Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫২ (২)

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫২ (২)

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫২ (২)
আরোবা চৌধুরী আরু

সায়মান এখনও বাবার পায়ের কাছে বসা, চোখ লাল, মুখ কাঁপছে, বুক উঠানামা করছে অনিয়মিতভাবে। মাহবুব রাশিদ এগিয়ে গেলেন ছেলের দিকে। সায়মানের সমানে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন।
সায়মান মাথা তুলে তাকাল, বিভ্রান্ত চোখে ।
মাহবুব রাশিদ ততক্ষণে দুই হাত বাড়িয়ে ছেলেকে নিজের বুকে টেনে নিলেন। সায়মান আরো ভেঙে পড়ল একটু আস্কারা পেয়েই। বাবাকে শক্ত করে জড়াল।
মাহবুব রাশিদ ফিসফিস করে বললেন,

“শান্ত হও বাবা… কিছু হবে না। আমি আছি। আমি আছি তোমার সাথে। শান্ত হও।”
কিন্তু সায়মান আর শান্ত থাকতে পারল না। আরও জোরে বাবাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
“আব্বু… আমার বউ… আব্বু আমার পিচ্চি পুতুল… ও এখন একা না আব্বু… ওর সাথে আমার সন্তান আছে… আমার অস্তিত্ব আছে আব্বু…”
কথা গুলো বলতে বলতে গলা কেঁপে গেল। চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে।
“আব্বু, আমি… আমিও তোমার মতো বাবা হতে যাচ্ছি… আব্বু…!”
সায়মানের এই অসহায় ভেঙে পড়া রূপ দেখে, পুরো রুম যেন স্থির হয়ে গেল। ইমা বেগম মুখ চাপা দিয়ে কেঁদে ফেললেন। বিলকিসারা বেগম নিঃশব্দ শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। সায়ফান মাথা নিচু করে চোখ দিয়ে পানি পড়ছে নীরবে।বাকিদের সবার অবস্থা একই।
সায়মান আবার বাবার কাঁধে মাথা রেখে কাঁপা গলায় বলল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“আব্বু… আমার বউ… আমার বাচ্চা… ওরা কি আমার উপর অভিমান করবে? ও কি আমাকে ক্ষমা করবে না আব্বু? ও কি ভাববে ওর বাবা ওকে সেফ রাখতে পারল না? আব্বু প্লিজ… আমার বউ-বাচ্চাকে এনে দাও… প্লিজ আব্বু…”
মাহবুব রাশিদের চোখের নিচেও পানি জমেছে, কিন্তু তিনি নিজের শক্ত ভাবটা ধরে রাখলেন। এক হাত দিয়ে ছেলের মাথায় হাত রাখলেন, অন্য হাত দিয়ে পিঠে চাপ দিলেন।
“আমি আছি। এ বাড়ির বউ আর বংশধরের কিছু হবে না। নিজেকে শান্ত করো কিছু হবে না।”
ঠিক তখনই, তড়িঘড়ি দৌড়ে এসে থমকে দাঁড়াল মাহবুব রাশিদের P.A। হাঁপাচ্ছে সে।
“স্যার… একটা নিউজ পেয়েছি…”
সবাই একসাথে তাকাল। পিএ গম্ভীর কাঁপা গলায় বলল,

“আমাদের বর্ণনার সাথে মিল আছে এমন একটা মেয়ের লাশ পাওয়া গেছে… পুলিশ বলছে… বয়স আনুমানিক ১৮-১৯…”
হলরুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
“টিভিটা অন করেন স্যার… এখনই।”
রিশা দৌড়ে গিয়ে রিমোট তুলে নিল। হাত কাঁপছে । টিভি অন করতেই স্ক্রিনে নিউজ চ্যানেলের লাল জরুরি ব্রেকিং ব্যানার জ্বলে উঠল।

BREAKING NEWS ঢাকার গাবতলী সংলগ্ন খোলা জায়গায় অর্ধদগ্ধ এক কিশোরীর লাশ উদ্ধার। পুলিশের ধারণা রেপের পর আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। বয়স অনুমান ১৮–১৯।
সাথে কোনো আইডেন্টিটি কার্ড নেই।
স্ক্রিনে অর্ধদগ্ধ লাশের ঝাপসা ছবি দেখানো হচ্ছিল।
রিপোর্টার গম্ভীর কণ্ঠে বলছে, রাস্তার পাশে আগুন ধোঁয়ার চিহ্ন পাওয়া গেছে, এলাকাবাসী সকালে দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেয় ইত্যাদি…

