Home ডাক্টার ইশতিহার ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৬

ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৬

ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৬
অনামিকা আহমেদ

” মা, এই বেহায়া মেয়েটাকে বলে দাও, যেনো সে আমার আশেপাশে না ঘেঁষে। আমি এখন বিবাহিত, ওর ন্যাকামো আমার একদমই সহ্য হয় না। রূপ ছাড়া আমার কাছে আর কারো প্রাধান্য নেই কথাটা ওকে বুঝিয়ে দাও।”
অষ্টাদশীর উদ্দেশ্যে বাজখাঁই কন্ঠে কড়া কথাগুলো ছুঁড়ে মেরে ইশতিহার সবার সামনে দিয়ে উঠে চলে যায়। একটিবারের জন্য মেয়েটার বিধ্বস্ত চোখের চাহনির দিকে তাকালো না পর্যন্ত। রূপের ও মন মেজাজ ভালো নেই, অন্য কারোর ক্ষেত্রে হলে হয়তো মেয়েটার কাছে গিয়ে তাকে সান্ত্বনা মূলক আদরের ছোঁয়া দিত। কিন্তু সে যে তার স্বামীর দিকেই হাত বাড়িয়েছে, মেয়ে হয়ে সেটা রূপ কি করে সহ্য করে। তাই আজ আর রূপের অভিব্যক্তি স্বভাব সুলভ রইলো না, চোখ মুখ কুঁচকে মেয়েটার সামনে দাঁড়িয়ে মনে মনে তাকে বেহায়া বলে সম্বোধন করে ইশতিহার এর পেছনে পেছনে ছুটে গেলো।

ইশতিহার এর দীর্ঘদিন গ্রামের বাড়ি না আসার কারণ এই বেহায়া মেয়েটি, আঁখি। আত্মীয়তার দিক দিয়ে আঁখি ইশতিহার এর দূরসম্পর্কের চাচাতো বোন। আঁখি আর রূপ প্রায় সমবয়সী হওয়ায় আগে তাদের মধ্যে ভাব ছিল বেশ। কৈশোরে বছরে এক দুবার গ্রামের বাড়িতে সকলের আনাগোনা ঘটলে আঁখির ও আসা হতো সেখানে। মূলত এখন থেকেই ইশতিহার এর সাথে আঁখির দেখা। তবে কোনোদিন ও তেমন কথাবার্তা হয়নি তাদের মধ্যে। ইশতিহার এর সামনে পড়তেই আঁখির বুক কেঁপে উঠত ভয়ে, চমৎকার তার গাম্ভীর্য যা আঁখি কে প্রতি মুহূর্তে পুলকিত করেছে। সবাইকে ছাপিয়ে আঁখির চোখ জোড়া যখন ইশতিহার এর দিকে ছুটত, তখন ইশতিহার এর সূক্ষদৃষ্টি রূপের ওপরই নিবদ্ধ থাকত।
ইশতিহার এর বলা কথা গুলো যেনো আঁখি সহ্য করতে পারল না। তার দুনিয়া অন্ধকার হয়ে আসতে শুরু করলো। এতগুলো দিন সে যার পথ চেয়ে বসেছিল সে নাকি আজ অন্য এক মেয়ের স্বামী। আঁখি এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো যেনো দুনিয়ার কোনো কিছুই তার ওপর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে অক্ষম। কেবল এক দুই ফোঁটা করে অশ্রু গাল বেয়ে মেঝেতে পড়তে শুরু করলো।
সুলেখা একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিলেন। তার খুব ইচ্ছা হলো মেয়েটাকে একটু জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে কিন্তু পারলেন না। আজ আঁখি কে সান্ত্বনা দেওয়া মানে বড় রকমের বিপদ কে প্রশ্রয় দেওয়া। সবটা চিন্তা করে তিনি শুধু আঁখির একটু পাশে সরে এসে বলেন,

