Home ডাকপ্রিয়র চিঠি ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৫০

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৫০

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৫০
রিক্তা ইসলাম মায়া

মানিক মাথা চেপে সুখকে গালি দিয়ে বলে—
‘শালীর ঘরের শালী চু*তমা*রানীর ঝি, মারলি ক্যান?’
সুখ নূরজাহানকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে দেখে মানিক একহাতে কপাল চেপে তাদের পেছনে দৌড় দেয়। মুখে অনবরত অশ্রাব্য গালিগালাজ করছে, ‘ঐ হারা*মজা*দি বাচ্চা, চুদানীর ঝি, খাঁড়া কইতাছি। আমার নূরজাহানরে দিয়া যা শালীর ঝি।’
বসার ঘরের পশ্চিমে পরপর তিনটে গেস্ট রুম। সুখ নূরজাহানকে নিয়ে পশ্চিমের প্রথম গেস্ট রুমে ঢুকে দরজা লাগাতে যায়। কিন্তু মানিক তৎক্ষনাৎ দরজার ওপাশ হতে দুহাতে ধাক্কা দিয়ে ধরে ফেলে বলে—
‘মাগীর ঝি, তোরে রাস্তায় ফালাইয়া কুবামু। বান্দির ঝি, আমার নূরজাহানরে ফিরত দে কইতাছি। তোরে ছিঁড়া কাইট্টা লবন লাগামু কইতাছি নর্টীর ঝি।’

সুখ একা শক্তিতে মানিকের সঙ্গে পেরে উঠছে না। মানিক গায়ের জোরে দরজা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে দেখে নূরজাহান তৎক্ষণাৎ সুখের সঙ্গে দরজায় ধাক্কা দিয়ে ছিটকিনি আটকে দেয়। বাইর থেকে মানিক দরজায় কিল, ঘুসি ও লাথি মারছে অনবরত দরজা ভাঙতে। মুখে অসংখ্য গালিগালাজ তো করছেই। নূরজাহানের চোখে পানি। সুখ আতঙ্কিত মুখে নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে বলে—
‘ ভানি এই অসভ্য লোকটা কে?
‘মানিক সওদাগর।’
ভয়, আতঙ্ক আর শশুরবাড়ির মানুষের সামনে সম্মান নষ্ট হওয়া—সবমিলিয়ে নূরজাহান কাঁদছে। সুখের প্রশ্নের উত্তরে নূরজাহান মানিক সওদাগর সম্পর্কে তেমন কিছুই বিস্তারিত বলতে পারল না, শুধু মানিকের নামটা বলল। সুখ নূরজাহানের মুখে মানিক সওদাগর নামটা শুনে বলে—

‘কালো মানিক্কা তো সাংঘাতিক বদমাশ ভাবি। জাউয়া বেডা, ক্লান্ত বানিয়ে ফেলছে! আল্লাহ গো!’
বাইরে হইচই শোনা গেল। সুখ ও নূরজাহান দরজায় কান পেতে দাঁড়ায় বাইরে কী হচ্ছে জানতে। বাড়িতে পুরুষ মানুষ না থাকায় মানিকের লোকজন লাঠিসোটা হাতে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেছে। ফাতেমা, সালমা, আফিয়া, সুফিয়া ও সৈয়দ শাহ সহ বাড়ির মহিলারা চিল্লাচিল্লি করছে। মানিক ও তার লোকজনকে দেখে সৈয়দ শাহ প্রথমে মনে করে ছিলেন বাড়িতে ডাকাত পড়েছে হয়তো। তিনি ছেলের বউদের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে নিজেও সবার সাথে আটকা পড়েন মানিকের ছেলেদের হাতে।
সালমা, ফাতেমা, সুফিয়া, আফিয়া, রেণু ও রোজিনা সবাই মিলে মানিককে বাধা দিচ্ছে সুখ-নূরজাহানের রুমের দরজা না ভাঙতে। মানিক বারবার ধাক্কা দিয়ে তাদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। মানিকের ছেলেপেলে সবার উপর লাঠি দিয়ে আঘাত করছে—আফিয়া, সুফিয়া, ফাতেমা, সালমা, রেণু, রোজিনা, সৈয়দ শাহ কেউ বাদ যাননি তাতে। দশ-বারোজন ছেলে মিলে সবাইকে আঁটুক করে ধরে রাখে।

শক্তপোক্ত দরজা ভাঙতে না পেরে মানিক কিশোরের কাছ থেকে বন্দুক নিয়ে দরজায় গুলি করতে উদ্যত হয়। সালমা আতঙ্কে মন্টুর হাত কামড়ে ছুটে যান মানিককে বাধা দিতে। বন্দুক হাতে দুজনের মাঝে টানাটানি শুরু হয়। সবাই আতঙ্কে অস্থির, কখন না জানি গুলি ছুটে যেকোনো একজন মারা পড়ে! ভাগ্য সহায় থাকায় কারও গায়ে গুলি লাগেনি। মানিক পুরুষ মানুষ হওয়ায় সে গায়ের জোরে সালমার কাছ থেকে বন্দুকটা ছিনিয়ে নিয়ে সালমাকে থাপ্পড় মেরে ফ্লোরে ফেলে দেয়। রাগের বশে মানিক দুই-তিনটে লাথিও মারে সালমার বুক-পিঠ কোমরে মিলিয়ে। মুখে অসংখ্য গালিগালাজ তো আছেই।

