Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ৫২

জাহানারা পর্ব ৫২

জাহানারা পর্ব ৫২
জান্নাত মুন

আমি রিনরিন স্বরে দাদি বলে ডাকতেই তৎক্ষণাৎ দাদির থেকে প্রতিত্তোর আসলো।আমি তব্দা লেগে গেছি!ইফান হাসছে, তার দেহের কম্পনে অনুভব করতে পারছি।আমি বাক হারা!মানে দাদি সজাগ ছিলো!!আমি তো এইটুকু ভেবে নিশ্চিন্ত ছিলাম যেহেতু তিনি প্রতিদিন ঘুমানোর ওষুধ খায়,তাহলে নিশ্চয়ই আজও তাই খেয়ে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু এটা কি হলো!!আমি আচমকা হেঁচকি তুলে কেঁদে উঠলাম।ইফান নিজের হাসি আটকে আমাকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে উঠলো।আমি ইফানের বুকে কিল-ঘুষি দিচ্ছি।আমি নাক টেনে হেঁচকি তুলতে তুলতে ইফানকে ফিসফিস করে বললাম,

–” হা’রা’মির বাচ্চা, দাদি সব শুনে নিয়েছে।”
–“নারে বউ আমি কিছু শুনি নি।”
আবার দাদির কন্ঠ কানে আসতেই এ্যা এ্যা করে লজ্জায় কেঁদে দিলাম।ইফান নিজের হাসি থামিয়ে বললো,”কিছুই শুনে নি জান।শুনলেও লাভ নাই।তোমার জামাইয়ের আদরের ভাগ এই বুড়ি পাবে না।”
–“শা’লার ভাই,তুই চুপ কর। খা’ই’ষ্টা বেডা কোথাকার।তোর উপর আল্লাহর গজব পড়বে,বলে দিলাম।”
লাজ লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে আমার।এতক্ষণ যে আমি আর ইফান ঘনিষ্ঠ মূহুর্ত কাটিয়েছি আরও যা যা আমাদের মধ্যে কথাবার্তা হয়েছে সব দাদি….!!!আস্তাগফিরুল্লা, আস্তাগফিরুল্লা।আর কিছু ভাবতে পারছি না।ইচ্ছে করছে ম’রে যায়।আল্লাহ্ আমাকে তুলে নাও।আমি এই মুখ নিয়ে দাদির সামনে কিভাবে আসবো!মনে মনে আহাজারি করতে করতে আড় চোখে দাদির দিকে তাকালাম।তিনি এখনো আমাদের পিঠ দিয়ে শুয়ে আছে।আমি চোখ বন্ধ করে ঠোঁট কামড়ে পড়নের চাদারটা দিয়ে মুখ লুকাতে চাইলাম।

আমার এমন বেহাল অবস্থা দেখে ইফান আমার উপর থেকে সরে গেলো।অতঃপর কোমরে একটা টাউয়াল পেচিয়ে নিলো।আমি এখনো তব্দা মেরে পড়ে আছি মুখে চাদর টেনে।একটু আগে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা লাজের কান্নাও থেমে গেছে। দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা।শাড়ি আর ব্লাউজ শরীরে নেই।বান্দরটা না জানি কোথায় ডিল মেরে ফেলে রেখেছে।হঠাৎই ইফান আমাকে চাদরে মোড়ানো অবস্থায় কোলে তুলে নিলো।আমি তৎক্ষনাৎ চোখ মেলে ইফানের দিকে তাকালাম।অন্ধকারের মধ্যে মিহি আলোয় লোকটার লাল চোখদুটো ঝলমল করছে।আমি শুকনো ঢুক গিলে ফিসফিস করে বললাম,

–“ককি করছ তুমি?”
–“রুমে চল বাকি কথা আমাদের বেডরুমে হবে।”
বলতে বলতে ইফান তার নাক দিয়ে আমার নাকে ঘষলো।আমি বিরক্তি নিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলাম।ইফান হালকা হেসে তার বুকের সাথে আমাকে চেপে ধরে রুমে চলে আসে।
মাঝ রাতের এই ঘটনাটা ভাবতেই আমার সারা দেহে শিহরণ বয়ে গেলো।আমি কম্ফর্টার দিয়ে নিজেকে মুড়িয়ে বেডের মাঝখানে ঘাপটি মেরে বসে এসব ভাবছি।শীতকাল পড়েছে এখনো আহামরি শীত না পড়লেও রাত আর সকালে ভালোই ঠান্ডা পড়ে।আর এই শীতেও ইফাইন্না হা’লার পুতের জন্য আমাকে ফরজ গোসল করতে হয়েছে।শেষ রাতে আমাকে আধমরা বানিয়ে ফ্রেশ করে নিজেও ফ্রেশ হয়ে নিয়েছে।আমি ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে একটু ঘুমিয়েছিলাম।কিন্তু এক দেড় ঘন্টার বেশি ঘুমাতেও পারি নি।স্বপ্নেও গতরাতের দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে।তার সাথে আরেকটা ভ’য়ংকর স্বপ্ন দেখেছি।যেখানে একটা ছায়া আমার দিকে ধারালো ছুরি হাতে নিয়ে পিছন থেকে এগিয়ে আসছে।আর এই স্বপ্নটা দেখারও কারণ আছে।গতকাল মাঝরাতে ইফান যখন আমাকে রুমে নিয়ে আসছিলো তখন আমি অনুভব করি কেউ আড়াল থেকে দেখছে।ইফান যখন সিড়ি বেয়ে উপরে উঠছিল তখন মনে হয়েছে পেছনে কেউ আছে।আবার মনে হয়েছে দোতলার রেলিঙের কাছে কেউ দাঁড়িয়ে উপর থেকে আমাদেরকে দেখছে।এমনকি আমি একটা ছায়াও দেখতে পাই রুমের কাছে।সত্যি বলতে তখন আমার শরীরটা নেতিয়ে ছিলো।আমি ভয়ও পেয়েছিলাম কিছুটা।হয়তো শরীর খারাপ থাকার কারণে এমনটা হয়েছিলো।আমার শরীরে কাঁপনও ধরেছিলো।ইফান আমার এমতাবস্থা দেখে নিজের বুকের সাথে আরও চেপে ধরে।আমিও ঘাপটি মেরে ওর বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে ছিলাম রুমে আসা অব্দি।

