তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২৮
রাফিয়া জান্নাত রিফা
নাঈম তালুকদার শেষ পর্যন্ত নিধি ও আর্দ্রর বিয়েতে সম্মতি দিয়েছেন। তবে সে সম্মতি তাঁর হৃদয়ের গভীর কোনো স্বস্তি থেকে নয় বরং গতকালের সেদিনের অদৃশ্য আতঙ্কে। ভূতুড়ে সেই ঘটনার রেশ এখনো তাঁর স্নায়ুতে কাঁপন তোলে। সেই ভয়ের তীব্রতা নাঈম তালুকদারকে আজও এক অদ্ভুত তটস্থতায় বেঁধে রেখেছে।
সিদ্দিকী বেগমও বহুক্ষণ বুঝিয়েছেন তাঁকে। বুদ্ধি, পরিবার, ভবিষ্যৎ সব দিক বিবেচনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে। অনেক তর্ক, অনুরোধ, নিঃশ্বাসের ভারী ওঠানামার পর শেষে নাঈম তালুকদার ধীরে ধীরে মাথা নত করলেন।
সব দিক বিচার-বিবেচনার পর তিনি এক অনিবার্য নিয়তির সামনে দাঁড়িয়ে, তিনি এ বিয়েতে রাজি হয়ে গেলেন।
এখন তিনি ড্রয়িংরুমে বসে আছেন মুখে এক চাপা গম্ভীরতা, চোখে অদৃশ্য কোনো হিসেব-নিকেশ। তাঁর পাশে নীরবে স্থির হয়ে বসে আছেন সুহানার বাবা, সাফিন তালুকদার। ঘরের অপর প্রান্তে, আলাদা সোফায় কুঁজো হয়ে বসে আছে হরলিক্স ও তার বাবা-মা।
আজকের এই নীরব বৈঠকের মূল বিষয় সুহানা ও হরলিক্সের বিয়ে।
হরলিক্স মাথা নিচু করে রেখেছে লজ্জা আর অনুতাপের ভার তাকে আরও ছোট করে ফেলেছে। নিজের সেই অপ্রত্যাশিত ভুলের দংশন এখনো তার বুকের ভেতর ধারালো কাঁটার মতো বিঁধে আছে।
অন্যদিকে, সাফিন তালুকদার নীতির দিক থেকে বিয়েতে আপত্তি করছেন না। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায় তার অত্যন্ত আদরের মেয়ে সুহানা। তার মতামত না নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সাফিন তালুকদারের পক্ষে স্বভাব নয় আর সুহানাও এমন তড়িঘড়ি প্রস্তাবে সম্মতি দেবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েই গেছে।
এই সময় হরলিক্সের বাবা নরম অথচ দৃঢ় কণ্ঠে সাফিন তালুকদারকে সম্বোধন করে বলেন,,
__ সাফিন তালুকদার বিয়েতে মত দিলেন তো।
সাফিন তালুকদার বলেন,,
__ অনন্ত ভালো প্রস্তাব এটা কিন্তু আমি আমার মেয়ের মতামত ছাড়া কিছুই করতে পারবো না।
আলবানের বাবা নাজিম তালুকদার বলেন,,
__ সুহানা মামনি আর হরলিক্স বাবা কে আলাদা ভাবে কথা বলে নিজেদের মতামত শেয়ার করুক না হয়।
উপস্থিত থাকা সবাই তাতে সায় জানালো।আলিফা বেগম ইতি, বিথী, নীধিকে ডাকলো এবং নাজিম তালুকদার তাদের উদ্দেশ্য করে বললেন,,
__ হরলিক্সকে সুহানার সাথে দেখা করাও।
ইতি, বিথী আর নীধি তিনজনেই বিস্ময়ের চরম সীমানায় দাঁড়িয়ে। তবুও বড় বাবার কঠোর নির্দেশের সামনে কারওই কিছু বলার উপায় নেই। তাই বাধ্য মেয়ের মতো হরলিক্সকে সঙ্গে নিয়ে তারা রওনা দিল সুহানার ঘরের দিকে।
হরলিক্সের অবস্থা আরও করুণ বারবার বুকে হাত বুলিয়ে ফুঁ দিচ্ছে, যেন ভিতরের ধুকপুকানি একটু কমবে। হাঁটতে হাঁটতে তার পা কাঁপছে, আর মাথা নিচু করে অনুতাপে ভরা ছায়ার মতো পিছন পিছন আসছে।
ইতি ও বিথী আজ অস্বাভাবিকভাবে চুপ মুখে সোনার কুলুপ আঁটা। চোখেমুখে বিস্ময়, আশঙ্কা আর খানিকটা কৌতূহলের মিশেল।
কিন্তু নীধি সে তো একেবারেই আলাদা! তার মুখে খুশির ঝিলিক থামতেই চাইছে না। উত্তেজনায় ননস্টপ বকবক করছে, হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে তার আনন্দ যেন সামলে রাখা দায়।