এক মুহূর্তে,
সবাই যেন বরফ হয়ে গেল। বিলকিসারা বেগম কেঁপে উঠলেন।
ইমা বেগম বুক চাপা দিলেন, হাঁটু কাঁপছে।রিশা দাঁড়িয়ে নিজের ঠোঁট কামড়াচ্ছে। সায়ফান এক পা পিছিয়ে গেল। আফিয়া বেগম মেজেতে বসে পড়ল চুপ করে।
আর সায়মান সে ধীরে, খুব ধীরে মাথা তুলল।
তার চোখ দুটো এত লাল, এত ভয়ঙ্কর টিভির দিকে তাকিয়ে রইল।
একদম স্থির। একটুও নড়ছে না। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।শুধু নিঃশ্বাস… ভারি। খুব ভারি।
তারপর…
ধীরে ধীরে সে দাঁড়াল। সায়মান দুই কদম সামনে এগিয়ে স্ক্রিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
অর্ধদগ্ধ ছবির দিকে তাকিয়ে বলল,

“এটা… এটা আমার নাফিসা না…”
তার কণ্ঠ এত ঠান্ডা, এত ফাঁকা, সবাই নিঃশ্বাস চেপে রইল।
সায়মান আবার বলল,
“এটা… আমার বউ না।”
এক সেকেন্ড থেমে গিয়ে হঠাৎ গলা ফেটে উঠল,
“এটা আমার বউ না!!!”
তার চিৎকারে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল।
আফিয়া বেগম হাউমাউ করে কাঁদলেন। দৌড়ে এসে ছেলেকে ধরার চেষ্টা করলো কিন্তু ছুঁতেও পারলো না। সায়মান স্পর্শ করতে দিল না। দু’হাতে নিজের চুল ধরে মেঝেতে বসে পড়ল।
“আমার বউ না… আমার বউ না… এটা আমার নাফিসা না…”
তার গলা কাঁপছে, শ্বাস কাঁপছে। মাহবুব রাশিদ এগিয়ে গিয়ে ছেলের কাঁধ ধরলেন।
“বাবা… শান্ত হও।”
সায়মান মাথা তুলে চেয়ে বলল,
“আব্বু… আমি ওকে মরে যেতে দেবো না…
আমি ওকে খুঁজে আনব…
যেখানেই থাকুক…”
তারপর দাঁড়িয়ে উঠে চিৎকার করে বলল,
“গাড়ি আনো! সব ফোর্স রেডি করো! পুরো ঢাকা শহর ঘুরিয়ে ফেলবো আমি!”

দুপুর প্রায় বারোটা বাজতে চলেছে।
ঘরের ভেতরে এক ধরনের মোলায়েম শান্তি জমে আছে না বেশি আলো, না বেশি অন্ধকার; ঠিক যেন দুপুরের অলস রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে নরম হয়ে ঘরে ঢুকেছে। পর্দার ফাঁক দিয়ে রোদের হালকা সোনালি রেখা বিছানার এক কোণে পড়ে একটা উষ্ণ আভা তৈরি করেছে।রুমটা নিঝুম অন্ধকারে ডুবে ছিল। জানালার পর্দা হালকা দুলছে, বাইরে রাতের বাতাস যেন নরম ফিসফাস করছে। ঠিক এমন সময় হঠাৎ,

“আহ!”
হালকা চিৎকারে যেন পুরো ঘরটা কেঁপে উঠলো।
নাফিসা ধড়মড় করে উঠে বসল। ঘাম ভেজা মুখ, হাঁপাচ্ছে, বুক উঠানামা করছে দ্রুত তালে। এক হাত দিয়ে পেটটা চেপে ধরে চারদিকে তাকালো চোখে বিস্ময়, ভয় । সামনে–পিছনে তাকিয়ে বুঝতে পারল… সে সেই নোংরা, অন্ধকার রুমে নেই।এটা মেহেরাবদের ফর্ম হাউসে আছে সে৷ পরিপাটি, পরিষ্কার, গুছানো।
পর্দা টেনে রাখা, বিছানায় নরম কম্বল।
কিন্তু তবুও মনে হচ্ছে যেন সবকিছু ভুল। মনে হচ্ছে, একটু আগে…
ওই দুঃস্বপ্নটা…ওই ভয়ের অন্ধকার… এখনও ওকে তাড়া করছে।
হঠাৎ দরজার কাছে ছোটাছুটির শব্দ।

