Home তাকদিরে তুমি তাকদিরে তুমি পর্ব ১৪

তাকদিরে তুমি পর্ব ১৪

তাকদিরে তুমি পর্ব ১৪
মোনালিসা মেহরোজ

—ছায়া! তুমি এখানে? অফিসে?
কপাল কুঁচকে প্রশ্নটা করে বসলো আসিফ৷ মাঝখানে কেটেছে তিনটে দিন। এই তিনদিনে আসিফ আর একবারও অফিসে আসেনি। বাড়িতেও কাটায়নি বেশি সময়। বাহিরে বাহিরে সকলের আড়ালেই থেকেছে সে। তবে কাল রাতে আযান মির্জা ফোন করে অফিসে আসার জন্য রিকুয়েষ্ট করেছিলেন, কি একটা গন্ডগোল হয়েছে হিসেবে সেটা দেখতে। বাধ্য হয়ে আসিফ আজ এসেছে। আর এখন ছায়াও উপস্থিত।
আসিফ অবাক লোচনে চেয়ে স্থির বসে রইলো চেয়ারে। ছায়া বাঁকা নজরে কাচে ঘেরা পুরো কেবিনটা পর্যবেক্ষণ করে ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে এলো। টেবিলে দু’হাত রেখে ঝুঁকে এলো খানিকটা। আসিফের ভ্রু যুগল আরো খানিকটা কুঁচকে গেলো। সে বুঝলো না ছায়ায় উপস্থিতির কারণ।

—কথা বলছো না যে? এখানে কেনো এসেছো? আসবে তা জানাওনি তো!
—জানিয়ে এলে কি করে দেখতাম আসিফ মির্জা যে কতটা লোভী!
আসিফ থমকে গেলো এক মুহূর্তের জন্য। কুঞ্চিত ভ্রু আরো কুঁচকে গেলো। গম্ভীর পরিবেশটা যেনো আরোও গম্ভীর হয়ে পরলো তার বদলে যাওয়া মুখশ্রীতে।
—মানে?
তাচ্ছিল্য হাসে ছায়া। ধীরস্থির ভাবে চেয়ারে বসে গা এলিয়ে দেয় সেথায়। আসিফের পানে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠে—-
—মানে? মানে এই যে আসিফ মির্জা আজ অফিসে এসেছে বাবার কথায়। কারণ বাবার কথার অবাধ্য হলে সম্পত্তি হাতছাড়া হবে। আর তাই আসিফ এখন বাবা ও বউয়ের কেনা গোলামের ন্যায় তারা যা বলছে সেটাই শুনছে। বাহ্….!
এক মুহূর্তের জন্য আসিফ থমকে গেলেও পরমুহূর্তেই তীব্র রাগে ঝাঁঝিয়ে উঠে যুবক। কেমন সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে করতে আঙুল তুলে বলে—-

—লিমিটে থাকো ছায়া, লাগাম টানো নিজের কথায়।
—উহু, একদমই না। কেন টানবো লাগাম? যা বলছি, একটাও মিথ্যা বলছি না। তিন দিন আগে যে ছেলেটা বলতো, “আমাকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না”, সেই ছেলেটাই আজ বাবা আর বউয়ের কথায় অফিসে বসে হিসাব মিলাচ্ছে। বাহ! পরিবর্তনটা কিন্তু বেশ দ্রুত হয়েছে।
আসিফের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। সে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বললো—
—ছায়া, আর একটা শব্দও না।
—কেন? সত্যিটা শুনতে কষ্ট হচ্ছে? নাকি আমি এমন জায়গায় আঘাত করেছি, যেখানে তুমি নিজেও দুর্বল হয়ে পড়েছো?
আসিফ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। শক্ত জুতোর খটখট আওয়াজ নিরবতা ভেদ করে তীরের ন্যায় বেড়িয়ে গেলো।
—আমি শেষবারের মতো বলছি, সীমা বুঝে কথা বলো।
ছায়াও ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। চোখে চোখ রেখে স্থির দৃষ্টিতে বললো—
—সীমা? সীমা তো তুমি নিজেই ভেঙেছো। তুমি কি জানো এখন সবাই কী বলছে? ‘আসিফ মির্জাকে বদলে দিয়েছে তার বউ।’
ছায়া হালকা হেসে আবার বললো—

—আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার জানো কী? তুমি সেটা বুঝতেও পারছো না আসিফ মির্জা।
আসিফ এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। তাকে নিয়ে বলা কথাগুলো, তার বদলে যাওয়া নতুন রূপ সবকিছু তীব্র প্রভাব ফেলালো যুবকের খিটখিটে মস্তিষ্কে। যার দরুন তীব্র রাগে হিতাহিত গর্জে উঠলো সে।
—এনাফ!
ছায়া খানিক কেঁপে উঠল। পুরো কেবিন জুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো তার কঠোর স্বর। আসিফের চোখজোড়া কেমন দাবানলের ন্যায় জ্বলছে। তাদের ফ্রেন্ড সার্কেলের একজন মেয়ে সদস্য ছায়া। যাকে তারা সকলে বেশ সম্মান করে। আসিফ নিজেও তাকে কখনো অন্য চোখে দেখেনি, স্বাভাবিক বন্ধুদের মতো তুই করেও বলেনি। অথচ সেই মেয়েটাই কি-না তার পার্সোনাল লাইফ নিয়ে বারবার এভাবে নাক গলায়? কথা শোনায় তাকে!
আসিফের রাগ হলো। মনে মনে ভিষন ক্রোধ জন্ম নিলো যুবকের। এবার সরাসরি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আওড়ালো—-

—আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মন্তব্য করার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে, ছায়া?
ছায়া ভ্রু উঁচু করলো। একসাথে এতো বছর কাটালেও আসিফ তাকে কোনদিন এই প্রশ্ন করেনি। অথচ আজ! আজ তাকে অধিকার নিয়ে প্রশ্ন করছে? বাহ্!
—অধিকার? বহু বছর ধরে যে সম্পর্কের উপর ভরসা করেছিলাম, সেই সম্পর্কই আমাকে অধিকার দিয়েছে।
—না, ছায়া।
কঠিন স্বরে বলে উঠলো আসিফ। কপাল স্লাইড করতে করতে পুনরায় বললো—
—অধিকার আর অভ্যাস এক জিনিস নয়। তুমি অভ্যস্ত ছিলে আমার জীবনে নাক গলাতে। কিন্তু তাই বলে সেটা তোমার অধিকার হয়ে যায় না।
ছায়ার মুখের তাচ্ছিল্য হাসিটা মিলিয়ে গেলো। অপমানিত বোধ করলো সে। আসিফ সরাসরি অধিকার তুলে কথা বলবে তা সে ভাবতেও পারেনি। কাল রাতে যখন আযান মির্জার সাথে তার তর্কাতর্কি হয়েছিলো সেই জেদ ধরেই আজ সে এখানে এসেছে। তবে আসিফের থেকে এরূপ কিছু সে আশা করেনি। ছায়া মাথা নুইয়ে হাতের মুঠোই শক্ত করে নিলো৷ দাঁতে দাঁত চেপে আওড়ালো—-
—তাহলে এখন ওই মেয়েটাই সব?
—আমি কারও পক্ষ নিচ্ছি না।
দাঁতে দাঁত চেপে বললো আসিফ। ছায়া টু শব্দ অবদি করলো না তার কথা পাছে। আসিফ পুনরায় বললো—

—কিন্তু তোমার এই অপমান আমি আর সহ্য করবো না।
ছায়া তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো—
—বাহ! আজ তো দেখি বউয়ের সম্মান রক্ষা করতেও শিখে গেছো।
কথাটা শেষ হতে না হতেই টেবিলের উপর রাখা ফাইলটা সজোরে বন্ধ করে দিলো আসিফ। যার শব্দে পুরো কেবিন কেঁপে উঠলো। ফাইলের শব্দ মিলিয়ে যেতে না যেতেই ভেসে এলো আসিফের গমগমে কন্ঠস্বর—-
—গেট আউট।
যুবকটির কথায় ছায়া কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো। মাথা কাজ করলো না তার। পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে পরলো রমণী।
—কি বললে?
—আমি বলেছি, বের হয়ে যাও।
প্রতিটি শব্দ আলাদা করে উচ্চারণ করলো আসিফ। ছায়া জমে গেলো তার কথায়। আসিফ যে তাকে এভাবে অপমান করবে এ তার ভাবনারও বাহিরে। তীব্র রাগে ভেতরটা রি রি করে উঠলো ছায়ায়। ছায়া দাঁতে দাঁত চেপে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লো—-