ইফান আমার এমন অবস্থা দেখে আর ঘনিষ্ঠ হয় নি।দু’জনই শাওয়ার নেই।অতপর ইফান আমাকে তার বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে।
আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি ইফান রুমে নেই।আমিও সেই থেকে সাদা কম্ফর্টারটা জড়িয়ে বেডের মাঝখানে বসে।আমার মুখটা ছাড়া মাথা সহ সারা দেহ ঢাকা।হঠাৎই ফোনটা বেজে উঠে। আমি তাড়াতাড়ি ফোনটা হাতে নিতেই দেখি তন্নি কল করেছে।ফোন রিসিভ করতেই তন্নি বলে উঠলো,,,
–“কিরে জাহান আজ কি ভার্সিটি আসবি না?”
–“মন চাইতাছে না।”
–“আরে বোইন আজ মিস দিস না।আজতো আমাদের লেখা অ্যাসাইনমেন্টটা জমা দিতে হবে।চলে আয় বোইন প্লিজ প্লিজ।”
আমি ঠোঁট উল্টে একটু ভাবতে লাগলাম কি করা যায়।তখনই তন্নি আবার বললো,”জাহান চলে আয় না-রে।আমি নাহলে একলা অনাথের মতো ভার্সিটিতে বসে কি করবো!”

–“আচ্ছা আমি আসবো।”
কথা শেষ করতে না করতেই ইফানের কন্ঠ কানে আসলো,”ভার্সিটিতে যাবা।রেডি হয়ে নাও। আমি অফিস যাওয়ার সময় ড্রপ করে দিয়ে যাব।”
আমি ফোনটা বেডে রেখে ইফানের দিকে তাকালাম।ইফান হুডি পড়ে আছে।যা শরীরে আষ্টেপৃষ্টে লেগে আছে।ইফান রুমে এসে হুডিটা খুলে ফললো। উন্মুক্ত হলো পেশিবহুল দেহ।ফর্সা বুকে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে।আগের থেকে কিছুটা মোটা হওয়ায় আগের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হয়েছে।আমি দৃষ্টি সরিয়ে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ঢোক গিললাম।মানতে হবে লোকটা সুদর্শন।আমি অন্যদিকে তাকিয়ে মুখ মুচড়ে বললাম,

–“আমি নার্সারিতে পড়ুয়া বাচ্চা নই যে আমাকে ড্রপ করে দিয়ে আসতে হবে।”
ইফান আমার কথা শুনতে শুনতে টি-টেবিল থেকে গ্লাসটা নিয়ে ঢকঢক করে পুরো গ্লাসের পানিটা শেষ করে দিলো।অতঃপর বেডে হাঁটু গেড়ে আমার সামনে বসলো।আমি তার দিকে চোখ তুলে তাকাতে না তাকাতেই আমার ঠোঁটে শব্দ করে চুমু খেলো।আমি তাড়াতাড়ি মুখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে নাক ছিটকালাম।ইফান ঠোঁট কামড়ে হাসলো।তারপর খুব মনযোগ দিয়ে আমার ফেইসের দিকে তাকিয়ে রইলো।আমি ইতস্তত বোধ করলাম।ইফান তার হাতের উল্টো পৃষ্ঠ দিয়ে আমার ডান গালে যেখানে ওর কামড়ের দাগ আছে সেখানে আল্ত করে ছুঁইয়ে দেয়।তার হাতটা আমার মাথার পেছনে নিয়ে আমাকে তার দিকে টেনে গালের সেই দাগটার উপর শব্দ করে চুমু খেলো।আমি ওর হাত ছাড়িয়ে বিরক্তি নিয়ে বললাম,

–“উফফ অসহ্যকর!”
আমি বিছানা থেকে উঠে যাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে গেলাম।তৎক্ষনাৎ কম্ফোর্টারটা শরীর থেকে সরে বেডে পড়তেই দৃশ্যমান হলো ইফানের নেভি কালার টিশার্টটা।যা আমার হাঁটু পর্যন্ত ঢেকে আছে। ওভার সাইজ হওয়ায় এক কাঁধ থেকে পড়ে আছে।আমার ফর্সা দেহে বেশ মানিয়েছে।চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে।আমি আগে এলোমেলো হাতে চুলগুলো একসাথে করে খোপা করতে চাইলাম।তার আগেই ইফান টান মেরে তার কোলে তুলে নিলো।আচমকা ঘটনাটা ঘটায় আমি দু’হাতে ইফানের গলা আর দুপা দিয়ে কোমর জড়িয়ে ধরলাম।চোয়াল শক্ত করে চেচিয়ে উঠলাম,