মানিক সালমাকে মারছে দেখে বাড়ি সবাই চিৎকার করে। ফাতেমা গায়ের জোর খাটিয়ে বেলালের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়াতে চাইলে বেলাল হাতের লাঠি দিয়ে আঘাত করে ফাতেমার পায়ে। ভদ্রমহিলা পা ধরে চিৎকার করে বসে পড়েন ফ্লোরে। মাকে আঘাত পেতে দেখে আফিয়া ও সুফিয়া চিৎকার করছে নিজেদের ছাড়াতে। কিন্তু জোড়াজুড়িতে কেউ পুরুষদের শক্তির সঙ্গে পেরে উঠছে না। নূরজাহান সুখ দুজনেই বুঝতে পারছে, তাদের জন্যই মানিক বাড়ির সবাইকে মারধর করছে। নূরজাহান সুখকে ঠেলে পাশে সরিয়ে দরজার লকে হাত দিতেই মানিক দরজার ওপাশ থেকে দরজার লকের উপর পরপর গুলি চালায় লক ভাঙতে। মানিকের প্রথম গুলিটা করতেই নূরজাহান ছিটকে সুখকে নিয়ে দূরে সরে যায়। মানিক দ্বিতীয় তৃতীয় গুলিটা করে দরজার লক ভেঙে ফেলে। গায়ের জোরে লাথি মেরে দরজা খুলে সুখকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে নূরজাহানের হাত টেনে ধরে নিয়ে যেতে। সুখ বাধা দিতে নূরজাহানকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে। মানিক নূরজাহানকে টেনে-হিঁচড়ে নিজের সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে, পুরুষালি শক্তিতে সুখও নূরজাহানের সঙ্গেই ঘসেটে যাচ্ছে।
বাড়ির মেয়েরা সবাই চিল্লাচিল্লি করছে। সকলেই বন্দী মানিকের ছেলেদের হাতে। ঝন্টু দৌড়ে এসে সুখকে গালি দিয়ে নূরজাহানের কাছ থেকে আলাদা করতে টেনে ধরে। সালমা মার খেয়েও ফ্লোর থেকে উঠছেন মেয়ে আর ছেলের বউকে বাঁচাতে। ফাতেমা নিজের আহত পা-টা ধরে সালমাকে চিৎকার করে বাধা দিচ্ছেন নূরজাহানকে না বাঁচাতে, বলছেন—

‘ভাবি, তুমি যেওনা। নিয়ে যাক এই বদচরিত্রা বদমাইশ মেয়েকে।
সৈয়দ বাড়ির মেয়ে-বউরা সবাই থ্রি-পিস পরে। নূরজাহানকে বলা হয়েছিল বাড়িতে সবসময় থ্রি-পিস পরে থাকতে। এই যুগের মেয়েদের এখন আর শাড়ি পরতে হয় না। সালমা, ফাতেমা, মুনিয়া শাশুড়ি হয়েও এই বয়সে এসে বাড়িতে সবসময় থ্রি-পিস পরেন, তাহলে নূরজাহান কেন পরবে না? তবে নূরজাহান মারিদের পছন্দ অনুযায়ী শাড়ি পরে বলে কেউ আর বাধা দেয় না। ছেলেদের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে সালমার গায়ের ওড়না কোথাও পড়ে গেছে সেটার খেয়াল নেই। তিনি ফাতেমার নিষেধ অমান্য করে তৎক্ষনাৎ ফ্লোর থেকে উঠে দৌড়ান মানিকের পেছনে। গায়ের শক্তিতে ঝন্টুকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে সুখকে ছাড়িয়ে মা-মেয়ে মিলে মানিকের উপর হামলে পড়েন নূরজাহানকে ছাড়াতে।

সালমা কিছু না পেয়ে মানিকের হাতে কামড়ে ধরেন। আর সুখ সেই সুযোগে মানিকের চোখে মুখে খামচে ধরলে মানিক নিজের ভারসাম্য হারায়। বয়স্ক মানুষের শক্ত দাঁতের কামড় মানিক সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে নূরজাহানকে ছেড়ে দেয়। হাতের বন্দুকটা দিয়ে সুখের কপালে জোরে আঘাত করে সুখকে ছিটকে ফেলে ফ্লোরে। সুখ ফ্লোরে পড়ে তৎক্ষনাৎ আবারও উঠে দাঁড়াচ্ছে মানিককে মারতে। মানিক সেই ফাঁকে হাতের বন্দুকে সালমাকে গুলি করতে চাইলে সকলে একত্রে আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে। নূরজাহান চিৎকার করে তৎক্ষণাৎ দুহাতে মানিকের বন্দুকসহ হাতটা উপরে তুলে ধরতেই পরপর গুলি চলে ছাদে। ছাদ ফুটো হয়ে সিমেন্ট-বালু এসে পড়ে গায়ে। তিনটা মেয়ের সাথে মানিক পেরে উঠতে না পেরে চিৎকার করে নিজের ছেলেদের উদ্দেশ্যে বলে—

‘ঐ সয়োরের বাচ্চারা ওইখানে খাঁড়ায় আছত ক্যান? এই চু*দা*তা*নির ঝি গুলারে ধর। আমারে ছিঁড়া ফালাইতাছে। মাগীর ঝি গুলা মনে অই গু খাইয়া গায়ে শক্তি বাড়াইছে একেকটা!
ঝন্টু আর কিশোর দৌড়ে এসে সুখ আর সালমাকে টেনে-হিঁচড়ে মানিকের কাছ থেকে সরিয়ে নেয়। নূরজাহান যাবে না বলে ফ্লোরে বসে পড়ে। মানিক নূরজাহানের হাত টেনে-হিঁচড়ে ঘর থেকে বের করতে চাচ্ছে।
মারিদদের অফিস বাড়ি থেকে এক ঘণ্টার রাস্তা। মারিদ সুখকে বলেছে, যেভাবেই হোক আধাঘণ্টার জন্য হলেও মানিকসহ ওদের লোকজনকে আটকে রাখতে। বাড়িতে এই হাঙ্গামা আর ধস্তাধস্তিতে কতটা সময় গেছে সুখ জানে না, তবে মারিদ আসার আগ অবধি সে নূরজাহানকে সেইফ রাখতে চায়। ইতিমধ্যে সালমা, সুখ, ফাতেমা ও নূরজাহান আঘাত পেয়েছে মানিক ও তার দলের হাতে। সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছেন সালমা আর সুখ। মানিকের জন্য কেউ নূরজাহানের গায়ে টোকা দেওয়ার সাহস না করলেও সালমা ও সুখকে বাঁচাতে গিয়ে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে নূরজাহানও আঘাত পায় মানিকের হাতে; কপাল কেটেছে কিছুটা।
দিশেহারা সুখ ঝন্টুর চোখে-মুখে খামচে ধরতে ঝন্টু চিৎকার করে। ঝন্টুর চিৎকারে সবাই পেছনে তাকায়, সেই ফাঁকে সুখ নিজেকে ছাড়িয়ে দৌড়ে গিয়ে হঠাৎ মানিকের হাতের বন্দুকটা কেড়ে নেয় নিজের হাতে। উপস্থিত সকলেই আঁতকে ওঠে। সুখ বন্দুক চালাতে পারে না; দুহাতে বন্দুকটা চেপে ধরে আছে মানিকের দিকে। কম্পিত হাত দুটো অনবরত কাঁপছে তিরতির করে। ধস্তাধস্তিতে সুখের শরীর ঘেমে একাকার। কপাল থেকে রক্ত আর ঘাম মিশে গাল বেয়ে গলায় নামছে। সুখ মানিকের দিকে বন্দুক তাক করেছে দেখে নূরজাহান ফ্লোর থেকে তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ায়। সুখ কম্পিত হাতে শক্ত গলায় মানিককে বলে—

