Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ৫৪

জাহানারা পর্ব ৫৪

জাহানারা পর্ব ৫৪
জান্নাত মুন

আমি বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকিয়ে।লোকটার চেহারা-ছবির করুন বেহাল দশা।দেখতে আগের মতো আর নেই। তবুও লোকটাকে চিনতে আমার একটুও ভুল হচ্ছে না।আমার সব ভাবনাগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। মৃত মানুষ কিভাবে এতগুলো বছর পর ফিরে আসতে পারে!নাকি কখনো মরেই নি!!
আমার শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা।তবুও নিজেকে কিছুটা সামলে ডেকে উঠলাম,”শা শামিন ভাই!!”
বোতল থেকে পানি খাচ্ছিল তক্ষুনি পরিচিত কারো কন্ঠ কর্ণধার হতেই শামিন ভাই চমকে উঠলো।তৎক্ষনাৎ সেদিকে ফিরে তাকাতেই আমাকে দেখতে পেল।শামিন ভাই অবাক হলো।তার চেয়েও বেশি চেহারায় আতংকের চাপ স্পষ্ট। আমার চোখদুটো টলমল করছে।আমাকে দেখে শামিন ভাইয়ের চোখও ভিজে উঠলো।আমি কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললাম,”আআপনি শামিন ভাই,তাই না।”

শামিন ভাইয়ের থেকে কোনো প্রতিত্তোর আসলো না।আমি ভেতর থেকে আসা কান্না গিলে পুনরায় বললাম,”আপনি শামিন ভাই-ই তো!কোথায় ছিলেন এতগুলো বছর? সবাই তো ধরে নিয়েছে আপনি মৃত।”
শামিন ভাইয়ের ক্লান্ত শরীর অনিয়ন্ত্রিত ভাবে কাঁপছে। আমি লক্ষ করলাম বিষয়টা।কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছে। আমি কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে বললাম,”কি হলো বলছেন না কেন,এতগুলো বছর কোথায় ছিলেন?কেন পালিয়ে বেড়িয়েছেন সবার থেকে?”

শামিন ভাই হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছে নিলো।অতঃপর কিছু একটা বলতে যাবে তার আগেই নজর আটকালো আমার পিছনে।আমাদের থেকে বেশ কিছুটা দূরে গান হাতে এদিক সেদিক তাকিয়ে কাউকে খুঁজছে মাহিন।শো-রুমের মিররে দেখা যাচ্ছে মাহিনের ক’জন গার্ডদেরও।তারাও হন্যে হয়ে কাউকে খুঁজছে।
শামিনের চোখমুখে দ্বিগুণ আতংকের চাপ ভেসে উঠলো।আমি এখনো প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে। কিন্তু কোনো উত্তর না পেয়ে আমি আবারও বলে উঠলাম,”কি হলো কিছু বলছেন না কেন?আপনার থেকে অনেক কিছু জানার আছে।সেদিন কি,,, ”

আমি বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারলাম না।তার আগেই হাতের বোতল ফেলে ছুট লাগালো শামিন ভাই।উনার এই কাজে আমি হতবিহ্বল।মূহুর্তেই যখন বিষয়টা বোধগম্য হলো তৎক্ষনাৎ আমিও শামিন ভাইয়ের পিছুপিছু ছুট লাগালাম।আসেপাশে মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে। আমি দৌড়াতে দৌড়াতে শাড়ির আচল পেঁচিয়ে কোমরে গুঁজে নিয়েছি।শামিন ভাই পাগলের মতো দৌড়াতে দৌড়াতে পুলিশ প্লাজা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমিও সমান তালে পিছু নিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলাম,
–“কোথায় পালিয়ে যাচ্ছেন আপনি?আমার এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া বাকি।সেদিন কি হয়েছিলো?কে জায়ান ভাইকে মেরেছিলো?থামুন বলছি।আমার হাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারবেন না।শামিন ভাইই থামুন বলছি……..”
শামিন ভাই আমার কোনো কথা কানে তুলছে না।তিনি প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে। আমি পিছন থেকে ছুটতে ছুটতে চেঁচিয়ে উনাকে থামতে বলছি।শামিন ভাই দৌড়াতে দৌড়াতে মাঝ বাজারে পৌঁছালো। আসেপাশে মানুষে ভরপুর। কেউ আমাদের মধ্যে আসছে না।তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে এই দৃশ্য দেখছে।আমি আরো জুড়ে পা চালালাম।

