ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪ (২)
সাবিলা সাবি
রিকার্দোর ব্যক্তিগত আস্তানা—একটি পুরনো পরিত্যক্ত কারখানার নিচতলা।
ভাঙা কংক্রিটের গায়ে লেগে থাকা মরিচা আর ছেঁড়া ইলেকট্রিক তারে ঝুলে থাকা আলোগুলো টিমটিম করে জ্বলছে, আবার নিভছে। চারপাশে ভেসে আছে এক ধরণের ঘমঘমে গন্ধ—ঘাম, রক্ত আর ভয়ের।
এই কারখানার নিচে তৈরি করা হয়েছে এক নির্জন হলঘর। তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করে রাখা হয়েছে মানুষগুলোকে—যারা এখন শুধুই বন্দি।
প্রথম জোনে—ফারহান উল্টো ঝুলছে। এখন ও বেঁচে আছে তবে গুলি বিদ্ধ জায়গা থেকে র/ক্ত বের হচ্ছে প্রচন্ড। হাত-পা মোটা দড়িতে বাঁধা, মাথা নিচে ঝুলে আছে মেঝের দিকে। মুখ রক্তে ভেজা, ঠোঁট ফেটে গেছে, চোখে তীব্র যন্ত্রণা… তবু এক বিন্দু দমও যেন হারায়নি।
দ্বিতীয় জোনে— ফারহানের মা আর বাবা, এক কোণে পাশাপাশি। চোখে কালো কাপড় বাঁধা, মুখ দড়ি দিয়ে বাধা যেন চিৎকার করতে না পারে। শরীর ভয়ে গুটিয়ে আছে, বয়স যেন হঠাৎ আরও বেড়ে গেছে কিছু বছর।
তৃতীয় জোনে—এলিনা আর তান্বী। দুজনকে একত্র করে বসানো হয়েছে এক ভাঙা লোহার চেয়ারে, রুক্ষ দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে হাত-পা। তান্বীর চোখে জল জমে আছে, কিন্তু মুখ কঠিন। এলিনা নিচু গলায় প্রার্থনা করছে নিঃশব্দে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
ঠিক তখনই…জুতোর শব্দে কারখানার ঘর কেঁপে ওঠে।
রিকার্দো ধীরে ধীরে প্রবেশ করে। হাতে এক গ্লাস রেড ওয়াইন, ঠোঁটে সেই চিরচেনা বিকৃত হাসি। চোখে হিংস্র শিকারির আত্মবিশ্বাস।ও এগিয়ে আসে তান্বী আর এলিনার সামনে। ওদের চেয়ারের চারপাশে হাঁটতে থাকে ধীরে ধীরে।
রিকার্দো নিচু গলায় ফিসফিস করে বলে “সুন্দরী… একেবারে ঝকঝকে দুইটা গয়না। যদি ইউরোপে ট্র্যাকে তুলে দিই, চাহিদা হবে আকাশ ছোঁয়া।” এট বলে একটু থামলো তারপর পুনরায় বললো “ফারহান তো আমার পুরোনো পছন্দের লোক, তাই ভাবছি… তোদের প্রথম শিফটে পাঠাবো।
তান্বী তখন আর চুপ থাকতে পারে না।
ফুঁসে উঠে বললো “তোর সাহস কিভাবে হয়? পশু কোথাকার।”
রিকার্দোর মুখে কোনও রাগ নেই, বরং সে হেসে মুখটা একেবারে তান্বীর মুখের কাছে নিয়ে আসে, গলার স্বরটা হয়ে ওঠে ছায়ার মতো ঠাণ্ডা “পশু? হাহা… এই জঙ্গলের রাজা আমি।ৎবাঘের মুখে কুকুর ঘেউ ঘেউ করলে কী হয়, জানো?
এই দৃশ্যের ঠিক উল্টোদিকে রশিতে বাঁধা অবস্থায় ফারহান ছটফট করছে। তার চোখে তখন কেবল আতঙ্ক নয়, প্রতিশোধের আগুন। সে নিজের শক্তিতে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে, শরীর পেঁচিয়ে যাচ্ছে।
একটা মুহূর্তে গলা তুলে চিৎকার করে ওঠলো ” রিকার্দো! যদি একটা চুলও ছুয়েছিস ওদের… আমি তোর শরীর ছি*ন্নভিন্ন করে দেবো!
