঠে নিজেদের জায়গা নিচ্ছে।স্টেজের আলো হালকা নীল ও গোলাপি আলো মিশিয়ে ঝলমল করছে। নরম সঙ্গীতের সুর ভেসে আসছে চারপাশে, আর সেই সুরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ”Janam Janam” গানের মৃদু কিন্তু আবেগময় তাল। গানটি শুরুর প্রথম সুরেই যেন সমস্ত পরিবেশে এক ধরণের রোমান্টিক নীরবতা সৃষ্টি করছে।

রিশা এবং আকাশের দিকে নজর দিলে দেখা যাচ্ছে, আকাশ তার স্থির দৃষ্টি দিয়ে রিশাকে দিকে তাকিয়ে আছে। রিশা একটু লাজুক, মুখে হালকা রঙ চেপে রেখেছে। আকাশের হাত ধীরে ধীরে তার হাতে স্পর্শ করছে, তাল মেলাচ্ছে সঙ্গীতের সাথে। রিশা এক মুহূর্তও চোখ সরাতে পারছে না, প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন তার হৃদয়ের সাথে মিলছে।
জারিন ও সাইফানের দিকে তাকালে দেখা যায়, সাইফান ধীরে ধীরে জারিনকে আগলে নিচ্ছে। তার কণ্ঠে হাসি মিশ্রিত গম্ভীর স্বর,

——— আজকে তোমাকে অনেক হট লাগছে, চশমা।
তার হাতে কোমর দোলে ধীরে জারিনকে নিজের দিকে টেনে নিল, তালের সঙ্গে মিলিয়ে। জারিনের নিঃশ্বাস কখনও থেমে আসে, কখনও ছুটে যায়—ডান্সের ছন্দে তার শরীরের স্পন্দন সবকিছুকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলছে। তারপর হঠাৎ সে ফিসফিস করে বলল,
——— অসভ্য!

সাইফান মুচকি হাসল, চোখে সেই ঝলমল ভাব ধরে রাখল। তবু তার মন পুরোপুরি জারিনের প্রতি কেন্দ্রীভূত।
স্টেজের আলো ঝলমল করছে, হালকা বাদ্যের সুর ভেসে আসছে চারপাশে। দর্শকেরা একেবারে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে হলেও, নাফিসা আর সায়মানের চারপাশ যেন এক নিস্তব্ধ দুনিয়া। কোনো শব্দ নেই, কোনো কথাও নেই—— শুধু তাদের চোখ, নিঃশ্বাস, হাতের স্পর্শ, শরীরের নড়াচড়া।
সায়মান ধীরে ধীরে নাফিসার হাতে হাত রাখল, হাতে হাত মিলিয়ে টেনে নিল নিজের কাছে। নাফিসা হালকা চমকে, কিন্তু ধীরে ধীরে তাল মিলিয়ে নিল। তাদের চোখে চোখ পড়ল—— নিরব, গভীর, চার বছরের দূরত্ব আর জমে থাকা আবেগের মিশ্রণ।
নাফিসার হৃদয় দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে, নিঃশ্বাস ছটফট করে ওঠে। সায়মানও অনুভব করতে পারলো , তার হাতের প্রতিটি স্পর্শে নাফিসা কেমন কম্পিত হচ্ছে। কোমলতার সঙ্গে গম্ভীরতা—— তার ছোঁয়া ধীরে ধীরে নাফিসাকে আরও কাছে টেনে নিল।

কোমর লাগানো, হাতের আলতো স্পর্শ, চোখের অদৃশ্য কথোপকথন——সব মিলিয়ে তাদের মধ্যে এক নীরব সংলাপ তৈরি হলো। নাফিসা চোখ বন্ধ করে একটি গভীর নিঃশ্বাস নিল, আর সায়মান তার কানের কাছে মুখ রেখে, শুধু একধরনের আবেগপূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে তাকাল। সায়মানের উষ্ণ নিঃশ্বাস, ওর ঘাড়ে পড়তে নিজের শরীর ছেড়ে দিল। সায়মান ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে, নাফিসার দুই পা নিজের হাত দ্বারা উঁচু করে, ঘোরানো শুরু করল।
এমন হওয়ায় নাফিসা চমকে, সাইমানের দুই কাঁধে নিজের হাতের নখ দাবিয়ে দিয়ে বন্ধ করে নিল।