–“সকাল সকাল হচ্ছে টা কি!!”
ইফান কথা ব্যয় না করে আমাকে নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের উপর বসালো।মিররে আমার ব্যাক সাইট আর ইফানের ফ্রন্ট সাইট দেখা যাচ্ছে।ইফান আমার গলার লালচে দাগগুলো আর গালের কামড়ের দাগে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো।অতঃপর আমার কানে ঠোঁট রেখে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,
–“মাই ডিয়ার ফা*কিং বুলবুলি,আজ তোমাকে প্রোপার্লি মিসেস ইফান চৌধুরী লাগছে ।”

ইফানের এহেন কথা শুনে আমি ঘাড় বাকিয়ে আয়নার দিকে তাকালাম। তক্ষুনি আমার চোখদুটো বড় বড় হয়ে গেছে। সারা গলা ঘাড়ে অসংখ্য ছোপ ছোপ লালছে দাগ।তার চেয়েও বেশি নজরে পড়েছে গালে কামড়ের দাগ।দাঁতগুলো গালে বসে আছে।কেউ দেখে বলবে কোনো প্রাণী কামড়েছে।ছি ছি ছি আমি এভাবে সবার সামনে কি করে যাব!!আমি ইফানের দিকে ফিরে চেহারায় বিরক্তি প্রকাশ করলাম।তারপর ইফানের বুকে ধাক্কা মেরে আমার থেকে একটু দূরে ঠেলে ড্রেসিং টেবিল থেকে নেমে পড়লাম।ইফান কিছু বলার আগেই বিরবির করলাম,
–“জানো*য়ার একটা।”
–“তোমারই।”
আমার আস্তে বলা কথাটাও ইফান শুনে প্রতিত্তোর করলো।আমি কানে তুললাম না।ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যেতে নিলেই পা দু’টো থেমে যায়।আমি ঠিক করে হাঁটতেও পারছি না।আমার হাটঁতে সমস্যা হচ্ছে দেখে ইফান সাহায্য করতে আসলো।আমি রাগ দেখিয়ে বকতে বকতে ওয়াশরুমে চলে গেলাম।

লিভিং রুমে সকলেই উপস্থিত আছে।ইকবাল চৌধুরী, ইরহাম চৌধুরী, ইমরান আর মাহিন চা খেতে খেতে রাজনীতি আর বিজনেস নিয়ে আলোচনা করছে।পলি আর কাকিয়া রান্নাঘরে।কাজের মেয়ে লতা তাদের কাজে সাহায্য করছে।ইতি আর মীরা হয়তো রুমে।নুলক চৌধুরী কারো সাথে ফোনে কথা বলে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে।নাবিলা চৌধুরীও লিভিং রুমে এসে হাজির হলো।দুই বোন পাশাপাশি সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসলো।তারপর ফিসফিস করে কিছু একটা আলোচনা করছে।
পলি দুজনকে চা দিচ্ছে তখনই আমি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসলাম। আমি ভার্সিটি যাওয়ার উদ্দেশ্যেই হালকা পিংক কালারের মধ্যে আরও কয়েকটা কালারের কম্বিনেশনের একটা শাড়ি পড়ে।দেহের অস্বস্তিকর দাগগুলোকে লুকানোর জন্য কলার ব্লাউজ পড়েছি।তাই গলা ঘার সবটা ঢাকা।তার সাথে বাসা থেকে বের হলে মুখে মাস্ক পড়ে বের হব। আমাকে দেখে পলি সিঁড়ির কাছে আসলো।

–“ভাবি আজও কি ভার্সিটি যাবে।তোমার জন্য চা,,”
পলি হঠাৎই থেমে গেলো।আমি পলির সামনে দাঁড়িয়ে।সে আমার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে। আমি শুকনো কাশলাম। পলি চা আনছি বলে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।আমি কাঁধে শাড়ির আচলটা কাঁধে আরেকটু টেনে নাবিলা চৌধুরীর পাশের সোফায় গিয়ে বসলাম। নাবিলা চৌধুরী কারো উপস্থিতি পেয়ে আড় চোখে তাকালো।আমিও একই ভাবে ওনার দিকে তাকালাম। নাবিলা চৌধুরীর চোখে পড়লো আমার গালের দাগটা।তিনি চোখমুখ বিকৃত করে আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বলল,
–“ছিহ্!”
আমি চোয়াল শক্ত করে ফেললাম।উনার গলার নিচে উঁকি মারতেই চোখে পড়লো হালকা লালচে দাগের। আমিও একই ভাবে চোখ মুখ বিকৃত করে আরেক পাশে মুখ ফিরিয়ে বললাম,

–“ছিহ্!”
নাবিলা চৌধুরী আবারও আমার দিকে তাকিয়ে মুখ মুচড়ে বললো,
–“ছিহ্!”
আমিও একইভাবে বললাম, “ছিহ্!”
দুজন দুই দিকে মুখ ফিরিয়ে বসে রইলাম। পলি আমাকে চা এনে দিলো।আমি ওর থেকে চা নেওয়ার সময় পলি আমার গালের দাগটাকে ইশারা করলো।আমি মুখ ভার করে চোখের ইশারায় বুঝালাম কি আর করবো বোন,বল।তখনই নকুল চৌধুরী পলিকে জিজ্ঞেস করলো,
–“এই মেয়ে বড় মা কোথায়?”
–“আন্টি, সকালে দাদির রুমে গিয়ে দেখি ঘুমাচ্ছে।আমি আস্তে করে ডাক দিয়েছিলাম।তখন দাদি বললো সারারাত ঘুম হয়নি এখন ঘুমাবে।”
আমি ফোন টিপতে টিপতে চা খাচ্ছিলাম।পলির কথাটা কান অব্ধি আসতেই আমার কাশি শুরু হয়ে গেলো।সবাই আমার দিকে তাকালো। আমি কেশেই যাচ্ছি। হঠাৎই পিঠে কারো হাতের স্পর্শ পেলাম।আমি ঘাড় কাঁধ করে সেদিকে তাকাতেই ইফান বলে উঠলো,