—আমাকে বের করে দিচ্ছো?
—হ্যাঁ।
—ওই মেয়ের জন্য?
আসিফ ঠান্ডা অথচ ভয়ংকর গলায় বললো—
—না। তোমার ব্যবহার আর অসম্মানজনক কথার জন্য। আমার অফিসে দাঁড়িয়ে আমার পরিবারকে নিয়ে আর একটা শব্দও বলবে না।
আসিফের কথার পাছে ভেতরে ভেতরে তীব্র রাগ-ক্ষোপ বাসা বাঁধে ছায়ার। অবশেষে ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিলো সে। এবং দরজার সামনে গিয়ে থেমে শেষবারের মতো বললো—
—আজ আমাকে বের করে দিলে ঠিকই। কিন্তু খুব শিগগিরই বুঝবে, আমি যা বলেছি তার একটাও ভুল ছিল না।

দরজাটা জোরে ঠেলে বেরিয়ে গেলো ছায়া।
পুরো কেবিন নিস্তব্ধ হয়ে গেলো তার চলে যাওয়ায়। আসিফ দু’হাতে কপাল চেপে ধরলো।
রাগ, বিরক্তি আর অদ্ভুত এক ক্লান্তি তাকে গ্রাস করে ফেলেছে। আর কাজ করার মতো মানসিক অবস্থায় নেই সে। চেয়ারের পেছনে ঝুলে থাকা কোটটা তুলে নিলো আসিফ মির্জা। কাউকে কিছু না জানিয়েই কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো।
বিকেলের শেষ আলো ফুরোতে ফুরোতে মির্জা বাড়ির সামনে এসে থামলো আসিফের গাড়িটা। ভেতরে ঢুকতেই ড্রয়িংরুমে বসে থাকা আযান মির্জাকে নজরে পরলো। আসিফকে দেখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি। আসিফ সেদিকে একপলক তাকিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে গেলেই ভেসে এলো তার হিমশীতল কণ্ঠ—

—আসিফ, এদিকে এসো।
থেমে গেলো আসিফ। ভেতরের অস্থিরতাকে আঁটকে ফিরে এলো। সামনে বাবা-মা বসে আছেন। পাশে দাঁড়িয়ে ফাতিহা। আসিফকে ফিরে আসতে দেখে ফাতিহা চট করে ছুটলো রান্নাঘরের দিকে। আর কয়েক মুহূর্ত বাদে ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি নিয়ে ফিরে এলো। আসিফের সামনে গ্লাস ধরলে আসিফ শক্ত দৃষ্টিতে তাকালো তার দিকে। তবে যুবক কোন বাজে প্রতিক্রিয়া দেখালো না। বরং বরফশীতল থেকে পাথরের ন্যায় পানিটা নিয়ে তা পান করলো। আযান মির্জা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সবটায় দেখলেন। এবং দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন।

—বলো!
ছেলের কথায় আযান মির্জা চশমাটা খুলে টেবিলের উপর রাখলেন।
—কাল সকালে তোমার মামার বাড়ি যেতে হবে।
আসিফ নির্বিকার রইলো বাবার কথার পাছে। শুধু ঠোঁট জোড়া নাড়িয়ে আওড়ালো—
—কেন?
—তোমার মামাতো বোনের বিয়ে। আজই ফোন এসেছে। সবাই যাবো।
আসিফ অনাগ্রহী গলায় বললো—-
—তোমরা যাও। আমার যাওয়ার দরকার নেই।
—দরকার আছে।
শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন আযান মির্জা। আসিফ চোখ ঘোরালো। তার বড্ড মাথা যন্ত্রণা করছে। ভেতরে ভেতরে অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছে।
অন্যদিকে আযান মির্জা না দমে বলেই চললেন—

