Home ডিজায়ার আনলিশড ডিজায়ার আনলিশড শেষ পর্ব

ডিজায়ার আনলিশড শেষ পর্ব

ডিজায়ার আনলিশড শেষ পর্ব
সাবিলা সাবি

পিকআপ ভ্যান থেকে নেমে জাভিয়ান যখন তান্বীকে পাঁজকোলা করে নিয়ে হসপিটালের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে প্রবেশ করল, তখন তার নিজের পরনের শার্ট রক্ত আর কাদায় মাখামাখি অবস্থা। স্ট্রেচারে তান্বীকে শুইয়ে দেওয়ার পর ডক্টরের দল যখন তাকে রেড জোনের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, জাভিয়ান তান্বীর হাতটা শেষবারের মতো চেপে ধরে অবরুদ্ধ গলায় বলল, “তোমাকে বাঁচতেই হবে জিন্নীয়া… আমাদের ছোট সংসারের জন্য হলেও ফিরতে হবে।”

তান্বীকে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকিয়ে দরজার ওপর লাল আলোটা জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। জাভিয়ান ওটি-র দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে ধীরপায়ে মেঝের ওপর বসে পড়ল। তার দুই হাত তান্বীর তাজা রক্তে রাঙানো। সে চোখ দুটো বুজে অপেক্ষা করতে লাগল পুলিশের সাইরেনের কারন সে জানত, হসপিটাল সোর্স অলরেডি ইন্টারপোলকে খবর দিয়ে দিয়েছে। হাতকড়া পরার জন্য সে মানসিকভাবে প্রস্তুত।
ঠিক তখনই, হসপিটালের লাউঞ্জে থাকা বিশাল এলইডি টিভির স্পিকার থেকে স্প্যানিশ এবং ইংরেজি ক্যাপশনে এক তীব্র ব্রেকিং নিউজের টোন বেজে উঠল—
**”ব্রডকাস্ট নিউজ: মেক্সিকো আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে বড় ওলটপালট! নাইট রেভেনের ওপর থেকে সব হুলিয়া প্রত্যাহার!”**

নিউজের সেই পরিচিত টোনে জাভিয়ানের ধূর্ত মস্তিষ্ক এক লহমায় সজাগ হয়ে উঠল। সে ফ্লোর থেকে উঠে দাঁড়িয়ে লাল বর্ন হয়ে যাওয়া চোখজোড়া তুলে তাকাল টিভির বড় স্ক্রিনের দিকে। স্ক্রিনে তখন মেক্সিকোর ইন্টারপোল চিফ এবং ফেডারেল কোর্টের প্রধান বিচারপতির যৌথ প্রেস কনফারেন্স লাইভ দেখানো হচ্ছে। টিভির অ্যাঙ্কর অত্যন্ত উত্তেজিত গলায় স্ক্রল পড়ে শোনানো শুরু করল—”মেক্সিকোর ডার্ক ওয়েবের ইতিহাসে আজ সবচেয়ে বড় মোড়! দীর্ঘ তদন্তের পর মেক্সিকান ফেডারেল কোর্ট ঘোষণা করেছে যে, ‘নাইট রেভেন’ ওরফে মিস্টার জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী সম্পূর্ণ নিরপরাধ! মেইলস্ট্রমের ওরফে ইভান চৌধুরীর ল্যাপটপ হ্যাকিং ডেটা, পেন্টহাউসের গোপন সিসিটিভি ফুটেজ এবং তার মা ইসাবেলা মোরেলাসের রেখে যাওয়া সমস্ত এভিডেন্স প্রমাণ করেছে যে জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীকে আন্তর্জাতিক Cicada 3301 এর পাসকোড লিকের কেসে ফাঁসানো হয়েছিল।”

জাভিয়ান বিস্ফোরিত নয়নে টিভির সামনে এগিয়ে গেল। তার বুকের ভেতর তীব্র ঝড় চলছে। স্ক্রিনে ইভানের সেই সাইকো রূপের ছবি ভেসে উঠল, যাকে আধ ঘণ্টা আগে ইন্টারপোল সম্পূর্ণ পরাস্ত করে সুরক্ষিত অন্ধকার সেলে চালান করে দিয়েছে। অ্যাঙ্কর আবার বলতে লাগল—
“ইন্টারপোল চিফ অফিশিয়ালি ঘোষণা করেছেন, মিস্টার জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীর ওপর থাকা রেড নোটিশ এবং শুট-অন-সাইটের অর্ডার এই মুহূর্ত থেকে বাতিল করা হলো। হি ইজ আ ফ্রি ম্যান নাও! মেক্সিকোর মাটিতে তিনি এখন একজন স্বাধীন নাগরিক।”

জাভিয়ানের চোখের কোণটায় এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পরার উপক্রম। সে আর কারও মুখ না দেখলেও স্পষ্ট বুঝতে পারল, এই অসম্ভবকে সম্ভব কে করেছে। এই বুদ্ধি, এই নিখুঁত নিখুঁত চাল কেবল একজনেরই হতে পারে—তার বিশ্বস্ত সেনাপতি রায়হান। রায়হান তার রাজাকে তার বসকে দুনিয়ার সামনে আবার সসম্মানে স্বাধীন করে দিয়েছে।
ঠিক তখনই, হসপিটালের করিডোরে ভারী বুটের শব্দ শোনা গেল। জাভিয়ান ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল ইন্টারপোলের চারজন স্পেশাল কমান্ডো অফিসার অত্যন্ত গম্ভীর মুখে তার দিকে এগিয়ে আসছে। জাভিয়ান নিজের দুই হাত সামনে বাড়িয়ে দিল হাতকড়া পরার জন্য। কিন্তু অফিসাররা হাতকড়া বের করল না। বরং জাভিয়ানের ঠিক সামনে এসে তারা লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ডান হাত কপালে ঠেকিয়ে জাভিয়ানকে এক রাজকীয় স্যালুট ঠুকল! কারন জাভিয়ান এমন একজন মানুষ যে Cicada 3301 এর মতো পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল পাজেল সমাধান করেছিলো আর তাকেই কিনা একদিন বিনা অপরাধে হেনস্তা করা হয়েছে রিমান্ডে নেয় হয়েছিলো। একদম সামনে থাকা অফিসারটি অত্যন্ত সম্মানের সাথে বলল,”মিস্টার জাভিয়ান, আমাদের ভুল বুঝবেন না। আমরা আইনের দাস। আদালতের নতুন রায়ের পর আপনি এখন সম্পূর্ণ মুক্ত। আপনার এই বিপদের দিনে ইন্টারপোলের পক্ষ থেকে ভুল বোঝাবুঝির জন্য আমরা দুঃখিত। আপনার স্ত্রীর চিকিৎসার সব দায়িত্ব মেক্সিকান ফেডারেল পুলিশ পার্সোনালি তদারকি করবে।”

জাভিয়ান অফিসারদের দিকে তাকিয়ে আলতো করে মাথা নাড়ল। তার চোখের সেই চেনা নাইট রেভেন রূপটা আবার ফিরে এসেছে। কিন্তু আজ তার এই স্বাধীনতার আনন্দ পূর্ণতা পাবে না, যদি না ওটির ভেতরের তার জিন্নীয়া তার বুকে ফিরে আসে। সে কমান্ডোদের বলল, “আই জাস্ট ওয়ান্ট মাই ওয়াইফ ব্যাক।”
জাভিয়ান আবার ওটি-র দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। টিভির স্ক্রিনে তখনো তার নির্দোষ হওয়ার খবর ফ্ল্যাশ হচ্ছে, পুরো মেক্সিকো সিটি এখন তার পায়ের নিচে, তার হারানো রাজত্ব আবার তার হাতের মুঠোয়। কিন্তু মেক্সিকোর এই স্বাধীন সম্রাট আজ হাতজোড় করে আল্লাহর কাছে কেবল একটা জিনিসেরই ভিক্ষা চাইছে—তার তান্বীর বেঁচে থাকা।
সে ওটি-র জানলার কাচ দিয়ে ভেতরে আবছা আলোয় শুয়ে থাকা তান্বীর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “জিন্নীয়া… দেখো, তোমার জাভিয়ান আজ আবার স্বাধীন। এই দুনিয়ার কোনো শক্তি আজ আর আমাদের আলাদা করতে পারবে না। এবার চোখ খোলো ভালোবাসা… আমাদের সেই ছোট সংসার তো করা বাকি এখনও।”

ইন্টারপোলের অফিসাররা যখন জাভিয়ানকে স্যালুট জানিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, জাভিয়ান তখন ধীরপায়ে তাদের প্রধান অফিসারের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো বরফের মতো শীতল, কণ্ঠস্বরে গম্ভীরতা। সে অফিসারকে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত চতুরতার সাথে আদেশ জারি করে বললো “অফিসার, মেক্সিকান ফেডারেল কোর্ট আমাকে নির্দোষ ঘোষণা করেছে ঠিকই, কিন্তু ইভানের খাতায় আমি আর তান্বী আজ থেকেই চিরতরে মৃত! এটাই আমার শেষ আদেশ মিডিয়া এবং ডার্ক ওয়েবের প্রতিটা সাইটে আন অফিশিয়ালি অ্যানাউন্স করে দিন যে, ‘কপার ক্যানিয়নের সেই অতল খাদে ঝাঁপ দেওয়ার পর নাইট রেভেন আর তার স্ত্রী তান্বীর ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে’।”
অফিসারটি চমকে উঠে বলল, “কিন্তু মিস্টার চৌধুরী, আপনি তো জীবিত! আর আপনার স্ত্রীও ভেতরে চিকিৎসাধীন—”
“আমি যা বলছি, ঠিক তা-ই করুন!” জাভিয়ান অফিসারের কথা থামিয়ে দিয়ে শক্ত গলায় বলল, “মেক্সিকোর কবরস্থানে দুটো কাল্পনিক কবর খুঁড়বেন আপনারা। সেখানে দুটো এপিটাফের সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেবে, যেখানে লেখা থাকবে আমাদের নাম। আর… ওই সাইকো ইভানকে জেলখানায় অফিশিয়াল ডেড সার্টিফিকেট দেখানোর পাশাপাশি, শেষবারের মতো গার্ডের পাহাড়ায় এনে ওই দুটো কবর সশরীরে দেখাবেন!”
অফিসাররা জাভিয়ানের এই কুটিল বুদ্ধির গভীরতা দেখে মনে মনে শিউরে উঠল। জাভিয়ান অফিসারদের দিকে পা পুনরায় তাকিয়ে এক চিলতে রহস্যময় হাসি হেসে বলল—

“আমি নিজে আলতিপ্লানো জেলের সিকিউরিটি ভেঙে বের হয়েছি। তাই আমি জানি, ইভানের মতো ধূর্ত মাফিয়া কিং আজ হোক বা দশ বছর পর হোক, কোনো না কোনো উপায়ে এই জেল থেকে বের হবেই। ও যদি কোনোদিন জানতে পারে তান্বী আর আমি মেক্সিকোর কোনো কোণায় জীবিত আছি, ও আবারও আমার ওয়াইফের দিকে বিষাক্ত হাত বাড়াবে। কিন্তু ও যদি নিজের চোখে দেখে যে তান্বী আর আমি ওই খাদে ঝাঁপ দিয়ে সত্যিই মরে গেছি… তবে জেল থেকে বের হওয়ার সেই হিংস্রতা আর তান্বীকে পাওয়ার সেই অদম্য জেদ ওর ভেতর থেকে চিরতরে মরে যাবে। ও মরে যাওয়া কোনো লাশের পেছনে নিজের শক্তি খাটাবে না। এক মৃত জাভিয়ান আর মৃত তান্বীই হবে ওর আজীবনের মানসিক কারাগার!”
ইন্টারপোলের অফিসাররা জাভিয়ানের এই দূরদর্শিতার সামনে মাথা নোয়াতে বাধ্য হলো। তারা স্যালুট দিয়ে বলল, “ইয়েস মিস্টার চৌধুরী। আজ রাতেই ইভানকে ওই ভুয়ো কবরের সামনে নিয়ে যাওয়া হবে। ওর চোখে আপনারা আজ থেকেই মৃত।”

মেক্সিকোর সেই প্রাচীন নিস্তব্ধ ‘পান্তেওন দে সান ফার্নান্দো’ কবরস্থানের একটা কোণে, যেখানে কুয়াশা আর পাইন গাছের ছায়া সারাদিন অন্ধকারছন্ন করে রাখে। কপার ক্যানিয়নের সেই তীব্র খাদের ট্র্যাজেডির পর, মেক্সিকোর অফিশিয়াল রেকর্ড বুকে জাভিয়ান আর তান্বীর অস্তিত্ব থাকলেও ইভানের চোখে তাদের অস্তিত্ব চিরতরে মুছে দিতে শহরতলির এই শান্ত কবরস্থানটিকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। গভীর রাতে ভারী বুটের শব্দ করে যখন পুলিশ পাহাড়ে ঘেরা সেই কবরের সামনে এসে দাঁড়াল, তখন চাঁদের আলোয় চকচক করছিল দুটো ধবধবে সাদা মার্বেল পাথরের ফলক।
ফলক দুটোর ওপর স্প্যানিশ এবং ইংরেজি হরফে নিখুঁতভাবে খোদাই করা ছিল তাদের নাম, জন্ম ও মৃত্যুর সেই হিসাব—

*JAVIAN EMILIO CHOUDHURY*
*Born: April 01, 1997
*Died: may 25, 2026.
*TANBEE EMILIO CHOUDHURY*
*Born: August 13, 2006
*Died: May 25, 2026.
মেক্সিকোর ‘পান্তেওন দে সান ফার্নান্দো’ কবরস্থানের সেই কঠোর নিস্তব্ধতা চিরে ইভানের ভেতরের সুপ্ত সাইকো রূপটি এবার এক পৈশাচিক উন্মাদনায় রূপ নিল। চাঁদের আলোয় সেই দুটো পাথুরে ফলকের জন্ম-মৃত্যুর তারিখ আর জাভিয়ান-তান্বীর নাম পাশাপাশি দেখে তার এতদিনের জমানো হিংসা আর পরাজয়ের গ্লানি আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। ডাণ্ডাবেড়ি আর ভারী শিকল পরা অবস্থায় ইভান যখন তান্বীর সেই ভুয়ো কবরের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল, তখন তার ধূসর চোখজোড়া আর কোনো সাধারণ মানুষের মতো ছিল না। ফলকের গায়ে খোদাই করা ‘তান্বী চৌধুরী’ নামটা এবং তার ঠিক পাশেই থাকা জাভিয়ানের কবরটা দেখে তার মাফিয়া মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ বিকৃত হয়ে গেল।

সে দুই হাতে নিজের মাথাটা চেপে ধরে এক বন্য পশুর মতো চিৎকার করে আকাশ কাঁপিয়ে হাসতে লাগল, আর সেই হাসির পরক্ষণেই তার চোখ দিয়ে টপটপ করে ঝরতে লাগল নোনা জল। সে তান্বীর কবরের পাথুরে ফলকটা খামচে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলতে লাগল—”তুমি মরে গিয়েও ওই জাভিয়ানের পাশাপাশি… ওর সাথেই মরলে তান্বী? কেন? আমার মধ্যে কী কম ছিল, বলো আমাকে? হ্যাঁ, আমি পাপী, আমি জঘন্য, আমি ডার্ক ওয়ার্ল্ডের মেইলস্ট্রোম! কিন্তু ওই জাভিয়ান ? ও কি খুব পবিত্র ছিল? ওর হাত কি রক্তে রাঙানো ছিল না? তবে কেন ওকে বাঁচানোর জন্য তুমি নিজের ১৯ বছরের জীবনটা ওই খাদের জলে ভাসিয়ে দিলে, আর আমার এই এত বড় রাজত্ব এক সেকেন্ডে লাথি মেরে চলে গেলে?!”

