তাকদিরে তুমি পর্ব ২০
মোনালিসা মেহরোজ
রেস্টুরেন্ট হতে তাড়াহুড়ো করে বাড়ির পথে রওয়ানা হলো আসিফ। মনের মধ্যে অজানা এক আশঙ্কা ডানা বাঁধছে তার। হুট করেই বাবা তার এতোবার কল কেনো করলেন, তা ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না যুবক। সাথে নিজের উপরেও বেশ ক্ষুব্ধ হলো ভীষণ। কী হতো ফোনটা রিসিভ করে একটা মিনিট কথা বললে? বাবা তাকে ফোনে না পেলে কোনোদিন দু’বারের বেশি কল করতেন না। আর আজ এতোবার?
অজান্তেই আসিফের বড্ড চিন্তা হতে থাকলো।
আধাঘন্টার রাস্তা সে প্রায় পনেরো মিনিটে পার করে কোনোরকমে গাড়িটা পার্ক করে ভেতরে ঢুকলো। অফিসে অবশ্য আসিফ কল করেছিলো বাবা কোথায় আছেন তা জানতে। অ্যাসিস্ট্যান্ট জানিয়েছিলো, আযান মির্জা অফিসে নেই। সাথে অফিসে নাকি কোনো একটা ঝামেলাও হয়েছে। তাই আসিফ সরাসরি বাড়িতে ঢুকলো মনের মধ্যে অজানা আশঙ্কা নিয়ে।
ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো আসিফের। চারদিকে যেন গুমোট বেঁধে আছে নীরবতা। আশেপাশে কেউ নেই। সদর-দরজাটা ভেড়ানো ছিলো বিধায় সে প্রবেশ করতে পেরেছে। কাজের লোকজনও আশেপাশে নেই। আসিফ শুকনো ঢোক গিললো। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো আযান মির্জার ঘরের পানে। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই আযান মির্জার ঘর হতে মৃদু কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো।আসিফের ভ্রু কুঁচকে গেলো।
সে দ্রুত পায়ে ঘরের দরজার সামনে এসে থামতেই দেখলো আযান মির্জা বিছানায় নিথর হয়ে শুয়ে আছেন। মুখটা শুকনো। কপাল ও হাতে ব্যান্ডেজ করা। আসিফের বুকটা ধক করে উঠলো। বাবার কী করে এই অবস্থা হলো, তা বুঝে উঠতে পারলো না যুবক। সায়না মির্জা স্বামীর পাশে বসে মুখে আঁচল চেপে কাঁদছেন।
আসিফ এই দৃশ্য দেখে যেন ভাষা হারিয়ে ফেললো নিজের। ঠিক তখনই ঘরের একপাশে বসে থাকা ডাক্তার ব্যাগ গুছিয়ে নিতে নিতে বললেন—-
—হয়ে গেছে, মিসেস মির্জা। আমি ঔষধগুলো লিখে দিলাম এতে। ঔষধগুলো জলদি এনে নিবেন এবং নিয়মিত সেবন করাবেন। একটু খেয়াল রাখবেন ওনার। মানসিকভাবেও বিধ্বস্ত উনি। কোনো রকম টেনশন দিবেন না আশা করি। উনাকে এখন যতটা সম্ভব মানসিক ভাবে সুস্থ থাকতে হবে।
বলেই ডাক্তার নিজের ব্যাগ গুছিয়ে নিলেন।
ফাতিহা প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়ে মাথা নাড়ালো। অতঃপর একজন মেইডকে বিনয়ের সহিত ডাক্তারকে এগিয়ে দিয়ে আসতে বললো।
ডাক্তার ব্যাগ তুলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
ফাতিহা প্রেসক্রিপশনের কাগজটা একবার চোখ বুলিয়ে দেখে সায়না মির্জার পানে চাইলো।
—মা! আমি ঔষধগুলো নিতে কাউকে পাঠাচ্ছি। আর বাবার জন্য নরম খাবারের ব্যবস্থা করি। উনাকে খাবার খাইয়ে তারপর ঔষধ খাওয়াতে হবে।
