চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৭
আরোবা চৌধুরী আরু
ঘরের মধ্যে তখন এক গভীর নিরবতা।
নাফিসা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল বেলকনির স্লাইডিং ডোরের কাছটায়। চোখে-মুখে এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা, শরীরে ক্লান্তির ছাপ। তবু মনটা অস্থির, একটা ঘূর্ণির মতো মনে হচ্ছিল, যেন ভেতরে কিছু একটা ঘটছে, কিন্তু ভাষায় ধরা যায় না। হঠাৎ,
“টক টক টক।”
দরজায় হালকা শব্দ।
একটা হালকা কাঁপুনি নাফিসার গায়ে বয়ে গেল।
কিছুক্ষণের জন্য নিঃশব্দ… তারপর দরজার ওপাশ থেকে গভীর, গম্ভীর এক পুরুষকণ্ঠ:
“Can I come in?”
তেমন কিছু নয়, স্রেফ অনুমতি চাওয়া। কিন্তু সেই কণ্ঠের ভেতরে যে ভার ছিল যে গাম্ভীর্য, চ জানে তার অনুমতি লাগবে না। কিন্তু পরিস্থিতির আজ অন্যরকম।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
নাফিসা যেন মুহূর্তে জমে গেল। চোখ বড় হয়ে উঠল। সেই কণ্ঠ? যে কৌতূহলের সাথে মনে রাখে। হৃদপিণ্ডটা যেন এক ঝটকায় ধক করে উঠল। এত স্পষ্টভাবে সে কখনও কাউকে অনুভব করেনি।
ধীরে ধীরে সে পেছন ঘুরে দাঁড়াল। একটুও কথা না বলে।
দরজাটা খুলে গেল।ভেতরে ঢুকল সায়মান । প্রথমে ধীর পা, তারপর পুরোটা দৃশ্যমান হল সেই দীর্ঘদেহী, গাম্ভীর্য ছড়ানো পুরুষটি।
গ্রে কালারের টাউজার। হালকা অরেঞ্জ, ওভারসাইজ টি-শার্ট, হাতাটা কনুইয়ের নিচে গুটানো, ক্লাসিক ঘরোয়া অথচ এক অদ্ভুত সৌন্দর্যে জড়ানো। চুলগুলো কিছুটা এলোমেলো, কপালের উপর এসে নেমে আছে।
নাফিসা থমকে দাঁড়িয়ে গেল।
তাকে আগে দেখেছে, কিন্তু এমন রূপে নয়। আজ এই মানুষটাকে দেখল যেন অন্য আলোয়। কী জানি কোথা থেকে এক কিশোরী লাজুকতা এসে মনের ভেতর ঝাঁপিয়ে পড়ল। বুকের মধ্যে দপদপ করে উঠতে লাগল কিছু। সে চোখ সরাতে পারল না,ঠিক যেন কোথাও আটকে গেছে। নাফিসা হা করে তাকিয়ে আছে।
ওর এমন করে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখেে, সায়মান একটু ভুরু কোঁচকালো।
“Are you okay?”
