Home তিমিরে ফোঁটা গোলাপ তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ৮১+৮২

তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ৮১+৮২

তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ৮১+৮২
Taniya Sheikh

পরদিন যখন ইসাবেলার ঘুম ভাঙল তখন সকাল গড়িয়ে দুপুর। আজ সূর্য ওঠেনি। তাপমাত্রা নেমে গেছে। জানালার বাইরে তুলোর মতো তুষার পড়ছে। সারারাত জ্বলতে থাকা ফায়ারপ্লেসের আগুন নিভে ছাইয়ে চাপা পড়েছে। এই সুযোগে বাইরের হাড় কাঁপানো শীত ঢুকে পড়েছে ইসাবেলার কক্ষে। লেপটা আরও ভালো করে জড়িয়ে নিলো। একটু নড়াচড়া করতে ব্যথায় দাঁত কামড়ে ধরে।

“শেমলেস বিস্ট!”
ইসাবেলা জানে এই শব্দটি শুনলে নিকোলাসের ইগো সন্তুষ্ট হতো। রাতের উষ্ণ মুহূর্ত মনে পড়ে যায়। এখনও যেন অনুভব করছে নিকোলাসের স্পর্শ। লজ্জায় বালিশে মুখ গুঁজে রইল। সমস্ত শরীরে ক্লান্তি আর অদ্ভুত এক ভালোলাগার স্পর্শ জড়িয়ে আছে। নিকোলাস যে বালিশে মাথা রেখেছিল, যেপাশে শুয়েছিল সেদিকে তাকালে বৃহৎ শূন্যতার গিরি তৈরি হয় হৃদয়ে। ওকে না দেখা পর্যন্ত এই শূন্যতার শেষ নেই। হঠাৎ গলার কাছে চিনচিনে ব্যথা টের পেল। গতকাল নিকোলাস মিলন মুহূর্তে ওর রক্ত পান করেছে। ব্যথা আর সুখের চরম উত্তেজনায় উন্মাদ, দিশেহারা করে ছেড়েছিল। দেহ নিয়ে, সৌন্দর্য নিয়ে হীনম্মণ্যতা যা ছিল সব যেন এই চাদরে দলিত মথিত হয়েছে। জীবনের বিশেষ এই মুহূর্তটিকে ইসাবেলার জন্য চিরস্মরণীয় এবং সবচেয়ে মধুর করেছে নিকোলাস। শুষ্ক ঠোঁটে লাজুক হাসি জেগে ওঠে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“বেলা, জেগেছ?” তাতিয়ানা দরজা ধাক্কা দিয়ে ঢুকে পড়ল। ওর কোলে তাশা। পেছন পেছন আজ্ঞাকারী দাসীর ন্যায় এলো রেইনি। ইসাবেলা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। ভাগ্যিস ওর পরনে নাইটি ছিল। কিন্তু সেটাও এই মুহূর্তে নিরাপদ নয়। সর্বাঙ্গে স্বামীর ভালোবাসার স্মৃতি বহন করছে। তাতিয়ানা দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে। থুতনি পর্যন্ত লেপ টেনে নিলো। ঘুমের ভান ধরে পড়ে থাকা সবচেয়ে নিরাপদ এই মুহূর্তে। কান খাঁড়া করে আছে। না! আর তো ওদের পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছে না। চলে গেল কী?
“উহ!” গালে কামড়ের ব্যথায় চকিতে তাকাল। তাশা ওর শিওরে দাঁড়িয়ে আছে। মুক্তোর মতো সাদা দাঁত বের করে হাসছে। খালার আর্ত আরক্ত মুখ দেখে খুব যেন মজা পেয়েছে।

“বে-ল, বে-ল।” বাবার মতোই ডাকে খালাকে। আদুরে হাতে খালার গালটাতে হাত বুলিয়ে দেয়। কাজটা যে মায়ের প্ররোচনায় করেছে। নয়তো কি খালাকে কষ্ট দেয়! ইসাবেলার রাগ উবে যায় ওর মুখে নিজের নাম শুনে। ইচ্ছে করে দুহাতে জড়িয়ে মুখ ভরে চুমু দিতে, আদর করতে।
“এবার তুই তাশাকে নিয়ে যা।” স্মিত হেসে বলল রেইনিকে তাতিয়ানা। মেয়েটি হাসল না। কিংবা বলা যায় হাসেই না। দিনে দিনে বাড়তে থাকা ওর গম্ভীরতা তাতিয়ানাকে অস্বস্তি দেয়। রেইনি নীরবে মাথা নাড়িয়ে তাশাকে কোলে তুলে নিলো। আশ্চর্যের কথা তাশা আপন পিতা-মাতা থেকেও এই মেয়ের সান্নিধ্য এখন বেশি পছন্দ করে। একটা গম্ভীর বালিকাকে কোনো শিশু কী করে এত পছন্দ করতে পারে!

