Home তিন তরঙ্গের আলোকছটা তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৫২

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৫২

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৫২
রাফিয়া জান্নাত রিফা

আজ শুক্রবার জুমার নামাজ পড়ে সবাই বাড়ি ফিরছে, তালুকদার বাড়ির আলবান, আর্দ্র, নাঈম তালুকদার এরাও নামাজ পড়ে আসলো সবে,গতকালই নাজিম তালুকদারকে জেলে ভরা হয়েছে তালুকদার বাড়ির পরিবেশ এখন আর আগের মতো নেই।সবাই নিশ্চুপ হয়ে আছে,খাওয়া দাওয়ায় ও যেন সবার অরুচি পড়েছে বেশ। সেদিন দির্শকের ফাঁসির রায় শোনার পর বিথী এক ট্রামার মধ্যে পড়ে আছে, খাওয়া দাওয়া কিছুতেই করছে না মেয়েটা, প্রায় প্রায়ই চিৎকার করে কান্না করতে শোনা যাচ্ছে,আর সবসময় বলছে,
“এসব আর সহ্য হচ্ছে না,এখন ঘরে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।”
ইতি আড়ালে থেকে বলেছি,,
“কোথায় যাবি?”
“কবর”

সেদিন বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া খাবার গুলো দির্শককে খেতে দেয় নি পুলিশ, দির্শকের ফাঁসি নির্ধারণ করা হলো ২৭ এ মার্চ ঠিক এই দিনই ওর মায়ের ফাঁসি হয়েছিল।
বিথী ঘর বন্ধ করে রেখেছে কারও সাথে ঠিকমতো কথা বলছে না সে,খাওয়া দাওয়া তো নেই,কতবার ইতি,নিধি ওর সাথে সাক্ষাৎতের চেষ্টা করল কিন্তু পেলো না।ঘরে হালকা আলো ছড়িয়ে আছে সেই আলো ও বিথীর চরম বিরক্ত লাগলো, বিথী এখন আর কাঁদে না হয়তো চোখের পানি ফুড়িয়ে গেছে,আজ বিথী সকালে উঠেই চিঠি লিখতে বসেছে,দির্শককে যে সংশোধনাগারে রাখা হয়েছে সেখানে বিথী গিয়েছিল যদিও দির্শকের সাথে দেখা হয়নি,তবে সেখানে এক বৃদ্ধ দাড়োয়ানের সাথে বিথীর বেশ বনাবনি হয়েছে। একদিনেই বৃদ্ধের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে সে,আজ চিঠি লেখার কারণটা হলো ওই বৃদ্ধকে এই চিঠি দিবে এবং উনি যাতে এটি দির্শকের কাছে পৌঁছে দেয়।সেই প্রস্তুতি নিয়েই বিথী আজ সাদা কাগজে মনের সব কথা ঢেলে দিচ্ছে,কলম দিয়ে লিখছে ও চোখের পানি সেই সাদা কাগজে পড়ছে,এতে আরও বিরক্তি বেড়ে গেল বিথীর।

কারাবন্দির পোশাক পড়ানো হয়েছে দির্শকে,জেলের পরিসর সুদূর তবে চারিদিকে দেওয়াল দারা বেষ্টিত, এখানে দির্শকে খুব ভারী লাগে,তখন ঘনঘন নিশ্বাস ছাড়ে,হুট করে এই চার দেওয়ালের মাঝে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে যেন।খাওয়া দাওয়া ও ঠিক ভাবে হয় না ওর, সেখানকার কর্মীরা খাবার দে দির্শককে কিন্তু দির্শকের খাওয়ার আগেই তা অন্য কেউ ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায়।দির্শকের সঙ্গে আরো আসামি আছে যারা দির্শকের খুব দুর্ব্যবহার করে,তাতে দির্শক টু শব্দটি ও করে না নিরবে সব সহ্য করে নেয়,জেলের ভিতরে বেশ বড় বড় হাতে গোনা কয়েকটি গাছ আছে সেই গাছ গুলোতে গোল করে বসার জায়গা করা ।এখন সেখানেই দির্শক বসে,পেটে হাত দিয়ে আছে, প্রচুর খিদে পেয়েছে সকালে খাবার দিয়েছে তবে খেতে পারলো আর কই,এখন তো আর দির্শকের জন্য কোন খাবার বরাদ্দ নেই, দুপুরের দিক একটা করে রুটি খেতে দিবে,খিদা নিবারণের জন্য একটু আগেই চার গ্লাস পানি খেয়ে এখানে এসে বসলো,মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে ওর,মনে পড়ছে এভাবেই ও ওর মায়ের সাথে পাঁচটা বছর জেলে ছিল।তবে সেই ছোটবেলায় জেলের থাকা মহিলা ও মহিলা পুলিশ গুলো দির্শককে খুব ভালোবাসতো, দির্শকের তখন বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে ধারণা ছিল না,ও মনে করতো এই চার দেওয়ালটাই ওর বাড়ি এটাই সব,সেখানে দির্শক একাই বেড়ে উঠেছিল দির্শক তখন বন্ধু বান্ধব সম্পর্কে ওর ধারনাও ছিল না।