সুহানার রুমে কাছে আসতেই ইতি হরলিক্স কে উদ্দেশ্য করে বললো,,
__ এই রুমে প্রবেশ করুন হরলিক্স ভাই?
হরলিক্স কিছুটা ভয়ভয় করে বলল,,
__ এ্যাম আপনারাও চলুন,না মানে এমনি চলুন?
ফট করে কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বিথী বলে,,
__ হ্যাঁ ওই আমাদের কাজ, তাছাড়া আর কি?নিজের তো আর একটাও জোটাতে পারলাম না?
নিধি বলে,,
__ আমার বিয়েটা হলে তোদের বিয়েটা নিয়ে বাবাকে চিন্তা করতে বলবো?
ইতি নিধির মাথা হালকা টালা দিয়ে বলে,,
__ হয়েছে পাম মারা বন্ধ কর?
হরলিক্স ভেবলাদের মতো নিষ্পলক চেয়ে রইল তাদের দিকে, পরক্ষণে ইতি হরলিক্স কে বলে,,
__ চলেন?
দরজা খোলার মুহূর্তেই সুহানার চোখে বাজের ঝলকানি। রুমের ভেতর পা রাখা মাত্রই হরলিক্স তার গলায় শীতল, শক্ত কোনো কিছুর স্পর্শ টের পেল।
চমকে উঠে নিচের দিকে তাকাতেই দেখল একটি বন্দুক তার গলায় ঠেকানো।আর সেই বন্দুকটা হাতে রেখেছে সুহানা চোখে তীব্র আগুন, মুখে দমিত ঝড়ের আক্রোশ।
হরলিক্সের হাঁটু কেঁপে উঠলো। সে মুহূর্তেই দু’হাত উপরে তুলে নিখুঁত সেলেন্ডারের ভঙ্গি করল আত্মসমর্পণের প্রতিমা দেখালো।
ভয়ে তার গলা শুকিয়ে কাঠ, ঢোঁকের পর ঢোঁক গিলছে বেচারা।
সুহানা দাঁতে দাঁত চেপে, রাগের আগুনে গলাটা কাঁপিয়ে বলল,,
__ ওই মাদারির বাচ্চা তুই আমার ঘরে কেন আইছোস, সেদিন আকাম কইরি শান্তি হয়নি,মনটা কইতাছে গুলি চাল্লিয়া তোরে ঝাঁঝরা করে দেই।যা আমায ঘর থাইকা,বের হ?
ইতি, বিথী, নীধি মোটেও প্রস্তুত ছিলো না সুহানার এমন কান্ডের।ইতি ভরকে গেল এবং বলতে লাগলো,,