–“Do you feel better now,বেইবি?”
–“হু,,”
আমি সংক্ষিপ্ত উত্তর করলাম।নাবিলা চৌধুরীর বিষয়টা ভালো লাগলো না।নকুল চৌধুরী আমাদের এক পলক দেখে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো।
ব্রেকফাস্ট করা শেষ হতেই ইফান বললো ভার্সিটি যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে আসতে।আমি এখানে ওকে না করলেও শুনবে না। তাই আর কথা না বাড়িয়ে রুম থেকে কাঁধের ভ্যানিটি ব্যাগটা আনতে চলে গেলাম।ইফান কালো প্যান্ট-শার্ট,ব্লেজারে নিজেকে তৈরি করেই নিচে নেমেছিলো।সে পায়ের উপর পা তুলে সোফায় বসে ফোন টিপছে।মাঝে মাঝে বাপ-ভাইদের কথাতেও উত্তর করছে।হঠাৎই সদর দরজা দিয়ে ইনান তাড়াহুড়ো করে ইফানের কাছে আসলো।ইফানকে ফিসফিস করে কিছু একটা বললো।ইফানের চোখমুখ কুঁচকে এসেছে।ইফান চোয়াল শক্ত করে বললো,

–“এসে গেছে তাহলে!”
–“জি ভাই।”
আমি নিচে আসতেই দেখলাম ইফান আর ইনান কিছু একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছে।তবে ইফানের চেহারায় বিরক্তির ছাপ।আমাকে দেখে ইনান চোখ নিচে নামিয়ে নিলো।ইফান কাছে এসে কোনো ইঙ্গিত না দিয়ে গালে চুমু খেলো।আমি চোখমুখ শক্ত করে আসেপাশে তাকিয়ে দেখলাম। নাহ্,কেউ আমাদের দিকে তাকিয়ে নেই। নিজেদের মতো কথা বলছে।তখনই ইফান আমার হাত থেকে কালো মাস্কটা নিয়ে আমার মুখে পড়িয়ে দিলো।আমি বিরক্তি নিয়ে ইফানের দিকে তাকালাম।তক্ষুনি ইফান আমার কপালেও চুমু খেলো।
–“অসভ্যতামির একটা লিমিট থাকে।”
–“আর সব লিমিটের উর্ধ্বে ইফান চৌধুরী।”

আমি মুখ ফিরিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে ইফান আমার বাহু ধরে আবার তার সামনে এনে দাঁড় করালো।আমি মুখ দিয়ে চ বর্গীয় উচ্চারণ করে দাঁত দাঁত পিষে বললাম,
–“আরে আমার লেইট হয়ে যাচ্ছে। তুমি কি যাবে নাকি আমি একাই চলে যাবে?”
ইফান আমার বাহু জড়িয়ে ধরে চৌধুরী বাড়ির সদর দরজা দিয়ে বেড়িয়ে আসলো।তারপর দু কাঁধে ধরে বললো,
–“সরি জান আজ যেতে পারছি না।কাজ আছে,,,,”
–“কি কাজ আছে তোমার?”
ইফান কথা সম্পূর্ণ করার আগেই আমি পাল্টা প্রশ্ন করে বসলাম।ইফান আমার কথা শুনে হাসছে।এটা তার চোখ দেখে অনুভব করলাম।আমি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম হঠাৎ এভাবে ইফানকে প্রশ্ন করায়।ইফান এক আঙ্গুল দিয়ে আমার নাকে ঘষে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,

–“বলতাম।বাট তোমাকে বললেই ম্রা খাব।”
আমি নাকে মাস্ক টেনে বিরবির করলাম,”শয়তান।”
আমি চলে যেতে নিলেই ইফান হাত ধরে আটকে বললো,”কোথায় যাচ্ছ?”
–“আমার লা’ঙ্গের কাছে।যত্তসব!!”
–“তোমার লাং ভাতার যা সব আছে তা তো আমিই।”
আমি ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললাম,”লেইট হয়ে যাচ্ছে।”
ইফান আমাকে নিয়ে পার্কিং লটের দিকে যেতে যেতে ইনানকে বললো,”ইন্দুর তর ভাবিকে ভার্সিটি দিয়ে আয় যা।”
ইনান তাড়াতাড়ি গাড়ি উঠে যেতে যেতে বললো,”জি ভাই।”
গাড়িতে উঠতেই দেখি গার্ডরা আগে থেকে গেইটের কাছে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে।ইফান আমার গাড়ির ডোর ক্লোজ করতে নিলেই আটকে দিলাম।

–“গার্ডদের বল আমার পিছু না নিতে।”
–“কেন কি হয়েছে?”
–“আমার ভালো লাগে না এসব।”
–“ওরা তোমার সেফটির জন্য,,,”
ইফানের সম্পূর্ণ কথা শেষ করার আগেই আমি গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার জন্য উদ্ধত হলেই ইফান আটকালো।আমি শক্ত কন্ঠে বললাম,”তুমি ছিলে না ওরা আমার সাথে সাথে ঘুরাঘুরি করেছে মেনে নিয়েছি আমার কথা শুনে নি তাই।এখনো যদি আমার পিছনে পড়ে থাকে আমি আর মানব না।আমি নিজের মতো থাকতে চাই,কেন বুঝতে চাইছ না।”
আমি কিছুটা উত্তেজিত হয়ে উঠলাম।ইফান গালে হালকা থাপড়ে বললো,”রিলাক্স বুলবুলি।”
ইনানের উদ্দেশ্য বললো,”তর ভাবিকে সেইফলি দিয়ে আসিস।”