–“শামিন ভাই থামুন বলছি।নাহলে খুব খা’রা’প হয়ে যাবে।আপনি কিন্তু আমাকে চেনেন না।থামুন… ”
আমি দৌঁড়ানোর মাঝে রাস্তার পাশে বসে থাকা এক সবজিওয়ালার থেকে একটা পাতি লাউ ছু মেরে নিয়ে শামিন ভাইয়ের দিকে ছুড়ে মারলাম।লাউটা উনার পিঠ বরাবর গিয়ে পড়ে খন্ড খণ্ড হয়ে যায়।তিনি তাল সামলাতে না পেরে উপুড় হয়ে রাস্তায় পড়ে।আমি ছুটে গিয়ে ধরে ফেলি।শার্টের কলারে চেপে দাঁড়া করিয়ে হুংকার ছাড়লাম,,
–“পালাতে চাইছেন,আমার থেকে পালাতে চাইছেন!এতই সহজ আমার থেকে পালানো!!অনেক লুকোচুরি খেলেছেন।এবার আমার সব প্রশ্নের উত্তর করুন।কোথায় ছিলেন এতগুলো বছর?আপনি জানেন জিতু ভাইয়া আপনাকে পাগলের মতো খুঁজেছে।শুধু জিতু ভাইয়ায় নয়।পুরো সিআইডি টিম আপনাকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়িয়েছে।একসময় সকলে ধরে নিয়েছে আপনি আর নেই। কেন লুকিয়ে ছিলেন এতগুলো বছর?কি লুকিয়ে রাখতে চাইছেন?”
শামিন ভাই করুন কন্ঠে তাড়া দিয়ে বলে উঠলো,”জারা বোন আমার।আজ আমাকে যেতে দাও।তোমার জন্যই এত রিস্ক নিয়ে দেশে ফিরে আসা।আমি তোমাকে পরে সব সত্যি বলবো।কিন্তু আজ সময় নেই,,,,”
আমি শামিন ভাইয়ের মুখের কথা কেড়ে নিলাম,”সময় নেই মানে কি?আজ আপনাকে সব খুলে বলতে হবে।আমার হাত থেকে আজ আপনার ছাড়া নেই। কি হয়েছিলো সেদিন? আমার জায়ান ভাইকে কে মেরেছে?বলুন বলছি, বলুন…”

শামিন ভাই আমার হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য চটপট করছে।মনে হচ্ছে তার এখনই পালাতে হবে।নাহলে খুব বিপদ। তিনি এলোমেলো করে বলতে লাগলো,”জারা আমাকে যেতে দাও।আমি তোমাকে সব বলবো।তোমাকে সব কিছু বলার জন্যই নিজেকে খুব কষ্টে বাঁচিয়ে রেখেছি।গত চারটা বছর ধরে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। তোমাকে অনেক কিছু বলার আছে আমার। কিন্তু এখন সব বলতে পারবো না।আমাকে ছেড়ে দাও…”
–“এই ভুল আমি করবো না। খুব কষ্টে আপনাকে পেয়েছি। আজ আমার সব উত্তর চাই।কি হয়েছিলো জায়ান ভাইয়ের সাথে?কেন তাকে মেরে ফেললো?তিনি কি এমন জানতো যা জিতু ভাইয়ার থেকেও আড়াল করে রেখেছিলো?”

–“তুমি বুঝতে পারছ না এখন আমার পালানো দরকার। আমাকে দেখে ফেললে,,,,”
–“আমি থাকতে আপনাকে কেউ কিছু করতে পারবে না।আপনি শুধু বলুন আমার জায়ান ভাইকে কে মেরেছে?”
আমি আরও শক্ত করে শামিন ভাইয়ের কলার চেপে ধরলাম।তিনি বুঝতে পারছে এখন না বললে আমার হাত থেকে ছাড়া পাবে না।তাই তিনি বলার জন্য হাত দিয়ে সারা মুখ মুছে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজাল।অতঃপর শুকনো ঢুক গিলে বললো,”ভি স্যার।”
–“ভি স্যার!”
আমি পুনরাবৃত্তি করলাম।তিনি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে পুনরায় বললো,”ভি স্যার মানে ইফান স্যার,,”
–“ইফান কি?”
আমি উদগ্রীব হয়ে উচ্চারণ করলাম।শামিন ঠোঁট ভিজিয়ে আবারও খুব কষ্টে শুকনো ঢুক গিললো।অতঃপর ভয়াতুর কন্ঠে বললো,”জায়ান ভাইকে ভি স্যার মারেনি।”