__ সুহানা তুই বন্দুক কই পেলি?
বিথী বলে,,
__ উনি তোর সঙ্গে কথা বলতে আসছে? বন্দুক নামা।
সুহানা ঝাঁঝালো কন্ঠে আবার বলে,,
__ এই গোলামের পুঁতের সাথে কি কথা বলবো আমি,পরশু কি করলো দেখলি না?
নিধি বলে,,
__ তোর বাবা এবং আমাদেরকে বাবাই পাঠালো হরলিক্স ভাইকে।তোর সাথে কথা বলার জন্য।
বাবার কথা শুনে সুহানা কিছুটা শান্ত হলো হরলিক্সের গলা থেকে বন্দুকটা নামিয়ে বলে,,
__ আমার বাবা এসেছে, কোথায় বাবা?কই আমি তো জানি না?
ইতি বলে,,
__ হুট করেই এলো।
__ এই লোকরে কেন পাঠাবে আমার সাথে কথা বলার জন্য?
বিথী বলে
__তোদের বিয়ের কথা চলছে।
__ কিইইইই?
সুহানা প্রচুর গর্জে আবার বলে,,
__ এ তোরা সব বের হ তো আমার রুম থেকে। বের হ?
এবার সেখানে উপস্থিত হলেন আছিয়া বেগম, হরলিক্স পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সুহানাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,,
__ সুহা কি হয়েছে চেতে আছোস কেন?
সুহানা কিছুটা ভারাক্রান্ত গলায় বলে,,
__ দেখো না দাদিমা এরা কি শুধু করে দিয়েছে?
বিথী এবার কিছুটা রাগ নিয়েই বলে,,
__ আজব তো আমরা আবার কি করলাম।এই ইতি,নিধি চল তো চল এখানে না থাকাই ভালো।
এই বলে মুখ ভেংচি কেটে তিন বোনেই চলে গেল।
আছিয়া বেগম অনেক বোঝানো ধমকানো টানাটানি করে শেষ পর্যন্ত সুহানাকে রাজি করাতে সক্ষম হলেন। বাধ্য মেয়ের মতো সুহানা এসে বসলো ঘরের ছোট্ট টি-টেবিলের পাশে, বিপরীতে কাঁপতে থাকা হরলিক্সকে বসিয়ে দিয়ে আছিয়া বেগম নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলেন ঘরে রেখে গেলেন তপ্ত নীরবতা আর দুই বিপরীত স্রোতের মানুষের লড়াই।
সুহানা মুখ ফিরিয়ে বসে আছে। অপরদিকে হরলিক্সের অবস্থা আরও শোচনীয় হাত-পা অনবরত কাঁপছে, যেন প্রতিটি শিরা-উপশিরায় ভয়ের স্রোত দৌড়াচ্ছে। কাঁপুনি থামানোর জন্য সে ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড চেষ্টা করছে, কিন্তু শরীরের বিশ্বাসঘাতকতা তাকে থামতে দিচ্ছে না।
অবশেষে, কয়েক সেকেন্ডের উত্তেজনায় ভরা নীরবতার পর সুহানা ধীরে গলা খাঁকারি দিয়ে, স্বরটাকে যতটা সম্ভব শীতল ও ধারালো করে বলল,,
__ কি বলতে এসেছেন বলেন।
হরলিক্স আমতা আমতা করে বলল,,
__ আমি কি বলবো?
__ আজব তো ?
হরলিক্স কাঁপা কাঁপা স্বরে আবার বলে,,
__ আমাকে তো পাঠানো হলো আ আপনার সাথে কথা বলতে,মানে আমার আপনার মধ্য কথা বলে সব ঠিকঠাক করতে।
__ তো কি করবো আমি।
__ আমাকে আপনার পছন্দ হয়েছে?
সুহানা চমকে উঠলো,কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল,,
__ মানে?
__ আমার বাবা মা বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে আপনার বাবাকে,এখন আপনার সাথে কথা বলার জন্য আমাকে এখানে পাঠানো হয়েছে,যাকে বলা হয় দুজনের মধ্যে আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর জন্য।
