Home এমপি শেহরান মির্জা এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২০

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২০

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২০
সেঁজুতি আক্তার

গাড়ি চলছে নিজ গন্তব্যে। পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে গাড়ির মধ্যে। মাইরা গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। মনটা খারাপ, আবার কবে আসতে পারবে ঠিক নেই। সকালে দাদির থেকে বিদায় নিয়ে মামা বাড়িতে খাওয়া দাওয়া শেষ করে ওরা বেরিয়ে পড়েছে।
শেহরান ফোনের দিকে দৃষ্টি রেখে বসে আছে। কিছুক্ষণ পর পর আড়চোখে মাইরাকে দেখছে। মেয়েটা কেমন শান্ত হয়ে গেছে। আগে যেমন ছিলো, এখন তার ছিটেফোঁটাও নেই। এতে শেহরান বেশ বিরক্ত। ও তো মাইরার চঞ্চলতাকে পছন্দ করে। এমন শান্ত মাইরাকে দেখতে ভালো লাগে না।
শেহরান হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে মাইরার মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করল। কিন্তু মাইরার মধ্যে কোনো রকম ভাবান্তর দেখা গেল না।

–বলছি কি দেখছো বাইরে?
–মাইরা চমকে পাশ ফিরে চাইল। শেহরান ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। কিছু না, এমনি তাকিয়ে আছি!
–ওহ! কিছু কি খাবে? হাওয়াইমিঠা?
–না।
–শেহরান আর কিছু বলল না। আবার ফোনে মনোযোগ দিল।
–মাইরা আবার জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি রাখল।
–হঠাৎ শেহরানের ফোনটা বেজে উঠল। রনির কল। শেহরান কপাল কুঁচকে কল রিসিভ করতেই রনির উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ভেসে আসলো।
— ভাই সর্বনাশ হয়ে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় লিক হয়ে গেছে। বর্তমানে এমপি শেহরান মির্জা বাল্যবিবাহ করেছেন। কে বা কারা করেছে এখনো জানা যায়নি কিন্তু সংসদ ভবনে মিটিং এর আয়োজন করা হয়েছে। আপনাকে যত দ্রুত সম্ভব সংসদ ভবনে আসতে হবে। বিপক্ষ দলের নেতা এ বিষয় নিয়ে খুবই উত্তেজিত।
শেহরান রনির কথা শুনতেই সাথে সাথে হাত মুঠি বদ্ধ হয়ে গেল। হাতের শিরা উপশিরা ভেসে উঠলো। শেহরান উত্তেজিত কণ্ঠে ড্রাইভারকে গাড়ি তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে নিতে বলল।
— রনি বলল ভাই আপনি যত দ্রুত সম্ভব সংসদ ভবনে আসুন। কলটা কেটে গেল। শেহরান মাইরার দিকে একবার তাকালো।
–মাইরা ফ্যালফ্যাল করে শেহরানের দিকেই তাকিয়ে আছে। কিছু কি হয়েছে?
–না! শেহরান পুরো বিষয়টা চেপে গেল। আর কোনো কথা বলল না। মাইরাও আর ঘাঁটলো না।

ঘণ্টা দুয়েক পরেই গাড়িটি এসে মির্জা ভিলার সামনে থামলো। শেহরান মাইরার দিকে তাকিয়ে বলল যাও।
–মাইরা চোখ ছোট ছোট করে তাকালো। যাবো মানে আপনি যাবেন না?
–না আমার একটু কাজ আছে। ফিরতে লেট হবে তুমি চলে যাও।
–মাইরা আর কিছু বলল না। হয়তো ওনার কাজ আছে ভেবেই গাড়ি থেকে নেমে পড়লো। মাইরা নামতেই ড্রাইভার গাড়ি ঘোরালো। তুমুল বেগে ছুটে চলল রাস্তার দিকে। মাইরা গাড়ি চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই লোকের কখন কি হয় বোঝা বড় দায়। বাড়ির ভেতরে চলে গেল।

শেহরানের কালো গাড়িটা সংসদ ভবনের গেট দিয়ে ঢুকতেই এক ঝাঁক সাংবাদিক ক্যামেরা আর মাইক হাতে গাড়িটার দিকে ছুটে আসলো।
–স্যার! স্যার! গ্লাসটা একটু নামান!
–স্যার, আপনার বিরুদ্ধে বাল্যবিবাহের অভিযোগ উঠেছে। এটা কি সত্য?
–স্যার! আমরা খবর পেয়েছি আপনি যাকে বিয়ে করেছেন তার বয়স মাত্র ষোলো বছর। এ বিষয়ে কিছু বলবেন?
–স্যার, আপনি কি সত্যিই একজন নাবালিকাকে বিয়ে করেছেন?
সাংবাদিকরা একের পর এক প্রশ্ন করেই চলেছে। শেহরান গাড়ির ভেতর থেকেই সাংবাদিকদের দিকে একবার তাকাল। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। কোনো উত্তর দিল না। শুধু ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারা করল।
–দ্রুত চালাও। গাড়ি থামল না। সাংবাদিকদের ভিড় পেছনে ফেলে সোজা পার্কিংয়ের দিকে চলে আসলো। কিছুক্ষণ পর গাড়িটা সংসদ ভবনের সামনে থামল। দরজা খুলতেই দুই-তিনজন বডিগার্ড দ্রুত এগিয়ে এসে শেহরানের পাশে দাঁড়াল।
শেহরান গাড়ি থেকে নামল। শেহরানের মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কী চলছে। রনি ফাইল হাতে তার পাশে পাশে হাঁটছে।

