চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫৩
আরোবা চৌধুরী আরু
রাত তিনটা বাজে। ঢাকা শহর যেন দিনের সমস্ত হইচই গুটিয়ে নিয়ে গভীর ঘুমে ডুবে আছে। দিনের বেলা যে রাজপথে হর্ণের শব্দ, মানুষের ভিড়, দোকানের কোলাহল রাতে সব যেন পালিয়ে গেছে। রাস্তার লাইটগুলো কেবল টিমটিম করে জ্বলে আছে, হালকা কুয়াশা লাইটের আলো ছড়িয়ে ধোঁয়াটে একটা পরিবেশ বানিয়ে রেখেছে।
এ শহর কখনো পুরোপুরি ঘুমায় না।কিন্তু আজকে সায়মানের চোখে মনে হচ্ছে পুরো শহরটাই অচেনা। এত বড় শহর, অথচ তার নাফিসা কোথাও নেই।
গাড়ির স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে আছে সায়মান। চোখ লাল, মুখ শুকনো, ঠোঁট ফেটে গেছে। গত ১২ ঘণ্টা ধরে সে শুধু একটাই কাজ করেছে তার বউকে খোঁজা। একটা রাস্তা থেকে আরেকটা রাস্তা, একটা এলাকা থেকে আরেকটা পুরো ঢাকা শহর যেন তার সামনে ঘুরতে ঘুরতে ধোঁয়াটে হয়ে যাচ্ছে।
পুলিশ ফোর্স চারদিকে ছড়িয়ে গেছে। মাহবুব রাশিদ মন্ত্রী হওয়ায় আরো বেশি জোরদার ভাবে খোঁচাখুঁজি চলছে। তবু কোথাও কোনো হদিস নেই।
এদিকে টিভি চ্যানেলগুলোতে ব্রেকিং নিউজ চলছে। একটা মেয়েকে রাত সাড়ে বারোটার দিকে রাস্তার পাশে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। লাস্ট আইডেন্টিফিকেশন দেখে অনেকে ভেবেছিল এটাই নাফিসা। কিন্তু পরে নিশ্চিত হওয়া গেল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“দেহটি নাফিসা নয়।”
এটা শুনে পুরো রাশিদ পরিবার যেমন স্বস্তি পেল, তেমনই সায়মানের বুকের ভেতর নতুন করে আশা জেগে উঠেছে। জানে নাফিসা বেঁচে আছে। কোথাও আছে। শুধু তাকে খুঁজে বের করতে হবে বউটাকে৷
সাইফান আর রাজিব তার সাথেই আছে। রাজিবের দায়িত্ব ছিল পুরো শহরের সব হাসপাতালের ডিটেলস নেওয়া। সব কিছু নিজে হ্যান্ডেল করছে। সে একটার পর একটা কল দিচ্ছিল, প্রায় সব হাসপাতাল থেকেই একই উত্তর,পেয়েছে নাফিসার খোঁজ পাচ্ছে না।
হঠাৎ একটা ছোট প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে রাজিবের ফোন এল। ফোনটা রিসিভ করে, জানতে পারে তাদের পাঠানো ছবি ও বাদবাকি ডিটেলস অনুযায়ী একটা মেয়েকে নিয়ে আসা হয়েছিল। মেয়েটা প্রেগনেন্স সাথে দুইটা ছেলে মেয়ে ছিল একই বয়সে।
শোনা মাত্রই রাজিব থমকে গেল। তারপর রাজিব চুপ না থেকে সঙ্গে সঙ্গে সায়মানের কাছে গেলো।
“স্যার! একটা হাসপাতাল বলেছে… মিলছে ভাবির মত একজনকে। তাদেরকে ছবি দেখানো হয়েছে উনারা বলেছেন সেম ছবিটার সাথে মিলে গেছে এমন একজন এসেছিল !”