” আসলে ইশতিহার হুট করেই বিয়েটা সেরে ফেলেছে। আমাদের জানায়নি মাত্র। রূপ অন্তস*ত্ত্বা হওয়ার পর ব্যাপারটা জানা জানি হয়েছে। আমি বলি কি আঁখি, তুই সুন্দরী সুশীলা মেয়ে, ভালো একটা ছেলে দেখে বিয়ে করে নে। আর কতদিন ইশতিহার এর জন্য অপেক্ষা করবি, ও তো তোকে ভালবাসে না।”
সুলেখার বলা শেষ কথা গুলো কানে আসতেই আঁখির ক্রন্দনরত মুখের অভিব্যক্তি পরিবর্তন হয়ে ক্রোধে মুখ লাল হয়ে যায়। চোখ থেকে তার পানি ঝরছে ঠিকই কিন্তু এ যেনো দীর্ঘদিনের রাগের বহিঃপ্রকাশ।
” আমি তো ভালোবেসেছিলাম, আপনার ছেলেকে পাগলের মত ভালবেসেছিলাম। কিন্তু আপনার ছেলে আমাকে কখনো চোখেও দেখেনি। আমি কি রূপের চেয়ে কোনো অংশ দিয়ে কম? আমি ছাড়ব না আপনাদের, ইশতিহার ভাইয়া যখন আমার হয়নি তখন ওকে আমি আর কারোর হতে দিবো না। জ্বালিয়ে দিবো আমি ওদের সুখের সংসার, কথাটা মনে রাখবেন।”

সকালের সেই ঘটনার পর সেই যে ইশতিহার বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল আর ফেরার খবর নেই। রূপ সকাল থেকে না খেয়ে তার জন্য অপেক্ষা করে যাচ্ছে। বাইরে একটু শব্দ হলেই সে ছুটে যাচ্ছে জানালার কাছে ইশতিহার এসেছে নাকি দেখার জন্য কিন্তু তার এই অপেক্ষা নিমিষেই কর্পূরের মতো হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে দেরি করছে না।
কাপা হাতে জানালার পর্দা টেনে রূপ আবারো ক্লান্ত শরীরে বিছানায় বসে পড়ে। ঘোলা চোখে একবার দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকালে দেখতে পায় রাত সাড়ে আটটা বাজে। কিন্তু এখনও ইশতিহার এর একটাও খবর নেই দেখে নীরবে চোখের জল ফেলে ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না রূপের। ক্ষণে খোন তার মধ্যে থাকা ছোট্ট প্রাণটা নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। ছয় মাসের অন্তঃসত্বা সে, এই সময়টা যে প্রতিটা মেয়েই তার স্বামীকে পাশে চায় এটা কি ইশতিহার বোঝে। নয়তো সকল রাগ অভিমানের বহির্প্রকাশ করতে গিয়ে কেনো সে রূপ কে কষ্ট দেয়।

রূপ দু হাত জড়ো করে মুখ ঢেকে কেঁদে দেয়। দুশ্চিন্তার বিষা*ক্ততা তাকে এতটাই গ্রাস করেছে যে রূপ ইশতিহার ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারছে না। সকালের স্মৃতিগুলো বারবার তার মস্তিষ্কে হানা দিচ্ছে, সত্যিই কি সে এবার ইশতিহার কে হারিয়ে ফেলবে?
রূপ আর ভাবতে পারছে না। শরীর অসার হয়ে আসছে। ঠিক তখনই রুমের বাইরে কারো পায়ের আওয়াজ শুনে রূপ চোখ মেলে তাকায়। তার ধারণাই সত্যি হলো, ইশতিহার এসেছে। চোখ মুখে কঠোরতা বিদ্যমান, যেনো এইমাত্র সে রাজ্য উদ্ধার করে এসেছে। রুমে ঢুকতেই রূপের সাথে একবার চোখাচোখি হলেও ইশতিহার তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। রুমে ঢুকে ড্রয়ারে হাতের ঘড়ি আর চাবি খানা রাখতে রাখতে আয়নায় নিজের স্ত্রীর কান্নারত মুখটা ভালো করে দেখে নেয়। রূপ স্তব্ধ হয়ে বিছানার ওপর বসে অভিমানী চোখে ইশতিহার এর প্রতিটা নড়াচড়া দেখে যাচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ এর এই নিস্তব্ধতা ভেঙে ইশতিহার গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,

” মা বলল তুই কিছু খাসনি সকাল থেকে। এসব উদাসীনতার মানে কি রূপ? যা নিচে গিয়ে খেয়েনে।”
কিন্তু প্রতি উত্তর এলো না রূপের দিক থেকে। সে শুধু চেয়ে চেয়ে ইশতিহার কে দেখে যাচ্ছে। ইশতিহার কে এবার বাধ্য হয়ে রূপের দিকে ফিরতে হয়। ভ্রু তুলে একবার রূপ কে আপাদমস্তক দেখে সে বলে,
” কি হলো চুপ করে বসে আছিস যে? যা খেয়ে আয়। না খেলে শরীর খারাপ করবে, তখন আবার আমাকে তোকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটতে হবে।”
” আপনি কি আদেও আমার চিন্তা করেন ইশতিহার? কোথায় ছিলেন এতক্ষণ?”
” সেটা তোর না জানলেও চলবে।”
রূপ বিছানা থেকে নেমে ইশতিহার এর কাছে এগিয়ে আসে।
” কোথায় ছিলেন আমার সেই উত্তর চাই। ওই মেয়েটার কাছে ছিলেন আপনি? আমাকে ছেড়ে দিতে চাচ্ছেন?”

