Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ৬১

জাহানারা পর্ব ৬১

জাহানারা পর্ব ৬১
জান্নাত মুন

অল্পবয়সী মেয়েটা কল্পনাও করেনি কখনো যে এভাবে আচমকা বিয়ে হয়ে যাবে।পলি অযাচিত ভয় আর দ্বিধায় জড়সড় হয়ে বসে।আজ মেয়েটার সারাদিন ছোট্ট ইতি আর দাদির সাথে ভালোই কেটেছে। কিন্তু এখন ? অচেনা পুরুষ নামক লোকটার ঘরে সেজেগুজে বসিয়ে রাখা হয়েছে তাকে। ঘড়ির কাটা রাত সারে বারোটার ঘরে। পলি মাথায় ঘোমটা টেনে সাজানো গোছানো বিছানায় বসে।সারা ঘর তাজা ফুলের গন্ধে ম ম করছে। নাজুক মেয়েটা নিজের ভেতরকার অস্থিরতায় শাড়ি খামচে ধরছে বারবার।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রুমে আসল ইমরান। ইমরান গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের উপস্থিতি বুঝাল। লোকটার কন্ঠস্বর শুনে পলির ভেতরের অস্থিরতা আরো বেড়ে গেল।মেয়েটার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। সে প্রতিবেশী ভাবীর কাছে শুনেছিল বাসর রাতে কি হয়।আচ্ছা এখন কি তার সাথেও হবে?এসব ভাবতেই পলির বুক ধুকপুক করতে লাগল।কিন্তু এমন কিছু হল না।ইমরান বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল।তেসরা চোখে নিজের সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকেও দেখে নিল।

ইমরান হয়তো কল্পনাও করেনি ফুলের মতো কোমল সুন্দর মেয়েটা তার বউ হয়ে যাবে। ইমরান আনমনে হাসল। কিন্তু এভাবে ওরা দুজন আর কতক্ষণ বসে থাকবে। ইমরান শুকনো কেশে বলল,”তোমার নাম কি?”
এতক্ষণের নিরবতা ভেদ করে ইমরানের পুরুষালি কণ্ঠস্বর পলির কানে যেতেই তার বুকটা কেঁপে উঠল।পরক্ষণেই ইমরানের কথাটা কানে বারি খেল। ইমরান আবার তার নাম জিজ্ঞেস করছে কেন? কাল কতবারই তো তার নাম শুনেছে। আর নিজের বউয়ের নামই জানে না!! পলির থেকে উত্তর না আসায় ইমরান বেশ লজ্জা পেল। সে বুঝতে পারছে বোকা প্রশ্ন করে বসেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আবারও শুকনো কাশল।কিছু বলবে তার আগেই পলির রিনরিন কণ্ঠস্বর ভেসে আসল,

–“আমার নাম অনামিকা পলি।”
ইমরানের কানে বারবার এই বাক্যটা আওয়াজ তুলছে। যেমন মিষ্টি মেয়ে তেমন মিষ্টি নাম। ইমরান মনে মনে মাআশাল্লাহ বলল।তারপর আবারও নিরবতা। খানিক সময় ইমরান ভাবল সদ্য বিবাহিত মেয়েটার সম্পর্কে আসলেই তো তার কিছু জানা হল না।আচ্ছা মেয়েটা কি এই বিয়েতে রাজি আছে? বিয়ের সময় তো কেউ তার মত জানতে চায় নি। মনের উশখুশ দূর করতে ইমরান জিজ্ঞেস করতে চাইল পলি বিয়েতে রাজি কিনা।কিন্তু সেটা না জিজ্ঞেস করে বলে উঠল,”আপনার কি কাউকে পছন্দ আছে?”

নতুন বরের মুখে এমন কথা শুনে পলির দমবন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। ইমরান সাথে সাথে নিজের ভুল শুধরে নিয়ে বলল,”সরি সরি। অ্যাকচুয়ালি আমি সেভাবে বলতে চাইনি।আসলে আমি বলতে চাইছিলাম আপনি এই বিয়েতে হ্যাপি তো।আই নো এই বিয়েটা আর পাঁচটা বিয়ের মতো হয় নি।আমারই দোষ হয়তো।পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিবেন।আমি আপনাকে কোনো কিছুর জন্য জোর করব না।আজকালকার ছেলেমেয়েদের তো নিজেদের একটা অপিনিয়ন থাকে।আপনার যদি কিছু বলার থাকে তাহলে বলতে পারেন।আপনার মতকেই সবচেয়ে বেশি প্রায়োরিটি দেওয়া হবে।আপনি কি কাউকে পছন্দ করেন?

