Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ৮৯

জাহানারা পর্ব ৮৯

জাহানারা পর্ব ৮৯
জান্নাত মুন

চকবাজার, ঢাকা।।
ধরণীর বুকে তখন গোধূলি নেমেছে। দিগন্তের ক্যানভাসে কে যেন ছড়িয়ে দিয়েছে সিঁদুরে লালিমার শেষ আঁচড়। সূয্যিমামা বিদায়ের অন্তিম লগ্নে। ঠিক তখনই চারপাশের বাতাস মুখরিত করে ভেসে এল মাগরিবের আজানের সুমধুর ধ্বনি। জাগতিক ব্যস্ততা একপাশে সরিয়ে রেখে ধর্মপ্রাণ মানুষেরা পা বাড়াল মসজিদের পানে। তবে শান্ত এই সুরের সমান্তরালেই চকবাজারজুড়ে থিতু হয়ে আছে উপচে পড়া ভিড় আর কানফাটানো কোলাহল। সেই যান্ত্রিক জনসমুদ্র ঠেলে সামনে এগোনো যেন এক দুঃসাধ্য যু’দ্ধ। কিন্তু এই চেনা বিশৃঙ্খলার বুকেই লুকিয়ে আছে কিছু অচেনা ছায়া। একদল রহস্যময় মানব চতুর ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে ভিড় চিরে দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলেছে। তাদের মুখাবয়ব কালো মাস্কের আড়ালে বন্দি, যেন অতি গোপনে কোনো নিষিদ্ধ গন্তব্যের দিকে তাদের এই সতর্ক যাত্রা।

অন্ধকার গোডাউনের ভেতর টিমটিমে হলদে আলোয় আবছা হয়ে ফুটে উঠেছে চারপাশ। সেখানে সারিবদ্ধভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে একদল যুবক। মলিন বেশভূষায় প্রথম নজরে তাদের সাধারণ কোনো কুলি বা শ্রমিক বলেই ভ্রম হয়। কিন্তু সত্যিই কি তারা ততটাই নিরীহ? উঁহু, একেবারেই নয়! সাধারণের এই ছদ্মবেশের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ঝাঁক হিং’’স্র টে’রো’রিস্ট। আর তাদের ঠিক সামনে, কাঠের চেয়ারের পিঠে হেলান দিয়ে রাজকীয় আলসেমিতে বসে আছে এই দুর্ধর্ষ টেরোরিস্টদের দলনেতা। উফস! একটু ভুল হয়ে গেল। দলনেতা নয়, দলনেত্রী। আন্তর্জাতিক অ’পরাধ জগতের মোস্ট ওয়ান্টেড মাফিয়া গ্রুপ ‘ব্ল্যাক ভেনমের’ ক্যাপ্টেন, মীরা চৌধুরী। পরনে তার অশুভরঙা ব্লেজার ড্রেস আর তার ওপরে লং কোট। হাতের কালো গ্লাভস ভেদ করে কেবল উন্মুক্ত ফর্সা আঙুলগুলোই দৃশ্যমান। টেবিলের ওপর আড়াআড়িভাবে রাখা কালো সুয়েড থাই-হাই বুট পরা লম্বাটে পা জোড়া সে ক্ষণে ক্ষণে মৃদু দোলাচ্ছে। ততক্ষণে চারপাশের আজানের সুর মিলিয়ে গেছে, সেখানে জেঁকে বসেছে এক পিনপতন নীরবতা। আচমকাই সেই স্তব্ধতা ভেঙে আরও কয়েকজন লোক গোডাউনে প্রবেশ করল। তাদের একজন মীরার পাশে সটান দাঁড়িয়ে থাকা আলালের কানে কানে কিছু একটা ফিসফিসিয়ে বলল। অতঃপর লোকটা গিয়ে সকলের সাথে দাঁড়িয়ে গেল।

আলাল কিছুটা ঝুঁকে মীরার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে কিছু একটা বলল। কিন্তু মীরার শান্ত মুখাবয়বে বিন্দুমাত্র ভাবান্তর হলো না। যেন এই সংবাদ তার আগে থেকেই জানা ছিল। সে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে চোখের ওপর চেপে থাকা কুচকুচে কালো চশমাটা খুলে নিল। আর অমনি উন্মোচিত হলো তার অদ্ভুত রহস্যময় চোখজোড়া। চোখের পাতায় লেপ্টে থাকা ডার্ক আইশ্যাডোর গাঢ় প্রলেপ। মীরা চোখ বন্ধ করলেই মনে হয়, যেন তার চোখের পাতাজুড়ে এক অপার্থিব অমাবস্যার ঘন আঁধার নেমে এসেছে। এই রমণীর শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ নয়নজোড়া এক অপ্রসিদ্ধ রহস্যের আধার। মীরা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার প্রতিটি নড়াচড়ায় বাঘিনীর মতো এক চতুর ক্ষি’প্রতা। সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোকে শিকারী নজরে অবলোকন করতে করতে সে চাপা, গম্ভীর কণ্ঠে অথচ চরম সতর্কতার সাথে বলে উঠল,
–“শিউরলি, অল অভ ইউ হ্যাভ আন্ডারস্টুড হোয়াট ইউর টাস্কস অ্যাকচুয়ালি আর।”
উপস্থিত লোকগুলো যেন এক অদৃশ্য কমান্ডে কেঁপে উঠল। তারা মেরুদণ্ড সোজা করে একসুরে প্রত্যুত্তর করল,“ইয়াহ্ ক্যাপ্টেন।”

মীরার চোখের মণি জোড়া এবার আরও একটু সংকুচিত হলো। সে প্রতিটি শব্দে বরফশীতল কাঠিন্য মিশিয়ে ফের বলে উঠল,“রি-মেম্বার, নো ম্যাটার হোয়াট হ্যাপেন্স, হি মাস্ট বি প্রোটেক্টেড।”
নেত্রীর কণ্ঠের এই শীতলতা স্পর্শ করল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দলটির আত্মবিশ্বাসকে। তাদের মধ্য থেকে একজন বুক চিতিয়ে,দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠল,“আপনি শতভাগ নিশ্চিন্ত থাকুন, আমার ক্যাপ্টেন। আমরা থাকতে কারো সাহস হবে না আমাদের লিডার অব্ধি পৌঁছানোর। নিজেদের প্রাণ দিয়ে হলেও আমরা নিজ দায়িত্বে অটুট থাকব।”
মীরার ঠোঁটের কোণে একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল, তবে তা এক পলকের জন্য। সে অত্যন্ত ধীর অথচ মাপা কদমে টেবিলের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। তার থাই-হাই বুটসের সুচালো হিলজোড়া প্রতিটি পদক্ষেপে মেঝের বুকে এক একটা তীক্ষ্ণ ঠকঠক শব্দ তুলতে লাগল। যা বদ্ধ গোডাউনের চার দেওয়ালে আঘাত পেয়ে প্রতিধ্বনিত হলো। মীরা টেবিলের উপর রাখা ল্যাপটবে মনযোগ দিয়ে বলে উঠলো,“কথাটা মনে থাকে যেন। যদি তার কিছু হয় তোমরাও কিন্তু পাড় পাবে না। নিশ্চয়ই সকলের জানা আছে সেই পরিণতি কি হবে?”

–“আমরা সকলেই সেই বিষয়ে অবগত, ক্যাপ্টেন। আমরা প্রাণপণে নিজেদের শপথ পালন করব।”
লোকটার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে মীরা বাঁকা হাসল। তার ঠোঁটের বাঁকানো হাসিতে যেন অবজ্ঞা আর ক্রূরতা মিশে আছে। সে চাপা স্বরে বলল,“দ্যাট’স গ্র্যাট।”
অতঃপর ল্যাপটপের মনিটরে গভীর মনযোগ দিল। পুরো গোডাউন জুড়ে আবার এক জমাটবদ্ধ নৈঃশব্দ্য নেমে এল। যত সময় গড়াচ্ছে, স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা মীরার ফর্সা কপালে চিন্তার সূক্ষ্ম বলিরেখাগুলো তত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মীরা ল্যাপটপে দৃষ্টি স্থির রেখেই সকলের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করল,
–“ডু ইউ হ্যাভ ইনাফ ওয়েপনস?”
–“ইয়েস ক্যাপ্টেন। গতবার দেশের বাইরে বড় চালানটা পাচার করার আগেই আমরা অত্যন্ত গোপনে কিছু উন্নতমানের আধুনিক মাল নিজেদের আস্তানায় স্টক করে রেখে দিয়েছিলাম।”