” রূপ, মুখ সামলে কথা বল। আমাকে দেখে কি তোর চরিত্রহীন লাগে তোর বাবার মতো?”
রূপ চুপ হয়ে যায়। ইশতিহার কখনও তাকে বাবা তুলে কথা বলবে রূপ কখনও ভাবতেও পারেনি। রূপ ইশতিহার এর থেকে দুই পা পিছিয়ে যায়, চোখে মুখে তার অবিশ্বাস চেয়ে গেছে। ইশতিহার মুহূর্তের মাঝেই রূপ কে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকে টেনে নেয়। মুখে হাজারো আদরের স্পর্শ দিতে দিতে বলে,
” আমার ভুল হয়ে গেছে রূপ। আমি এটা বলতে চাইনি। প্লীজ আমাকে মাফ করে দে।”
” কোথায় গেছিলেন আপনি?”
” আঁখির একটা ব্যবস্থা করতে গেছিলাম। যাতে ও কখনও আমাদের মধ্যে না আসে।”
” তাহলে সেটা আমাকে জানালেন না কেনো?”
” কারণ আছে দেখেই জানায়নি। তুই সবসময় বেশি চিন্তা করিস রূপ। দেখ আমি ছিলাম না দেখে না খেয়ে কি অবস্থা করেছিস নিজের। তুই কেনো নিজেকে কষ্ট দিস রূপ? তুই বুঝিস না তোর কষ্ট হলে আমারও কষ্ট হয়।”
রূপ ইশতিহার এর শার্ট মুঠো করে ধরে তার বুকেই বাচ্চাদের মত কেঁদে ফেলে।
” আপনি কেনো আমাকে এত কষ্ট দেন ইশতিহার। আমাকে বলে গেলে কি খুব ক্ষতি হতো। আপনার জন্য আমি কখন থেকে না খেয়ে বসে আছি। আমার ক্ষুধা লাগে না বুঝি।”
রূপের কথা শুনে ইশতিহার হেসে ফেলে। রূপের ছোট্ট মুখটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে আলতো সুরে বলে,

” কি খাবি বল? এনে দেই তোকে।”
রূপ খানিক ভেবে বলে,
” কাঁচা আম খাবো।”
” এত রাতে আমি কাঁচা আম কোথায় পাবো?”
” কেনো বাড়ির সামনের গাছে অনেক আম এসেছে এবারে। এখন থেকে পেড়ে নিয়ে আসেন।”
” আর ইউ মেড রূপ? আমি এত রাতে গাছে উঠব? কাল সকালে এনে দিবো নে।”
” না আমার আজই চাই, এক্ষুনি চাই”
রূপের সাথে না পেরে উঠে ইশতিহার মুখটা ভার করে বাড়ি থেকে বের হয় আম পাড়ার জন্য। বাড়ির বাইরে তখন ঘন অন্ধকার। তাই মোবাইলের ফ্লেশ লাইটটা জানিয়ে কোনো রকমে ইশতিহার গাছের একটা ডাল ধরে আস্তে আস্তে উপরে উঠে যায়। একটা ডালের ওপর বসে আম পাড়তেই যাবে ঠিক তখনই তার কানে ভেসে আসে কিছু কথা।

” আই লাভ ইউ জান। প্লীজ আমাকে একটু বোঝার চেষ্টা করো। আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি। তোমার বাড়ির কেও মানুক বা না মানুক আমার তাতে কিছুই যায় আসে না। জান প্লীজ একবার জানালাটা খুল। তোমার মুখটা দেখি না পুরো একটা দিন হয়ে গেছে। তোমাকে না দেখলে আমি শান্তিতে খেতে পারি না, ঘুমাতে পারি না, শুতে পারি না, ঘুম আসে না আমার। রাত গুলো যে আমার কেমন কাটছে তুমি কেনো বুঝ না। প্লীজ জান একবার আমার সামনে আসো।”

ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৫

রাত বিরেতে বউয়ের শখ মেটাতে গিয়ে ইশতিহার কে যে ভূতের প্রেমালাপ শুনতে হবে সেটা কে জানত। ভয়ে ভয়ে শব্দের উৎসের দিকে মোবাইলের ফ্লেশ লাইট ছুঁড়ে মারতেই ইশতিহার অবাকের শীর্ষে পৌঁছে যায়।
” আদনান তুই?”

ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here