তাঁর গলা যেন থেঁতলে দিল সমস্ত কল্পনার ঘোর।
নাফিসা চমকে উঠল।
“আমি… আমি ঠিক আছি।”
সে মাথা নিচু করে নিল দ্রুত। চোখ সরিয়ে ফেলল, গাল গরম হয়ে উঠেছে, লজ্জায়, অস্বস্তিতে, আর নিজেকে ধমক দেওয়ায়।
সায়মান এবার পুরোপুরি ভেতরে চলে এলো। দরজাটা নিজের হাতে আলতো টেনে বন্ধ করে দিল। এরপর চোখ রাখল নাফিসার উপর।
ওড়নাটা মাথায় পেঁচানো, মুখটা অর্ধেক ঢাকা, মেরুন রঙের আনারকলি আর চুড়িদারে মোড়া সেই পাতলা শরীরটা ভয়ে ভয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মুখ নিচু, কিন্তু এক পলক চাহনিতেই যেন মন পড়ে যাওয়া যায়।
সায়মান চোখ সরাল না, ধীরে ধীরে দুই হাত বুকের সামনে ভাঁজ করল। একটা গম্ভীর অথচ নরম কণ্ঠে বলল,
“তোমার সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিল। কালকে তোমাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেব। তুমি রিশার সাথে যাবে। সব ডকুমেন্ট আমি আজ রাতের ভেতরে আনিয়ে নেব।”
নাফিসা চোখের কোণ দিয়ে তাকাল। কিছু বলবে কি বলবে না, বুঝে উঠতে পারছে না। সায়মান আরও বলল,
“আর বিকেলে রেডি থেকো। রুহি আর রিশার সাথে যাবে শপিংয়ে। তোমার যা যা প্রয়োজন লিস্ট করে নিও।”
সায়মান বলেই থামল, নাফিসার প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করল।
নাফিসা মাথা নিচু রেখেই এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল,
“আপনি আমাকে একটা সরকারি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিন। আমি রিশা আপুর স্কুলে যাব না। আর আমার কিছু লাগবে না। আসার সময় স্যার অনেক জামা দিয়েছিলেন… ওগুলোই যথেষ্ট। আপনি প্লিজ আমার পেছনে এত খরচ করবেন না। আর… একটা কাজ খুঁজে দিন আমাকে। আপনাদের এখানে কতদিন থাকবো জানি না।”
এই কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠ থরথর করে কাঁপছিল। গলায় যেন চেপে বসেছে একটা অজানা আতঙ্ক আর দায়বদ্ধতার বোধ।
সায়মান তার দৃষ্টিটা নরম করল না।
দুই হাত বুকের সামনে ভাঁজ করে ঠান্ডাভাবে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ এমনভাবে তাকিয়েই রইল, চোখে সন্দেহ, জিজ্ঞাসা, চাপা ক্রোধ। তারপর গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করল,,
“তোমাকে কেউ কিছু বলেছে?”
নাফিসা দ্রুত মাথা নাড়ল,
“না… কেউ কিছু বলেনি।”
“তাহলে?”
“…আসলে, আপনি আমার জন্য অনেক করছেন। আমি আর… আপনার বোঝা হতে চাই না।”
এই শেষ কথাটুকু বলতে বলতে তার গলাটা ভার হয়ে গেল। ঠোঁট কেঁপে উঠল। সায়মান চোখ সরালো না। তারপর বলল,,
“বেশি কথা আমার পছন্দ না। তুমি যতদিন না বড় হচ্ছ, ততদিন তুমি আমার দায়িত্ব। ছোট মানুষের এত কথা বলতে হয় না। পিচ্চি পিচ্চির মতো থাকো। যা বলেছি, তাই করবে।”
নাফিসা এবার কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। হালকা করে ঠোঁট ফাঁক করে বলতে গিয়েই,,
“কিন্তু আমি—”
“Enough.”
সায়মানের গলা এবার কিছুটা কঠিন।
“এক কথা বারবার রিপিট করতে ভালো লাগে না আমার। আমাকে রাগাবে না।”
এই কথাগুলোর গম্ভীরতা এতটাই ঠান্ডা ছিল যে নাফিসা কেঁপে উঠল। সত্যি, সে চমকে উঠল একেবারে। একটু আগেও যে মানুষটা সুরেলা গলায় কথা বলছিল, হঠাৎ তার এমন তীব্র ধমক কেন?
সে চোখ নামিয়ে ফেলল একদম, মুখ ঘুরিয়ে নিল। বুকের ভেতর যেন একটা গুমোট কান্না জমে থাকল।
সায়মান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল তার দিকে। তারপর গলার স্বর স্বাভাবিক করে বলল,
“টাইম মতো বিকেলে রেডি হয়ে থেকো। আর কোন প্রবলেম হলে আমায় বা আম্মুকে জানাবে, ঠিক আছে?”