‘ আমার ভাবীকে ছাড় বলছি কালো মানিক! তা না হলে আমি কিন্তু গুলি করব তোকে!
মানিক ছাড়া উপস্থিত সবাই ভয় পাচ্ছে, যদি সুখ সত্যি গুলি করে দেয় সেই নিয়ে, ঝন্টু চোখ-মুখ ডলে দৌড়ে আসে সুখকে আটকাতে। সুখ হাতের বন্দুকটা একবার মানিকের দিকে, একবার ঝন্টুর দিকে তাক করে ঝন্টুকে হুঁশিয়ার করে বলে—
‘এই শুটকির ঘরের শুটকি, দূরে যা বলছি! নাহলে কিন্তু তোরেও গুলি করব বলে দিচ্ছি! যা সর, দূরে যা!
ঝন্টু হালকা-পাতলা গঠনের মানুষ, শরীরে হাড্ডি ছাড়া মাংশের দেখা নেই। সেজন্য সুখ তাকে ‘শুটকি’ বলায় সে বেশ অপমান বোধ করে। আবার বন্দুকের ভয়ে দূরে সরেও যায়—পাঁচে যদি সত্যি সত্যি মেয়েটা ওকে গুলি করে দেয় তো? এতক্ষণে মানিক নূরজাহানকে নিয়ে চলে যেত; কিন্তু এই ছোট্ট একটা মেয়েই এতগুলা লোককে বারবার হেস্তনেস্ত করছে, সবার নাকে দম এনে ছেড়েছে! ছোট মেয়ে হলে কী হবে, ছোট মরিচের ঝাল বেশি।
মানিক হিংস্র রাগে ফুঁসফুঁস করছে। ঝন্টুকে ধমকিয়ে বলে—

‘এই খানকি মাগির বিষ বেশি। এইডারেও লইয়া ল সাথে, ঝন্টু।’
নূরজাহান এবার তিলমিলিয়ে উঠে গর্জে বলে—
‘খবরদার মানিক ভাই! সুখের গায়ে কেউ হাত দিলে খোদার কসম, আমি তোমায় খুন করব বলছি!
অল্প সময়ের জন্য মানিকের কন্ঠে নমনীয়তা দেখা যায়। মানিক আকুতি স্বরে নূরজাহানকে বলে…
‘তোমার হাতে তো আমি মেলা আগেই খুন হইছি! নতুন কইরা তুমি আমারে কি খুন করবা, নূরজাহান?
সুখ বুঝেছে মানিক নিজের জানের তোয়াক্কা করে না, তাই বন্দুকের ভয় মানিককে দেখিয়ে কাজ হবে না। মানিক সুখসহ নূরজাহানকে নিয়ে যেতে পারে। মানিকের চোখে নূরজাহানের জন্য আকুতি দেখে সুখ চট করে বুদ্ধি করে নূরজাহানের বাহু টেনে গলা চেপে ধরে মাথায় বন্দুক ঠেকায়। হুমকি দিয়ে বলে—

‘বেশি বাড়াবাড়ি করলে আমি কিন্তু তোমার নূরজাহানকে মেরে দেব, কালো মানিক!
নূরজাহান মানিকের কথার উত্তর দিতে যাচ্ছিল, এর মাঝে সুখ ওর মাথায় বন্দুক ঠেকাতে উপস্থিত সবাই আবাক হয়। নূরজাহানও অবাক হয়। কিন্তু মানিকের অবস্থা ছিল দেখার মতো! সে যেন দিশেহারা পাগল, উন্মাদ হয়ে গেছে সুখ নূরজাহানের মাথায় বন্দুক ঠেকানোতে। মানিকের রুহ যেন নূরজাহানের মধ্যে বাঁচে তেমন করে ছটফটিয়ে উঠে আতঙ্কে। যদি সুখ নূরজাহানের মাথায় গুলি করে দেয়—সেই আশঙ্কায় মানিক দিশেহারা হয়ে পাগলের মতো করে সুখকে বাঁধা দিয়ে বলে—
‘দেখ বইন, তোর আল্লাহ দোহাই লাগে, বন্দুকডা নিচে নামা! আমার নূরজাহানের কিচ্ছু করিস না, ও ভয় পাইতাছে! তুই আমারে মার। গুলি কর। হেরপরও আমার নূরজাহানরে ছাইড়া দে! দেখ, আমি চইল্লা যাইতেছি, তুই নূরজাহানরে মারিস না।

মানিক সর্বোচ্চ খারাপ, তার খারাপের শেষ নেই। কিন্তু নূরজাহানকে ভালোবাসার বেলায় মানিক প্রেমিক হিসেবে নিষ্পাপ, পবিত্র আর নিষ্ঠাবান—যে নিজের জীবন দিতেও পিছপা হবে না প্রেমিকার জীবন রক্ষায়। সুখ, সালমা, ফাতেমা, আফিয়া, সুফিয়া, রেণু, রোজিনা সকলে অবাক চোখে মানিকের নূরজাহানকে ঘিরে দিশেহারা উন্মাদ পাগলামি দেখে। সুখ মুভিতে দেখেছিল, নায়িকার কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে নায়ককে জব্দ করা যায়; অথচ বাস্তব জীবনে নূরজাহানের কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে একজন ভিলেনকে জব্দ করছে সে! কার ভালোবাসা খাটি পবিত্র? সিনেমার কোনো নায়কের, নাকি বাস্তব জীবনের এমন ওয়ানসাইডেড মানিকের মতো উন্মাদ পাগল প্রেমিকের?
সুখ নূরজাহানের মাথায় গুলি করবে—এমনভাবে ট্রিগার চেপে জোর খাটিয়ে সুখ বলে—
‘এত কথা বুঝি না! তুমি তোমার দলবল নিয়ে এক্ষুনি আমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও, নয়তো আমিও মরব সাথে তোমার নূরজাহানকে নিয়ে মরব! এখন বলো, তুমি কি চাও?’
‘না না না বইন! আমি কিচ্ছু চাই না। দেখ, আমি চইল্লা যাইতেছি। তুই আমার নূরজাহানরে মারিস না, ছাইড়া দে।’