সকলের সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করে মীরা আর এক মূহুর্ত সময় অপচয় করল না। দ্রুত গোডাউন থেকে বেরিয়ে পরল। ত্রিভুবন ততক্ষণে সম্পূর্ণ অন্ধকারের চাদরে নিমজ্জিত। তবে সেই গাঢ় আঁধারকে ফালি ফালি করে কেটে চারপাশ আলোকিত করে রেখেছে নিয়ন আলোর রোশনাই। সন্ধ্যার পর যেন চকবাজারের চেনা জনসমুদ্র আরও বেশি উথাল-পাথাল রূপ নিয়েছে। মীরা এগিয়ে গেল তার বাইকের কাছে। গোডাউন থেকে খানিকটা সূদুরেই বাইকটি দাঁড় করিয়ে গিয়েছিল। সে মাথায় হেলমেট পরতে যাবে অমনি ফোনের তীব্র ভাইব্রেশন আওয়াজ তার কানে আসে। সে ফোন রিসিভ করে কানে ধরল। অপর প্রান্তের কলদাতার বক্তব্য শুনে তার চেহারায় আধার ঘনিয়েছে যেন। কিন্তু ওপাশ থেকে কথা শেষ হওয়ার আগেই, মীরার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আচমকা স্থির হলো বাইকের লুকিং গ্লাসে। আয়নার কাচে এক জোড়া অচেনা ছায়ামূর্তি প্রতিফলিত হতেই বিপদের আঁচ পেল সে। এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ মাত্র সময়! মীরা বিদ্যুৎবেগে ঘুরে দাঁড়িয়ে আগন্তুকের বুকে লাথি চালাল। ঘটনাটা এত অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ঘটল যে, অতর্কিতে আসা আগন্তুক বোধহয় অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। কিন্তু দমে না। মীরা মাটিতে পা ছোঁয়াতেই যখন দ্বিতীয় আঘাতটি হানতে গেল, লোকটা অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে একপাশে সরে গিয়ে নিজেকে রক্ষা করল। কিন্তু মীরা থামার পাত্রী নয়। তার ভেতরের বারুদ যেন জ্বলে উঠেছে। সে একের পর এক নিখুঁত ও প্রাণঘা’তী আ’ঘাত হেনে চলল, আর আগন্তুকও সমান তালে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে সেই আক্রমণ প্রতিহত করতে লাগল। আশেপাশের সকল মানুষ এক মূহুর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। একটা মেয়ে একজন পুরুষের সাথে এভাবে মা’রামা’রি করতে দেখে সকলে যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি বেসামাল রূপ নেওয়ার আগেই আগুন্তক লোকটা আত্মসমর্পণ করতে দু হাত উপরে তুলে বলে উঠলো,

–“ওকে ওকে আমি হেরে গেছি। সারেন্ডার করলাম মেডাম।”
পুনরায় উদ্যত আঘাতটি করতে গিয়েও মিরা করল না। সামনের মাস্ক পরহিত পুরুষটির চোখে তখন হাসির ঝলকানি। সেই ধৃষ্টতা মীরার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়াতে পারল না। সহসা তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, যেন চোখের মণি দিয়ে সে সামনের মানুষটাকে ভস্ম করে দেবে। কিন্তু আগন্তুক সেই ম’রণা’স্ত্রের মতো দৃষ্টিকে তোড়াই পাত্তা দিল না। বরং লোকটি আসেপাশের মানুষদের দিকে তাকিয়ে হেসে বললো,
–“আমার গার্লফ্রেন্ডের সাথে একটু মজা করছিলাম। আপনারা আসতে পারেন। হাহাহা।”
মূহুর্তেই চারপাশে চাপা হাসির রোল পড়ল। জনসাধারণ এটা-ওটা বলে নিজেদের গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এদিকে কালো চশমার আড়ালে মীরার চোখে ক্রোধের ফুলকি ঝড়ছে যেন। আগুন্তক লোকটা মুখের কালো মাস্ক খুলে মাথার অবিন্যস্ত চুলগুলোতে ব্যাক ব্রাশ করে মীরার দিকে দৃষ্টি ঘুরাল। লোকটার চেহারা দেখেও মীরার মধ্যে কোনো প্রকার ভাবাবেগ কাজ করল না। লোকটা গা দুলিয়ে হেসে মীরার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বললো,

–“কি মেডাম, ভয় পাইলেন নাকি?”
মীরা কোনো মৌখিক উত্তর দিল না। কেবল জিহ্বার ডগা দিয়ে গালের ভেতরের অংশটা ঠেলে, মেরুদণ্ড সটান করে দাঁড়িয়ে রইল। লোকটা কাছে এসে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
–“মেডাম নিশ্চয়ই আমার পরিচয় দেওয়ার আর প্রয়োজন নেই? খবর আছে মীরা চৌধুরী এবং তার চতুর মাইন্ড নাকি বাতাসের থেকেও দ্রুত গতিতে চলে?”
এই লোকটি আর কেউ না, বরং সিআইডির উপর মহলের প্রধান অফিসার আরাজ আহমেদ। কিন্তু আরাজের এই প্রচ্ছন্ন খোঁঁচাতেও মীরা এবার সম্পূর্ণ নির্বিকার রইল। সিআইডির প্রধানকে কোনো উত্তর দেওয়ার ন্যূনতম প্রয়োজনবোধও করল না সে। মীরার এই গ্রানাইটের মতো কঠিন আচরণ দেখে আরাজ দমে যাওয়ার পাত্র নয়, বরং তার ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও চওড়া হলো। সে পরম কৌতুক মিশিয়ে সহাস্যেই বলে উঠল,

–“মেডাম দেখছি অনেক রেগে গেছেন? কোনো ব্যাপার না। আমার কাছে রাগ ভাঙানোর নিনজা টেকনিক আছে।”
নিজের বলা বাক্য শেষ করেই পরনের সাদা শার্টের ভেতর থেকে হাত দিয়ে একটা লাল গোলাপ বের করে এনে মীরার দিকে ধরে বলে উঠলো,
–“বিউটিফুল লেডির জন্য আমার তরফ থেকে সামান্য একটা গোলাপ। আপনি গ্রহণ করলে বড় খুশি হব মেডাম।”
এবার মীরা একটু নড়েচড়ে দাঁড়িয়ে, ধীর ও মাপা কদমে দু-পা এগিয়ে সে আরাজের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। মীরার এই নৈকট্যে অফিসার আরাজ আড়চোখে আপাদমস্তক পরখ করে নিল সামনের রমণীকে। কাঁধ ছুঁয়ে নামা রেশমি বাদামি চুলের অবাধ্য গোছা, নিখুঁত শরীরের ভাঁজে রাত-কালো ওয়েস্টার্ন পোশাকের এই মারাত্মক মেলবন্ধন যেন এক জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড। এমনকি আরাজের তীক্ষ্ণ চোখ এড়াতে পারল না মীরার রাজকীয় ও দাম্ভিক পদচারণ। মনে মনে আরাজ স্বীকার করতে বাধ্য হলো, মানতে হবে মীরা চৌধুরী অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারীনি।
মীরা চোখের রোদচশমা মাথায় তুলে নিল। অফিসার আরাজ এবং মীরা প্রায় একই উচ্চতার। মীরা হাই হিল পড়ায় আরাজের হাইটের সাথে খাপে খাপ মিলে গেছে। মীরা অবেলায় লোকটার হাত থেকে দুই আঙুলের ডগায় ফুলের ডাঁটাটি চেপে ধরে সেটি নিজের হাতে নিয়ে নিল। বাঁকা হেসে বলে উঠলো,

–“এখানে কি কোনো সিনামার শুটিং চলছে, মিস্টার?”
মীরার মুখে এমন বিদ্রূপাত্মক প্রশ্ন শুনে অফিসার আরাজের ঠোঁটের হাসিটা আরও বিস্তৃত হলো। সে শরীরটা সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে প্রচ্ছন্ন কৌতুক মিশিয়ে বলল,“হঠাৎ এমন মনে হলো কেন?”
–“এই যে, হিরোর মতো এন্ট্রি নিয়ে আমাকে একটা ইউজলেস ফ্লাওয়ার ধরিয়ে দিলেন?”
মীরা হাতের গোলাপ ফুলটি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে করতে অবজ্ঞাভরে কথাটা বলল। আরাজ এবার তার ঠোঁটের কোণে এক চতুর বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল। তারপর কণ্ঠস্বর কিছুটা খাদে নামিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,“সামনে যদি এমন হিরোইনের মতো সুন্দরী রমণী থাকে, তাহলে তো একটু-আধটু চান্স নিতেই হয় মেডাম।”
বাঁকা হাসল মীরা। সেও হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,“উফস! বাট আমি কোনো হিরোইন নই।”
অফিসার আরাজ ভ্রুকুটি করল। চেহারায় রসিকতার হাসি ঝুলিয়ে শুধালো,

–“তাই! তাহলে কে আপনি মেডাম?”
মীরা লোকটার রসিকতার হাসি মাখা চোখের পানে চেয়ে জিহ্বার ডগা দিয়ে গাল ঠেলে বাঁকা হাসল। অতঃপর আচমকা ধরে রাখা গোলাপ ফুলটা দু আঙুল আলগা করে ছেড়ে দিল। অফিসার আরাজ জমিনে থাকাতেই মীরা এক পা ফুলের উপর রাখল। তার পায়ের ছয় কি সাত ইঞ্চি লম্বা সুক্ষ্ম পেন্সিল হিলের নিচে ফুলটি অবেলায় পিষে ম’রছে। আরাজের হাস্যোজ্জ্বল চেহারা তৎক্ষনাৎ মিইয়ে যেতে লাগল অপমানে। এদিকে মীরার গলা শুনেই চকিতে মীরার দিকে দৃষ্টি ঘুরালো। মীরা ইংরেজি কিছু বর্ণমালা একনাগাড়ে আওড়ালো,
–“V i l l a i n.”
বর্ণগুলো আওড়ে সম্পূর্ণ শব্দ উচ্চারণ না করেই দু’হাতের মিডল ফিঙ্গার দেখালো। থতমত খেয়ে গেল অফিসার আরাজ আহমেদ। মূহুর্তেই তীব্র অপমানে তার চেহারায় অন্ধকার হানা দিল। কঠিন হয়ে গেল তার মুখাবয়ব। মীরা ক্রোর হাসল। অতঃপর কোনো কিছুর পরোয়া না করে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সাথে দুহাত ঝেড়ে নিজের বাইকে উঠে মাথায় হেলমেট পরে নিল। চোখের উপর গ্লাস ফেলার আগেই রাগে হিসহিসিয়ে আরাজ বলে উঠলো,