রিকার্দো ঘুরে ফারহানের দিকে তাকায়। ঠোঁটে ঠান্ডা হাঁসি। এক পা এক পা করে এগিয়ে যায় ফারহানের কাছে।
” হুম… এই ভয়টাই তো তোর দুর্বলতা, ফারহান।
আজ তোর পরিবারই হবে তোর শাস্তি।”
সে থেমে যায়, তারপর আবার বললো “আর যেহেতু তুই নারী পাচার করতে রাজি হোসনি, ভাবলাম… তোর নিজের বোনদের দিয়েই শুরু করি। শিখে নে, কেমন করে ব্যবসা চলে!
রুমের ভেতর হঠাৎ এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে।
ফারহানের চোখে রক্ত চাপা প্রতিজ্ঞা জমাট বাঁধে।
তার দেহটা বাতাসে ধীরে ঘুরে যায়, মাথা নিচে —
কিন্তু চোখে তখন শুধু আগুন।
চোখে লেখা— “একবার বাঁধন খুলে দে, দেখ তোকে কি করি।”
সাঁতসেঁতে সেই কারখানার কুয়াশাভরা ঘরে হঠাৎই রশিতে ঝুলতে থাকা ফারহানের মুখ নিচু থেকে একটু বাঁ দিকে ঘুরে যায়। চুলগুলো রক্ত আর ঘামে ভেজা, ঠোঁট ফেটে গেছে। রক্ত গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে—কিন্তু তার চেয়ে বড় ছিল চোখের অভিমান।
এমন সময়েই এক কোণে বাঁধা বাবা-মার চোখের কাপড়টা কেউ একজন খুলে দেয়।
কাপড় খুলতেই তারা যা দেখে… সেটা যেন বিশ্বাস আর বুক ভেঙে পড়ার একসাথে আঘাত।
ছেলে… ফারহান… ঝুলছে উল্টো, বন্দি হয়ে। আর তার আশপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই ভয়াল অস্ত্রধারীরা।
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কাঁপা গলায় বললো
— ছি ফারহান… ছি! তুই এই নোংরা কাজ গুলো করেছিস এতো দিন? আমরা তো ভেবেছিলাম তুই আলাদা… সৎ, নির্ভীক… আমার আদর্শবান ছেলে।
মা হঠাৎই গুমরে গুমরে কেঁদে ওঠেনৎএই মুখ নিয়ে কোথায় যাবো?মহল্লায় গর্ব করে বলতাম — “আমার ছেলে একদিন পুলিশ হবে, সব অন্যায় থামাবে!” আজ তাকেই দেখছি এই দানবদের সাথে… নারী পাচারের মাঝখানে!
বাবার কণ্ঠ ফেটে যায় “মহল্লার কেউ আমাদের মেয়েদের দিকে চোখ তুলে তাকাতে সাহস পেত না, আর আজ… আজ তোর সেই বোনদের গায়ে হাত পড়লো… তোর জন্যই! আজ তোর জন্যই আমরা বন্দি, লাঞ্ছিত! তুই কী করে পারলি, ফারহান?”
রশিতে ঝুলে থাকা ফারহান যেন ভেঙে পড়ে মুহূর্তে।
রক্তাক্ত মুখটা উপরে তোলার চেষ্টা করে, গলাটা কাঁপে, চোখে আগুন, জলে ঝাপসা।
ফারহান চিৎকার করে বললো “না আব্বু! না আম্মু!
আমি খুন করেছি… অনেক ক্রাইম করেছি… হ্যাঁ, স্বীকার করছি! কিন্তু নারী পাচার? নারীর ইজ্জতের সাথে বেঈমানি? না! সে রাস্তা আমি কখনও পা দিইনি!