মানিক দুই-এক কদম পিছিয়ে যাচ্ছে। সুখ মানিকের সঙ্গে কথা বলার ফাঁকে, কিশোর ফাতেমাকে ছেড়ে হঠাৎ দৌড়ে পেছন থেকে সুখকে আক্রমণ করে। হঠাৎ আক্রমণে সুখ ও নূরজাহান দুজনেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। অসাবধানতায় সুখের বন্দুকটা ছিটকে দূরে পড়তেই মানিক লাফ মেরে সেটি হাতে নেয়। তেড়ে গিয়ে সুখের দিকে বন্দুক তাক করে গালি দিয়ে বলে—
‘বান্দির ঝি! বহুত জ্বালাইছস আমারে। এহন একডা গুলি কইরা তোর জাউরামি বাইর করমু!
নূরজাহান, সালমা, ফাতেমা, সুফিয়া, আফিয়া, রেণু, রোজিনা সকলেই চিৎকার করে ওঠে মানিক সুখের দিকে বন্দুক তাক করতেই। নূরজাহান দুহাতে মানিকের হাত চেপে ধরে আতঙ্কিত স্বরে বলে—
‘খবরদার মানিক ভাই! আপনি কাউকে গুলি করলে আমি কিন্তু নিজের জীবন দিয়ে দেব!’
মানিক দমে যায়। সুখকে ছেড়ে নূরজাহানের হাত থাবা মেরে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। সুখকে কিশোর ধরে রেখেছে। টানছে সঙ্গে নিয়ে যেতে।

বাইরে গাড়ির হর্ণের শব্দ শোনা যাচ্ছে, হয়তো কেউ এসেছে। মানিক নূরজাহানকে টেনে ঘর থেকে বাইরে বের করতে হিংস্র মারিদকে দেখা যায় গাড়ি থেকে হকিস্টিক হাতে বের হতে। কতটা পাগল আর দিশেহারা অবস্থায় অফিস থেকে মারিদ দৌড়ে এসেছে, তা তার উসকোখুসকো চুল আর ঘামে ভেজা শার্ট দেখেই বোঝা যাচ্ছে। মারিদের গাড়িতে হাসিবও এসেছে হকিস্টিক হাতে।
মানিক মারিদকে দেখেই হাতের বন্দুকে এলোমেলো গুলি ছাড়ে। আল্লাহ সহায় থাকায় প্রথম গুলিটা মিস হয়ে গিয়ে লাগে মারিদের গাড়ির কাচে। মুহূর্তে ঝনঝন শব্দে গাড়ির কাচ ভেঙে পড়ে। মারিদ ও হাসিব অস্ত্র ছাড়া শুধু হকিস্টিক হাতে এসেছে। একটা বন্দুকে ছয়টা গুলি থাকে, যার চারটা গুলি মানিক বাড়ির ভেতরে খরচ করে ফেলেছে—তিনটা গুলি নূরজাহানকে বের করতে ঘরের দরজায় আর একটা ছাদে করেছিল মানিক। আর এখন একটা মারিদের গাড়িতে। বাকি একটা গুলি মানিক তার দক্ষ হাতে আবার গুলি চালায় মারিদকে নিশানা করে। হাসিব মারিদকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের হাতে গুলি পেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। মারিদের হিংস্র রাগ যেন তরতর করে আকাশসমান হয়। বাড়ির মেয়েরা চিল্লাচিল্লি করছে মানিক মারিদকে গুলি করছে দেখে। নূরজাহানের মানিকে বাঁধা দিচ্ছে গুলি করতে। কিন্তু বন্দুকে গুলি শেষ এটা মানিকের ধারণাতেও ছিল না। মানিক আবার গুলি করার আগেই মারিদ দক্ষ হাতে হকিস্টিকটা মানিকের দিকে ছুড়ে মারতে মানিকের হাত থেকে বন্দুকটা পরে যায়।

মানিক রাগে-ক্ষোভে গর্জে উঠে মারিদের দিকে তেড়েফুঁড়ে যায় মারতে। মারিদ সেই ফাঁকে হাসিবের হকিস্টিকটা নিয়ে দক্ষ হাত চালায় মানিকের উপর। হিংস্র শিকারির মতো দুহাতে যেভাবে পারছে সেভাবে এলোপাতাড়ি হকিস্টিক চালাচ্ছে মানিকের উপর। মানিক কিছু বলবে কিংবা উঠে দাঁড়ানোর সেই সুযোগটা পর্যন্ত দিচ্ছে না মারিদ; নির্দয়ভাবে জংলি কুকুরের মতো লাঠিপেটা করছে মানিককে। মুহূর্তের মাঝে মানিক মাটিতে রক্তাপ্লুত অবস্থায় লুটিয়ে পড়ে।
মুহূর্তের মাঝে কী হয়ে গেল বুঝতে পেরে মানিকের ছেলেপেলে সবাই একত্রে মারিদের উপর হামলে পড়লে, মারিদ মানিককে ছেড়ে একের পর এক বাকিদের উপরও লাঠিপেটা করতে থাকে। যে সামনে আসছে তাঁকে হকিস্টিকে এলোপাতাড়ি বারি মারছে। মারিদ একা একটা ছেলে হয়ে দশ-বারো জন ছেলের সাথে পেরে উঠবে না, সেটাই স্বাভাবিক; তাই মানিকের ছেলেপেলেদের লাঠির পাল্টা দুয়েকটা আঘাত মারিদও পাচ্ছে।
বাড়ির মেয়েরা সবাই একত্রে মারিদের সঙ্গে যোগ দেয়। লাঠি, ইট, গাছের ডাল ভেঙে যে যেটা পাচ্ছে সেটাই নিয়ে মানিকের ছেলেদের এলোমেলো মারছে।

মেয়েরা যোগ দেওয়ায় মারিদের জন্য সহজ হয়; ছেলেদের সংখ্যা কমে আসে। সুখ আফিয়া মানিকের ছেলেদের লাঠি দিয়েই ওদের আঘাত করছে। মেয়ে হয়ে কি ছেলেদের শক্তির সঙ্গে পারবে? দেখা যাচ্ছে তারা একটা বারি দিলে অপর পাশ থেকে দুটো বারি পাচ্ছে।
মারিদ বাড়িতে আসার কয়েক মিনিটের মাঝে রাদিলের গাড়ি সৈয়দবাড়িতে ঢোকে। গেট থেকেই বাড়ির সবার মারামারি দেখে রিফাত ও রাদিল দুজনেই হকিস্টিক নিয়ে গাড়ি থেকে লাফিয়ে বের হয়ে দৌড়ে দেয় সবার উদ্দেশ্যে। সুখ মারিদকে কল করার সময় রাদিল ও রিফাতকেও কল করেছিল বাড়িতে গুন্ডা পড়েছে বলে। এই সময়ে রাদিল ও রিফাত দুজনেই কলেজে ছিল; সুখের ফোন পেয়ে কী দিশেহারা অবস্থায় দৌড়ে এসেছে, তারা নিজেরাই জানে!

