Home ডার্কসাইড ডার্কসাইড পর্ব ২৪

ডার্কসাইড পর্ব ২৪

ডার্কসাইড পর্ব ২৪
জাবিন ফোরকান

আজ থেকে কয়েকদিন আগের কথা।একটি জ্যায বারে দেখা হয় এক ইটালিয়ান বান্দার সঙ্গে।প্রথম সাক্ষাতেই চিত্রলেখাকে প্রাইভেট চেম্বারে আমন্ত্রণ জানায় সে। ভদ্রভাবেই অস্বীকৃতি জানায় চিত্র।যাওয়ার পূর্বে তার উদ্দেশ্যে ছেলেটির সর্বশেষ বক্তব্য ছিল,
“ ত্রি প্রেনদেরো কমুনকুয়ে [ আমি যেভাবেই হোক তোমাকে হাসিল করবো] ”—
স্বভাবতই ব্যাপারটিতে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেনি চিত্র।কোনোদিন সে কল্পনাও করতে পারেনি যে সেই বান্দা “মিস্টিক রিপার” মাফিয়া গোষ্ঠীর কেউ হতে পারে!

খুব বেশিক্ষণ নিজের ভাবনার জগতে বিলীন হওয়ার সুযোগ পেলোনা চিত্র।তার মস্তিষ্কজুড়ে একত্রে অসংখ্য চিন্তাভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে। ল্যাম্বরগিনির পিছনে দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছে আসমানের বুগাটি এবং নিহাদের বাইক।ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকলো সে।এ কি দেখছে?আদতে কারা এরা?কে আসমান?
– দ্যা কি*লিং মেশিন।কে বি গ্রুপের সবচেয়ে শক্তিশালী অ*স্ত্র।
কণ্ঠটি কর্ণগোচর হতেই চিত্র হতচকিত হয়ে পাশেই বসা নিজের বাবার দিকে তাকালো।বিলাল রেমানের চেহারাজুড়ে অদ্ভুত এক কাঠিন্য,যা তার চরিত্রের সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানান।কম্পিত কন্ঠে চিত্র জিজ্ঞেস করলো,
– ক…কি বললে…তুমি?

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

বিলাল একনজর নিজের কন্যার দিকে তাকালেন।তবে দ্বিতীয় বাক্য উচ্চারণ করার পূর্বেই ল্যাম্বরগিনির পাশাপাশি এসে পড়ল বুগাটি।মাথা কাত করে চাইলো চিত্র,দৃষ্টি বিনিময় ঘটলো উভয়ের মাঝে।নিজের রিভ*লভার সম্বলিত হাতটি বুকে ছোঁয়ালো আসমান।ইশারার অর্থ,
“ আমি আছি।”
নিজের ভেতর কেমন ঘূর্ণিপাক অনুভূত হলো চিত্র বলতে পারবেনা।তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো অশ্রুর তোরে।ততক্ষণে এগিয়ে গিয়েছে বুগাটি,সর্বোচ্চ ৪৯০ কিলোমিটার পার আওয়ার গতির ক্ষমতাসম্পন্ন দানব গাড়ীর সঙ্গে পাল্লা দিতে সক্ষম হলোনা ল্যাম্বরগিনি।সহসাই অতিক্রম করে হুংকার ছড়িয়ে বাক কেটে বুগাটি সড়কপথ আটকালো।তাতে উভয় ল্যাম্বরগিনি সংঘর্ষ এড়াতে থামতে বাধ্য হলো একে একে।পিছনের পথে বাঁধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল নিহাদের বাইক।

নিঃশব্দতা ঘিরে ধরলো চারপাশে।ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন পরিবেশ।ধূসরতার চাদর ভেদ করে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে নিভছে গাড়িরূপী দানবগুলোর হেডলাইট।কয়েক মুহূর্তের অস্বস্তিকর নীরবতা।বাইকের উপর বসে হাঁপাচ্ছে নিহাদ।সতর্ক হয়ে খেয়াল করছে চারিদিক।অবশেষে মুহূর্তের নিগূঢ়তা ছেদ করে ল্যাম্বরগিনির দরজা খুলে গেলো।বেরিয়ে এলো গোটা সাতেক সশ*স্ত্র কালো পোশাকধারী।বুকে প্রজ্জ্বলিত পেঁচার সিলভার মোহর।সকলের অ*স্ত্র তাক করা বুগাটির দিকে।সতর্কিত সকলে।

হুট করেই বুগাটির দরজা খুলে গেলো।রীতিমত রুদ্ধশ্বাস হয়ে অপেক্ষারত প্রত্যেকে।ধোঁয়াটে অমানিশার অন্তরাল হতে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো পিশাচের অবয়বটি।প্যান্টের পকেটে একটি হাত ঢুকিয়ে রেখেছে। অপর হাতে শোভা পাচ্ছে রিভ*লভার।হিংস্র পশুর ন্যায় এগিয়ে আসছে সে।সম্পূর্ণ চেহারা বর্তমানে আচ্ছাদিত মাস্কের অন্তরালে।শুধুমাত্র দীপ্ত শোষণ ক্ষমতাসম্পন্ন কৃষ্ণগহ্বর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছে শত্রুদলের উপর। দানব যত এগিয়ে আসছে, উপস্থিত শত্রুগণ ততই যেন বিচলিত হয়ে পড়ছে।এতটাই অশুভ এবং শক্তিশালী এক প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে তাদের অন্তরে যে না চাইতেও সমস্ত শরীর ক্ষণে ক্ষণে প্রকম্পিত হয়ে উঠছে।গু*লি যে ছুড়বে তাতেও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে।

– জাস্ট ফা*য়ার!
দলের নেতার আদেশে যেন সম্বিৎ ফিরলো সকলের।কিন্তু অ*স্ত্র চালনার পূর্বেই,
ঠাস!
প্রকম্পিত হয়ে উঠলো ধরিত্রী।ধপাস করে সড়কে লুটিয়ে পড়ল বরাবর খু*লি ভে*দ করে যাওয়া দলনেতা।মুহূর্তেই তাজা র*ক্তে সিক্ত হয়ে উঠল ভূমি।নিজের হাতের রিভ*লভার ছুঁড়ে ফেললো আসমান। গু*লি শেষ,গড়িয়ে গেলো তা দূরে।একটি ঢোক গিলে নিরস্ত্র তার দিকে ছুটে এলো পেঁচাবাহিনী।তবে আদও কি নিরস্ত্র সে?