–“জি ভাই টেনশন করবেন না।”
অতঃপর আমি শান্ত হয়ে বসলাম।ইফান গাড়ির ডোর ক্লোজ করতেই গাড়িটা চৌধুরী ম্যানশন থেকে বেড়িয়ে গেলো।ইফান সেদিকে তাকিয়ে প্যান্টের পকেটে এক হাত গুঁজে আরেক হাত দিয়ে বুকের বাম পাশে হাত বুলালো।অতঃপর কিছু একটা বিরবির করে মৃদু হাসলো।
তক্ষুনি ফোন কর্কশ আওয়াজ তুলে বেজে ওঠলো।ইফান বিরক্তি নিয়ে প্যান্টের পকেট থেকে ফোনটা বের করতেই স্কিনে দেখলো একটা কোড নাম্বার।এই কোড নাম্বার গুলো ইফানের গ্যাংয়ের সদস্যদের নামের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়।এটা মূলত সিকিউরিটি জন্য।ইফান নিশ্চিত হলো ব্ল্যাক ভেনমের কোনো সদস্য কল করেছে।ইফান রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে কিছু একটা বলতেই ইফান হুংকার ছাড়লো,,,
–“শুউ*রের বাচ্চারা যেকোনো ভাবে ওকে অক্ষত অবস্থায় খুঁজে বের কর।অন্য কারো হাতে পড়ার আগে তাকে আমার চাই।চাই মানে চাই। আর নাহলে তোদের লা*শ ফেলে দিবো।”

সিআইডি অফিস……।।
জিতু ভাইয়ার কানে ব্লুটুথ লাগানো।তিনি কারো সাথে কথা বলতে বলতে অফিসের ভিতর প্রবেশ করলো।সারা অফিসে পিনপতন নীরবতা।জিতু ভাইয়া অফিসে ঢুকতেই আশ্চর্য হলো।অন্যদিন সবাই অফিসে এসেই হাসিঠাট্টা করতে থাকে__জিতু ভাইয়া আসার আগ অব্ধি। কিন্তু আজ সবাই এত শান্ত কেন!জিতু ভাইয়ার চোখদুটো সরু হয়ে আসলো।তিনি সকলের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো।অফিসার আবির আর অরনা কবিরের ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে ফাইলে ডুবে আছে।কবির ঠোঁট কামড়ে কম্পিউটারের কিবোর্ডে হাত চালাচ্ছে।জিতু ভাইয়া চোখ ঘুরিয়ে অফিসার হিমনের ডেস্কের দিকে তাকালো।অফিসার হিমন আর কণা একসাথে দাঁড়িয়ে ফাইল দেখছে।আবার আড় চোখে অন্যদিকে তাকাচ্ছে।হঠাৎই অফিসার আবিরের চোখে পড়লো এসপি কে।

–“গুড মর্নিং স্যার।”
আবিরের কথা শুনে সকলে দরজায় দৃষ্টি রাখতেই দেখলো এসপি দাঁড়িয়ে। সকলেও গুডমর্নিং জানালো।জিতু ভাইয়া মাথা নাড়িয়ে ভেতরে আসলো।সকলের উদ্দেশ্য বললো,”কি ব্যাপার ওয়েদার এতো ঠান্ডা কেন?”
–“জি স্যার শীত পড়েছে।”
হিমনের কথা শুনে বাকি অফিসাররা কপাল চাঁপড়ালো।জিতু ভাই চোয়াল শক্ত করে বললো,”স্টুপিট, আমি তোমাদের কথা বলছি।সবাই এত চুপচাপ কেন?”
জিতু ভাইয়ার কথা শুনে সকলে শুকনো কেশে আড় চোখে আরেক দিকে ইশারা করলো।জিতু ভাইয়ার কপালে সুক্ষ্ম ভাজের সৃষ্টি হলো।তিনি ঘাড় কাঁধ করে তাকাতেই দেখলো টেবিলের সামনে চেয়ারে কেউ বসে আছে।দেহের নিচের অংশ টেবিলের আড়াল হয়ে আছে।যতটুকু দৃশ্যমান তাতেও মুখ বুঝার উপায় নেই। কারণ মুখের সামনে ম্যাগাজিন ধরে আছে।কাঁধের নেভি কালার আচল দেখে বুঝা যাচ্ছে শাড়ি পড়ে আছে।জিতু ভাইয়া নিশ্চিত হলো এটি মহিলা। কিন্তু এটা কে?
জিতু ভাইয়া ভাবুক চিত্তে বাকি অফিসারদের দিকে তাকালো।কেউ কিছু বলার আগেই অফিসার হিমন জিতু ভাইয়ার কাছে এসে সব খুলে বলতে লাগলো,,,,,,

–“স্যার সকালে আমরা অফিসে এসে নিজের কাজ করতে যাব তখনই এই ভদ্র মহিলা উপস্থিত হয়।তিনি একজন লোকের প্রতি অভিযোগ করেন প্রতারণার।ভদ্রমহিলাকে নাকি ছ্যাকা দিয়েছে এক ভদ্রলোক।এখন উনার দাবি উনাকে ন্যায় বিচার দিতে হবে।কিন্তু স্যার আমি স্পষ্ট বলে দিয়েছি উনি ন্যায় বিচার পাবেন না।”
–“হোয়াট দ্যা!কি বলছ হিমন, উনাকে ন্যায় বিচার পেতে দিবে না কেন?তুমি জানো না এটার জন্য তোমার চাকরি চলে যেতে পারে।এমনকি শাস্তিও হতে পারে।”
অফিসার কণা এগিয়ে এসে বললো,”স্যার এটা কিছুতেই আমরা করতে পারবো না।আপন মানুষকে কিভাবে শাস্তি দিব!”
জিতু ভাইয়া কোমরে দু’হাত ধরে আশ্চর্য হয়ে বললো,”তার মানে অপরাধী তোমার আপনজন।ও মাই গড, কণা!তুমি একজন সিআইডি অফিসার হয়ে এধরণের কথা কিভবে বলছ?কে সেই অপরাধী?”