এই একটা বাক্যই সায়মানের বুকের ভিতর অস্থিরতা কিছুটা কমলো, জড়িয়ে একটা নিশ্বাস নিয়ে রাজিবের দিকে তাকিয়ে,, আমাকে তাড়াতাড়ি ঠিকানা টা সেন্ড কর। বলে দ্রুত বাড়ির কাছে গেল পিছন থেকে একবার ঘুরে দাঁড়িয়ে,
“গাড়িতে ওঠো! এখনই!”
রাজিব সামনেই বসল, পিছনে সাইফান। সায়মান দেরি না করে গাড়ি স্টার্ট দিল।রাতে শহর ফাঁকা থাকলেও সায়মানের কাছে মনে হচ্ছে প্রতিটা সেকেন্ড যেন ভারী। তার হাত কাঁপছে, বুক ধুকপুক করছে। গাড়ির স্পিড দাঁড় করালো প্রায় ১০০-এর ওপরে।
পেছনে পুলিশ ফোর্সও রওনা হলো সায়মানদের গাড়ি ফলো করে।
হাসপাতালের সামনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত তিনটা বেজে পনেরো মিনিট। ছোট একটা ভবন, প্রায় অন্ধকার। রিসেপশনে মাত্র একজন কম্পাউন্ডার নাইট ডিউটিতে।
“মেয়েটা কোথায়?”—সায়মানের কণ্ঠ ভারি, তাড়াহুড়ো করে রাগে কাঁপতে থাকা কন্ঠে জোরে বললো ।
কম্পাউন্ডার ভয় পেয়ে গেল, সায়মান হঠাৎ রেগে যাওরে কথা বলাই,
“স্যার… আমরা রোগীকে রাখিনি।”
সায়মান রেগেমেগে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“হোয়াট! তাহলে কোথায় গেল? সম্পূর্ণ ডিটেইলস না দিয়ে আমাদের এখানে ডেকেছেন কেন? টাইম নষ্ট করার মানে কি?”
কম্পাউন্ডারের মুখ চুপসে গেল। ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“স্যার… আমরা পুরোটা বলতেই চেয়েছিলাম। তার আগেই আপনাদের অফিসার ফোন কেটে দিয়েছেন।”
সায়মান ধীরেধীরে রাজিবের দিকে তাকাল—চোখের দৃষ্টি যেন খেয়ে ফেলার মতো। পরের মুহূর্তে হঠাৎ ঝড়ের মতো তার দিকে এগিয়ে গিয়ে ঠাস করে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল।
রাজিব পুরোটা বোঝার আগেই সায়মান দাঁত চেপে গর্জে উঠল,
“ইডিয়েট! নেক্সট টাইম এমন ভুল করলে আরেকটা গালেও থাপ্পড় পড়বে!”
রাজিব সঙ্গে সঙ্গে দুই গালে হাত চেপে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। লজ্জা, ভয়ে শরীরটা কুঁকড়ে গেল। পাশ থেকে সায়ফান রাজিবের অবস্থা দেখে হঠাৎ ফিক করে হেসে ফেলল।
হাসির শব্দটা শেষ হওয়ার আগেই ঠাস—ওর গালেও আরেকটা থাপ্পড়! চমকে সায়ফান সামনে তাকিয়ে দেখল—সায়মান ভয়ংকর রাগী চোখে তাকিয়ে আছে। সায়ফান নিজের গালে হাত রেখে দৌড়ে একটা পিলারের আড়ালে লুকিয়ে উঁকি দিল।
“সরি ভাই… আর এমন হবে না…”
ওর কণ্ঠে ভয়টা স্পষ্ট।
সায়ফানের এমন কাণ্ড দেখে রাজিব মিসমিস করে হাসি চাপার চেষ্টা করল। কম্পাউন্ডারও অজান্তে পিড়িক করে হেসে ফেলল।
কিন্তু সায়মান যখন কম্পাউন্ডারের দিকে চোখ গরম করে তাকাল,
ওর হাসি মুহূর্তে শুকিয়ে গেল। হাত-পা গুলিয়ে তাড়াহুড়া করে বলতে শুরু করল,
“স্যার! ওনাকে দুইজন এনেছিল। বলেছিল ডাক্তার দেখাবে। ওদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছিল এমার্জেন্সি কেস। ডাক্তার দেখার পর বলেছিলেন—সম্ভবত শ্বাসকষ্ট, ট্রমার মতো কিছু… কিন্তু তারা পাঁচ মিনিটের মাথায় রোগীকে নিয়ে চলে যায়।”
সায়মানের মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হলো।
“কোথায় নিয়ে গেছে? কে ছিল? ঠিকানা দেন—তাড়াতাড়ি!”