–“মেডাম, অতি বাড় ভালো না। ঝড়ে পড়ে যাবেন।”
মীরাও সহাস্যে জবাব দিল,“আপনিও, অতি খেলা খেলবেন না খাট ভেঙে পড়বেন।”
মীরার অদ্ভুত আর শ্লেষাত্মক কথায় বিস্মিত হলো আরাজ। কথার মানে বোধগম্য না হওয়ায় আওড়ালো,“কিহ্?”
তৎক্ষনাৎ অফিসার আরাজের ফোনে মেসেজের টুং শব্দ হলো। মীরা ইশারা করলো ফোন চেক দিতে। অফিসার ভোঁতা মুখ করে ফোন হাতে নিল। অতঃপর মেসেজ চেক করতেই তার চোখ দু’টো যেন কুঠুরি থেকে বেড়িয়ে আসার উপক্রম। কারণ ভিডিওতে প্লে হচ্ছে সে এবং কিছু মেয়েদের সাথে তার আপত্তিকর অসামাজিক কার্যকলাপ। আরাজ চকিতে মীরার দিকে দৃষ্টি ঘুরালো। মীরা বাঁকা শ্লেষ হেসে চোখ মা’রল। অতঃপর চোখের উপর হেলমেটের কাচ ফেলে এক্সিলারেটরে মোচড় দিয়ে গাড়িতে ভুমভুম আওয়াজ তুলে ঝড়ের বেগে সেই স্থান ত্যাগ করল। এদিকে আরাজের চেহারায় আগুনের স্ফুলিঙ্গের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। চোয়াল শক্ত করে ক্রুদ্ধ নয়নে মীরার যাওয়ার পানে সে তাকিয়ে রইল। অপরদিকে মীরার প্রস্থান দেখে আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো আরও দুজন অফিসার। তারা বসের এরূপ চেহারা দেখে কিছু আন্দাজ করতে পারল না। একজন শুধালো,
–“মীরা চৌধুরীকে এত সহজে ছেড়ে দিলেন স্যার?”
অধস্তন অফিসারের প্রশ্নে আরাজের সংবিৎ ফিরল। সহাস্যে চাপা গলায় ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠলো,“সঠিক সময় আসতে দেন অফিসার, সব দুষ্টু পাখিকেই এক এক করে গরাদের পিছনে ঢোকাব।”

নাবিলা চৌধুরী অস্থির হয়ে অনবরত পায়চারি করে চলেছেন। আমিও অনেক চিন্তায় পড়েছি এই মূহুর্তে। চৌধুরী বাড়ি থেকে কিছুক্ষণ আগে খবর এসেছে নুলক চৌধুরী দেশে ফিরে এসেছেন। বাড়িতে কাউকে না পেয়ে কাজের লোকদের উপর অনেক চোটপাট করেছেন। মেইডরা ভয়ে নুলক চৌধুরীকে বলে দিয়েছে, নোহা হাসপাতালে ভর্তি। জানতে পেরেই তিনি নাকি বাসা থেকে ছুটে বেরিয়ে গেছেন। নিশ্চয়ই হাসপাতালের দিকে আসছেন। অধিক উদ্বেগের কারণে আমার শরীর ক্রমশ দুর্বল লাগছে। কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে ঘাড় ঘুরাতেই পলি বলে উঠলো,
–“ভাবি, নুলক আন্টিকে আমি খুব ভালো চিনি। কি হবে আজ? আমাদের কাউকে ছেড়ে দিবেন না দেখো।”

মীরা ফোনের কথা রেখে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল,“এত টেনশন করার কিছু নেই। তোমরা নর্মাল হও। আমি আছি তো।”
নাবিলা চৌধুরী ঠাস করে চেয়ারে বসে দু’হাতে মাথা চেপে ধরে হতাশ কণ্ঠে বলে উঠলেন,“দিভাই আমার উপর সব বিশ্বাস হারাবে। আল্লাহ জানে কি হবে!”
ঘড়ির কাটা প্রায় নয়টার ঘরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আমি ইতোমধ্যে অবজারভেশন উইন্ডো দিয়ে এক নজর দেখে আসলাম নোহাকে। অবস্থার কোনো উন্নতি হয় নি। বরং ক্রমশ খা’রাপ হচ্ছে। হঠাৎ কানে ভেসে আসল চিৎকার চেচামেচি। উপস্থিত আমরা সকলে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। করিডর দিয়ে এক প্রকার উন্মাদের মতো ছুটে আসছেন নুলক চৌধুরী। তার পিছু ছুটছে দেহরক্ষী দু’জন পুরুষ এবং একজন মহিলা। নুলক চৌধুরী এসেই নাবিলা চৌধুরীর বাহু শক্ত করে চেপে গর্জে উঠলেন,

–“মি’থ্যােবাদী, বেইমান! কি করেছিস আমার মেয়ের সাথে? আমার মেয়ের কি হয়েছে? তুই না বলেছিলি দেখে রাখবি? তাহলে কেন আজ আমার বাচ্চাটা মৃত্যুর সাথে লড়াই করে যাচ্ছে বাঁচার জন্য?”
আমার আর পলির সাহস হচ্ছে না এই মূহুর্তে নুলক চৌধুরীর সাথে কথা বলার। কেঁদে উনার মুখাবয়বের বিধ্বস্ত দশা। চোখ দু’টো অস্বাভাবিক লাল ঠেকছে। না, নুলক চৌধুরী এই মূহুর্তে একদমই ঠিক নেই। আর থাকবেনই বা কী করে? পৃথিবীর কোন মা নিজের নাড়িছেঁড়া সন্তানের এমন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণের খবর পেয়ে শান্ত আর নির্বিকার থাকতে পারে? নুলক চৌধুরী বাইরের জগতের কাছে কিংবা আমাদের কাছে যতই নি’ষ্ঠুর বা খা’রাপ হোন না কেন, নিজের সন্তানদের ক্ষেত্রে তিনি এক সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ। মীরা এগিয়ে গিয়ে নুলক চৌধুরীকে টেনে সরাতে সরাতে বলল,

–“মিমি শান্ত হও। পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা কর..”
নুলক চৌধুরী ঝটকা মে’রে মীরাকে দূরে সরিয়ে গর্জে উঠলেন,“তুই আমার সাথে কথা বলবি না। তুই থাকতে কি করে আমার মেয়ের এই অবস্থা হয়? ও মায়ের অপঘাতে মৃ’ত্যুর প্র’তিশোধ এখন আমার এইটুকু সহজসরল বাচ্চাটার উপর নিচ্ছিস তাই নারে?”
নুলক চৌধুরীর কথায় এক মূহুর্তের জন্য থমকে গেল মীরা। কি থেকে কি প্রসঙ্গ উঠল বোধে আসছে না। হাসপাতালের সকল ডাক্তার-নার্সরা জড়ো হয়েছেন। সকলে মানা করছে চিৎকার চেচামেচি না করার জন্য। কিন্তু নুলক চৌধুরী কারো কথায় আমলে তুলছেন না। নুলক চৌধুরীর গার্ডরা উনাকে শান্ত করতে চাইলে তারাও ব্যর্থ হয়। বাধ্য হয়ে আমি এগিয়ে গেলাম। নুলক চৌধুরী এখনো নাবিলা চৌধুরীর উপর রাগ ঝারছেন। আমি উনার বাহু টেনে নাবিলা চৌধুরীর থেকে সরাতে সরাতে বলে উঠলাম,

–“দেখুন আপনি শুধুশুধু আমাদের উপর চড়াও হচ্ছেন। আমাদের এখানে কোনো হাত নেই। নোহার কপালে এটাই লেখা ছিল। আল্লাহর উপর দিয়ে কি আমরা কখনো যেতে পারব? আপনি একটু শান্ত হোন। আমরা আপনাকে সবটা ব..
আচমকা আমাকে ধাক্কা মা’রলেন নুলক চৌধুরী। আমি খেই হারিয়ে পড়ে যেতে নিলে মীরা আর পলি ধরে নেয়। নুলক চৌধুরী ফের গর্জে উঠলেন,
–“অপয়া, কালনাগিনী। তুই বাড়িতে আসার পর থেকেই একের পর এক অলক্ষুণে ঘটনা ঘটছে। তুই একটা পিশাচিনী। তোর কারণেই আমার জীবন থেকে সবাই হারিয়ে যাচ্ছে। আজকে চৌধুরী বাড়ির সকলের ধ্বং’সের কারণ তুই। সবাইকে বিনাশ করে তর শান্তি হয় নি? এখন তুই আমার সরল মেয়েটাকে ধ্বং’স করতে চাইছিস? আমার মেয়েটা তর কি ক্ষ’তি করেছিল? সবসময় তো তোদের সকলের কথায় উঠতো বসত। আর তোরা কিনা ওকেই মে’রে দিতে চাইলি?”