মুহূর্তেই বেরিয়ে এলো পকেটের অভ্যন্তরে থাকা হাতটি। হেডলাইটের আভায় চকচক করে উঠলো সিলভার বর্ণের ধাতব নানচাক্স।এমন অদ্ভুত অ*স্ত্র লক্ষ্য করে পরিহাসের হাসি হাসলো শত্রুদল।কিন্তু সেই হাসির রেখা মুহূর্তেই উধাও হলো চরম আ*ঘা*তে।ঘুরে গিয়ে নানচাক্সের টানে অ*স্ত্রবিলুপ্তি ঘটিয়ে একজনের গলা পেঁচিয়ে ধরলো আসমান। সেকেন্ডখানেকও অপেক্ষা করলোনা।শক্তিশালী বাহুজোরে একবার ডানে অতঃপর বামে ঘুরিয়ে দিলো মা*থা,চড়চড় করে হাড় ভা*ঙার আওয়াজ।বিকৃত হয়ে আসা অভিব্যক্তি নিয়ে সড়কে ধরাশায়ী হলো শত্রু।হতভম্ব হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকলো অবশিষ্ট লোকগুলো।এক ঝটকায় নানচাক্স ঘুরিয়ে দুহাতে টেনে আসমান দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো তাদের উদ্দেশ্যে।কন্ঠে বজ্রপাতের ধ্বনি তুলে ঘোষণা করলো,
– নেকড়ের সঙ্গিনীর গায়ে সামান্যতম আঁচড়ও নেকড়েকে ধ্বংসদেবতারূপে আবির্ভূত করতে যথেষ্ট। অ্যান আলফা অলওয়েজ প্রোটেক্টস হিয মেইট!

এ যেন ঠিক রূপকথার গল্পে শোনা রাক্ষস, ভক্ষক হয় আবির্ভূত হয়েছে তাদের ভাগ্যাকাশে। একে অপরের মাঝে দৃষ্টি বিনিময় ঘটিয়ে শক্ত ঢোক গিললো সকলে।অসহনীয় এই অবয়ব।
ততক্ষণে বাইক থেকে নেমে ল্যাম্বরগিনির কাছে পৌঁছেছে নিহাদ।দোটানার সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাশে দাঁড়ানো একজন মাত্র গার্ডকে ঘাড়ে আ*ঘা*ত হেনে এক মুহূর্তে ধরাশায়ী করে দরজা খুললো সে।ভিতরের সিট থেকে বাইরে নেমে আসতে সাহায্য করল চিত্রলেখা এবং বিলাল রেমানকে। বিলালের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই খানিক দ্বিধা অনুভব করলো।কিন্তু পরমুহুর্তে চিন্তা ঝেড়ে ফেলে পায়ের বুট থেকে ছু*রি বের করে বাঁধন কে*টে মুক্ত করলো তাদের।মুক্তি পেয়েই এক ছুটে আসমানের দিকে চলে যেতে চাওয়া চিত্রকে আটকালো হাত চেপে ধরে।

– কি করছেন কি আপনি?
– আসমান…
– নিজেকে ওয়ান্ডার উইমেন মনে করেন নাকি?যে আয়রন ম্যানকে সাহায্য করতে ছুটে যাচ্ছেন?
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো চিত্র নিহাদের দিকে।এই ছেলেটা কে তার জানা নেই।কিন্তু প্রথম থেকেই সে তাদের রক্ষা করার প্রচেষ্টা করে আসছে তা তার নিকট স্পষ্ট।নিহাদ ভ্রু উচুঁ করে বললো,
– জীবনে সিনেমা দেখেন নি? ফাইটের মাঝখানে যান আর একটা আপনার গলায় ছু*রি ধরে ব্ল্যাকমেইল করা শুরু করুক?দুই বোন এক্কেবারে এক, মস্তিষ্কের স্ক্রু ঢিলা।কিভাবে যে আসমান ভাই এই ঢিলার সাথে ফাঁসলো!প্রেম মানুষকে গর্ধব বানায়,প্রমাণিত।

হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে শুধু চেয়েই থাকলো চিত্র।তারপর দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকালো যেখানে আসমান মুখোমুখি হয়েছে পেঁচাবাহিনীর।নমনীয় শরীর তার বায়ুর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। অতি ক্ষীপ্র গতিতে হাতে ঘুরছে নানচাক্স।যার জোরে তার ধারেকাছে ঘেঁষাও কঠিন হয়ে পড়েছে সকলের জন্য।তবুও হাল ছাড়তে নারাজ শত্রু।চারিদিক থেকে ঘিরে ফেললো আসমানকে।দুর্বার হৃদস্পন্দন নিয়ে তাকিয়ে রইলো চিত্রলেখা,তার অবাধ্য অন্তর প্রার্থনা করছে এই পরিস্থিতি সমাপ্তির।