—আজই তুমি ফাতিহাকে নিয়ে বের হবে।
এ পর্যায়ে ভ্রু কুঁচকে গেলো আসিফের। সে বুঝে উঠতে পারলো না বাবার কথা। প্রশ্ন করলো কারণ।
—কোথায়?
—শপিং করতে।
—আমি?
—হ্যাঁ, তুমি।
আযান মির্জা আরেকটু গম্ভীর হয়ে বললেন—
—মেয়েটা এই বাড়িতে এসেছে খুব বেশি দিন হয়নি। তার প্রয়োজনের জিনিসপত্র কিনতে হবে। বিয়েবাড়িতে যাবে, ভালো কিছু কাপড়চোপড়, কিছু গয়না, যা যা দরকার সব কিনে দিও।
আসিফ বিরক্ত হলো। মনে মনে রাগান্বিত হলো প্রচুর। আশ্চর্য! তাকে কি চাকর মনে হয়? না-কি সে কেনা গোলাম? ‘কেনা গোলাম’ শব্দটা মাথায় আসতেই চোয়ালদ্বয় আচমকা শক্ত হয়ে আসে আসিফের। মনে পরে ছায়ার বলা প্রতিটা ব্যাক্য। আর এখন বাবার আদেশ! আসিফ চোখজোড়া বন্ধ করে নিলো। সত্যিই কি সে অন্যের হাতের পুতুল হয়ে যাচ্ছে? সত্যি গোলাম হয়ে যাচ্ছে স্ত্রী’র? ভাবতে পারেনা আসিফ। শিরা-উপশিরায় তরতর করে ছড়িয়ে পরে তীব্র আক্রোশ। নাকের পাটাতন কেমন ফুলে উঠে যুবকের।

—পারবো না আমি।
—যেতে হবে তোমায়।
আযান মির্জার আদেশি স্বর। আসিফ তবুও তা অস্বীকার করলো। আবারো একই আওয়াজ ছাড়লো—-
—বললাম তো আমি পারবো না।
—তোমাকে যেতে হবে, আসিফ। তুমি তার স্বামী।
আসিফ দাঁতে দাঁত চেপে রইলো চোখ বন্ধ করে নিলো। পেরিয়ে গেলো অনেকটা সময়। সায়না মির্জা ফ্যাল ফ্যাল করে স্বামী-ছেলের যুদ্ধ দেখছেন। ফাতিহা নিজেও তাই। আসিফ কি বলবে এরপর তা দেখার আশায় উৎসুক রমণী। ঠিক তখনি আসিফ চট করে চোখ খুলে তাকায়। সরাসরি তার চোখের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বলে—-
—ওকে ফাইন। আমি যাবো।
ব্যাস, মাত্র কয়েকটা শব্দ ব্যায় করে ধপধপ পা ফেলে মুহূর্তের মধ্যে নিজের ঘরের দিকে ছুটলো আসিফ। আযান মির্জা বিজয়ীর হাসি হাসলেন। অন্যদিকে ফাতিহা অবাক লোচনে চেয়ে দেখলো আসিফের চলে যাওয়া। সে যে রাজি হবে তা ফাতিহা ভাবতেও পারেনি৷
অন্যদিকে ঘরে প্রবেশ করেই ধপ করে নিজের কোট খুলে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে আসিফ। অতঃপর নিজেও বসে মাথার চুল খামচে আওড়ায়—
—আমি তোমাকে দেখে নিবো ফাতিহা নূর

বিকেলের শেষভাগে তৈরি হয়ে নিচে নামলো আসিফ। সময় তখন সারে পাঁচ’টার কাছাকাছি। ফাতিহা তৈরি হচ্ছে। আযান মির্জা বাড়ি নেই। বিকেলেই বেড়িয়েছেন অফিসে৷ সায়না মির্জা সোফায় বসে ছেলের সাথে টুকটাক শপিং নিয়ে কথা বলছেন। যদিও আসিফ অতন্ত্য গম্ভীর মুখে বসে আছে। সাথে মনে মনে কষছে অন্য অংক। আজ যে করেই হোক সে ফাতিহাকে শিক্ষা দিয়েই ছাড়বে। তাকে জোড় করে শপিংয়ে নিয়ে যাওয়া না! বের করবে।
মনে মনে কুটিল হাসে যুবক। মাথার চুলে হাত বুলিয়ে সিঁড়ির পানে তাকাতেই নজরে পরে সাদা বোরখায় আবৃত অর্ধাঙ্গিনী তার। গাঢ় ধূসররঙা আঁখিপল্লব বাদে পুরো কায়া’টায় পর্দার আড়ালে৷ আসিফ চোখ ঘোরালো, অতঃপর গটগট পায়ে বেড়িয়ে গেলো বাড়ি থেকে। ফাতিহা সিঁড়ি বেয়ে নেমে শাশুড়ীকে সালাম দিয়ে স্বামীর পিছু নিলো