কান্নায় গলা জড়িয়ে আসে, রক্ত আর চোখের জল মিশে যায় — “আমি রিকার্দোর প্রস্তাবে রাজি হইনি…আমি এই জাহান্নাম ছেড়ে পালাতে চেয়েছিলাম।”
ঘরে নিঃশব্দ জমে ওঠে। মা কিছু বলতে গিয়েও থেমে যান। ঠোঁট কাঁপছে, কান্না আটকাতে পারছেন না।
বাবা চুপচাপ তাকিয়ে থাকেন ছেলের দিকে, চোখে অস্পষ্ট জ্বালা। সাঁতসেঁতে সেই অন্ধকার কারখানায়, বাতাস থমকে আছে। বাতির আলো ফ্লিক করছে। রশিতে উল্টো ঝুলে থাকা ফারহানের মুখে রক্ত জমে কালচে হয়ে গেছে, কিন্তু চোখ জ্বলছে তীব্র লজ্জা আর অভিমানে।
বাবা-মা চুপচাপ তাকিয়ে আছেন তার দিকে। দৃষ্টিতে ঘৃণা, যন্ত্রণা আর বিশ্বাসভঙ্গের ক্ষত।
একসময়, ফারহান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। বুকের ভেতর জমে থাকা কথা ফেটে পড়ে—
ফারহান গলা ফেটে চিৎকার করে বললো ” হ্যাঁ! আমি চেয়েছিলাম অনেক বড়লোক হতে! আমি চেয়েছিলাম তুমি গাড়ি চড়ে নামো, লোকজন বলুক “এই সেই ফারহানের বাবা!” তান্বী আর এলিনা লাক্সারি লাইফ লিড করুক, ব্রান্ডেড জিনিসপত্র, জামাকাপড় ব্যাবহার করুক।য়তুমি আর আম্মু ওষুধের জন্য রাত জেগে ফার্মেসি খুঁজে বেড়াবে না।
কান্না গিলে ফেলতে গিয়ে গলাটা কেঁপে ওঠে। “ভুলে গেছো বাবা? তোমার নিজের ভাই… আমার চাচা আমাদের সাথে কেমন করেছে?একটা বিশাল সম্পত্তি রেখে… তোমাকে শুধু একটা পুরনো ছাদের নিচে ঠেলে দিয়েছিলো। তারা গাড়িতে ঘোরে, বিদেশ যায়… আর আমরা সংসার চালাতে হিমশিম খাই।
শ্বাস নিতে নিতে কথা বলে ফারহান।— “আমি সবকিছু ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলাম বাবা…এই পরিবারের মর্যাদা… তোমার মুখে হাসি…তাই আমি ভুল পথে গেলাম। আমি ভাবলাম, একবার টাকা এলেই সব ঠিক হয়ে যাবে… কিন্তু… আমি জানতাম না… এত অন্ধকার, এত নোংরা।
তখনই… বাবা কাঁপা গলায় দাঁত চেপে ওঠেন। চোখে আগুন, কিন্তু গলার আওয়াজ ঠাণ্ডা — তীব্র, ছেদনকারী।
বাবা রাগে কাঁপা কণ্ঠে বললো ” চুপ কর, ফারহান।
চুপ কর ওইসব হারাম টাকার কথা। তুই যদি ভাতের অভাবে মরতি, আমি তোর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে গর্ব করতাম —”আমার ছেলে সৎ ছিল”।
“কিন্তু এইভাবে? এইভাবে সন্ত্রা/সীদের সাথে নোংরা খেলায় জড়িয়ে… আমার জীবনের প্রতিটি ঘাম মিথ্যে করে দিলি?
চোখে জল আসে, গলায় ফাটল ধরে —” তুই গাড়ি দিতে চেয়েছিলি? আমি বলছি — তোর বাবা মরবে, কিন্তু ওই হারাম টাকার গাড়ির সিটে কখনও বসবে না।”
ঘরে তখন নিস্তব্ধতা। তান্বী আর এলিনার চোখে জল, মা মুখ ঢেকে কাঁদছেন।ফারহানের চোখের জল থামছে না, গলায় আর আওয়াজ নেই।
রশিতে ঝুলে থেকে শুধু ফিসফিসিয়ে বললো “বাবা… আমি ভুল করেছি। কিন্তু আমি সব পুড়িয়ে শেষ করে দেবো… আমি মরলেও রিকার্দোকে শেষ করে যাবো।”