আসমানের পিছন থেকে সজোরে ছুটে এলো একজন, চালালো পি*স্ত*ল।মোকাবেলায় একটু দেরী হতেই বু*লে*ট ঘেঁষে গেলো তার বাহু,ছিটকে উঠলো র*ক্ত।মুহূর্তেই যেন নিজের পৃথিবী থমকাতে অনুভব করলো চিত্র।পুনরায় অগ্রসর হতে চাইলে সম্মুখীন হলো পিতার বাঁধার।তাকে নিজ আলিঙ্গনে চেপে ধরে দৃশ্যপট থেকে যেন সম্পূর্ণ আড়াল করে নিলেন বিলাল।এহেন কদর্যতা সন্তানকে দেখতে দিতে চান না।এক ছুট দিলো নিহাদ মুহূর্তেই।ধরাশায়ী করলো গুরুকে আ*ক্রমণ করা লোককে।ততক্ষণে নিজের বাহু চেপে ধরেছে আসমান,আঙুলের ফাঁক গড়িয়ে র*ক্ত চুঁইয়ে পড়ছে তার।তবুও পরোয়াহীন দুর্বার সে।এক হাতে নানচাক্সে গতির ঝড় তুললো।ক্ষ*ত বিক্ষ*ত হয়ে একে একে ছিটকে পড়তে শুরু করলো শত্রুপক্ষ।

যে সময়টা বিস্তর দীর্ঘ মনে হলো তার সমাপ্তি ঘটলো ইটালিয়ান পুলিশের গাড়ির সাইরেনের মাধ্যমে।অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোয় এমনিতেও তাকে অনুসরণ করছিল একটি পেট্রোল টিম,পরবর্তীতে এমন ঝামেলার খবর পেয়ে ছুটে এসেছে।যার দরুণ মাঝ পথেই বিদ্রোহের অবসান ঘটলো।কিন্তু ততক্ষণে নিথর হয়েছে অগণিত।

ইউনিফর্ম পরিহিত ইটালিয়ান পুলিশ গাড়ি থেকে বের হয়ে দ্রুত এগিয়ে এলো,নিজেদের অ*স্ত্র তাক করে।চারিপাশের বিভীষিকা তাদেরও চক্ষু চড়কগাছ করে ছেড়েছে।ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যিখানে অবস্থানরত র*ক্তস্নাত আসমানকে সর্বপ্রথম পাকড়াও করে পুলিশের গাড়ির বনেটে ছুঁড়ে ফেলা হলো।উভয় হাতে পরিয়ে দেয়া হলো ধাতব হাতকড়া।কোনপ্রকার প্রতিবাদ করার প্রচেষ্টা করলোনা সে।অপরদিকে কিছুটা দূরে থাকায় নিহাদ এবং রেমান পরিবার এসবে যুক্ত কিনা তা অনিশ্চিত হয়ে আপাতত তাদের গ্রেফতার করা হতে বিরত থাকলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।যদিও সবাইকেই থানা পর্যন্ত টেনে নেয়া হবে প্রাথমিক বিশ্লেষণের জন্য।

বিলাল রেমানের সঙ্গে কিছু বাক্য বিনিময় করলো পুলিশ সদস্য।ততক্ষণে আসমানকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পুলিশের গাড়ীর উদ্দেশ্যে।পথিমধ্যে একবার পাশ ফিরে চাইলো সে।দৃষ্টি বিনিময় করলো চিত্রলেখার সঙ্গে।ছলছলে দৃষ্টিতে চেয়ে আছে মেয়েটি।
কিছু উচ্চারণ করতে মুখ খুলছিলো আসমান কিন্তু তার পূর্বেই….
থাপ!
আসমানের দিকে শরীর ঘুরিয়ে অতর্কিতে শরীরের সর্বোচ্চ জোর কাজে লাগিয়ে চিত্র চড় লাগিয়ে বসলো হৃদয়ের প্রিয় পুরুষটিকে!তার হঠাৎ তীব্র প্রতিক্রিয়ায় উপস্থিত পুলিশ সদস্যগণ পর্যন্ত ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো।তবুও নিটল আসমান।ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে চাইলো হৃদয়রাণীর মুখয়বে।মাস্কের অন্তরালে অধরে প্রস্ফুটিত হলো তীর্যক হাসি।

– ট্রেইটর!
– সরি।
দুটো শব্দ,অগুনতি অনুভূতির বিনিময়।দুটি সত্তা আজ এক হয়েও যেন বিচ্ছিন্ন।এই বিচ্ছেদ সারাজীবনের।অনুধাবনে বেগ পেতে হলোনা আসমানকে।পুলিশ সদস্য তাড়া দেয়ার আগেই সে অন্তিম বারের মতন চিত্রলেখাকে অবলোকন করে হেঁটে চলে গেলো,গাড়ির ভেতর চেপে বসলো।তার জীবনের বর্তমান উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ অজানা।
বাইরে বিধ্বস্ত সড়কে দাঁড়িয়ে টলটলে অশ্রু উপচে পড়া দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো চিত্র,নিজের হাতটি মুষ্টিবদ্ধ করে গুটিয়ে নিলো।অনুভূতির দোলাচলে তার হৃদয় আজ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে।

এক সপ্তাহ পর।
রোমের পুলিশ দপ্তর থেকে ধীরপায়ে নতমুখে বেরিয়ে আসতেই সামনের দৃশ্যপট থমকাতে বাধ্য করলো আসমানকে।
ছলছল দৃষ্টিতে তার জন্য অপেক্ষারত নিহাদ।কিন্তু ছেলেটি নয়,বরং তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিলাল রেমান দৃষ্টি কাড়লো তার।নিজেকে প্রশান্ত রেখে এগোলো,মুখোমুখি হলো মানুষটির।তার প্রজ্জ্বলিত নয়নে গভীর দৃষ্টিপাত ঘটালেন বিলাল।বুকে উভয় হাত ভাঁজ করে জিজ্ঞেস করলেন,

– ভালো আছো?
ভিন্নদিকে চেয়ে পরিহাসের হাসি আড়াল করলো আসমান।তারপর বিড়বিড় করলো,
– আপনি সব জানতেন।তাইনা?
– শুরু থেকে অবশ্যই নয়। তবে আমারও সোর্স আছে।কে বি গ্রুপের সমতুল্য না হলেও নেহায়েত কম কিছু নই ডিয়ার।
স্বীকার করে নিলেন বিলাল।কপালে আঙুল ঘষে একটি দীর্ঘশ্বাস নির্গত করে যুক্ত করলেন,
– কিন্তু ততদিনে আমার মেয়েটা….