সুহানা বেশ ভাবনা চিন্তায় পড়ে গেল।জেদি কন্ঠে বলে উঠলো,,
__ আমি এ বিয়েতে রাজি না?
__ আচ্ছা সেটা সবার সামনে বলে দিয়েন? আসি।
হরলিক্স উঠে চলে গেল,এমনিতেই সেদিনের অপ্রত্যাশিত চুমুর কারনে বেচারা হরলিক্স লজ্জা মারা যেতে ইচ্ছে করছে, এখন সুহানার সামনে আরো কিছুক্ষন থাকা তার পক্ষে বড় দায় হয়ে দাঁড়ালো। সুহানা বেশ চিন্তায় পড়ে গেল।খেলনা পিস্তল টা মাথায় ঢুকিয়ে ঘষাঘষি করতে লাগলো।
বিথীর মাথার ভেতর অচেনা এক অনুভূতির জন্ম হয়েছে নামহীন, মুখবিহীন, কিন্তু তীব্র তার উপস্থিতি। সেই অদ্ভুত অনুভূতি তাকে সুস্থির থাকতে দিচ্ছে না মনে যেন অনবরত কোনো অদৃশ্য বেতার-সংকেতের মতো বিক্ষুব্ধ যন্ত্রণা ধরা পড়ছে।মনকে নিজের কাজে ফেরাতে ব্যাকুল হয়ে বিথী বারবার চুলের গোছা মুঠোয় চেপে টেনে ধরে আছে, যেন সেই ব্যথার বিনিময়ে অন্তর্দাহকে থামিয়ে রাখবে।
কিন্তু সেই অজানা অনুভূতি ততক্ষণে মস্তিষ্কের প্রতিটি কোণে নিজের ছায়া বিস্তার করে বিথীকে এক অনিবার্য অস্থিরতার গভীরে ডুবিয়ে রেখেছে।
দির্শকে সেই নীল চোখ বিথী সেই অদ্ভুত অনুভুতির কারণ,চোখ বন্ধ করলেই সেই রহস্যময় নীল চোখ ভেসে উঠছে বিথীর চোখে। বিথী চায় না এটা, বিথী ইদানিং এই কারনেই বেশ শান্ত ও নূইড়ে পড়ছে।সেই সব অনুভূতিক বিথী কাথে অন্তত বাজে অনুভূতি মনে হয়,এখন বিথীর মনে একটাই দৃঢ় সিদ্ধান্ত এই অনুভূতির শেষ দরকার। নিজের ভেতরের ঝড়কে থামানোর জন্য যাই হোক করতে হবে। সে জন্যই বিথী এখন দির্শকের রুমে উদ্দেশ্য পা বাড়ালো।
দির্শকের দরজার সামনে এসে থমকে দাড়ালো বিথী জামা কাপড় চুল, মুখে বরন পরিপাটি করে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সাহস আনলো নিজের ভিতরে। দরজায় কড়া নাড়া লো,,
রুমের ভিতর থেকে গমগমে স্বরে আওয়াজ এলো,,
__ দরজা খোলা আছে,আসতে পারো?
সহসা বিথী দির্শকের কক্ষের ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে থমকে দাঁড়াল। বিছানার মাথায় হেলান দিয়ে দির্শক হাপাচ্ছে শ্বাসের শব্দ যেন কক্ষের নিস্তব্ধতাকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। তার এই অগোছালো, বিপর্যস্ত চেহারা বিথীর কাছে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলে মনে হলো না।
বিথীর মনে এক অজানা শঙ্কা দোলা দিল। দির্শকের সাদা শার্ট পুরোপুরি ঘামে ভিজে গাঢ় রঙ ধারণ করেছে; কপাল বেয়ে নেমে আসছে ঘামের সরু রেখা। ফর্সা মুখচোখ অস্বাভাবিক লালচে,সন্দিগ্ধ, প্রায় কাঁপা গলায় বিথী বলল,,
__ আপনাকে এমন কেন লাগছে?
দির্শক জোরে শ্বাস ফেলে বুকের বা পাশে হাত চেপে বলল,,
__ আই নিড ইয়ুর হেল্প বিথী?
বিথী হকচকিয়ে দির্শকের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,,
__ হ্যাঁ হ্যাঁ বলুন কি করতে হবে।
__ টেবিলে নিট্রোগ্লিসারিন ট্যাবলেট টা আছে ওটা এনে দাও।
বিথী তড়িৎ বেগে সেটা এনে সেখান থেকে একটা ট্যাবলেট খুলে দির্শকের হাতে দিলো দির্শক সেটাকে জিহ্বার নিচে চেপে আবার ধফ করে বেডে হেলান দিলো। আস্তে ধীরে আবার বিথী কে বলল,,