ঘরটা নিঃস্তব্ধ, অন্ধকার। ঘরের অন্য পাশে, ধূলি-ঢাকা একটি পুরনো সোফায় আধাশোয়া ভঙ্গিতে বসে আছে রিকার্দো। ঠোঁটে জ্বলন্ত চুরুট, চোখে হিমশীতল নিষ্ঠুরতা। তার চারপাশের বাতাসেও একটা ভয় ছড়িয়ে আছে—জ্যান্ত, ছুরি-ধরা ভয়ের মতো।
এই সময় তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সাঙ্গপাঙ্গ, ভিক্টর, ধীরে পায়ে ঘরে ঢোকে। চুপচাপ কিছুক্ষণ ফারহানের ঝুলন্ত দেহের দিকে তাকিয়ে থেকে মুখ ঘুরিয়ে, ভিক্টর নীরবতা ভেঙে বললো— “ভাই..এত কিছু হইলো, এই ফারহান শালারে এখনও বাঁচাইয়া রাখছেন কেন? এই শালারে তো গু/লি কইরা মাইরা ফেললেই হইতো।
রিকার্দো মুখে ঠোঁট রেখে চুরুটের ধোঁয়া টানলো। তারপর ধোঁয়াটা ধীরে ছেড়ে হালকা হালো। হাসির নিচে চাপা পড়ে থাকা হিংস্র/তা যেন মেঝে বেয়ে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে।
রিকার্দো ধীরে, শীতল কণ্ঠে বললো — “ওরে মেরে ফেললে একবারেই শেষ হয়ে যাবে, ভিক্টর। কিন্তু বাঁচিয়ে রাখলে… ওর বুকের ভেতরের আগুনটারে আমি ঘি দিতে পারি বারবার।”
একটু থেমে, ঠান্ডা কণ্ঠে আবার বললো— “ওর বোনেরা এখন আমার হাতে। ওর মা-বাবা আমার খাঁচায়।এই ফারহান যত বড়ই হোক না কেন, পরিবার তো ওর নরম জায়গা। সেই নরম জায়গাটাতে আমি যদি আগুন দিই,তাহলেই দেখবি—ও নিজ হাতে এমন কাজ করবে, যা করার কথা ওর শত্রুও কল্পনা করবে না।”
ভিক্টর এক মুহূর্ত চুপ করে থাকে, চোখের পাতা পড়ে যায়। তারপর ধীরে জিজ্ঞেস করে—”তাইলে… ব্ল্যাকমেইল করবেন?
রিকার্দো এবার মাথা নাড়ে। চোখ সরু করে, ঠোঁটে ছায়া-হাসি টেনে বলে — “না ওরে ব্ল্যাকমেইল না। ওরে আমি নিজের হাতে গড়ে তুলবো। একটা নতুন সত্তা বানাবো—যে নিজের হাতেই নারীর গায়ে হাত দেবে, নিজের হাতেই ঘর পুড়িয়ে দেবে,নিজের চোখেই দেখবে মৃ/ত্যু…কিন্তু ওর বিবেকে একটুকুও লাগবে না।”
— “আমি ওকে এমন জায়গায় আনব, যেখানে
মানুষ বলে কিছু থাকবে না…শুধু আমার তৈরি একটা ছায়া, একটা বেহায়া ছায়া থাকবে।”
ভিক্টরের ঠোঁটে ধীরে একটা মুচকি হাসি ফুটে ওঠে।
ভিক্টর আস্তে বললো— “ভাই… আপনে তো সত্যি ডেভিল!”
রিকার্দো চুরুটের ছাই মাটিতে ঝেড়ে, ফিসফিসিয়ে উত্তর দেয় —”ডেভিল না…আমি গড।”
একটা থামলো তারপর চোখ সরু করে বললো— “পার্থক্য শুধু এই—গড মানুষ বানায়। আর আমি… মানুষের ছায়া বানাই।”
ঘরে আবার নিস্তব্ধতা নামে। ঝুলে থাকা ফারহানের চোখে তখনো আলো আছে—কিন্তু সেটি এখন ভীত নয়, শান্ত নয়। সেই চোখে জন্ম নিচ্ছে কিছু…একটা অভিশপ্ত ছায়া।
কারখানার ভিতরের একটা গোপন কনফারেন্স রুমের আশপাশটা অস্বাভাবিকভাবে নীরব। দেয়ালের পেইন্ট উঠে গেছে, বাতি ফ্লিক করছে, বাতাসে কেমন একটা ভারী চাপা গন্ধ।
জাভিয়ানের সেক্রেটারি রায়হান এসেছিল মাত্র একটা ছোট কাজের জন্য। গতরাতের ক্লাবে জাভিয়ানের ফোনটা রেখে গিয়েছিল সে। ওটাই ফেরত নিতে। কিন্তু ঘরে পা রাখতেই, ভেতরের কাঁপানো নিঃস্তব্ধতা তার হৃদয়ে হালকা শীতল একটা স্রোত নামিয়ে দেয়।
হঠাৎ পাশের ঘরের আধা খোলা দরজার ফাঁক দিয়ে তার চোখ পড়ে।
তার দৃষ্টিতে প্রথম ধরা পড়ে ফারহান— রশিতে উল্টো ঝুলে আছে, পুরো শরীর রক্তা/ক্ত। চোখ দুটো যেন এখনো জ্বলছে—ভয়ের নয়, রাগ আর অপমানের আগুনে।
ঘরের এক কোণে দুটো পুরনো ভাঙা লোহার চেয়ারে বসে, আছে দুজন মেয়ে। তাদের হাত বাঁধা, মুখ নিস্তব্ধ।কিন্তু তাদের চোখে ধরা পড়ে এক অপূর্ব বৈপরীত্য—ভয়, কান্না আর তবু এক রকম অপরাধহীন নিরীহত্ব।
রায়হান আর এগোয় না। দরজার ছায়ায় দাঁড়িয়েই দেখে সবকিছু। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়। বুকের ভেতর কেমন একটা চিনচিনে অস্বস্তি জমে।
তার চোখ পড়ে মেয়েদের একটুর দিকে। চোখে পানি ঝুলে আছে, কিন্তু মুখে এক নরম, নিষ্পাপ চেহারা।
সে নিজের মনেই ফিসফিস করে বলে ওঠে—”ইনোসেন্ট… একদম নিষ্পাপ। জাভিয়ান স্যার তো বলেছিল এমন কাউকেই খুঁজতে—যার চোখে তাকালে কারো কলুষিত জীবনটাও যেন ধুয়ে যাবে… যার মুখের শান্তিতে কেউ নিজের যন্ত্রণা ভুলে যেতে পারবে… এই দুইজনের মধ্যে হয়তো একজনই হতে পারে সেই…
কথা শেষ করেনি সে। মনের কথা আর ভাবার সুযোগ নেই।
এই মুহূর্তে যা ঘটছে তা অনেক বড়, অনেক গভীর।
এই জায়গায় নিষ্পাপদের জন্য স্থান নেই, আর রায়হানের মতো পর্যবেক্ষকদের জন্যও নয়। সে পা টিপে পেছনে সরে আসে, মুখে কড়া দৃঢ়তা— এখন চিন্তা নয়, এখন দরকার আসল কাজের।
চৌধুরী নিকেতন, রাত ১টা।
চারদিক নিস্তব্ধ।শহরের বাতাসে ঘুম ঘুম গন্ধ ছড়িয়ে আছে, কিন্তু চৌধুরী নিকেতনের এই ঘরে—ঝড় জমে উঠছে।
জাভিয়ান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে সিগারেট ধরাচ্ছিল। শহরের আলো তার মুখে ছায়া ফেলে রেখেছে। চোখের নিচে গাঢ় গম্ভীরতা, যেন বহু রাতের ঘুমহীন হিসেব।
হঠাৎ দরজাটা ধাক্কা দিয়ে খুলে যায়। রায়হান প্রায় দৌড়ে ঢুকে পড়ল জাভিয়ানের রুমে।
রায়হান হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠল— “স্যার… আপনার জন্য অনেক ভালো খবর এনেছি।”
জাভিয়ান ধীরে চোখ সরিয়ে তাকাল ওর দিকে। সিগারেটের আগুনটা একবার লাল হয়ে উঠল।
জাভিয়ান কঠিন গলায় বললো “বল, রায়হান।”
তখন রায়হান ফিসফিস করে সব বলে গেল— রিকার্দোর গোপন আস্তানা, একটা ছেলেকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে… তার পরিবার বন্দী… দুই বোন ভয়ে নিশ্চুপ…হয়ে আছে সেই নিষ্ঠুর ঠাণ্ডা পরিবেশ।
“স্যার… আপনি যেরকম বলছিলেন না… ইনোসেন্ট একটা মেয়ে লাগবে, এমনই দুটো মেয়ে খুঁজে পেয়েছি।”
জাভিয়ান না তাকিয়ে বললো “বিস্তারিত বল।”
রায়হান তখন আবার ও বলা শুরু করলো “রিকার্দো কাল একটা ফ্যামিলি ধরে এনেছে। আটকে রেখেছে কোনো কারনে। তাদের মধ্যে দুইটা মেয়ে আছে—একদম চুপচাপ, চোখে ভয়, মুখে নিষ্পাপ ভাব। ভদ্র ফ্যামিলি বলেই মনে হয়েছে। আর মেয়েদুটো দেখতে সুন্দর… কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, আপনার চাওয়া মতো—একদম ইনোসেন্ট।স্যার, আপনার হাতে বেশি সময় নেই। এটাই বোধহয় একমাত্র উপায়।”
জাভিয়ানের মুখ থেমে যায়।সিগারেটের ধোঁয়া আর মুখের অভিব্যক্তি—দুটোই একসাথে থেমে থাকে কয়েক মুহূর্ত।
তারপর সে ধীরে ফোনটা তোলে। একবারে চোখ না চেপেই রিকার্দোর নাম্বার ডায়াল করে।
রিং হয় একবার… দুইবার… তারপর ওপ্রান্তে হাসির আওয়াজ।
রিকার্দো অভিনয় করা উল্লাসে বলে উঠলো “আহা! ঈদের চাঁদ পেলাম মনে হচ্ছে। হঠাৎ জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীর কল এসেছে আমার নাম্বারে।”
জাভিয়ানের চোখে হঠাৎ আগুন জ্বলে ওঠে।
কিন্তু গলা বরফের মতো ঠাণ্ডা। ঠোঁট শক্ত করে কষে বলে ওঠে— “একটা পরিবার নাকি তোমার কাছে বন্দি হয়ে আছে? সাথে দুটো মেয়ে আছে? আমি ওদের মধ্যে একজনকে চাই। আমার লাগবে।”
রিকার্দো অবাক হয়ে বললো “হাহা! হঠাৎ তোমার কী হলো রে ভাই? তুমি তো মেয়েদের ধারেকাছেও থাকো না… এখন হঠাৎ করে মেয়ে লাগবে?”
জাভিয়ান দম চেপে বললো “ডোন্ট টক টু মাচ। জিনিস দেবে দাম নেবে। এইটা একটা ডিল। তোমার যত টাকা লাগে, পাবে। কিন্তু আপাতত, মেয়েদুটোর গায়ে যেনো কেউ হাত না দেয়।”
ওপাশে হঠাৎ একটু থেমে যায় রিকার্দো। তারপর আবার সেই হাসির আওয়াজ রিকার্দো নরম স্বরে, কিন্তু কুৎসিত ভঙ্গিতে বললো “না না… চিন্তা করোনা জাভিয়ান… ওদের গায়ে এখন ও পর্যন্ত হাত দেয়নি কেউ। মেয়েদুটো একদম ফ্রেশ মাল।”
জাভিয়ান ফোন কেটে দেয় না। চোখে তখন এমন এক আগুন, যা শুধু রিকোর বিরুদ্ধে নয়—নিজের ভেতরের শূন্যতার বিরুদ্ধেও। সে ধীরে ফোনটা নিচে নামিয়ে রাখে।
রায়হানের দিকে না তাকিয়েই জাভিয়ান নিজের মনেই বলে উঠলো “মেয়ে দুটো কারা, জানি না। কিন্তু এইবার যদি ওদের মধ্যে একজনকে না পাই তবে বাবার কাছে হেরে যেতে হবে।”
ঘরের বাতাস থেমে যায়। জাভিয়ান সিগারেটটা মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে, আর পায়ের নিচে পিষে ফেলে আগুনটা।
সিয়ুদাদ হুয়ারেস, মেক্সিকো। সময়: রাত ৩:৪০।
শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে, মেক্সিকোর এক পুরনো ফ্যাক্টরির নিচে লুকিয়ে আছে মেইলস্ট্রোমের ব্যক্তিগত সিকিউর ঘাঁটি।
এই ঘরটা বাইরের কেউ জানে না।এখানে সোনার বার, হিরার বাক্স, পুরনো টাকাপয়সা আর অনেক দেশের ব্যাংক-নোটে ভর্তি বাক্স সারি সারি সাজানো।
ঘরের একপাশে একটা সাইবার টার্মিনাল (Cyber Terminal – হাই টেক কম্পিউটার), যেখানে দাঁড়িয়ে মেইলস্ট্রোম কাজ করছিল টানা কয়েকদিন ধরে। কাজটা খুবই স্পর্শকাতর – এক গোপন আন্তর্জাতিক ফিনান্সিয়াল প্রজেক্ট যার নাম Project Exchequer (প্রজেক্ট এক্সচেকার – অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থা)।
আগামী ৭২ ঘণ্টার (৩ দিন) মধ্যে সেই প্রজেক্টের ডেমো দিতে হবে। যদি সে সফল হয়, তাহলে বিশ্বের সবচেয়ে গোপন টাকার লেনদেনের চেইনের একমাত্র নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে সে।
এই কারণে মেইলস্ট্রোম নিজেকে পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ফোন বন্ধ, ইন্টারনেট অফ, কেউ তাকে খুঁজতে পারবে না। এমনকি তার লোকদের মেসেজও তার কাছে পৌঁছাবেনা।
এই অবস্থায়, সে হঠাৎ করেই দেয়ালের পাশে এক গোপন সুইচ চাপ দেয়। “ক্লিক” – শব্দ করে খুলে যায় একটা লোহার বাক্স।
ভেতরে আছে তিনটা জিনিস। একটা ভাঙা পুরনো হ্যান্ডগান (পিস্তল),র/ক্তমাখা এক চিঠি, আর একটা ব্রোঞ্জের (তামা-মিশ্রিত ধাতু) মেডেল – যা তার জীবনের একমাত্র বিশ্বাসঘাতকতা ও কষ্টের প্রমাণ।
মেইলস্ট্রোম ধীরে মেডেলটা হাতে নেয়।চোখে একরাশ পুরনো স্মৃতি জমে উঠে। মেইলস্ট্রোম নিজে নিজে ফিসফিস করলো “ওরা ভাবে আমি হারিয়ে গেছি… ওরা জানে না, আমি যদি ফিরি… তাহলে কেউ আর আগের মতো থাকবে না।”
এই মুহূর্তে সে জানে না, বাইরে অনেক কিছু বদলে যাচ্ছে।
তান্বী—যাকে সে অনেকদিন ধরে গোপনে নজরে রেখেছিল, যার চলাফেরা, চিন্তা, নিরাপত্তা—সব ছিল তার লোকের নজরে— আজ সেই তান্বী রিকার্দোর হাতে বন্দি। কিন্তু মেইলস্ট্রোম সেটা এখনো জানে না।
তার মন বলে— “এই মিশন শেষ হলে আবার সব ঠিক করে নেবে… তখন সময় নিয়ে ভাববে তান্বীর কথা।”
কিন্তু জীবন তাকে সময় দেবে তো?
বাইরে আগুন জ্বলছে। আর ভেতরে সে এখনো বরফের মতো ঠান্ডা।
পরের দিন সকাল।
সূর্যটা একটু ধীরে ধীরে উঠেছে আজ, যেন জানে—জাভিয়ানের জীবনে আজকের দিনটা আলাদা। দরজা খুলে জাভিয়ান বেরিয়ে আসে। কালো শার্টের ওপরে কালো ব্লেজার আর চোখে রোদচশমা, মুখটা আজ আরও গম্ভীর। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গাড়ির দিকে যায়। মাথায় একরাশ চিন্তা—কিন্তু চেহারায় প্রকাশ নেই।
গাড়িতে বসে দরজা বন্ধ করতেই পাশের আসনে রাখা বাবার ছবি চোখে পড়ে যায়। কাঠের ফ্রেমে গম্ভীর এক মুখ। ছবিটা তুলে নিয়ে চুপচাপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে জভিয়ান। তারপর আস্তে করে বললো,
“আপনার কাছে আমি কোনদিনও হারবোনা মিস্টার চৌধুরী! আপনাকে হারাতে আমি একটা বিয়ে করতে যাচ্ছি। কিন্তু জানেন তো, আমি কিছুই অনুভব করতে পারছি না। আজ যে মেয়েটাকে আমি ঘরে তুলবো… সে কি জানে, আমি তাকে ভালোবাসবো না কোনদিন ও?”
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪
তার চোখে কিছু একটা যেন আটকে থাকে—না বলা কথা, না বোঝা অনুভূতি। গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট হয়। রাস্তা ধরে গাড়িটা ছুটে চলে—উদ্দেশ্য, রিকার্দোর আস্তানা। সেখানেই আজ এক চুক্তির বিয়ে, এক অজানা মেয়ের সঙ্গে… জাভিয়ানের নতুন জীবনের শুরু,অথচ তার মনে কোনো উন্মাদনা নেই—শুধু নিঃসঙ্গতা, চ্যালেঞ্জ, আর একরাশ ফাঁকা অনুভব।