“নাফু!”
দৌড়ে রুমে ঢুকলো মেহেরাব আর মেহেরিন। দুজনের মুখেই ভয়।
মেহেরাব এগিয়ে এসে বিছানার পাশে বসে পড়লো।
মেহেরিন একটু দূরে দাঁড়িয়ে, চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে।
“কি হয়েছে? কি হয়েছে নাফু?”
মেহেরাবের কণ্ঠে আতঙ্ক।
নাফিসা কথা বলতে পারছে না।জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে শুধু।
ও বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“আমার বাচ্চা… আমার বাচ্চা… না… প্লিজ না…”
চোখ ভিজে গেছে, গলা কাঁপছে।
মেহেরিন দৌড়ে গিয়ে পাশে রাখা জগ থেকে পানি ঢেলে গ্লাসে নিলো। মেহেরাব আলতো করে নাফিসার কাঁধে হাত রাখলো।

“নাফু, শোন… শোন প্লিজ… তুই ঠিক আছিস । স্বপ্ন ছিল এটা ।তুই নিরাপদ।”
নাফিসা এখনও কাঁপছে। মেহেরিন পানি এগিয়ে দিলো,
“আপি, পানি খা… ধীরে ধীরে।”
মেহেরাব গ্লাসটা হাতে নিয়ে নিজের হাতে নাফিসার মুখের কাছে ধরল।
“ধীরে খা, ঠিক আছে? একদম টেনশন করবি না।”
নাফিসা আধা কাঁপা হাতে গ্লাসটা ধরতে যাচ্ছিল, কিন্তু মেহেরাব থামিয়ে দিলো।
“না, আমি ধরছি। তুই শুধু চুমুক দে।”
দুই–তিন চুমুক খাওয়ার পর নাফিসার শ্বাস একটু স্বাভাবিক হলো।
তবুও চোখে ভয়, শরীরটা কাঁপছে।
মেহেরিন পাশে বসে ওর পিঠে হাত বুলাতে লাগল।

“নাফু … তুই নিরাপদ। কেউ কিছু করতে পারবে না আর… শোন?”
নাফিসা ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে হালকা ‘হুম’ বলল, কিন্তু বিড়বিড় করা থামছে না,
“আমার বাচ্চা… ভয় লাগতেছে… আমার বাচ্চার কিছু হবে না তো?”
মেহেরাব সাথে সাথেই দৃঢ় গলায় বলল,
“না। একদম না। তুই আর তোর বাচ্চা দুইজনেই সেফ। তোকে ডাক্তার দেখাইছি না? ডাক্তার নিজেই বলছে, বেশি টেনশন নিলে চলবে না।”
মেহেরিন উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ভাইয়া, আমি খাবার নিয়ে আসি?”
মেহেরাব মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ, নিয়ে আয়। গরম স্যুপ দে, আর ওর ওষুধটাও নিয়ে আয়।”
মেহেরিন দ্রুত রুম থেকে বের হয়ে গেল।
মেহেরাব নাফিসার সামনে বসে বলল,

“দেখ নাফু, প্রথম কথা, টেনশন করবি না। দ্বিতীয় কথা, তুই এখন একা না। আমরা আছি। আর তোর বাচ্চাটার জন্য তোকে প্রপার রেস্ট নিতে হবে। ডাক্তার এতবার বলেছে টেনশন করা যাবে না। তুই ভয় পাবি কেন? আমি আছি। দিন–রাত তোর পাশে থাকব।”
নাফিসার চোখ বেয়ে টুপ করে পানি পড়ে বিছানায়।
সে চুপচাপ শুধু বলল,
“আমি আবার হারায়ে যাইতেছি মনে হয়… ওই রাতটার মতো…”
মেহেরাব সাথে সাথে মাথা নাড়ল।
“না। ওই রাত আর কোনদিন হবে না। যতক্ষণ আমি বাঁচি, তুই আর তোর বাচ্চার গায়ে একটা আঁচড়টাও কেউ দিতে পারবে না। তুই শুধু রেস্ট নে।”
ঠিক তখনই মেহেরিন খাবার আর ওষুধ নিয়ে ফিরে এলো। ট্রে বিছানার পাশে রেখে মেহেরাবকে বলল,
“ভাইয়া, স্যুপটা গরম গরম। নাফুকে একটু করে খাওয়াই দে । আমি আম্মুর সাথে কথা বলে আসি। বাসায় যাওয়ার জন্য বলছি অলরেডি ফোন দিছে। নাফিসার সাথে থাকার জন্য যেভাবেই হোক পাশে ম্যানেজ করছি আমি সমস্যা নাই। ”