–“বাস! অনেক বলে ফেলেছেন। আর একটা বাজে কথাও যদি ভাবিকে বলেছেন, ভাই কিন্তু আপনাকে ছাড়বে না। ভুলে যাবেন না আমাদের অবস্থান।”
ইনান হুশিয়ারি ভেসে এলো। হঠাৎ কোথা থেকে হৈচৈ শুনে সে ছুটে এসে দেখে এহেন পরিস্থিতি। নাবিলা চৌধুরী মাথা নিচু করে নিঃশব্দে অপরাধীর ন্যায় দাঁড়িয়ে আছেন। এদিকে ইনানের কথা শুনে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠলেন নুলক চৌধুরী। ইনানের উপর গর্জে ওঠে বলতে লাগলেন,
–“তোর মুখ বেশি বেড়ে গেছে না? নি’মকহা’রামের দল! ভুলে গেছিস তোদের দুইটার মা বাপ তোদের দুইটাকে জন্ম দিয়ে রাস্তায় ফেলে দিয়েছিল? আমার জামাই তোদের তুলে নিয়ে গিয়ে আশ্রয় দিয়েছে, খাইয়ে পড়িয়ে মানুষ করেছে। আর এখন আমার উপরই গলাবাজি করছিস। তোর মা মইন্নাটাও তো আমাকে শান্তি দেয় নি। তলেতলে কত কি করেছিল আমাকে শেষ করার জন্য। কি বাল ছিঁ’ড়তে পেরেছে আমার? উল্টে দেখ কার না কার হাতে প্রাণ হারালো…
নুলক চৌধুরীর কথাগুলো তখন বোধগম্য হয় নি। উনি এসব কি আজগুবি কথা বলছিলেন? ইনান কাকিয়ার ছেলে…সবই যেন আমার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। এদিকে বহু বছর ধরে লুকিয়ে রাখা সত্য এভাবে সকলের সামনে চলে আসায় ইনানের মস্তিষ্ক রা’গে ফেটে পড়ার উপক্রম। ছেলেটার চোখ দুটোর রঙ বদলে লালছে রূপ নিয়েছে। দু হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। রাগে চাপা গলায় বলে উঠল,

–“খাইয়ে পড়িয়ে মানুষ করেছেন নাকি না খাইয়ে-পড়িয়ে অমানুষ বানিয়েছেন? আমার মুখ খুলাবেন না নুলক চৌধুরী?”
মীরা পরিস্থিতি সমাল দিতে ইনানকে এখান থেকে সরিয়ে নিল। গার্ডরা চারপাশের সকলকে সরিয়ে উত্তাল পরিবেশ শান্ত করছে। হঠাৎ নাবিলা চৌধুরী তার দুর্বল দেহের ভার বহন করতে না পেরে হেলে পড়ে যেতে নিলে আমি আর পলি ধরে বসালাম। উনার চোখ দুটো ছলছল করছে। মনে হয় নুলক চৌধুরীর কথায় আর আচরণে আ’হত হয়েছেন।

আইসিইউ কেবিনের নিস্প্রাণ ও যান্ত্রিক নিস্তব্ধতার মাঝে, নোহার শয্যার পাশে পাথরের মূর্তির মতো বসে আছেন নুলক চৌধুরী। তাঁর কাতর, ঝাপসা ও অশ্রুসিক্ত দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে মেয়ের ফ্যাকাসে মুখাবয়বের ওপর। বুকের ভেতর জমে থাকা কান্নার পাহাড়টা এই মুহূর্তে হয়তো এক তীব্র চিৎকারে উগরে দিতে ইচ্ছে করছে তাঁর। কিন্তু এখানে এসব করা মেয়ের জন্য মোটেও ভালো কিছু বয়ে আনবে না। নিঃশব্দে তিনি কেঁদে যাচ্ছেন। কান্নারত অবস্থায় নিচু গলায় বলতে লাগলেন,
–“আমার সোনার কি হয়েছে? মায়ের উপর রাগ হয়েছে? আমি তো তোমাকে সাথে যেতে বলেছিলাম,কিন্তু তুমিই যেতে চাইলে না। কেন সেদিন আমার সাথে গেলে না মানিক? গেলে তো আজ আমাকে এই দিন দেখতে হতো না। খুব কষ্ট হচ্ছে তোমার? আমার মামনির খুব কষ্ট হচ্ছে?”
মেয়ের থেকে কোনো উত্তর আসে না। নুলক চৌধুরীর আরও বুক ফেটে কান্না আসছে। তিনি ফের বলতে লাগলেন,“কেন তুমি এত সহজসরল হলে আমার সোনা, আমার হিরা-মানিক? এই পৃথিবীতে সহজ মানুষদের যে সবসময় কষ্ট পেতে হয়। সবসময় অবহেলা কুড়াতে হয়। আমি কি করে দেখব তোমার এই কষ্ট? কেন হলো এমন তোমার সাথে..?”

শেষ বাক্যটি বলতে গিয়েই ভিরমি খেলেন নুলক চৌধুরী। অক্সিজেন মাস্ক লাগানো মেয়ের চেহারার পানে চেয়ে থেকে তিনি কি যেন বিড়বিড় করে গেলেন। মনে হচ্ছে যেন তিনি কোনো এক জটিল অংক মিলাতে মরিয়া হয়ে উঠলেন। হঠাৎ করেই নুলক চৌধুরীর চেহারার রঙ পাল্টে গেল৷ এক তীব্র হিং’স্রতা এসে হানা দিল তাঁর এতক্ষণের কোমল মুখাবয়বে। চোখে প্রতিশোধের আ’গুন দাউদাউ করে জ্বলছে যেন। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। অবচেতন হয়ে শয্যাশায়ী আদুরে মেয়ের পানে তাকিয়ে বিড়বিড়িয়ে কিছু আওড়লেন। অতঃপর দাপটে পায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে আসলেন। আমি এতক্ষণ ধরে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম৷ এভাবে নুলক চৌধুরীকে হুটহাট বেড়িয়ে আসতে দেখে কিছুটা ভরকে গেলাম। নুলক চৌধুরী পায়ের গতি হঠাৎই থামিয়ে পিছন দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। অতঃপর ঠোঁট বাকিয়ে নিঃশব্দে হাসলেন। আমার কাছে কি অদ্ভুত ভ’য়ঙ্কর ঠেকল ঐ হাসি। আমি কিছু ভাবতে পারলাম না। তার আগেই গটগট করে হেঁটে আমার চোখের আড়াল হয়ে গেলেন তিনি। আমি বেশ কিছুক্ষণ একই জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে এটা-ওটা ভাবলাম। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে স্থান ত্যাগ করলাম।

ঘড়ির কাটা ঘুরতে ঘুরতে রাত সারে দশটা নাগাদ এসে পৌঁছাল। রাত যত গভীর হচ্ছে আবহাওয়াও সেই অনুযায়ী রূপ বদল করছে। বাইরে ফুরফুরে হাওয়া বইছে। কখনো রাতের ওই একাকী আকাশের রূপালি পূর্ণিমার চাঁদটা এক টুকরো কালচে মেঘের আড়ালে মুখ লুকাচ্ছে, আবার কখনো আলো ছড়াচ্ছে। শহরের বড় বড় দালানকোঠাগুলো তখনও যান্ত্রিক আলোয় ঝলমল করছে। জিতু ভাইয়ার ফ্ল্যাট আজ অন্যরকম আলোক ঝলমলে। ফেইরী লাইটের বহর আর মোমবাতির আলোয় সারা ঘর আলোকিত। ফুলদানিগুলোতে তাজা ফুল সাজিয়ে রাখা। সারা ঘরে মনমাতানো ফুলের মিষ্টি সুঘ্রাণে মম করছে।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বালিকা ইতি। সামনে রাখা ফোনের স্ক্রিনে শাড়ি পরার টিউটোরিয়াল চলছে। আর সেটা অনুসরণ করে বালিকা নিজ দেহে লাল টকটকে শাড়ি জড়াচ্ছে। যা তাকে আগুনের শিখার মতো রাঙিয়ে তুলেছে। তার ঠোঁটের কোণে লেপ্টে আছে এক পশলা লাজুক হাসির চেনা রেশ। অনেকটা সময় ধরে আপ্রাণ চেষ্টার পর অবশেষে শাড়ি পরা সম্পন্ন করল মেয়েটা। অতঃপর গাঢ় লাল লিপস্টিকের ছোঁয়ায় আরও একটু রাঙিয়ে দিল নিজের পাতলা অধরযুগল। গায়ে জড়ানো টুকিটাকি স্বর্ণের অলংকারগুলো নিয়ন আলোয় চিকচিক করছে, যা তাকে শ্বশুরবাড়ির সবাই ভালোবেসে উপহার দিয়েছে। নিজে গোছগাছ করা শেষ হলে বালিকা কোমর ধরে হাঁপ ছাড়ল। মনে তো হচ্ছে আজ সারাদিন খুব পরিশ্রম করেছে।
ইতি দেয়াল ঘড়ির দিকে এক ঝলক তাকাল। পনে এগারোটা বাজে। বালিকা গালে এক আঙুল ধরে বিজ্ঞের মতো ভাবুক চেহারা করল। বিড়বিড়ালো,

–“ইশরে বারোটা বাজতো তো এখনো মেলা দেরি। কত আগে সেজে ফেলছি!”
ইতি চেহারায় বিরক্তি ভাব প্রকাশ করল। তক্ষুনি বাসার কলিং বেল বেজে উঠল। ধক করে উঠল বালিকার তনু বুক। ল’জ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো কোমল ত্বক। ছুটে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। এতে শাড়ির কুচিগুলো আরও এলোমেলো হয়ে গেল। ইতি দ্রুত হাতে ঠিক করতে লাগল তক্ষুনি আবার কলিং বেল বেজে উঠল। ইতি দরজা খুলতে যাবে অমনি স্বামীর নিষেধাজ্ঞার কথা স্মরণে আসল। সে মৃদু গলায় শুধালো,
–“কে?”
দরজার অপর পাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ আসল না। ঘাবড়ে গেল ভীতু মেয়েটা। ফের কলিং বেল বেজে উঠল। ইতি ভয়ে জড়সড় হয়ে পুনরায় শুধালো,
–“কে এসেছেন? কথা না বললে দরজা খুলব না, হু।”
–“মিমি এসেছে, সোনামা।”
পরিচিত গলার স্বর শুনে এক মূহুর্তে চেহারার ভয় সরে গেল বালিকার। খুশিতে আটখানা হয়ে জিজ্ঞেস করল, “নুলক মিমি এসেছ?”