আস্তে আস্তে আবার নিচে নামিয়ে দিল, নাফিসা এবার চোখ খুললো। প্রতিটি ঘূর্ণন, প্রতিটি তাল, প্রতিটি কোমরের নড়াচড়া——সবই একে অপরকে আরও কাছে টেনে আনছে। নাফিসা ধীরে ধীরে সায়মানের হাত শক্ত করে ধরল, যেন এই মুহূর্তে তার সমস্ত নিরাপত্তা এবং বিশ্বাস ওর হাতের মধ্যে আছে।
সায়মানও ধীরে ধীরে নাফিসার কোমর আলতো করে আঁকড়ে ধরল। চোখে তার দৃঢ়তা, মুখে লাঘব হাসি নেই—— কেবল চোখের মাধ্যমে প্রতিফলিত হচ্ছে যত আবেগ, যত আকাঙ্ক্ষা, যত নিঃশব্দ ভালোবাসা।
এই এক মুহূর্তে নাফিসা ও সায়মান একে অপরের কাছে টানছে, শুধু স্পর্শের মাধ্যমে কথা বলছে, নিঃশব্দে সব অনুভূতি প্রকাশ করছে।
রাইমার মুখ গোমড়া। দাঁত চেপে, হাতের আঙুল মুঠো করে আছে। সায়মান আর নাফিসা দিকে তাকিয়ে,
ঠিক তখনই সাবিহা খালেদ ধীরে ধীরে ওর পাশে এসে দাঁড়াল। ঠোঁটে হালকা হাসি, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।

——— “ওইদিকে তাকিয়ে এত টেনশন নিও না বেবি। অনাথ মেয়ে তো, জানোই সায়মানের মনটা কেমন। হয়তো আবদার করেছে, ফিরিয়ে দিতে পারে নি। এটাই স্বাভাবিক।”
রাইমা ঘুরে তাকাল সাবিহার দিকে, চোখ লাল হয়ে উঠছে রাগে।
——— “তাই বলে আমি যখন বললাম তখন একেবারেই না করে দিল! আমার সাথে ডান্স করবে না, আর ওই মেয়ের সাথে এইভাবে মিশে যাচ্ছে? একদম সহ্য হচ্ছে না আমার ।——”দাঁতের দাঁত চেপে। “
সাবিহা এবার হালকা হেসে কাঁধ নাড়ল।
——— “সায়মানকে বোকা ভেবো না, এত ছোট একটা মেয়ের সাথে ও কখনো কিছু করবে না। এটা অসম্ভব।”
রাইমার চোখে জল এসে ভিজে উঠল। অস্থির কণ্ঠে বলল,
——— “আম্মু, আর সহ্য হচ্ছে না। কতদিন এইভাবে চলবে?”
সাবিহা ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি রেখে এগিয়ে এল, কানে কানে বলল,
——— “সারপ্রাইজ আছে বেবি… ওয়েট করো। ঠিক সময়ে তুমি নিজেই পেয়ে যাবে। আজকের রাতটাই তোমার।”
রাইমা কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে বলল,
——— “মানে কী?”
সাবিহা কোনো উত্তর দিল না, শুধু মৃদু হেসে রাইমার কপালে এক চুমু দিল।
——— “মানেটা কিছুক্ষণ পরেই বুঝবে।”

অন্যদিকে, ভিড়ের মাঝখান থেকে আরিব সায়মান আর নাফিসার নাচ দেখছিল একদৃষ্টিতে। নিজের মনেকে বোঝাচ্ছে—— দাভাই তো সবসময় নাফিসাকে ছোট বোনের মতো দেখে , আগলে রেখেছে। কিন্তু আজ কেন জানি দুইজনকে এত কাছাকাছি দেখে বুকের ভেতর অদ্ভুত ব্যথা অনুভব হচ্ছে। হৃদয়ের গভীরে কেমন চাপ চাপ কষ্ট জমছে, যা বোঝানোর মতো নয়।