ছয়বছর বয়সে জেল থেকে বেরিয়ে খোলা প্রকৃতি দেখে মাথা ঘুরেছিল ওর মনে হয়েছিল ও যেন অন্য কোন এক দেশের চলে এসেছে তবে যখন প্রকৃতির বাতাস ওর গায়ে লাগলো তখন এত শান্তি অনুভব হয়েছিল যে ওখানেই সে ঘুমিয়ে গেছিল, এসব ভাবনায় বিভোর হলো দির্শক হঠাৎ সেখানে একজন কনস্টেবল পুলিশ হাক ছাড়লেন,,
“তুমি ই কি সেই খোকা দির্শক না? যে ছুটাছুটি করে বেড়াতে জেলে।”
দির্শক চমকে তার দিকে তাকিয়ে বলল,,
“হ্যাঁ।”
“তোমার কেইসটা পড়েছি আমি, অত্যন্ত খারাপ হয়েছে এটা,তবে আইনের বিধানের অন্যায়।”
এই বলে দীর্ঘশ্বাস শ্বাস ছাড়লেন তিনি।দির্শক কিছু বলল না উনি আবার বললেন,,
“ছয়বছর আগে জেল থেকে বের হওয়ার পর তোমাকে অনেক খুজেছিলাম।”
দির্শক অবাক হলো কিন্তু চোখে মুখে তার প্রতিচ্ছবি ফুটল না,,
“কেন?”
“তোমার মা তোমার জন্য চিঠি রেখে গিয়েছিল।”
হাঁসির ঝিলিক দেখা গেল দির্শকের মুখে নিজের অজান্তেই চোখের কোনে পানি কিচকিচ করতে লাগলো। ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল সে,,

“কই সে চিঠি।”
কনস্টেবল পকেট থেকে কাগজ গুলো বের করে দির্শকের দিকে দিতেই একপ্রকার ছিনিয়ে নিল দির্শক ,উনি সামান্য হাসলেন এতে,,
“আজ জানতে পেলাম তুমি নাকি এই জেলেই আছো তাই দিতে আসলাম।”
চুপ রইল দির্শক, কনস্টেবলের চোখে দির্শককে খুব শুকনো শুকনো লাগলো,মনে হলো ক দিন যাবৎ খায় নি যেন, ওনার বুক মোচড় দিয়ে উঠল,ছোট বেলার মতো নিষ্পাপ এই ছেলেটি, এখনো কি মায়া এই মুখে, দ্বিধাদন্ড এক পাশে রেখে বললেন,,
“কিছু খাও নি।”
সাথে সাথে দির্শক মাথা ঝাঁকিয়ে না বলল,হয়তো দির্শকের ভাবনায় এলো এনি যদি তাকে খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন,তাই হলো,
“চলো আমার সাথে।”