রেণু ও রোজিনা মোটা মন্টুর চুল টেনে মাটিতে ফেলে, রোজিনা মন্টুর বুকে বসে গালে থাপ্পড় দিচ্ছে। রেণু মন্টুর চুল টেনে ধরে রেখেছে যেন উঠতে না পারে। ঝন্টুকে সুফিয়া ও আফিয়া দুবোন মিলে দুপাশ থেকে দুহাতে ধরে টানাটানি করছে। ঝন্টু এমনই শুটকির মতো শুকনা মানুষ, দুই মেয়ের টানাটানিতে সে মাঝ দিয়ে ছিঁড়ে যাওয়ার অবস্থা! সালমা ও ফাতেমা মিলে বাছির নামের একটা ছেলেকে চারাগাছ ভেঙে সেই গাছের ডাল দিয়ে পেটাচ্ছে। সুখ ও নূরজাহান তিতাসকে লাঠি দিয়ে মারছে—একজন নারী একটা পুরুষের সাথে পারবে না বলে, দুজন নারী মিলে একজন পুরুষকে মারছে! আর মারিদ মানিকসহ বাকি ছেলেদের পেটাচ্ছে।
রাদিল ও রিফাত সেই অবস্থায় হকিস্টিক হাতে দৌড়ে এসেছে। মারিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দুই পক্ষের মারামারি আরো জোরালো হয়। মানিকের লোকজনের অবস্থা প্রায় রক্তাক্ত।
মিনিট দশেক পর মাহবুব ও মকবুলের গাড়ি বাড়িতে প্রবেশ করে। রবিউল শাহ থানার ওসি হওয়ায় তিনি চারটা জিপে করে বাড়িতে পুলিশ বাহিনী নিয়ে এসেছেন। মুহূর্তের মাঝে বন্দুক হাতে জিপ গাড়ি থেকে পুলিশ বাহিনী লাফিয়ে বের হচ্ছে, চোখের পলকে শত পুলিশের ভিড় দেখা যায় সৈয়দ বাড়িতে। মানিকসহ তাদের ছেলেদের অবস্থাও প্রায় আধমরা; রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে পড়ে আছে একেকজন, উঠতে পারছে না। পুলিশ তাদের টেনে তুলছে গাড়িতে।

মারিদ বাড়ির মেয়েদের ভেতরে যেতে আদেশ করে। মেয়েরা সবাই বাড়ির ভেতরে চলে যাচ্ছে। সুখ নূরজাহানকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে যাচ্ছে দেখে মানিক দিশেহারা উন্মাদের মতো গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে আর নূরজাহানকে বলছে—
‘এই নূরজাহান? এই! তুই আমারে আবার ছাইড়া যাস না! তোরে ছাড়া আমি বাঁচুম না নূরজাহান! মইরা যামু! ওই নূরজাহান? ক্যান তুই আমারে বারবার ছাইড়া চইল্লা যাস? ক্যান তুই আমারে একটু ভালোবাসলি না? ক্যান তুই আমার হইলি না নূরজাহান? কোন দোষে আমারে ছাইড়া গেলি? আমি তোরে ছাড়া বাঁচুম না, মইরা যামু নূরজাহান! আমার বুকডা ফাইটা যাইতাছে তোর লাইগা! অ নূরজাহান, আমার নূরজাহান তুই ফিইরা আয়, একটাবার ফিরা আয় কলিজা!

রক্তাক্ত মানিককে দুটো পুলিশ টেনে-হিঁচড়ে জিপ গাড়িতে তুলছে, অথচ মানিক নিজের কথা চিন্তা করছে না; শরীর লা*ল রক্তে মাখোমাখো, অথচ সে শরীরের ব্যথা যন্ত্রণা ভুলে নূরজাহানের চলে যাওয়ার দিকে উন্মাদ পাগলের মতো চিৎকার করছে। পাষাণ নূরজাহান একটিবারের জন্যও পেছন ফিরে তাকায় না! অথচ উপস্থিত এমন কেউ নেই যে মানিকের চিৎকার-আহাজারিতে ঘুরে তাকায়নি। মানিককে ঐ অবস্থায় দেখেনি। সুখ, সালমা, ফাতেমা, আফিয়া, সুফিয়া, রেণু, রোজিনাও চেয়ে দেখেছে মানিকের আর্তচিৎকার, শুনেছে আর্তনাদের কথা। কারও মায়া লেগেছে মানিকের জন্য, আর কেউ উপহাস করেছে মানিককে। কিন্তু নূরজাহান পেছনে তাকায়নি; মারিদের আদেশে সোজা বাড়ির ভেতরে চলে যায়।
হিংস্র মারিদ ফেলে দেওয়া হকিস্টিক মাটি থেকে তুলে ফের মানিকের দিকে তেড়ে যায়। পুলিশ ঠেলে মানিককে আবারও এলোপাতাড়ি প্রহার করতে থাকে। রিফাত রাদিল—দুজন পুলিশ তৎক্ষণাৎ মারিদকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে বাধা দেয়। মাহবুব মকবুল দৌড়ে এসে মারিদকে সান্ত্বনা দিচ্ছে শান্ত হতে। রবিউল শাহ নিজেও মারিদকে শান্ত হতে বলছেন।