বসুন্ধরার ফাস্ট ফ্লোর থেকে একের পর এক ফ্লোর পাগলের ন্যায় উন্মাদচিত্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে ফাতিহা। কাঙ্ক্ষিত মানুষটার খোঁজে যেন পুরো ভবনটাই হন্যে হয়ে চষে ফেলছে রমণী। সাদা বোরখার আড়ালে মুখটা তার ধারণা করেছে ফ্যাকাসে বর্ণ। বুকের ভেতরটা কাঁপছে রীতিমতো। বাবা-মাকে ছাড়া বাহিরে কখনো বের হওয়া হয়নি তেমন ভাবে। পড়াশোনা চলাকালীন এক বান্ধবী তার সাথে যাতায়াত করতো, যে তার ভরসা ছিলো। ফাতিহা দুর্বল নয়। তবে এতো এতো মানুষের কোলাহলে সে রীতিমতো হাঁসফাঁস করে উঠছে।

শশুর-শাশুড়ীর কথাতে আসিফের উপর ভরসা করে তার সাথে শপিংয়ে এসেছিলো ফাতিহা। ভেবেছিলো, বাহিরে এলে অন্তত বাড়ির মতো এড়িয়ে চলবে না যুবকটি। হয়তো আশ্রয়স্থল হয়ে পাশে পাশে থাকবে তার। তবে কি হলো এটা? আসিফ কি তবে এতোটাই নির্দয়? সে কি করে এভাবে ফাতিহাকে একা ফেলে চলে যেতে পারলো এই অচেনা জায়গায়? তার কি বিবেকে বাঁধলো না?
বাহিরে তখন এশার আযানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। ফাতিহা থামলো একটু। চারিদিকে আস্তে করে নজর বুলালো সে, দেখতে পেলো আযান হলেও চারিদিকে কমেনি একটুখানিও কোলাহল। বেশ নাম করা শপিংমল এটা, মোট কটা ফ্লোর আছে তা অজানা ফাতিহার। আগে আশা হয়নি।
ফাতিহা চোখজোড়া বুঝে নিলো। কান্না পেলো বড্ড। কেনো যেনো একা লাগছে বড্ড। কাছে টাকাও নেই বাড়ি ফিরবে। এখান থেকে কোথায় যাবে, কিভাবে কোন রোড থেকে ফিরবে তার কোন কিছুই জানা নেই ফাতিহার। বেশ খানিকটা সময় নিয়ে আসিফ এখানে এনেছিলো, নিশ্চয়ই বাড়ির দূরত্ব একটুখানি হবে না!

ফাতিহা ভয় পেলো। বড্ড বেশিই অস্থির হয়ে উঠলো ভেতরটা। তবে রমণীর ভেতরের ঝড় বাহিরে খুব একটা প্রকাশ পেলো না।
ফাতিহা আবারো ঘুরে দাঁড়ালো। অস্থিরচিত্তে পুনরায় ছুটলো সেদিকপানে, যেখানে শেষবার আসিফ তাকে রেখে গেছিলো ফোনে কথা বলার অজুহাতে। দু’মিনিটের নাম করে কেটে গেছে ঘন্টাখানেক, তবুও দেখা নেই অবুঝ যুবকটির।
ফাতিহা দ্রুত পদক্ষেপে এসে থামলো লিফটের সামনে। তবে রমণী গুলিয়ে ফেললো লিফট আর সিঁড়ির মধ্যে পার্থক্য। লিফটে পা ফেলে তারাহুরো করে তা সিঁড়ি ভেবে বসলো। আর করে ফেললো এক অঘটন। লিফটে চড়ে তা সিঁড়ি ভেবে ধপধপ পা ফেলে সে নামতে চাইলো। তবে বালাইষাট, তা কি আর করা যায়? আধুনিক যুগের লিফট আর পুরাতন শৌর্য মিস্ত্রির আবিষ্কার কি এক হলো?
আচমকা টাল সামলাতে না পেরে হুড়মুড়িয়ে পরে যেতে লাগলো রমণী। কাঁপতে থাকা হৃদয়খানা বোধহয় এবার হারালো তার সর্বোচ্চ গতি। চোখজোড়া খিঁচে দম বন্ধ করে নিলো ফাতিহা। মস্তিষ্ক তখন পুরোপুরিভাবে অচল, কি করবে না করবে তার কোনকিছুই খেললো না তার মাথায়।
ফাতিহা দম খিঁচে নিচে পরার অপেক্ষার মাঝেই আচমকা তার সরূ কবজিতে কোন কিছুর টান অনুভব করলো৷ বোরখার নিচে ছিলো কালো রঙের মুজো, ফলে একটুখানি হাত পিছলে গেলেও অপর মানবটি ছাড়লো না হাল। বরং দৃঢ়ভাবে চেপে ধরে রাখলেন রমণীর হাত।

