Home তাকদীর তাকদীর পর্ব ৪

তাকদীর পর্ব ৪

তাকদীর পর্ব ৪
নিরুর কল্পনারাজ্য

— কীরে ব্রো, গতকাল নাকি দ্রুত ফিরে গেলি। তা, বাসর-টাসর হয়নি নাকি? একই শেরওয়ানি? হু? ব্যপারটা কী বলতো?
জুনায়েদের বন্ধু রাফি শুধালো তাকে। রাফির মন্তব্যে জুনায়েদ বিরক্ত হলো। বিরক্তি ঝেড়ে বললো,
— ফর গড সেইক, স্টপ রাইট নাও।
রাফি এবার হতবাক হলো। এ’মুহূর্তে জুনায়েদ রাফির বাড়িতে অবস্থান করছে। রাফি এবার সোফায় গিয়ে বসলো। জুনায়েদ তার সামনের সোফায়। আপাতত কপাল স্লাইড করছে সে। রাফি তাকে দেখে শুধালো,
— হেই ডুড, কিছু নিয়ে টেন্সড?
জুনায়েদ উত্তর দেয়না। তাতে রাফি আরও চিন্তিত হয়। বলে,

— ওই মেয়েটা কিছু করেছে? চোখ-মুখ এমন লাগছে কেনো? ডোন্ট সে মি দ্যাট, তুই ওর কাছ থেকে মার খেয়ে এসেছিস।
জুনায়েদ এবার চোখ গরম করে তাকায়। বলে,
— একসেট ড্রেস দে, বেশি বকবক করে মাথা খাস না।
রাফি বিনাবাক্যে আগে গিয়ে একসেট ড্রেস নিয়ে এলো। জুনায়েদের হাতে তা ধরিয়ে দিয়ে বললো,
— নে, যা! আগে চেইঞ্জ করে আয় দ্যান একটা জায়গায় নিয়ে যাবো আজ তোকে!
জুনায়েদ তিক্ত বিরক্ত হয়ে আছে এই মুহূর্তে। সে মনোযোগ দিলোনা তার কথায়। পোশাক পরিবর্তন করে তার আসল ফর্মে আসলো। তাকে দেখে রাফি উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে বলে ওঠে,
— বাহ! এখন মনে হচ্ছে আওয়ার ক্রাশ বয় জুনায়েদ ইজ ব্যাক নাও।
জুনায়েদের চিন্তিত মস্তিষ্কে এখনও আয়রার আদলের প্রতিচ্ছবি স্পষ্টত। না, না! সে কখনো এমন একজনের স্মামী হতে পারেনা যে কিনা, যেকিনা এক বাচ্চার মা। ওর তো চাই–একজন সুন্দর রমণী; যে তাকে তার উচ্চবিলাসিতা অথবা সকল ধরণের কার্যে সমর্থন করবে। না-তো ওই মেয়ের ন্যায় অমন পর্দাশীল এবং ধার্মিক চিন্তার হবে। ওসব এখনও চলে নাকি? ব্যাকডেটেড কোথাকার! জুনায়েদ নিজেকে যথাযথ স্থির রাখার পরিকল্পনা করলো। ওপাশ থেকে রাফির কন্ঠস্বর ভেসে এলো,