সায়না মির্জা মাথা নাড়ালেন। ফাতিহা বসা হতে উঠে পা বাড়ালো বাহিরের দিকে। আর দরজার কাছে আসতেই হুট করেই শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে থাকা আসিফকে নজরে পড়লো তার। ফাতিহার পা থমকে গেলো। এক মুহূর্তের জন্য রমণীর চোখমুখ লাল হয়ে এলো কেমন। কিন্তু বাইরে সে কথা বললো না। কোনো শব্দ অবধি করলো না আসিফকে দেখে। শুধু অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে এক পলক স্বামীর পানে তাকালো। অতঃপর গটগট পায়ে সেখান হতে বেরিয়ে গেলো।
অন্যদিকে ফাতিহার এমন শান্ত দৃষ্টি আসিফের বুকে অদ্ভুত এক ঝড়ের সূচনা করলো। কেঁপে উঠলো সে। আযান মির্জা তখনো চোখ বন্ধ করে বিছানায় হেলান দিয়ে আছেন। আজ অফিসে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিলো নতুন একটা প্রজেক্ট নিয়ে। সেটাই অ্যাটেন্ড করতে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তবে বাড়িতে ফেলে গিয়েছিলেন ইম্পর্ট্যান্ট একটা ফাইল। কাউকে পাঠাতে চেয়েছিলেন, যাতে সায়না মির্জা ফাইলটা খুঁজে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু সায়না মির্জা সেসময় বাড়িতে ছিলেন না। বাধ্য হয়ে তিনি ফাতিহাকে ফোন করতে চাইছিলেন। তবে আসিফ যেহেতু আছে, তাই তাকে আর কল করেননি তিনি। আর প্রয়োজনীয় ফাইল হওয়ায় কাউকে দিয়ে আনাবেন, সেরকম একটা ভরসাও পাচ্ছিলেন না।
তাই আসিফকে বেশ কয়েকবার ফোন করেছিলেন, যাতে ফাইলটা পৌঁছে দেয়। তবে আসিফ কল রিসিভ করেনি। শেষ মুহূর্তে যখন বাধ্য হয়ে ফাতিহাকে কল করলেন, ততক্ষণে প্রজেক্টটা ক্যান্সেল করা হয়। এবং আযান মির্জাকে সময়ানুবর্তিতাহীন বলে দাবি করা হয়। ভবিষ্যতে কোনো ডিল মির্জা কোম্পানির সাথে করবেন না বলেও জানান তারা। এতে আযান মির্জা ভীষণ ব্যথিত হন। একটা ব্যবসায়িক ভুল শুধু একটা প্রজেক্ট নষ্ট করে না—একটা মানুষের বহু বছরের পরিশ্রম, বিশ্বাস আর প্রতিষ্ঠানের সুনামকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিতে পারে। সেই মুহূর্তে আযান মির্জার মাথায় এসবই ঘুরছিল।তিনি চিন্তিত মুখে একলা বেরিয়ে পড়েন অফিস থেকে।
আর অতিরিক্ত টেনশন ও অন্যমনস্ক থাকায় হুট করেই ছোটখাটো একটা এক্সিডেন্ট হয়ে যায়। যার ফলে মাথায় বেশ চোট পান তিনি।
আশেপাশের কিছু লোক তাকে হাসপাতালে নিতে চাইলে আযান মির্জা রাজি হননি। বরং বাড়িতে পৌঁছে দিতে বলেছিলেন।পরবর্তীতে দু’জন লোক তাকে বাড়িতে পৌঁছে দেন।
কথাগুলো ভাবতেই আযান মির্জার বন্ধ চোখের পাতা গড়িয়ে পানি ঝরলো এক ফোঁটা। ছেলের এভাবে বারবার ফোন প্রত্যাখ্যান করা তিনি ঠিক মেনে নিতে পারেন না। আগেও আসিফ এরকম করতো। তবে আজকে তো তিনি এমনি এমনি কল করেননি! আজ তিনি ছেলেকে প্রয়োজনেই ডেকেছিলেন। বাবার প্রয়োজনের সময়ও ছেলে ফোনটা ধরলো না—এই কষ্টটাই যেনো আঘাতের চেয়েও বেশি যন্ত্রণা দিচ্ছিলো তাকে।