–ভাই?
–শেহরান না তাকিয়েই বলল হুম।
–বাইরে সাংবাদিকদের সংখ্যা অনেক। মনে হচ্ছে বিষয়টা অনেক দূর পর্যন্ত…
–শেহরান শান্ত স্বরে বলল আমি জানি।
বডিগার্ডরা সামনে থেকে ভিড় সরিয়ে রাস্তা করে দিল। শেহরান ধীর পায়ে সংসদ ভবনের মূল গেট পেরিয়ে ভেতরের করিডোরে ঢুকে পড়ল।
–বেলা ৩টা বেজে গেছে। স্পিকার বেল বাজিয়ে অধিবেশন শুরু করলেন।
কিছুক্ষণ পরেই বিপক্ষ দলের ইলহাম সিকদার নিজের আসন থেকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। হাতে থাকা মাইকটা শক্ত করে ধরে চিল্লিয়ে বললেন, মাননীয় স্পিকার। ইলহাম সিকদার একবার শেহরানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন,
আমি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে একটা বিষয় এই মহান সংসদের সামনে উত্থাপন করতে চাই।

–শেহরান চুপচাপ বসে রইল। দৃষ্টি তার ইলহাম সিকদারের দিকে স্থির।
–ইলহাম আবার বললেন, আমাদের এই মহান সংসদের একজন সম্মানিত সদস্য, মাননীয় শেহরান মির্জার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তিনি মাত্র ষোলো বছরের একজন নাবালিকা মেয়েকে বিয়ে করেছেন।
–সাথে সাথে পুরো হলঘরে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল।
শেহরান ধীরে ধীরে চেয়ারের পেছনে হেলান দিয়ে বসলো। চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে ইলহামের দিকে।
–এটা শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়। এটা আমাদের সংসদের মানসম্মানের লঙ্ঘন। একজন সংসদ সদস্য যদি নিজেই আইন ভঙ্গ করেন, তাহলে সাধারণ মানুষ তার কাছ থেকে কী শিখবে? আমি দাবি করছি, এই লোকের অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত!

–শেহরান এবার ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে টেবিলের ওপর রাখা কলমটার দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ পরপর কলমটা হাতে নিয়ে আঙুলের মধ্যে ঘোরাতে লাগল। মুখে কোনো কথা নেই।
–স্পিকার ইলহাম শিকদারকে বসতে বললেন।
–ইলহাম অনিচ্ছায় নিজের আসনে বসলেন।
স্পিকার এবার শেহরানের দিকে তাকালেন। মাননীয় সদস্য শেহরান মির্জা। শেহরান ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাল। আপনার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুতর। আপনি কি এ বিষয়ে সংসদকে কিছু বলতে চান?
–শেহরান ধীরে ধীরে নিজের আসন থেকে উঠে দাঁড়াল।
শার্টের কলারটা ঠিক করে মাইকের সামনে দাঁড়াল। তারপরে বলল মাননীয় স্পিকার। আমি আইনকে সম্মান করি। এবং আমি আইনের ঊর্ধ্বে নই। বিয়ের বিষয়ে যে তথ্য সামনে এসেছে, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। যদি আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়ে থাকে, তাহলে আমি তার দায় নেব।
–কথাটা শুনে ইলহাম আবার নিজের আসন থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন। দায় নেবেন?
–শেহরান আস্তে আস্তে ইলহাম শিকদারের দিকে তাকাল।

–ইলহাম মাইক হাতে নিয়ে বললেন, দায় নিলে হবে না! পদত্যাগ করতে হবে। একজন সংসদ সদস্য হয়ে আপনি আইন ভাঙবেন, তারপর শুধু দায় নেওয়ার কথা বলবেন?
–শেহরান চোখ ছোট ছোট করে। ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরল। কিছু বলল না।
–স্পিকার বললেন ইলহাম সিকদার, বসুন। ইলহাম বিরক্ত মুখে বসে পড়ল।
–স্পিকার এবার শেহরানের দিকে তাকিয়ে বললেন, মাননীয় সদস্য শেহরান মির্জা, অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুতর। আইন সবার জন্য সমান। একজন সংসদ সদস্যও আইনের ঊর্ধ্বে নন। বিষয়টি তদন্ত করা হবে।
শেহরান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। মাননীয় স্পিকার, আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, তার সুষ্ঠু তদন্ত হোক। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি এই পদে থাকতে চাই না।
–শেহরান শান্ত গলায় বলল, আমি আমার পদত্যাগপত্র জমা দিচ্ছি। আমি চাই, আইন সবার জন্য সমান থাকুক। আমার ক্ষেত্রেও। কথাটা বলে শেহরান বসে পড়ল।
–ইলহাম কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতেই হলো, শেহরান মির্জা।
—শেহরান এবার ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল। দৃষ্টি তার শান্ত।

–ড্রয়িং রুমে পিনপতন নীরবতা। রায়হান মির্জা সোফায় বসে মাথায় হাত দিয়ে আছেন। পাশেই শাহানা বেগম শক্ত মুখে বসে আছেন। আজ তাদের ভুলের কারণেই তো এমন একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আর তার জন্য তাদের ছেলেকেই এত বড় সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। কথাটা মনে পড়তেই ভেতরটা অপরাধবোধে ভরে উঠছে তার।

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১৯

–ছায়রা চিন্তিত মুখে চুপচাপ বসে আছে। কেউ কোনো কথা বলছে না।
–এদিকে মাইরা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল। ড্রয়িং রুমের সামনে আসতেই টিভিতে বলা কিছু কথা কানে গেল। কৌতূহলী হয়ে টিভির দিকে তাকাতেই হঠাৎ ওর পা দুটো থেমে গেল। টিভির পর্দায় শেহরানের ছবি।
এটা কী হলো?

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২১