পুলিশের গাড়িতে করে মানিক ও তার ছেলেপেলেদের থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সৈয়দবাড়ির মতো প্রভাবশালী পরিবারে দিনদুপুরে মানিক গুন্ডাপান্ডা নিয়ে হামলা করবে, তা কেউ ভাবেনি। আজ সঠিক সময়ে মারিদ পৌঁছাতে না পারলে এতক্ষণে কেলেঙ্কারি হয়ে যেত। নূরজাহানকে নিয়ে যেত মানিক। তাই রবিউল শাহ নিজের থানার পুলিশ সিকিউরিটির জন্য সৈয়দ বাড়িতে চারজন পুলিশ রেখে দেন। থানার পুলিশ সিকিউরিটি রাখতে যেসব ফরম্যালিটি পূরণ করতে হয়, সেইসব উপরমহলে দরখাস্ত হিসেবে জমা দেবেন ভেবেছেন।
কিন্তু তারপরও আশেপাশের মানুষ আর রাস্তার মানুষ সকলেই দেখেছে মানিক নূরজাহানকে ঘিরে শেষের তোলপাড়। গ্রামের মানুষ হলে হয়তো এই ঘটনাকে বেশি নিন্দা করত; সেই তুলনায় শহরের মানুষ একটু কম নিন্দা করছে। তারপরও সবাই বলাবলি করছে, বদনাম করে বেড়াচ্ছে—সৈয়দবাড়ির বউয়ের সাবেক প্রেমিক গুন্ডাপান্ডা নিয়ে সৈয়দবাড়িতে হামলা করেছে মারিদ আলতাফের বউয়ের জন্য! আবার কেউ কেউ বলছে, সৈয়দবাড়ির বউই নাকি সাবেক প্রেমিককে ফোন করে ডেকেছে নিজের শশুরবাড়িতে, আর স্বামী-শশুর মিলে পিটিয়ে প্রেমিককে পুলিশের হাতে দিয়েছে! আশেপাশের মানুষের মাঝে বেশ বদনাম রটেছে মানিক-নূরজাহানকে ঘিরে এই হাঙ্গামার জন্য। মানুষ না জেনে না বুঝে কথা রটায়।

সালমা এতক্ষণ নূরজাহানকে বাঁচানোর জন্য মানিকের হাতে মার পর্যন্ত খেয়েছেন; কিন্তু এখন মানিককে পুলিশ ধরে নিয়ে যেতে পরিবেশ পরিস্থিতি শান্ত হতেই তিনি বসার ঘরের সোফায় বসে কপাল চাপড়াচ্ছেন আর আহাজারি করছেন। রিফাত ও রাদিল মিলে সবার ব্যান্ডেজ-পট্টি করছে। মেয়েরা সবাই কমবেশি আঘাত পেয়েছে; রাদিল সালমার কপালের রক্ত পরিষ্কার করছে, কিন্তু সালমার আহাজারির জন্য ঠিকমতো করতে পারছে না। সালমা বিলাপ করে বলছেন—

‘ কি মেয়ে আসলো আমার সংসারে, আল্লাহ গো অশান্তি আগুন লাগছে আমার ঘরে। আজ একটুর জন্য আমার মেয়েটা মরেনি। আল্লাহ, এই কলঙ্কিত দাগী মেয়ে আমার সংসারে থাকলে আমি এই সংসারে থাকব না! আমি সব ছেড়েছুড়ে চলে যাব যেদিকে দুচোখ যায়! আল্লাহ গো, একটা ডিভোর্সি তালাকের মেয়েকে কেমনে আমার সংসারে জায়গা দিল কীভাবে ওরা? আমার সোনার ছেলের এত বড় সর্বনাশ করল ষড়যন্ত্র করে? বড়লোক দেখে লোভ সামলাতে পারে নাই ছোটলোকের জাতেরা, সেজন্য লোভে পড়ে আমার সহজ-সরল ছেলেটার কাধে নিজেদের ডিভোর্সি পঁচা কাঠাল মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে ছোটলোকের জাতগুলা! আমার ছেলেটাকে ঠকিয়েছে ছোটলোকের জাতে!
রাদিল মাঝে সালমাকে বাধা দিয়ে সংশোধন করে বলে—

‘মারিদ সবকিছু জেনেশুনেই নূরজাহানকে বিয়ে করেছে, বড় মামী। তাছাড়া নূরজাহানের আগে ফোনে একটা বিয়ে হয়েছিল ফুফাতো ভাইয়ের সঙ্গে, নূরজাহান কখনো শশুরবাড়িতে যায়নি মামী।
সালমা কিছু বলবে তার আগেই ফাতেমা পাশ থেকে রাদিলের কথার উত্তর দিয়ে রাগে ফুসফুস করে বলে….
‘ফোনে বিয়ে হোক কিংবা সরাসরি, ডিভোর্স তো হইছে? ওরা আমাদের মারিদকে ফাসিয়ে নিজেদের বদচরিত্রের মেয়ে বিয়ে দিয়েছে! নয়তো প্রেমিক এসে প্রেমিকার শশুরবাড়ির মানুষদের এমনই মারে? শুনেছ কখনো? বড় ভাবিকেও কতগুলো থাপ্পড়, লাথি দিল! আপার বয়সে কেউ কখনো উনার গায়ে ফুলের টোকাও পযন্ত দেয়নি। কত সম্মানে এত বছর ধরে স্বামীর সংসার করছেন, আজ পর্যন্ত বড় ভাইই কখনো ভাবীকে জোরে ধমক দেননি, গায়ে হাত তোলা তো দূর! অথচ আজ সেই সম্মানিত মানুষ কত অপদস্ত আর মার খেলেন ছেলের বউয়ের প্রেমিকের হাতে! আজ একটুর জন্য সুখও গুলি খেতে খেতে বাঁচল নূরজাহানের প্রেমিকের হাতে…’

‘চাচী মুখ সামলে কথা বলুন।
দরজার সামনে থেকে ফাতেমাকে ধমকে ওঠে মারিদ। নূরজাহান নিজেও আঘাত পেয়েছে, কিন্তু শশুরবাড়ির মানুষের সামনে টু শব্দ করতে পারছে না। নূরজাহানের জন্যই সবাই মানিকের হাতে মার খেয়েছে, স্বাভাবিকভাবেই এখন সবাই নূরজাহানকে দোষী করবে, কথা শোনাবে। নূরজাহান সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে নীরবে কাঁদছে সালমা ও ফাতেমার কথায়। রাদিল ও রিফাত সবাইকে বোঝাচ্ছে, তাও সালমা, ফাতেমা কিছুতেই কিছু বুঝতে চাইছেন না। সুখ বাদে বাড়ির সব মেয়েরাই নূরজাহানের উপর নারাজ। রেণু, রোজিনাও কেমন বাঁকা চোখে নূরজাহানের দিকে তাকাচ্ছে। মানিকের আগমনে যে নূরজাহানের সংসারে আগুন লেগেছে, সবকিছু জ্বালিয়ে তছনছ করে দিয়ে গেছে মানিক, তার টের নূরজাহান বেশ পাচ্ছে।