কম্পাউন্ডার অসহায় সুরে মাথা নাড়ল,
“স্যার… তারা রাগারাগি করছিল। বারবারই বলছিল বড় হাসপাতালে নেবে।”
এবার সায়ফান লাফিয়ে উঠল, এগিয়ে এসে বলল,
“কোন বড় হাসপাতাল? নাম বলছে?”
কম্পাউন্ডার মাথা নিচু করে বলল,
“না স্যার… নাম বলেনি। নরমালি চেকআপ করেছে—সব ঠিক আছে কি না দেখার জন্য। তবে আমাদের কাছে তাদের দেয়া একটা ঠিকানা আছে। চাইলে দেখতে পারেন…”
সায়মান দুই হাতে মাথা চেপে ধরল। রাগ আর দুশ্চিন্তায় কণ্ঠ কেঁপে উঠছে,
“ঠিকানাটা এখনই দেন! প্রথমে দিতে সমস্যা কি ছিল? এতক্ষণ বাজে কথা শুনাচ্ছিলেন কেন? আর আপনারা সিসিটিভি ফুটেজ দেখান—তাড়াতাড়ি!”
সিসিটিভি ফুটেজ চালু হতেই স্ক্রিনে নাফিসার মুখ স্পষ্ট দেখা গেল।
নাফিসাকে দেখামাত্রই সায়মানের বুকের ভিতর ব্যথা অনুভব হলো।
ভালো করে আবার কম্পিউটারের স্ক্রিনে তাকালো,
কিন্তু যে দুইজন তাকে এনেছিল—তাদের মুখ দেখা যাচ্ছে না।
তবে শরীরের গঠন, পোশাক দেখে ধারণা করা গেল—সম্ভবত এক ছেলে আর এক মেয়ে, দুজনেরই বয়স কাছাকাছি।
কম্পাউন্ডার জড়ানো হাতে ছোট একটা কাগজ এগিয়ে দিল।
সায়মান সেটা ছিনিয়ে নিল প্রায় ছিঁড়ে ফেলার মতো শক্তিতে।
সায়মান ঝড়ের মতো এক দৌড়ে গাড়ির দিকে ছুটে গেল ।
পেছন পেছন রাজিব ও সায়ফানও দৌড়ে ছুটল।
গাড়ির কাছে পৌঁছাতেই সায়মান প্রথমে দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। সাইফন পিছনের সিটে উঠে বসলো।
রাজিব পাশের সিটে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই গাড়ি সশব্দে বেরিয়ে গেল।
মেহেরিন আর নাফিসা একই রুমে শুয়ে আছে । সারাদিনের দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ, শরীরের দুর্বলতা সব মিলিয়ে নাফিসার শরীর ভেঙে পড়েছে।
হঠাৎ,
নাফিসা অস্থির হয়ে উঠল। তার হাত কাঁপছে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।
মনে হচ্ছে বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে। এক পর্যায়ে
ঢক! ঢক! করে নাফিসা গলা ভারী হয়ে এলো, চোখ উল্টে গেল। হঠাৎ তীব্রভাবে উঠে বসলো,
“মেহু… মেহু…”
তারপর হঠাৎই বিছানা থেকে নেমে এক দমে বমি করতে শুরু করলো। মেহেরিন ঘুমিয়ে ছিল। হঠাৎ এমন শব্দে চমকে উঠল। আলো জ্বালানোর সুযোগও পেল না, অন্ধকারে ঝাপসা দেখতে দেখতে নাফিসার দিকে ছুটে গেল।
“আহ!নাফু! এ কী হইতেছে তোর ? দাঁড়া, দাঁড়া—”
নাফিসা কথা বলতে পারছে না। মাথা ঘুরছে। দেহটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
মেহেরিন কাঁপা হাতে তাকে ধরে দেয়ালে ঠেকাল।
“মেহরাব! ভাইয়া!তারাতাড়ি এখানে আই নাফু কেমন জানি করছে !”