–“হ্যাঁ, সোনামা।”
ব্যাস! আর এক মূহুর্ত দরজা খুলতে দেরি করল না ইতি। দরজা খুলতেই দৃষ্টিতে ধরা দিল কাঙ্ক্ষিত পরিচিত মুখ। বালিকা আহ্লাদে জড়িয়ে ধরল মায়ের বোনকে। নুলক চৌধুরীও জড়িয়ে ধরলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলেন,
–“কেমন আছ তুমি?”
–“আমি ভালো আছি মিমি। তুমি কেমন আছ?”
–“তোমাকে দেখে একদম ভালো ফিল করছি। তা আমাকে ভেতরে নিয়ে যাবে না?”
ইতি সোজা হয়ে দাঁড়াল। দাঁত দিয়ে জিহ্বা কামড়ে ধরে নিজ মাথায় আলতো থাপ্পড় দিয়ে বলল,“ইশরে ভুলি গেছি। আসো, আসো। ভিতরে আসো।”
নুলক চৌধুরী কাঁধে শাড়ি আঁচল টেনে ভেতরে প্রবেশ করলেন। ইতি দরজা লাগিয়ে ভেতরে এসে দেখল নুলক চৌধুরী সারা ঘরে দৃষ্টি বুলচ্ছে। বালিকা বলল,

–“মিমি এখানে সোফায় বস তুমি। আমি তোমার জন্য চা বানিয়ে আনি।”
নুলক চৌধুরী ইতির দিকে তাকালেন। আপাদমস্তক মেয়েটাকে পরখ করে নিলেন। অতঃপর বললেন,“একদমই না বাচা। আমি তো শুধু আমার সোনামাকে একনজর দেখতে আসলাম। শুনলাম সবে বিয়ে হয়েছে। আমার কাছে একদন্ত বস তো গল্প করি।”
নুলক চৌধুরী ইতির হাত ধরে পাশাপাশি সোফায় বসলেন। সহাস্যে বললেন,“আমি তো দেশের বাইরে ছিলাম তাই দেশের খবরা-খবর তেমন জানতেই পারি নি। এসে শুনলাম তোমার বিয়ে হয়ে গেছে! কদিন হলো বিয়ে হয়েছে আমার সোনামার?”
ইতি ঝটপট উত্তর করল,“এপ্রিলের ২৯ তারিখ বিয়ে হয়েছিল। আজ হচ্ছে মে মাসের সাত তারিখ।”
ইতি হাতের আঙুলের সাহায্যে গুনে বলল,“উওও…আজ বিয়ের নয়দিন চলছে মিমি।”
–“বাববাহ্ নয়দিন হয়ে গেছে বিয়ের!”
ইতি মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ বলল। নুলক চৌধুরী লক্ষ্য করল মেয়েটা বারবার দেয়াল ঘড়িতে সময় দেখছে। নুলক চৌধুরী ইতির গালে হাত রেখে শুধালো,“স্বামী বুঝি এখনো আসে নি বাড়িতে?”
ইতি লাজুক চেহারায় মাথা নাড়িয়ে বলল,“হু, উনি কাজে গেছেন। চলে আসবেন তাড়াতাড়ি।”
নুলক চৌধুরী আওয়াজ করে হেসে বললেন,“তাই বলি মেয়েটা বারবার ঘড়ি দেখছে কেন? স্বামীর জন্য বুঝি মন উতলা হয়ে আছে?”

–“ইশশ কি যে কও তুমি? আজকে তো উনার জন্মদিন। তাই আমি বারবার ঘড়ি দেখছি, উনাকে সারপ্রাইজ দিব। হিহিহি।”
নুলক চৌধুরী বিস্মিত হয়ে আরও মন খুলে হেসে বললেন,“ওওও তাই বলি ঘরদোর এত জমকালো কেন! আর মেয়েটা রাতবিরেত অমন পরির মতো সেজেগুজে বসে আছে কেন?”
লজ্জা পেল বালিকা। মিনমিন করে বলল,“দুরু মিমি কি যে বল?”
নুলক চৌধুরী ইতির থুতনি ছুঁইয়ে নিজ হাতে চুমু খেয়ে শুধালেন,“তো সোনামা কি কি আয়োজন করলে?”
–“ইউটিউব দেখে একটু পায়েস রেঁধেছি আর কেক বানিয়েছি। আর আর…
ইতি কথা শেষ করতে পারলো না। কারণ নুলক চৌধুরী ইতির হাত ধরে সোনার বালাগুলোকে নেড়েচেড়ে খুব মনযোগ দিয়ে দেখছেন। খেয়াল করে ইতি হেসে বলল,
–“মিমি এগুলো আমার চাচি শাশুড়ি দিয়েছেন।”
–“তাই?”
–“হু তো। আরও অনেক কিছু আমার শ্বশুর বাড়ি থেকে দিয়েছে।”
–“তাই! তো আর কি কি আমার সোনামাকে দিয়েছে শুনি!”
ঘড়ির কাটা ঘুরতে ঘুরতে রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা ঘরে পৌঁছাল বলে। নুলক চৌধুরী আর বেশিক্ষণ থাকলেন না। তিনি যেভাবে এসেছিলেন ঠিক সেভাবেই ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেলেন।

নুলক চৌধুরী হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই নাবিলা চৌধুরী মাথা ঘুরে পড়ে যান। ডক্টর চেক-আপ করে মেডিসিন দিয়ে গেছেন। অতিরিক্ত চিন্তিত থাকার কারণে উনার প্রেসার লো হয়ে গিয়েছিল। এখন ওনাকে পলির কাছে রেখে এলাম। মীরা কল দিয়ে বলল এক্ষুনি গার্ডেনে যেতে। এত রাতে গার্ডনে ডাকল কেন মেয়েটা?

নিজের প্রশ্নের কোনো উত্তর নিজের কাছে না পেয়ে ঠোঁট উল্টালাম। হাঁটতে হাঁটতে মাথার ওড়নাটা আরও একটু টেনে নিলাম। সেই বিকালে গোসল করে যে মাথায় খোপা করেছিলাম, এখনও এভাবেই রয়েছে। ওপরে শুকনো থাকলেও ভেতরে সব চুল ভেজা। নির্ঘাত এবার সর্দি-জ্বর বাঁধিয়ে ছাড়ব। না এবার দ্রুত পা চালাতে হবে। মীরার সাথে দেখা করে ঘরে ফিরে চুলগুলো মেলে শুকাব। দেখি আজ-কালের মধ্যে সকলকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যাব। হাসপাতালে থেকেই কি আর হবে। নোহার তো কোনো উন্নতি দেখছি না! ইনান আর মীরার কথাবার্তায় বুঝলাম কয়েকদিনের মধ্যে নোহাকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হবে। কি জানি নোহার বাবার কানে ইতোমধ্যে কিছু খবর গেল নাকি? নুলক চৌধুরী সেই কখন যে বেড়িয়েছে এখনো হাসপাতালে ফিরেননি। তিনি কোথায় গিয়েছেন উনার বডিগার্ডরাও সেই খবর জানে না। সব দিকে আমারই হয়েছে যত জ্বালা!
আপন মনে বকবক করতে করতে বাইরে বেরিয়ে আসলাম। চারপাশে ধমকা হাওয়া বইছে। আকাশের অবস্থা ভালো না। বোধহয় যেকোনো সময় ঝড়-তুফান হতে পারে। চারপাশ নিরব। সকলে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। ফোনের স্ক্রিনে সময় দেখে নিলাম। গার্ডেনের দিকে এগোতেই দেখি মীরা দাঁড়িয়ে। শুধু মীরা নয়, ইনানও আছে। আরও কেউ বোধহয় আছে। সেখান থেকে কথাবার্তার আওয়াজ সহ আর কিসের যেন একটা আওয়াজ আসছে। আমি আরেকটু এগিয়ে গিয়ে মীরাকে শুধালাম,