–“আরমান শেখ জিতু।”
–“কিহ্!”
অফিসার হিমনের কথায় জিতু ভাইয়া আসমান থেকে যেন পড়লো।বাকি অফিসার’রা শুকনো কাশতে লাগলো।জিতু ভাইয়া শক্ত কন্ঠে মেজাজ দেখিয়ে বললো,”সকাল সকাল হেয়ালি হচ্ছে আমার সাথে হেয়ালি!”
তক্ষুনি একটা মেয়েলি কন্ঠ ভেসে আসে,”জিতু বেবি আমি এখানে।”
আবারও সকল অফিসাররা শুকনো কাশতে লাগলো।জিতু ভাইয়া পিছনে ফিরে তাকালো।মেয়েটার কন্ঠ চেনা চেনা ঠেকছে।জিতু ভাইয়ার চেহারায় দ্বিগুণ কাঠিন্যে চলে আসলো।তিনি বড় বড় পা ফেলে ডেস্কের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।দাঁতে দাঁত পিষে আওড়ালো,”সিআইডি অফিসে বসে বসে তামাশা হচ্ছে?”
মেয়েটি মুখের সামনে থেকে ম্যাগাজিনটা সরাতেই চেহারা দৃশ্যমান হলো।শর্টকার্ট কয়েকটা চুল কপালে পড়ে আছে।ফর্সা ফেইসে চমৎকার করে হালকা স্টেন্ডার্ড মেকআপ।ঠোঁটে রেড কালার লিপস্টিক।জিতু ভাইয়া এতদিন পর হঠাৎ করে নোহাকে দেখে বেশ অবাক হলো।তার চেয়েও বেশি অবাক হলো যে মেয়ে হাফ প্যান্ট আর ব্রা পড়ে থাকে সবসময়। আজ সে কিনা শাড়ি পড়েছে!
নোহা মিষ্টি হেসে চোখ পিটপিট করলো।জিতু ভাইয়া বিরবির করে বললো,”ও মাই গড! এই মেন্টালটা এতদিন পর আবার কোথা থেকে আসলো!”

–“বেইবি আমি লন্ডন থেকে আজ সকালে বিডিতে এসেছি।বাসায় না গিয়ে স্টেইটলি তোমার সাথে দেখা করতে চলে এসেছি।”
জিতু ভাইয়া দাঁত কটমট করে সিআইডি অফিসারদের দিকে তাকিয়ে বললো,”একে অফিসে ঢুকতে দিয়েছে কে?”
–“জি স্যার উনি এসে আপনার খোঁজ করছিলো।বললো আপনি নাকি উনার সাথে চিট করেছেন।তাই আপনার নামে আমাদের কাছে কমপ্লেইন করেছে।”
অফিসার কণার কথা শুনে জিতু ভাইয়া ধমকে উঠলো,”এটা সিআইডি অফিস পাগলদের হসপিটাল নয়।”
জিতু ভাইয়া কে রেগে যেতে দেখে নোহা উঠে জিতু ভাইয়ার কাছে আসতে লাগলো।বাকি অফিসাররা কাশতে কাশতে দৃষ্টি সরিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ফেলেছে। জিতু ভাইয়া আরেক দফা আশ্চর্যের চূড়ায় নোহাকে দেখে।নোহার উপরে সুন্দর করে শাড়ি পড়া থাকলেও নিচে কোনো মতে হাফ প্যান্টে শাড়ির কুচি গুজে রাখা।হাফ প্যান্টাও আবার ঢিলেঢালা।কোমরে আটকানোর জন্য লেডিস বেল্ট লাগানো।পা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত।না না হাফ প্যান্ট বললে ভুল হবে এ তো ছেলেদের জাঙ্গিয়া।জিতু ভাইয়া স্পিচলেস।কারণ জাঙ্গিয়াটা দেখে জিতু ভাইয়ার নিখোঁজ হওয়া কালো আন্ডারপ্যান্টের কথা মনে পড়ে গেছে।যেদিন নোহা শেখ বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলো সেদিনই আন্ডারপ্যান্টটি নিখোঁজ হয়।আর সেদিন আবার নোহাকেও নিজের রুমে দেখতে পায়।
এসব ভেবে জিতু ভাইয়ার হেঁচকি উঠে গেছে। তিনি হেঁচকি তুলতে তুলতে চেয়ারে ধুম করে বসে পড়লো।অফিসার অরনা এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলো।জিতু ভাইয়া এক চুমুকে সবটা শেষ করে ফেললো।নোহা জিতু ভাইয়ার কাছে আসতে নিলেই তিনি ধমকে উঠলো।নোহা নেকামি কন্ঠে বললো,”জিতু বেইবি তুমি ঠিক আছ?”