পেরিয়ে গেলো কয়েকটা মুহূর্ত। ফাতিহা এখনো আগের ন্যায় ঠাঁই দাঁড়িয়ে। অপরজনও তাই। তবে তার চোখ ফাতিহার ন্যায় ভিতু চাহুনির ন্যায় খিঁচে নেই বন্ধ। বরং ফাতিহার বন্ধ, কাঁপতে থাকা চক্ষুদ্বরেয় পানে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আগন্তুক। ফাতিহার চোখের কোণ ভেজা, ঠিক ভেজা মেঘের ন্যায়। ঘন চোখের পাপড়িগুলোকে ঠিক কিসের সাথে তুলনা করা যায় তা বুঝে উঠতে পারলো না যুবক। তবে এই ভিতু, হরিণী আঁখিপল্লব বড্ড নিষ্ঠুর তা সে সেকেন্ডর ব্যবধানে অনুভব করলো। নিষ্ঠুর’ই বটে, নিষ্ঠুর না হলে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে এভাবে এক পুরুষের হৃৎস্পন্দন থামিয়ে দেয়? আচমকা বুকে ব্যথা অনুভব করাই বুঝি? এ কেমন রসিকতা!
যুবকটি তখনো তার আপন ধ্যানে। তবে ফাতিহা যখনি বুঝলো সে পরেনি, তখনি মেলে তাকালো তার চোখ। আর সবার আগে তার চোখ গিয়ে আটকালো সামনের যুবকটির পানে। মাথায় তার কালো ঘন ঝাঁকড়া চুলের বাহার। সিগারেটে পোড়া কালচে ঠোঁট। পরণে ঢিলেঢালা টিশার্ট। ফাতিহা অনুভব করলো আগন্তুকের স্থির চাহুনি। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো তার। কাঁপবে নাই-বা কেনো? এহেন পরপুরুষের সম্মুখীন যে সে হয়েছে বড্ড ক্ষীণ।

ফাতিহার গলা শুকিয়ে আসলো। সাথে সাথে যখনি সে ঠাওর করতে পারলো লোকটার হাত তার অঙ্গে, তৎক্ষনাৎ একপ্রকার আতঁকে উঠলো রমণী। দ্রুত ছাড়ালো হাতের বাঁধন। অতঃপর আর অপেক্ষা নয়, না তো কোন শব্দ ব্যায়, যেভাবে নিঃশব্দে লোকটার সাথে তাহার সাক্ষাৎ হয়েছিলো, ঠিক সেভাবেই আকস্মা ফাতিহা ছুটে পালিয়ে গেলো সামনের দিকে। কেননা ততক্ষণে তারা নিচের ফ্লোরে এসে পৌঁছেছিলো। ফাতিহা তীব্র বেগে হাওয়া হলো সামনে থেকে। সাদা বোরখা পরির ডানার ন্যায় দু’দিকে তাদের বিস্তার ঘটালো। একদম বাতাসের ন্যায় মিলিয়ে গেলো সে।
অন্যদিকে, মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আচমকা এই ঘটনাটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না যুবক। যখনি বুঝে উঠতে পারলো তখন রমণী তার দৃষ্টির ওপারে। হতভম্ব হয়ে পরলো যুবক। কপালে পরলো গাঢ় ভাজ। বুক চিরে বেড়িয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস।
রমণীর মায়া মাখানো দুনিয়া থেকে বেড়িয়ে এসে চোখমুখ খানিক উদাস হয়ে পরলো যুবকের। পকেট হতে সিগারেট বের করে ঠোঁটে চেপে ধরলো। অতঃপর ধোঁয়া আকাশপানে ছেড়ে বিড়বিড় করে আওড়ালো—
—কে তুমি? হুরপরি?