–“হ্যাঁ আমি জানি ইফান মারে নি।সেদিন তার হাতে রিভলবার থাকলেও সেটা দিয়ে জায়ান ভাইকে শুট করে নি।যদি ইফান হতো তাহলে কবেই আমি ওকে নিজের হাতে খু/ন করতাম।তবে কে করেছে?উত্তর দাও।”
শামিন হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,”সেদিন স্যারকে ইফান স্যার কল করে ছাঁদে নিয়ে গিয়েছিলো ঠিকই।কিন্তু তিনি মারেন নি,,,,”
শামিন ভাইয়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই আবারও চেঁচিয়ে উঠলাম,”আমি জানি ইফান মারে নি।কে মেরেছে সেই নামটা বল?”
–“সেদিন ভাইকে মে,,,,,”
শামিন ভাই হঠাৎই থেমে গেলো।কোথা থেকে একটা বুলেট শামিন ভাইয়ের পিঠ ঝাঁঝরা করে দিলো।বাকি কথা সম্পূর্ণ করার আগেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল তিনি।উনি নিচে পড়ে যেতেই দেখলাম মাটিতে রক্তের ধারা বইছে।আমি বুঝতে পারছি না কি হয়ে গেলো।রাস্তায় পাবলিক সোরগোল আরম্ভ করেছে।

ইমরান গাড়িতে উঠে বসলো।হাতে একটা শপিং ব্যাগ।গাড়িতে আগে থেকেই বসে আছে পলি।আজ ইমরান বাড়িতেই ছিলো।পলি বাইনা ধরে বসার বাইরে বের হতে। বহুদিন ধরে বাড়ির বাইরে বের হয় না তাই একঘেয়ে লাগে তার।ইমরান তৎক্ষনাৎ পলিকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে।উদ্দেশ্য তাদের পুলিশ প্লাজা শপিং মল। কিন্তু উত্তরা থেকে গুলশান আসতে অনেকটা সময় লেগে যায়।আর পলি গাড়িতে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না, বমি হয়।
আজও পলি আসার পথে একবার বমি করে ফেলেছে। ইমরান ব্যাকুল হয়ে এখানে একটা ডক্টর দেখায়। পলির লক্ষ্মণগুলো দেখে ডাক্তার বললো প্রেগন্যান্সি টেস্ট করাতে।ইমরান পলিকে গাড়িতে বসিয়ে ফার্মেসী থেকে প্রেগন্যান্সি কিট আর কিছু ঔষধ নিয়ে আসলো।
ইমরান পলির দিকে শপিং ব্যাগটি দিলো।পলি মনমরা হয়ে ব্যাগটা হাতে নিয়ে বললো,”শুধু শুধু আনতে গেলে।আমার মনে হয় এবারও নেগেটিভ আসবে।”

ইমরান পলিকে নিজের কাছে টেনে বললো,”এমন বলে না বউজান।আমরা তো পরিশ্রম করছি।ইনশাআল্লাহ এবার পজিটিভ আসবে।আল্লাহর উপর ভরসা রাখ।”
পলি ইমরানের আদুরে কথা শুনে গলে গেলো।তাই নাক টেনে কাঁদতে কাঁদতে বললো,”আমাদের বিয়ের প্রায় দুবছর হতে চললো।কিন্তু এখনো একটা বেবি আসলো না।বাড়ির সবাই আমার দিকে চেয়ে। আমি লজ্জায় এখন কারো কাছে যেতে পারি না।যখন বাচ্চার কথা তুলে তখন আমার লজ্জা লাগে খুব।”
ইমরান পলিকে বুকে চেপে ধরে মাথায় চুমু খেয়ে বললো,”ইনশাআল্লাহ এবার সুখবর আসবে দেখো।আর না আসলে তাতেই বা কি।আমরা আগের চেয়ে আরও কঠোর পরিশ্রম করবো।বাচ্চা আসবে না মানে! একেবারে বাপ বাপ বলে চলে আসবে।”