ইভান ফলকের গায়ে নিজের কপাল ঠুকে রক্ত বের করে ফেলল। তার কণ্ঠস্বর তখন ক্রমশ হিংস্র আর পৈশাচিক শোনাচ্ছিল—”আমার ভালোবাসা কি মিথ্যে ছিল, সোলফ্লেম (Soulflame)? না! আমার ভালোবাসা মিথ্যে ছিল না! আমি তোমাকে কিছুতেই এই মরার পরেও ওই জাভিয়ানের পাশে থাকতে দেব না! বেঁচে থাকতেও তুমি ওর ছিলে, মরে গিয়েও তুমি ওর কবরের পাশে শুয়ে থাকবে? তা হতে পারে না! আই উইল নট অ্যালাউ দিস!”
হঠাৎ করেই ইভানের ভেতরের সাইকো সত্ত্বাটা চরম মাত্রায় চাঙ্গা হয়ে উঠল। সে কোনো আইন, কোনো পুলিশ বা নিজের হাতের ভারী হাতকড়ার তোয়াক্কা না করে পাগলের মতো দুই হাত বাড়িয়ে তান্বীর কবরের ভেজা মাটি খুবলে খুবলে খুঁড়তে শুরু করল। “আমি তোমাকে বের করে আনব তান্বী! এই মাটি থেকে তোমাকে আমি নিজের হাতে টেনে তুলব। মরে গেলেও তুমি শুধু আমার… আমার খাঁচাতেই তোমাকে থাকতে হবে!”
তার নখগুলো পাথুরে মাটিতে লেগে ফেটে গিয়ে রক্ত বের হতে লাগল, নখের ভেতরের চামড়া উপড়ে মাটি আর রক্ত এক হয়ে গেল, কিন্তু ইভানের কোনো হুঁশ নেই। সে পৈশাচিক উন্মাদনায় মাটির বুক চিরে তান্বীকে বের করার জন্য দুই হাতে মাটি ছুড়তে লাগল।

ইন্টারপোলের প্রধান কমান্ডো ইভানের এই ভয়ঙ্কর রূপ দেখে আর এক সেকেন্ডও দেরি করলেন না। চারজন হৃষ্টপুষ্ট মেক্সিকান পুলিশ অফিসার একযোগে ইভানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা ইভানের কোমর, ঘাড় আর শিকল পরা হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। “ছাড় আমাকে! তোরা চিনিস আমি কে? আমি মেইলস্ট্রোম! তোদের এই পুরো কবরস্থান আমি উড়িয়ে দেব। তান্বী… তুমি আমার…!” ইভান মাটিতে শুয়ে পা ছুড়ে, ছটফট করে কামড়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু চারজন ট্রেন্ড অফিসারের শক্তির কাছে তার সেই উন্মাদনা বেশিক্ষণ টিকল না। পুলিশ অফিসাররা তাকে মাটি থেকে টেনেহিঁচড়ে, হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে প্রিজনিং ভ্যানের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। ইভানের পা দুটো মেক্সিকোর সেই ধূসর মাটিতে দাগ কাটতে কাটতে এগিয়ে চলল। ভ্যানের ভেতরে তোলার সময়ও সে পেছনের দিকে তাকিয়ে সেই দুটো কাল্পনিক কবরের দিকে চেয়ে উন্মাদের মতো হাসছিল আর কাঁদছিল। তার এই চূড়ান্ত মানসিক পরাজয় আর আজীবনের ভ্রমের চ্যাপ্টার এখানেই সিলগালা হয়ে গেল। সে কোনোদিনও জানতে পারবে না যে, যে মাটিকে সে নিজের নখ দিয়ে রক্তাক্ত করেছে—তার নিচে কোনো তান্বী নেই।
ওদিকে, মেক্সিকো সিটির সেই শান্ত হসপিটালের কেবিনের জানলা দিয়ে ভোরের প্রথম সোনালী আলোটা এসে পড়েছে তান্বীর মুখের ওপর। জাভিয়ান তান্বীর হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে পরম শান্তিতে বসে আছে। ইভানের সেই বিষাক্ত হাহাকার আর কোনোদিন এই পবিত্র সকালের আলো কাঁপাতে পারবে না।

কবরস্থান থেকে ফিরিয়ে আনার পর ইভানকে মেক্সিকো সিটির সবচেয়ে হাই-সিকিউরিটি জেলের একটি স্পেশাল সেলে রাখা হয়েছিল। তার দুই হাতে তখনও লক করা ছিল ভারী হাতকড়ায়। কিন্তু তান্বীর মৃত্যুর সেই ভুয়ো দৃশ্য এবং জাভিয়ানের পাশে তার চিরন্তন চলে যাওয়াটা ইভানের মস্তিষ্কের প্রতিটা কোষকে এক সেকেন্ডে বিকৃত করে দিয়েছিল। পরদিন ভোরবেলা, যখন দুজন অভিজ্ঞ প্রিজন গার্ড ইভানের সেলে সকালের খাবার দিতে প্রবেশ করল, তখন তারা ভাবতেও পারেনি যে এক খাঁচাবদ্ধ সিংহের চেয়েও এক পাগল হয়ে যাওয়া পিশাচ কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে! খাবারের থালাটা মেঝেতে রাখামাত্রই, ইভান এক বাঘের ক্ষিপ্রতায় হাতকড়া পরা অবস্থাতেই ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রথম গার্ডের ওপর। নিজের হাতের সেই ভারী লোহার শিকলটা সে পেঁচিয়ে ধরল গার্ডের গলায়। গার্ডটি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ইভান নিজের পুরো শরীরের শক্তি দিয়ে শিকলটা টেনে ধরল। মাত্র কয়েক সেকেন্ডে দম আটকে গার্ডের চোখ দুটো উল্টে গেল। দ্বিতীয় গার্ডটি কোমর থেকে রিভলভার বের করতে যাবে, ঠিক তখনই ইভান প্রথম গার্ডের নিথর দেহটা ছুড়ে ফেলে বাঘের মতো গর্জে উঠে দ্বিতীয় গার্ডের ওপর আছড়ে পড়ল। হাতকড়ার ধারালো লোহা দিয়ে সে আঘাত করল গার্ডের গলার প্রধান ধমনীতে। অন্ধকার সেলের দেওয়ালে আর মেঝেতে ফিনকি দিয়ে ছিটকে পড়ল তাজা রক্ত। মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে ইন্টারপোলের সেই দুর্ধর্ষ দুজন গার্ডকে ঠান্ডা মাথায় খু/ন করে ইভান সেই রক্তের ওপর নিজের দুই পা ডুবিয়ে বসে রইল। তার সারা মুখে, পোশাকে তখন রক্ত। সে নিজের রক্তাক্ত আঙুল দিয়ে সেলের দেওয়ালে পাগলের মতো কেবল একটা নামই লিখতে লাগল ‘সোলফ্লেম’… ‘তান্বী’।

এই নৃ/শংস জোড়া খুনের পর মেক্সিকোর শীর্ষস্থানীয় চারজন ফরেনসিক সাইক্রিয়াট্রিস্ট এবং নিউরোলজিস্টদের নিয়ে এক আর্জেন্ট মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হলো। ইভানকে কড়া নজরদারিতে রেখে তার ওপর দীর্ঘ মানসিক পরীক্ষা চালানো হয়। পরদিন দুপুরে, ইন্টারপোলের চিফ কমান্ডো আর জজ সাহেবের সামনে ডক্টর জোসেফ তাঁর মেডিকেল রিপোর্ট পেশ করতে গিয়ে গম্ভীর মুখে বললেন—
“মিস্টার কমান্ডো, মেইলস্ট্রোম ওরফে ইভানের এই কেসটি কোনো সাধারণ অপরাধীর কেস নয়। আমাদের সাইকোলজিক্যাল টেস্টে প্রমাণিত হয়েছে যে ও দীর্ঘদিন ধরে ‘অ্যান্টিসোশিয়াল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার’ (ASPD) এবং ‘বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার’ (BPD) এর শেষ স্টেজে ভুগছিল। ওর ভেতরে চরম মাত্রার ‘প্যাসেসিভ সাইকোসিস’ কাজ করছিল। তান্বী নামের ওই মেয়েটির প্রতি ওর ভালোবাসা কোনো সাধারণ প্রেম ছিল না, ওটা ছিল একটা ভয়ঙ্কর অবসেসন।”

ডক্টর তাঁর চশমাটা ঠিক করতে করতে রিপোর্টের পাতায় আঙুল রেখে আরও বললেন—”তান্বী মেয়েটির মৃত্যুর খবর শোনার পর ওর মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা অংশটি পুরোপুরি ড্যামেজ হয়ে গেছে। ও এখন এক জ্যান্ত উন্মাদ। ও কোনটা বাস্তব আর কোনটা ওর কল্পনা তা আলাদা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। এই মুহূর্তে ওকে এই সেলে রাখা অসম্ভব। ও নিজের সেলের যেকোনো মানুষকে, এমনকি নিজেকেও যেকোনো সময় খু/ন করে ফেলতে পারে। ওর মানসিক অবস্থা এতটাই বিকৃত যে ও এখন ইন্টারন্যাশনাল ইমিউনিটি পাওয়ার যোগ্য।”
ডক্টরের এই ফাইনাল রিপোর্টের ভিত্তিতে মেক্সিকান ফেডারেল কোর্ট ইভানের ফাঁসির বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা স্থগিত করে এক নতুন নির্দেশ জারি করল।

মেক্সিকো সিটির সবচেয়ে সুরক্ষিত এবং কুখ্যাত মানসিক হাসপাতাল ‘লা লোমা মেন্টাল অ্যাসাইলাম’ এর এক অন্ধকার, সাউন্ডপ্রুফ সাদা সেলে ইভানকে আজীবনের জন্য স্থানান্তরিত করা হলো। তার পরনে এখন কয়েদির পোশাক নেই, বরং তাকে পরিয়ে দেওয়া হয়েছে মেন্টাল পেশেন্টদের সেই বিশেষ স্ট্রেটজ্যাকেট, যাতে সে নিজের হাত নাড়াতে না পারে। সেলের চারদিকের দেয়াল নরম প্যাড দিয়ে ঢাকা, যাতে সে মাথা ঠুকে মরতে না পারে। ইভান সেই অন্ধকার সেলের এক কোণে বসে শূন্য চোখে জানলার ওপারে তাকাতে লাগল। তার সেই দুর্ধর্ষ আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়া কিং ‘মেইলস্ট্রোম’ রূপটা আজ এক অন্ধকার কামরার পাগলে পরিণত হয়েছে। সে সারাদিন শুধু জানলার ওপারে হাত বাড়িয়ে ফিসফিস করে ডাকতে থাকে “তান্বী… তুমি আসবে তো? দেখো, আমি তোমার জন্য সবাইকে মেরে ফেলেছি…”*

টানা সাতদিন জাভিয়ান হসপিটালের সেই কেবিনের একটি চেয়ারে পাথরের মতো বসে কাটিয়েছে। তার নিজের শরীরের ক্ষত, ক্লান্তি বা আন্ডারওয়ার্ল্ডের কোনো খবরই তাকে সেই জায়গা থেকে এক চুলও নড়াতে পারেনি। এই এক সপ্তাহের মাঝেই হসপিটালে এসে পৌঁছেছিলেন তান্বীর ভাই ফারহান আর জাভিয়ানের বাবা, মা আর চাচা । রায়হানের পেশ করা সেই অকাট্য প্রমাণের পর চৌধুরী পরিবারের সবার সামনে উন্মোচিত হয়েছিল এক ভয়ঙ্কর সত্য। তারা জানতে পেরেছেন কীভাবে মার্কো আর ওই সাইকো ইভান মিলে জাভিয়ানকে বেইমানি করে ফাঁসিয়েছিল, আর কীভাবে তান্বী নিজের জীবন বাজি রেখে তার স্বামীকে বাঁচানোর লড়াই লড়েছিল।
পুলিশ যখন কপার ক্যানিয়নের জঙ্গল থেকে মার্কোর গলিত লাশ উদ্ধার করে, সেই খবরটা রায়হানের মাধ্যমে জাভিয়ানের কাছে এসে পৌঁছায়। নিজের ভাইয়ের এই পরিণতি জাভিয়ানকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু মার্কোর করা সেই কুৎসিত বিশ্বাসঘাতকতার ক্ষত তখনো দগদগে। এদিকে, নিজের ছেলে মার্কোর এই পৈশাচিক চাল আর জাভিয়ানের ওপর করা অন্যায়ের কথা জানতে পেরে জাভিয়ানের চাচা সাইফ চৌধুরী সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি হসপিটালের করিডোরে জাভিয়ানের সামনে এসে দাঁড়ানোর সাহস পাচ্ছিলেন না। অবশেষে তিনি কেবিনে ঢুকে জাভিয়ানের দুই হাত ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন।
তিনি কাঁপতে কাঁপতে বলেছিলেন, “আমাকে ক্ষমা করে দে জাভি! আমি নিজের ছেলেকে চিনতে পারিনি। আমার মার্কো টাকার লোভে আর হিংসায় অন্ধ হয়ে তোদের এই নরকে ঠেলে দিয়েছিল। আজ ওর পাপের শাস্তি ও নিজেই পেয়ে গেছে। কিন্তু আমি তোদের সামনে মুখ দেখানোর যোগ্যতা হারিয়েছি রে … আমাকে তুই ক্ষমা করে দিস।”