আযান মির্জা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সায়না মির্জা তখনো স্বামীর শিয়রে বসে মুখ চেপে আছেন।
তিনি বাইরে গিয়েছিলেন এক পুরোনো বান্ধবীর সাথে সাক্ষাৎ করতে। আর বাড়িতে যখন ফিরলেন, তখন স্বামীকে এমন নিথর দেখে থমকে গিয়েছিলেন তিনি। ফাতিহা চটজলদি ডাক্তারকে কল করে নিয়েছিলো। শুধু তাই নয়, ডাক্তার আসার আগ পর্যন্ত আযান মির্জার মাথার নিচে বালিশ ঠিক করে দেওয়া, পানি খাওয়ানো, কপালে ঠান্ডা কাপড় দেওয়া—সবকিছু একা হাতে সামলেছিলো মেয়েটা।
আযান মির্জা হয়তো নিজের কষ্টে সবটা দেখতে পারেননি। কিন্তু সায়না মির্জার চোখ এড়ায়নি কিছুই। এরমধ্যে করিডোরে ভারী পায়ের আওয়াজে চমকিত হলেন সায়না মির্জা।সামনে শুকনো মুখে ছেলেকে আসতে দেখে তীব্র অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিলেন তিনি। আসিফের বুকটা ধক করে উঠলো তা দেখে। আযান মির্জাও ততক্ষণে মৃদু চোখের পাতা মেলে ছেলেকে দেখতে পেলেন। ক্লান্ত হাসলেন তিনি।ঠোঁটের কোণায় খুবই সূক্ষ্ম এক হাসি ফুটলো।আসিফের বুক কেঁপে উঠলো তা দেখে। পুরুষটির চেহারা কেমন নীল হয়ে এসেছে।
—বা…বাবা!
কাঁপা কণ্ঠে আযান মির্জাকে ডেকে উঠলো আসিফ।আযান মির্জা পুনরায় হাসলেন।
—বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া হলো?
আসিফ মাথা নিচু করে নিলো অপরাধী ভঙ্গিতে। আযান মির্জা ফের বলে উঠলেন—-
—আলমারির সেকেন্ড ড্রয়ারে তোমার জন্য একটা ব্ল্যাক কার্ড রাখা আছে। নিয়ে নাও। আর যত পারো বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে মজা-মাস্তি করো। তোমার বাবা আর কোনোদিন তোমায় বিরক্ত করবে না। স্বাধীনতা চেয়েছিলে না? দিলাম। যাও এবার।
—বাবা আমি….!
—আসিফ, বলছি যাও।
আসিফ অসহায় মুখে বাবার দিক হতে মায়ের পানে তাকালো।তবে সায়না মির্জাও কোনো প্রতিবাদ করলেন না। তীব্র অভিমানে নিজেও কেমন মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আসিফ শুকনো ঢোক গিলে মাথা নুইয়ে ধীর পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো। জীবনে আজ প্রথমবার নিজের কাজের জন্য অনুতপ্ত সে। আজ প্রথমবার বাবার তীব্র অভিমান তার বুকের ভেতরে গাঢ় দাগ কাটলো। আসিফ নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।ঢুলুঢুলু পায়ে সে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো।
কিচেনের দিকে তাকাতেই খেয়াল করলো, ফাতিহা অত্যন্ত গম্ভীর মুখে খাবার তৈরি করছে। তার ভারী চোখের পাতা আবদ্ধ নিচের দিকে। আসিফ হাত মুঠোই করে দু’পা এগিয়ে গেলো। বলতে চাইলো কিছু। জানতে চাইলো এসব কীভাবে হলো। তবে কোথাও একটা বাধা পেলো। মনে হলো, কোন মুখে সে জানতে চাইবে এসব ঘটনা? তার কি আদৌও জানতে চাওয়ার মুখ আছে?