–“কী ব্যাপার, এত রাতে এখানে ডাকলে কেন?”
আমার গলা শুনে মীরা সহ ইনানও তাকাল। অতঃপর দুই ভাই-বোন চোখাচোখি করল। আমি এতে ভ্রুকুটি করে নিলাম। কিছু বলব তার আগেই পাশে যন্ত্রমানবের মতো দাঁড়িয়ে থাকা একদল গার্ড নজরে আসল। সহসা আমার মুখশ্রীতে বিস্ময় ফুটে ওঠল। চকিতে দৃষ্টি ঘুরালাম আরেকদিকে। একটা হেলিকপ্টার দাঁড়িয়ে, যার পাখাগুলো এখনো ঘুর্নায়মান। বোধহয় সবে ল্যান্ড করেছে! চতুর্দিকে মৌমাছির মতো গিজগিজ করছে কালো পোষাক পরহিত অ’স্ত্রধারী দেহরক্ষী। সবাইকে এড়িয়ে আমার দৃষ্টি আঁটকে গেল হেলিকপ্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কালোয় মোড়ানো বিশালদেহী অবয়বের উপর। যে আমাকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে কারো সাথে ফোনে কথা বলতে ব্যতিব্যস্ত।

আমি পলকহীন সেদিকে তাকিয়ে রইলাম। বুকের ভেতর ধুকপুক আওয়াজ হচ্ছে। আওয়াজ এত জোরেই হচ্ছে যে আমার মনে হচ্ছে আশেপাশের সকলের কান অব্ধি পৌঁছে যাবে। আমি ঢোক গিলালম। দু’হাতে কামিজ খামচে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলাম। বিশাল-দেহী অবয়বের লোকটা লং কোট ডিঙিয়ে প্যান্টের পকেটে এক হাত ঢুকিয়ে নড়েচড়ে দাঁড়াল। তখনই তার বেখেয়ালি নজর আটকাল আমার দিকে। সহসা ইফান থমকে দাঁড়াল। তার ধূসর বাদামী অক্ষিযুগল স্থির হলো আমার ভ্রমর কালো অক্ষিযুগলে। সর্বাঙ্গে কেমন একটা ঘোর লেগে গেল।

খনিকের মধ্যে আমার সংবিৎ ফিরল। আমি বুঝতে পারছি না এখন আমার কি করা উচিত? তার নিকট এগিয়ে যাব, নাকি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকব? ইফানের নিস্প্রভ অনুভূতিহীন দৃষ্টির তোপে সেদিকে আর তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। তক্ষুনি আমার দৃষ্টি এলোমেলো হয়ে পড়ল। ইফানও পলক ফেলল। হাতের ফোন পকেটে গুঁজে দাম্ভিক পদচারণে আমার দিকে অগ্রসর হলো। সেই সাথে কম্পিত হচ্ছে তার প্রশস্ত কাঁধ।
নিমিষের মধ্যেই ইফান আমার সন্নিকটে এসে দাঁড়াল। তখনো আমার দৃষ্টি এলোমেলো। অধরযুগল আর গলা শুকিয়ে এসেছে। ইফান আমাকে অবলোকন করে আরও কাছে এসে দাঁড়াল। তার বলিষ্ঠ বক্ষে আমার মিইয়ে যাওয়া এইটুকু শরীরখানা প্রায় ঠেকল বলে। উচ্চতায় ইফান আমার থেকে অনেকটা বেশি হওয়ায় সে খানিকটা আমার ওপর ঝুঁকে হাস্কি গলায় ডাকল,

–“বুলবুলি।”
সাড়া দিলাম না তার ডাকে। ইফান পুনরায় বলল,“লুক অ্যাট মি।”
আমি তাকালাম না। বরং আমার দৃষ্টি আরও এলোমেলো হয়ে গেল। ওর নেশা ধরানো গলার স্বর শুনে অভিমানে গলা ধরে এলো। চোখ ক্রমান্বয়ে ঝাপসা হয়ে আসছে। ইফান হাঁপ ছেড়ে আমার দু’গাল তার দু-হাতে আগলে নিল। আমি চোখ বন্ধ করে নিলাম। ইফান আমার কপালে আলতো ঠোঁট ছুঁইয়ে বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। তার গভীর আলিঙ্গনে এবার আমার সব রাগ অভিমান গলে জল হয়ে গেলো। আমি ওকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠলাম। এসব দেখে মীরা আর ইনান আমাদের একান্ত সময় দেওয়ার জন্য প্রস্থান করল। গার্ডরা সুদূরে মাথা আনত করে যন্ত্রমানবের মতো দাঁড়িয়ে রইল ঠায়।
ইফান আমার মাথায় থুতনি ঠেকিয়ে এক হাতে আমার পিঠ জড়িয়ে ধরে, অপর হাতে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আমি ওকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। ইফান বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে আমার চোখের কোণায় চিকচিক করা অশ্রুকণা মুছে দিল। হাস্কি গলায় হিসহিসিয়ে শুধাল,

–“আমার বুলবুলি। খুব বেশি মিস করেছিলে আমায়, জান?”
আমি নাক টানলাম। গাল ফুলিয়ে রেখে ওর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে সপাটে জবাব দিলাম,“হ্যাঁ, ভীষণ মিস করেছি। তবে তোমাকে নয়, তোমার ছোট ভাইকে।”
–“তাইই?”
–“হু।” আমি হাসি আড়ল করে মাথা ঝাঁকিয়ে প্রত্যুত্তর করলাম। আমার এহেন কথায় ইফান ঠোঁট কামড়ে ধরল। বাঁকা হেসে বলল,“ছোট ভাইও তার বান্ধবীকে খুব মিস করেছিল?”
–“ছি, অসভ্য একটা।”
আমি নাক সিটকালাম। ইফান নিঃশব্দে হেসে ফের আমাকে তার সাথে জড়িয়ে ধরল। আমার অধরকোণে বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে ছুঁইয়ে দিতে লাগল। তার চোখের ভাষা বুঝতে পেরে সরে যেতে চাইলাম। ইফান আরও শক্ত করে ধরল। আমি মানা করে বললাম,
–“কি হচ্ছে কি! ছাড় আমায়।”
–“উহু।”

–“দেখেছ আবহাওয়া কেমন? যেকোনো সময় বৃষ্টি নামবে। চল এখান থেকে।”
কে শুনে কার কথা? ইফান টুক করে আমার অধরকোণে চুমু খেল। আমি সরে যেতে চাইলে বাঁধ সাধল। আমি বিরক্ত মিশ্রিত নয়নে ওর দিকে তাকিয়ে বলতে চাইলাম,“ই..
আমাকে কিছু বলার ফুরসত না দিয়েই ইফান আমার ঠোঁট আঁকড়ে ধরল। বাধ্য হয়ে আপোষ হলাম। দু’হাতে ওর কলার চেপে ধরলাম। ইফান কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাকে ছেড়ে দিল। নিজেকে সংযত করে, জিহ্বা দিয়ে নিজ ঠোঁটের চারপাশের তরল আহরোণ করে নিল। বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে আমার ঠোঁট মুছতে মুছতে হিসহিসিয়ে বলল,
–“পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম, তোমাকে কাছ থেকে দেখার জন্য।”
–“তাহলে কেন গিয়েছিলে?”
–“দরকারী কাজ ছিল।”
–“কিসের এত দরকারী কাজ থাকে তোমার?”
ইফান ফের আমার দু গাল নিজের দু’হাতে পুড়ে আমার কপালে কপাল ঠেকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। আমি ওকে আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বাতাসের দাপট ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। আমি দু’হাত ইফানের বুকে ঠেকালাম। কিছু বলব তার আগেই শুনতে পেলাম সুদূর থেকে চিৎকার চেচামেচির আওয়াজ ভেসে আসছে। মস্তিষ্ক সচল হলো তৎক্ষনাৎ। ধ্যান ধরতেই পলির চিৎকার কানে ভেসে আসল। আমি আঁতকে উঠলাম,

–“এই, এটা পলির গলা না?”
ইফান আমার চোখের দিকে তাকাল। কিন্তু আমি কিছু বলার ফুরসত পেলাম। ইতোমধ্যে চিৎকার চেচামেচির আওয়াজ আর প্রকট হয়েছে। আমি ভেতরের দিকে ছুট লাগালাম। ইফানও গার্ডসদের এলার্ট করে দ্রুত আমার পিছু নিল।