গান শেষের সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে হাততালির শব্দ উঠল। ধীরে ধীরে আলো নিভে আসতে লাগল। নাফিসা সায়মানের হাত থেকে নিজেকে আলগা করল। বুক ধড়ফড় করছে, নিশ্বাস অস্থির। এক মুহূর্ত তার চোখে সায়মানের চোখ পড়ল, তারপর আর স্থির থাকতে পারল না। তাড়াহুড়ো করে স্টেজ থেকে নেমে সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে উঠতে লাগল।
সায়মান কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল, তারপর হঠাৎ যেন অজান্তেই নাফিসার পেছনে হাঁটা শুরু করল। ধীর কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপে সিঁড়ি বেয়ে ওর পিছু নিল।
ভিড়ের মাঝখানে রিয়াদ এতক্ষণ কুঁচকে থাকা মুখ নিয়ে সবকিছু লক্ষ্য করছিল। তার চোখে অস্থিরতা, ঠোঁট শক্ত করে কামড়ে রেখেছে। নাফিসাকে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে দেখে ওর বুকের ভিতর হঠাৎ আগুনের মতো কিছু জ্বলে উঠল।
সে দুই পা বাড়িয়ে উপরে যাওয়ার জন্য এগোল, কিন্তু সায়মানকে ঠিক পিছনেই যেতে দেখে থেমে গেল। মুঠো করা হাতটা কাঁপতে লাগল, আর ঠোঁট থেকে বেরিয়ে এল ———
—— “ফাক!”

নাফিসা দৌড়ে এসে নিজের রুমে গিয়ে এক হাত দিয়ে দরজার গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন পুরো ঘর জুড়ে বাজছে। নিঃশ্বাস থামাতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। প্রতিটি শ্বাস এত ভারী, যেন গলায় আটকে আসছে। চোখে ভাসছে কয়েক মুহূর্ত আগের দৃশ্য—— সায়মানের স্পর্শ, হাতের দৃঢ়তা, কাছে টেনে নেওয়ার উষ্ণতা।

ঠিক সেই সময় বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। কোমরের কাছে, পেটের উপর হালকা উষ্ণ স্পর্শ টের পেল সে। চমকে চোখ নামিয়ে দেখল——— সায়মান তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। শাড়ির আঁচল সরে গিয়ে কোমরের কাছে ফাঁকা হয়ে পড়েছিল। সায়মান ধীরে ধীরে সেটি ঠিক করছে।
কিন্তু সেই ছোঁয়া… আঙুলের স্পর্শ কেবল কাপড়ের গিট বাঁধছে না, নাফিসার পুরো শরীরের ভেতর অজানা শিহরণ জাগিয়ে তুলছে। নাফিসার চোখ বড় বড় হয়ে গেল, ঠোঁট কাঁপছে, বুকের ভেতর নিঃশ্বাস ছুটছে অনিয়মিত ছন্দে। সে কিছু বলতে চাইলো, কিন্তু শব্দ গলায় আটকে গেল।
সায়মান কোনো কথা বলছে না। কেবল মনোযোগ দিয়ে আঁচল গুছিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু তার আঙুলের নরম ছোঁয়া বারবার নাফিসার ত্বকে লাগছে, আর নাফিসা সেই প্রতিটি স্পর্শে ভেতর থেকে কেঁপে উঠছে। একেকটা শ্বাস যেন আগুনের মতো গরম হয়ে তার ঠোঁট ছুঁয়ে বেরোচ্ছে।