আসিফ পা ফেরালো। আর বাড়ালো না ফাতিহার পানে। ঠিক তখনই পিছন হতে ফাতিহার নিষ্প্রাণ কণ্ঠ পেছন হতে ভেসে এলো—
—কী করে এক্সিডেন্টটা হলো, এটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো এটা যে এক্সিডেন্টটা হয়েছে। আর তার দায়টা কিন্তু আপনার।
ফাতিহার কথায় পা থমকে গেলো যুবকের।
কথা বললো না আসিফ। বরং স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। থমথমে পরিবেশ। চারদিকে কেউ নেই।
কানে লাগছে শুধু আসিফের ভারী নিশ্বাসের আওয়াজ। এরমধ্যেই ফাতিহা ফের আওড়ালো—
—শুনেছি, শিক্ষা ছাড়া মানুষ শুধরায় না। আজকে তো পেলেন। আশা করছি এরপর আর ভুল হবে না।
ফাতিহা আর কিছু বললো না। কিচেন হতে হাতে সুপের বাটি তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। আসিফ ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো সেথায়। নড়লো না এক পা-ও। বরং অদ্ভুত অনুভূতিতে কাহিল হয়ে পরলো যুবক।
মাঝখানে কেটে গেছে দু’টো দিন।
এরমধ্যে ফাতিহার বাবা ও ছোট নাবা আযান মির্জার অসুস্থতার কথা শুনে এ বাড়িতে এসেছিলেন। এতে আযান মির্জা বড্ড সন্তুষ্ট হন।পুরো একটা দিন ইয়াসিনের সাথে গল্প-গুজব করেই কাটিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। সাথে নাবার অতি মাত্রায় ভদ্রতা আর চঞ্চলতা মুগ্ধ করেছে আযান মির্জাকে। বয়স হিসেবে ছোট নাবার নিষ্ঠা, তার আচার-আচরণ, বড়দের প্রতি সম্মান—সবকিছুতেই যেনো মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সায়না মির্জাও অতি স্নেহে আপন করে নিয়েছিলেন তাকে। তারা চলে গেলে হুট করেই আযান মির্জার একটু ফাঁকা ফাঁকা লাগে। মেয়েটার চঞ্চল কণ্ঠ যেনো পুরো বাড়িটাকে কয়েক ঘণ্টার জন্য প্রাণবন্ত করে তুলেছিলো। যা তারা চলে যাওয়ার পর মির্জা বাড়িকে কয়েক মুহূর্তের জন্য শূন্য করে তুলেছিলো।
পরেরদিন সকালে জানালা দিয়ে প্রবেশ করা সূর্যের রশ্মি মুখে চিত্রকর্ম আঁকতেই চোখ পিটপিট করে তাকালো আসিফ। কানে বাজে পাখিদের মৃদু কলকলধ্বনি। সাথে কুরআন তেলাওয়াতের মিষ্টি আওয়াজ কানে ভেসে আসতেই দেওয়াল ঘড়ির পানে নজর বুলালো আসিফ।
সকাল সাড়ে পাঁচটা বাজে। যুবক নড়ে না।
বিছানায় স্থির সটান হয়ে শুয়ে রইলো। রোজ সকালেই এই সুরটা সে শোনে।ফাতিহা বরাবরই বারান্দার কোল ঘেঁষে ছোট্ট জায়গাটাতে বিছানা পেতে শোয়। আসিফ অবশ্য মাথা ঘামায় না এসব নিয়ে। এরমধ্যেই আসিফ অনুভব করলো, কুরআন তেলাওয়াতের মিষ্টি সুর তার কানে আর লাগছে না। সে নড়েচড়ে পাশ ফিরে অদূরে তাকালো। দেখলো ফাতিহা উঠে দাঁড়িয়েছে বুকে কুরআন চেপে।
কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইলো আসিফ।ফাতিহা কুরআনটা যত্ন করে রেখে দিলো। আসিফ দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলো। বিছানা হতে উঠে ওয়াশরুমে গেলো ফ্রেশ হতে। আর ফ্রেশ হয়ে আসতেই ফাতিহা চট করে তার সামনে বেশ শব্দ করেই বেডসাইড টেবিলে একটা কাগজ রাখলো।আসিফ ভ্রু কুঁচকালো।
—কি এটা?
—বাজারের লিস্ট।
কুঞ্চিত ভ্রু যুগল আরো খানিকটা কুঁচকে গেলো আসিফের। ধীর হস্তে কাগজটা তুলে নিতেই খেয়াল করলো, সবকিছু বেশ ভালো পরিমাণের।এতো বেশি বাজার তো করতে হয় না!
—বাজারের পরিমাণ এতো বেশি কেনো?আর এতো মাংস কি হবে?