এই বলে সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে হাঁটতে লাগল। দরজার সামনে গিয়ে একবারও পিছন ফিরে তাকাল না। দরজা খুলল। ধীরে ধীরে আবার নিজেই টেনে বন্ধ করে দিল।
ঘরটা আবার চুপচাপ হয়ে গেল।
নাফিসা দাঁড়িয়ে আছে। মাথা নিচু, এক হাত বুকের উপর। কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করছে যেন। তারপর ধীরে ধীরে সে বুকের কাছে হাত রাখল, নিঃশ্বাস ফেলল গভীরভাবে।
“এই মানুষটার সামনে এলেই কেন জানি বুক কেঁপে ওঠে… শরীর ঠান্ডা হয়ে আসে… অথচ মন এক অজানা উষ্ণতায় ভরে যায়।”
তার মাথার ভেতর একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে,
“এটা কী? কেন এমন হচ্ছে?” তার ছোট মস্তিষ্ক বুঝে উঠতে পারছে না।
সে নিজেও জানে না।
কিন্তু আল্লাহ তো জানেন।
হয়তো এটা সেই বন্ধন যে বন্ধন শুধুই হালাল সম্পর্কের মধ্য দিয়ে হয়। বিয়ের মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের মধ্যে এমন টান তৈরি করে দেন… যার ব্যাখ্যা মানুষ নিজেই খুঁজে পায় না। যা বোঝে না বয়সের ব্যবধান।
নাফিসা জানে না কীভাবে, জানে না কেন,কিন্তু এই মানুষটার সামনে এলেই মনে হয় যেন,,
“আমি নিরাপদ। আমি বেঁচে আছি। আমি… কোনো এক পরিচিত অথচ অপার ভালোবাসার আশ্রয়ে দাঁড়িয়ে আছি।”
বাইরে বৃষ্টি থেমেছে কিছুক্ষণ হলো, কিন্তু বাতাসে এখনও বৃষ্টির গন্ধ। জানালার পাশে রাখা ছোট্ট একটা মানকচুর গাছ দুলছে হালকা বাতাসে। পেছনের স্টাডি রুমটা বেশ নিরিবিলি। চারদিক শান্ত, শুধু ঘড়ির কাঁটার একঘেয়ে টিক-টিক শব্দ আর মাঝে মাঝে ছাদের টিনে পড়ে থাকা বৃষ্টির জল ফোঁটা ফোঁটা করে টুপটাপ করে পড়ছে।
রিশা বসে আছে স্টাডি রুমে, টেবিলের উপর খোলা আছে জীববিজ্ঞান বইটা, কিন্তু বইয়ের পাতায় মন নেই তার। এক ভাবনার জগতে হারিয়ে গেছে সে। চোখ সোজা সামনের দিকে, বুকের বাঁ পাশটায় যেন ধক ধক করে কিছু একটা চলেছে।
সামনের চেয়ারে বসে আছে সে।
একটা তামাটে গায়ের রঙের পুরুষ।
শ্যামলা নয়, আরও একটু ডিপ, একটা উষ্ণ বাদামি ছায়া যার গায়ে লেগে থাকে সারাক্ষণ। পরনে পুরনো একটা চেক শার্ট, হাতার গুটিয়ে রাখা, কিন্তু তার শরীরে এমনভাবে মানিয়ে গেছে যেন পোশাকটা তার নয়, সে পোশাকের।
চুলগুলো একটু অগোছালো, চোখজোড়া গভীর, ভাবলেশহীন কিন্তু স্থির। একদৃষ্টে তার খোলা খাতায় কিছু লিখছে। মাঝে মাঝে থামে, ভাবে, আবার লিখে চলে।
রিশার চোখ পড়ে আছে তার হাতে, কলম ধরার ভঙ্গিটা কী শান্ত, কী স্থির।
হঠাৎ কলমটা থেমে গেল। মনে হচ্ছে তাকে কেউ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
মাথা উঠিয়ে আকাশ সরাসরি তাকাল রিশার দিকে।
রিশা তখনও তাকিয়ে আছে ওর দিকে, ঠিক বলা চলে হা করে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টি কারও নজর এড়ায় না, আকাশেরও এড়ায়নি।
সে ভুরু কুঁচকে ফেলল সঙ্গে সঙ্গে।পরক্ষণেই টেবিলের ওপর থাকা তুরি বাজালো দুবার টক টক করে।
চমকে উঠলো রিশা!