চিৎকারের সাথেই দরজা খুলে দৌড়াতে দৌড়াতে এলো মেহরাব।
“কি হইছে? নাফিসা!”
নাফিসাকে দেখে তারও শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। ও জানত মেয়েটা মানসিক ধাক্কায় ভুগছে। কিন্তু এত খারাপ হবে—ভাবেনি।
দুজন মিলে নাফিসাকে ধরে ওয়াশরুমে নিয়ে গেল।মুখ ধুইয়ে, পানি খাওয়ানোর চেষ্টা করল। ওর শরীর ঠান্ডা, ঠোঁট নীলচে।
মেহরাব হাত কাঁপতে কাঁপতে ফোন বের করল।নাফিসার দিকে একবার তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস রইল একটা।
ডক্টর কে ফোন করে সমস্ত পরিস্থিতি জানালো। মেহরাব মাথা নেড়ে সব শুনল।
“ঠিক আছে স্যার! আমরা করছি।”
ফোন রাখতেই মেহেরাব মেহেরিনকে সব বানিয়ে নিয়ে আসতে বলল। মেহেরিন দৌড়ে রান্নাঘরের দিকে গেল।
রুমে এখন শুধু নাফিসা আর মেহরাব। নাফিসা আধশোয়া অবস্থায় চোখ বন্ধ করে আছে। বমি আর দুর্বলতায় পুরো শরীর ভেঙে পড়েছে। মেহরাব ধীরে ধীরে তার মাথার পিছনে বালিশ ঠিক করে দিল।
“আমাদেরকে তোর বন্ধু ভাবিস না তাই না? নাহলে এতদিনে সব সত্য কথা বলতিস। এভাবে আমাদের থেকে লুকিয়ে রাখতিস না।
কিছুক্ষণ পর নাফিসা একটু চোখ খুলল। চোখের নিচে কালো দাগ, ঠোঁট ফাটা, মুখের রঙ ফ্যাকাশে।কোন উত্তর দিল না কথার।
মেহরাব মৃদু হেসে বলল,
“বস একটু। বসলে ভালো লাগবে। শরীর টান দিস না।”
ওকে আস্তে কর উঠিয়ে বসাল। নাফিসা কাঁপা গলা বলল,
“মাথা ঘুরতেছে…”
“আমি আছি। ভয় পাবি না।”
গল্প করতে করতে মেহরাব চেষ্টা করছিল নাফিসাকে একটু হাসিখুশি রাখার।
কিছুক্ষণ পর দুজনে ধীরে ধীরে করিডোর ধরে হাঁটতে বের হলো, যেন রক্তচাপ একটু ওঠে। মেহরাব নাফিসার হাতে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। নাফিসা চুপচাপ কিন্তু হাঁটছে ।
ফার্ম হাউসের সামনে একের পর এক পুলিশ গাড়ি এসে থামল।
সায়মানের গাড়ি সবার আগে। গাড়ি থেকে নামতে নামতে বিড়বিড় করে বলতে থাকলো
,” আমি আসছি, বউ।”
চোখ লাল, শরীর কাঁপছে দৌড়াতে দৌড়াতে।ওর পিছনে পিছনে বাকিরা সবাই নেমে আসলো। দারোয়ান সামনে এসে বলল,
“স্যার এত পুলিশ কেন? সমস্য—”
কথা শেষ হওয়ার আগেই—
ধাম!