সাড়ে এগারোটার পরপরই, এগারোটা চল্লিশের দিকে জিতু ভাইয়ার গাড়ি পার্কিং লটে এসে থামল। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। জিতু ভাইয়া নিজ ফ্ল্যাটের সামনে এসে চুলগুলো ঝেড়ে নিল। অতঃপর কলিং বেল চাপল৷ দুবার চাপার পরও ভেতর থেকে কারো সাড়া আসলো না। হঠাৎ তার মনে পড়ল সকালে বলে যাওয়া নিজের কথাটা। তিনি পরপর ডেকে উঠলেন,
–“ল’জ্জাবতী দরজা খোল।”
অপরদিক থেকে ফের নৈঃশব্দ্য। উনি এবার নাম ধরে ডাকলেন,“ইতি দরজা খুল, আমি এসেছি।”
এবারো ভেতর থেকে সাড়া আসল না। তাই চিন্তার সুক্ষ্ম ভাজ পড়ল তার কপালে। প্রথমে ভেবেছিলেন মেয়েটা বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে তাই দরজা খুলতে দেরি করছে। কিন্তু এখন তাঁর মন অশান্ত হয়ে পড়েছে৷ তিনি দরজায় কড়া নেড়ে ডাকতে যাবেন অমনি দরজা কিছুটা খুলে গেল। বিস্মিত হলেন জিতু ভাইয়া। তিনি দরজা আরও ফাঁক করে ভেতরে প্রবেশ করলেন। পুরো লিভিং রুমটা আলো-আঁধারিতে আচ্ছন্ন। চারদিকে ফেইরী লাইট আর মোমবাতির মৃদু আলো চারপাশকে কিছুটা দৃশ্যমান করে তুলেছে। জিতু ভাইয়া সামনে তাকাতেই তৎক্ষনাৎ নজরে আসলো তাঁর ল’জ্জাবতীকে। যে কিনা কোলে কুশন নিয়ে সোফার নরম পিঠে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। ইতিকে সুস্থ দেখে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন জিতু ভাইয়া। তিনি পায়ের জুতা খুলে রেখে, দরজা বন্ধ করে ভেতরে প্রবেশ করলেন। বাইরে থেকে আসায় ভীষণ ক্লান্ত তিনি। তাই এগিয়ে গিয়ে ইতির পাশে বসলেন। হাতের শপিং ব্যাগখানা পাশে রেখে সোফায় গা হেলিয়ে দিতেই নজরে পড়ল ঘরের আবহের উপর। পুরো রুম দৃশ্যমান নয়, তবে ঝাপসা আলোয় বেশ বুঝা যাচ্ছে আলাদা রকমভাবে গোছগাছ করা হয়েছে। হঠাৎ ঘরের এরূপ আবহ দেখে ভ্রুকুটি করলেন৷ কিন্তু বেশি ভাবলেন না।

জিতু ভাইয়া ঘুমন্ত ইতির শান্ত আদুরে চেহারায় পুনঃদৃষ্টি দিল। মূহুর্তেই তার দৃষ্টি আটকে গেল ঘুমন্ত স্ত্রীর পানে। মৃদু অন্ধকারে বালিকার সাজ চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। তিনি ইতিকে মুগ্ধ নয়নে দেখতে দেখতে নিচু গলায় ডেকে উঠলেন,“ল’জ্জাবতী…এই লজ্জাবতী ওঠে পড়। দেখ আমি এসেছি।”
মেয়েটার মধ্যে কোনো নড়চড় দেখা গেল না। জিতু ভাইয়া হাতে শপিং ব্যাগটা তুলে ধরে স্ত্রীকে ফের ডাকলেন,“দেখ আমি তোমার জন্য কি এনেছি! আমি নিজে গিয়ে তোমার জন্য একটা লাল বেনারসি, কাচের চুড়ি আর আলতা কিনে এনেছি। তুমি সেদিন আমার কাছে আবদার করেছিলে না? ওঠে দেখ একবার।”

এবারও ঘুমন্ত মেয়েটার থেকে কোনো প্রত্যুত্ত এলো না। বালিকা বধূ মেয়েটির এহেন ঘুম দেখে আনমনে হাসলেন তিনি। আলতো করে বালিকার বাহু ছুঁতেই ইতির এইটুকু দেহ হেলে আরেক পাশে পড়ে গেল। এক লহমায় থমকে গেলেন জিতু ভাইয়া। হাতের শপিং ব্যাগ আপনা-আপনি হাত কষে পড়ে গেল ফ্লোরে৷ তিনি তৎক্ষনাৎ ইতিকে বাহুডোরে আগলে নিলেন। সহসাই কেঁপে উঠলো তার বলিষ্ঠ দেহ। তার বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ল। কারণ বুকে জড়িয়ে ধরা মেয়েটার শরীর অস্বাভাবিক রকম ঠান্ডা। জিতু ভাইয়ার মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে গেছে। কাঁপা কাঁপা হাত ইতির নাসারন্ধ্রের কাছে ধরতেই শিউরে উঠলেন তিনি। মেয়েটার নিঃশ্বাস পড়ছে না। জিতু ভাইয়ার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। এই মূহুর্তে মস্তিষ্ক তার নিশ্চল হয়ে পড়েছে। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে অশ্রু কণা গড়িয়ে পড়ছে।
বাইরে আবহাওয়া খা’রাপ হচ্ছে। বৃষ্টির বেগ ধীরে ধীরে বাড়ছে। আকাশে বিদুৎ চমকাচ্ছে। ভারী বৃষ্টি পড়ার ছমছম আওয়াজ আর বিদুৎ চকমকানো শব্দ একত্রে মিশে বিকট আওয়াজের সৃষ্টি করছে। এই মূহুর্তে অন্য যেকোনো তীব্র শব্দও ফিকে ঠেকবে। এদিকে জিতু ভাইয়া উন্মাদের মতে নিথর ইতির সর্বাঙ্গ ঝাঁকিয়ে ডাকছেন। বালিকার থেকে কোনো সাড়া আসছে না। সে যে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এই ঘুম যে এ জীবনে আর ভাঙবে না। কিন্তু এ কথা তো জিতু ভাইয়ার মন মানতে নারাজ। তিনি ইতির হীম হয়ে আসা গালে হালকা থাপ্পড়ে ভাঙা গলায় ডাকছেন,

–“এই বোকা মেয়ে এমন করছ কেন? আমি কিন্তু খুব হার্ট হচ্ছি। প্লিজ আমার দিকে একবার তাকাও। দেখ আমি এসেছি। তুমি বলেছিলে তাড়াতাড়ি চলে আস, দেখ আমি কিন্তু সময়ের আগেই চলে এসেছি। তাহলে তুমি কেন অসময়ে চলে গেলে?”
পাগলের মতো আচরণ করছে জিতু ভাইয়া। তার মাথা কাজ করছে না। গলায় কিছু একটা আঁটকে গেছে। মনে হচ্ছে, এই বুঝি তার দম বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। সেই কান্নার শব্দ ঝড়-বৃষ্টির আওয়াজের সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। ইতিকে ঝাপটে ধরে কাঁদতে কাঁদত ভাঙা গলায় বলতে লাগলেন,

–“তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যেতে পার না। এটা কি হচ্ছে আমার সাথে! কেন হচ্ছে! এমন তো কথা ছিল না! তোমার সাথে যে এখনো সংসার গড়ায় হয় নি। তাহলে কি করে তুমি আমায় ছেড়ে চলে যেতে পার? না না না, এটা হতে পারে না! নিশ্চয়ই আমি দুঃস্বপ্ন দেখছি! তোমার কিচ্ছু হয়নি!”
বিধিবাম এটা কোনো দুঃস্বপ্ন নয়। কিছু মানুষের জীবনে কিছু কালবৈশাখী ঝড় প্রকৃতপক্ষে এক দুঃস্বপ্ন হয়েই নামে। যা জীবনের সবকিছু এক লহমায় তচনচ করে দিয়ে চলে যায়। কে জানতো জিতু ভাইয়ার জীবনেও এরকম এক ঝড় ওঠবে, যা তার জীবনটাকে এক লহমায় উলটপালট করে দিয়ে যাবে। প্রকৃতির তান্ডব আরও ভয়ঙ্কর হয়ে রুপ নিয়েছে। পুরো শহর বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ইতির নিজ হাতে সাজানো ঘরের ফেইরী লাইটগুলোও একত্রে নিভে গেছে। পুরো ঘরটা আজ তার জীবনের মতোই অন্ধকারে গূঢ় আঁধারে ছেয়ে গেছে। তার জ্বালানো মোমগুলো বাতাসের প্রবল ঝাপটায় দপদপ করে নিভুনিভু হয়ে এখনো জ্বলজ্বল করে প্রজ্জ্বলিত হচ্ছে। সেই হলদে আলোয় বালিকার দুধে-আলতা রঙের পুতুলাবরণ বদনখানি দৃশ্যমান। আজ যেন বিদায়কালে বালিকাকে আরও বেশী মায়াবতী আর রূপসী ঠেকছে। কি ভীষণ মায়াবী মুখাবয়ব। জিতু ভাইয়া কান্নারত ভাঙা গলায় এখনো মেয়েটাকে ডাকছে,

–“তুমি না থাকলে কি নিয়ে বাঁচব আমি? কাকে একটা নজর দেখার জন্য সব কাজ, ব্যস্ততা পায়ে পিষে ছুটে আসব? তুমি না আমায় বলেছিলে কখনো ছেড়ে যাবে না, তাহলে কেন ফাঁকি দিলে? কেন মিথ্যা মায়ায় জড়ালে? কেন আমার কাছে এত নিষ্পাপ নির্বোধ সেজে থাকতে বল?
এই লজ্জাবতী চোখ দুইটা খুল-নারে। চোখ খুলে দেখ তোর চুপ থাকা আমাকে মেরে ফেলছে। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে তোর এই আচরণে। এবার তো তাকা আমার দিকে। এই পাগলি এমন করছিস কেন? তুই না নির্বোধ, বোকাসোকা মেয়ে? কই তুই বোকা মেয়ে? এই তো কি দরুন অভিনয় করছিস। তাহলে তোর এই সরলতা দিয়ে কেন আমাকে ঘায়েল করলি? কেন বোকা সহজসরল সেজে আমার হৃদয়ের সবটা জুড়ে দখল করে নিলি….