“কি? এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? তোমার পড়া কমপ্লিট? পড়া দাও, পড়া কমপ্লিট হলে।”
রিশা ধরা পড়ে গেছে। তবু হাসি থামায় না। দাঁত বের করে বলল,
“আপনাকে পড়ছিলাম তো স্যার! আপনি ডিস্টার্ব করলেন! আপনি প্রশ্ন করুন, আপনার কথায় কি আছে না আছে, সব বলে দিতে পারব।”
আকাশ চোখ সরু করল, ঠোঁটে একটুকরো অবিশ্বাস ঝুলিয়ে বলল,,
“কি বলছো তুমি?”
রিশা আবারও সেই কচি-মুখের, নেকি হাসিটা দিয়ে বলল,
“কিছু না স্যার! কিছু বলছি না। আরেকটু হলেই হয়ে যাবে।”
আকাশ তার খাতাটা বন্ধ করে বলল,,
“ওকে। পড়া কন্টিনিউ করো। তোমার পড়া শেষ হলে আমাকে যেতে হবে। আমার আরও টিউশনি আছে।”
রিশা মুখ টেনে বলল,
“এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন স্যার?”
আকাশ এবার একটু অবাক হয়ে তাকাল,,
“মানে?”
রিশা সামলে বলল,
“মানে স্যার বলছিলাম, সময় কত তাড়াতাড়ি চলে যায়! মনে হলো, আপনি তো এখনই এলেন, এরমধ্যেই দুই ঘণ্টা গেল!”
আকাশ একটু হাসল না, বরং গাম্ভীর্য রেখেই বলল,
“হ্যাঁ, ঠিক বলেছো। এতক্ষণ ধরে তুমি আমাকে একটা পড়াও দাওনি! এভাবে চললে, তোমার আম্মুর কাছে আমি কমপ্লেইন দিয়ে যাব।”
রিশা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আরে স্যার, এত সিরিয়াস হচ্ছেন কেন? কাল থেকে ঠিক করে পড়া দেব। আপনি শুধু একটু ভালোবেসে আমার সাথে কথা বলবেন।”
আকাশ থমকে গেল।
“কি বললে তুমি?”
রিশা তড়িঘড়ি করে কণ্ঠ পাল্টে ফেলল,
“কিছু না! কিছুই বলিনি স্যার! আমি শুধু বললাম, আম্মুর কাছে কমপ্লেইন দেওয়ার দরকার নেই। আমি ভদ্র মেয়ের মতো আপনার সব পড়া করে দেব কাল থেকে।”
আকাশ এবার আর কিছু না বলে বলল,
“মনে থাকে যেন। আজকের মত,, আল্লাহ হাফেজ।”
এই বলে পিঠে রাখা ব্যাগটা কাঁধে চাপিয়ে বেরিয়ে গেল চুপচাপ।
রিশা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ওর যাওয়ার দিকটায়। বুকের বাঁ পাশে হাত রেখে বলল,
“তোর ব্ল্যাক ডায়মন্ড তো তোকে দেখতেই পায় না!”
তারপর মাথা নিচু করে মনের ভেতরে গুনগুন করল,
“আল্লাহ… আমার ব্ল্যাক ডায়মন্ড আমাকে কবে বুঝবে?”
“আল্লাহ, আমার ক্রাশটে তুমি হেদায়েত দাও।”
“আমাকে বোঝার ক্ষমতা দাও।”
“আল্লাহ, এমন কিছু উনার ভিতরে দিয়ে দাও যাতে উনি আমার পেছনে পাগলের মত ছুটে বেড়ান।”
“আমাকে ছাড়া আর কাউকে যেন চোখে না দেখেন… কবুল করে নাও আল্লাহ, মাবুদ…”
তার চোখে তখন লুকিয়ে থাকা স্বপ্নের জল, হাসির নিচে গুমরে ওঠা ব্যথার আস্তরণ।
আকাশের পেছনে কোনো সোনালি পরিবার নেই। সে একটা সাধারণ ছেলের মতো বড় হয়েছে। তার বাবা রাশিদ কম্পানিতে চাকরি করেন মধ্যবিত্ত, সাদাসিধে জীবন।
আকাশ অনেক ছোট বয়স থেকে নিজের পড়ার খরচ নিজেই চালায়, অনেকগুলো টিউশনি করে, তার মধ্যে একটা এই রিশার টিউশনি।
সে এখন অনার্স চতুর্থ ইয়ারে। সায়ফানের অনেক ভালো বন্ধু। ছোটবেলা থেকেই আসা-যাওয়া এই বাড়িতে। তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল, আকাশ একবার তার বাবার সাথে অফিসে এসেছিল, তখন সায়ফানের সাথে পরিচয়। কথায় কথায় দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। আজ সেটা গাঢ় হয়েছে।
সায়ফান অনেক মিশুক, সেও আকাশকে পরিবারের মতোই দেখে।
রিশা?