–“গেট আউট অফ হিয়ার?”
নোহা পাত্তা দিলো না।বরং কাঁধের কয়েকটা চুল উড়িয়ে বললো,”আমাকে কেমন লাগছে হুম হুম,টেল মি, টেল মি।”
জিতু ভাইয়া কিছু বলার আগেই নোহার কাছে এসে অফিসার হিমন বললো,”জি আপা দেখে মনে হচ্ছে সদ্য পাবনা হসপিটাল থেকে পালিয়ে আসা নতুন এক কিরিম আপা।”
পাবনা হসপিটাল কি জানা নেই নোহার।সে খুশি হয়ে বলে উঠলো,”থাংকু থাংকু।”
হিমন খুশি হয়ে বুকে হাত ধরে মাথা নুইয়ে বললো,”ওয়েলকাম।”
অফিসার হিমনকে চোখ রাঙালো জিতু ভাইয়া।নোহা আবার জিতু ভাইকে টাচ করতে গেলে আবারও ধমকে উঠলো।নোহা একটু ভয় পেলো।তবে আজ সে হারবে না।সে প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে।সে আজ খুব ভালো বাংলা গান শিখে এসেছে।সেই গান গেয়ে জিতু ভাইয়াকে তার প্রেমে ফেলবে।
নোহা একটু ভাবসাব নিচ্ছে। সকলেই নোহার দিকে তেছড়া নজরে চেয়ে। নোহা ঠোঁট ভিজালো।অতঃপর বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিয়ে বেসুরো কন্ঠে গান ধরলো,,

❝আমি করতে যদি পারি তোমার মন চুরি
হবে আমার প্রেমের ডাবল সেঞ্চুরি
তুমি আমার এই জীবনের দুইশ তম টার্গেট
তোমায় নিয়ে খেলবো আমি
টেস্ট প্রেমের ক্রিকেট……….❞
নোহা গান শেষ করতে পারলো কি পারলো না।তার আগেই জিতু ভাইয়া পায়ের শুজ খুলতে লাগলো।নোহার চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। বাকি অফিসাররা হা করে একবার জিতু ভাইয়া আরেকবার নোহাকে দেখছে।নোহা গান বন্ধ করে ঢোক গিলে যেদিক দিয়ে এসেছিলো, সেদিক দিয়ে উরাধুরা দৌড়াতে দৌড়াতে বলতে লাগলো,
–“ওহ্ হোলি পালাআআআও…”

ইনানের গাড়ি ভার্সিটি প্রাঙ্গণে এসে থামলো।ইনান গাড়ি থামাতেই কোথা থেকে আলাল দুলাল ছুটে এসে গাড়ির ডোর খুলে দিলো।আমি ওদের দেখে বিরক্ত হলাম।ওরা আমাকে দেখে দাঁত কেলিয়ে বললো,
–“আসসালামু ওয়ালাইকুম ভাবি।”
–“ওয়ালাইকুম আসসালাম।”
আমি গাড়ি থেকে নামতেই চোখে পড়লো গেইটের সামনে তন্নি দাঁড়িয়ে ফোন টিপছে।তন্নি আচমকা এদিকে তাকাতেই আমাকে নজরে পড়লো।মেয়েটার মুখে হাসি ফুটে ওঠেছে।মনে হচ্ছে এই মাত্র বুঝি তার প্রাণটা এলো।তন্নি ছুটে এসে আমাকে ঝাপটে ধরে আহ্লাদি করে বললো,”জান্নু তুই আইছস!আল্লাহ আমি কখন থেকে দাঁড়িয়ে তোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম।”

তন্নি বলতে বলতেই থেমে গেলো।তার নজর আটকালো আমাদের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইনানের দিকে।তন্নি চোরাই চোখে ইনানকে উপর নিচ দেখে নিলো।মনে মনে বললো না ছেলেটা বেশ স্মার্ট।তারপর আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,”ভাই তুই তোর জামাইয়ের চামচাটাকেও এখন থেকে নিয়ে আসবি।”
তন্নি কথাটা ফিসফিস করে বললেও ইনানের কান অব্ধি পৌঁছে গেছে।আমি আড় চোখে ইনানের দিকে তাকাতেই দেখলাম চোয়াল শক্ত করে বেশ রেগে তন্নির দিকে তাকিয়ে ইনান।তন্নি ইনানের ভাবমূর্তি দেখে আবারও আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,”ও মামা, এই কাইক্কা বেডারও তেজ আছে দেখছি।”
তন্নির কথা শুনে হাসি পেলো।মাস্কের আড়ালে একটু হাসলামও।ইনান তন্নির এই কথাটাও শুনে ফেলেছে।তবুও আমার বান্ধবী বলে কিছু বলার সাহস পেলো না।ইনান আমার কাছে এসে বললো,”ভাবি চলেন ক্লাস পর্যন্ত দিয়ে আসি।”

আমি ব্রু কুঁচকালাম,”ক্লাস অব্ধি দিয়ে আসবেন মানে কি?”
–“না মানে ভাই বলেছে আপনাকে ক্লাসে দিয়ে আবার ক্লাস শেষে বাড়ি নিয়ে যেতে।”
–“আপনি চলে যান। আমি নিজেই নিজের ক্লাস অব্ধি যেতে পারবো।আমি কোনো বাচ্চা নই যে দিয়ে আবার নিয়ে যেতে হবে।আমি যাতে ক্লাস শেষে আপনাকে না দেখি।”
–“কিন্তু ভাই,,,।”
আমি চোখমুখ শক্ত করে ইনানের দিকে তাকাতেই ইনান চোখ নামিয়ে নিলো।আমি বললাম,”এক কথা দ্বিতীয় বার বলতে পছন্দ করি না।”
ইনান আর কিছু বললো না।আমি তন্নিকে নিয়ে ভেতরে চলে যাচ্ছি। ইনান পিছনে দাঁড়িয়ে দেখে নিশ্চিত হচ্ছে। আমি তার চোখের আড়াল হতেই আলাল দুলাল কে আমার উপর নজর আর ঠিক সময়ে ইফানের কাছে খবর দেওয়ার জন্য বলে চলে যায়।তন্নি হাসতে হাসতে হেলেদুলে পড়ে যাচ্ছে।