“বোকাই তো আমি, ভীষণ বোকা আমি!”
দেয়াল ঘড়ির কাটা টিকটিক করে ঠিক রাত বারোটার ঘরে এসে থামল। তখনই হঠাৎ কোথা থেকে ভেসে এলো একটা মেয়ের আহ্লাদি গলার স্বর। জিতু ভাইয়া থমকে গেল। এই গলার স্বর সে চিনে, খুব ভালো করে চিনে। সহসা জিতু ভাইয়ার ঠোঁট প্রসারিত হলো। এই তো তার ল’জ্জাবতী ল’জ্জার পর্দা ভেদ করে তার সাথে কথা বলছে। জিতু ভাইয়া ইতির চেহারার উপর ঝুঁকে গেল। কিন্তু চেহারা তো সেই আগের মতোই নিশ্চুপ আর নিথর। তাহলে কে কথা বলল? মনে প্রশ্ন জাগল জিতু ভাইয়ার। তবে উত্তর খোঁজার আগেই ফের ভেসে আসল ইতির বাচ্চা কণ্ঠের মায়া জড়ানো আহ্লাদি গলার স্বর,
–“বোকা বলেই তো স্বামীর চোখের দিকে তাকিয়ে একটা কথাও বলতে পারি না। আপনার সাথে কথা বললে কি যে লজ্জা লাগে আমার। তাই তো সারাদিন ভেবে ভেবে খুব কষ্ট করে আমার মনের কথাগুলো লিখেছি রেকর্ড করে আপনাকে শুনাব বলে। আচ্ছা শুনন, একদম হাসবেন না কেমন? আমি কিন্তু আমার মন থেকে কথাগুলো বলছি, হু।”

জিতু ভাইয়া ইতির নিথর চেহারার পানে তাকিয়ে অস্থির হয়ে ওঠল। হাতরে ফোন প্যান্টের পকেট থেকে বের করে ফ্ল্যাশ অন করল। পুরো রুমে ঘুরাতেই পাশেই টেবিলের উপর দৃষ্টি স্থির হলো। নিভে আসা মোমবাতির ভীড়ে একটা আধপোড়া কেক দেখা যাচ্ছে। ঠিক তার পাশেই ইতির ফোনটা। জিতু ভাইয়া হাত বাড়িয়ে হাতে তুলে নিলেন। ঠিক তক্ষুনি ফোন থেকে ইতির গলা ভেসে আসল,
–“আপনি জানেন আমি কিছু নিয়ে এত ভাবতে পারি না। ভাবতে গেলেই চোখে ঘুম চলে আসে। কিন্তু আপনাকে প্রথম যেদিন দেখেছিলাম কেন জানি সেদিন প্রথমবারের মতো আমি অনেক ভেবেছিলাম। ছোটবেলায় দাদি আর কাকিয়া আমাকে রাজপুত্র আর রাজকুমারীর গল্প শুনাতো। আমি ভাবতাম আমিই সেই রাজকুমারী। কিন্তু আমার রাজপুত্র ছিল না। দাদি বলেছিল আমার রাজপুত্র হঠাৎ করেই একদিন আমার জীবনে আসবে। আর আমাকে নিয়ে ভূবণ ঘুরে বেড়াবে। আমি মুক্ত পাখির মতো তার সাথে জোট বেঁধে আকাশে উড়ে বেড়াব। বাইরের এই রঙবেরঙের জগৎটাকে চিনব।

একদিন আপনিও হঠাৎ করে আমার সামনে ধরা দিলেন। তাই তো আমি আপনাকেই আমার রাজপুত্র ভেবে বসেছিলাম৷ আপনাকে নিয়ে যত ভাবতাম ততই আমার অদ্ভুত রকম অনুভূতি হতো, যে অনুভূতি আমি আর কখনো অনুভব করি নি। আপনাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যে রাত ফুরিয়ে দিনের আলো ফুটে যেত আন্দাজই করতে পারতাম না। তবুও আপনাকে নিয়ে আমার ভাবনা শেষ হতো না।
আমি বাইরের পৃথিবীর সাথে একটুও পরিচিত নই, বিশ্বাস করুন। আমাকে পরিচিত হওয়ার সেই সুযোগটাই কেও কখনো করে দেই নি। তাই আমার কখনো কোনো আকাঙ্খাও ছিল না। আকাঙ্খা কি বুঝতামই না। কারণ চাওয়ার আগেই সব পেয়ে যেতাম। কিন্তু আপনাকে দেখার পর একটা আকাঙ্খা মনে বাসা বাঁধে। আমি আপনাকে খুব করে চাইতাম। আপনি ছিলেন আমার কল্পপুরুষ, আমার কল্পনার রাজপুত্তর। এই বোকা আমি সবার আড়ালে আপনাকে নিয়ে কত যে পাগলামি করেছি তা কেউ কখনো জানতেও পারে নি। আমিই জানতে দেইনি। আপনি শুধু আমার, একান্ত আমার। আমি এক আপনাকে ছাড়া আর কোনো বিষয় নিয়ে ভাবি নি, ভাবতেও চাই না।

আপনি জানেন আমি অনেক ভাগ্যবতী যে আপনাকে আমার করে পেয়েছি। কজন নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে নিজের কাছে পায়? আমি পেয়েছিল। বোধহয় আল্লাহ আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ বানিয়েছে।
স্বামীজান আপনি জানেন, আপনি যখন আমাকে লজ্জাবতী বলে ডাকেন তখন আমার মনে কি যে সুখ সুখ লাগে…! মন চায় আপনাকে জড়িয়ে ধরে একটা লম্বা… সুখের ঘুম দেই। আপনাকে দেখলেই আমার কেমন এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়, দম বন্ধ হয়ে আসে। বুকের পাঁজরে তীব্র প্রেমদহন হয়। ইচ্ছে করে মাটির নিচে ঢুকে লুকিয়ে পড়ি। শুনন, আমি যেখানেই লুকিয়ে থাকি না কেন, আপনি কিন্তু আমায় খুঁজে বের করবেন। আপনার শুরু থেকে শেষ পৃষ্ঠার ইতিকথায় যেন শুধুই এই বোকা ইতিই থাকে, হু। বিনিময়ে আমি আপনাকে পৃথিবীর সব… ভালোবাসা উজাড় করে দেব। আপনার সুখে দুঃখের সব কষ্ট ভাগ করে নিব।”
বলতে গিয়ে থামল সেই মন ভুলানো মিষ্টি গলার স্বর। মেয়েটার গলা শুনেই বুঝা যাচ্ছে বড্ড আবেগপ্রবণ হয়ে গেছে। থেমে এবার ভেসে এলো তার ধরে আসা গলার স্বর,

“শুভ জন্মদিন আমার জেন্টালম্যান। আমার সব আয়ু আপনার হোক। আপনার আগামী দিনগুলো খুব সুন্দর কাটুক। আপনার সব মনের আশা পূরণ হোক। আল্লাহর কাছে আমার এই প্রার্থনাই। আমি আপনাকে অনেক… ভালোবাসি। যতটুকু ভালোবাসলেও এ জীবনে আপনাকে পাওয়ার আকাঙ্খা পূরণ হবে না। ঠিক ততটুকু আপনাকে ভালোবাসি। আমি শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত আপনাকে ভালোবেসে যাব। আপনার সুস্থতা কামনা করব। আপনার সব দুঃখ-কষ্টের সঙ্গী হব। আর এমন করেই একদিন আমি আপনার বুকে মাথা রেখে শান্তির শেষ ঘুম দিব।”
জিতু ভাইয়া অশ্রুসিক্ত নয়নে ফোনের দিকে তাকিয়ে। যন্ত্রটি থেকে আর তার লজ্জাবতীর গলা ভেসে আসছে না। জিতু ভাইয়া ফোনটিকে শক্ত করে মুঠোবন্দি করে নিলেন। বালিকার বদনে উন্মাদের মতো অসংখ্য চুমু দিয়ে ভরিয়ে দিলেন। তার হীম হয়ে আসা দেহটিকে আরও শক্ত করে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলেন। চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে আওড়ালেন,

–“আজ গোটা শহরজুড়ে সবাই আছে, শুধু তুমিই নেই। বল বোকাফুল, কী করে একাকী বাঁচব আমি?”
রাত গভীর হতে থাকে। ঝড়ের তীব্রতাও ক্রমশ বাড়ছে। জিতু ভাইয়ার আর্তনাদগুলো চারদেয়ালেই আবদ্ধ হয়ে গুমরে ম’রছে। কেউ শুনতে পায়নি তার এই আর্তনাদগুলো। বাতাসের ঝাপটায় বেশিরভাগ মোম নিভে গেছে। আর কিছু প্রায় ফুরিয়ে আসা মোম দবদব করে প্রজ্জ্বলিত থাকার লড়াই করছে। জিতু ভাইয়ার আ’র্তনাদগুলো একসময় তার হৃদয়ে বিষাদের সুরে বেজে উঠেছে। বাইরের ভারী বৃষ্টিকণাগুলো যেন জমিনে পতিত হয়ে ছমছম আওয়াজ তুলে গেয়ে চলছে সেই বিষাদের সুর,

জাহানারা পর্ব ৮৮

“কী ভুলে গেছ ভুলে আমায়
আড়ালে একা?
হৃদয়ে দেওয়াল তুলে তোমার
হারালে কোথায়?….
আমার আকাশে আজ বরিসরন
কালো মেঘে ঢাকা এ মন
ফিরে তো পাবো না
তোমাকে কভু আর
হবে না তুমি তো আমার
খুলে মনোদ্বার, ভাঙ্গা মন-আমার
খুঁজে তোমাকেই বারে-বার…”

জাহানারা পর্ব ৯০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here