সায়মান হাত দিয়ে গেট ঠেলে খুলে ভেতরে ঢুকে গেল।কোনো কথা না বলে, কোনো অনুমতি না নিয়ে।পুলিশ ফোর্সও তার পেছনে ঢুকে পড়ল। সায়মান ঢুকতে ঢুকতেই চিৎকার শুরু করল,
“বউ! পিচ্চি বউ! তুমি কই?!
আমি আইছি—শুনছো?
শুধু একবার সামনে আয়!
আর কখনো ছাইড়া যাইতাম না!”
চিৎকারে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল। সিঁড়ির দিকে ছুটে গেল
উপরের দিকে,
উপরে করিডোরে হাঁটছিল নাফিসা ও মেহরাব। সায়মানের চিৎকার শুনেই নাফিসার শরীর থরথর করে উঠল।
“এই শব্দটা… DSP সাহেব ?”
নাফিসার মুখ সাদা হয়ে গেল। হৃদপিণ্ড যেন বুকে পড়ে গেছে।
সে দাঁড়িয়ে রইল। শ্বাস নিতে পারছে না।
মেহরাব নাফিসার দিকে তাকিয়ে বলল নিচে চল, সায়মান ভাইয়া এসেছে বোধহয়,,
তুই একা যেতে পারবি । নাফিসা অসুস্থ অবস্থায় সিঁড়ি দিয়ে নামা কঠিন, তাই মেহরাব তাকে কাঁধ দিয়ে ধরে নিচে নামাতে শুরু করল।
ঠিক সেই সময়,
সায়মান উঠে এল সিঁড়ির মোড়ে।
এক নজরেই দৃশ্যটা তার চোখে ধাক্কার মতো লাগল। নাফিসার দিকে তাকিয়ে, চোখ দিয়ে দু ফোটা পানি বেরিয়ে পড়ল। মাথায় ব্যান্ডেজ করা ক্লান্ত ফ্যাকাশ মুখটা দেখে নিজেকে খুব অসহায় মনে হল। নিজের বউ বাচ্চার খেয়াল রাখতে পারিনি, এই অবস্থায় এভাবে একা রেখেছে । ছোট্ট পিচ্চি বউটা কত কিছু সহ্য করেছে।
কত অপমান সহ্য করেছে। এগুলো ভাবতে ভাবতে চোখ গেল, নাফিসার কাঁধের ওপর রাখা মেহরাবের হাতের দিকে।
সায়মানের মাথায় আগুন জ্বলে উঠলো।দৌড়ে এগিয়ে যেতে যেতে,
“তুই… তুই ওকে ছুঁছিস কেন?”
সায়মান দৌড়ে এসে, ধাপ! একটার পর একটা থাপ্পর মারল মেহরাবকে।
মেহরাব সায়মানের নিজের থেকে সরিয়ে দিতে দিতে ,
“শুনেন! ভুল হইতেছে! সায়মান ভাই ”
কিন্তু সায়মান আর শুনছে না। পাগলের মত মেহরাবকে মারতে থাকলো । সাইফান দৌড়ে এসে সায়মানকে টেনে ধরল,
“ভাই থামো কি করছো !”
রাজিবও ধরে ফেলল,
“স্যার ! প্লিজ থামেন !”
উপরের রুম থেকে মেহেরিন দৌড়ে আসলো,
“আমার ভাইরে মারছেন কেন সায়মান ভাই। ”
নাফিসা এদিকে হাঁটতে পারছে না… শরীর কাঁপছে…সায়মানকে আমানার মত শক্তিও নেই নিজের ভিতর,
হঠাৎ,আর সহ্য করতে না পেরে জোরে চিল্লিয়ে উঠলো,
“থামো!!!!!!!”