সে তো এখন উঠতি বয়সের এক কিশোরী তরুণী। বুকের মধ্যে একতরফা ভালোবাসার ফুল ফোটে, যার সুগন্ধ একমাত্র সে-ই পায়, যাকে ভালোবাসে সে নয়।
আর রিশার একটা দুর্বলতা আছে, ডার্ক স্কিনড ছেলেদের জন্য এক অদ্ভুত ক্রাশ।
আকাশের ব্যক্তিত্ব, ব্যবহার, ঠান্ডা মাথার ভদ্রতা, এসব দেখে সে আরো গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলে।
কিন্তু একতরফা ভালোবাসা কি সবসময় পরিণতি পায়?
আকাশ আর রিশার মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য।
একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের মাটির ঘ্রাণ মাখা বাস্তববাদী ছেলে।
আরেকজন সম্ভ্রান্ত ঘরের কন্যা, যে এখনো বাস্তবতাকে সিনেমার মতো দেখে।
রিশার মাথায় এখনো বাস্তবতা এসে ঠেকেনি। সে জানে না, এই প্রেমে কাঁটাও আছে। এখন সে শুধু ভালোবাসার স্বপ্ন দেখে।
ভালোবাসা হয়তো পবিত্র, কিন্তু সমাজের হিসাব-নিকাশ পবিত্র নয়।
এই প্রেমের ভবিষ্যৎ?
কেউ জানে না।
হয়তো শুধু আল্লাহ জানেন।
বিকেল, ঠিক পাঁচটা বাজতে চলেছে।
আকাশ রঙের একটা বিকেল যেন জানালার বাইরে গড়িয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। পশ্চিম দিকের আকাশে রঙিন তুলির আঁচড়ে কেউ যেন সিঁদুরি কমলা আর ধোঁয়াটে সাদা মেখে দিয়েছে। পাখিরা গাছের ডালে ফেরার পথে। একটা নিঃশ্বাস ফেলে বিকেল বলছে,
“আজকের দিনটা ফুরোচ্ছে…”
বাড়ির ভেতরে সেই নরম আলো এসে পড়েছে নাফিসার রুমের জানালার পাশে রাখা টেবিলের ওপরে। ল্যাম্প জ্বালানো হয়নি, প্রয়োজনও নেই। আলো এমনিতেই পর্যাপ্ত। নাফিসা একটা রঙিন বই হাতে নিয়ে পড়ছে, পুরনো উপন্যাস, পাতাগুলো হালকা হলদে, কাগজের গন্ধে মিশে থাকা সময়ের গল্প।
সে পড়ায় ডুবে আছে। নাফিসা উপন্যাসে হারিয়ে যেতে জানে। সেখানে কারও প্রেম থাকে, কারও হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন, কেউ মরে যায় গল্পের শেষ পাতায়, কেউ হঠাৎ ফিরে আসে… আর সে প্রতিটা পৃষ্ঠা চোখ বুঁজে অনুভব করে। মনে হয় যেন সেই চরিত্রের সাথে সে নিজেও খানিকটা হাঁটছে।
ঠিক তখনই…
“ধপপপ!”