– আপনার নিজের মেয়ে নয়।দত্তক নেয়া যমজ সন্তান।
আসমানের কন্ঠে হতচকিত হয়ে তাকালেন বিলাল।নিহাদ নিঃশব্দে একবার নিজের গুরু এবং আবার রেমান অধিপতির দিকে নজর বুলিয়ে চলেছে।হস্তক্ষেপ করার কোনো বাসনা নেই তার।শুধু নীরব পর্যবেক্ষণ।বিলালের সরু গোঁফের নিচের অধরে ফুটলো এক অমায়িক পুষ্পধারা।
– ইউ আর ইন্টেলিজেন্ট, আরেন্ট ইউ?
– আমাকে কেনো সুযোগ দিয়েছেন?

বিষয়টি ব্যাপ্ত করার কোনো আগ্রহ না দেখিয়ে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়লো আসমান।কঠিন তার দৃষ্টি।তাতে বিলাল রেমান মাথা নুইয়ে কিঞ্চিৎ হাসলেন,পরবর্তীতে আকাশের পানে চাইলেন।তার দৃষ্টিতে অব্যক্ত এক অনুভূতি প্রদর্শিত হলো যার অর্থ উদঘাটন করা দায়।
– আয়েশার ছেলে তুমি… আসমান।
সর্বাঙ্গে যেন বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়েছে এমন ভঙ্গিতে কম্পিত হয়ে উঠল পাথর মানব।তার অনুভূতিশূন্য দৃষ্টিজুড়ে বর্তমানে বিস্ময়,সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিস্ময় যা নিজের জীবনে এর পূর্বে কোনোদিন অনুভব করেছে কিনা স্মরণে নেই।এই ব্যক্তির কন্ঠে নিজের মায়ের নাম শুনতে পাবে তা কস্মিনকালেও ধারণা করেনি তার বিচক্ষণ মস্তিষ্ক।
– আপ…আপনি…

তিরতির করে কাপতে থাকলো তার অধরজোড়া। শব্দগুচ্ছ দলা পাকিয়ে গেলো কন্ঠনালীতে।শক্ত একটা ঢোক গিলতে হলো তাকে।এ কেমন দোলাচল?এগিয়ে এলেন বিলাল,নিজের একটি হাত স্থাপন করলেন আসমানের কাঁধে।তার ওষ্ঠ যথারীতি উদ্ভাসিত অমায়িক হাসির আস্ফালনে।
– গো ব্যাক টু বাংলাদেশ আসমান,নেভার কাম ব্যাক।
এটুকুই।বিলাল রেমান উল্টো ঘুরলেন।কিছুটা দূরেই অপেক্ষারত গাড়িতে চড়ে বসলেন।সড়ক ধরে তা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে থাকলো আসমান।তার হাঁটুর জোর কমে এলো সহসাই। মাটিতে বসে পড়ার আগেই নিহাদের শক্তিশালী বাহুডোর তাকে আলিঙ্গন করে নিলো চারিপাশ হতে।
জীবনে প্রথমবার কোনো মিশনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে দ্যা কি*লিং মেশিন আসমান।তবে তা নিয়েবিন্দুমাত্রও আফসোস অনুভূত হচ্ছেনা তার।বরং শুধু একটি চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছে মস্তিষ্কজুড়ে।

এই কি তবে সমাপ্তি?
হ্যাঁ।
ভ্রুকুটি করে যেন উত্তর দিলো তার ভাগ্যদেবতা।
তবে কি দরকার ছিল আবেগের?
যন্ত্রণা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে,ভাগ্য পরিপূর্ণ শুধুমাত্র যন্ত্রণা এবং যন্ত্রণায়।হোক তা ব্যর্থতার কিংবা বিচ্ছেদের।

অতিবাহিত হয়েছে মাস তিনেক।দেশের প্রকৃতিতে নিজের রাজত্ব দখল করেছে ঘোর বর্ষা।টানা বৃষ্টি, দিন পেরিয়ে ছুঁয়ে যায় সপ্তাহ।কোথাও খিচুড়ি ইলিশ ভাজার উল্লাস, কোথাও বা বন্যার হাহাকার।এর মাঝেই প্রশান্ত সমুদ্রমাঝে পাল তুলেছে জীবনতরী। ছুটে চলেছে উদ্দেশ্যহীনভাবে।সময় প্রবাহমান, কারো জন্য থামেনা মহারাজ, বাঁধা দেয়ার সাধ্যি কার? জীবনও বয়ে চলেছে আপন গতিতে,জীবন না বলে বলা উচিত বেঁচে থাকা। বেঁচে আছে দেহ,মৃ*তে পরিণত হয়েছে অন্তর।

গান শোনা হয়না আর।করা হয়না নিহাদের সঙ্গে খুনসুঁটি।রান্না?রেসিপি ভুলে বসেছে।সাহিত্যের বই?অযত্নে আচ্ছাদিত হয়েছে দুই আঙ্গুল স্তরের ধূলোয়। আগ্রহভরে ক্রয়কৃত গিটারটির স্ট্রিং ছিঁড়ে পরে আছে, মেরামতের আকাঙ্ক্ষা নেই।কে বি গ্রুপের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়েছে, মাস ছয়েকের জন্য।নিজেকে গুছিয়ে নেবে, ব্যর্থতার গ্লানি ধুয়েমুছে পবিত্র হবে।কিন্তু তা কি সম্ভব? বেঁচে থাকার সবটুকু রঙ হরণ হয়েছে। ভাগ্যকাশ ছেয়েছে অমানিশার আঁধারে।যেই রঙিন সত্তা এই সাদা কালো জীবনে পদার্পণ করে নিজের বর্ণে ভুলিয়েছিল সবটুকু বিষাদ,তার অভাবে খাঁ খাঁ মরুভূমি এই হৃদয় বালুচর।

ঠিক কি হয়েছিল ইতালিতে সেইদিন?সঠিকভাবে জানা নেই।কিভাবে রক্ষা হয়েছিল পুলিশের হাত থেকে?হাত রয়েছে ক্ষমতাধর বিলাল রেমানের।কি দরকার ছিলো নিজের ঘা*তককে মুক্ত করার?হয়ত ছোট্ট এক কৃতজ্ঞতা।ঘা*তক যে সেদিন রক্ষকরূপে আবির্ভূত হয়েছিল।কিংবা এর অন্তরালে ভিন্ন ব্যাক্ষা রয়েছে কি?ভাবতে রাজী নয় অন্তর।প্রয়োজন কি?সমাপ্তি ঘটেছে এক মহাউপাখ্যানের।সেই অনুভূতি পরিপূর্ণ যাত্রায় দ্বিতীয়বার অংশ নেয়া অমর হওয়ার ন্যায়ই অসম্ভব।
কে বি গ্রুপ কেমনভাবে গ্রহণ করেছে এই ব্যর্থতাকে?সত্যিকার অর্থে,করেনি।কিন্তু নিজের হাতিয়ারের অনুভূতিহীনতায় ধরা চির স্পষ্ট খেয়াল করেছেন অধিপতি বাদশাহ কায়সার।তাইতো সময় দিয়েছেন সেই ফাঁক পরিপূর্ণ করে পুনরায় নব উদ্যমে জাগ্রত হওয়ার।

আগারগাঁওয়ের নিকটবর্তী শ্যামলী এলাকা।সামনে বিস্তৃত সড়ক সম্পূর্ণ শূণ্য।হাতঘড়িতে সময় দুপুর ২ টা ১৫। একে ভরদুপুর বলা চলে।তবুও বর্ষার আকাশ এতটাই গুমোট হয়ে রয়েছে যে সান্ধ্যকালীন আঁধার গ্রাস করেছে চারিপাশ।সড়কে যানবাহন নগণ্য।ঝমঝমিয়ে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা।টানা তিনদিন বৃষ্টিতে ঢাকার সড়ক লেকের মতন পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করেছে।গুটিকতক কাউন্টার বাদে অধিকাংশ বাস কাউন্টারের শাটার বন্ধ। বাস ধর্মঘট চলছে দুইদিন ধরে। তারই কর্মসূচি।কি যেনো দাবি শ্রমিকদের?মনে করতে ব্যার্থ হলো আসমান।আপনমনে ফুটপাত ধরে হেঁটে চলেছে সে।পরিধানের ওভারসাইজড টি শার্ট বর্তমানে চুপচুপে হয়ে লেপ্টে রয়েছে অঙ্গজুড়ে।পরোয়া নেই কোনো।ব্ল্যাক স্কিন এবং মাস্কের অন্তরালে আচ্ছাদিত করে ফেলেছে নিজের সমগ্র কলুষিত সত্তাকে।মাথায় একটি ক্যাপ,সামান্যতম প্রদর্শনও যেন অপর কোনো পবিত্র অস্তিত্বের জন্য হানিকারক।

উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটছে।পকেটের ফোন ভাইব্রেট হতে হতে ভিজে বর্তমানে নষ্ট হয়ে গিয়েছে হয়ত।ইচ্ছা হয়নি বের করে দেখার।জানে তাকে এতবার খোঁজ করার একটিমাত্র মানুষ রয়েছে পৃথিবীতে,নিহাদ।একটি নিঃশ্বাস ফেলে ফুটপাতের উপরেই বসে পড়ল,পা নামিয়ে রাখলো সড়কে।তীব্র বারিধারার শীতল আবহ ছু*রি চালিয়ে যাচ্ছে শরীরজুড়ে,রোমকূপ হিম হয়ে আসছে।তবুও বেপরোয়া।পরোয়া করার কোনো প্রয়োজন অবশিষ্ট নেই এই ঝরঝরে কাঁচভাঙা হৃদয়জুড়ে।

কতক্ষণ বসেছিল মুক্ত হাওয়া এবং বৃষ্টিতে?হিসাব নেই।নিজের অস্তিত্বে ছাউনির আবরণ অনুভব করে মাথা তুলে তাকালো আসমান।তার শূণ্য দৃষ্টি নির্বিকারভাবে অবলোকন করলো দৃশ্যপট। কলেজড্রেসপড়ুয়া এক মেয়ে।এক হাতে নিজের জীর্ণ ব্যাগ, অপর হাতে একটি ছাতা ধরে রেখেছে আসমানের উপরে।বারিধারার প্রবাহ তাতে বাঁধা পাচ্ছে।একদৃষ্টে চেয়ে থাকল নিগূঢ় দৃষ্টি,কিন্তু সাদা সার্জিক্যাল মাস্কের কারণে দর্শন হলোনা মেয়েটির মুখাবয়ব।

– আপনি কি ছাতা আনতে ভুলে গিয়েছেন?
উত্তর করলোনা আসমান।নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিলো।মেয়েটি এক পা এগিয়ে এলো।
– বাসা কি খুব বেশি দূরে?কাছাকাছি হলে বলুন, পৌঁছে দিতে পারি।
বিরক্তি অনুভূত হলো।কি দরকার এই মেয়ের?কলেজ শেষ হয়েছে তো বাসায় যাক নিজের?রাস্তার ধারে কেউ বসে বিলাপ করছে কিনা দেখার কি প্রয়োজন?আজকাল কোনো মানুষ কি অপর মানুষের পরোয়া করে নাকি?সকলেই নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত এই যান্ত্রিক সভ্যতায়।অপরের খোঁজ নেয়ার সময় কোথায়?

– তুমি নিজের পথ দেখো মেয়ে।
– এই বৃষ্টি খুব সহজে থামবে বলে মনে হয়না।আসুন, অন্তত একটা কাউন্টার পর্যন্ত পৌঁছে দেই?
– আশ্চর্য্য তো!আমি যদি গাঁজাখোড় হই?তোমাকে তুলে নেই মাইক্রোবাসে?
হাসলো মেয়েটি।ঝমঝমিয়ে বর্ষণধ্বনির সঙ্গে তা মিশ্রিত হলো অবলীলায়।
– আপনাকে দেখে মনে হয়না আপনি গাঁজাখোড়।
– তুমি গাঁজাখোড় দেখেছ এর আগে?

– প্রচুর।আমাদের বাড়ির সামনের রেললাইনে উদাম শরীরে সারাদিন পরে থাকে।মাঝে মাঝে আবার হাতে পলিথিনও থাকে,কি যেন শুঁকে বেড়ায়।আপনার কাছে তেমন কিছুই দেখছিনা।
ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকলো আসমান।এই মেয়ে কি তার সঙ্গে রসিকতা করছে নাকি?মেয়েটি একটু ঝুকলো,তাতে এক মুহূর্তের জন্য তার নয়নমাঝে দৃষ্টি আপতিত হলো আসমানের।ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত এক চাহুনি।
– মাত্র তো কলেজে পড়ো।কতটুকু দেখেছ জীবনের?
– যথেষ্ট।

তার উত্তরে আসমান নৈঃশব্দ্য বরণ করলো।বুঝতে পারছেনা কি বলা উচিত।
– আপনি বোধ হয় আমার উপস্থিতিতে বিরক্ত হচ্ছেন।
– পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আছে তাহলে।
– তা বেশ ভালোই।কিছুক্ষণ আগেই প্র্যাক্টিকাল করে এলাম, অনুবীক্ষণযন্ত্রে উদ্ভিদকোষ শনাক্তকরন।
– আমাকে কি উদ্ভিদ মনে হচ্ছে?
– উহুম,ব্যাকটেরিয়া।
অস্বীকার করবেনা,কিঞ্চিৎ আগ্রহ অনুভব করছে আসমান।না চাইতেও তার কন্ঠ প্রশ্ন করলো,
– ব্যাকটেরিয়া?ব্যাক্ষা?

– দেখুন।বিজ্ঞান বলে এই ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার কারণে মানবদেহে রোগ সৃষ্টি হয়।আবার ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে কিন্তু অনেক জটিল ব্যাধীর ঔষধও তৈরী হয়।কিন্তু আমরা সকলেই ব্যাকটেরিয়া মানেই খারাপ কিছু মনে করি,কারণ এটি রোগ সৃষ্টি করে, রোগ সারানোর ক্ষমতাকে পাত্তা দেইনা।ব্যাকটেরিয়া তো ব্যাকটেরিয়াই!
মৃদু হাসলো আসমান।আজ কতদিন পর?তিন মাস?নাকি তার অধিক সময়?স্মরণ নেই।মাস্কের অন্তরালে অবশ্য তার হাসি প্রদর্শিত হলোনা।হালকা ধাঁচে উচ্চারণ করলো সে,

– তোমার দর্শনজ্ঞান অদ্ভুত মেয়ে।
– ইউ মিন ইন্টারেস্টিং রাইট?
– জানিনা।
মেয়েটি এক মুহূর্ত চেয়ে তারপর সোজা হয়ে দাঁড়ালো।ছাতাটি আসমানের হাতে গুঁজে নিচু হয়ে নিজের ব্যাগ খুললো।কি করছে সে?তাকিয়ে থাকলো আসমান।একটা ছোট আচারের প্যাকেট বের করলো সে। ছাতা ফিরিয়ে নিয়ে সেটা আসমানের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,
– আপনি যেহেতু আজ বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে অসুস্থ হওয়ার প্ল্যান করেই এসেছেন সেহেতু আমি তাতে বাঁধ সাধবোনা।বসে বসে আচার খান,দুই টাকায় কিনেছি, অনেক ঝাল।দেখবেন খেলে একটু হলেও শরীর গরম হয়ে যাবে।

উল্টো ঘুরে হাঁটতে থাকলো মেয়েটি।তার কলেজড্রেস এমনিতেও ভিজে একসা,তার উপর আবার আরেকজন মানুষকে আশ্রয় দিতে চায়!আসমানের ভাগ্যে সবসময় রমণীঘটিত এমন অদ্ভুত ঘটনা কেনো ঘটে?মেয়েটি দৃষ্টির আড়াল হতে হতে হাতের আচারের প্যাকেটের দিকে তাকালো।ফেলে দেবে ভাবলেও কেনো যেনো ফেললোনা।কিছুক্ষণ পরই আবিষ্কার করলো সে সত্যিই প্যাকেট খুলে আচার খেতে শুরু করেছে।খুব একটা খারাপ লাগছেনা!ঝালের কারণে কিছুটা উষ্ণতাও অনুভূত হচ্ছে শরীরজুড়ে।
বৃষ্টি থামলো অবশেষে।আকাশের প্রায় পশ্চিম প্রান্তে দেখা মিললো স্বচ্ছ এবং স্নিগ্ধ দিবাকরের।উঠে পড়লো আসমান। আচার শেষ হয়ে অনেক আগে।খালি প্যাকেটটা প্যান্টের পকেটে ভরে যেই না সে ফুটপাতের উল্টো পথ ধরলো ভূত দেখার মতন করে চমকে উঠলো।নিজের দৃষ্টিকে বিশ্বাস করে উঠতে নিজেকেই বেগ পেতে হলো তাকে।

কাকভেজা শাড়ি পরিহিত অবস্থায় তার সম্মুখে কয়েক হাত দূরেই দন্ডায়মান…. চিত্রলেখা।
নিজের অন্তরে জোরালো একটা টান অনুভব করলো আসমান।গা গুলিয়ে উঠলো তীব্র অনুভূতির জোয়ারে।হৃদযন্ত্র যেন দুর্বার অশ্ব, দৌড়পাল্লায় মেতেছে অসমতার।একদৃষ্টে চেয়ে থাকলো সে।নিজের জীবনের প্রথম এবং একমাত্র ভালোবাসার দিকে।স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে এগিয়ে এলো চিত্র।এক পা, আরো এক পা,মুখোমুখি।অতঃপর……
সমস্ত জীবনে খাওয়া দ্বিতীয় চড়টিও নিঃশব্দে হজম করলো আসমান।

– তুমি আসলেই একটা মেশিন আসমান!
একটি ঢোক গলাধঃকরণ করে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে থাকল সে।অভ্যন্তরে ওঠা ঘূর্ণিঝড়ের অস্তিত্ব কাউকে টের পেতে দিতে নারাজ।তবুও অবাধ্য হৃদয় বিচলিত।সবকিছুর না সমাপ্তি ঘটেছিল?তবে আজ আবারও কেনো সে মুখোমুখি অনুভূতির?
হুট করে আসমানের টি শার্ট টেনে ধরলো চিত্র, কাছে টেনে দাঁতে দাঁত পিষে অতর্কিতে জিজ্ঞেস করলো,
– ভালোবাসো?
মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো আসমানের উভয় হাত।অতিরিক্ত আবেগে বর্তমানে মস্তিষ্ক কর্মক্ষমতা হারিয়েছে।বুঝে ওঠার আগেই নীরবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো তার সমস্ত অস্তিত্ব। চিত্রলেখার অধরজুড়ে বহু অনুভূতিঘেরা সেই হাসিরি ফুটে উঠলো।

– চলো বিয়ে করি।
ব*জ্রাহত ব্যক্তির মতন তাকিয়ে থাকলো আসমান।নিজের শ্রবণ ইন্দ্রিয়কে বিশ্বাস করতে পারছেনা।
– কিঃ!
– তুমি আমাকে ভালোবাসো,আমিও তোমাকে ভালোবাসি আসমান।এরপর কি হয়?এরপর বিয়ে হয়, সংসার হয়, পরিবার হয়।
– চি…চিত্র…আমি… আমিহ…
নিঃশ্বাস আটকে এলো বক্ষের মাঝে।যেন শ্বাসকষ্ট অনুভূত হচ্ছে।নির্বিকার চিত্রলেখা।তার কঠোর কন্ঠ ব্যক্ত করলো,

– ভালোবাসার জন্য চিরশত্রু মন্টেগু ক্যাপুলেট একত্রিত হয়েছিল রোমিও জুলিয়েটের বন্ধনে।প্রিন্সেস জেসমিন জীবন সাজিয়েছিল এক সাধারণ ছেলে আলাদিনের সঙ্গে।
রূপকথার উদাহরণ কেনো টানছে চিত্র?—প্রশ্নটি করা সম্ভবপর হলোনা।এর আগেই,
– তুমি পারবে আসমান?আমার জন্য সবকিছু ছাড়তে?তোমার অতীত কি ছিল,তোমার পরিচয় কি, তুমি কি কাজ করতে তা দিয়ে আমার কাজ নেই।আমি বর্তমানকে চাই।ভুলে যাও কে ছিলে তুমি, কি করতে তুমি।আমি জানবো তুমি আসমান, আমার ভালোবাসার আসমান।এটুকুই হবে তোমার পরিচয়।পারবে আমার জন্য তোমার বর্তমানকে অশুভ অমানিশা থেকে পবিত্র দীপ্তিতে উদ্ভাসিত করতে?যদি পারো….তবে কথা দিচ্ছি।সারাটাজীবন এই হাতটি ধরে চলতে আমি প্রস্তুত আসমান!
কোনো উত্তর করা সম্ভব হলোনা আসমানের পক্ষে।সে শুধু চেয়েই রইলো নিজের অব্যক্ত ভালোবাসার দিকে। অনুভবও করলোনা কখন তার নয়ন বেয়ে একফোঁটা অবাধ্য অশ্রু গড়িয়ে নামলো।

রোযার গাল বেয়েও যে কখন অশ্রুধারা বইতে শুরু করেছে সে টের পায়নি।চারুলতার বিরতিতে নৈঃশব্দ্য ভর করেছে সমগ্র ফ্ল্যাটজুড়ে।শুধুমাত্র বিষাদের সুর বেজে চলেছে যেন প্রতিটি হৃদয়জুড়ে। নিহাদও মাথা নিচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে।তার দৃষ্টি অব্যক্ত।
– এভাবেই কি তারা বাঁধা পড়েছিল পবিত্র বন্ধনে?
চারুলতা একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সম্মতি জানালো।

– হুম।
– চিত্রলেখার জন্য নিজের সবকিছু বিসর্জন দিয়েছিল আসমান?এমনটা সম্ভব হয়েছিল?
– হয়েছিল বলেই তো আজ আমাদের প্রত্যেকের জীবন এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
হঠাৎ নিহাদের দিকে ঘুরলো রোযা।তার সরু দৃষ্টি লক্ষ্য করে কিছুটা বিহ্বল অনুভব করলো নিহাদ।
– তার মানে তুমি আগে থেকেই বিলাল… আই মিন বাবাকে চিনতে নিহাদ?
নিঃশব্দ।

– সেদিন তাকে বাইকে লিফট দেয়ার সময় না চেনার অভিনয় করছিলে আমার সামনে তাইনা?
– না তো কি করতাম বলো?ও আমার কাক্কু….আপনি কেমন আছেন?আপনাকে না দেখে আমার পরান যায় জ্বলিয়া রে অবস্থা, এখন দেখে আমার পরান এভারেস্টের চূড়ার মতন ঠান্ডা হয়ে গেলো!মনে আছে ইতালিতে আপনাকে নেচেকুদে খু*ন করতে গিয়েছিলাম? আহা কি কুড়কুড়ে সুখের মেমোরি!আসেন একটু সোহাগ করি!বলে জড়িয়ে ধরে চুমু দিতাম?
নিহাদের হঠাৎ এমন বি*স্ফো*রণে রোযা হতচকিত হয়ে চেয়ে থাকলো।একটি নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করে বান্দা জানালো,

– লিসেন,আমি কিছু সম্পর্কেই নিশ্চিত ছিলাম না।ওনাকে সেদিন রাস্তায় দেখে যথেষ্ট অবাক হয়েছিলাম।আমি যেমন অপরিচিতের মতন আচরণ করেছি তিনিও করেছেন।পাঁচ বছর পর সাক্ষাৎ হলে কিভাবে আচরণ করা উচিত মনে করো?তাছাড়া আসমান ভাইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে আমি অবহিত ছিলাম না যদিও এই পেত্নী চারুকে দেখে আগেই সন্দেহ করেছি।শ্বশুর থেকে কেউ বাবা হতে পারে কে জানতো?আসমান ভাই নিজে থেকে আমাকে কিছুই বলেনি।
চারুর কটমট চাহনিতে পরোয়া করলোনা সে।দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিলো নির্বিকার চিত্তে।একটি নিঃশ্বাস ফেলে রোযা পুনরায় চারুলতার মুখোমুখি হলো।

– তারপর?নিশ্চয়ই এটুকুতেই বর্তমানের কালো অধ্যায় শুরু হয়নি!অবশ্যই এমন কিছু ঘটেছিল যাতে….
রোযার উত্তেজিত কন্ঠে বাঁধা পড়লো চারুলতার ফোনের রিংটোনে।কিছুটা অনাগ্রহী হয়েই তা তুললো মেয়েটি।নিঃশব্দে শুনলো অপরপাশের বক্তব্য।এক আতঙ্কে ছেয়ে গেলো তার সুদর্শন চেহারা।
– কি হয়েছে?
নিহাদ প্রশ্ন করলেও চারুলতা ঘুরল রোযার দিকে।
– তোমার দাদু….
– দাদু!

ধক করে উঠলো রোযার বুক!এক লাফে উঠে দাঁড়ালো সে।হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেলো বাইরে।নিহাদ কিংবা চারুলতার পরোয়া পর্যন্ত করলোনা।লিফট ধরে সোজা ত্রিশ তলায় পৌঁছে ঝড়ের গতিতে ঢুকলো পেন্টহাউজে।দৌড়ে গেলো দাদুর রুমে।ঢুকতেই দৃশ্য দেখে তার পদক্ষেপ থমকে রইলো।
বিছানায় ছটফট করছেন ইউনূস রহমান।তার পাশেই হাঁটু মুড়ে বসে তার একটি হাত ধরে রেখেছে আসমান, ভ্রুজোড়া তার কুচকে আছে।বিলাল রেমান দন্ডায়মান বিছানার বিপরীত পাশে।রোযা ঢুকতেই সবাই চোখ তুলে তাকালো।

– চ…চড়ুই..
– দাদু!
দুর্বল কন্ঠে ইউনূস উচ্চারণ করতেই রোযা এগিয়ে গিয়ে রীতিমত ঝাঁপিয়ে পড়লো তার উপর।চিৎকার করে উঠলো,
– দাদু তোমার কষ্ট হচ্ছে হ্যাঁ?একটু সহ্য করো, এক্ষুনি অ্যাম্বুলেন্স…
– আসবেনা।
আসমানের শীতল কন্ঠে রোযা শিউরে উঠে হতবাক হয়ে বললো,
– কি বলছো তুমি?

ডার্কসাইড পর্ব ২৩

আসমানের উত্তর না পেয়ে নার্সের দিকে তাকালো রোযা, ডানে বামে মাথা নাড়লো নার্স।রোযার সামনে যেন সমস্ত পৃথিবীর আলো দপ করেই নিভে গেলো।
– আমাকে এবার হাসিমুখে বিদায় দাও চড়ুই…..
অশ্রুসিক্ত দৃষ্টিতে মুমূর্ষু বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে থাকলো রোযা,কিছুই অনুভূত হচ্ছে না তার,একবুক শূন্যতা ছাড়া।

ডার্কসাইড পর্ব ২৫