দির্শক কথা সাথে ওনার সাথে যেতে লাগলো,জেল খানায় অনেক ধরনের দোকানই আছে ।যেখানে প্রয়োজনীয় সব পাওয়া যায়, সেখানে হোটেল ও ছিল কিন্তু ওসব কিনে খেতে হবে। দির্শকের কাছে তো কিছু কিনে খাওয়ার মতো টাকা নেই।কনস্টেবল ভাত,মাছের এক পিস,ডাল দির্শকের মুখের সামনে ধরলো,দির্শকের চোখ ধাঁধিয়ে এলো এসব দেখে,মনে হলো কতদিন থেকে যেন খায় না এমন ভালো তরকারি দিয়ে ভাত,মাথা নিচু করেই দির্শক ভাত মাখিয়ে মুখের সামনে এনেই থেমে গেল ,এবার মনে পড়ে গেল বিথীর কথা , বিথীও তো তার এতো ভালো খাবার খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে,ও তো জানেই না যে তার দুষ্মন স্যার আজ ভালো তরকারি দিয়ে ভাত খাচ্ছে।এই পর্যায়ে দির্শক আর ওই ভাত মুখে নিল না মাছের বাটিটি সড়িয়ে রাখল,ওই ভাতে পানি ঠেলে খেতে লাগল, কনস্টেবল অবাক হলো কিন্তু কিছু বলল না,খেতে খেতেই অসহায় সুরে বলল দির্শক,,
“সরি বিথী।”
কয়েক ফোঁটা চোখের পানি গড়িয়ে পড়লো সে ভাতের প্লেটে,তারপর আবার মনোযোগ দিয়ে ভাত খেয়ে নিল সে।পেট পুরে খেল,যেন আর দুদিন না খেলেও আর খিদে না লাগে।

দির্শক এখন বসে আছে গাছের বেদিতে,এখন সে মায়ের চিঠি পড়বে।কাগজ গুলো বেশ পুরোনো তার ছাফ স্পষ্ট হয়ে আছে, ভাঁজ পড়ে গেছে একটু হলেই এই ছিঁড়ে যেত বোধহয়,এর জন্য কনস্টেবলের প্রতি এক কৃতজ্ঞতা জন্মালো দির্শকের।
দির্শক চিঠি গুলো তার বুকে জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে মা কে অনুভব করতে চাইল।তখন দির্শকের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো নিরবে,এরপর চিঠি গুলো দীর্ঘ একটা ঘ্রাণ নিল,হয়তো এতে মায়ের শরীরের ঘ্রাণ পাওয়া যাবে,দির্শক তা পেল ও, তাতে চওড়া করে হেসে উঠলো সে।ডায়েরির প্রথম কাগজ খানা উল্টাতেই দেখতে পেল বড় রে লেখা,,,
“মা,মা,মা, এবং মা, শুধু ই মা, তোমার মা।”
প্রিয় খোকা,

আমি তো একদিন মরেই যাবো,তবে মরে যাওয়ার আগে বলেই যাই তোমাকে নিয়ে আমার অনুভূতি,জানো সোনা,তুমি পেটে থাকাতেই যখন আমার ফাঁসির রায় এলো তখন আমি আমার জন্য কাঁদিনি কেঁদেছিলাম তোমার জন্য,তখন তোমাকে পৃথিবীর মুখ দেখানোর জন্য মরিয়া ছিলাম আমি,তারপর পুলিশ যখন জানতে পেল আমার গর্ভে তুমি বেড়ে উঠছো তখন ওরা রায় বদলালো এবং ছয় বছর পর আমার ফাঁসি নিল,জানো খোকা, সেদিন এত খুশি হয়েছিলাম যে তোমার এই নাচ না জানা মা টিও সেই খুশিতে নেচে উঠেছিল।
আমি ছিলাম বৌদ্ধ ধর্মের,তারপর তোমার বাবাকে বিয়ে করার পর পুরোপুরি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করি এই ধর্মে খুব শান্তি ,খুব শান্তি যতবার আমি আঘাত পেয়েছি ততবারই আমি নামাজ আদায় করে আল্লাহর নিকটে কেঁদেছি তখন এত শান্তি উপলব্ধি করেছি যা বলার বাইরে,তারপর এঁকের পর এক কোরআন,হাদিস পড়তে থাকি,এভাবেই সময় কাটাতাম।

তারপর একদিন জানতে পেলাম তুমি আমার গর্ভে, তোমার অস্তিত্বের খবর পেয়ে আমি আনন্দে প্লাবিত হয়েছিলাম।আমার শরীর আস্তে আস্তে পরিবর্তন এলো। তারপর তোমার বাবা আমাকে ধোঁকা দিয়ে আমার যত সোনা,গহনা টাকা পয়সা ছিল সব নিয়ে এক রাতে পালিয়ে গেল ও তোমার কাপুরুষ বাবা ছিল,আমি ভুল লোকের হাত ধরেছিলাম,তবে ওই লোকটাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ যে এত সুন্দর এক ধর্মের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, এবং আমার হৃদয়ে শান্তি স্থাপন করার জন্য।ওই লোকট আমায় ছেড়ে যাওয়ার পর আমি একা হয়ে যাই। সবাই বলে আমি নাকি একটু বেশিই সুন্দর। তাই তো কুনজরের পর কুনজর লেগেই থাকত। একদিন ঘরে চাল,ডাল সব ফুরিয়ে এলো, তিনদিন পানি খেয়ে থাকলাম।তখন ভাবলাম তোমাকে নিয়ে এভাবে চললে হবে না।