ইমরানের কথায় কাঁদতে থাকার মধ্যেই পলি হেসে ফেললো,”ধ্যাত্তেরিকি। সবসময় ফাইজলামি।”
পলি গাল ফুলালো।ইমরান হেসে পলির নাক টেনে প্রেয়সীর ওষ্ঠে ডুব দিল।কয়েক মিনিটের মাথায় পলি ইমরানের বুকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিলো।পলি ল’জ্জা’য় অন্যপাশে ঘুরে বসে নিজের ঠোঁট মুছতে মুছতে রিনরিন কন্ঠে বললো,”ইশশ আপনার লজ্জা লাগে না।রাস্তায় এসব কি করছেন?”
ইমরান হাহা করে হেসে পিছন থেকে পলিকে জড়িয়ে ধরে পলির ঘাড়ে মুখ গুঁজে অসংখ্য চুমু খেতে লাগলো।পলি লজ্জায় ইমরানকে সরাতে চাইছে।ইমরান হাস্কি স্বরে বললো,”আমি রাস্তায় কোথায়! গাড়িতেই তো রোমান্স করছি।তুমি জান গাড়িতে ঐসবও করা যায়।”

পলি ধস্তাধস্তি থামিয়ে ইমরানের দিকে ফিরে অবাক স্বরে বললো,”ঐসব করা যায় মানে?”
ইমরান ঠোঁট কামড়ে হেসে নেকটাই লুজ করতে করতে বললো,”চল আমি তোমাকে বুঝিয়ে দেই।”
ইমরানের ইঙ্গিত করা বাক্য পলি বুঝতে পেরে লজ্জায় চোখমুখ খিচকে বললো,”ইশশ নি’র্ল’জ্জ লোক একটা।”
ইমরান পলির থুতনি ধরে নুইয়ে রাখ মুখটা তার দিকে তুলে পলির ঠোঁটে শব্দ করে চুমু খেয়ে বললো,”একটু নির্লজ্জ না হলে বাবা ডাক যে শুনতে পারবো না জান।”
পলি বেশ লজ্জা পাচ্ছে।হঠাৎই তাদের কানে আসে রাস্তায় কোনো একটা ঝামেলা হচ্ছে। পলি গাড়ির উইন্ডো দিয়ে মাথা বের করতেই দেখলো কাঁচামলে মানুষের ভীর।ইমরান পলির হাতে টান মেরে ভেতরে নিয়ে আসলো।

–“সোনা করছ কি!জান না তুমি, এভাবে মাথা বের করলে যেকোনো সময় দূর্ঘটনার ঘটে যেতে পারে।”
–“এত মানুষ চেচামেচি করছে কেন?মনে হচ্ছে ঝামেলা হয়েছে বড়সড়।”
–“এত মানুষ দেখে আমারও তো তাই মনে হচ্ছে। আমার বড় ভুল হয়ে গেছে। আসার সময় গার্ড নিয়ে বের হওয়া উচিত ছিলো।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেইফলি তোমাকে নিয়ে বাসায় ফিরতে হবে।আজকাল আমাদের বিরোধী দলের লোকেরা ওতপেতে থাকে, কখন কিভাবে ক্ষতি করা যায়।”
–“একদম ঠিক বলেছ গো।”
পলি তাড়াতাড়ি গাড়ির কাচ তুলতে যাবে তখনই ভীড়ের মাঝে কিছু লোক সাইড হতেই আমাকে নজরে পড়লো।তবে অনেকটা দূরে হওয়ায় ঠিক করে নিশ্চিত হতে পারছে না। পলি অবাক হয়ে ইমরানকে বলে উঠলো, “হে গো ঐখানে মহিলাটাকে ভাবির মতো লাগছে না?”
ইমরান তৎক্ষনাৎ বাইরে দৃষ্টি রাখতেই দেখতে পেলো আমাকে নিচে বসে থাকতে।ইমরান পলির মতোই কনফিউজড আর অবাক হলো।

–“আরে ভাবিই তো মনে হচ্ছে।জান তুমি গাড়িতে বস আমি গিয়ে দেখে আসছি।”
ইমরান চটজলদি গাড়ি থেকে নেমে পড়লো।পলির মন বসলো না।সেও পিছনে নেমে পড়লো।ইমরান তাড়াতাড়ি রোড ক্রস করতে যাবে।ঠিক তক্ষুনি এতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা হলুদ রঙের পিকআপ তেড়ে আসলো।ইমরান স্তব্ধ হয়ে গেলো।কি করবে বুঝতে পারছে না।যখন গাড়িটা প্রায় ধাক্কা মারবে ঠিক তখনই পিছন থেকে পলি ইমরানের হাতে টান মেরে গাড়ির সামনে থেকে সরিয়ে নিলো।ইমরান বুঝে উঠতে পারছে না কি থেকে কি হলো।পলি হু হু করে কেঁদে উঠলো।ইমরান নিজেকে আর পলিকে সামনে আমার কাছে ছুটে আসলো।
–“ভাবি কি হয়েছে?আর এ কে?