ঘোমটার আড়ালে থাকা পলির চোখদুটো হঠাৎই জলে টইটম্বুর হয়ে উঠল। একই তো অচেনা লোক।তারউপর এসব কি ধরনের কথা বলছে।ইমরান কোনো উত্তর না পেয়ে পলির দিকে তাকাল।কি সুন্দর লাল টুকটুকে বউ সেজে মাথায় ঘোমটা টেনে বসে আছে। যদি ঘোমটা না থাকত তাহলে দেখতে পেত মেয়েটার ভেজা নয়ন জোড়া। পলি একটা ঢোক গিলল।কেন জানি এই মূহুর্তে তার গলা কেউ টিপে ধরেছে মনে হচ্ছে তার।চাইলেও কিছু বলতে পারছে না।অতঃপর নিজেকে ধাতস্থ করে কিছু বলতে যাবে তখনই ইমরান বেড থেকে বালিশ নিতে নিতে বলল,”আপনি অনেক ক্লান্ত ঘুমিয়ে পড়েন।”

ব্যস আর কি।কথাটা শুনে যেন পলির ভেতরে প্রাণ আসল।সে গুটিসুটি মেরে গুমিয়ে পড়ল।একবার যদি চোখ তুলে দেখত, তাহলে হয়ত ইমরানের ঘায়েল হওয়া দৃষ্টির উত্তাপে বশীভূত হত। ইমরান সোফায় শুয়ে ঘুমাবার আগ পর্যন্ত নিজের নব বধূর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।আসলেই কি সেই রাতে ইমরানের ঘুম হয়েছিল?নাকি বেডে শুয়ে থাকা রমনীকে দেখতে দেখতে রাত পেরিয়েছিল?
পলি তার বিয়ের ফাস্ট নাইটের কথা শেষ করতেই বেশ উদাস হয়ে গেল।ফারিয়া, নোহা আর ইতি খুব মনযোগ দিয়ে গল্পটা শুনছিল।হঠাৎ পলি থেমে যেতেই ওদের হুঁশ ফিরল।ফারিয়া দু’গালে হাত ধরে বলল,”তুমি কত বোকা গো পলি ভবি।বিয়ের প্রথম রাতেই জামাইয়ের আদর সোহাগ থেকে বঞ্চিত হলে।”
ফারিয়ার কথায় পলি ধ্যান থেকে বেরিয়ে এসে লাজুক হাসল। মুখে হাত ধরে লাজুকতার সাথে বলল,”প্রথম দিন পাইনি তো কি হয়েছে। এখন তো পাই।”

–“তারপর কি হয়েছিল?”
পলি ইতির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসল। সহজসরল মেয়েটার চোখেমুখে জানার কত আগ্রহ। পলির এহেন চাহনিতে ইতি লজ্জা পেয়ে মাথা নামিয়ে নিল।পলি লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলল,”তারপর আর কি।পরদিন রাতেও তোমার ভাই সোফায় শুয়েছিল।ওর শুতে অসুবিধা হচ্ছে তাই ভদ্রতার খাতিরে বললাম পাশে এসে ঘুমাতে।আমি ভেবেছিলাম আসবে না।ওমা দেখি এসে আমার পাশে শুয়ে পড়েছে। তারপর আর কি। আমার সাথে এটা ওটা গল্প করতে থাকে।আর আমি তার কথার জালে ধরা দিই।তারপর যা হয় আরকি।কখন যে অচেনা লোকটা আমার এতটা কাছে এসে এতটা আপন হয়ে গেল আমি নিজেও জানি না।সেই রাতের পর থেকে লোকটাকে নিজের নিজের লাগে।”
ফারিয়া চোয়াল ঝুলিয়ে বলল,”তোমরা কত লাকি।আর আমাকে দেখ।জামাই তো দূর, আমার বপ্পেনই দুদিনের বেশি টিকে না।”

–“কেন টিকে না?”
ফারিয়া পলির কাঁধে মাথা রেখে বলল,”প্রথম দুদিন ঠিকই চলে।পরে যখন শপিং এ যেতে বলি তখনই হ্যালো হাই বাই বাই।”
ফারিয়ার কথা শুনে তিনজন উচ্চস্বরে হেসে দিল।ফারিয়া মুখ মুচড়ে বলল,”হয়েছে আর হাসার লাগবে না।জীবন টায় তেজ পাতা।ইশশ আমার জীবনেও যদি মেডামের মত একটা ভিলেন থাকত ।তাহলে নিশ্চয়ই আমার সব আবদার পূরণ করত।আর আমি তাকে এত্তো এত্তো ভালো…”

বলতে গিয়ে আচমকা থেমে পড়ল ফারিয়া। তার নজর আটকালো সিঁড়ির দিকে।ড্যাশিং লুকে পঙ্কজ সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে । ফারিয়া হা করে তাকিয়ে পঙ্কজ কে দেখতে লাগল।একদম দেখতে বিদেশিদের মতো ফর্সা আর সেই লম্বা।যদিও এই বাড়ির প্রতিটি ছেলে সুন্দর আর লম্বাচওড়া। তবে পঙ্কজের ক্ষেত্রে নোহার মতো বিদেশি একটা ভাইব আছে । ব্রাউন চুলগুলো জেল দিয়ে সেট করে রেখেছে। আবার বাম কানে স্টাড কালো পাথরের ইয়ার রিং। ফারিয়া হা করে পঙ্কজের দিকে তাকিয়েই রইল।পঙ্কজ নিচে তাকাতেই দেখল ফারিয়ার মুগ্ধ চাহনি। পঙ্কজ বাঁকা হেসে চোখ মারল।ফারিয়ার চোখের পলক পড়ল তৎক্ষনাৎ। আজ ওর জায়গায় অন্যকেউ হলে নিশ্চয়ই পঙ্কজ কে ভালো চোখে দেখত না।কিন্তু ফারিয়ার এই বিষয়টাও মনে ধরল।পঙ্কজ ফারিয়ার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে ঘাড়ে হাত বুলাতে বুলাতে বেড়িয়ে গেল।

সময়ের সাথে সাথে সন্ধ্যা প্রায় নেমে এলো। পশ্চিম আকাশে সূর্য প্রায় ডুবে যাচ্ছে। চারদিকে কি চমৎকার লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে। দৃশ্যটা ভীষণ অপূর্ব। আমি মাচার উপরে বসে এই দৃশ্যটা এনজয় করছি। দক্ষিণা হাওয়ায় শরীর কাপিয়ে দিচ্ছিল বলে ব্রেইঝারে আ’গু’ন জ্বা’লা’নো হয়েছে একটু আগে।এখন অবশ্য উষ্ণ অনুভব করছি।আমার কোলে একটা সাদা পার্সিয়ান বিড়াল। কি এক কান্ড! গতকাল ফোনে রিলস দেখছিলাম। তখনই একটা বিড়ালের ভিডিও আসে।আমি পেইজে ঢুকে কিছু ভিডিও দেখি।আর সেই খবর এই ইফান নামক লোকটা কিভাবে যেন জেনে গেল।এখন কিছুক্ষণ আগে একটা লোক বিড়ালটি আমায় দিয়ে গেছে। ইফান নাকি কিনে এনেছে।
আমার কোলের উষ্ণতা পেয়ে বিড়ালটা ঝিমচ্ছে।কি যে কিউট দেখতে!!সারা দেহ সাদা পশমে ভর্তি। আমি মেকি হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম।তৎক্ষনাৎ মিয়াঁও বলে ডেকে উঠলো।আমি খুশি হয়ে বিড়ালটাকে একটু চুমু দেওয়ার জন্য ঠোঁট এগোতেই ইফানের নিষেধাজ্ঞা কানে আসে, “উমম বেইস ডোন্ট ডু দিস।”
আমি ইফানের দিকে তাকাতেই দেখি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখমুখ স্বাভাবিক। আমি চোখ সরু করে শুধালাম,”কেন? কি সমস্যা?”

–“অনেক সমস্যা। তুমি এখনো আমাকে কিস কর নি।তাহলে এটাকে কেন করবে?”
কি অদ্ভুত কথাবার্তা! আমি নাক ছিটকালাম।আবার বিড়ালটার শরীরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বিরবির করে ইফানকে এক দুটো গা’লিও দিয়ে দিলাম।হঠাৎই মনে পড়ল বিড়ালটার একটা নাম থাকলে ভালো হয়। আমি ইফানকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা ওর নাম কি?”
–“জানি না।”
–“জান না মানে কি?তুমি ওকে এনে দিয়েছ। আর তুমি জান না।”
ইফান মাথা নাড়িয়ে না বলল।আমি ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বললাম,”ঠিক আছে। এখন ওর কি নাম রাখব?”
–“তোমার যা ইচ্ছে, জালু-মালু।”
–“ইফাআআন।”
আমি দাঁত কটমট করে চেচিয়ে উঠলাম। ইফান উচ্চ স্বরে হেসে দিয়ে বলল,”তোমার পছন্দ মতো একটা রেখে দাও সোনা।”
আমি বেশ কিছুক্ষণ ভাবলাম। অতঃপর বললাম,”নিম্মি টা কেমন?”

–“ভালো।”
ইফান ছোট্ট করে উত্তর দিল।আমি খুশি মনে নিম্মিকে আদর করতে করতে বলালম,”ঠিক আছে ওর নাম নিম্মি।”
এরই মাঝে সব জায়গায় লাইট জ্বলে উঠল।চারপাশে যেন আলোর খেলা। আহা কি সুন্দর এই দৃশ্য। চারপাশ কত খোলা-মেলা নীরব। কিছু একটা ভেবে আনমনেই বলে উঠলাম, “জায়গাটা অনেক সুন্দর তাই না?”
ইফান ফোনে কিছু একটা করছে সেই কখন থেকে।মনে হচ্ছে কারো সাথে চ্যাট করছে।আমি একবার খেয়াল করেও এড়িয়ে গেলাম।
–“আমার তো যেতেই ইচ্ছে হচ্ছে না।এখানে যদি একটা বাড়ি থাকত তাহলে এখানেই থেকে যেতাম।”
–“আচ্ছা।”
আমি ব্রু কুঁচকে ইফানের দিকে তাকালাম। ওর বেখেয়ালি ভাব আমার কেন যেন সহ্য হচ্ছে না।কি এমন আছে ফোনে যে আমাকে উপেক্ষা করছে!আমি চোয়াল শক্ত করে বললাম,”আচ্ছা আবার কি, হ্যাঁ?”
ইফান আমার দিকে তেসরা চোখে চেয়ে বলল,”বাড়ি করে দিব।”
আমি দাঁতে দাঁত পিষে বললাম,”করে দিবে মানে কি?এমন ভাব করছ জায়গাটা তোমারই।”
ইফান হালকা হেসে বলল,”আমার কেনা না বাট এখন আমারই।”

–“মানে?”
–“এখানের আসেপাশের সব আমার নানা ভাইয়ের জায়গা।আর তিনি আমার মমকে উনার সকল প্রোপার্টি লিখে দিতে চেয়েছিলেন। বাট মম নানা ভাইকে দিয়ে সব আমার নামে করিয়েছে।এন্ড নাও আ’ম দ্য লিগাল ওনার অফ দিস ল্যান্ড।”
নানা ভাই নামটা ইফানের মুখে শুনতেই খেয়াল আসল বিয়ের পর থেকে তো কখনো ইফানের নানা নানির কথা শুনি নি। শুনবই বা কিভাবে? না আমি কখনো জানতে চেয়েছি।আর না তো কেউ নিজে থেকে বলেছে। আমি গলার স্বর নিচু করে ইফানকে শুধালাম,”তোমার নানা কোথায়? কখনো তো তাদের সম্পর্কে শুনি নি।”

–“আমি জন্মের আগেই ওপরে টপকে গেছে।”
–“মা’র বাবার বাড়ির আর কেউ নেই। আমি বলতে চাইছি তোমার মামা…
–“মম আর মনি দুই বোন ছাড়া নানা ভাইয়ের আর কোনো সন্তান ছিল না।
আমার মনে হয় নানা ভাইয়ের নুনুর পাওয়ার কম ছিল।তাই আর একটা পিসও আসে নি।”
ইফান নিজের কথা শেষ করেই উচ্চ স্বরে হেসে দিল।আমি দাঁতে দাঁত পিষে বললাম, “অসভ্য একটা।”
পরক্ষণেই ইফানের কথায় হঠাৎই একটা প্রশ্ন মনে আসল।নানা ভাই সকল সম্পত্তি নাবিলা চৌধুরীকে দিয়ে দেয় মানে?মনের ভেতরের জেগে উঠা প্রশ্নের উত্তর পেতে ইফানকে জিজ্ঞেস করলাম,”তোমার নানার সব কিছুরই কি এখন মালিক তুমি?”

–“হুম।”
–“নুলক আন্টিকে কি কিছু দেয় নি নাকি?”
হঠাৎই ইফানের হাত ফোনে থেমে গেলো। সম্পূর্ণ মনযোগ দিয়ে আমার চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।আমি ওর এমন দৃষ্টিতে বেশ অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম।ইফান শীতল কন্ঠে বলল,”নট মেইবি।”
–“কেন?”
আমি তৎক্ষনাৎ পাল্টা প্রশ্ন করলাম।ইফান বাঁকা হেসে হেয়ালি কন্ঠে বলল,”সিআইডিদের মতো জেরা করছ দেখছি।”
আমি ওর এহেন কথয় বিব্রত হয়ে দৃষ্টি সরিয়ে শুকনো কাশলাম। ইফান আবার উচ্চ স্বরে হেসে বলল,”জানি না কেন।শা’লা তখন আমি পয়দা হইনি।নাহলে সব হিস্ট্রি জেনে তোমাকে বলতে পারতাম।”

–“তুমি তোমার নানাকে দেখনি?”
আমি সহসা প্রশ্ন করলাম।ইফান পকেটে ফোন ঢুকিয়ে নিজের উরুতে মৃদু থাপ্পড় দিয়ে মুখে হাত ধরে হায় তুলল।অতঃপর টেনে আমাকে তার পাশে বসিয়ে বলল,”বুঝলে বউ শালার নুনুর সাথে দমের পাওয়ারও কম ছিল।তাই তাড়াতাড়ি টপকে গেছে। আমিও দেখতে পারলাম না।”
–“যতসব অসভ্যতামি কথাবার্তা।”
ইফান আমার বাহু ধরে চেপে তার সাথে মিশিয়ে হেয়ালি করে হাস্কি স্বরে বলল,”বুঝলে বুলবুলি ওয়েদারটা ঠান্ডা ঠান্ডা। এখন করলে শরীরটা গরম হতো। ভালো লাগতো।”
আমি ইফানের দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে দাঁত কটমট করলাম।ইফান ঝটপট আমার ঠোঁটে শব্দ করে চুমু খেল।অতঃপর পকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠোঁটে ধরাতে ধরাতে বলল,”বেশিক্ষণ থাকলে ঠান্ডা লাগবে।তার ওপর সুন্দরী জিনিস তুমি। হালার পুতাইনে নজর দিলে আবার সমস্যা। ”
আমি নাকে ওড়না ধরে বসলাম।ইফান আমার অসুবিধা হচ্ছে বুঝতে পেরে উঠে আরেক পাশে গিয়ে পিঠ করে দাঁড়াল। আমি পিছন থেকে ঠান্ডা কন্ঠে বললাম, “একটা কথা বলবে?”

–“বল?”
–“আমি শুনেছিলাম মা’র বিয়ের আগে কিছু একটা হয়েছিল। ঠিক কি হয়েছিল আমায় বলবে?”
ইফান হঠাৎই থমকে দাঁড়াল। আমি পিছন থেকে দেখে আন্দাজ করলাম।হঠাৎ এমন কিছু বলব হয় তো আশা করে নি।আমি উত্তরের অপেক্ষায় বেশ কিছুক্ষণ ইফানের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কিন্তু কোনো সারা শব্দ আসল না।আমি পুনরায় বললাম,”না মানে শুনেছিলাম কি একটা ঝামেলা হয়েছিল।তারপর নাকি বিয়ে,,,,,”
–“বড্ড বেশি কথা বলছ।আই ডোন্ট লাইক দিস।”

আমার কথার মাঝ পথে থামিয়ে ইফান ভারিক্কি কন্ঠে বলল।ওর স্বরটা বেশ কঠিন শুনাল।মনে হল আমার কথা বলা তার পছন্দ হচ্ছে না। কই মনে পড়ছে না তো সে আগে কখনো আমার সাথে এভাবে কথা বলেছে।আমি ওর সাথে কত রাগারাগি ঝগড়া করেছি। কখনো তো এত রুঢ় গলায় কথা বলেনি।হ্যাঁ সেই রাতে ও আমার সাথে ধস্তাধস্তি করেছিল।এমন কি আমার গায়ে প্রথমবার হাত তুলেছিল। তখনও তো ওর কন্ঠে এতটা জোর ছিল না।তবে এখন কেন এভবে আমার সাথে কথা বলল? আমার মস্তিষ্ক হঠাৎই যেন অযাচিত ক্রোধে ফেটে পড়ছে।যার ফলস্বরূপ টুপ করে চোখ দিয়ে এক ফোটা নোনাজল গড়িয়ে পড়েছে।আমি এক দৃষ্টিতে ইফানের দিকে তাকিয়ে।
বেশ কিছুক্ষণ পর কিছু একটা ভেবে ইফান আচমকা পিছনে ফিরে আমার দিকে তাকাল।আমি তাড়াতাড়ি অন্যদিকে ঘুরে উঠে দাঁড়ালাম।তাড়াতাড়ি নিম্মিকে নিয়ে মাচা থেকে নামার জন্য প্রথম সিঁড়িতে পা ফেলতে না ফেলতে পিছন থেকে আমার বাহুতে টান পড়ে।খেই হারিয়ে ইফানের প্রশস্ত শক্ত বুকে পড়ি।

নিজের অবস্থান বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি সরে যেতে নিলে ইফান আমার মাথা তার বুকের সাথে চেপে ধরে।অতঃপর আমার ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে উন্মাদের মতো বলতে লাগল,”সরি জান। আ’ম সরি।”
রাগে আমার শরীরে মৃদু কম্পন আরম্ভ হয়েছে।হঠাৎই আমি স্থির হয়ে যাই।আমার কানে খুব তীব্র ভাবে আসছে ইফানের হৃদ স্পন্দনের আওয়াজ। লোকটার বুকটা অস্বাভাবিক ভাবে উঠানামা করছে।
বেশ খানিকটা সময় অতিবাহিত হলেও ইফান তার বুক থেকে আমাকে সরাচ্ছে না।আমি নিজেই ওর বুকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে সরে দাঁড়ালাম। ইফান আমাকে চোখ নিচু করে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমার থুতনিতে ধরে হাস্কি স্বরে বলল,”লুক এট মি।”
আমি তাকালাম না।বরং শক্ত চোয়াল ঝুলিয়ে রাখলাম। ইফান আমার এমন চেহারা দেখে ঠোঁট কামড়ে হেসে মুখ উপরে তুলল।আমি ওর দিকে তাকাবো না বলে চোখ বন্ধ করে নিলাম।ইফান দেখল আমার চোখের ঘন পাপড়িগুলো ভেজা।তাই আমার দু’চোখের উপর চুমু খেল।কানের কাছ ঠোঁট এনে হিসহিসিয়ে বলল,”বাসায় চল। রাতে তোমার সব রাগ ভাঙাব।”

ইফান আবার আমার কানে শব্দ করে চুমু খেল।আমি তাড়াতাড়ি চোখ খুললাম ওকে কয়েকটা কথা শুনিয়ে দিব বলে।তার আগেই আচমকা আমার চোখে পড়ে ইফানের কানে স্টাড কালো পাথরের ইয়ার রিং।আমি খুব মনযোগ দিয়ে দেখতে লাগলাম।ব্ল্যাক ডায়মন্ড হবে হয় তো।
না ঠিক মনে করতে পারছি না ওকে আগেও পড়তে দেখেছি কিনা।আমি রিনরিন কন্ঠে বললাম,”তোমার কানের এটা!এটা তো আগে কখনো পড়তে দেখিনি।”

ইফান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আমার চোখে চোখ রাখল।আলতো হাতে আমার মাথার ওড়নাটা টেনে দিতে লাগল যাতে কানে বাতাস না লাগে।সেভাবেই বলল,”তুমি তো আমার দিকে কখনো তাকিয়েই দেখনি ভালো করে।দেখলে আরও অনেক কিছু আবিষ্কার করতে আমার মাঝে।তুমি তো শুধু ভালো করে চিনলে আমার ছোট ভাই কে।আহ্ দুক্কু।”
ইফানের কথা শেষ হতে না হতেই ওর বুকে থাপ্পড় মারলাম।চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম,”অসভ্য একটা।”
ইফান আর আমি হাঁটতে হাঁটতে রাস্তায় উঠছি।ইফান বলল,”বেশ কয়েক বছর ধরে পড়া হয় না কানে।আমরা সব ভাই আর কিছু ফ্রেন্ড একসাথে ইয়ার পিয়ার্সিং করিয়েছিলাম।”

বলতে বলতে বাইকের কাছে এসে থামলাম। চোখ ঘুরাতেই চোখে পড়ল দূরে গার্ডরা গাড়ি নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে।আমি তপ্ত শ্বাস ছাড়লাম। ইফান নিজে হেলমেট পড়ে আমার হাত থেকে নিম্মিকে নিয়ে বাইকের পিছন সিটে রাখা ক্যাট বাস্কেটে রাখল।তারপর আমাকেও হেলমেট পড়িয়ে দিল।কিন্তু আমি বসব কোথায়।টনক নড়তেই ইফানের দিকে তাকালাম, “আমি বসব কোথায়?”
–“এখানে।”
ইফান একটু সরে তার সামনে ইশারা করল।আমি দাঁত কটমট করে বললাম, “ফাইজলামি বন্ধ ক,,,”
আমার বাক্য শেষ হওয়ার আগেই লোকটা আমাকে টান মেরে তুলে নিয়ে তার সামনে বসিয়ে দিল।আমি কিছু বলতে যাব তার আগেই নিজের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিল।আমাদের দেহের মধ্যে বিন্দু মাত্রও ফাঁকা নেই।আমার পা দুটো তার কোমরে পেচিয়ে দিয়ে আমার মাথা তার এক কাঁধে রেখে নিমিষেই ঝড়ের বেগে বাইক চালাতে শুরু করল।আমার মুখে আসা কথা মুখেই রয়ে গেল।পড়ে যাব বলে আমি ঝটপট ওর গলা জড়িয়ে ধরলাম।

দু ঘন্টা আগে সিআইডি অফিসাররা নিজেদের কাজ শেষ করে অফিস অফ করে বেড়িয়ে গেছে।তাই অফিস ভবন এখন অন্ধকারে নিমজ্জিত। অফিসের পাশের আরেকটা ছাঁদে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকার থাকায় অশরীরির মতোই দেখাচ্ছে। আগুন্তক বেশ কিছুক্ষণ মনযোগ দিয়ে বিল্ডিংয়ের তিনতলা মনযোগ দিয়ে লক্ষ করলো।অতঃপর সব কিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে দেখে ক্রর হাসল।অন্ধকারে যা দৃশ্যমান নয়।
আগুন্তক নিজের সরু কোমর হারনেসে আটকে পুলি ছাড়তেই জিপলাইনটা শিস কেটে তাকে সিআইডি ভবনের ছাদের দিকে টেনে নিল।অতঃপর অফিস ভবনের ছাঁদে গিয়ে নেমে অতি সতর্কতার সাথে মেইন অফিসের ভেতরে ঢুকে পড়ল।

অফিসের ভেতর ও বাহিরে কড়া সিকিউরিটি দেওয়া। অথচ আগুন্তক সব কিছু নিজের কন্ট্রোলে নিয়ে নিয়েছে।বর্তমানে অফিস ভবন সহ আসেপাশের সকল সিকিউরিটি তার নিয়ন্ত্রণে। মনে হয় খুব পরিকল্পিত এবং সুক্ষ্ম ভবে নিজের কাজ করছে। আগুন্তক যেন এই বিষয়ে ভীষণ দক্ষ।
আসেপাশে সব অন্ধকার। অশরীরির মতো ছায়াটা নিজের টর্চ লাইট জ্বালিয়ে সোজা এসপির কেবিনে ঢুকে পড়ল।শরীরে কালো হুডি জড়ানো। মাথা মুখ সব ঢাকা।তার একটিবারও এদিক সেদিক তাকানোর প্রয়োজন হল না।যেন পুরো অফিস তার হাতের মুঠোয়। আগুন্তক কেবিনে ডুকেই দেখতে পেল ডেস্কের উপর কম্পিউটার রাখা।সে তাড়াতাড়ি বসে কম্পিউটার চালু করল।কিন্তু পাসওয়ার্ড দেওয়া থাকায় আগুন্তকের কিবোর্ডে রাখা আঙ্গুল গুলো থামলো।মূহুর্তেই আগুন্তকের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি উদয় হল।সে তাচ্ছিল্য করে ভারিক্কি মেয়েলী কন্ঠে বললো,

–“লাইক সিরিয়াসলি। জাস্ট আ পাসওয়ার্ড আমাকে দমাবে। ইয়্যু নো, দ্যা ফা/কিং ইডিয়ট এসপি এখানে কে বসে আছে?দ্যা ইন্টারন্যাশনাল হ্যাকার অ্যান্ড দ্যা মোস্ট পাওয়ারফুল টেরোরিস্ট গ্যাং’স ক্যাপ্টেন অফ ব্ল্যাক ভেনম।
অতি মাধুর্য মেশানো কন্ঠ স্বর। অথচ সেখানে মিশে আছে নিজের কনফিডেন্সে আর দম্ভ। কি শক্তই না তার বলা প্রতিটি শব্দ। আগুন্তক কিবোর্ডে কিছুক্ষণ চাপতেই পাসওয়ার্ড খুলে গেল।অতঃপর সে একটা ফাইল থেকে অনেক ইনফরমেশন নিজের পেন ড্রাইভে নিয়ে নিল।তার মধ্যে শেষ তথ্যগুলো ছিল জায়ান ভাইয়ের মা’র্ডা’র কেইস সম্পর্কিত। আগুন্তক শেষ তথ্য গুলো খুব মনযোগ আর সময় দিয়ে নিয়ে নিল।তারপর শেষে যখন ফাইল থেকে বেড়িয়ে আসবে তখন আরেকটা ফাইল তার নজরে পড়ে।সেখানে সিআইডি অফিসারদের ইনফরমেশন। আগুন্তক ফাইলে ঢুকে বেশ কিছুক্ষণ ঘাঁটতেই অবাক হয়ে গেল।অতঃপর আশ্চর্য স্বরে বলে উঠলো,

–“ও মাই গশ!আর ইয়্যু হিয়ার!”
আগুন্তক আরেকটু ঘাঁটতে যাবে তার আগেই সিআইডি অফিসের দরজা খুলে যায়।কারো উপস্থিতি টাহর করতে পেরে আগুন্তক উঠে ঝটপট ছাঁদের দিকে দৌড়াতে থাকে।জিতু ভাই আর আবির এই এরিয়ায় আসেপাশে ছিল একটা দরকারে।হঠাৎ ফোনে এলার্ট আসায় জিতু ভাইয়া বুঝে কেউ তার কম্পিউটার খোলার চেষ্টা করছে।তারা আর দেরি না করে ঝটপট ফিরে আসে।
সিঁড়ি দিয়ে আগুন্তক প্রাণপণে ছুটছে। জিতু ভাইয়া চিৎকার করে উঠলো,”হা’রা’মির বাচ্চা। ধরতে পারলে ফাঁ’শিতে ঝুলাব।”

অফিসার আবির বলল,”এই দাঁড়া বলছি।ধরতে পারলে খবর আছে।সারেন্ডার কর বলছি।আমি কিন্তু শুট করব।”
আগুন্তক দৌড়াতে দৌড়াতে বাঁকা হাসল।কারণ এই অন্ধকারে কেউ তার কিচ্ছু করতে পারবে না।আগুন্তক ছাঁদে ওটার জন্য দরজার প্রায় কাছে আসতেই জিতু ভাইয়া থাবা মেরে মাথার হুডিটা খুলতেই একগুচ্ছ মেয়েলি সিল্কি চুল পিঠে আঁচড়ে পড়ল।মেয়েটা তৎক্ষনাৎ দৌড়ে গিয়ে ছাঁদের দরজা অফ করে দিল।জিতু ভাইয়া ছুটে এসে একটা লাথি দিতেই দরজা ভেঙে যায়।কিন্তু ভেতরে এসেই দেখল মেয়েটা আরেক বিল্ডিং এর ছাঁদে ইতোমধ্যে পৌঁছে গিছে।জিতু ভাইয়া আর আবির এক দন্ড সময় ব্যয় করল না।তারা দৌড়ে নিচে নেমে এসে দেখে বেশ কিছুটা দূরে বাইকে বসে আছে আগুন্তক মেয়েটা।মেয়েটা আরও আগে নিচে নেমে বাইকে বসে সিআইডির জন্য অপেক্ষা করছে।কি অদ্ভুত আর সাহসী মেয়েটা! জিতু ভাইয়া এই নিয়ে বেশি ভাবার ফুসরত পেল না।
জিতু ভাইয়া আর আবির চেচিয়ে মেয়েটাকে দাঁড়াতে বলল।মেয়েটা বাঁকা হাসল।যা হেলমেটের জন্য দেখা যায় নি।তবে চোখে তা ভেসে উঠেছে। আগুন্তকের দিকে সিআইডি দুইজন ছুটে আসছে তা দেখে মেয়েটা ভারিক্কি স্বরে বিরবির করল,

জাহানারা পর্ব ৬০

–“আমাকে ধরতে চাও তোমরা?আমাকে,মীরা চৌধুরী কে!দ্যা ক্রেজি গাই!”
নিজের বাক্য শেষ হতেই চোখের উপর হেলমেটের গ্লাস ফেলে বাইক নিয়ে ছুটে চলে গেল।পিছন থেকে জিতু ভাইয়া আর আবির বেশ কয়েকবার গাড়িতে শুট করল। তবে গাড়ির আঁকাবাকা গতিবেগের জন্য সবকটা নিশানা ছ্যুত হল।

জাহানারা পর্ব ৬২