— ব্রো, চল! আজ তোকে একটা নতুন জায়গায় নিয়ে যাবো। কা’মন!
জুনায়েদ ফিরতি প্রশ্ন করেনা কোথায় নিয়ে যাবে। সে শুধু ওই মেয়েটার চিন্তা-ভাবনা নিজ মন এবং মস্তিষ্ক থেকে বের করতে চায়। কেমন যেনো ঘাপটি মেরে বসে আছে সে তার মাঝে। জুনায়েদ কোনোরকম ভণিতা ছাড়াই তার চিরচারিত গম্ভীর মুখে জবাব দেয়,
— ওকে!
অতঃপর তারা বেরিয়ে পড়ে। বাইকে করে ঢাকা শহরের অলিগলি পেরিয়ে বাইকটা থামে রেডলাইট এড়িয়াতে। জুনায়েদ শুরুতে বুঝতে পারেনা কিছুই। তার একটা কারণও অবশ্য রয়েছে। গার্লফ্রেন্ড অথবা ফ্রি মিক্সিং এ সে অভ্যস্ত হলেও কখনো এমন নিষিদ্ধ পল্লিতে তার আগমন ঘটেনি। জুনায়েদ আশপাশ নিগূঢ় দৃষ্টে পর্যবেক্ষণ করেও যেনো আয়রার সেই ঘুমন্ত চেহারা মস্তিষ্কের একপাশ হতে সরাতে পারছেনা। তার বোধগম্য হয়না তার এমন কেনো হচ্ছে। সে এক লহমায় ফোন বের করলো। কী যেনো নাম ছিলো? আমিরা, হ্যাঁ আমিরা-ই তো। বাচ্চা মেয়েটা বললো সালাত আদায় করে এসেছিলো সে। অথচ সে তো জানেই না সালাতের মানে? সে যান্ত্রিক ফোনটির আধুনিক এপ গুগল বের করে সেখানে সালাতের অর্থ খুঁজলো। পরক্ষণেই দেখালো সালাতের অর্থ–’নামাজ!’
জুনায়েদ অবাক না হয়ে পারলোনা। ওই ছোট্ট মেয়েটি নামাজ-কালামে অভ্যস্ত? অথচ জুনায়েদের মনে পড়ে না সে শেষ কবে নামাজ আদায় করেছিলো। এরই মাঝে সে আশপাশ দৃষ্টি তুলতেই অবাক হয়ে গেলো। একদম চিপা গলি। আশপাশের দালানকোঠাগুলো থেকে অশ্লীল কিছু শব্দ ভেসে আসছে। জুনায়েদ অবাক হলো। ভাঁজকৃত কপালে জিজ্ঞেস করলো,

— ইয়ার, এটা কোথায় এনেছিস?
রাফি ফোকলা হাসে। মিহি স্বরে জবাব দেয়,
— সেই একটা জায়গাতে এনেছি তোকে মামা, মজা পাবি!
মজা? জুনায়েদ চারপাশটা ভালো করে পরখ করতেই সে যা বোঝা বুঝে গেলো। সে অত্যাধিক হতবাকতায় বাকহারা হলো। সে আনমনেই বলে ফেললো,
— এটা কোথায় নিয়ে এসেছিস আমাকে তুই রাফি?
রাফি পাশ ফিরে বলে,
— নিষিদ্ধ পল্লি!
জুনায়েদ থেমে গেলো। তার পা আর চললো না। তার পা যেনো কোনো এক অদৃশ্য শক্তিই আটকে রেখেছে। অস্ফুট স্বরে অন্যমনষ্ক হয়ে বলে ফেললো,

— রাফি, হোয়াট দ্যা হ্যাক ইউ ডিড? আমি ম্যারিড তুই জানিস না?
রাফি যারপরনাই অবাক হলো। চক্ষুদ্বয় কোটর হতে উদয় হবার উপক্রম। এ’কাকে দেখছে সে? বিস্ময় নিয়ে সে শুধায়,
— দোস্ত, এটা তুই তো? কী বলছিস এসব? তুই ওই এক বাচ্চার মাকেই নিজের বউ বানিয়ে নিলি? ছিহ্ ইয়ার! অরাটা-ই নষ্ট করে দিলি তুই নিজের।
জুনায়েদ নারাজ হয়ে যায়। সে নিজেকে সামলায়। বলে,
— না না, মেনে নেওয়ার প্রশ্ন-ই আসেনা। বাট স্টিল, আমি এখানে থাকতে চাই না। ব্যাক করবো এক্ষুণি আমি।
রাফি শোনে না কথা। বলে,
— ধূর, কী যা-তা বলছিস তুই হ্যাঁ? এতদূর এসে ফিরে যাবো? এটা হয়?
— ইয়ার তুই বুঝছিস না….
— হাই হ্যান্ডসামস….!
অকস্মাৎ এক মেয়েলি ডাকে দুজনাই থমকায়। একসাথেই সামনে তাকাতেই ওয়েস্টার্ন ড্রেসে অর্থাৎ প্রায় নিজেকে অর্ধনগ্নভাবে উপস্থাপিত করা এক নারীকে দেখতে পায়। পার্থক্য কেবল একটাই– একজন নারীটির সাথে দৃষ্টি মিলিত হওয়ার সাথে সাথেই দৃষ্টি নত করে এবং অন্যজন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে।
রাফি মেয়েটিকে দেখে বলে,