মাহবুব, মকবুল ও রবিউলের সঙ্গে মারিদ এতক্ষণ বাইরে পুলিশের সঙ্গে কথা বলছিল—কীভাবে বাড়িতে আরও সিকিউরিটি বাড়ানো যায়। সেই সাথে মানিক সওদাগরকে কতগুলো মামলা দিয়ে চিরকালের জন্য জেলে আটকে রাখা যায় সেই ব্যাপারেও কথা বলছিল মারিদ। কথা শেষে মারিদ দ্রুত ঘরে আসে; তার নূরজাহানের জন্য বেশ চিন্তা হচ্ছিল। কিন্তু ঘরে ঢুকে সালমার পুরো কথা শুনতে না পারলেও শেষের কথাগুলো শুনতে পায়, আর দরজায় দাঁড়িয়ে ফাতেমার কথা শুনে সে ধমকে উঠে তক্ষুনি বলে—
‘সবকিছুতে অগ্রিম কথা বলেন কেন, চাচী? আমার বউ বলেছিল আমার মাকে আর আপনাদের কেউ মারতে? শিক্ষিত মানুষ হয়েও সবকিছুতে অশিক্ষিত মূর্খের মতো কথা বলেন কেন? আমার বউকে আমি চিনি না, আপনারা চেনেন ভালো? মানিক সওদাগর নূরজাহানের প্রেমিক হলে নূরজাহান মানিকের কাছ থেকে পালাতো কেন? কেউ কখনো প্রেমিকের কাছ থেকে পালায় দেখেছেন?
মারিদের শক্ত গলায় সবাই চুপ করে যায়। অপমানে ফাতেমার মুখ থমথমে হয়ে যায়। মারিদ ফাতেমাকে এই প্রথম উচু গলায় অপমান করছে দেখে সালমা তিলমিলিয়ে উঠে বলেন—

‘ দুদিন হয়েছে বিয়ে করেছিস? আর এক্ষুনি বউ চিনে গেছিস? মা চাচী এখন পর? কেউ না? ওই ডিভোর্সি মেয়ের জন্য এত দরদ? আর তোকে দশ মাস পেটে ধরে জন্ম দিয়ে, ত্রিশ বছর তোকে লালন-পালন করলাম, এখন আমাদের কোনো দাম নাই? এখন আমরা সবাই খারাপ আর তোর বউ একা ভালো মানুষ? তোর বউ তোকে তাবিজ করেছে মারিদ, সেজন্য মা-চাচী তোর জন্য খারাপ, চোখের বিষ! নইলে তোর শশুর ছোটলোকের জাত, আমার ঘরে তার চরিত্রহীন ডিভোর্সি মেয়েকে কীভাবে লোভে পড়ে বিয়ে দিল, হ্যাঁ? আজ আমার পঞ্চান্ন বছর বয়সের জীবনে এই প্রথম তোর বউয়ের জন্য পরপুরুষের হাতে মার খেতে হলো! সুখ একটুর জন্য গুলি খেতে খেতে বাঁচল! সৈয়দবাড়ির সবগুলো নারী সম্মানের সঙ্গে ছিল, তোর বউয়ের জন্য আজ সবাই অপদস্ত আর পরপুরুষের হাতে মার খেল! এই জবাব তুই, তোর বউ আর তোর শশুর মিলে দিবি আমাকে! নইলে তোর বউকে তালাক দিয়ে বাপের বাড়িতে রেখে আয় যদি মা চাস তো! না হলে আমি তোর বউয়ের রান্না করা অন্ন-পানিও পান করব না, না খেয়েই মরব দেখিস!

মারিদ রাগে ক্ষোভে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছে। শক্ত চোয়াল, দাঁতে দাঁত পিষে রেখেছে। এমনিতেই মানিকের জন্য তার মেজাজ চটে আছে, এখন আবার সালমা ও ফাতেমার দুর্ব্যবহার দেখে জিদে ফেটে পড়ছে। নূরজাহান নীরবে শব্দবিহীন কাঁদছে; মারিদকে মাথা নাড়িয়ে ইশারা করছে সালমাকে কিছু না বলতে। রাদিল ও রিফাত সালমাকে বোঝাচ্ছে এসবের মাঝে নূরজাহানের হাত নেই, তাও সালমা বুঝতে চাইছেন না; আর্তনাদ, আহাজারি ও চিৎকার-চেঁচামেচি করছেন।
মারিদ মায়ের কথার উত্তর না দিয়ে তেড়ে যায় নূরজাহানের দিকে। থাবা মেরে নূরজাহানের হাত টেনে সালমার উদ্দেশ্যে বলে—

‘আমার বউ যখন খারাপ, তখন আমি আমার খারাপ বউকে নিয়ে তোমাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি! যে বাড়িতে আমার বউয়ের ঠাঁই নেই, সে বাড়িতে আমিও থাকতে চাই না! চলো।’
মারিদ নূরজাহানকে টেনে নিজের সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। ফাতেমা সালমা থমকে যান; মারিদ যে নূরজাহানকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার কথা বলবে, তা উনারা ভাবেননি। মারিদ নূরজাহানকে নিয়ে চলে যাচ্ছে দেখে সালমা আরও চিল্লাপাল্লা করছেন। সৈয়দ শাহ বয়স্ক মানুষ, এসবের মাঝে ঘোলাটে চোখে ছেলের বউদের অশান্তি দেখছেন। উনার গায়ে তেমন জোর নেই যে উঁচু গলায় কাউকে কিছু কথা বলবেন; তিনি বসে আছেন সকলে শান্ত হলে কিছু কথা বলবেন বলে, অথচ কেউ উনাকে সেই সুযোগই দিচ্ছে না!
রিফাত ও রাদিল দৌড়ে গিয়ে মারিদের পথ আটকে বাধা দিচ্ছে না যেতে। নূরজাহান নিজেও মারিদের হাত টানছে মারিদের সঙ্গে যাবে না বলে। এই পরিস্থিতিতে সবাই নূরজাহানকে ভুল বুঝছে, খারাপ কথা বলছে; এখন যদি নূরজাহান মারিদের হাত ধরে শশুরবাড়ি থেকে চলে যায়, তাহলে সবার ভুল বোঝাবুঝি আরও বাড়বে। সালমা ও ফাতেমা সারা জীবন নূরজাহানকে এজন্য দোষী করবেন, বলবেন নূরজাহান মারিদকে নিয়ে চলে গেছে মায়ের বুক খালি করে!