তাই বাধ্য হয়ে আমি আমার বাবার বাড়ি ফিরে আসি,জানো , সেদিন আমাকে আমার বাড়ির লোক খুব মেরেছিল,আমার ঠোঁট দিয়ে রক্ত ঝরছিল ,গালে থাপ্পড়ের পাঁচটা আঙুল বসা ছিল , পরিবারের বারোজন সদস্যই দুই তিনটা করে মেরেছিল আমায়,তোমার অস্তিত্বের কথা বলি নি আমি বললে হয়তো পেটে লাথি মারতো। সেদিন দূর্বল শরীর নিয়েই,একের জনেন পা ধরে খেতে চাইলাম,কেউ খেতে দিল না,আমার মা ছিল না।মা থাকলে ঠিকই খেতে দিত। সৎ মা ও সৎ ভায়ের সংসার তো তাই কারো হৃদয়ে একটু ও দয়া হলো না আমার জন্য।
তারপর বাড়ির সব কাজ করে দিতাম তাদের,ওরা খাওয়ার পর যে খাবার বাঁচত তাই খেয়ে নিতাম,আর বেশি করে পানি খেতাম। কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল আমার শরীরে আস্তে আস্তে পরিবর্তন আসতে লাগল,এমন পরিবর্তনে আমি খুব ভয় পেতাম কারণ আমি যা খেতাম তাই বমি করে দিতাম। আল্লাহ শপথ করে বলছি তুমি পেটে আসার পর আল্লাহ তায়ালা আমার ধৈর্য শক্তি অসীম করে দিয়েছেন, দূর্বলতা, অসহনীয় ব্যাথা,খেতে না পারা ঘুমাতে না পারা,আবার বাড়ির সব কাজ এক হাতে করা।

এর মধ্যেই কোন একজনের কুনজরে পরি আমি,বাড়ির কেয়ারটেকার উনি খুব স্নেহ করতেন, একদিন বাগানে হাটার সময় এক অপরিচিত লোক খুবই খারাপ ব্যবহার করে আমার সাথে, কথাকাটাকাটি মারামারির একপর্যায়ে কেয়ারটেকার তার পেটে ছুরি বসিয়ে দেন । এবং কেয়ারটেকার পালিয়ে যায়,এবার সেখানে উপস্থিত হয় নাঈম তালুকদার বাংলাদেশী ওনি লোকটার পেটে ছুরি দেখে সরল ভাবেই পেট থেকে ছুড়িটা বের করে দেয়, লোকটিকে বাঁচানোর দায়ে।তখনি উনি আমাকে দেখে ভয় পেলেন মনে করলেন হয়তো আমি ভাবলাম উনিই আসল খুনি এই ভয়ে চলে যান তিনি।
এর মধ্যেই উনি ওনার বড় ভাই নাজিম তালুকদারকে নিয়ে উপস্থিত হলেন, অত্যন্ত ভালো লোক,উনার জন্য এই নিরাপদ আমিটার ফাঁসি হলেও তা আমি মাথা পেতে গ্রহন করে নিয়েছি। নাজিম তালুকদারের কথা হতো প্রায় প্রায়ই আমার এক পর্যায়ে মনে হলো নিজেকে সেভ রাখার জন্য নাজিম তালুকদার কাছে সাহায্য চাওয়া দরকার,সে অনুযায়ী ওনাকে জোর করতে শুরু করলাম। উনি অনেক ভেবে রাজি হয়ে গেলেন আমাকে বাংলাদেশ নিয়ে যাওয়ার জন্য।সেই রাতেই কাউকে না বলে উনার সাথে যেতে গিয়েই ঘটলো,কেউ একজন দেখে ফেলায় জোর করে আমাদের বিয়ে দিয়ে দিল।