__ নাউ আম ওকে। তুমি এখানে হঠাৎ?
বিথী মুখখানা শুকিয়ে খাঁঠ হয়ে আছে,,
__ আগে বলুন আপনি এমন কেন করছিলেন?
দির্শক ফেচেল হেসে বলল,,
__ আমার এনজাইনার সমস্যা আছে।
__ আমি যতটা জানি এটা ধুমপানের কারণে হয়।
__ নো,দিস ইজ পার্ট অফ আ হার্ট ডিজিজ।
বিথী ছোট করে বলল,,
__ ওহহ।
কিছুক্ষণ দুজনেই নিরব রইল, পরক্ষণে আবার দির্শক বলে,,
__ এ রুমে কেন এসেছো তা কিন্তু বললে না।
বিথী আমতা আমতা করে বলল,,
__ আ ভুলে গেছি।
বিথী আবার বলে,,
__ সকলে কিছু খাননি বোধহয় ,আমি খাবার আনছি।
দির্শক বলে,,
__ মা সিদ্দিকী বেগম খাইয়ে দিয়েছেন আমায়।
__ ওহহ
বিথী আবার বলে,,
__ আপনার জীবনি বললেন না স্যার?রোগের কারণ ও বললেন না।
__ শুনলে কই।
__ শুনলাম না?
__ চাইছো কি?
__ আমি শুনতে চাই আপনি বলুন?
__ আর ক টা দিন ওয়েট করো,সব কিছু তখন এমনি বুঝতে পাবে।এখন ওসব চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে বিয়েতে ইনজয় করো। কিছুদিন পর তো এডমিশন এক্সাম ও আছে।
__ হুম।
বিথী কিছু একটা ভেবে আবার বলে,,
__ দুপুরের খাবার এনে দেই?
দির্শক মুচকি হেসে বিথী চোখে চোখ রেখে বলে,,
__ মা আসবে খাবার নিয়ে তা বলেছে।আজ বড্ড চিন্তাধারী লাগছে তোমায়।
__ হ্যাঁ,না এমনি।আসি তাহলে।
বিথী যাওয়ার জন্য উদিত হলেই দির্শক আবার বলে,,
__ মন মস্তিষ্ক বিগড়ে গেছে তাইতো।
বিথী কিছু বললো না,দির্শক আবার বলে,,
__ পাত্তা দিতে চাও কি, সেই চাওয়া পাওয়া গুলোকে।না চাইলে নিমিষেই মন থেকে উবে যাবে সব।আসতে পারো।
বিথী কোন কথা না বলে চলে গেল।
বিথীর যাওয়ার পানে তাকিয়ে দির্শক বলে,,,
__”আমার ভিতরেও তোমার দহন যা আমায় শান্তি দিচ্ছে না, সেখানে তুমি শান্তিতে থাকবে কি করে,খুব তাড়াতাড়ি তুমি পুড়তে যাচ্ছো উজ্জ্বল নারী।বি রেডি।
বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে দির্শক আবার বলে,,
__ তুই নিজের গন্তব্যে থেকে সরে যাচ্ছিস ডিকে,তোর পতন দেখতে পাচ্ছি আমি।
এই বলে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো দির্শক, হাঁসি থেমে গেল চোখের কর্নিশে পানি চিকচিক করছে,তা বৃদ্ধ আঙ্গুলের সহিত নিয়ে ঝড়ে ফেলে বলল,,
__ আই হেইট টিয়ার্স।
দুদিন পর
আজ বুধবার নিধি ও আর্দ্রের বিবাহের শুভদিনটি ঠিক হলো আসন্ন শুক্রবার। একই শুক্রবারেই সুহানার বিয়ের তারিখও বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এ বিয়ে নিয়ে সুহানার নিজের কোনও মতামত ছিল না সবকিছুই ঘটে চলেছে নীরব স্রোতের মতো। তবে বাবার মুখের অদৃশ্য উদ্বেগ আর দীর্ঘদিনের স্বপ্নের কাছে মাথা নত করে সে রাজি হয়েছে।
অনেক ভাবনাচিন্তার পর একসময় সুহানা উপলব্ধি করল হরলিক্স নামের ছেলেটি মোটেও মন্দ নয়। যেখানে তার বাবার মন সেই ছেলেটির প্রতি সহজেই সায় দিয়েছে, সেখানে সুহানার আপত্তির অবকাশই বা থাকে কোথায়? তবু সেদিনের সেই ক্ষণিক পরিচয়ের পর তাদের আর কোনও কথা হয়নি দেখা তো বহুদূরের কথা। যেন দু’জন দু’কূলের মানুষ, মাঝখানে শুধু নীরবতার দীর্ঘ নদী।
এদিকে বিয়ের আনন্দে উচ্ছ্বসিত নিধিকে দেখে ইতি আর বিথী রীতিমতো হাঁ হয়ে গেছে। তাদের মাথায় একটাই প্রশ্ন এ মেয়েটা আবার কবে থেকে এত বিয়ে পাগল হলো , চক্ষুচড়কগাছ হওয়াই স্বাভাবিক।
যেদিন থেকে নিধি শুনেছে যে শুক্রবারেই তার বিয়ের দিন তক্ষুনি তার ভেতরের ঝড় হাওয়া বেরিয়ে এসেছে। লাফাতে লাফাতে, হাসতে হাসতে, কখনো অতি খুশিতে টেবিলের কোণে ধাক্কা খেয়ে, আবার কখনো দরজায় ঠোকর মেরে, সে সোজা পৌঁছে যায় আর্দ্রের ঘরে। সেখানে দাঁড়িয়ে এক ঝলক প্রেমের দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে বলে,,
— শুনছো, শুক্রবার কিন্তু খুব দূরেও নয় আবার!