মাহবুব, মকবুল ও রবিউল দরজায় ঢুকতেই সকলের হইচই দেখতে পান। মারিদ মাহবুবের কলিজার ছেলে; মারিদের সামান্য কিছু হলেও তিনি বাবা হয়ে দিশেহারা হয়ে যান। মারিদ নূরজাহানকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে দেখে তিনি দৌড়ে এসে মারিদকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন। আহাজারি করে বলেন—
‘আব্বা, আপনি আমাকে ছেড়ে যাইয়েন না, আব্বা! আমি আপনাকে একদিন না দেখলে আমার দিন যায় না, সকাল হয় না। আপনি আমার একমাত্র শখের ছেলে! আপনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলে আমি নিঃস্ব-কাঙ্গাল হয়ে যাব! আপনি আমাকে এত বড় শাস্তি দিয়েন না, আব্বা! আমি সইতে পারব না!
মারিদ পড়েছে ফ্যাসেদে। একদিকে বউয়ের অসম্মানে সে এই বাড়িতে থাকতে পারছে না, অন্যদিকে বাবার ভালোবাসা তাকে এই বাড়ি ছেড়ে যেতেও দিচ্ছে না। মারিদ বেশ বুঝতে পারছে, আজকের ঘটনাকে ঘিরে নূরজাহানের জন্য বেশ তিক্ততা জমেছে এই বাড়ির সবার মনে—বিশেষ করে সালমা আর ফাতেমার মনে। বাড়ির শাশুড়িরা যদি রাগচটা মানুষ হয়, তাহলে সেই সংসারে বউদের টিকে থাকা মুশকিল। নূরজাহানের জন্যও মুশকিল হবে পুনরায় সালমা আর ফাতেমার মন জুগিয়ে চলা। মারিদ বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে সৈয়দবাড়ি ছাড়তে পারল না, তাই শক্ত গলায় বলে—

‘আজকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যদি ফারদার এই বাড়ির কেউ আমার বউয়ের দিকে আঙুল তোলে, কিংবা দুর্ব্যবহার করে, অসম্মান করে—তাহলে সেদিনই হবে আমার জন্য এই বাড়িতে হবে শেষ দিন! আর কখনো এই বাড়িতে আমার বউকে নিয়ে আমি এই মুখী হব না, বাবা!’
মাহবুব মেনে নেন। মারিদ নূরজাহানের হাত টেনে সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরে চলে যেতেই মাহবুব পয়ত্রিশ বছরের সংসারে এই প্রথম সবার সামনে সালমাকে উঁচু গলায় ধমকান, শাসিয়ে বলেন—
‘বুড়ো বয়সে তোমার আমার সংসার করতে মন না চাইলে আমার ঘরের দরজা খোলা তোমার জন্য খোলা, মন চাইলে বেরিয়ে যেও তুমি!
উপস্থিত সকলেই অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে মাহবুবের দিকে তাকায়। ছেলের আর ছেলের বউয়ের জন্য নিজের পয়ত্রিশ বছরের সংসার ছেড়ে চলে যেতে বলছেন সালমাকে? এটাই পাওনা ছিল সালমার! সালমা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকেন।

ছেলের কথা শুনে বয়স্ক সৈয়দ শাহ এতক্ষণে মুখ খোলেন। ধমকে মাহবুবকে বলেন—
‘মাহবুব, মুখ সামলে কথা বল! সালমা এই বাড়ির বড় বউ। নিজের জীবনের অনেক কিছু ত্যাগ করে এই সংসারটাকে আগলে রেখেছে এতদিন। শেষ বয়সে এসে এখন স্বামী-সংসার ছাড়ার জন্য?’
‘ আপনার চোখের সামনেই তো আমার ছেলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল আব্বা! ও চেনে না মারিদ কেমন? তাহলে ওহ কেন ছেলের বউকে খুঁটিনাটি নিয়ে কথা শোনায়? আজকের ঘটনায় নূরজাহানের কী দোষ ছিল, আপনি বলেন? ও কেন বলে মারিদ ওর বউকে তালাক দিক? নূরজাহানের আগে যে ফোনে একটা বিয়ে হয়েছিল, সেই কথা এই বাড়ির সব পুরুষরাই আগে থেকে জানত। আপনাকে তো আমি প্রথম দিনই থানচি থেকে ফোন করে সবকিছু জানিয়েছিলাম!

আপনি নিজেও তো এই বিয়েতে সম্মতি দিয়েছেন, আব্বা! আমরা সব জেনেশুনে মারিদকে দিয়ে নূরজাহানকে বিয়ে করিয়েছি। তাহলে এখন এসব নিয়ে কেন বাড়ির মেয়েরা ঝামেলা করবে? একটা মাত্র ছেলের বউকে ওহ মানিয়ে নিয়ে চলতে পারে না? আজ যদি আমার মারিদ বাড়ি ছেড়ে চলে যেত, তাহলে ওকে আমি ফেরাতে পারতাম, আব্বা? মারিদ কেমন জেদি জানেন না আপনি?

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪৯

প্রথমে ছেলে, তারপর স্বামীর অপমানে বেশ অপমান বোধ করেন সালমা। ভেতর থেকে তিনি ভেঙে পড়েন। পয়ত্রিশটা বছর এই সংসারের জন্য নিঃস্বার্থভাবে খেটেও আজ উনার মূল্য নেই! দুই দিনে আসা ছেলের বউয়ের জন্য সবাই সালমাকে অপমান করছে, কথা শোনাচ্ছে! মাহবুব সালমাকে বাড়ি থেকে চলে যেতে পযন্ত বলেছে! এই সংসারে এই মূল্য পেলেন তিনি? তাও ছেলের বউয়ের জন্য?

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৫১