একটা শব্দ, হঠাৎ ঘরের নিস্তব্ধতায়।
নাফিসা চমকে তাকায়। বিছানায় মুখ থুবড়ে শুয়ে পড়েছে রিশা! যেন একটা মানুষ নয়, একটা ঝড় এসে আছড়ে পড়েছে এই ঘরের ভেতরে।
চোখ তুলে দেখে জিন্স পরা, হাঁটু পর্যন্ত একটা কুর্তি গায়ে। চুলগুলো সোজা করা, পুরো মাথা ভরে খুলে রেখেছে কানের দুলে হালকা ঝুমঝুম শব্দ। ঠোঁটে হালকা পিচ শেডের লিপস্টিক। চোখে ছোঁয়া একটা কাজল। দেখে মনে হচ্ছে, আজ ওর কোথাও যাওয়ার কথা ছিল।
রিশা হঠাৎ শোয়া থেকে লাফিয়ে উঠল, বিছানার পেছনে গা ঘুরিয়ে বসে এক নিঃশ্বাসে বলে উঠল,
“এই তুই এখনো রেডি হোসনি! দা ভাইয়া কিন্তু রেগে যাবে! নিচে ওয়েট করছে আমাদের জন্য! আমি আর রহি আপু রেডি, ! কেন রেডি হসনি এখনো? ঝটপট রেডি হ! আমরা শপিংয়ে যাবো, এখনি যাবো! দেরি করলেই ভাইয়া…!”
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে ও থামে। নাফিসার দিকে তাকিয়ে থাকে।
নাফিসা এতক্ষণ হা করে তাকিয়ে আছে রিশার মুখের দিকে। এত কথা কীভাবে বলে এক মেয়ে? মনেই হয় না সে নিশ্বাস নেয় মাঝে মাঝে! রিশাকে না দেখলে ও হয়তো বুঝতো না কখনো।
নাফিসা আস্তে বলল,
“আপু, আমি যাব না। আমার অনেক জামা আছে…”
কথা শেষ হবার আগেই রিশা বিছানা থেকে উঠে এসে ওর পাশে দাঁড়াল।
“না মানে কী??”
একহাতে ওকে দাঁড় করিয়ে দিল, অন্য হাতে ধাক্কা দিয়ে বলল,,
“ওয়াশরুমে যা! রেডি হ হ হ হ!! না হলে আমি এখনি গিয়ে দা ভাইয়াকে বলব! উনি এসে তোর অবস্থা কীরকম করবেন তখন বুঝবি!”
নাফিসা কিছু বলতে চায়, কিন্তু রিশা তখন চারপাশ খুঁজছে। চোখ চলে গেল বিছানার নিচের দিকে।
“এই যে! ব্যাগটা!”
ও দ্রুত হাঁটু মুড়ে বসে ব্যাগের চেইন খুলে একটা ঝকঝকে সাদা আনারকলি বের করল। জামার ঘেরটাতে সূক্ষ্ম সোনালি এমব্রয়ডারি করা, দেখে মনে হয় একদম ঈদের জন্য কেনা।
নাফিসা ভ্রু কুঁচকে বলল,,
“এইটা নতুন… আমি…”
“একদম চুপ! এটা পরবি! দুই মিনিট দিলাম! যদি নিচে না আয়, তুই জানিস না রিশা কী করতে পারে!”
ও বলেই ওকে জামা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বাথরুমের দিকে ঠেলে পাঠিয়ে দিল।
নাফিসা দরজা বন্ধ করতেই রিশা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে জোরে বলল,
“দুই মিনিট!! আমরা নিচে ওয়েট করছি! প্লিজ দেরি করিস না প্লিজ!!”
তারপর সে খিলখিল করে হেসে চলে গেল।
ঘর আবার নীরব হয়ে গেল।
নাফিসা বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে হাত বোলাচ্ছে। মুখে জল ছিটায়, তারপর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
“আহ্… তাই আর কী করার… এখন তো রেডি হতেই হবে…”
সে তখন পড়ছিল হুমায়ূন আহমেদের ‘জোছনা ও জননীর গল্প।ই লোকটাই তো…”
“সাভার থেকে এসে ধমক দেয়!”
“বলবে, ছোট মানুষের এত কথা বলতে হয় না!”
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬
“পিচ্চি পিচ্চির মতো থাকো!”
নাফিসা নিজের অজান্তেই মুচকি হেসে ফেলে।
জানালার বাইরে তখনও আলো কমছে, পাখিরা ফিরছে।
আকাশ গাঢ় হচ্ছে ধীরে।