মেহেরাব আবার নাফিসার দিকে তাকালো। তার ভরসাদায়ক কণ্ঠে বলল
“নাফু, চল… একটু খেয়ে নে। তারপর ওষুধ খাবি। শরীর ঠিক থাকলে মনও ভালো থাকবে। আর তোর বাচ্চাটাকেও তো শক্ত থাকতে হবে, তাই না?”
নাফিসা ধীরে ধীরে মাথা নড়ল। মেহেরাব চামচে স্যুপ তুলে ওর মুখের কাছে ধরলো। এক চামচ, দুই চামচ… নাফিসা চুপচাপ খেতে লাগলো। মেহেরিন কথা বলা শেষ করে পাশে বসে ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
“নাফু , আল্লাহ রক্ষা করবে। তুই শুধু নিজের সঙ্গে একটু কোমল হো… আর কিছু না।”
অল্প কিছু খাওয়ানোর পর মেহেরাব ওষুধটা এগিয়ে দিলো।
নাফিসা খেয়ে নিল। তারপর বালিশটা ঠিক করে, কম্বলটা গায়ে ঢেকে দিয়ে মেহেরাব শান্ত স্বরে বলল,
“এখন ঘুমা। রেস্ট নে। আমরা দুজন এখানেই আছি।”
নাফিসা চোখ বন্ধ করে নিল। তার শ্বাস ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে লাগল। বাইরে হাওয়া জানালায় ধাক্কা দিচ্ছে।
মেহেরাব আস্তে করে বলে উঠলো,
“নাফু, তোর জন্য না হলেও… অন্তত তোর বাচ্চাটার জন্য রেস্ট নিতে হবে। টেনশন করিস না আর।”বলেই মেহেরাব চলে গেল রুম থেকে।

নাফিসার ভেতরে নিঃশব্দে। তার অভিমান এখন পাহাড়ের মতো—ডিএসপি সাহেবের প্রতি, তার অবহেলার প্রতি, সেই এক মুহূর্তের জন্যও না ভেবে তাকে ফেলে যাওয়ার প্রতি। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে—নিজে থেকে আর কখনো ডিএসপি সাহেবের সামনে দাঁড়াবে না। যদি সত্যিই তাকে গুরুত্ব দেয়, তবে তিনি নিজেই খোঁজ করে এখানে আসবেন, নিজের হাতে তাকে নিয়ে যাবেন। তার আগ পর্যন্ত না।
মেহেরাবা আর মেহেরিন ঠিক সময়ে না পৌঁছালে কি হতে পারত, এ কথা ভাবতেই নাফিসার বুকটা দপদপ করে উঠল ভয়ে। এই পৃথিবীতে এখন সে কাউকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে সাহস পায় না, আবার পেটে হাত রাখলেই নিজের ভেতরের ছোট্ট প্রাণটা তাকে নতুন করে শক্তি দেয়। হাত বুলিয়ে নরম স্বরে বলল,