ফাতিহা শান্ত দৃষ্টিতে স্বামীর পানে তাকিয়ে আওড়ালো—-
—আজ শুক্রবার, জুমার দিন। আর আমি ঠিক করেছি, আজ মসজিদে মিলাদের ব্যবস্থা করবো। সবকিছু ঠিক করাই আছে। কাল ফরহাদ চাচা চাল-ডাল, এছাড়াও বেশিরভাগ বাজার করে দিয়েছেন। আর বাদ-বাকিটা করে নিয়ে আসুন আপনি। রান্নার কাজ শুরু করতে হবে। জলদি করুন।
আসিফ বিরক্তিকর মুখে কাগজটা টেবিলে ছুঁড়ে দিলো। এরপর তোয়ালেটাও বিছানায় আছড়ে ফেললো একপ্রকার। যা ফাতিহা খুব সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে অবলোকন করে চললো।
—পারবো না আমি। ফরহাদ চাচাকেই বলো এনে দেবে। বাজারে যাওয়ার অভ্যাস নেই আমার।
—না থাকলে অভ্যাস করে ফেলুন।
—হোয়াট?
ফাতিহা তপ্ত শ্বাস ফেললো। আসিফ তার পানে শীতল চাহুনি নিক্ষেপ করে আছে। ফাতিহা ফের কাগজটির পানে চাইলো। মৃদু গলায় আওড়ালো—-
—সদ্য বাবা সুস্থ হতে শুরু করেছেন। এতো বড় একটা এক্সিডেন্ট হতে বাঁচলেন আল্লাহর রহমতে। তাঁর সুস্থতা কামনায় এই মিলাদের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আর তাঁর ছেলে হয়ে আপনি এটুকু পারবেন না?
ফাতিহা থামলো। আসিফ তার পানে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। তীব্র নীরবতা গ্রাস করলো ঘরটাকে। ফাতিহা ধীরে শ্বাস নিলো। তার কণ্ঠ এবার আগের চেয়ে খানিক নরম হয়ে এলো—
—আল্লাহ যখন বিপদ থেকে কাউকে ফিরিয়ে দেন, তখন তাঁর শুকরিয়া আদায় করা উচিত। আমরা তো বাবাকে হারাতেও পারতাম। আজ তিনি আমাদের মাঝে আছেন—এটাই তো আল্লাহর বড় রহমত। তাঁর জন্য দোয়া করা, মানুষকে খাওয়ানো, মসজিদে কুরআন তেলাওয়াত আর দোয়ার আয়োজন করা—এসবের মধ্যে যদি কারও মুখে একবেলা খাবার পৌঁছে যায়, তাহলে সেটাই তো আমাদের জন্য নিয়ামত।
ফাতিহা এবার একটু থেমে ফের আওড়ালো—–
—আপনি জানেন? আজ মসজিদের আয়োজনের পাশাপাশি বাড়িতে কতজন মিসকিনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে? কতজন অনাথ শিশু আসবে একবেলা খেতে! তাদের জন্যও রান্না হবে। কেউ হয়তো সারাদিন পর এই খাবারটুকু খাবে।
রমণীর কন্ঠটা খানিক মিইয়ে গেলো কথাখানা বলতে গিয়ে—
—আর তারপরেও বলছেন যাবেন না?
আসিফ চুপ রইলো। তার নিরবতা দেখে ফাতিহা তপ্ত শ্বাস ফেললো।
—এতো আশা করে থাকলাম আমি… আর আপনি এভাবে হেলাফেলায় নিয়ে নিলেন আমার আকাঙ্ক্ষাকে?
এ পর্যায়ে রমণীর চোখজোড়া কেমন ছলছল করে উঠলো। তবুও সে কান্না করলো না। বরং লম্বা শ্বাস টেনে মনে তীব্র অভিমান নিয়ে আওড়ালো—-
—এরকম নির্দয় কেনো আপনি?
আসিফের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো তার কথায়। ফাতিহা এবার এক পা এগিয়ে এলো।
—আল্লাহ তো সকলের হৃদয় দিয়েছেন। তাহলে আপনারটা কোথায়? বলুন, কোথায়?