তোমার জন্যই সেদিন চুপ ছিলাম সোনা, তোমার কথা চিন্তা করেই সে বিয়ে করি আমি।যদি নাজিম তালুকদার আগে থেকেই বিবাহিত তাই এ বিয়ে ইসলামী শরীয়তে গ্রহনযোগ্য ও নয়,আমার সৎ মা ও সৎ ভাই হয়তো সেদিন নিস্তার পেল আমাকে অন্যর ঘাড়ে চেপে দিয়ে, শুকরিয়া যে নাজিম তালুকদার আমাকে একখানা বাড়িতে এনে রাখলেন,তার একমাত্র পরই ডিভোর্স ও দিল আমায়।উনি খাওয়া দাওয়ার ও ব্যবস্থা করে দিলেন।
যেদিন আমাকে পুলিশ খুনে অপবাদে ধরলো সেদিন ঘটেছিল অপ্রত্যাশিত এক ঘটনা,যা ওই ডায়েরিতে বলে রেখেছি আমি।

একটা কথা জানো খোকা,
তোমার অস্তিত্ব টের পেতেই আমি প্রথম থেকে মনে হয়েছে তুমি ছেলে সন্তান হবে,এটাই বড় শুকরিয়া আমার কাছে।জেলে দিনকাল ভালোই কাটতো আমার,ওখানকার সবাই খুব ভালো ছিল ভালো ভালো খাবার, ফলমুল খেতে দিতো,আমার থেকে থেকেও বেশি মহিলা পুলিশ,ও আসামি মহিলা গুলো এরা তোমাকে নিয়ে খুব ভাবতো ‌।সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে দিন দিন আমি ভারী হয়ে উঠতে লাগলাম,তোমার অস্তিত্ব টের পেতাম,তুমি নড়াচড়া করতে।এতোই ভারী হয়ে উঠলাম যে, কোথাও বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারতাম না, হাঁটতে পারতাম না, এভাবে যত দিন যাচ্ছিল তত তোমার জন্য আমার ভালোবাসা বাড়ছিল,তখনও আমার বারবার মনে হতো আমি যদি তোমাকে জন্ম দিতে গিয়েই মারা যাই,তোমার মুখ না দেখেই যদি মারা এসব ভাবনা কুঁড়ে কুঁড়ে খেত।
মাঝে মাঝে পেটে এমন ব্যাথা উঠতো যে আমি নিজেকে গুটিয়ে নিতাম।

এরপর সময় এলো,সেই মাহেন্দ্রক্ষণ!সেদিন আমি এমন এক ব্যাথা অনুভব করলাম যে,মনে হলো এই বুঝি মারা যাই আমি। ব্যাথার পর ব্যাথা,চাপের পর চাপ, সেকেন্ডের পর সেকেন্ড! মিনিটের পর মিনিট! আল্লাহর কসম সেই সময়টা আমার জীবনের দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। তবুও চিন্তার কেন্দ্র বিন্দু শুধু তুমিই ছিলে, সবসময় আল্লাহ কে ডাকছিলাম।
অতঃপর তুমি এলে, তোমাকে আমার কোলে দিল,তখন তোমার চেহারা দেখা মাএই সকল যন্ত্রণা,সকল দুঃখ ব্যাথা নিমিষেই মিলিয়ে গেল,আমার চোখ চোখ ভরে উঠলো অশ্রুতে।তখন তোমাকে বুকে নিয়ে বললাম,,
“সুবহানা রাব্বিলয়াল আ’লা!”
প্রিয় সন্তান,

এরপর শুরু হলো তোমাকে বেড়ে তোলার কার্যক্রম। বিছানায় একদমই গা এলিয়ে দিতে চাইতে না,হুট করেই কান্না করতে তখন আমি হুড়মুড়িয়ে উঠে তোমার কোলে নিয়ে হাটতাম।
এরপর তুমি আস্তে ধীরে হামাগুড়ি দিতে লাগলে তখন তা দেখে নিজেই আমি কুটি কুটি হাসতাম।এরপর আঙ্গুল ধরে হাটতে শিখলে,তোমাকে তখন আরবি বাংলা, ইংরেজি পড়াতে শুরু করি, তোমার আইকিউ খুবই প্রকট,একবার কিছু বললে তা মনে থাকতো তোমার,তোমার মেধার প্রশংসা অনেকেই করেছিল।
এরপর তোমার থেকে আমি দুরুত্ব বাড়াতে চাইলাম জোর করেই কিন্তু তুমি তখন আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝো না সারাক্ষণ আমার আঁচল ধরে ঘুরে বেড়াতে,তখন তোমাকে আমার কাছ থেকে সড়াতে হতো কারণ আমার সেই কাঙ্খিত ফাঁসি দিন খুব কাছে এসে গিয়েছিল।