ঘরের ভেতরে নিস্তব্ধতা, শুধু নাফিসার দ্রুত নিঃশ্বাসের শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সায়মানের নীরব উপস্থিতি আর তার হাতের উষ্ণতা মিলিয়ে মুহূর্তটা এক অদ্ভুত আবেশে মোড়ানো——— যেখানে কথার কোনো প্রয়োজন নেই, শুধু অনুভূতি, শুধু নিঃশ্বাস, আর এক অদৃশ্য টান… যা দুজনকে আরও কাছে টেনে আনছে।
সায়মান ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে উঠল। তার চোখে অদ্ভুত তীব্রতা, ঠোঁটে চাপা রাগ। হঠাৎ এক ঝটকায় ও নাফিসার দুই হাত নিজের এক হাতে চেপে ধরল, নাফিসার পিঠের সাথে শক্ত করে ধরে, এক ঝাটকাই নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল নাফিসাকে।
নাফিসার শরীর শিহরিত হয়ে উঠল। হাত নড়াতে পারছে না, বুকের ভেতর নিঃশ্বাস আরও তীব্র হয়ে উঠছে। তার চোখে লাজ, রাগ, আর ভয়ের এক অদ্ভুত মিশ্রণ জমে উঠছে।
সায়মান দাঁতের ফাঁক গলিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,

——— “হিজাব কোথায়? এভাবে সবার সামনে বের হওয়ার সাহস কোথা থেকে পেলে?”
নাফিসা চোখ মেলল ধীরে, অনুভূতি এক সাইডে রেখে। ঠোঁটে হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটল।
——— “আমি নিজেই সাহস জোগাড় করেছি। আর আপনি বলার কে?”
সায়মান হঠাৎ থমকে গেল, তার চোখ সরু হয়ে এলো। ভেতরের রাগ আর অস্থিরতা চেপে রাখতে না পেরে ধীরে ধীরে বলল,
——— “আমার সামনে এত কথার বলা শিখলে কবে থেকে?”
নাফিসা নরম কণ্ঠে, কিন্তু ভেতরে জমে থাকা আবেগ উজাড় করে দিয়ে বলল,

——— “আপনাকে ভালোবাসি… এটা বোঝার পর থেকেই।”
এই শব্দগুলো শুনে সায়মানের বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। তার গলা ভারী হয়ে এল। সায়মান মৃদু রাগ-সংমিশ্রিত হতাশায় চোখে অনিশ্চয়তা,——
——— “এটা ভালোবাসা না পিচ্ছি… তোমার শুধু উঠতি বয়সের আবেগ বলে? ”
নাফিসার চোখে এবার রাগের আগুন জ্বলে উঠল। চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
——— “যেভাবে ঐদিন রাতে আপনি আমাকে স্পর্শ করেছিলেন…”
সায়মান হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। বুকের ভেতর দ্বন্দ্ব তীব্র হতে লাগল। কিছু মুহূর্তের নীরবতার পর গলা ভারী করে— নিজের ভেতর লড়াই করে কোনরকমে বলল,
—— “ওই ব্যাপারটা ভুলে যাও… ওইদিন আমি নিজের মধ্যে ছিলাম না।”
নাফিসার ঠোঁট বাঁকা হয়ে গেল তিক্ত এক হাসিতে। চোখে অশ্রু জমলেও কণ্ঠে বিদ্রূপ।
—— “সব মেয়েদেরকে দেখে কি সিডিউস হয়ে, ঠিক ঐভাবেই স্পর্শ করেন?”
এই কথা শুনে সায়মানের বুকের ভেতর আগুনের ঝড় বয়ে গেল। গভীর নিঃশ্বাস নিল সে, তারপর হঠাৎ এক ঝটকায় হাত তুলে নাফিসার গাল শক্ত করে চেপে ধরল। আঙুলের চাপ এতটাই তীব্র যে নাফিসার নিঃশ্বাস আটকে এল।
তার চোখে অগ্নি ঝলকানি, ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে গর্জে উঠল,