“তোমার বাবা খুব পচা, জানো? আমাকে এভাবে একা ফেলে রেখে চলে গেল। তুমি আসছো, এ কথাটাও সে জানে না। আমরাও বলব না। তোমার পাপা নিজে খুঁজে নিতে আসুক আমাদের… এই শাস্তিটা তাকে পেতেই হবে।”
কথাগুলো বলতেই নাফিসার চোখের কোণে পানির চিকচিকানি ফুটে উঠল। আফিয়া বেগমের মুখটা মনে পড়তেই বুকটা আরও মোচড় দিয়ে উঠল। কতটা বিশ্বাস নিয়ে, কতটা ভালোবেসে তাকে আগলে রেখেছিলেন সেই মানুষটা। অথচ আজ নাফিসাকে অবিশ্বাস করল,।
হয়তো সে ভুল করেছে, হয়তো পরিস্থিতি তাকে এই ভুলের দিকে ঠেলে দিয়েছে—তবুও এখন আর ফিরে যাওয়ার পথ নেই। সে স্থির করেছে, নিজের সম্মান আর তার অনাগত সন্তানের নিরাপত্তার জন্য এই দূরত্বটাই দরকার।

ফ্ল্যাশব্যাক,
রাশিদ ভিল্লার দিকেই যাচ্ছিল মাহেরাব আর মেহেরিন। নাফিসা এখন কেমন আছে? কি ঘটেছে? এগুলো জানতে মেহেরিন সারাক্ষণ ফোন কানে ধরে চেষ্টা করছিল, কিন্তু ফোনটা বন্ধ। আর মাহেরাব স্টিয়ারিংয়ে হাত শক্ত করে ধরে থাকতে থাকতে কয়েকবার শ্বাস ফেলল।
গাড়িটা যখন মূল সড়কে উঠলো, তখন সন্ধ্যার আলো পুরাটাই মিলিয়ে গিয়েছে। রাস্তায় দু’একটা হেডলাইট জ্বলছে চারপাশে অদ্ভুত একটা নিস্তব্ধতা। ঠিক তখনই মেহেরিন জানালার বাইরে তাকিয়ে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল,
“মাহেরাব ! দেখ—ওটা কি নাফিসা না?”
গাড়ি থামানোর আগেই দুজনই দেখল, খুব ধীরে ধীরে হাঁটছে এক মেয়ে। মাথা নিচু, শরীরটাও ক্লান্তির মতো ঢলে পড়েছে। আলো কম থাকায় চেহারা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু সেই হাঁটার ভঙ্গি, দুলে দুলে এগোনো… মেহেরিন নিশ্চিত, ও নাফিসাই।

মাহেরাব ব্রেক চাপল সাথে সাথেই । দুজন দরজা খুলে দৌড় দিতে যাবে, ঠিক তখনই নাফিসা একটা সরু গলির ভেতর ঢুকে গেল। গলি এত দ্রুত মোড় নিল যে মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই সে চোখের আড়ালে চলে গেল।
মেহেরিন হতবাক—“এই যে! এই যে! কোথায় গেল? এতো দ্রুত কই গেল?”
মাহেরাব গলির দিকে দৌঁড়ে গিয়ে শুধু নিস্তব্ধ ফাঁকা পথটাই দেখল। অল্প একটু আগেও যার ছায়া ছিল, এখন সেখানে ছায়ার আভাও নেই।
“গাড়িতে ওঠ । দ্রুত অন্যদিক ঘুরি।” — মাহেরাব স্থির কণ্ঠে বলল।
দুজন আবার গাড়িতে উঠে বাম-ডান সব রাস্তায় সার্চ শুরু করল। প্রায় ৩ঘন্টা খোঁজার পর, একটি পরিত্যক্ত নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ের পাশে আলো-অন্ধকারের মাঝে কিছু নড়াচড়ার শব্দ পেল।
মাহেরাব গাড়ি থামিয়ে বলল—“ওই দিকে! ওদিকে কেউ আছে!”

দুজন দৌড়ে এগিয়ে যেতেই দৃশ্যটা যেন বুক কেটে ফেলল।
তিনজন অচেনা লোক নাফিসার হাত ধরে টানতে টানতে একটা মাইক্রোবাসের দিকে নিয়ে যেতে চাইছে। নাফিসা শক্তিহীন, মাথা দুলছে, সে চেষ্টা করছে ছুটে বেরোতে—কিন্তু এক বিন্দু শক্তি নেই শরীরে। তার মুখে আতঙ্ক, চোখের নিচে অশ্রুর দাগ।
মেহেরিন চিৎকার করল—“ছাড় ! নাফুকে ছেড়ে দে !”
তাদের ছাড়া মুহুর্তেই মাহেরাবের গলা বজ্রের মতো গর্জে উঠল,
“এক ইঞ্চি নড়বি না কেউ!”
তার গলার রাগে তিনজনই থমকে গেল। দুজন পিছিয়ে গেলেও বাদবাকি লোকটা নাফিসার হাত ছাড়ল না। তখন আর সময় নষ্ট করেনি মাহেরাব। দৌড়ে গিয়ে লোকটার কলার চেপে ধরে তাকে একটা ধাক্কা দেয়। লোকটা মাটিতে গড়িয়ে পড়ল।
মেহেরিন উঠে গিয়ে দ্রুত নাফিসাকে জাপটে ধরল