ইমরানের কথা আমার কান অব্ধি পৌঁছাতে পারছে না।পলি আমার এই অবস্থা দেখে কেঁদে উঠলো।আমার মাথা ঠিক নেই। আমার হাঁটুর কাছে শামিন ভাই র’ক্তা’ক্ত অবস্থায় ম’রণ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। আমি সকলের কাছে চিৎকার করে হেল্প চাচ্ছি। কিন্তু কেউ ঝামেলায় এগিয়ে আসছে না।বরং এখান থেকে অনেকটা দূরে সরে গেছে। আমি শামিন ভাইয়ের গালে হালকা থাপড়াতে লাগলাম। যাতে জ্ঞান না চলে যায়।আমার মাথা কাজ করছে না।সেই তখন থেকে কতবার জিগ্যেস করে ফেলেছি জায়ান ভাইয়ের খু’নির নাম বলতে।শামিন ভাই রক্তাক্ত অবস্থায় বলতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই আবার ভীড়ের মাঝ থেকে একটা বুলেট মাটিতে পড়ে থাকা শামিন ভাইয়ের বুকে এসে বিঁধলো।যাও কিছু মানুষ সাহায্য করতে এগিয়ে আসছিলো ঠিক তখনই দ্বিতীয় বুলেটটা সকালের মধ্যে আতংক ধরিয়ে দিয়েছে।
শামিন ভাইয়ের নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে।দেখেই বুঝা যাচ্ছে অবস্থা শঙ্কানীয়। আমি আবারও বলতে লাগলাম,”শামিন ভাই দয়া করে বলুন কে সে।প্লিজ বলুন না।আপনি না বললে আমি কার থেকে জানবো।দয়া করুন। আপনার কিছু হবে না। দয়া করে বলুন।”

এরই মাঝে ইমরান আতংকিত হয়ে বললো,”ভাবি লোকটা কে?দেখে তো মনে হচ্ছে গুলি করা হয়েছে।ব্লিডিং হচ্ছে অনেক। ইমিডিয়েটলি হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে।”
আমি আতংক ভরা চেহারায় ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললাম,”ভাই তাড়াতাড়ি হসপিটালে নেওয়ার ব্যবস্থা কর।”
ইমরান উঠে দাঁড়াল।সকলকে সাহায্য করতে বললো।এখানে মন্ত্রীর ছেলেকে দেখে জনগণ একটু ভরসা পেল।কয়েকজন এগিয়ে আসলো।আমি আবারও শামিন ভাইকে অনুরোধ করে বলতে লাগলাম,”শামিন ভাই আপনি তো জায়ান ভাইয়ের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিলেন। কেন উনার সাথে এমনটা করলেন?আপনি সব জেনেও কেন চুপ ছিলেন?কেন পালিয়ে বেড়িয়েছেন বলুন সব।কে আমার জায়ান ভাইকে মেরেছে দয়া করে বলুন।”
শামিন ভাইয়ের চোখ বন্ধ হয়ে আসছে।তবুও হাত বাড়ালো আমার দিকে।তিনি কিছু বলতে চাইছেন।আমি উনার হাত ধরলাম।কান ওনার মুখের কাছে এগিয়ে নিয়ে গেলাম।শামিন ভাই অস্পষ্ট স্বরে বিরবির করে বললো,