জাভিয়ান নিজের চাচাকে ফিরিয়ে দেয়নি। তার এই অনুশোচনার সামনে নিজের ভেতরের সমস্ত ক্ষোভ বিসর্জন দিয়ে সাইফ চৌধুরীর কাঁধে হাত রেখে সান্তনা দিয়েছিলো।
ঠিক এক সপ্তাহ পরের এক শান্ত সকালে, তান্বীর অবশ হয়ে থাকা আঙুলগুলো হঠাৎ একটু নড়ে উঠল। ধীরে ধীরে তার চোখের পাতা দুটো কাঁপতে কাঁপতে মেলল
“জা… জাভিয়ান…” খুব ক্ষীণ দুর্বল একটা আওয়াজ তান্বীর ঠোঁট চিরে বেরিয়ে এল। জাভিয়ান এক লহমায় তান্বীর হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় পুরে তার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ল। তার চোখে তখন আনন্দের অশ্রু। “জিন্নীয়া! এই তো আমি… তোমার পাশে। আর কোনো ভয় নেই সোনা, আমরা জিতে গেছি।” কেবিনের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা তান্বীর ভাই আর লুসিয়া। ফারহান যখন দেখলো তার বোন অবশেষে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে, তখন তার চোখের জল আর বাঁধ মানল না। সে সরাসরি কেবিনে ঢুকে তান্বীর কপালে হাত বুলিয়ে দিলো। সবাইকে এভাবে চোখের সামনে দেখে তান্বী একপ্রকার প্রশান্তি অনুভব করলো।

জ্ঞান ফেরার পরও জাভিয়ান কোনো তাড়াহুড়ো করেনি। সে তান্বীকে আরও পুরো দুটো দিন হসপিটালের সেই ভিআইপি কেবিনে রেখে সম্পূর্ণ মেডিকেল অবজারভেশনে রাখল। ডক্টররা যেন তান্বীর চিকিৎসার প্রতিটা খুঁটিনাটি নিখুঁতভাবে তদারকি করে, তার পুরো দায়িত্ব নিজে সামলাল জাভিয়ান।
এই দুদিন জাভিয়ান এক মুহূর্তের জন্যও তান্বীর পাশ থেকে সরেনি। ডক্টরদের দেওয়া ডায়েট চার্ট অনুযায়ী তান্বীকে নিজের হাতে চামচ দিয়ে স্যুপ খাইয়ে দেওয়া, নার্সদের আগেই পরম মমতায় তান্বীর মাথায় ব্যান্ডেজ ড্রেসিং করার সময় তাকে আগলে রাখা, আর রাতে তান্বীর চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে তাকে ঘুম পাড়ানো সবকিছু জাভিয়ান নিজে করল। ফারহান কয়েকবার চেয়েছে বোনের পাশে থাকতে কিন্তু জাভিয়ান কাউকেই এলাও করেনি।
সেদিন বিকেলে তান্বী জাভিয়ানের বুকে মাথা রেখে জানলার ওপারে মেক্সিকোর শান্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখো জাভিয়ান, এতো ঝড়ঝাপটার পর আজ সত্যি একটা নতুন ভোরের আলো পড়েছে। এবার আমরা আমাদের সংসারে ফিরতে পারবো তো?”

জাভিয়ান তান্বীর কপালে একটা গভীর, পবিত্র চুমু খেয়ে তার সেই চেনা মায়াবী গলায় বলল, “হ্যাঁ জিন্নীয়া। আর মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা। হসপিটালের এই সাদা দেয়াল আর ওষুধের গন্ধের চ্যাপ্টার শেষ করে আমরা এবার আমাদের নিজেদের তৈরি করা সেই নতুন জীবনে পাড়ি দেব। যেখানে শুধু তুমি আর আমি থাকব।”
মেক্সিকো সিটি বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা চৌধুরী বংশের সেই ঐতিহ্যবাহী রাজপ্রাসাদ—‘ভিলা এস্পেরেন্জা’র বিশাল রাজকীয় গেটটা আজ অনেকদিন পর আবার খুলে গেল। কালো মার্সিডিজ থেকে যখন জাভিয়ান পরম মমতায় তান্বীর হাত ধরে নামল, তখন পুরো ভিলার পরিবেশটা শান্তিতে ভরে উঠেছিল। করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা জাভিয়ানের মা কার্গো চোধুরী, বাবা সায়েম চৌধুরী এবং চাচা সাইফ চৌধুরী—সবার চোখেই তখন আনন্দের ঝলক। কিন্তু সেই খুশির জোয়ারে এক মুহূর্তের মধ্যে বরফশীতল জল ঢেলে দিল জাভিয়ানের এক গম্ভীর ঘোষণা। বসার ঘরের ঝাড়বাতির নিচে দাঁড়িয়ে জাভিয়ান তান্বীর হাতটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। সে সবার মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা দৃঢ় গলায় বলল—”আপনারা আমাকে আর তান্বীকে এই বাড়িতে ফিরে দেখে খুশি হয়েছেন, তার জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আমি আজ এখানে শুধু তান্বীর আর আমার প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র আর ওর পাসপোর্টটা নিতে এসেছি। আমরা এই ভিলা এস্পেরেন্জায় আর একটা মুহূর্তও থাকব না। আমরা এখান থেকে অনেক দূরে… নিজেদের মতো কোথাও চলে যাচ্ছি।”

জাভিয়ানের মুখ থেকে এই কথা শোনামাত্রই ডাইনিং হলের সেই আনন্দঘন নীরবতা এক ধাক্কায় ভেঙে গেল। জাভিয়ানের বাবা প্রথমে মুখ খুললেন। তিনি তাঁর গম্ভীর, রাশভারী গলায় বললেন “দূরে চলে যাবে মানে? তুমি কি সত্যিই মনে করো এতকিছুর পর তুমি এক সাধারণ মানুষের মতো সংসার করতে পারবে, জাভিয়ান? আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ম আর তার বিষাক্ত অতীত সম্পর্কে আমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না। ওই অন্ধকার দুনিয়ার ছায়া কোনোদিনও পিছু ছাড়ে না।” জাভিয়ান তার বাবার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বিজয়ী হাসি হেসে বললো “আমি ওই জগতের প্রতিটা নিয়মকে নিজের পায়ে পিষে দিয়ে এসেছি, মিস্টার চৌধুরী। আমি আজ থেকে সব ছেড়ে দিয়েছি। এই মেক্সিকোর মাটিতে আজ আর কোনো নাইট রেভেন বেঁচে নেই। আমি এখন শুধুমাত্র তান্বীর হাজবেন্ড—জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী। এর বাইরে আমার আর কোনো পরিচয় নেই, কোনো সাম্রাজ্য নেই। আমার ওই অফিশিয়াল পারফিউম ব্র্যান্ডের যে লিগ্যাল বিজনেসটা আছে, ওটাই আমি দাঁড় করাবো। ওখানকার সৎ উপার্জন দিয়ে আমি আমার ওয়াইফকে নিয়ে সুখে শান্তিতে বাঁচব। আপনাকে আর আমাদের নিয়ে ভাবতে হবে না, কালো জগতের কোনো ছায়া আর আমাদের ছুঁতে পারবে না।”

জাভিয়ানের মা কার্গো আর চাচা সাইফ চৌধুরী এবার জাভিয়ানের দুই হাত ধরে প্রায় কেঁদে উঠলেন। মা ভেজা গলায় বললেন, “প্লিজ জাভি, তুই এভাবে চলে গেলে এই বিশাল বাড়িটা এক নিমেষে শূন্য হয়ে যাবে! আমাদের মার্কোটা আর লুসিয়াটাও নেই… এখন যদি তুইও আমাদের এভাবে ত্যাগ করে চলে যাস, তবে আমরা কাকে নিয়ে বাঁচব?”
জাভিয়ান এক ঝটকায় নিজের হাতটা সরিয়ে নিল। তার চোখে তখন বহু বছরের জমানো অবহেলা আর কষ্টের আগুন। সে অবজ্ঞার সুরে বলল—”এতে কি তোমাদের সত্যিই কিছু যায় আসে, মম? যখন ইন্টারপোল আমাকে খাঁচায় পুরেছিল, যখন আমার নিজের ভাই আমার পিঠে ছুরি মেরেছিল, তখন তো এই চৌধুরী ভিলার কেউ আমার পাশে এসে দাঁড়ায়নি!” ছেলের মুখের এই চরম সত্যের চাবুক খেয়ে সায়েম চৌধুরী নিজের দীর্ঘদিনের অহংকারের বর্মটা এই প্রথম মাটিতে নামিয়ে রাখলেন। চৌধুরী বংশের সেই কঠোর বিজনেস টাইকুন, জাভিয়ানের বাবা এই প্রথম নিজের মুখ ফুটে, অত্যন্ত ভাঙা গলায় বললেন—”আমি… আমি সবকিছুর জন্য তোমার কাছে সরি, জাভিয়ান! আমি একজন বাবা হিসেবে নিজের ছেলেদের চিনতে ভুল করেছিলাম। আমাকে ক্ষমা করে দাও।”

বাবার মুখে ‘সরি’ শব্দটা শুনে জাভিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তার চোখ দুটো এক লহমায় লাল হয়ে গেল। সে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলল “আপনার কোনো ‘সরি’ তেই আমার এই পাথুরে মন গলবে না, মিস্টার চৌধুরী! কারণ আপনার এই একটা সামান্য সরি আমার ভাই রাহিয়ানকে তো আর আমার কাছে ফিরিয়ে এনে দিতে পারবে না! ও আপনার অতিরিক্ত শাসন, টক্সিটিটি আর ইগো অহংকারের বলি হয়েছে। রাহিয়ানের জীবনের দাম আপনার এই সরি-র চেয়ে অনেক বেশি।”
সায়েম চৌধুরী ছেলের এই ক্ষোভের সামনে আর কোনো যুক্তি খুঁজে পেলেন না। তিনি এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচু গলায় বললেন, “ঠিক আছে… থাকো তুমি তোমার এই জেদ নিয়ে। নিজের বাবা-মাকে পর করে যদি সুখী হতে পারো, তবে তাই হও।”

ঠিক তখনই জাভিয়ানের মা ইসাবেলা ধীরপায়ে তান্বীর সামনে এসে দাঁড়ালেন। যে সেদিন তান্বীকে ভুল বুঝেছিলেন, ইভানের কাছে যাওয়ার কারনে তান্বীর পবিত্রতা নিয়ে সন্দেহ করেছিলেন—তিনি আজ তান্বীর দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে কেঁদে ফেললেন। তিনি বললেন, “আমাকে ক্ষমা করে দাও মা তান্বী! আমি নিজের চোখের অন্ধত্বে তোমার ওই পবিত্র ভালোবাসার রূপটা দেখতে পাইনি। তুমি নিজের জীবন বাজি রেখে আমার ছেলেকে ফিরিয়ে এনেছ, আর আমি তোমাকে অপবাদ দিয়েছিলাম। তুমি প্লিজ একটাবার ওকে বোঝাও এই বাড়িতে থাকার জন্য আমি জানি ও তোমার কথা শুনবে।”

তান্বীর নিজের চোখও তখন জলে ভিজে উঠেছে। সে এক পলক জাভিয়ানের দিকে তাকাল। জাভিয়ান তখনো দরজার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে, তার চওড়া পিঠটা রাগে কাঁপছে। কিন্তু তান্বী খুব ভালো করেই জানে, জাভিয়ানের এই রাগ ওপর ওপর; ভেতরের মানুষটা তার পরিবারকে এখনও হয়ত ভালোবাসে। এই ভাঙা পরিবারকে জোড়া লাগানোর দায়িত্ব এবার তান্বী নিজের কাঁধে নিল। সে আলতো করে জাভিয়ানের মায়ের চোখের জল মুছে দিয়ে বলল, “কাঁদবেন না মা, আপনি তো আমারও মা। আপনি ভুল বোঝেননি, পরিস্থিতিটাই তেমন ছিল।” তান্বী এবার ধীরপায়ে হেঁটে গিয়ে জাভিয়ানের পেছনে দাঁড়াল। সে নিজের দুটো নরম হাত বাড়িয়ে জাভিয়ানের শক্ত কোমরটা পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। জাভিয়ানের পিঠে নিজের মুখটা ঠেকিয়ে সে অত্যন্ত আদুরে, শান্ত আর জাদুকরী গলায় বলতে লাগল— “জাভিয়ান… প্লিজ শান্ত হও। রাগ করো না আর।

তুমি না আমাকে প্রমিজ করেছিলে, আমরা আমাদের একটা সুন্দর সংসার বানাবো? দেখো, মা আর বাবা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছেন। চাচা আজ কতটা একাকী। মার্কো ভাইয়া আর লুচি আপা চলে যাওয়ার পর এই বাড়িটা সত্যিই বড্ড একা হয়ে গেছে। তুমি কি পারবে তোমার বাবা-মাকে এই শূন্য প্রাসাদে ফেলে রেখে আমায় নিয়ে সুখে থাকতে? প্লিজ জাভিয়ান… আমার কথা রাখো। আমরা এই ভিলা এস্পেরেন্জাতেই আমাদের সেই ছোট্ট সুখের সংসারটা গড়ে তুলব। আমাদের বাবা মায়ের ছায়াতেই আমরা নতুন করে বাঁচব। প্লিজ রাজি হয়ে যাও…”