— হাই, সুন্দরী!
মেয়েটি কিছু বলতেই যাবে তার আগেই জুনায়েদের শরীর কেমন অদ্ভুত রকমের খারাপ করা আরম্ভ করলো। ক্রমাগত মাথায় চক্কর দেওয়া অতঃপর চোখের মাঝে জ্বালাপোড়া। মাথা ব্যাথা উঠে গেলো রিতীমতো তার। মস্তিষ্ক আনমনেই যেনো মানতে পারছেনা তার,
‘ ওই স্নিগ্ধ এবং পবিত্র রমণীটির পর জুনায়েদ এমন এক অপবিত্র নারীর ওপর চোখ রেখেছে যার কুলষিত নজরে তার অন্তঃস্থলে থাকা আয়রার আদলের প্রতিচ্ছবি পরিশুদ্ধতা বিনষ্ট হচ্ছে!’
জুনায়েদ কিছু বলে অস্ফুটে,

— রাফি, এখান থেকে চল রাইট নাও। আদারওয়াইজ আমি তোর প্রত্যেকটা হাড় গুঁড়ো করবো।
অবস্থা বেগতিক দেখে রাফি ভয় পায়। জুনায়েদ নিজের মাথা চেপে দাঁড়িয়ে। গভীর নীল চোখদুটো হতে প্রবল স্রোতে অশ্রুরা নির্গত হচ্ছে। রাফি আর ওই মেয়েটির দিকে নজর না দিয়ে জুনায়েদের দিকে মনযোগ পেশ করলো। মেয়েটি তাতে বিরক্ত-ই হলো বটে। অসহ্য কন্ঠে বলে চলে গেলো,
— কোত্থেকে আসে এসব, শুধু শুধু কাজ আর সময়ের বরবাদ ঘটায়। ধূর!
বলেই সে প্রস্থান গ্রহণ করে। অপরপাশে জুনায়েদ সরাসরি বাইকে গিয়ে বসে। সে বাইক চালানোর মতো অবস্থাতে ছিলোই না। তার ওপর তা ছিলো বিএমডব্লিউ। রাফি তাকে হুঁশিয়ারি দিলো,
— ব্রো, শক্ত করে ধর। তোকে হসপিটাল নিয়ে যেতে হবে।
জুনায়েদ নিষধাক্কা দেয়। বলে,
— বাড়িতে নিয়ে চল রাফি। হসপিটাল যাওয়ার দরকার নেই।
রাফি বারণ করতে চায়লো,