নাফিসার কণ্ঠ শুনে সবাই চুপ হয়ে গেল। সবার দৃষ্টি নাপিসার দিকে।
সায়মানও থমকে গেল। তার চোখে পানি। মেহরাবকে ছেড়ে দিয়ে সে এক পা… দুই পা… ধীরে ধীরে নাফিসার দিকে এল।সে এক হাত দিয়ে নাফিসাকে পাকড়ে নিজের বুকে টেনে নিল। বুকে শক্ত করে টেনে নিল।
এমনভাবে, যেন আর কখনো ছেড়ে দিতে চাইবে না। নাফিসা চোখ বন্ধ করে তার বুকে ঢলে পড়ল।
মেহরাব, মেহেরিন, রাজিব, সায়ফান সবাই নিস্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।
নাফিসা সায়মানের বুকের সাথে মিশে গেল। মুখ তুলে তাকাল তার দিকে—
আর তারপর…
অধরে অধর মিলিয়ে পাগলের মতো চুমু খেতে লাগল।মাঝে মাঝে ঠোঁট সরিয়ে অস্পষ্ট গলায় বিড়বিড় করে বলল
“এই আমার বউ।
আমার জীবনের অংশ।
একে আমি হারাবো না।
কেউ নিতে পারবে না।”
সায়ফান এবার জোরে চিলিয়ে উঠলো,
“এই বাচ্চাকাচ্চারা সব চোখ ঢাকো! ঢাক বলছি! এখানে দাঁড়ায় দুইজন এমন চুমাচাটি শুরু করছে যেন নিজেরা ছাড়া পৃথিবীতে আর কেউ নাই!”
মেহরিন আর মেহরাব এর ধরে ছিলো ঠোঁটে কেটে গেছে সেটা ওড়না নিয়ে মুছে দিচ্ছলো। সায়মানের কান্ড কারখানা দেখে চোখ দুটো রসগোল্লার মতো গোল হয়ে গেছে।
রাজিব তো পাশেই মিসমিস করে হাসছে। সায়ফান আবার আরও জোরে চেঁচিয়ে বলল,
“ভাইয়া, তুমি নিলজ্জ! নিলজ্জ থেকে গেছো আরো ! আমরা তো অবিবাহিত— আমাদের কপালে একটু শান্তি রেখো। এটা কী! আমাদের সামনে এভাবে চুমাচাটি? আমরা বেঁচে থাকবো কেমনে? এই বাড়িতে মনে হচ্ছে অনেক গুলো রুম আছে— যেকোনো একটায় ঢুকে গিয়ে মান-অভিমান সব মিটায়ে আসতো। এখন পাবলিকের সামনে এইসব করা কি লাগে?”
সায়ফানের কথা শেষ হতেই সায়মান ধীরে ধীরে নাফিসার ঠোঁট থেকে মুখ সরিয়ে নিল। আগুন চোখে তাকলো সায়ফানের দিকে যে আরেকটা কথা বললেই মনে হয় তাকে তুলে ডাস্টবিনে ফেলে দেবে।
নাফিসা দাঁড়িয়ে ছিল সায়মানের বুকের খুব কাছেই। শরীর কাঁপছে ক্লান্তি, লজ্জা আর অতিরিক্ত অনুভূতির ধাক্কায় সে অর্ধেক সায়মানের বুকে হেলে পড়েছে।
হঠাৎ—
সায়মান এক ঝটকায় নাফিসাকে তুলে নিল। দুই হাত দিয়ে পুরো শরীরটা নিজের বুকের মাঝে আলতোভাবে জড়িয়ে ধরল।
নাফিসা লজ্জায় মুখ লুকিয়ে ফেলল সায়মানের কাঁধে। তার শরীর দুর্বল ও অসুস্থ শরীর আর পেরে উঠছে না। তবু এই উষ্ণ বুকে মাথা রাখতেই সে নিঃশ্বাস ফেলে শান্ত হলো।
পেছনে আবার সায়ফান বলতে শুরু করল,
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫২ (২)
“দেখো! আবার তুলে নিয়ে গেল! ভাইয়া, তুমি—”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই রাজিব তার মুখ চেপে ধরল।
“চুপ! আরেকটা কথা বললে আমাদেরও তুলে নিয়ে গিয়ে ঘরে বন্ধ করে দেবে।”
সায়মান সবার কথার তোয়াক্কা না করে সোজা সামনের রুমের দিকে হাঁটতে লাগল। রুমে ঢুকে ঠাস করে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