বেচারা আর্দ্র মাথা চুলকায়। নিধির এই আচমকা ঝড় তার অভ্যস্ত শান্ত জীবনে একেবারে ভূমিকম্প নামিয়েছে। নিধি যখন তখন হুড়মুড়িয়ে তার ঘরে ঢুকে পড়ে কোনও নক, কোনও সতর্কতা ছাড়া। ঢুকেই আবার খিলখিলিয়ে হাসে, হুটহাট জড়িয়ে ধরে, উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে।
আর্দ্রের অবস্থা তখন এমন যে লজ্জায় দেয়ালে মাথা ঠুকে অজ্ঞান হবে। তবুও তার চোখের কোণে কোথাও এক চিলতে হাসি লুকিয়ে থাকে যেন নিধির এই পাগলামিই তাকে নীরবে বাঁচিয়ে রাখে।
বিয়ের ঘ্রাণে ঘরছাপা এক অদ্ভুত হাওয়া যেখানে নিধির উচ্ছ্বাস, আর্দ্রের লজ্জা, আর ইতি-বিথীর দমবন্ধ করা বিস্ময় মিলেমিশে তৈরি করছে এক সুন্দর, হৈচৈমুখর দিনযাপনের গল্প। আর্দ্র মাঝে মাঝে ভেবেও পায়না যে এই মেয়ে আদৌও বিয়ের মানে জানে তো।নিধির এমন বাচ্চামো কান্ডে মোটেও বিরক্ত হয় না আর্দ্র বরং নিধির এই বাচ্চামো স্বভাবই তাকে বেশ ঝরঝরে রাখে প্রতিনিয়ত।
ইতি ভুগছে চরম সমস্যা,কথ নেই বার্তা নেই হুটহাট করে আলবানে মার হজম করছে মেয়েটা,আবার সময় অসময়ে কফি চা এ নিয়ে রূমে ডাকছে,আজ আলবান আর্দ্র দির্শক কেউই নিজ কর্মস্থলে যায়নি।ইতি কিছু বলছে না মুলত এই জন্যই আলবান লাই পেয়ে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে।
কিন্তু আজ ইতির মুডই নেই ঝগড়া করার। সে ক্লান্ত, মন-মেজাজে ভারঃ তাই নীরবে, অভিযোগহীনভাবে সব কাজ করে যাচ্ছে, নিঃশব্দ কোনো দায়িত্ববোধ তাকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
তিনবার কফি দিয়ে এসেছে আলবানের রুমে।দু’টি শার্ট পরিপাটি করে ইস্ত্রি করে দিয়েছে।বিছানাটাও ঠিকঠাক গুছিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এসেছে নিঃশব্দে। এজন্য মেজাজ টাও বিগড়ে আছে খুব, ঠিক তখনি আবার ডাক আসলো,,,
__ ইতিইইইই
আলবান ডাকলো তাই বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেললো ইতি,চোখে মুখে চরম রাগ নিয়ে পা দুটোকে টেনেটুনে সিঁড়ি বেয়ে আলবানের ঘরে যেতে লাগলো।আলবানের ঘরে এসে,রাগি ভঙ্গিমায় দরজা খানাকে জোরে ধাক্কা মারলো,আলবান কিছুটা চমকে তাকালো ইতি দিকে ,ইতি আলবানের কাছে এসে রাগে ফোঁস ফোঁস করতে লাগলো,কপালে ভাঁজ পড়লো আলবানের, কটাক্ষ করে বলে,,