আসিফ থমকে গেলো। ফাতিহার কণ্ঠে অভিযোগ ছিলো না। কিন্তু কি ছিলো আসিফ তা ঠিক ঠাওড় করে উঠতে পারলো না। সকাল সকাল তার এহেন কথায় আসিফের বুকের ধুকপুকানি বাড়ে ক্রমশ। ফাতিহা চোখ নামিয়ে নিলো।
—মানুষের জন্য একটু ভালো কিছু করতে গেলে সবসময় নিজের জন্য কিছু পেতে হয় না। কখনো কখনো শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করতে হয়। আপনি বাবার ছেলে। তাঁর জন্য এই সামান্য কাজটুকুও যদি না করেন, তাহলে পরে নিজের কাছেই হয়তো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না।
আসিফের গলা শুকিয়ে এলো। ফাতিহা শেষবারের মতো তার পানে তাকালো। চোখে কেমন এক অসহায় আবেদন।
—আমি আপনার কাছে স্বামী হিসেবে কিছু চাইছি না। শুধু বাবার ছেলে হিসেবে দায়িত্বটুকু পালন করতে বলছি। আজ যদি উনি সুস্থ হয়ে আমাদের সামনে বসে থাকেন, তাহলে আলহামদুলিল্লাহ বলুন। আর তাঁর জন্য একটু দোয়া করুন। তাঁর সুস্থতার জন্য সামান্য একটা চেষ্টা করুন। এটুকু কি খুব বেশি?
আসিফ কোনো উত্তর দিতে পারলো না। ফাতিহা আর দাঁড়ালো না। দ্রুত পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। আসিফের কানে বাজতে লাগলো তার কথাগুলো। চোখ বন্ধ করে ফেললো আসিফ। হাতের মুঠোই শক্ত করে নিলো। কেনো যেনো বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আসে অজান্তেই। সে আস্তে করে দু’পা এগিয়ে যায়। অতঃপর আলতো করে শুভ্র রঙা কাগজখানা হাতে তুলে সেদিকপানে তাকিয়ে রয় এক দৃষ্টিতে।
প্রায় দুই ঘণ্টা পর……
বাড়ির সামনের গেট দিয়ে একটা গাড়ি ঢুকতেই বারান্দায় থাকা কাজের লোকজনের দু-একজন স্বাভাবিকভাবেই সেদিকে তাকালো। পরক্ষণেই তাদের চোখ কপালে উঠলো। গাড়ি থেকে নামছে আসিফ। পরনে সাধারণ পোশাক। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। চুল এলোমেলো। মুখটা ঘামে ভিজে একেবারে ক্লান্ত। দুই হাতে ঝুলছে বড় বড় কয়েকটি বাজারের ব্যাগ। এমন দৃশ্য যেনো এই বাড়ির কেউ কোনোদিন দেখেনি। একজন মেইড তো অবাক হয়ে মুখ হা করে তাকিয়েই রইলো।
আরেকজন আরেকজনের পানে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে ইশারা করলো।
যে আসিফ মির্জা কখনো নিজের পানির বোতলটাও নিজে নিয়ে উঠতে চায় না, সেই মানুষ আজ দুই হাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে আসছে?
আসিফ বসার ঘরে পা রাখতেই আযান মির্জার দৃষ্টি সেদিকে যায়। তিনি থমকে যান একপ্রকার। খানিক আগেই মনটা ভালো করতে এখানে এসে বসেছিলেন। বাড়ি ভর্তি মানুষ। কয়েকজন আত্নীয়-স্বজনও এসেছে। এসময় আসিফকে এভাবে বাজারের ব্যাগ হাতে ঢুকতে দেখে তিনি খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পরেন ভেতরে ভেতরে। চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে চোখের চশমা ঠিক করে ছেলের পানে তাকালেন। আসিফের নজরও এবার বাবার পানে পরলো। অদ্ভুতভাবে বাবাকে পরখ করে মাথা নুইয়ে নিলো যুবক। আযান মির্জা নিজেও চোখ ফিরিয়ে নিলেন।
তাকদিরে তুমি পর্ব ১৯
আসিফ ব্যাগ নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দু’জন লোক আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে দ্রুত তার হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে নিলো। আর আসিফ ব্যাগ তাদের দিয়ে দিয়ে ঘাম মুছতেই নিজের চোখের সামনে পানির গ্লাস আবিষ্কার করলো। চমকে উঠলো সে। সামনে তাকাতেই দেখলো নিজ স্ত্রী তার সামনে পানির গ্লাস বাড়িয়ে দিয়েছে। ফাতিহার চোখ দু’টো অদ্ভুত প্রশান্তিতে ছেয়ে আছে। আসিফ হাত বাড়ালো না। ঠাঁই তাকিয়ে রইলো স্ত্রীর পানে। রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা সায়না মির্জা ছলছলে চোখে চেয়ে মৃদু গলায় আওড়ালেন—-
—আলহামদুলিল্লাহ।