আর একটা কথা কি জানো তোমার জন্মদিনের দিনই আমার ফাঁসির তারিখ ছিল।২৭ মার্চ ১৯৯৫,সেদিন রাতে তোমাকে ঘুম পাড়ালাম তুমি তখন বারবার বলছিলে,,
“মা আমার খুব ভয় করছে,মনে হচ্ছে যেন তুই আমাকে ছেড়ে দুরে কোথাও চলে যাচ্ছো।”
এই কথার উত্তর আমি তোমার আজও দিতে পারি নি,খুব কান্না করেছিলাম একদমই ইচ্ছা ছিল না তোমাকে ছেঁড়ে যেতে। সেদিন নিজের হাতে খাওয়ালাম,গোসল করালাম,চুমু খেলাম একদম শেষ বারের মতো।
সেদিন রাতে তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো,খুব কান্না করেছিলাম সেদিন বাবা।
একের পর এক চুমু খেলাম তোমার মন প্রাণ ভড়িয়ে,সোনা বাবা আমার,খুব ভালোবাসি তোমায়, জীবনে অনেক বড় হবে তুমি, সর্বদা সবার বিপদে আপদে পাশে থাকবে, অন্যায়কে সমর্থন করবে না। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করবে,মায়ের জন্য অনেক দোয়া করবে।যেকোন কিছুতেই আমাকে সরন করবে আমায়,পাবে আমায়।
তোমার জীবনের একজন নেক জীবন সঙ্গী আসবে যার সাথে সুখে সংসার করবে।মাকে ভুলো না যেন সোনা,মা তোমায় খুব ভালোবাসে,খুব ভালোবাসের।
ইতি,
তোমার জন্মদাত্রী মা জননী।

দির্শকের চোখ ভিজে এলো অশ্রুতে , শরীর অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপতে লাগলো,তার মা তার জন্য এত কষ্ট করছে, কান্নারা সব বাঁধ ভেঙে এলো দির্শকের, সেখানেই ধুপ করে হাঁটু গেড়ে বসে শব্দ করে কান্না করতে করতে জোরে চিৎকার করে বলল,,
“মায়ায় য়য়য়য়য়য়য়য়,আমি ভালো নেই তোমাকে ছাড়া,মায়য়য়য় কোথায় তুমি,মায়য়য়য় আমার পৃথিবী অন্ধকার করে দিয়ে কেন চলে গেলে এভাবে,তুমি মারা যাওয়ার পর আমার থাকার জায়গা ছিল না মায়য়, তিনদিন আমি তোমার কবরের পাশে থেকেছি আমি,তোমার কবর জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়েছিলাম,ওই তিনদিন আমি ঘাস খেয়ে ছিলাম মায়য়য়। খিদের জ্বালায় মানুষের খাবার চুরি করেছি পর্যন্ত, এজন্য অনেক মার খেয়েছি আমি,মায়য়……….”
সেখানে জড়ো হলো আরো কিছু আসামি দির্শকের চিৎকার শুনে এসে জড়ো হয়েছে।
সেদিন ছোট দির্শক তার মায়ে কবর জড়িয়ে অনেক কেঁদেছিল ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠে বলেছিল,,

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৫১

“মায়য় কষ্ট হচ্ছে মা, তোমাকে কিছুতেই ফিল করতে পারছি না মা।,ও মা,ইয়া আল্লাহ মা চাই আমার,মা দাও আল্লাহ,খুব কষ্ট হচ্ছে আমার।
আমার খিদে পেয়েছে মা,খুব খিদে পেয়েছে,ঘাস খেয়ে আর কতক্ষন থাকবো মা।মা আসো না,আমাকে খাইয়ে দিয়ে যাও না,আদর করে দাও আমায়।গায়ে কত মাটি আমি তো পরিষ্কার করতে পারছি না,আমার পোশাক ও নেই মা।”
মায়……..

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৫৩