অন্যদিকে আসিফ৷
শপিংমলে ফোনে কথা বলার নাম করে ফাতিহাকে সেখানেই ফেলে চলে এলেও বুকের ভেতরের অস্থিরতা থামাতে পারেনি। ফাতিহাকে সে শুধু ভয় দেখাতে চেয়েছিলো, তবে হুট করেই কি হলো কে জানে! মন বলছিলো যদি কোন অঘটন ঘটে যায়! যদিও ফাতিহার চিন্তা সে করে না। কিন্তু সেই অস্থিরতা! তার কি হবে? আসিফ নিজেকে সামলাতে পারেনা। এক মুহূর্তের জন্য মনে পরে ফাতিহার সেই ধূসররঙা আঁখিপল্লব। আর হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে ফের নিজের সকল জেদ, রাগ এক সাইডে রেখে নিজের মত পাল্টায়।
আসিফ মাথা চেপে তড়িঘড়ি করে গাড়ি ঘুরিয়ে আবারো ফিরে এলো বসুন্ধরা শপিংমলের সামনে। তবে গাড়ি পার্ক করে গাড়ি থেকে নেমে যেই না সামনের দিকে পা বাড়াবে তৎক্ষনাৎ হুট করেই, একদম হুট করেই আচমকা এক মেয়েলি কায়া তার পিঠের উপর আছড়ে পরে। পিছন দিয়ে দু’হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে পুরুষটির বলিষ্ঠ দেহ। মাথা ঠেকায় বাহুতে।
হতভম্ব আসিফ থমকালো৷ ল্যামপোস্টের নিয়ন আলোয় একজনের ছায়ার জায়গায় দু’টি ছায়া উদিত হলো৷ তবে অপরজন কে? কে এই রমণী?

আসিফের মাথা কাজ করে না। নড়াচড়াও করতে পারেনা। শুধু মনে হয়, এভাবেই থেকে যাই, সারাজীবন, অন্ততকাল থেকে যাই এভাবেই৷ অদ্ভুত এক অনুভূতি হয় আসিফের। হৃদয়টা কেমন শীতল, একদম বরফের ন্যায় ঠান্ডা হয়ে আসে। পিছনের মানবীটি ফুপিয়ে কাঁদছে, আসিফ তা টের পাচ্ছে। তার জানতে ইচ্ছে হলো এর কারণ,কিন্তু কিভাবে জানবে সে? এই নিরবতা ভাঙতে ইচ্ছে হচ্ছে না কি-না!
এভাবেই নিঃশব্দে কেটে গেলো অনেকগুলো মুহূর্ত। আসিফের হৃদয়টা তখন গতি হারিয়ে দিগবিদিক ছুটছে। দু’জনই নিশ্চুপ৷ আর এই নিস্তব্ধ রজনী ভেদ করে তীরের ফলার ন্যায় কিছু ব্যাক্য ছুঁড়লো রমণী। যা আসিফের বুকে গিয়ে বিঁধলো, আর হুট করেই রক্ত*ক্ষরণ শুরু হলো।
মেয়েটি আসিফের বাহুতে মুখ গুঁজে অভিমানী গলায় ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো—-

তাকদিরে তুমি পর্ব ১৩

—এতই রাগ ছিলো যে এভাবে অন্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে এলেন? অন্যের সাথে দেখার খুব শখ না! পূরণ করলে নিতে পারবেন তো?
আসিফের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। চোখের মণি কেমন অস্থির চিত্তে এদিক-ওদিক ছুটতে থাকলো৷ মস্তিষ্ক তখন কেমন ঝাঁ ঝাঁ করছে৷ অন্যদিকে অভিমানী মুখটা কেমন ছোট্ট হয়ে গেছে ফাতিহার। মলিন হাসে সে। মাথা ঠাঁই গুঁজে রয় স্বামীর বাহুতে।

তাকদিরে তুমি পর্ব ১৫