__ কি হলো, নাগিন রুপ ধারণ হচ্ছে না?
রাগে চোখ জোড়া বন্ধ করে নিলো ইতি,রাগ কে যথাসম্ভব দমিয়ে বলল,,
__ সমস্যা কি?আবার ডাকলেন কেন?
আলবান ও ইতি মাঝে খানিকটা দুরুত্ব ছিলো,আলবান বলল,,
__ এদিকে আয়।
ব্যাস রাগ নিয়ে ঝরঝর করে ইতি বলল,,
__ কাছেই তো আছি,আরো কোথায় যাইতে বলছেন, আপনার ভিতরে ঢুকবো,বাল।
ইতির এহেন কথা শুনে আলবানের কপালে দশ ভাঁজ পড়লো,বুঝলো ইতি প্রচুর পরিমাণে রাগে আছে,আলবান ভাবলো সেই রাগে ঘি ঢালাই যায়।,,
__ মুখটা ওমন পেঁচার মতো করে রেখেছিস কেন?
__ আপনার তাতে কোন সমস্যা?
আলবান মুখ ভেংচালো কিছুটা প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,,
__ শোন না।
ইতি দাঁত কটমট করে রাগ দেখিয়ে বলল,,
__ বলুন।
আলবান আলসে ভাব নিয়ে বলে,,
__ কফির মগটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেছে,ওই দেখ? পরিষ্কার করে দে?
দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ফেলে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,,
__ আমি কি আপনার চাকর লাগি?
__ তার থেকে নিচু কিছু।
ইতি নিজের রাগকে আর সংযত করতে না পেরে আলবানের দিকে এগিয়ে গিয়ে পায়ের পাতায় ভর দিয়ে খপ করে আলবানের চুল গুলো ধরে টেনে বলতে লাগলো,,
__ আমি চাকর লাগি তাই না আজ আপনার একদিন না হয় আমার একদিন,সকাল থেকে এটা কর ওটা কর বলে বলে পাগল করে দিচ্ছেন। চাইছেন টা কি?
চুল টানার ফলে আলবানের মাথা নিচু হয়ে আছে,আলবান মুখ থেকে কাইকুই শব্দ বের করে বলল,,
__ লাগছে ছাড়?
__ ছাড়বো না,কি পেয়েছেন কি আমায়,আমি কি রোবট?
__ বউ হস তো স্বামীর সেবা যত্ন করবি না?
__ বালের স্বামী আমার, কতবার বলবো এ বিয়ে মানি না আমি?
__ সবাইকে বলে দিবো আমি,আমার কাছে বিয়ের কাবিন নামা আছে।
ইতি আরো শক্ত করে চুলের মুঠি ধরে বলে,,
__ আজ টাকলা করেই দিবো রে,কি বললেন আর একবার বলেন?
__ আহহ ইতি লাগছে ছাড়।
__ ছাড়বো না,
আলবান ইচ্ছে করলেই নিজের চুল থেকে ইতির হাত সড়াতে পারে কিন্তু কিছু একটা ভেবে তা করছে না।আলবান এবার বেশ শক্ত করে ইতি হাত ছাড়িয়ে নিলো,হাত দুটো ইতির পিছনে চেপে ইতিকে এক ঝটকায় আলবান তার বুকে আনলো, এবং রাগী কন্ঠে বলতে লাগলো,,