তান্বীর সেই পবিত্র স্পর্শ আর তার মুখের শান্ত অনুরোধ এক সেকেন্ডের মধ্যে জাভিয়ানের ভেতরের সেই ক্রুদ্ধ সিংহকে পুরোপুরি শান্ত করে দিল। জাভিয়ান এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে দাঁড়াল। সে তান্বীর চোখের দিকে তাকাল—যে চোখে আজ সারা দুনিয়া জয় করার শান্তি লুকিয়ে আছে।
জাভিয়ান তান্বীর কপালে নিজের ঠোঁটটা ছুঁইয়ে দিয়ে নিজের বাবার দিকে তাকাল। সে গম্ভীর কিন্তু শান্ত গলায় বলল, “শুধু তান্বীর জন্য… ওর এই পবিত্র অনুরোধের জন্য আমি এই বাড়িতে থাকতে রাজি হলাম, মিস্টার চৌধুরী। কিন্তু মনে রাখবেন, ভবিষ্যতে এমন কিছু করবেন না যার কারনে আপনাদেরকে বাবা মা হিসেবে আমার ত্যাগ করতে হয়।”

জাভিয়ানের এই সম্মতির কথা শোনামাত্রই ভিলা এস্পেরেন্জার চারদিকের দেওয়ালে নতুন প্রাণের স্পন্দন জেগে উঠল। দীর্ঘদিনের অন্ধকার আর রক্তের হোলিখেলা শেষ করে, আজ চৌধুরী পরিবার এক ছাদের নিচে এসে দাঁড়াল—এক নতুন ভোরের আলোয়, নতুন এক জীবনের সূচনায়।
ভিলা এস্পেরেন্জায় জাভিয়ান আর তান্বী যখন নিজেদের ঘরটা নতুন করে গুছিয়ে নিচ্ছিল, ঠিক তখনই ভিলার বাইরের রাস্তায় এসে থামল ফারহানের বাইক। বোন সুস্থ হয়েছে এবং সে নিজের স্বামীর সাথে ভিলা এস্পেরেন্জায় ফিরে এসেছে এই খবরটা পাওয়ামাত্রই ফারহান এক সেকেন্ডও দেরি করেনি। সে ঝড়ের বেগে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করেই চিৎকার করে উঠল—”তান্বী! কোথায় তুই? আমার বোন কোথায়?!”
ভাইয়ের গলার আওয়াজ পেয়ে তান্বী সিঁড়ি বেয়ে হন্তদন্ত হয়ে নিচে নেমে এল। ফারহান ছুটে গিয়ে তান্বীকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল। তার চোখ দিয়ে তখন আনন্দের জল গড়িয়ে পড়ছে। সে তান্বীর মুখটা দুহাতে তুলে ধরে বলল, “তুই ঠিক আছিস তো? চল আমার সাথে, এই মেক্সিকোর নরকে তোকে আর এক মুহূর্তও আমি থাকতে দেব না। বাংলাদেশে বাবা-মায়ের কাছে ফিরে চল।”

তান্বী ফারহানের হাত দুটো ধরে পরম শান্তিতে হাসল। সে মাথা নেড়ে বলল, “না ভাইয়া, আমি কোথাও যাব না। আমি আমার স্বামীর কাছেই থাকব। দেখো, আমাদের সব ভুল বোঝাবুঝি শেষ হয়ে গেছে। আমি তো এখন মাত্র আমার এই সংসারটা নিজের হাতে গুছিয়ে নিচ্ছি। তোমার বোন এখন মেক্সিকোর এই ভিলাতেই তার সুখের একটুকরো শান্তির নীড় বানাবে।” ফারহান যখন তান্বীর এই ভালোবাসার জেদের সামনে হার মেনে নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন জাভিয়ানের চোখ গেল ভিলার মূল ফটকের দিকে। সেখানে বাইকের পাশে একাকী দাঁড়িয়ে ছিল লুসিয়া। লুসিয়ার বাবা নিজেই ধীরপায়ে ভিলার বাইরে বেরিয়ে গেলেন। তিনি লুসিয়ার হাত ধরে পরম মমতায় তাকে ঘরের ভেতরে নিয়ে এলেন। ড্রয়িংরুমের মাঝখানে সবাইকে দাঁড় করিয়ে সাইফ চৌধুরী এবার ফারহানের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কিন্তু অত্যন্ত সম্মানিত গলায় বললেন—”ফারহান, তুমি আমার একমাত্র আমায় মেয়েকে সঠিক পথে এনেছো। আমার পরিবারের আরেকটা সন্তানকে অন্ধকার জগত হতে বাঁচিয়েছ।

আর লুসিয়া তোমার পাশে ছায়ার মতো থেকেছে। আমরা পরিবারের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি—তুমি আর লুসিয়া এই ভিলা এস্পেরেন্জাতেই আমাদের সাথে থাকবে। এই বিশাল রাজপ্রাসাদ তোমাদেরও।” ফারহান সাইফ চৌধুরীর এই প্রস্তাব শুনে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই এক গর্বিত বাঙালি যুবকের আভিজাত্য আর আত্মসম্মান তার চোখের মণিতে চকচক করে উঠল। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত বিনীত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল—”আপনার এই মহানুভবতার জন্য ধন্যবাদ, মিস্টার চৌধুরী। কিন্তু আমি অত্যন্ত দুঃখিত। আমি ফারহান, নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কখনোই কোনো মেয়ের বাড়িতে ঘর জামাই হয়ে থাকব না। আমার যা যোগ্যতা আছে, আমি তা দিয়েই নিজের জীবন গড়ব। লুসিয়াকে যদি ভালো রাখতে হয়, তবে ও আমার নিজের বাড়িতে, আমার স্ত্রী হয়েই থাকবে।”

ফারহানের এই তীব্র পুরুষালী অহংকার আর জেদ দেখে লুসিয়ার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে গর্বের হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরপায়ে ফারহানের পাশে এসে দাঁড়াল এবং ফারহানের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো। লুসিয়া সাইফ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে স্প্যানিশ টোনে মিষ্টি বাংলায় বলল—
“ড্যাড! ফারহান ঠিকই বলেছে। আমিও আমার হাজবেন্ডের সাথে, আমার হাজবেন্ডের বাড়িতেই থাকব। ও যেখানে আমাকে নিয়ে যাবে, ওটাই হবে আমার আসল ঘর।”
সাইফ চৌধুরী লুসিয়ার দিকে তাকিয়ে কিছুটা চিন্তিত গলায় বললেন, “তুমি মেক্সিকোর যে বিলাসবহুল আর স্বাধীন পরিবেশে বড় হয়েছ লুসিয়া, বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত বা সাধারণ পরিবেশে সেভাবে তুমি মানিয়ে নিতে পারবে না। এখন আবেগের বশে বলছ, কিন্তু পরের বাস্তবতা অনেক কঠিন।”
লুসিয়া ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে এক অনাবিল বিশ্বাসের হাসি হাসল। তারপর তার বাবার দিকে ঘুরে বলল—

“ড্যাড, আমি কোনো আবেগে ভেসে এই সিদ্ধান্ত নিইনি। আমি এই মানুষটাকে মন থেকে ভালোবেসেছি। আর আমি জানি, আমার ফারহান আমাকে নিজের জানের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। ও আমাকে ওর নিজের দেশে নিজের বাড়িতে যথেষ্ট আগলে রাখবে, আগলে রাখার ক্ষমতা ওর আছে।”
ফারহান এবার সাইফ চৌধুরীর চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার কণ্ঠে তখন এক খাঁটি পুরুষের দায়িত্বশীল সুর। সে বলল—”চিন্তা করবেন না, মিস্টার চৌধুরী। আমি হয়তো আপনার এই ভিলা এস্পেরেন্জার মতো বিশাল রাজপ্রাসাদ লুসিয়াকে দিতে পারব না; কিন্তু আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি—আপনার মেয়ের কোনো ইচ্ছার, কোনো চাহিদার কমতি আমি রাখব না। ওকে আমার জীবনের চেয়েও ভালো রাখব, যথেষ্ট সুখে রাখব।”
ফারহানের এই প্রখর প্রতিজ্ঞা আর লুসিয়ার এই আত্মত্যাগী ভালোবাসা দেখে পুরো ড্রয়িংরুমে থমকে গেলো। জাভিয়ান এগিয়ে এসে ফারহানের কাঁধে হাত রেখে হালকা হাসল, আর তান্বী ছুটে গিয়ে লুসিয়াকে জড়িয়ে ধরল।

সব ঝড়-তুফান, চড়াই উৎরাই আর দীর্ঘদিনের সেই যন্ত্রণাদায়ক দূরত্ব পার করে আজ রাতে জাভিয়ান আর তান্বী সম্পূর্ণ একান্তে, নিজেদের ঘরে। বিছানার নরম চাদরে তান্বী যখন আধশোয়া হয়ে জাভিয়ানের অফিসের নতুন স্পেশাল এডিশনের পারফিউমের সুবাস নিচ্ছিল, ঠিক তখনই জাভিয়ান ধীরপায়ে এগিয়ে এল তার দিকে। এতগুলো দিন নিজের জিন্নীয়াকে হারানোর যে তীব্র ভয়, যে গভীর ক্ষত জাভিয়ানের বুকের ভেতর জমা হয়েছিল, আজ রাতে তান্বীকে এত কাছে পেয়ে তার সব নিয়ন্ত্রণ এক নিমেষে ধুলোয় মিশে গেল। জাভিয়ানের চোখের চাউনিটা এক লহমায় বদলে গিয়ে সেখানে জমা হলো এক তীব্র, অবসেসন। সে তান্বীর ওপর নিজের শরীরের পুরো ভর ছেড়ে দিয়ে তাকে বিছানায় লেপ্টে ধরল। তার চওড়া হাত দুটো তান্বীর কোমরের ভাঁজে শক্ত করে চেপে ধরে সে ফিসফিস করে বলল, “অনেক হয়েছে জিন্নীয়া… আজকে অনেকদিন পর তোমাকে কাছে পেয়েছি আমি জানি তুমি এখনও সুস্থ হওনি কিন্তু আমি নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিনা।”

তান্বীকে নিজের বাহুডোরে জড়িয়ে ধরে জাভিয়ান আজ যেন এক ক্ষুধার্ত সিংহের মতো নিজের সবটুকু নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। তার ঠোঁটের তীব্র ছোঁয়া তান্বীর ঠোঁটে, গলায় আর কাঁধে আছড়ে পড়তে লাগল। তান্বীও নিজের দুই হাত জাভিয়ানের চওড়া পিঠে শক্ত করে চেপে ধরে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিল তার জাভিয়ানের কাছে। দীর্ঘদিনের তৃষ্ণা আর ভালোবাসার এক মধুর বিস্ফোরণ ঘটল সেই নীল আলো আর সুবাস ছড়ানো বিছানায়। অনেক রাতে, ঘড়ির কাঁটা যখন মধ্যরাতের সময়ে, তখন জাভিয়ান তান্বীর কপালে একটা আলতো চুমু দিয়ে বিছানা ছেড়ে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল। ভেতর থেকে শাওয়ার অন করার জলপ্রপাতের মতো শব্দ ভেসে আসতে লাগল। তান্বী বিছানায় শুয়ে শুয়ে চাদরটা গায়ে জড়িয়ে জাভিয়ানের ফিরে আসার অপেক্ষা করছিল। কিন্তু দেখতে দেখতে বেশ অনেকক্ষণ সময় পার হয়ে গেল। শাওয়ারের জলের শব্দ অনবরত হয়েই চলেছে, কিন্তু জাভিয়ানের বের হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।

তান্বীর মনটা এক তীব্র আশঙ্কায় আর ভালোবাসার আকুলতায় অধৈর্য হয়ে উঠল। মেক্সিকোর সেই খাদের স্মৃতি, হসপিটালের সেই নিথর দিনগুলো তার মগজে এখনো কাঁপন ধরায়। সে আর এক মুহূর্তও একা থাকতে পারল না। সে বিছানা ছেড়ে উঠে ধীরপায়ে বাথরুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজাটা পুরোপুরি লক করা ছিল না, সামান্য একটু চাপ দিতেই ভেতরের কুয়াশাচ্ছন্ন গরম বাষ্প এসে ধাক্কা দিল তান্বীর মুখে। ঠিক সেই মুহূর্তে, শাওয়ার বন্ধ করে জাভিয়ান কেবল নিজের কোমরে একটা ধবধবে সাদা তোয়ালে পেঁচিয়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। তার ভেজা চুল বেয়ে জলের ফোঁটাগুলো টপটপ করে আছড়ে পড়ছিল তার উন্মুক্ত, শ্বেতশুভ্র চওড়া বুকের ওপর। সে মাত্রই বাথরুম থেকে বেরোতে যাচ্ছিল। হঠাৎ দরজায় তান্বীকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জাভিয়ান এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই চেনা, এক চিলতে হাসি। তান্বী কিছু মুখে বলার বা লজ্জিত হওয়ার এক ভগ্নাংশ সময় আগেই জাভিয়ান এক গভীর ক্ষিপ্রতায় নিজের ডান হাত বাড়িয়ে তান্বীর নরম হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।

এক তীব্র টানে জাভিয়ান তান্বীকে কুয়াশাচ্ছন্ন বাথরুমের দিকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এল। তান্বী সামলাতে না পেরে সরাসরি আছড়ে পড়ল জাভিয়ানের সেই চওড়া, ভেজা বুকের ওপর। আর ঠিক তার পরের মুহূর্তেই, জাভিয়ান তান্বীর কোমর ধরে তাকে বাথরুমের ঠাণ্ডা, কাঁচের দেয়ালের সাথে সজোরে চেপে ধরল! দেয়ালের সেই ঠাণ্ডা স্পর্শ আর জাভিয়ানের শরীরের তপ্ত ওম একযোগে আছড়ে পড়ল তান্বীর ওপর। জাভিয়ানের দুই হাত তখন তান্বীর মুখের দুপাশে দেয়াল লক করে ফেলেছে। “একসাথে শাওয়ার নিতে চেয়েছিলে জিন্নীয়া?” জাভিয়ান তার গরম নিঃশ্বাস তান্বীর ঠোঁটের ওপর ছেড়ে ফিসফিস করে বলল। তার চোখ দুটো তখন নেশাতুর। “আপনি অনেক দেরি করছিলেন জাভিয়ান… আমি একা—” তান্বীর কথা শেষ হওয়ার কোনো সুযোগই দিল না জাভিয়ান। সে নিজের পুরো অস্তিত্ব দিয়ে তান্বীর ঠোঁটের ওপর ঝুঁকে পড়ল। এক চরম, তীব্র আকুলতায় সে তান্বীর ঠোঁট দুটো নিজের ঠোঁটের গ্রাসে বন্দি করে নিল। দেয়ালের সাথে চেপে ধরে জাভিয়ানের সেই অবাধ্য, গভীর চুম্বন তান্বীর ভেতরের সমস্ত শক্তি কেড়ে নিতে লাগল। বাথরুমের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন বাষ্প আর জলের বিন্দুর মাঝে, একে অপরকে নিজের নিঃশ্বাসে ভরিয়ে দিয়ে তারা হারিয়ে গেল এক অনন্তকালের মধুর রাজ্যে—যেখানে কোনো অন্ধকার জগত নেই, নেই কোনো বিভীষিকা, আছে শুধু দুটো শরীরের এক হয়ে যাওয়ার তীব্র আকুলতা।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বাইরে যখন ফারহান আর লুসিয়া এসে দাঁড়াল, তখন ঢাকার চেনা তপ্ত বাতাস আর কোলাহল তাদের স্বাগত জানাল। মেক্সিকোর সেই বিলাসবহুল জীবন, এতো দিনের ঝড়ঝাপটা আর বিপদের তাড়া খাওয়া দিনগুলোর পর এই চিরচেনা মাটির গন্ধ ফারহানের বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত শান্তি এনে দিল।

কিন্তু বিমানবন্দরের গাড়ি যখন তাদের চিরচেনা সেই মধ্যবিত্ত পাড়ার বাড়ির গেটের সামনে এসে থামল, তখন ফারহানের পা দুটো যেন মাটিতে দেবে যেতে চাইল। মা বাবার অবাধ্য হওয়ার যে অপরাধবোধ, তা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। সে বাড়ির সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়েও ভেতরে যাওয়ার সাহস পাচ্ছিল না। তার বুকটা ভয়ে আর সংকোচে কাঁপছিল। লুসিয়া ফারহানের এই ভেতরের ঝড়টা এক পলকে বুঝতে পারল। সে ফারহানের কাঁপতে থাকা হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে ইশারায় বলল, *‘আমি আছি তো… চলো!’
কলিংবেলের শব্দ শুনে দরজা খুলতেই ফারহানের মা-বাবা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। অনেকদিন পর নিজের ছেলেকে অক্ষত অবস্থায় সামনে দেখে মায়ের চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু ফারহানের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা সেই অপূর্ব সুন্দরী, মেক্সিকান মেয়ে লুসিয়াকে দেখে তারা কিছুটা অবাক আর দ্বিধান্বিত হলেন। যদিও আগেরবার তান্বী জাভিয়ানের সাথে লুসিয়াকে দেখছিলো কিন্তু আজ ফারহানের সাথে ব্যাপারটা তাদের বোধগম্য হলোনা। ফারহান আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে লুসিয়াকে ইশারা করতেই, লুসিয়া সম্পূর্ণ বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে ফারহানের মা বাবাকে সালাম দিলো।
ফারহানের বাবা মা যখন জানতে পারলো লুসিয়া এখন তাদের বাড়ির বউ তখনই ফারহানের মা তড়িঘড়ি করে লুসিয়াকে জড়িয়ে ধরে বুকের সাথে চেপে ধরলেন। বাবাও মেয়ের মতো ভালোবেসে লুসিয়ার মাথায় হাত রেখে দোয়া করে দিলেন। নিজের একমাত্র ছেলের বউ হিসেবে এই বিদেশী, গুণবতী মেয়েটিকে তারা পরম আনন্দে ও হাসিমুখে বরণ করে নিলেন।

ঘরের ভেতরের শান্ত পরিবেশে যখন সবাই বসল, তখন ফারহান নিজের ভেতরের আর কোনো আবেগ ধরে রাখতে পারল না। সে ধপাস করে নিজের মা আর বাবার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। মা-বাবার পা দুটো নিজের দুই হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে সে এক অবোধ শিশুর মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।সে অশ্রুরুদ্ধ গলায় বলতে লাগল*”আমাকে ক্ষমা করে দাও বাবা… আমাকে ক্ষমা করো মা! আমি বাবার আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে, তোমাদের অবাধ্য হয়ে ওই ভয়ঙ্কর অপরাধ জগতে পা রেখেছিলাম। ক্ষমতার লোভে আর পরিস্থিতির চাপে আমি অনেক নোংরা পথ চিনেছিলাম। কিন্তু আমি আজ তোমাদের পায়ের নিচে দাঁড়িয়ে, এই পবিত্র মাটিকে সাক্ষী রেখে কসম খাচ্ছি—আমি আর কোনোদিন… কোনোদিন ওই অন্ধকার জগতে নিজের একটা পাও রাখব না! আমি ওসব নোংরামি চিরতরে ডাস্টবিনে ফেলে এসেছি বাবা।”

ফারহান লুসিয়ার দিকে তাকিয়ে এক বুক গর্ব নিয়ে মা-বাবার উদ্দেশ্যে আরও বলল—”আমি আজ থেকে সম্পূর্ণ সৎ পথে বাঁচব। আমার যা সামান্য যোগ্যতা আছে, তা দিয়ে এই দেশেই ছোটখাটো কোনো কাজ বা ব্যবসা করে হালাল উপার্জনে সংসার চালাব। লুসিয়াকে নিয়ে আমি খুব সাধারণ একটা জীবন কাটাব মা। তোমরা শুধু আমাকে একটু দোয়া করো দাও, যাতে আমি আর কোনোদিন পথ না হারাই আমাকে কখনো অভিশাপ দিওনা।”
ছেলের মুখের এই খাঁটি অনুশোচনা আর সৎ পথে ফেরার এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা শুনে বাবার চোখও আজ ভিজে উঠল। তিনি ফারহানকে মাটি থেকে টেনে তুলে নিজের চওড়া বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। মা ফারহান আর লুসিয়া—দুজনের হাত একসাথে এক করে দিয়ে বললেন, “তোরা সুখে থাক বাবা। সৎ পথের উপার্জনের চেয়ে বড় রাজত্ব এই দুনিয়ায় আর কিচ্ছু নেই।” জানলার ওপারে তখন ঢাকার আকাশে এক নতুন, স্নিগ্ধ সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়েছে। ভালোবাসার মানুষের হাত ধরে ফারহান অবশেষে খুঁজে পেল তার জীবনের আসল ঠিকানা।

দেখতে দেখতে বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেল। ভিলা এস্পেরেন্জার প্রতিটি কোণায় এখন শুধু শান্তি আর হাসিমুখের মেলা। এর মাঝেই জাভিয়ানের কাছে একটা অফিশিয়াল আপডেট এসেছিল যে, ‘লা লোমা মেন্টাল অ্যাসাইলাম’-এর চারদালের ভেতরে কড়া সিকিউরিটিতে ইভানের মানসিক চিকিৎসা চলছে। সে সম্পূর্ণ উন্মাদ হয়ে নিজের দুনিয়াতেই বন্দি। এই খবর পাওয়ার পর জাভিয়ান আর তান্বী পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হয়ে গিয়েছিল। আজ অনেকদিন পর তান্বী মনের সুখে নিজের ঘর থেকে বেরিয়েছে। জাভিয়ান এখন তার পারফিউম ব্র্যান্ডের মেইন অফিসে কাজের দায়িত্বে ব্যস্ত। তান্বী আজ পুরো সকালটা রান্নাঘরে কাটিয়ে জাভিয়ানের জন্য একদম সারপ্রাইজ বাঙালি কিছু স্পেশাল আইটেম রান্না করেছে। মেক্সিকোর কালচারে বড় হওয়া জাভিয়ান এখন তার জিন্নীয়ার হাতের বাঙালি খাবারের এমন ভক্ত যে, প্রতিদিন তান্বীর হাতের রান্না না পেলে তার চলেই না।

গরম ভাত, ইলিশ মাছের দোপেঁয়াজা আর মাংসের বাটিগুলো একটা সুন্দর লাঞ্চ বক্সে গুছিয়ে নিয়ে তান্বী ভিলার নিজস্ব লাক্সারি গাড়িতে করে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। কিন্তু নিয়তি বোধহয় অলক্ষ্যে হাসছিল। মেক্সিকো সিটির হাইওয়ের মাঝামাঝি আসতেই হঠাৎ জাভিয়ানের বাড়ির গাড়িটার ইঞ্জিন জ্যাম হয়ে বিকট শব্দ করে মাঝরাস্তায় বন্ধ হয়ে গেল। ড্রাইভার অনেক চেষ্টা করেও গাড়ি স্টার্ট করতে পারল না। দুপুরের লাঞ্চের সময় পার হয়ে যাচ্ছে দেখে ড্রাইভার অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে বলল, “ম্যাম, গাড়ি ঠিক হতে সময় লাগবে। আমি আপনাকে একটা উবার ক্যাব বুক করে দিচ্ছি, আপনি অফিসে চলে যান। আমি গাড়ি নিয়ে পরে আসছি।”

তান্বী আর কোনো উপায় না দেখে রাজি হলো। কয়েক মিনিটের মধ্যে একটা কালো রঙের সাধারণ উবার কার এসে দাঁড়াল। তান্বী পেছনের সিটে গিয়ে বসল। চালকের মাথায় একটা কালো ক্যাপ আর মুখে মাস্ক পরা ছিল, যা মেক্সিকোর সাধারণ উবার চালকদের ক্ষেত্রে খুবই স্বাভাবিক। গাড়ি চলতে শুরু করল। কিন্তু মিনিট দশেকের মাথায় তান্বী জানলা দিয়ে তাকিয়ে হঠাৎ লক্ষ্য করল—চারদিকের চেনা বহুতল ভবনগুলো হারিয়ে গিয়ে রাস্তাটা কেমন যেন জনমানবহীন, জঙ্গল ঘেরা একটা নির্জন হাইওয়ের দিকে এগিয়ে চলেছে।
তান্বীর বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় ধক করে উঠল। সে সোজা হয়ে বসে চালকের উদ্দেশ্যে বলল, “এক্সকিউজ মি! আপনি এদিকে কোথায় যাচ্ছেন? অফিসের রাস্তা তো সম্পূর্ণ ওদিকে ছিল! আপনি রং রুটে যাচ্ছেন, গাড়ি ঘোরান!” চালক কোনো জবাব দিল না। সে গাড়ির স্পিড আরও বাড়িয়ে দিল।

“হেই শুনছেন না আমার কথা?! আমি বলছি গাড়ি থামান! স্টপ দ্য কার!” তান্বী এবার প্রচণ্ড ভয় পেয়ে চিৎকার করতে লাগল। কিন্তু গাড়ির চাইল্ড লক অন থাকায় সে ভেতর থেকে দরজা খোলারও কোনো সুযোগ পাচ্ছিল না। তান্বী যখন পাগলের মতো দরজায় আঘাত করছে, ঠিক তখনই সামনের চালক অত্যন্ত ধীর গতিতে নিজের মাথার ক্যাপ আর মুখের মাস্কটা টেনে খুলে ফেলল। তারপর সে গাড়ির ভেতরের লুকিং গ্লাসের দিকে নিজের চোখ দুটো তুলে তাকাল। আয়নার সেই চেনা চোখের মণি আর পৈশাচিক চিলতে হাসিটা দেখামাত্রই তান্বীর গলার আওয়াজ এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল! তার পুরো শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে কাঁপতে লাগল।
ইভান…! মেইনস্ট্রোম!

যে মানুষকে মেন্টাল অ্যাসাইলামের অন্ধকার সেলে থাকার কথা, সে আজ উবারের চালক হয়ে তার সামনে জ্যান্ত দাঁড়িয়ে! অ্যাসাইলামের সেই ডাক্তারদের চোখ ফাঁকি দিয়ে, নাকি নিজের ডার্ক ওয়েবের শেষ ক্ষমতা খাটিয়ে সে সেলের খাঁচা ভেঙে আবার বেরিয়ে এসেছে তা ভাবার সময়ও তান্বী পেল না। গাড়িটা তীব্র ব্রেক চেপে মেক্সিকোর এক ঘন, আদিম জঙ্গলের সামনে এসে থামল। চারদিক একদম নিঝুম, শুধু বুনো বাতাসের শব্দ। “জাভিয়ান… বাঁচাও আমাকে!” তান্বী পাগলের মতো উইন্ডো গ্লাস ভাঙার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না।
ইভান অত্যন্ত শান্ত, ধীরপায়ে গাড়ি থেকে নেমে এল। তার পরনে অ্যাসাইলামের সেই জ্যাকেট নেই, আছে সেই পুরোনো ব্ল্যাক মাফিয়া কোট। সে গাড়ির পেছনের দরজাটা এক ঝটকায় খুলে ফেলল।

“অনেকদিন পর দেখা হলো, মাই সোলফ্লেম…” ইভানের কণ্ঠস্বরটা নরকের কোনো পিশাচের মতোই শোনাল। সে কোনো দয়া বা দ্বিধা না করে, এক বন্য পশুর মতো তান্বীর কাঁপতে থাকা নরম হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। তান্বী চিৎকার করার আগেই, ইভান তাকে গাড়ি থেকে এক তীব্র টানে হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে বের করে নিয়ে চলল সেই গভীর, অন্ধকার জঙ্গলের ভেতরের দিকে। লাঞ্চ বক্সটা ছিটকে পড়ে রইল গাড়ির মেঝেতে।

মেক্সিকোর আকাশ চিরে তীব্র গতিতে ওপরে উঠে যাচ্ছে ইভানের ব্যক্তিগত সেই কুচকুচে কালো প্রাইভেট জেট। পাইলটের আসনে স্বয়ং ইভান, তার চোখ ধূসর দুটোতে তখন রক্তের লাল আভা। আর তার ঠিক পাশের কো-পাইলটের সিটে দুই হাত শিকল দিয়ে লক করে বসিয়ে রাখা হয়েছে তান্বীকে। বিমানের ইঞ্জিনের বিকট গর্জন আর চারদিকের মেঘের আনাগোনার মাঝে ককপিটের ভেতরের পরিবেশটা এক পরম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো। জেট বিমানটি মেক্সিকোর সীমানা পেরিয়ে কোন অজানা দিগন্তের দিকে ছুটে চলেছে, তা তান্বীর জানা নেই। সে নিজের অবশ হয়ে আসা হাত দুটো নাড়ানোর চেষ্টা করে ভাঙা গলায় বারবার মিনতি করতে লাগল—”প্লিজ ইভান! খোদার দোহাই লাগে আমাকে ছেড়ে দিন! আপনার পায়ে পড়ছি, গাড়ি থামিয়ে যেমন আমাকে তুলে এনেছেন, কোনো একটা এয়ারপোর্টে এই বিমান ল্যান্ড করান। আমাকে আমার জাভিয়ানের কাছে ফিরে যেতে দিন…”

ইভান জেটের ইয়োকটা শক্ত করে ধরে এক পৈশাচিক হাসি হাসল। সে ঘাড় ঘুরিয়ে তান্বীর দিকে তাকিয়ে অবজ্ঞার সুরে বলল—”ভেবেছিলে আমাকে ধোঁকা দেবে, তান্বী? মেক্সিকোর পান্তেওন কবরস্থানে দুটো মিথ্যা কবর বানিয়ে, সেখানে জন্ম-মৃত্যুর তারিখ লিখে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিলেই মেইলস্ট্রোমকে ফাঁকি দেওয়া যায়?! ওই খবর আমার কানে পৌঁছাবে না? আমি তোমার জন্য উন্মাদের মতো অ্যাসাইলামের অন্ধকার সেলে ছটফট করে মরছি, আর তুমি… তুমি মনের সুখে ওই জাভিয়ানের জন্য বাঙালি খাবার রান্না করে সংসার করছো? হ্যাঁ?! কেন তান্বী, কেন? কেন তুমি ওর সাথে ওই কপার ক্যানিয়নের খাদে মরতে পর্যন্ত গেলে? এত ভালোবাসো ওকে?!”
তান্বীর চোখ দিয়ে তখন অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু তার কণ্ঠস্বরে জাভিয়ানের প্রতি থাকা ভালোবাসার সেই চিরন্তন জেদটা এক ফোঁটাও কমল না। সে ইভানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল—”এই কথাটা আপনি এতদিনে বুঝতে পারলেন, ইভান? হ্যাঁ! আমি সবসময় জাভিয়ানকে ভালোবাসি, বাসবো এবং মৃত্যুর পরেও বাসবো! আপনি আমাকে মুক্তি না দিলে এই আকাশ থেকেই ফেলে দিন, মৃত্যু দিয়ে দিন আমাকে! তবুও আমার মৃত্যুর সময়ে এই চোখের শেষ স্মৃতিটাও শুধু আমার জাভিয়ানেরই থাকবে। প্লিজ ইভান, আমাকে যেতে দিন…”

“না তান্বী!” ইভান হঠাৎ গর্জে উঠে বিমানের স্পিড আরও বাড়িয়ে দিল, “আমি তোমাকে কোথাও যেতে দেব না। আমি তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি আমার সাথে মরতে!”
তান্বী স্তব্ধ হয়ে গেল। তার বুকটা ভয়ে কেঁপে উঠল, “আপনার সাথে মরতে… মানে?!”
ইভানের চোখের কোণ দিয়ে এবার এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তার চেহারায় সেই খুনে মাফিয়া কিং আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক পরম একাকী, অবহেলিত শিশুর রূপটা বেরিয়ে এল। সে ইয়োকে এক হাত চাপড়ে হাহাকার করে বলতে লাগল—”মানে খুব সহজ তান্বী! কেন… কেন এই দুনিয়ায় কেউ আমাকে ভালোবাসেনি বলতে পারো? কোনোদিন কেউ আমাকে একটু আগলে রাখেনি?! আমার নিজের বাবা আমাকে জারজ বলে ছোটবেলায় অবহেলা করে জাস্ট একটা কুকুরের মতো দূরে ঠেলে দিয়েছিল। অথচ আমার ওই আপন ভাইবোন মার্কো আর ওই লুসিয়া… ওরা চৌধুরী ভিলার রাজপ্রাসাদে কত সুন্দর, বিলাসবহুল জীবন কাটিয়েছে! আর আমি? আমি আর আমার মা পথে পথে ঘুরে, প্রতিটা ক্ষণ মৃত্যুর সাথে লড়াই করে আজ এই ডার্ক ওয়ার্ল্ডের মেইলস্ট্রোম হয়েছি আমি !”

ইভান পুনরায় ড্যাশবোর্ডে লাথি মেরে বলতে লাগল—”এরপর আমার নিজের মা… ইসাবেলা! সে-ও যখন দেখল আমি তোমার জন্য পাগল হয়ে গেছি, আমি জাভিয়ানের ক্ষতি করব, তখন সে নিজের ছেলেকে সাপোর্ট না করে উল্টো আমাকে ইন্টারপোলের কাছে ধরিয়ে দিতে চাইল! নিজের মায়ের কাছ থেকেও আমি বেইমানি পেয়েছি, তান্বী! তোমাকে আমি প্রথম দেখায় ভালোবেসেছিলাম, অথচ তুমি… সে তুমিও অন্য কারও জন্য নিজের জীবন দিতে রাজি?!”
তান্বী ইভানের এই ভেতরের ক্ষতটা দেখে কিছুটা নরম হলো। সে তার কান্না ভেজা গলায় বোঝানোর চেষ্টা করে বলল—

“দেখুন ইভান, আপনি অতীতকে আঁকড়ে ধরে নিজের জীবনটা শেষ করবেন না। আমার থেকেও অনেক বেটার, অনেক ভালো মনের কাউকে আপনি লাইফে পাবেন। কেউ না কেউ আপনার জীবনে আসবে, যে আপনাকে অনেক ভালোবাসবে, আপনার এই একাকীত্ব দূর করবে। আপনিও আবারও তাকে ভালোবাসতে পারবেন…”
“শাট আপ! একদম চুপ করো!” ইভান রেগে ধমক দিয়ে ককপিটের ভেতর চিত্কার করে উঠল। তার চোখ দুটো সাইকোর মতো চকচক করে উঠল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল—”তোমার কী মনে হয় তান্বী? আমি প্রথম দেখায় তোমার প্রেমে পড়েছি? তুমি আমার সাধারণ কোনো ভালোলাগা বা ভালোবাসা? নো ওয়ে! তুমি আমার ভালোবাসা নও তান্বী… তুমি আমার অবসেশন! আমার তীব্র আসক্তি, বোঝো সেটা?”
ইভান বিমানটিকে এক চরম বিপজ্জনক বাঁক খাইয়ে দিয়ে তান্বীর মুখের একদম কাছে নিজের মুখটা এনে ফিসফিস করে বলল—”এই বোকা মেয়ে, দ্বিতীয়বার প্রেমে পড়া যায়, দ্বিতীয়বার কাউকে ভালোবাসাও যায়… কিন্তু করো প্রতি যদি একবার এই আসক্তি তৈরি হয়ে যায় না, তবে সেই আসক্তি মানুষের মৃত্যুর আগেও শেষ হয় না! তুমি আমার সেই আসক্তি, যাকে আমি বেঁচে থাকতে না পেলে… এই আকাশেই নিজের সাথে পুড়িয়ে ছাই করে দেব!”

বিমানের ড্যাশবোর্ডে তখন লাল আলো জ্বলতে শুরু করেছে, আল্টিমিটারের কাঁটা নির্দেশ করছে তারা এক আত্মঘাতী উচ্চতার দিকে এগিয়ে চলেছে।
মেক্সিকো সিটির চৌধুরী কর্পোরেশনের সেই সুবিশাল কনফারেন্স রুমে তখন এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিটিং চলছিল। প্রায় কয়েক কোটি টাকার একটা ইন্টারন্যাশনালি প্রজেক্ট সাইন হওয়ার ঠিক আগমুহূর্ত। টেবিলে কলম ছোঁয়ানোর ঠিক আগেই জাভিয়ানের ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। স্ক্রিনে বাড়ির ড্রাইভারের নাম। জাভিয়ান ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ড্রাইভার কাঁপাকাঁপা গলায় জানাল যে, ম্যাম বাড়ি থেকে লাঞ্চ বক্স নিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন প্রায় এক ঘণ্টা আগে। কিন্তু মাঝরাস্তায় গাড়ি নষ্ট হওয়ায় তাকে একটা উবার ক্যাবে তুলে দেওয়া হয়েছে। এতক্ষণ হয়ে গেলেও তান্বী অফিসে পৌঁছায়নি দেখে ড্রাইভার নিজেই উবার চালকের নাম্বারে এবং তান্বীর নাম্বারে অনবরত কল দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু দুটো ফোনই সম্পূর্ণ নট রিচেবল! এক ঘণ্টা! বাড়ি থেকে অফিসের দূরত্ব সর্বোচ্চ বিশ মিনিটের। জাভিয়ানের তীক্ষ্ণ মগজ এক সেকেন্ডে জানান দিল—কিছু একটা ঘটেছে। সামনে রাখা কোটি টাকার সেই প্রজেক্টের ফাইল, আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের উপস্থিতি সবকিছু এক নিমেষে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে জাভিয়ান চেয়ার ছেড়ে ঝড়ের বেগে উঠে দাঁড়াল। ক্লায়েন্টদের দিকে তাকানোর প্রয়োজনও সে মনে করল না। সে কনফারেন্স রুম থেকে বেরিয়ে আসার ঠিক পরপরই তার পার্সোনাল সিকিউরিটি হেড হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে ল্যাপটপটা সামনে ধরল—”স্যার! লা লোমা মেন্টাল অ্যাসাইলাম থেকে ইভান… আই মিন মেইলস্ট্রোমের পালানোর খবর এসেছে! ওখানকার সিকিউরিটি কোড হ্যাক করে ও ভোররাতেই উধাও হয়েছে!”

ইভানের নামটা শোনামাত্রই জাভিয়ানের চোখের মণি দুটো কুচকুচে কালো থেকে হিংস্র লাল রঙে রূপ নিল। কিছুদিনের সেই শান্ত, সংসারী জাভিয়ান এক সেকেন্ডে হারিয়ে গেল। মেক্সিকোর আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই অন্ধকার সম্রাট, অপ্রতিরোধ্য ‘নাইট রেভেন’ আবার জেগে উঠল তার পূর্ণ রুদ্রমূর্তি নিয়ে!
জাভিয়ান তার গাড়িতে গিয়ে বসামাত্রই মেক্সিকোর পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্কে তার হুকুম জারি হয়ে গেল। সে হাড়হিম করা গলায় তার বাহিনীকে নির্দেশ দিল—”লকডাউন এভরিথিং! মেক্সিকোর প্রতিটা বর্ডার, প্রতিটা হাইওয়ে, বিমানবন্দর আর সমুদ্রবন্দর এই মুহূর্তে অবরুদ্ধ করো! মাছি গড়ার ক্ষমতাও যেন কারও না থাকে। জাভিয়ানের জিন্নীয়াকে যে হাত দিয়েছে, সে যেন মেক্সিকোর মাটি থেকে জীবিত বের হতে না পারে!”

একদিকে পুরো মেক্সিকো সিটি যখন অবরুদ্ধ হয়ে গেল, অন্যদিকে জাভিয়ান তার সিক্রেট বেসমেন্টের ডার্ক ওয়েবের মেইন সার্ভার রুমে প্রবেশ করল। তার দক্ষ হ্যাকার টিম এবং সে নিজে মিলে মেক্সিকোর প্রতিটা সিসিটিভি ক্যামেরা, উবারের জিপিএস ট্র্যাকার আর স্যাটেলাইট ডাটা অনবরত স্ক্যান করতে লাগল। অবশেষে, তীব্র খাটুনির পর ইভানের শেষ ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টটা ট্র্যাপড হলো। স্ক্রিনে একটা প্রাইভেট জেটের সিগন্যাল ব্লিংক করে উঠল। ইভানের নিজস্ব হ্যাকিং কোড ব্যবহার করে একটা কালো প্রাইভেট জেট মেক্সিকোর একটা সিক্রেট রানওয়ে থেকে মাত্র কিছুক্ষণ আগে টেক-অফ করেছে, যার ভেতরে রয়েছে তান্বী!
জেটের রুট ট্র্যাক করতেই দেখা গেল সেটা মেক্সিকোর আকাশসীমা পেরিয়ে এক বিপজ্জনক সমুদ্রের ওপর দিয়ে কোন এক অজানা দ্বীপের দিকে ছুটে চলেছে।

জাভিয়ান তার জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়তে প্রস্তুত। সে তার ব্ল্যাক লেদার জ্যাকেটটা গায়ে জড়িয়ে, কোমরে জোড়া রিভলভার লক করে রানওয়ের দিকে এগিয়ে গেল। ইভানের এই আত্মঘাতী চালের জবাব দিতে জাভিয়ান আজ মেক্সিকোর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তির মহড়া নামাল। সে নিজে একটা অত্যাধুনিক, সুপারসনিক যুদ্ধ জেটের পাইলটের আসনে গিয়ে বসল। তার পেছনে আকাশে ডানা মেলল আরও কয়েকটা হাই-স্পিড প্রাইভেট জেট। শুধু আকাশেই নয়, নিচে সমুদ্রের বুক চিরে তীব্র গতিতে ধেয়ে চলল আন্ডারওয়ার্ল্ডের অত্যাধুনিক ফাইটার জাহাজ আর স্পিডবোটের বিশাল বহর। আর উপকূলে প্রস্তুত রাখা হলো শত শত ব্ল্যাক কার আর সাঁজোয়া গাড়ির স্কোয়াড!

আকাশে প্রাইভেট জেটের গর্জন, নিচে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ আর মাটির বুকে শত শত টায়ারের গর্জন—সব মিলিয়ে নাইট নাইট রেভেন আজ পুরো মেক্সিকোকে কাঁপিয়ে দিয়ে ইভানের পেছনে ধেয়ে চলেছে। জাভিয়ান জেটের স্টিয়ারিং হুইলটা শক্ত করে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “ইভান… তুই আমার সাম্রাজ্য ভাঙার চেষ্টা করেছিস, আমাকে জেলে পাঠিয়েছিস আমি তোকে ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু তুই আজ আমার কলিজায় হাত দিয়েছিস। এই মাঝ আকাশেই তোকে আমি এমন শাস্তি দেব, যা আন্ডারওয়ার্ল্ডের কেউ কোনদিন দেখেনি!”
মেক্সিকোর উত্তাল নীল আকাশের বুক চিরে ধেয়ে আসছিল জাভিয়ানের ত্রিমুখী ফাইটার জেটের বহর। দূর থেকে রাডারে আর খালি চোখে ইভানের সেই কালো প্রাইভেট জেটটিকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাতই জাভিয়ানের কলিজা শুকিয়ে গেল, তার বুকের ভেতরটা এক তীব্র আতঙ্কে মোচড় দিয়ে উঠল—সামনের কালো জেটটি সোজা পথে না চলে মাঝআকাশেই কেমন মাতালের মতো দিকবিদিকশূন্য হয়ে দুলতে শুরু করেছে! ককপিটের ড্যাশবোর্ডে তখন লাল আলোর সাইরেন তীব্র শব্দে ডেকে চলেছে। ইভান বিমানের জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে এক বিষাদময় হাসি হাসল। সে তান্বীর দিকে ঘুরে শান্ত গলায় বলল—”তোমার স্বামী ‘নাইট রেভেন’ তো এতক্ষণে পুরো মেক্সিকোতে অবরুদ্ধ লাগিয়ে দিয়েছে, তান্বী! দেখেছো… ওই দেখো, দূর আকাশ চিরে ওর ফাইটার জেটগুলো আমাদের দিকেই ধেয়ে আসছে।”

তান্বী জানলা দিয়ে জাভিয়ানের জেটের লোগো দেখতে পেয়ে জানলার কাচে হাত রেখে ডুকরে কেঁদে উঠল, “জাভিয়ান…! ইভান, আমি হাত জোড় করছি, আমাকে যেতে দিন প্লিজ! ও এসে গেছে, ও আপনাকে আস্ত রাখবে না…”
ইভান কোনো কথা না বলে কো-পাইলটের সিটের নিচে রাখা একটা ইমার্জেন্সি বক্স টেনে বের করল। সেখান থেকে একটা অত্যাধুনিক মিলিটারি প্যারাসুট বের করে সে নিজ হাতে তান্বীর পিঠে আর বুকে স্ট্র্যাপ দিয়ে বাঁধতে শুরু করল। তান্বী স্তব্ধ হয়ে জিজ্ঞেস করল, “এসব কী করছেন আপনি?”
ইভান বিমানের অটো-পাইলট সুইচটা অফ করে দিয়ে কন্ট্রোল প্যানেলের একটা লাল লিভার টেনে দিল। তারপর অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলল—”এই জেট আর মাত্র ১০ মিনিট পরেই মাঝআকাশে ক্র্যাশ করবে, তান্বী!”
“কী?!” তান্বী চমকে উঠে চিৎকার করে উঠল, “না! খোদার দোহাই লাগে এটা করবেন না! প্লিজ বিমানটা ল্যান্ড করুন! আপনি এটা করতে পারেন না!”

“ডোন্ট ওয়ারি সোলফ্লেম,” ইভান তান্বীর প্যারাসুটের শেষ লকটা আটকে দিয়ে বলল, “বিমানের এক্সিট ডোরটা হাইড্রোলিক প্রেসারে আর ঠিক দুই মিনিট পর এমনিতেই খুলে যাবে। বাতাস তোমাকে টেনে বাইরে নিয়ে যাবে, আর একটু পরেই তোমার প্যারাসুট নিজে থেকেই ওপেন হয়ে যাবে। তুমি নিরাপদে ফিরে যাবে।”
তান্বী এবার পুরোপুরি বুঝতে পারল ইভানের আত্মঘাতী পরিকল্পনা। সে আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আপনি কী বলতে চাইছেন ইভান? আপনি নিজে লাফ দেবেন না? প্লিজ ল্যান্ড করুন!”
ইভান বিমানের স্টিয়ারিং হুইলটা এক ঝটকায় ছেড়ে দিতেই জেটটি উল্টোপাল্টা চলতে শুরু করল, ড্যাশবোর্ডের ভেতরের তারগুলো শর্ট সার্কিট হয়ে ধোঁয়া বের হতে লাগল। ইভান ভাঙা গলায় বলল, “দেরি হয়ে গেছে তান্বী… আর সম্ভব নয়। মেকানিজম অলরেডি লকড!”

ঠিক তখনই তান্বীর নজর গেল ককপিটের এক কোণে পড়ে থাকা আরেকটি স্পেয়ার (অতিরিক্ত) প্যারাসুটের ওপর। ইভান ততক্ষণে তান্বীর হাতের লোহার শিকলের লকটা খুলে দিয়েছে। হাত দুটো মুক্ত হওয়ামাত্রই তান্বী সেই দ্বিতীয় প্যারাসুটটা কুড়িয়ে নিয়ে ইভানের বুকের সামনে ধরল। সে কেঁদে কেঁদে অনুরোধ করতে লাগল—”প্লিজ ইভান! এই প্যারাসুটটা আপনি পরে নিন!”
ইভান তান্বীর চোখের দিকে তাকাল। তার সেই সাইকো চোখে এখন কোনো হিংস্রতা ছিল না, ছিল এক মহাসমুদ্রের মতো ক্লান্তি। সে মৃদু হেসে বলল, “আমাকে বাঁচাতে চাইছো, তান্বী? তাহলে আমার সাথে একসাথে মরে যাও!”

“না… না!” তান্বী আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। সে দুই হাতে ইভানের ব্ল্যাক কোটের কলারটা শক্ত করে চেপে ধরে উন্মাদের মতো ঝাঁকাতে লাগল। তার চোখের জল ইভানের কোটের কাপড়ে গিয়ে মিশে যাচ্ছিল। সে চিৎকার করে বলতে লাগল—”আমি আপনাকে মরতে দেব না! আমি আপনার পায়ে পড়ছি ইভান, প্লিজ এই প্যারাসুটটা পড়ে নিন! প্লিজ নিজের ওপর দয়া করুন!”
ইভান তান্বীর এই আকুলতা দেখে এক পরম তৃপ্তির হাসি হাসল। সে তান্বীর কাঁদো কাঁদো মুখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ধীর, ভারী গলায় বলল—”জানো তান্বী… আমি জীবনে অনেক পাপ করেছি, অনেক অন্যায় করেছি, অনেক মানুষের রক্তে নিজের হাত রাঙিয়েছি। কিন্তু আজ প্রকৃতির বিচার দেখো, আমি শাস্তি ঠিক সেখানে এসেই পেয়েছি—যেখানে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ ছিলাম! আমার ভালোবাসা কোনো বেইমানি ছিল না সোলফ্লেম… আমার এই অবসেসন, আমার এই ভালোবাসা বিন্দুমাত্র মিথ্যে ছিল না!”

তান্বী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে মাথা নেড়ে বলল, “আমি জানি… আমি আপনার সব কষ্ট বুঝতে পারছি ইভান! আমি অনুরোধ করছি, আপনার পায়ে পড়ছি… প্লিজ এই শেষ কথাটুকু রাখুন, প্যারাসুটটা পরে নিন!”
বিমানের অ্যালার্ম তখন শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছে, আর মাত্র কয়েকটা সেকেন্ড, তারপরই খুলে যাবে বিমানের সেই মরণদ্বার। আর বহুদূরে ফাইটার জেটের ককপিটে বসে জাভিয়ান তার জিন্নীয়াকে এই জ্বলন্ত বিমান থেকে উদ্ধার করার জন্য নিজের গতি সর্বোচ্চ সীমায় বাড়িয়ে দিয়েছে।
ককপিটের হাইড্রোলিক এক্সিট ডোরটা তীব্র বাতাসে এক বিকট শব্দে খুলে গেল। বাইরের হিমশীতল হাওয়া আর মেঘের দল হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে ওলটপালট করে দিল সবকিছু। ড্যাশবোর্ডের আগুন আর ধোঁয়ার মাঝে ইভান শেষবারের মতো তাকাল তান্বীর ক্রন্দনরত মুখটার দিকে। তার ঠোঁটের কোণে তখন এক অদ্ভুত, শান্ত তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো।

“ভালো থেকো, আমার সোলেফ্লেম…তোমার প্রতি আমার অবসেসন চিরদিনের।” কথাটা শেষ করেই ইভান কোনো দয়া বা দ্বিধা না করে, নিজের পুরো শক্তি দিয়ে তান্বীর দুই কাঁধে এক তীব্র ধাক্কা মারল!
“জাভিয়ান…!” তান্বীর বুকফাটা আর্তনাদ আকাশের বুকে মিলিয়ে গেল। সে ছিটকে পড়ল প্রাইভেট জেটের বাইরে, মেক্সিকোর শূন্য আকাশে। তীব্র বাতাসের টানে সেকেন্ডের মধ্যে তার পিঠের স্বয়ংক্রিয় প্যারাসুটটি এক বিশাল সাদা ছাতার মতো ডানা মেলে খুলে গেল। তান্বী শূন্যে ঝুলতে ঝুলতে ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখল—ইভানের সেই জ্বলন্ত কালো জেটটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ক্রমশ নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। এদিকে নিচে সমুদ্রের বুকে তখন প্রলয় নেমে এসেছে। জাভিয়ান নিজের ফাইটার জেট থেকে রাডারে দেখতে পেয়েছিল যে তান্বী আকাশ থেকে প্যারাসুট নিয়ে ফ্রি ফল করছে। সে এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে তার হাই-স্পিড মিলিটারি হেলিকপ্টার সাগরের বুকে নামিয়ে আনল।
হেলিকপ্টারটি পুরোপুরি ল্যান্ড করারও সময় ছিল না। সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের ওপর হেলিকপ্টারটি স্থির হতেই, জাভিয়ান নিজের জীবনের পরোয়া না করে এক ঝটকায় লাফিয়ে পড়ল নিচে চলতে থাকা একটা স্পিডবোটের ওপর!

“স্পিড বাড়াও! ফুল থ্রোটল!” জাভিয়ান বাঘের মতো গর্জে উঠল।
স্পিডবোটের ড্রাইভার সর্বোচ্চ গতিতে বোটটি ছুটিয়ে দিল ঠিক সেই পয়েন্টে, যেদিকে তান্বীর প্যারাসুটটি বাতাসের টানে নেমে আসছিল। জাভিয়ানের চোখ দুটো তখন আকাশের দিকে স্থির। তার কলিজা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, বুকের ভেতরটা পাগলের মতো কাঁপছে। সে নিজের দুই হাত ওপরের দিকে বাড়িয়ে স্পিডবোটের একদম প্রান্তে গিয়ে দাঁড়াল।
বাতাসের গতিতে তান্বী যখন সমুদ্রের জলের ঠিক কয়েক ফুট ওপরে এসে পৌঁছেছে, প্যারাসুটের দড়ি ছিঁড়ে সে যখন সাগরের নোনা জলে তলিয়ে যাবে—ঠিক সেই ভগ্নাংশ সেকেন্ডে জাভিয়ান এক প্রখর ক্ষিপ্রতায় নিজের চওড়া দু হাত বাড়িয়ে দিল। ঠিক জলের ওপর আছড়ে পড়ার আগেই, জাভিয়ান তান্বীর কোমর আর পিঠ শক্ত করে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল! তান্বী সাগরের জলে নয়, সরাসরি আছড়ে পড়ল তার সেই নিরাপদ, তপ্ত আর পাথুরে বুকের ওপর।

জাভিয়ান তান্বীকে নিজের বুকের সাথে একদম পিষে ধরে স্পিডবোটের মেঝেতে বসে পড়ল। আর ঠিক তার পরের সেকেন্ডেই—মাঝআকাশে এক প্রলয়ঙ্কারী, কান ফাটানো বিকট শব্দে ইভানের সেই প্রাইভেট জেটটি ব্লাস্ট হয়ে গেল! পুরো আকাশ এক মুহূর্তে লাল আর কমল রঙের আগুনের গোলকায় পরিণত হলো। জেনারেটর আর তেলের ট্যাংকের সেই ভয়াবহ বিস্ফোরণের টুকরোগুলো জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ডের মতো সাগরের বুকে আছড়ে পড়তে লাগল। মাঝআকাশের সেই আগুনের লেলিহান শিখার দিকে তাকিয়ে তান্বী বুঝতে পারল—ইভান আর এই দুনিয়ায় নেই। যে মানুষটা একটু আগেও তার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বিশুদ্ধ অবসেসনের জবানবন্দি দিচ্ছিল, সে নিজের সমস্ত পাপ, কষ্ট আর একাকীত্ব নিয়ে ওই আগুনের গোলকায় চিরতরে ছাই হয়ে গেল।
বিস্ফোরণের সেই তীব্র আলো আর শব্দের ধাক্কায় তান্বীর পুরো শরীর উন্মাদের মতো কাঁপতে লাগল। সে জাভিয়ানের শার্টের কলারটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় খামচে ধরে তার বুকে মুখ লুকিয়ে বাচ্চাদের মতো ডুকরে কেঁদে উঠল।

“জাভিয়ান… ও মরে গেল…!” তান্বী কাঁপতে কাঁপতে অনবরত কেঁদেই চলেছে, তার চোখ দিয়ে নোনা জলের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। জাভিয়ান তান্বীর চুলে নিজের মুখ গুঁজে দিল। সে তান্বীর কাঁপতে থাকা শরীরটাকে নিজের দুই বাহুর দুর্ভেদ্য কবচে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলতে লাগল—”শশশ… শান্ত হও জিন্নীয়া। আমি আছি তো। তোমার জাভিয়ান তোমার পাশে আছে। আর কোনো ভয় নেই সোনা… সব শেষ। সব ঝড় আজ চিরতরে শেষ হয়ে গেছে।”

স্পীডবোটটি যখন সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ কেটে তীরের দিকে ছুটে চলছে, তখন ওপরের আকাশে জ্বলতে থাকা জেটের শেষ আগুনের ফুলকিগুলো ছাই হয়ে সাগরের বুকে খসে খসে পড়ছিল। জাভিয়ানের বুকটা তখনো তান্বীর কান্নায় ভিজে যাচ্ছে। ইভানের এই আকস্মিক ট্র্যাজিক পরিণতি—যেখানে এক হিংস্র পিশাচের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক বিশুদ্ধ প্রেমিক নিজেকে শেষ করে দিল, তা জাভিয়ানের মতো শক্ত হৃদয়ের ভেতরে ভেতরে এক তীব্র ধাক্কা দিয়েছিল। তার নিজের ভেতরেও একটা অদ্ভুত শূন্যতা আর খারাপ লাগা মোচড় দিয়ে উঠল, কিন্তু এই মুহূর্তে তান্বীকে সামলানোর জন্য সে নিজের সেই দুর্বলতা আড়াল করে নিল।
জাভিয়ান তান্বীর থরথর করে কাঁপতে থাকা শরীরটাকে নিজের বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। তান্বী তখনো সাগরের দিকে তাকিয়ে ডুকরে কাঁদছে, তার দু চোখ বেয়ে অবিরাম জল ঝরছে। জাভিয়ান তান্বীর চোখের জল নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে আলতো করে মুছে দিল। তার নিজের কণ্ঠস্বরও তখন কিছুটা ভারী, চোখের কোণে এক ফোঁটা চাপা কষ্ট। সে আকাশের সেই মিলিয়ে যাওয়া ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গভীর ও শান্ত গলায় বলল—

“শান্ত হও জিন্নীয়া… নিজেকে শক্ত করো। মনকে বোঝাও, ভালোবাসার এই মরণখেলায় শেষ পর্যন্ত কাউকে না কাউকে তো মরতেই হতো। আজ যদি ও এই আত্মঘাতী চাল না চালত… তবে হয়তো তুমি, আমি আর না হয় ও—আমাদের তিনজনের একজনকে আজ এই সাগরের বুকেই প্রাণ হারাতে হতো। নিয়তি আজ আমাদের দুজনকে বাঁচিয়ে নিয়ে ওকে নিজের বুকে টেনে নিয়েছে।”
তান্বী জাভিয়ানের শার্টের কলারটা খামচে ধরে মাথা নেড়ে হাহাকার করে উঠল, “কিন্তু জাভিয়ান… আমি যে এটা মানতে পারছি না! আমার জন্য একটা প্রাণ এভাবে ঝরে গেল, এই অপরাধবোধ নিয়ে আমি কীভাবে বাঁচব জাভিয়ান?”

“শশশ… তান্বী, তাকাও আমার দিকে!” জাভিয়ান তান্বীর মুখটা দুহাতে তুলে ধরে সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন একাধারে ভালোবাসা আর এক পরম সত্যের আলো। সে তান্বীর কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল—”এখানে তোমার কোনো দোষ নেই সোনা… বিন্দুমাত্র কোনো দোষ নেই। ওর ভাগ্যে আজ যা লেখা ছিল, ঠিক তা-ই হয়েছে। ও নিজের সব পাপের প্রায়শ্চিত্ত এই আগুনের মাঝেই করে দিয়ে গেছে।”

জাভিয়ান এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্পীডবোটের বাইরে সমুদ্রের দিকে তাকাল। যে নাইট রেভেন কোনোদিন কোনো শক্তির সামনে মাথা নোয়ায়নি, সে আজ নিয়তির এই অলৌকিক খেলার সামনে সম্পূর্ণ নত মস্তকে বলল—”তুমি তো জানো তান্বী, আমি অতীতে কোনোদিন এই নিয়তি, ভাগ্য কিংবা বিধির লিখন—এসবের কিচ্ছুতে বিশ্বাস করতাম না। আমি মনে করতাম আমার রিভলভারের বুলেট আর আমার ক্ষমতাই শেষ কথা। কিন্তু আজ… এই ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে, তোমাকে অক্ষত অবস্থায় আমার বুকে ফিরে পাওয়ার পর আমি স্বীকার করছি—আমি এখন ভাগ্যে বিশ্বাস করি তান্বী! আমি এখন নিয়তিকে বিশ্বাস করি।”

জাভিয়ান তান্বীর ঠোঁটে একটা আলতো, পবিত্র চুমু খেয়ে বলল—”নিয়তিই আমাদের কপার ক্যানিয়নের সেই খাদ থেকে বাঁচিয়ে এনেছে, নিয়তিই আজ এই মাঝআকাশের নিশ্চিত মৃত্যু থেকে তোমাকে আমার বাহুডোরে ফিরিয়ে দিয়েছে। আর নিয়তিই আজ ইভানের সেই বিষাক্ত আসক্তিকে চিরতরে শান্ত করে দিয়েছে। তাই আর কোনো অপরাধবোধ নয় জিন্নীয়া… এবার শান্ত হও। আমাদের এই নতুন জীবনটা নিয়তিরই এক পরম উপহার।”
জাভিয়ানের এই গভীর ও শান্ত সান্ত্বনা তান্বীর ভেতরের সেই তীব্র ট্রমা আর কান্নার ঝড়টাকে ধীরে ধীরে স্তিমিত করে আনল। সে জাভিয়ানের চওড়া বুকে নিজের মাথাটা এলিয়ে দিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মন এখনো ভারাক্রান্ত, কিন্তু জাভিয়ানের এই পাথুরে আশ্রয়ের ওম তাকে এক পরম সুরক্ষার অনুভূতি দিল।

স্পীডবোটটি অবশেষে ঘাটে এসে ভিড়ল। তীরের ওপারে তখন মেক্সিকোর আকাশে সব কুয়াশা আর কালো ধোঁয়া কেটে গিয়ে সব রক্তপাত, অবসেসন আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের কালো অধ্যায়কে চিরতরে সাগরের অতলে সমাধি দিয়ে, জাভিয়ান আর তান্বী হাত ধরে পা রাখল তাদের সেই চিরন্তন, পবিত্র আর স্বাধীন ভালোবাসার পৃথিবীতে।
মেক্সিকো সিটির শান্ত দুপুর। ভিলা এস্পেরেন্জার সেই লাক্সারি বেডরুমের চারদিকের জানলা দিয়ে রোদের আলো এসে পড়েছে মেঝেতে। সমুদ্রের সেই ভয়ঙ্কর কালবৈশাখী ঝড় শেষ হওয়ার পর আজ প্রথম এই ঘরে এক পরম শান্তি বিরাজ করছে। কিন্তু লিভিং রুমের সেই বড় এলইডি টিভির স্ক্রিনে তখনো মেক্সিকোর জাতীয় নিউজ চ্যানেলগুলোতে ফ্ল্যাশ হচ্ছিল সেই মাঝআকাশের প্রলয়ঙ্কারী ঘটনা।
লিভিং রুমের সোফায় বসে তান্বী শূন্য চোখে তাকিয়ে ছিল টিভির স্ক্রিনের দিকে। স্ক্রিনে তখন সেই ব্রেকিং নিউজের চেনা টোন বেজে চলেছে—”মেক্সিকোর আকাশে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত মাফিয়া মেইলস্ট্রমের (ইভান) প্রাইভেট জেট মাঝআকাশেই বিস্ফোরণে পুড়ে ছাই! ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে ফেডারেল পুলিশ। মেক্সিকোর ডার্ক ওয়ার্ল্ডের এক হিংস্র রাজত্বের অবসান!”

টিভির পর্দায় সেই জ্বলন্ত জেটের ধ্বংসাবশেষ আর ইভানের ছবিটা দেখামাত্রই তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল ইভানের সেই শেষ কথাগুলো—”আমার ভালোবাসা মিথ্যা ছিল না সোলফ্লেম…” ঠিক তখনই, পেছন থেকে একটা চেনা শক্ত হাত এসে রিমোটের বোতাম চেপে এক ঝটকায় টিভির স্ক্রিনটা পুরোপুরি অন্ধকার করে দিল। তান্বী চমকে উঠে তাকিয়ে দেখল—জাভিয়ান একটা সাদা ক্যাজুয়াল শার্ট পরিহিত অবস্থায় তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার চোখে আজ কোনো এর ক্রুরতা নেই, আছে শুধু তার জিন্নীয়ার জন্য এক আকাশ সমান ভালোবাসা। জাভিয়ান কোনো কথা না বলে, এক টানে তান্বীকে সোফা থেকে তুলে সরাসরি নিজের কোলে বসিয়ে নিল। তান্বী লাজুক মুখে জাভিয়ানের গলাটা দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল। জাভিয়ান তান্বীর কপালে নিজের ঠোঁটটা ছুঁইয়ে দিয়ে এক চিলতে মায়াবী হাসি হেসে বলল—”অনেক হয়েছে জিন্নীয়া! এই বিষাক্ত নিউজ আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের কোনো খবর আজ থেকে এই ভিলার ভেতরে প্রবেশ করবে না। আমি আজ থেকে অফিস থেকে পুরো এক মাসের লম্বা ছুটি নিয়ে নিয়েছি। এই কয়টা দিন আমি অন্য কোনো কাজ করব না, ফোন অফ থাকবে। আমি শুধু চব্বিশ ঘণ্টা তোমার সাথে থাকব। আমরা দুজন মিলে মেক্সিকোর সব সুন্দর সুন্দর জায়গায় ঘুরব, অনেক অনেক শপিং করব… তুমি যা চাইবে, আমি তা-ই করব।”

জাভিয়ানের এই মিষ্টি আবদার শুনে তান্বীর ঠোঁটের কোণে অনেকদিন পর এক অনাবিল, পবিত্র হাসি ফুটে উঠল। সে জাভিয়ানের বুকের বোতামটা নিজের আঙুল দিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে একটু আদুরে গলায় বলল—”আমরা মেক্সিকোতে পরে ঘুরব জাভিয়ান। তার আগে… আমি বাংলাদেশে যেতে চাই। অনেকদিন হলো ফারহান ভাইয়া, বাবা আর মাকে দেখি না। মনটা বড্ড ছটফট করছে ওদের জন্য। আমরা বাংলাদেশে যাবো?”
জাভিয়ান তান্বীর এই আকুলতা দেখে এক মুহূর্তও দ্বিধা করল না। সে তান্বীর গালটা আলতো করে চেপে ধরে এক বুক শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা নিয়ে বলল—”অবশ্যই যাবো জিন্নীয়া! তাদের কাছে না গেলে যে বড্ড অন্যায় হয়ে যাবে। আজ আমাদের এই সম্পূর্ণ স্বাধীন, নতুন আর পরম সুখের মুহূর্তে সবার আগে তো আমাদের ওখানেই যেতে হবে। কারণ…”
জাভিয়ান একটু থামল। তার চোখের কোণটা তখন এক অদ্ভুত কৃতজ্ঞতায় চকচক করে উঠল। সে তান্বীর চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ভারী, আবেগঘন গলায় বলল—
“বাংলাদেশেই যে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ঋণটা জমা হয়ে আছে, তান্বী! আমরা দুদিনের মধ্যে বাংলাদেশে যাবো।”

আজ এই আনন্দের ক্ষনে জাভিয়ানের মনের ক্যানভাসে ভেসে উঠল তার ফেলে আসা অতীতের প্রতিটি রক্তাক্ত পাতা। এই সেই জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী—যে একসময় ছিল মেক্সিকোর ডার্ক ওয়ার্ল্ডের ত্রাস, অপ্রতিরোধ্য ‘নাইট রেভেন’। অহংকারী, গম্ভীর, চরম রাগী, একরোখা আর অসম্ভব শক্ত হৃদয়ের এক মানুষ, যার ইশারায় কাঁপত পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড। যে মানুষটা কোনোদিন কারও সামনে মাথা নোয়ায়নি, নিজের ক্ষমতার দম্ভে যে ছিল অন্ধ, সে আজ এক সাধারণ রমণীর মায়ার বাঁধনে পড়ে এক নিমিষেই হয়ে উঠেছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুঁত ও কেয়ারিং এক স্বামী।

যে নাইট রেভেন কোনোদিন হাসতে জানত না, যার ঠোঁটের কোণে কেবল ক্রুরতার আভাস থাকত, তান্বী নামের এই মায়াবতী মেয়েটি তাকে আজ মন খুলে হাসতে শিখিয়েছে। ভালোবাসা সত্যিই এমন এক অলৌকিক দুর্বলতা, যার জন্য আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই প্রতাপশালী সম্রাট এক সেকেন্ডে নিজের পুরো কালো সাম্রাজ্যকে চিরতরে বিসর্জন দিতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। এই ভালোবাসার জোর এতটাই তীব্র ছিল যে, কপার ক্যানিয়নের সেই নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে, খাদের সেই গভীর অন্ধকার থেকেও তারা দুজনে আবার জীবনের আলোয় ফিরে এসেছে। জাভিয়ানের সেই একাকী, নিঃসঙ্গ, পাথুরে আর অন্ধকার জীবনে এক রানি হয়ে, সাত রঙের বসন্ত নিয়ে এসেছিল এই তান্বী। আর তার হাত ধরেই মেক্সিকোর এই স্বাধীন রাজা প্রথম বুঝতে পেরেছিল—ভালোবাসা কাকে বলে, কীভাবে কাউকে নিজের জানের চেয়েও বেশি ভালোবাসতে হয়।

ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪৯

ভিলা এস্পেরেন্জার জানলা দিয়ে শীতল দমকা হাওয়া বয়ে যাচ্ছিলো জাভিয়ান তখন তান্বীর কপালে নিজের ঠোঁটটা ছুঁইয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ জিন্নীয়া… আমাকে একজন আস্ত মানুষ বানানোর জন্য। আমাকে ভালোবাসার মায়ায় জড়ানোর জন্য নাহলে তো জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী সবসময় অন্ধকারেই থাকতো রংধনুর সাত রঙে জীবনটা কখনোই রাঙানো হতো না ভালোবাসি তোমাকে নিজের থেকেও বেশি।”
তান্বী চুপটি করে বিড়াল ছানার মতো জাভিয়ানের বাহুতে আরো মিশে গেলো।

সমাপ্ত