“নাফিসা! শুনতে পাচ্ছিস? আমার দিকে তাকা!”
কিন্তু নাফিসা তখন অর্ধচেতন, মাথা তার মেহেরিনের কাঁধে হেলে পড়ে আছে। সে শুধু অস্পষ্ট কণ্ঠে বলল—“বাঁচাও… আমাকে বাঁচাও…”
এই শব্দ দুটো মুহুর্তেই মেহেরিনের চোখ ভিজিয়ে দিল।
ওদিকে লোকগুলো সরে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। মাহেরাব তাদের দিকে শেষবার তাকিয়ে তর্জন করে বলল,
“দূর হও এখান থেকে। আজ পালাইলা, কিন্তু আরেকবার সামনে পড়লে হাত-পা ভেঙে দেব।”
লোকগুলো কোনো প্রতিরোধ দেখানোর সাহস পেল না। তারা দৌড়ে পালিয়ে গেল। নাফিসা তখন পুরো শরীর ঢলে পড়ে মেহেরিনের কোলেই অজ্ঞান হয়ে গেল। মেহেরিন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মাহেরাবকে বলল,
“দ্রুত গাড়িতে নাও! ওকে হাসপাতালে নিতে হবে!”
দুজন মিলে নাফিসাকে সাবধানে গাড়ির সিটে শুইয়ে দিল এবং দ্রুত গাড়ি ছুটল কাছাকাছি প্রাইভেট হাসপাতালে।
ডাক্তারের চেকআপ শেষে ডাক্তার বলল,

“ও খুব বেশি মানসিক ধাক্কায় আছে। শরীরেও প্রচণ্ড দুর্বলতা। ঠিকমতো খাবার খায়নি অনেকক্ষণ… ভয় পেয়েছে ভয়ানকভাবে। এখন কিছু ইনজেকশন ও স্যালাইন চলবে। ঘুমালে ভালো হবে।”
ডাক্তার চলে যাওয়ার পর নাফিসা ঘুমিয়ে গেল—অবচেতন, কাঁপা নিশ্বাসে।
মেহেরিন চেয়ারে বসে তার মাথার চুলে হাত বুলিয়ে বলতে লাগল—
“কোথায় যাচ্ছিলি? কেন একা বের হলি? জানিস—তোর সঙ্গে যদি কিছু হতো?” তার গলা কেঁপে উঠল। চোখ ছলছল করল।
মাহেরাব তখনো দরজার পাশে দাঁড়িয়ে। তার মুখ শক্ত, চোখে এক ধরনের ঠাণ্ডা রাগ,

“ওকে একা ছেড়ে দিয়েছে রাতে! এইটাই কি পরিবার? নিজের ঘরে মেয়েকে এভাবে ফেলে রাখে?”
কিছুক্ষণ পর দুজন সিদ্ধান্ত নিল,
“এখনই রাশিদ ভিল্লাতে কিছু জানানো যাবে না। নাফিসা পুরো জ্ঞান না ফিরলে আর মানসিকভাবে স্থির না হলে তারা কিছুই জানাবে না। এরকম অসুস্থ অবস্থায় যখন একা ফেলে দিয়েছে তাহলে তাদেরকে জানানোর কোন মানেই হয় না। ”
মাহেরাব বলল,

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫২

“আজ রাতে ওকে আমাদের ফার্ম হাউজে নিয়ে যাই। ওখানে শান্ত পরিবেশ, কেউ disturb করবে না।
মেহেরিন মাথা নেড়ে সম্মতি দিল,
“হ্যাঁ, ঠিক এইটাই ভালো। কেউ জানবে না আপাতত। ও পুরো সুস্থ হলে তারপর সব বলা হবে।”

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫৩