Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ৬৪

জাহানারা পর্ব ৬৪

জাহানারা পর্ব ৬৪
জান্নাত মুন

বাইরে কনকনে ঠান্ডা। দুদিন ধরে সূর্যের দেখা নেই। ফলে সারাদিনই কুয়াশায় ঢাকা পড়ে থাকে। আমি বেডে উপুড় হয়ে কম্ফোর্টারের নিচে শুয়ে একটা উপন্যাসের বই পড়ছি। গত এক সপ্তাহ ধরে একটু একটু পড়ে আজ শেষ করলাম। তবে কি পড়লাম নিজেই মনে করতে পারছি না।সবকিছুই বিরক্তিকর হয়ে উঠছে। সেই রাতে নিম্মিকে হারিয়ে আমি জ্ঞান হারাই, তারপর সকালে জ্ঞান ফিরে অনেক দেরীতে। আর জ্ঞান ফিরার পর থেকে ইফানকে খুঁজে পাই নি।মীরা বলে, ইফান কি একটা কাজে দেশের বাইরে চলে গেছে।

বইটা টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়ালাম। শীতে শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখন আমার তৈরি হতে হবে। এই এক সপ্তাহ ধরে চৌধুরী বাড়ির সকলের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলছি।কাউকেই এখন বিশ্বাস হয় না।সবার সাথে কথাও কম বলি।সারাদিন বাড়িতে আমাকে কেউ পায় না। ভার্সিটির নাম করে যে নয়টার সময় বের হই, আরেকবার রাত আটটার আগে বাড়ি ফিরে আসি না।

ইফান চলে যাওয়ার আগে মীরাকে বলে গেছে আমার খেয়াল রাখতে। কোথায় যায়, কি করি, সব যেন মীরা দেখে। তাই মীরা সবসময় আমার সঙ্গে থাকার জন্য জোর করেছে, যার কারণে দুদিন আগে আমার সাথে কথা-কাটাকাটি হয়। আমি স্পষ্ট বলে দিয়েছি আমার থেকে দূরে থাকতে। আমার জীবনে আমি চাইনা কাউকে। আমার কথায় হয়তো সেদিন মীরা হার্ট হয়েছে। আমার সঙ্গে কথা খুব কম বলে। আমিও ওর কাছে সরি বলি নি। আপাতত সরি বলার মনমানসিকতাও আমার নেই। দেয়াল ঘড়ির কাটা আটটার ঘরে,আমি আর সময় অপচয় না করে ওয়াশরুমে চলে গেলাম।

মেসেজে একটুআধটু কথা বলতে বলতে এখন ইতি আর জিতু ভাইয়ার মাঝে সম্পর্কটা একটু গাঢ় হয়েছে। সারাদিন ওদের কথা হয় না।রাতে জিতু ভাইয়া অফিস শেষ করে বাসায় এসে ইতির সাথে বেশ অনেকটা রাত কথা বলে।জিতু ভাইয়া কখনো ইতিকে মেসেজ দেয় না।বরং ইতি নিজে থেকেই হাই হ্যালো বলে কথা বলা শুরু করে।অতঃপর সারাদিন কি কি করল সব বলতে থাকবে।

এদিকে মেয়েটার কথা শেষ হতে না দেখে জিতু ভাইয়া এত রাত অব্ধি ইতিকে জেগে থাকতে বারণ করে। কিন্তু লাজুক মেয়েটা ভালোই প্রেমে মজেছে। কোনো কারণে জিতু ভাইয়া ইতির মেসেজের রিপ্লাই দিতে একটু দেরী হলেই ইতির চোখে পানি চলে আসে।ওদের এখনো ফোন কলে কথা হয় নি। জিতু ভাইয়া ইচ্ছে করেই তাদের মধ্যে দূরত্ব রাখতে চায়। এতে অবশ্য ইতির সুবিধায় হয়েছে। মেসেজে কথা বললে তার লজ্জা লাগে না। কিন্তু কারো সাথে ফোনে কথা বললেই লজ্জায় সালাম দেওয়াটায় ভুলে যায়,বাকি কথা তো দূরের বিষয়।

অপরদিকে নোহা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্নের দেশে পাড়ি দেয়। তার আবার কত রঙের স্বপ্ন। জিতু ভাইয়ার সাথে লং ড্রাইভে যায়,পার্টি করে আরও যা যা করে তা সব পরদিন বাড়ির সকলকে শুনাবে।বিশেষ করে ফারিয়ার সাথে তার বেশ ভাব, তাই তাকে সব শুনাবে। আগের নোহার সাথে এখনের নোহার বেশ পরিবর্তন লক্ষ করেছি। আগে যেমন কোনো ছেলে দেখলেই প্রপোজাল করে বসত, এখন আর এমন করে না। নাইট ক্লাব, ড্রিংক করে মাতলামি করার অভ্যাসও এখন নেই। বরং এই বয়সেও প্রতিদিন ইতির সাথে কলেজে যায়।সেখানে জুইদের সাথে সারাদিন কাটিয়ে দেয়। নোহা কলেজে আসে বলে জিতু ভাইয়াও আর আসে না। তার পরিবর্তে আবির এসে জুইয়ের খোঁজ খবর নিয়ে যায়।

ইতি ওয়াশরুমে গেছে কলেজে যাওয়ার জন্য রেডি হতে। তক্ষুনি নোহা রেডি হয়ে ইতির রুমে আসল। ঠান্ডা বেশি হওয়ার কারণে মোটা উষ্ণ হুডি গায়ে দিয়ে আছে। নোহা শীতে কাঁপতে কাঁপতে তাড়াতাড়ি ইতির বেডে ওঠে গায়ে কম্ফোর্টার টেনে নিল। হঠাৎই মেসেজের টুং শব্দ হতেই পাশে তাকিয়ে দেখল ইতির ফোন থেকে হয়েছে। নোহা ফোন হাতে নিতেই চোখে পড়ল মেসেঞ্জারের নোটিফিকেশন এসেছে,”আজ রাতে আমার মেসেজের জন্য অপেক্ষা করো না, আমি একটা মিশনে থাকব।”
নোহা বেশ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মেসেজটির দিকে। আরমান শেখ জিতু ইতিকে মেসেজ করেছে! তার মানে লিটিল গার্লের সাথে জিতু বেইবির কথা হয়।তাহলে আমাকে লিটিল গার্ল কেন একবারও বলল না? মনে মনে কয়েক মূহুর্ত এটা-সেটা ভেবে মেসেজ সিন করল। একটু একটু করে উপরের মেসেজগুলো পড়ল।নোহা এত ভালো বাংলা পড়তে পারে না,তার উচ্চারণ করতে সমস্যা হয়।তবুও ভেঙে ভেঙে পড়ল।নোহা নিষ্প্রভ ভাবে বেশ কিছুক্ষণ দেখল মেসেজ গুলো।
ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে ইতি বেরিয়ে আসল। নোহাকে রেডি দেখে তাড়াহুড়ো করে বলল,

–“নোহাপি তুমি রেডি হয়ে চলে এসেছ, আচ্ছা একটু বস আমি দু মিনিটেই রেডি হয়ে যাব।”
নোহা ইতির দিকে তাকাল না, উত্তরও করল না। নোহাকে এভাবে চুপ থাকতে দেখে ইতির নজর পড়ল নোহার হাতে তার ফোন। মূহুর্তেই ইতির চেহারায় আতংক ফুটে উঠল। ইতি ভয়ে একটা ঢুক গিলে বলল,
–“তুমি কি করছ?”
–“তোমার সাথে জিতু বেইবির কথা হয়?”
নোহা পাল্টা শুধালো। ইতি ঢোক গিলে মাথা নিচু করে উশখুশ করতে লাগল। নোহা শান্ত চেহারায় গাল ফুলিয়ে অভিমানী স্বরে বলল,”তোমার কাছে বেবির আইডি ছিল, আবার কথা হয় আমাকে বল নি কেন?”
–“ঐ মনে ছিল না আরকি।”
–“তুমি এটা একদমই ঠিক করনি লিটিল গার্ল। আমাকে বললে আমিও কথা বলতাম।”
–“তুমি কেন কথা বলতে?”
ইতি উত্তর পাওয়ার জন্য নোহার দিকে তাকিয়ে। নোহা প্যান্টের পকেট থেকে নিজের ফোন বের করতে করতে বলল,”বড়দের অনেক কথা থাকে যা লিটিল গার্লদের শুনতে নেই।”

–“আমিও তো বড় হয়ে গেছি,আমাকে বল।”
–“উহু তুমি ছোট, বলা যাবে না।”
বলেই নোহা ইতির আইডি থেকে জিতু ভাইয়ার আইডির লিংক নিয়ে নিজের আইডি দিয়ে ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট পাঠাল। ইতি রেডি হচ্ছে। নোহা ফোনের দিকে তাকিয়ে, এখনো তার রিকুয়েষ্ট একসেপ্ট হয় নি। নোহা নিজের আইডিও একবার ভিজিট করল, নাহ্ তার প্রোফাইল পিক অনেক সুন্দর। সেখানে নিজের সুন্দর একটা পিক দেওয়া। যে দেখবে তারই পছন্দ হয়ে যাব।মনে মনে নিজের প্রসংশা করতে গিয়ে উচ্চ স্বরে হো হো করে হেসে দিল। ইতি কি বুঝল কি বুঝলা না, সেও নোহার সাথে তাল মেলাল।
এদিকে নোহা জিতু ভাইয়ার আইডি ভিজিট করছে।জিতু ভাইয়ার প্রতিটি পোস্টের কমেন্ট বক্সে বিউটিফুল, ওয়ান্ডারফুল, হটি আরও যা যা প্রসংশা করা যায় তা লিখে সাথে হট ফেইসের ইমোজিও দিয়ে দিল তিন চারটা করে। হঠাৎই একটা পুরাতন পোস্টে নোহার চোখ আটকায়। বেশ জুম করে পিকটা দেখে টাস করে দাঁড়িয়ে চেচিয়ে উঠলো,

–“হু ইজ?”
ইতি ছুটে এসে ফোনে তাকিয়ে দেখল সেই পিকটা, যেখানে জিতু ভাইয়ার দিকে ডক্টর সুমি তাকিয়ে আছে ডেবডেব করে। ইতি নাক ফুলিয়ে বলল,
–“আরেকটা আছে এই দেখ।”
আরেকটা পিক বের করল।সেখানে জিতু ভাইয়া মাস্ক আর একটা ক্যাপ পড়ে থাকা মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসছে। নোহা আবার ধপ করে বিছানায় বসে মনযোগ দিয়ে ছবিটা দেখে ইতির দিকে তাকিয়ে গাল ফুলিয়ে বলল,
–“হু?”
–“জানি না। তবে দেখে ডাইনি মনে হচ্ছে।”
–“হোয়াট ইজ ডাইনি?”

নোহার প্রশ্নে বোকার মত তাকালো ইতি। চোখ পিটপিট করে অবিশ্বাস্য স্বরে বলল,”তুমি জান না।”
নোহা দু পাশে মাথা নাড়াল। ইতি একটু ভেবে আঙ্গুল দিয়ে পিকটার মেয়েটাকে দেখাল,”এই দেখ এই মেয়েটা কিভাবে জিতু বেইবি থুক্কু জিতু ভাইয়াকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করেছে। আর এমন যারা করতে পারে তাদের ডাইনি বলে। দাদি বলেছে, ডাইনি একবার নজর দিলে ক্ষতি না করে ছাড়ে না।”
নোহা ভাবুক চেহারা করে বলল,”কি বলছ লিটিল গার্ল, এখন এই ডাইনির থেকে কিভাবে বেবিকে বাঁচাব? না না না কিছু একটা করতে হবে।এটা কে আগে আমাদের জানতে হবে।”
নোহার কথায় ইতি সায় জানাল। অতঃপর দু’জন সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ড্রয়িং রুমে হাজির হল। ওদের খুশি খুশি দেখে পলি শুধালো,

–“কি বিষয় এত খুশি কেন?”
ইতি ব্রেকফাস্ট করতে করতে বলল,”ছোট ভাবি আজ জান আমরা সব ফ্রেন্ডরা মিলে ফুচকা খেয়ে পার্কে ঘুরাঘুরি করব।”
–“ইশশশ তোমরা প্রতিদিন ফুচকা খাও ঘুরাঘুরি কর, আমারো তোমাদের সাথে ঘুরতে, ফুচকা খেতে মন চাই।”
–“তাহলে রেডি হয়ে চলে আস। আমরা সবাই এনজয় করব।”
নোহার কথায় পলি আসেপাশে আড় চোখে তাকিয়ে দেখল। সবাই ব্রেকফাস্ট করছে সাথে বিজনেস নিয়ে আলোচনা করছে। পলি নিচু কন্ঠে বলল,”না গো তোমরা যাও। আমি চলে গেল বাসায় কাকিয়াকে সাহায্য করবে কে?”
–“আমার কথা তোমাকে ভাবতে হবে না।তোমার যদি মন চায় তাহলে ওদের সাথে বাইরে থেকে একদিন ঘুরে আস।”

কাকিয়া সবাইকে খারার বেড়ে দিচ্ছে তখনই পলিদের কথা কানে আসে। কাকিয়ার কথায় সকলে এদিকে তাকাল। নুলক চৌধুরী আর নাবিলা চৌধুরী এক নজর তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল। ইকবাল চৌধুরী হেসে বলল,”ছোট আম্মু তোমার মন চাইলে ঘুরে আস।”
বাড়ির কর্তার অনুমতি পেতেই পলির মন লাফিয়ে উঠল।সে যাবে বলে দৌড়ে রুমে চলে আসল ইমরানকে জানাতে। ইমরান নাকমুখ ঢেকে এখনো ঘুমচ্ছে। পলি ধপ করে ইমনকে উপর থেকে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদি করে বলল,”এই শুনছ, শুন না আমি ইতিদের সঙ্গে ঘুরতে যাব।”
ইমরান ঘুমের মধ্যে কি বলল পলি বুঝল না। সে ইমরানের গা থেকে কম্বল সরাতেই ইমরান শীতে মুখ দিয়ে আওয়াজ করে বলল,”ওও ঠান্ডা জানু কি করছ?”

–“এদিকে তাকাও আমি ঘুরতে যাব।”
এবার পলির কথায় ইমরান ঘুমঘুম চোখে পলির দিকে তাকালো। পলি গাল ফুলিয়ে তার দিকে তাকিয়ে। ইমরান নিজের প্রেয়সীর লতানো কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের কাছে মিশিয়ে নিল। পলি নিজেকে ছাড়াতে ছাড়াতে বলল,”ধুর কি করছ এসব! আমার জন্য তোমার বোনরা অপেক্ষা করছে।”
ইমরান টুপ করে পলির ঠোঁটে চুমু খেয়ে নিল।অতঃপর পলির গলায় মুখ ডুবিয়ে আদুরে স্পর্শ করতে ব্যস্থ হয়ে উঠলো।পলি জোর করে ইমরানের মুখে হাত ধরে বলল,”আমি যাব ছাড়।”
–“উমম বউজান এত সকালে উঠে চলে গিয়েছিলে কেন? কোথায় আমি ভাবলাম সকালে উঠে তোমার এলোমেলো আদুরে চেহারাটা দেখব কতটা গ্লো করছে রাতে আমার আদ…”
–“আর কথা বলবে না তুমি। অসভ্য লুচু লোক।”
রাতের কথা মনে পড়তেই পলির মুখ লজ্জায় লালনীল হয়ে যাচ্ছে। পলিকে লজ্জা পেতে দেখে ইমরান ঠোঁট কামড়ে হেসে আবার পলির ঠোঁটে শব্দ করে চুমু খেল।অতঃপর হাস্কি স্বরে বলল,”সাবধানে যাবে কেমন। কোনো প্রবলেম হলেই আমাকে কল করবে। আমি যদি পারি তাহলে তোমাদের গিয়ে নিয়ে আসব ওকে।”

–“আচ্ছা।”
কথা শেষ হওয়ার পরেও পলিকে ছাড়ার নাম নেই। বরং ওকে জড়িয়ে ধরেই আবার চোখ বন্ধ করে ফেলেছে।পলি মুচরামুচরি করেও নিজেকে ছাড়াতে না পেরে ইমরানের ঠোঁটে চুমু খেয়ে কামড়ে দিল। ইমরান ঝটপট পলিকে ছেড়ে নিজের ঠোঁট চেপে ধরতেই পলি দৌড় দিল। ইমরান ঠোঁটে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
–” আমি কিন্তু ভুলব না। রাতে তোমার খবর আছে।”
পলি ইমরানের কথাকে পুনরাবৃত্তি করে ভেঙ্গচি কেটে বলল,” রাতে তোমার খবর আছে।”
–“তবে রে।”
বলেই ইমরান বিছানা থেকে নামার জন্য উদ্ধত হল।এটা দেখে পলি হাসতে হাসতে ছুটে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল।বউয়ের এমন ছেলেমানুষী দেখে ইমরানের ঠোঁটেও হাসি ফুটে উঠেছে।অতঃপর সে আবার কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল।

সিআইডি অফিস।।
ইদানীং সিআইডি অফিসারদের ব্যস্ততা আরও দ্বিগুণ বেড়েছে। দেশের অলিগলিতে একের পর এক লা’শ পাওয়া যাচ্ছে। আর প্রতিটি লা’শই বিধ’স্ত অবস্থায় দেখা যায়। আবার নারী প্রচার চক্রটিও আগের তুলনায় সক্রিয় হয়ে ওঠেছে। এ ঘটনাগুলো নিয়ে দেশে আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ জনগণ দ্রুত বিচার চাইছে। ফলস্বরূপ উপর মহল থেকে সিআইডিদের উপর অনেক চাপ পড়ছে। জনগণ ভাবছে সরকারের অপারগতার কারণে এখনো ক্রিমিনালরা আটক হচ্ছে না। বর্তমান সরকারের বিরোধী দলগুলোও সুযোগ লুফে নিয়ে জনগণকে উষ্কে দিচ্ছে। তাই এবার যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। না হলে দেশের সরকার ও আইন কারো প্রতিই সাধারণ জনগণের আস্থা থাকবে না।
সব অফিসাররা নিজেদের ডেস্কে বসে মনযোগ দিয়ে কাজ করছে। তারা ইতিমধ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য খুঁজে পেয়েছে। এই তথ্যগুলো এখনো সিআইডির ভেতরই আছে। অফিসে পিনপতন নীরবতা। হঠাৎ কারও আগমনে সকলের দৃষ্টি ঘুরে সেদিকে। আগমনকারীকে দেখা মাত্রই সকলে সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় এবং একসঙ্গে সালাম দেয়।

–“আসসালামু আলাইকুম ম্যাম।”
আগমনকারী হালকা মাথা নাড়িয়ে এগিয়ে গেল এসপির ডেস্কের দিকে। জিতু ভাইয়া খুব মনযোগ দিয়ে কম্পিউটারের কিবোর্ড চাপছে। তার ডেস্কের কাছে কারো উপস্থিতি উপলব্ধি করে হালকা চোখ ঘুরাল নিচের দিকে। পায়ে স্নিকার্স এবং লেগিংস পড়ে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। চোখ উপরের দিকে উঠাতেই দেখল কালো হুডির পকেটে দু’হাত গুঁজে রাখা, মাথায় হুডির হুড তুলা।মুখে কালো মাস্ক এবং চোখে কালো রোদচশমা। জিতু ভাইয়া মুচকি হেসে তার পাশে বসার জন্য হাত দিয়ে ইশারা করল। বাকি অফিসাররাও জিতু ভাইয়ার ডেস্কের কাছে এসে দাঁড়াল। অফিসার কণা হাস্যজ্জল চেহারায় বলল,

–“ও মাই গড! জারা ম্যাম আপনি হঠাৎ !”
আমি মুখের মাস্ক আর সানগ্লাস খুলে সবার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলাম। আমি সিআইডি আন্ডারকভার অফিসার জাহানারা শেখ। আজ থেকে প্রায় দেড় বছর আগে সিআইডি তে জয়েন করি। আমার সম্পর্কে জানে সিআইডি টিম আর উপর মহলের হাতেগোনা দু থেকে তিনজন। সাধারণত আন্ডারকভার অফিসারদের পরিচয় অতি গোপনে থাকে। তাদের একটা গোপন মিশনে পাঠানো হয় তথ্য সংগ্রহের জন্য। আমিও সেই একটি মিশনে আছি। আমার দক্ষতা এবং সাহসিকতার জন্য জিতু ভাইয়া নিজে নারী পাচার চক্র কেইসের তদন্তের দায়িত্ব আমাকে দেয়। অনেক তথ্য এবং সূত্র অনুযায়ী চৌধুরী বাড়ির উপর আমার নজর ছিল। আর মাঝখানে আমার অপ্রত্যাশিত বিয়েটা ছিল একটা নিছক দূর্ঘটনা।
আমি সিআইডি অফিসে এসেছি খুব কম,যতবার এসেছি ততবারই কোনো না কোনো ছদ্মবেশে। সবার সাথে আমার যোগাযোগ থাকে গোপনে। যেমন মাঝ রাস্তায় যখন মানুষে ভর্তি থাকে, কখনো অটোতে, তো আবার ভার্সিটিতে। কোনো সুনির্দিষ্ট স্থান নেই। একেক সময় একেক স্থানে। আজ জিতু ভাইয়া আমাকে নিজে সিআইডি অফিসে ডেকে পাঠিয়েছে। জিতু ভাইয়া কম্পিউটারে কিছু একটা বের করে বলল,

–“লুক, চিনতে পারছিস।”
আমি মনিটরের স্ক্রীনে তাকিয়ে রইলাম আশ্চর্য নয়নে। বাকি সিআইডি অফিসারররাও চরম অবাক। আমাদের আশ্চর্য হতে দেখে জিতু ভাইয়া ঠোঁট বাকিয়ে হাসল।
–“সি ইজ আ ডেঞ্জারাস। সে নিজেকে চতুর ভেবেছিল। কিন্তু সে জানে না বাপেরও বাপ থাকে।”
–“মীরা চৌধুরী!!”
আশ্চর্য হয়ে উচ্চারণ করল অফিসার আবির। জিতু ভাইয়া হেসে বললো,”ইয়েস মীরা চৌধুরী অর্থাৎ ইন্টারন্যাশনাল নাম্বার ওয়ান হ্যাকার।”
–“কিহ্!”

অফিসার কবির অবিশ্বাস্য স্বরে আওড়াল। “এটা কিভাবে হতে পারে? একটা মেয়ের এত ক্ষমতা কিভাবে সম্ভব?”
কবিরের কথার পরেই হিমন বড় বড় চোখ করে মিনিটরের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,”আমার বিশ্বাস হচ্ছে না কিছুতেই। এইটুকু একটা মেয়ে এত বড় একজন হ্যাকার। তার চেয়েও বড় কথা, কত বড় সাহস আরেক বিল্ডিং থেকে সিআইডি বিল্ডিং এ দড়ি বেয়ে চলে এলো। এলো তো এলো আমাদের সব ইনফরমেশন চুরি করে পালাল!!”
এতক্ষণ আমার চেহারায় কোনো ভাবান্তর হয় নি। কিন্তু এখন ওদের এমন সব হাস্যকর কথাবার্তা শুনে চুপ করে বসে থাকতে পারলাম না। আমি আচমকা চেয়ারে মাথা হেলিয়ে উচ্চস্বরে হেসে উঠলাম। আমাকে এভাবে হাসতে দেখে সকলে ভরকে গেল। সকলে উৎসুক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে। আমি নিজেকে শান্ত করে জিহ্বা দিয়ে গাল ঠেলতে ঠেলতে ভারিক্কি স্বরে বলে উঠলাম,

–“মীরা চৌধুরী আই মিন চৌধুরী কন্যা, দ্য ডেঞ্জার। কি চেন তোমরা তাকে? নাউ আই’ল সে এবাউট হিম,
সি ইজ আ ক্যাপ্টেন ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল মাফিয়া গ্যাং ব্ল্যাক ভেনম এর ক্যাপ্টেন। আন্ডারওয়ার্ল্ডের মোস্ট ওয়ান্টেড প্রভাবশালী মাফিয়া, আমার গুনধর স্বামী মাফিয়া বস ইফান চৌধুরীর নিউরন। আড়ালে সকল তদারকির দায়িত্ব তার কাঁধে। ইফান কিংবা তার গ্যাং কোনো মিশনে গেলে আগে মীরা সেখানকার সকল নেটওয়ার্ক নিজের আয়ত্তে আনে। এন্ড বড় বড় ব্যাংক জালিয়াতি করাও তার কাছে দুধ ভাত।”

–“হোয়াট, তুই মারী চৌধুরী সম্পর্কে আগে থেকেই এত কিছু জানিস, কই আমাকে তো জানালি না? তুই জানিস গত এক সপ্তাহ পাগলের মতো খুঁজেছি কে হতে পারে যে আমাদের অফিসে ঢোকার সাহস দেখায়। আসেপাশের সব সিসিটিভি চেক করেও কোনো উত্তর পাইনি। কারণ আগে থেকেই সকল নেটওয়ার্ক মীরা চৌধুরীর আন্ডারে ছিল। আমি আশে পাশের এরিয়ার বিগত কদিনের সকল ফুটেজ চেক করি।সারাদিন কে বা কারা আশেপাশে ঘুরঘুর করেছে সকলের গতিবিধি দেখি। অনেক খুঁজে সব ঘাঁটিয়ে হঠাৎ নজরে আসে একজন বাইকারকে। যে কিনা গত দুদিন ঐ এরিয়ায় এসেছিল। কিন্তু সেদিন আমাদের অফিসে আসে তার কোনো ফুটেজ ছিল না।তার মানে সে প্ল্যান করে দেশে ফিরেছে। আর সব প্ল্যান মাফিক কাজ করেছে। অনেক ঘেঁটে লেডি বাইকার নিয়ে রিচার্জ করতে গিয়ে জানতে পারলাম মীরা চৌধুরী একজন হ্যাকার।কিন্তু তোর কথা শোনার পর আমি বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। একটা মেয়ে এত ডেঞ্জারাস!!”
জিতু ভাইয়ার কথাগুলো শুনে ঠোঁট বাঁকালাম। ডেস্ক থেকে কিউব নিয়ে খেলতে খেলতে বলতে শুরু করলাম,

–“চৌধুরীদের সম্পর্কে কিছুই জান না তোমরা। একটা বছর এমনি এমনি হতে চলেছে না। আমি ধীরে ধীরে গভীর সমুদ্রে ডুবে একটু একটু খবর বের করেছি। মীরার সাথে দেখা সেদিন। কিন্তু ওর সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে রেখেছি আরও ছ’মাস আগে। কাকিয়া বলেছিল পড়াশোনার কাজে তার ছেলেমেয়েরা দেশের বাইরে থাকে।
উমম, বিষয়টা আমার একদমই হজম হয় নি। তারপর থেকেই আমার টার্গেটে পড়ে ওরা দু ভাই বোন। মাহিন চৌধুরী চিনো নিশ্চয়ই। সে যেমন সহজ, তেমন কঠিন। ব্ল্যাক ভেনম গ্রুপের সেকেন্ড লিডার গ্যাংস্টার মাহিন চৌধুরী। ভালো মানুষের আড়ালে নামকরা ক্রিমিনাল। সে দেশে আসার পর থেকেই তার পিছনে আটার মতো লাগি।তার সম্পর্কে যখন জানলাম তখনই মীরা চৌধুরী কে নিয়ে সন্দেহ হয়। আর যা ভাবনা তাই হয়।

মজার বিষয় কি জান, নারী পাচার চক্রের বড় একটা টিম এদেশে ভালোমানুষের মুখোশ পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাহিন দেশে আসে আমার সাথে কিংবা তার পরিবারের সাথে দেখা করতে না। প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপে নারী পাচার চক্র শীতল হয়ে যায়। এদিকে মাফিয়াদের ক্যাসিনোতে এই মেয়েদের কিনে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং সেখানকার নাইট বারের এক্সক্লুসিভ স্লাট বানানো হয়। মাহিন এসেছিল এটা দেখতে কেন তাদের কেনা মেয়েরা তাদের হাতে পৌঁছাচ্ছে না।
এবার আমায় প্রশ্ন কর, আমি এত এত কিছু জানলাম তাহলে নিশ্চয়ই দেশের নারী পাচার চক্র সম্পর্কেও জানবো,কে বা কারা বাংলাদেশের মতো স্বতন্ত্র দেশে এই চক্র চালানা করছে? এবং অবশ্যই আমার জানার কথা,যেহেতু সেই কেইসের দায়িত্ব সিআইডি আন্ডারকভার অফিসার জাহানারা শেখের হাতে।”

–“কে?”
জিতু ভাইয়া উদ্বীগ্ন হয়ে বলে উঠলো। আমি আড় চোখে সকলের দিকে একনজর দৃষ্টি বুলালাম।অতঃপর ক্রুর হেসে বললাম,
–“উমম জানতে চাও? তাহলে আজ সন্ধ্যা অব্ধি ওয়েট কর। অনেক বড় ধামাকা অপেক্ষা করছে।”
কথাটা শেষ হাতেই হাতের কিউবটা মিলানো শেষ হলো। আমার চেহারায় এক রহস্যময় হাসি। সকালে আশ্চর্য হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে। অতঃপর আমার কথার রেশ ধরে সকালে গভীর ভাবনায় ডুব দেয়।

অন্যদিন নোহা ইতিদের সাথে ক্লাসে বসে থাকে। তবে আজ সে পলির সাথে বাইরে ছিল। তাই পলিকে নিয়ে পুরো কলেজ ঘুরে ঘুরে দেখেছে। বিশাল বড় কলেজ এরিয়া, তাই ঘুরে দেখেই পুরো সময় চলে গেছে। এখন ওরা প্রিন্সিপাল ম্যামের অফিস রুমে বসে আছে। চৌধুরী বাড়ির সদস্য হওয়ায় ওদের যথাযথ সম্মান দেওয়া হচ্ছে। টুকটাক প্রিন্সিপাল ম্যামের সাথে কথাও হয়েছে পলির। ওদের সামনে চা নাস্তা দেওয়া। পলি এক কাপ চা খেয়েছে ভদ্রতা সূলভ। নোহা কিছু খায়নি, তার পুরো দম নিয়ত বাইরে বেরিয়ে জুইদের সাথে খাবে।
কিছুক্ষণের মধ্যে কলেজ ছুটি হয়। জুই তার বান্ধবীরা আর ইতি অফিসে এসে নোহাদের নিয়ে বের হয়। তাদের নিরাপত্তার দেওয়ার জন্য আজ আরেকজন গার্ড বেশি এসেছে। জুইকে দেখে পলির বেশ ভালো লেগেছে, একদম তার মতো ঠান্ডা আর চুপচাপ একটা মিষ্টি মেয়ে। সবাই ফুচকা খেয়ে হেঁটে গল্প করতে করতে একটা পার্কের কাছে আসল। কলেজ থেকে বেশি দূরে না। মূলত এদিকটায় অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়ায় ছেলে মেয়েদের জন্য এই পার্কটি তৈরি করা।

পার্কে আগে থেকেই অনেক মানুষ। বেশিরভাগ ছাত্র ছাত্রীরা বন্ধুবান্ধবদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। জুইরা হেসে কথা বলতে বলতে ভেতরে গেল। ভেতরে আইসক্রিম, ঝালমুড়ি, হাওয়ায় মিঠাই আরও অনেক কিছু নিয়ে মামারা বসে আছে। আইসক্রিম দেখে নোহা লাফিয়ে উঠল। পলি আর জুই বারণ করল এই শীতে আইসক্রিম খেলে শরীর খারাপ হবে। কিন্তু নোহা মানতে নারাজ। নোহা বিরক্তি নিয়ে বলল,
–“ও এম জি কিছু হবে না, আমার কান্ট্রিতে ঠান্ডা থাকলেও আমরা অল ফ্রেন্ডস আইসক্রিম খেতাম। কিছু হবে না। আমি যাচ্ছি আইসক্রিম কিনতে।”

নোহা হাঁটা ধরল। জুই আর তার বান্ধবীরাও সেদিকে হাঁটা ধরল। পলি কাঁধে আচল তুলে ইতির সাথে কথা বলতে বলতে হেঁটে আরেকটু ভেতরে আসল। হটাৎই কানে আসে কেউ বা কারা গান গাইছে। পলি আর ইতি সেদিকে তাকাতেই দেখল, একদল ছেলে মেয়ে মাটিতে ঘাসের উপর গোল করে বসে আছে। একজন গিটারে সুর তুলে গান গাইছে, আর বাকিরা সুর মিলচ্ছে এবং কেউ কেউ কাজোনে আওয়াজ তুলছে।

❝ হৃদয়টার মাজারে রাখিলাম আদরে
কত যত্নে পুষিয়া…..
এভাবে আমাকে অবহেলা করে
কেনো গেলে চলিয়া
কে বুঝে আমাকে তুমি বিহনে
ভুলে গেছো কি সব সৃতি
বুঝি না কেনো যে রোজ রাতে স্বপ্নে
শুধু করো ডাকাডাকি………❞
পলি মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেদিকে তাকিয়ে রইল। গানের তালে ইতিও লাইনগুলো বিরবির করে গাইছে।যে গাইছে সে খুব জোরালো কন্ঠে গাইছে। পার্কে উপস্থিত কিছু মানুষের মনযোগও সেদিকে।তারা গান শুনছেই না শুধু, অনুভবও করছে। অনেকেই আবার চোখ পিটপিট করছে, হয়তো খুব কষ্টে চোখের পানি আটকানোর পায়তারা করছে।

❝তুমি পূর্নিমারি আলো আমার সোনার ময়না পাখি
চোখ-খানি মোর বন্ধ করলে তোমায় শুধু দেখি
আমার ভাল্লাগে না কিছু তোমাকে ছাড়া
প্রতি টা সময় যেনো লাগে দিসে হারা……❞
–“জিয়াদ ভাই।”
হঠাৎ পরিচিত কন্ঠ ভেসে আসতেই গিটারে হাত থেমে যায় জিয়াদের। সে ঘাড় কাঁধ করতেই দেখল জুই ছুটে আসছে। আদরের ছোট বোনকে হটাৎ দেখতে পেয়ে জিয়াদের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। উঠে দাঁড়াতেই জুই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে বলল,

–“তুমি এনে কি করতাস হুম। আমি যে পাশেই কলেজে পড়ি একবার দেখা করে আসতে পারলে না?”
ছোট বোনের মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে বলল,”দুদিন আগেও তো তোর সাথে দেখা…..”
বাক্য সম্পূর্ণ করার আগেই জিয়াদের নজর আটকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা চেরি ফুলের লাইট ম্যাজেন্টা কালার জামদানি শাড়ি পরহিত রমণীর পানে। মূহুর্তেই জিয়াদের তারুণ্য হৃদয় কেউ খামছে ধরল। চোখগুলোও ভিজে উঠেছে।

–“উনি জাহান আপুর ছোট জা।”
জুইয়ের বাক্যটা জিয়াদের বুকের বাম পাশে গিয়ে বিঁধল। সে নির্জীব দৃষ্টিতে পলির দিকে তাকিয়ে। তরণ্য হৃদয়ে এতক্ষণে আন্দোলন শুরু হয়েছে। পুরাতন ব্যথায় হৃদয়টা নীল হয়ে চোখ দুটো ঝলঝল করছে।
হঠাৎ এতগুলো দিন পর জিয়াদকে দেখে রমণীর পুরো অস্তিত্ব থমকে যায়। পালাবার পায়তারা করার আগেই আসামির ন্যয় ধরা পড়ে পূর্ব পরিচিত খুব কাছের একজন মানুষের কাছে। এখন কি করবে সে, কোথায় লুকাবে, এ জীবনে তার সাথে দেখা না হলে কি হতো না? নিজের মনকে প্রশ্নগুলো করে ভেতরে হু হু করে কেঁদে উঠল মেয়েটা।
পলি শাড়ির আচল খামচে ধরল। চোরের মতো হাঁপ-সাপ করছে, চোখ পিটপিট করে চোখের পানি আড়াল করতে চাইছে। আচ্ছা এখন যদি তাকে জিজ্ঞেস করে, কেন কথা দিয়ে সেই কথা রাখলে না, তাহলে কি উত্তর দিবে সে?

–“বউজান।”
ভাবনা গুলো যখন পলির শ্বাস রুদ করে দিচ্ছিল তখনই তার কাঁধে কেউ স্পর্শ করে আদুরে কন্ঠে ডাকে। অতিপরিচিত ডাক আর কন্ঠ কার হতে পারে তা আর বুঝতে বাকি নেই রমণীর। ভেতরের আটতে থাকা দম ফেলতেই ইমরান সামনে এসে দাঁড়াল। প্রেয়সীর চুপসে যাওয়া আদুরে চেহারা দেখে ব্যাকুল হয়ে উঠল তার হৃদয়। ইমরান দু’হাতে আগলে ধরল পলির দু’গাল। চিন্তিত কন্ঠে বলে উঠলো,
–“বউজান কি হয়েছে তোমার? শরীর ঠিক আছে, কেউ কিছু বলেছে?”
পলি চোরাই চোখ করে স্বামীর দিকে তাকাতেই দেখলো ইমরানের কপালে সাদা গজ দিয়ে ব্যান্ডেজ করা। গজটার উপরে ছোপ ছোপ লালছে হয়ে আছে। এবার নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না, কেঁদে উঠলো। ইমরানের কপালের গজটায় আলতো হাত ছুঁইয়ে বলে উঠল,

–“কি হয়েছে তোমার? সকালে তো সব ঠিক দেখে এসেছি। এরই মধ্যে কি হয়ে গেল?”
–“বউজান বউজান শান্ত হও। আমার কিছ্যু হয় নি। আমি ঠিক আছি দেখ আমাকে দেখ।”
–“কিছু না হলে কপালে বেন্ডেজ কেন?”
পলি নাক টেনে কেঁদে ভাসাচ্ছে। ইমরান ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। এই তো সকালে নাবিলা চৌধুরীর সাথে অফিসে গেছে। তারপর সব কাজ শেষ করে বউকে দেওয়া কথা রাখতে ইতির স্কুলের দিকে আসছিল। তারপর হঠাৎ কোথা থেকে একটা ট্রাক তার গাড়ির দিকে ধেয়ে আসে। ফ্রন্ট মিররে এই দৃশ্য দেখে ইমরান দ্রুত স্টিয়ারিং ঘুরায়। ফলে স্টিয়ারিং এ মাথা ঠুকে কপালে আঘাত পায়।

–“কি হলো কিছু বলছ না!”
ইমরান টুপ করে স্ত্রীর ঠোঁটে শব্দ করে চুমু খেয়ে বলল,”কিছু হয় নি জানু। আমি ঠিক আছি। এক মিনিট। ”
কিছু একটা মনে পড়তেই ইমরান প্যান্টের পকেটে হাত রাখল। অতঃপর একটা বেলি ফুলের গাজরা পলির হাতে বেঁধে দিয়ে বলল,
–“আসার পথে একটা বাচ্চা মেয়ে বিক্রি করছিল। আমাকে একটা হাতে দিয়ে বলল মেডামকে এটা দিলে মেডাম অনেক বেশি খুশি হয়ে যাবে বাবু। তোমার কথা ভেবে আমি তোমার জন্য সব ফুল কিনে নিয়েছি, গাড়িতে আছে। এটা তোমার পছন্দ হয়েছে?”

–“হু।”
তাজা বেলি ফুলের তীব্র মিষ্টি সুভাষ ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু এখন তা পলি কিছুতেই অনুভব করতে পারছে না। মনের ভেতর চলছে প্রবল বর্ষণ। পলি জিয়াদের দিকে আড় চোখে তাকাতেই পুনরায় অস্থির হয়ে উঠল। ব্যথাতুর ঝলঝল নয়নে তার দিকেই একনাগাড়ে তাকিয়ে আছে জিয়াদ।পলি তাকাতেই টুপ করে এক ফোটা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। পলি দৃষ্টি সরিয়ে নিল। এই দৃষ্টির উত্তাপে মেয়েটার ভেতরে দহণ হচ্ছে। কিন্তু সেই দহণ কেউ দেখতে পারবে না, সে ছাড়া।
ইমরানের হঠাৎ নজর পড়ল কিছুটা সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক তাগড়া যুবকের দিকে। ক্রিম কালার প্যান্ট আর কালো শার্ট পড়ে আছে। সবগুলো বোতাম খুলা থাকায় ভেতরের আরেকটা গেঞ্জিও দৃশ্যমান। ছেলেটার সারা মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি আর মাথার চুলগুলো এলোমেলো এবং হাতে একটা কালো ফিতার ঘড়ি।
জিয়াদকে এভাবে দেখছে বিষয়টা খেয়াল করে ইতি ভাইয়ার তর্জনী আঙ্গুল ধরে আহ্লাদি কন্ঠে বলল,

–“ভাইয়া এইটা আমাদের জাহান ভাবির ছোট ভাই। আস আস পরিচয় করিয়ে দেই।”
আমার ভাই জানতে পেরে ইমরানের কুঁচকানো কপাল ঠিক করে মৃদু হেসে উঠল। পলির কাঁধ জড়িয়ে ধরে জিয়াদের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। এমন পরিস্থিতিতে পলি ঠিক কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না,ফলে মাথা নিচু করে শাড়ির আচল শক্ত করে ধরে রাখল। কাঁধ থেকে ইমরানের হাত সরাতে চাইলেও পারল না,কারণ ইমরান স্ত্রীকে ছাড়তে চাইছে না।পলি এমন পরিস্থিতিতে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভেজাল। ইমরান জিয়াদের বাহু হালকা থাপড়ে হেসে বলল,

–“হেই ইয়ং ম্যান আ’ম ইমরান চৌধুরী। জাহানারা ভাবির একমাত্র দেবর। এন্ড সি ইজ মাই ওয়ান এন্ড ওয়ানলি ওয়াইফ অনামিকা পলি।”
এতক্ষণে জিয়াদ পলির থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে।ইমরানের কথায় মৃদু হেসে ক্ষীণ কণ্ঠে বলল,”আমি নাইম শেখ জিয়াদ।”
পলি আড় চোখে জিয়াদের দিকে তাকাতেই আবার চোখাচোখি হল। আন্তরের তাড়নায় দম বন্ধ হয়ে আসছে মেয়েটার। কিন্তু এই মূহুর্তে কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছে না এখান থেকে পালানোর। ইমরান হঠাৎই জিয়াদের পাশে একটা মেয়েকে লক্ষ করে। সে একটু ভেবে হেসে বলল,”উমম ভুল না হলে তুমি ভাবির বোন রাইট।”
জুই মৃদু হেসে বলল,”জি আমি জাহানারা আপুর ছোট বোন হুমাইরা শেখ জুই। আর ওরা আমার বান্ধবী সোমা এবং মিনা।”
ইমরান সবার সাথে পরিচিত হয়ে যখন বলবে কিছু খাওয়ার কথা, তার আগেই পলি রিনরিন কন্ঠে বলে উঠলো,

–“আমার শরীর খারাপ করছে, এখনই বাসায় যেতে হবে।”
–“কি বলছ ডাক্ত….”
–“তেমন কিছু না, বাসায় গেলে ঠিক হয়ে যাব। আমার রেস্ট প্রয়োজন।”
ইমরানকে থামিয়ে পলি নিজের কথা বলে চলে যেতে লাগল। ইমরান সবার সাথে হেসে বিদায় নিয়ে বলল আরেকদিন ভালো করে কথাবার্তা হবে।
জিয়াদ পিছন থেকে পলকহীন তাকিয়ে রইল পলির দিকে। যখন তার দৃষ্টি থেকে আড়াল হল তখনই ব্যথাতুর হেসে উঠল।

–“এই জুইদের সাথে ওরা কারা?”
–“বোনের শ্বশুর বাড়ির মানুষ।”
জিয়াদ তার ফ্রেন্ড সুজির কথায় উত্তর করে আবার সবার সাথে বসল। উপস্থিত জিয়াদের আরেকজন ফ্রেন্ড হিমা বলে উঠলো,

জাহানারা পর্ব ৬৩

–“বাদ দে দোস্ত। এখন তোর কথা বল, কে ছিল মেয়েটা আর কবে তোদের দেখা হয়?”
হিমার কথায় অদ্ভুত হাসলো জিয়াদ। অতঃপর কয়েক মূহুর্ত চুপ থেকে আনমনে বলে উঠলো,
❝কোনো এক শীতকালে অতিথি পাখির মতো সে দিয়েছিল এক চিলতে দেখা,
রেখে গেল মায়ার ঘোর, আর আমায় করল একা।❞

জাহানারা পর্ব ৬৫