–“চ,,,”
–“হ্যাঁ বলুন আমি শুনছি।”
আমি উতলা হয়ে বললাম।শামিন ভাই পুনরায় বলতে যাবে তার আগেই কয়েকজন উনাকে ধরে তুলে নিলো।ইমরান আমাকে শান্তনা দিয়ে বললো,”ভাবি চিন্তা করবেন না। আমরা উনাকে এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি।”
ইমরান সহ কয়েকজন শামিন ভাইকে ধরে গাড়িতে তুলার জন্য নিয়ে যাচ্ছে। আমি বসা থেকে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালাম। সুমাইয়ারা আমাকে খুঁজতে খুঁজতে এদিকে এসে দেখতে পেয়ে ছুটে আসছে।আমি ইমরানদের পিছু যাওয়ার জন্য এক-দু’পা এগোতেই ইমরানরা থেমে গেলো।আমার বুক উঠানামা করছে।গলা শুকিয়ে আসছে।লোকগুলো শামিন ভাইকে নিচে রেখে বলাবলি শুরু করেছে শামিন ভাই মারা গেছে। দম আর নেই।আমার পায়ের তলার মাটিটা কেঁপে উঠলো।বিশ্বাস করতে পারছি না একটু আগের জলজ্যান্ত মানুষটা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছে।
এদিকে মাহিন আর আলাল দুলালও এদিকে দৌড়ে আসছে।মার্কেটে যখন মাহিন শামিন ভাইকে খুঁজছিল, তখনই আলাল দুলালের সাথে দেখা।আলাল দুলাল মাহিনের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।যখন খবর হয় আমি মার্কেট থেকে বেরিয়ে এসেছি।তখনই তারা আমাকে খুঁজতে খুঁজতে এদিকে আসে।
মাহিন যখন দেখলো মাটিতে শামিনের রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে তক্ষুনি তার পা থেমে যায়।মাহিন দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিয়েছে।ঘনঘন শ্বাস ছেড়ে দৌড়ে শামিনের কাছে আসলো।সবাই বললো মারা গেছে। মাহিনের চোখমুখ শক্ত হয়ে এসেছে।আরেক পাশে ফিরে রাগে মাথার চুল টেনে বিরবির করলো,

–“ওহ্ শীট।এখন আমি ভাইকে কি জবাব দিব?”
পলি আমার এমন অবস্থা দেখে কিছু বলতে পারছে না।সুমাইয়ারা এসে আমাকে র’ক্তা’ক্ত দেখে আঁতকে উঠলো।সবাই কান্না শুরু করে দিয়েছে।তন্নি বেকুল হয়ে আমাকে বলে উঠলো,”এ জাহান তর শরীরে এত রক্ত কেন? তোর কি হয়েছে? আর ঐ লোকটা এভাবে পড়ে আছে কেন?রাস্তার মানুষের থেকে শুনলাম কোন মেয়ের সাথে ছেলের ঝগড়া হচ্ছিল। তখনই নাকি লোকটাকে গুলি করে কেউ।”
–“আমি পারলাম না। আমি শামিন ভাই কে রক্ষা করতে পারলাম না।পারলাম না আমি জায়ান ভাইয়ের খু’নিকে খুঁজে বের করতে।

আমি হতাশ হয়ে অসহায় ভেজা কন্ঠে বললম।আমার কথা শুনে তন্নিরা একত্রে বলে উঠলো, “শামিন ভাই!!”
তন্নিরা শামিন ভাইকে খুব ভালো করে চিনে। কতবার শামিন ভাইকে জায়ান ভাইয়ের সাথে দেখেছে। কথাও হয়েছে। তন্নিরা হু হু করে কেঁদে উঠলো।মাত্র দশ বারো মিনিটের ঘটনায় সব শেষ। রাস্তার পাবলিক স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে। পুলিশ কে ইনফর্ম করা হয়েছে।ওসি সহ গুলশান থানার স্টাফরা আরেক জায়গায় চলে গেছে। যার ফলে বনানী থানা থেকে পুলিশের টিম আসছে।বনানী পুলিশ সিআইডি কেও আসতে বলেছে।

জাহানারা পর্ব ৫৩

আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।হাত-পা অসার হয়ে গেছে। আমার দৃষ্টি এখনো পড়ে থাকা রক্তাক্ত শামিন ভাইয়ের লা’শের উপর।একটু আগে যেদিক থেকে শামিন ভাইয়ের উপর গুলি চালানো হয়েছে।সেদিকেই জনগণের ভীড়ের মধ্যে আড়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কালো হুডি পড়া একজন লোক।মুখে মাস্ক আর মাথায় হুডি টেনে রাখার ফলে চোখমুখ আড়াল হয়ে আছে।সবাই যখন শামনি ভাইয়ের লাশের দিকে মনযোগী ঠিক তখনই লোকটা আস্তে আস্তে রিভলবার বের করলো।অতঃপর আমার দিকে নিশানা তাক করলো।বন্দুকের নল আমার বুকের সোজাসুজি। লোকটা আমাকে টার্গেট করে ট্রিগারে আঙ্গুল রাখলো।

জাহানারা পর্ব ৫৫