__ বাল তখন থেকে বলছি লাগছে,কথা শুনছিস না কেন?তোকে এক ঝলক দেখার জন্যই তো এমন নির্লজ্জের মতো ডাকি নাকি।
__ আপনার দেখার গুল্লি মারি,মাথা আমার হেব্বি গরম আছে,ছাড়েন বলসি?
আলবান মুচকি হেসে বলে,,
__ ও বাবা এত গরম হয়ে আছিস কেন?এমনিতেও হট ফি..
__ মুখে লাগাম দিন আপন ভাই?
চোখ মুখ কুঁচকে আলবান বলে,,
__ কে তোর আপন ভাই?
__ মনে নেই?
__ না ।
__ আমার মা একদিন আপনায় রাস্তায় কুড়ে পেয়েছিল এটাও মনে নেই।
__ কি আজগুবি কথা বার্তা।
__ হাত ছাড়ুন তো, আপনার গায়ে আবার সেই বিশ্রী গন্ধ,অসহ্য লাগছে।
আলবান বুঝলো গন্ধ নয় বরং সুগন্ধির কথা বুঝাতে চেয়েছে ইতি,যা মুখ ফুটে স্বীকার করে না।আলবান ইতির কথাকে দু টাকার ও দাম না দিয়ে ইতি মাথা চেপে রাখলো তার বুকের মাঝ বরাবর এবং বলতে লাগলো,,
__ নে ভালো করে ঘ্রাণ নে।
ইতি নিজেকে ছাড়ানোর জন্য প্রবল ছটফট করতে লাগলো, কিন্তু আলবানের থেকে নিজেকে এক চুল ও ছড়াতে পারলো না, সর্বশেষ ইতি উপায় না পেয়ে আলবানের প্রসস্থ বুকে জোরে কামড় দিলো,আলবান ব্যাথার চোটে জোরে চেঁচিয়ে উঠলো,আলবানের এমন চিৎকারে ইতি আরো মজা পেলো,ওভাবেই কামড়েই মুখ গুঁজে রাখলো,আলবান আর উপায় না পেয়ে ইতিকে এক ঝটকা মেরে নিজের থেকে সরিয়ে নিল।ইতি ছিটকে মেঝেতে পড়লো। আলবান বুকের কামড়ের স্থানে হাত দিয়ে ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো এবং জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো, কামড়ের ক্ষত টাকে দেখে বলতে লাগলো,,,
__ এ কেমন রাক্ষুসী মেয়ে,উফফফ বাবা নাগিন দাঁত গুলো বসে গেছে।
ইতির রাগ কোনমতেই কমছে না আজ,নাগিন বলায় আরো ক্ষেপে গেলো ইতি, মেঝেতে থেকে উঠে আলবান দিকে হনহনিয়ে এগোতে লাগলো,ইতি কে আসতে দেখে আলবান এক দৌড়ে বিছানায় উঠে বলে,,
__ ওই পেত্নি এগোবি না বলে দিলাম,যাহহ হুস হুস ভাগ।
ইতি কোন কথাই শুনলো না সে ও বিছানায় উঠলো।আলবান বিছানা থেকে আবার ঘুরে আগের জায়গায় আসলো।ইতি ও দৌড়াতে দৌড়াতে বলতে লাগলো,,
__ দাঁড়ান বলছি দাড়ান।
তাদের মধ্যে এমন ঘুরা ঘুরি দৌড়াদৌড়ি চলতেই লাগলো,এই পর্যায়ে ইতি ক্লান্ত হয়ে মেঝেতে ধপ করে বসে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো,আলবান ও তাই করছে হাঁটুতে ভর করে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে।ইতি মেঝে থেকে উঠে আলবানের দিকে তাকিয়ে মুখ ভেংচালো এবং গটগট পায়ে চলে যেতে লাগলো,আলবান হাঁফাতে হাঁফাতে বলল,,
__ শোন?
ইতি রাগি চোখে আবার আলবানের দিকে ফিরে তাকালো,আলবান ফের বলে,,
__ আমি তোরে ভালোবাসি,আই লাভ ইউ,দিল তো পাগাল হে।
ডিবজলের ডায়লগ ছিলো,ইতি রাগে কটমট করে বলে,,
__ পাগলামি চিকিৎসা কর,পাবনা যা।
এটা শাবনুরের ডায়লগ ছিলো।আলবান কিছুটা হাসতে শুরু করলো,আলবান আবার বলে,,
__ আমি তোমার প্রেমের পাগল,তাইতো করি পাগলামো,মেরেছো চটকনা,হের লাইগা কি তুমি প্রেম দিবা না। সত্যি বলছি “ভালোবাসি”।
__ তোর ভালোবাসার গুল্লি মারি রেয়য়য়,দ্বারা,,
এই বলে ইতির হাতে কাছে থাকা ফুলদানি টা ধরে আলবানের নিকটে আবার ছুটলো,আলবান এবার আর দৌড়ালো না,মুখে বাঁকা হাসির রেখা টেনে আনলো,ইতি ও আলবানের নিকটে এসে থেমে গেল,নিজের ফুসরত এতটুকুই ছিলো তার যা এখন শেষ,আলবান ইতির চোখে তাকিয়েই বলে,,
তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২৭
__ কি হলো আয়।
ইতি আর এগোতে পড়লো না। কি হলো কে জানে আলবান ধীরে ধীরে ইতির দিকে এগোতে লাগলো,ইতি ঢোঁকের পর ঢোঁক গিলে পিছাতে লাগলো,আলবানের পরবর্তী পদক্ষেপ আঁচ করতে পেয়ে ঘুরে নিজের রুমে ভো দৌড় দিলো ইতি।