–“বোইন তর কথায় ঐ বেডার মুখটা দেখার মতো ছিলো।”
–“ধুর এসব বাদ দে ভাই।”
তন্নি ইনানের কথা বাদ দিয়ে আরও কি কি হলো সব পেটের মধ্যে চেপে রাখা কথা উগড়ে দিচ্ছে।মেয়েটার কথা শুনে আমিও হাসছি।এভাবে কথা বলতে বলতে ক্লাসে পৌঁছালাম।যখন দুই বান্ধবী বসার জন্য সিট খুঁজছি তখনই আরেক পাশ থেকে পরিচিত কারো কন্ঠ ভেসে আসে,
–“জাহান তোদের জন্য এখানে জায়গা রেখেছি।”
আমি আর তন্নি পিছনে তাকাতেই দেখলাম সুমাইয়া আর নাফিয়া একটা বেঞ্চে বসে আমাদের জন্যও জায়গা রেখেছে। এটা সেই স্কুল লাইফ থেকেই হয়ে আসছে।আমাদের মধ্যে আগে যে আসে সেই অন্যের সাথে ঝগড়া করে হলেও বান্ধবীদের জন্য জায়গা রাখে।আমি সুমাইয়া আর নাফিয়ার দিকে তাকালাম। ওরা আমার সাথে কথা বলতে অপ্রস্তুত। তবুও ঠোঁটে হাসি ধরে।সুমাইয়া আবার ডাকলো,

–“তন্নি, জাহান এখানে ব,,,,,।”
সুমাইয়ার কথা শেষ হওয়ার আগেই আমি ওদের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দূরে আরেকটা বেঞ্চে গিয়ে বসলাম।তন্নি অসহায় চোখে বাকি দুই বেস্ট ফ্রেন্ডের জ্বলজ্বল করা চোখ দুটো দেখলো।তবে তন্নি কিছু না বলে আমার সাথে এসে বসলো।নাফিয়া গুমরে গুমরে কাঁদছে। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।সুমাইয়া আমার থেকে ইগনোর সহ্য করতে পারলো না।বেঞ্চে মাথা গুঁজে হু হু করে কেঁদে উঠলো।মূহুর্তেই ক্লাস ভর্তি সকলেই সুমাইয়া নাফিয়াকে ঘিরে ধরলো।তন্নি সুমাইয়াদের দিকে একবার তাকিয়ে আমার দিকে আড় চোখে তাকালো।আমি অনুভূহীন বসে আছি।যেন আমার আশেপাশে কিছুই হচ্ছে না।আমি ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে মনযোগ দিয়ে পড়তে লাগলাম।তন্নি দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো।

টিএসসি ক্যাফেটেরিয়া……।।
আজ বহুদিন পর ক্লাস শেষ লাইব্রেরিতে গিয়েছিলাম।আমার জীবনের ঐ কাল রাত্রির দিন যে উপন্যাসটা শুরু করেছিলাম। আজ সেটা পড়ে সম্পূর্ণ করলাম।আজ মনটা আনচান করছিলো।ক্লাসে একটুও মন বসে নি।অথচ লেকচারার সহ সকলেই ভেবেছে আমিই ক্লাসে সবচেয়ে মনযোগী শিক্ষার্থী।মনকে একটু শান্ত করার জন্য উপন্যাস পড়া।কিন্তু এখন মন আরও ভারী হয়ে গেছে। খুব করে চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই ঝড়ের রাতের কথা।
আমি ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে টেবিলে দু’হাতের কনুই রেখে দু’হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরলাম।
তন্নি দুটো আইসক্রিম আর দু প্লেটে করে সাজানো শিঙাড়া, সমুচা আর সাথে সস নিয়ে আসলো।এসেই দেখে আমি অস্থির হয়ে আছি।তন্নি টেবিলে এগুলো রেখে আমার পাশে বসে বাহুতে হাত রেখে বললো,

–“জাহান তুই ঠিক আছিস।”
আমি উত্তর দিলাম না।বরং মাথা নাড়ালাম। তন্নি আমার না বলা কথাগুলো কিছুটা পড়তে পারছে।তাই আমার বাহুতে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নিঃশব্দে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।চারিদিকে শিক্ষার্থীরা নিজের মধ্যে গল্প গুজব করছে।আমাদের দুই বান্ধবীর মধ্যে নীরবতা।কিছুক্ষণের মধ্যে সেই নিরবতা ভেদ আমি আহত কন্ঠে বললাম,,,,

জাহানারা পর্ব ৫১

❝শুনেছিলাম আগুনের দিন শেষ হয় একদিন। কিন্তু আমার জীবনে তো দিনে দিনে সেই আগুনের তাপ আরও প্রখর হচ্ছে। আমি দগ্ধ হচ্ছি।আমার পোড়া অন্তর আরও পুড়ছে।আমাকে বিধাতা এতটাই অসহায় বানিয়েছে যে, আমার দেখা স্বপ্নগুলোও এখন আমাকে দেখে আর্তনাদ করে উঠছে।যদি হারাম না হতো,তাহলে একটা নোট লেখার কালি আমার কলমেও ছিলো।❞

জাহানারা পর্ব ৫৩