—— “স্টপ! ইডিয়েট… স্টপ্‌!”
ঘরের ভেতর নীরবতা জমে গেল। সায়মানের চোখ তখন আর স্বাভাবিক নেই—এ যেন এক অদ্ভুত বিপজ্জনক আবেগ, যেখানে রাগ, ভালোবাসা, কামনা আর মালিকানা একসাথে মিশে গেছে।
নাফিসা স্থির চোখে তাকিয়ে আছে, শরীর কাঁপছে, তবু মনে হচ্ছে এই মানুষটার কাছ থেকে পালানো অসম্ভব। তার ভেতরটা ভয় আর ভালোবাসার অদ্ভুত মিশ্রণে পুড়ে যাচ্ছে।
সায়মানের নিশ্বাস গরম হয়ে নাফিসার মুখের উপর পড়ছে ——যেন ওকে হারাবার ভয়, আবার অস্বাভাবিক আবেশে দখল করে রাখার এক জেদ।
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা জমে আছে, শুধু নাফিসার হাপরের মতো দ্রুত শ্বাস নেওয়ার শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
সায়মানের শক্ত আঙুলের চাপে নাফিসার গাল লাল হয়ে উঠেছে। ব্যথার তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে তার চোখের কোণ দিয়ে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
সেই অশ্রু সায়মানের হাতের ওপর পড়তেই, যেন হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এল ও। গলার ভেতরটা কেঁপে উঠল। কঠিন মুখভঙ্গি ভেঙে কিছুটা থমকে গেল। মুহূর্তের জন্য বুকের ভেতরটা শূন্য মনে হলো। ধীরে ধীরে সে নিজের হাত সরিয়ে নিল নাফিসার গাল থেকে।
নাফিসা মুক্তি পেয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে গভীর শ্বাস নিচ্ছে। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত ছন্দে। কিন্তু ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিল। চোখে জমে থাকা অশ্রু মুছে ঠোঁট চেপে ধরল। তারপর কাঁপা কণ্ঠে, কিন্তু দৃঢ়তায় ভর দিয়ে বলল—

——— “আমি ভুল কিছু বলিনি তো, ডিএসপি সাহেব?
এখনো তো আপনি যেভাবে আমাকে স্পর্শ করছেন——এটার মানে কী?
আর ওই রাতে… আমাকে ঐভাবে স্পর্শ করার পর হুট করে চলে গেলেন কেন?
চার বছর আমাকে থেকে দূরে রাখলেন, সেই কারণ কী?”
ঘরের ভেতরের হাওয়া যেন এক মুহূর্তে জমে গেল। কথাগুলো সায়মানের বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধল।
সে একদৃষ্টিতে নাফিসার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে অবাক দৃষ্টি।
মনের ভেতরে তীব্র ঢেউ উঠল———

“এই পিচ্চি মেয়েটা… যে একসময় ওর সামনে দাঁড়াতে কাঁপত, চোখ মেলাতে সাহস পেত না…
আজ সে-ই আমাকে এভাবে প্রশ্ন করছে?
ভয় না পেয়ে, সরাসরি চোখে চোখ রেখে, এমন কথা বলছে?”
সায়মানের চোখ সরু হয়ে এলো, ঠোঁটে আটকে গেল অজস্র উত্তর, কিন্তু শব্দ বের হলো না। বুকের ভেতর জ্বলছে অপরাধবোধ, ভালোবাসা আর অদৃশ্য এক টান।
সায়মাম কথা বলতে যাবে ঠিক সেই সময়——
হঠাৎ করেই বাইরে থেকে কারো দৃঢ় কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। পরিচিত কণ্ঠস্বর, যা শুনে দু’জনেই যেন ছিটকে চমকে সরে দাঁড়াল।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২৫

নাফিসার বুকের ধড়ফড় থামাতে চাইছে, আর সায়মান চোখের ভেতরের ঝড় লুকোতে ব্যস্ত।
ঘরের ভেতর হঠাৎ তৈরি হলো এক ধরনের অদ্ভুত পরিবেশ—
যেন মুহূর্ত আগে ঝড় বইছিল, এখন সেখানে লুকানো নীরবতা, অস্থির নিঃশ্বাস আর না-বলা হাজারো প্রশ্ন ঝুলে আছে বাতাসে।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২৬