— কিন্তু….
— ড্যামম, বেশি কথা বলবিনা একদম। এমনিতেই মাথা একটা ছিঁড়ে যাচ্ছে ব্যাথায়।
— ওকে ওকে, রিল্যাক্স আমি যাচ্ছি।
বেশ কিছুক্ষণের মাঝে রাফি আর সে শাহরিয়ার কুঞ্জের সামনে এসে বাইকখানা থামলো। দারোয়ান সাথে সাথেই মেইন গেইট খুলে দিলো। রাফি বাইক নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই ধাক্কা খেলো জুনায়েদের কথায়,
— রাফি, তুই চলে যা। ভেতরে যাওয়ার দরকার নেই।
রাফি অবাক হয়।
— এসব কী বলছিস তুই ভাই? তুই বলতে পারলি এভাবে?
— আরে ইয়ার, জলঘোলা করিস না। যা বলছি তাই কর। ভেতরে গিয়ে কী করবি হ্যাঁ?
— মনে থাকবে জুনায়েদ। শালা, নেমকহারাম।
জুনায়েদ পাত্তা দিলোনা ওসবে। সে মাথা ব্যাথার দাপটে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে সদর দরজার কাছে চলে আসে। তার অবচেতন মস্তিষ্ক কোনো কারণ ছাড়াই রাফিকে ভেতরে আসতে নিষেধ করলো। কারণ কী তার? সে কী ভয় পাচ্ছিলো আমিরা অথবা ওই মেয়েটা রাফির সামনে পড় যাবে?
সে ড্রইং রুমে প্রবেশ করতেই বাচ্চা বাচ্চা এক কন্ঠ এসে থামালো,

— আসসালামু আলাইকুম, আঙ্তেল!
জুনায়েদ থামলো। তার মন যেনো শান্ত হয়ে এলো। অদ্ভুত রকমের এক শান্তি সে অনুভব করলো তার বক্ষস্থলে। সে চায়লো মেয়েটির পানে। এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। পরণে তার ব্যাগি জিন্স সাথে লেদার জ্যাকেট। কানে হুপ ইয়াররিং তো আছেই। চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করতে করতে সে নিচে বসে পড়লো,
— হ্যালো, কিউটি।
— আপনি সালামের উত্তর দিলেন না তেনো? আবারও?
জুনায়েদ থমকায়। তার জানা নেই সালামের জবাবে কী বলতে হয়। তাদের মতো ক্লাসি এবং উচ্চবংশীয় ছেলে-মেয়েরা তো আর সালামের আদান-প্রদান করেনা। সে ভণিতা ছাড়াই জবাব দেয়,

— কিন্তু আমি তো জানিনা কী বলতে হয়!
— সত্যি? ইয়া আল্লাহ! আপনি সত্যি তানেন না তী বকতে হয়?
জুনায়েদ দু’পাশে মাথা নাড়ায়। তখনই ভেসে আসে মেয়েলি কোনো চিকন নরম; নিম্ন কন্ঠের সুর,
— আমিরা, আম্মুজান! কোথায় আপনি?
জুনায়েদ যেনো অনুভব করলো তার পৃথিবী থমকে গিয়েছে। কন্ঠস্বরের মালিককে একটিবার দেখার জন্য মাথা উ্চু করতেই সে আয়রার স্নিগ্ধ মুখশ্রীর সাক্ষাৎ পায়। মুহূর্তেই তার অশান্ত মস্তিষ্ক সমুদ্রের শীতল পানির ন্যায় শান্ত হয়ে গেলো। আয়রা অবশ্য তাজ্জআ বনে আছে। দু’জনের দৃষ্টি একে অপরের মাঝে। আয়রা ইতস্তত বোধ করলো। সে ভাবতে পারেনি যে এই পুরুষ এতক্ষণে অথবা এই দুপুর সময়ে এখানে উপস্থিত থাকবে। কারণ সকালেই তাকে রুহানি সৈয়দ বলে দিয়েছে সে যেনো খুশিমনে চারপাশটা ঘুরে দেখে। এখন জুনায়েদের আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। তার ফেরার সময় কেবলই রাত। হয়তো রুহানি সৈয়দ নিজেও বুঝতে পেরেছিলেন আয়রার মনের অবস্থা। আয়রা ইতস্তত ভঙ্গিতে সালাম দিলো,

তাকদীর পর্ব ৩

— আসসালামু আলাইকুম!
তবে হঠাৎ ঘটে গেলো এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। মুহূর্তেই জ্ঞান হারালো জুনায়েদ। জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে পড়ে রইলো। ওদিকে আয়রা আর আমিরা দু’জনই অবাক। কী হয়ে গেলো এটা?

তাকদীর পর্ব ৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here