ওরা দুজন চলে যেতে তাতিয়ানা কোমরে হাত রেখে বোনের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়।
“তাহলে তুমি ঘুমের ভান ধরে পড়েছিলে? জানতে পারি কেন?” প্রশ্ন করল তাতিয়ানা। ইসাবেলা ঠোঁট শক্ত করে বলে,
“এমনিতেই। তুমি কিন্তু কাজটা ভালো করোনি। মাতভেইকে বলে দেবো মেয়েকে তুমি বিপথে নিচ্ছো।”
“বিপথে?” ভ্রু তুলল তাতিয়ানা।
“হ্যাঁ, ওর নিষ্পাপ মস্তিষ্ককে ম্যানুপুলেট করছো।”
বোনের রাগ কেন যেন মাঝেমাঝে উপভোগ করে তাতিয়ানা। বিছানার ওপরপাশে যেতে যেতে বলল,
“ওহ! এখন আমি ম্যানুপুলেটিভ মা হয়ে গেলাম? হলে হয়েছি। তোমার মতো অলস আর ঘুম কাতুরে বোনকে শায়েস্তা করতে মেয়েকে আরও ম্যানুপুলেট করব। একশবার করব।”
“কী শয়তানমার্কা বোনই না দিয়েছে আমাকে ঈশ্বর! বেচারা মাতভেই! মাঝে মাঝে ওর জন্য আমার চিন্তা হয়।”
“বেচারা মাতভেই! হু! ও কোনো বেচারা টেচারা নয়।” তারপর বিড়বিড় করে বলে, “তোমার ওই বেচারা মাতভেই আমাকে বেচারি করে ছাড়ে তা কি জানো? জানলে যে তুমি আর মা খুশিতে লাফিয়ে উঠবে সে আমি খুব ভালো জানি।” হঠাৎ মনে হয় ওর গাল দুটো গরম হয়ে উঠেছে। ইসাবেলা লক্ষ্য করার আগে ঘুরে ওপর পাশের জানালা খুলে দিতে উদ্যোত হয়।

“জানালা খুলছো কেন? শীতে মেরে ফেলবে?”
গলা ঝেড়ে জানালা না খুলে ফিরে এলো তাতিয়ানা। বিছানায় বসতে গেলে চেঁচিয়ে ওঠে ইসাবেলা।
“বসবে না ওখানে?”
ভ্রু কুঁচকে যায় তাতিয়ানার।
“কেন?”
ইসাবেলা কী করে বলবে ওখানে ওর নিকোলাস শুয়েছিল। ওই স্থানে অন্য কেউ বসলে ভালো লাগবে না।
“উ-ম… আ-ম…”
“কী উম আম.. করছো বলোতো? এখানে বসলে সমস্যা কী? রাতে হিসু করে দাওনি তো?” তাতিয়ানার পুনরায় বসতে গেলে ফের চেঁচিয়ে ওঠে ইসাবেলা।
“বসবে না।”
“মেজাজ কিন্তু খারাপ করছো এবার তুমি ইসাবেল।” বিরক্ত হলো তাতিয়ানা।
“কাল রাতে ওই পাশে কার্ল ঘুমিয়েছিল। তুমি নিশ্চয়ই কার্লের শোয়া জায়গায় বসবে না। আমি হিসু করিনি তবে ও করেছে। গন্ধ পাচ্ছো না?”
নাক কুঁচকে বলল,
“কী গন্ধ!”

কার্ল এ বাড়ির নতুন পালিত কালো বেড়াল। ছোটোবেলা থেকেই বেড়াল অপছন্দ তাতিয়ানার। কার্লকে তো আরও বেশি। এই দুটো একে অপরকে সহ্য করতে পারে না। তাতিয়ানার ব্যবহারিক কোনো জিনিস সামনে পেলে তাতে মলমূত্র করবেই কার্ল। নানার প্রিয় না হলে এই কার্লকে তাতিয়ানা মেরেই ফেলতো মনে হয়। মানুষ আর প্রাণীতে এমন শত্রুতা থাকতে পারে তা ওদের না দেখলে ইসাবেলা জানতোই না। তাতিয়ানার গা রি রি করে উঠল। লাফ দিয়ে সরে গেল চার হাত দূরে।
“ইয়াক!” মুড একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে তাতিয়ানার। কী যে বলতে এসেছিল তাও ভুলে গেল। এই রুমে এসেছিল প্রসন্ন মনে। এখন রাগে ঘৃণায় তিক্ত ভেতর। বিছানার দিকে আবার তাকালো। মনে হলো কার্ল ওর সামনেই বিছানায় মূত্র ত্যাগ করছে। তারপর হাত নাড়িয়ে ইশারায় কাছে ডাকছে। না! আর এক মুহূর্ত নয় এখানে। দরজার দিকে গিয়ে হঠাৎ থমকে গেল। কী ভেবে বোনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“খুব গন্ধ তাইনা ইসাবেল?”
“হুম, খুব।” নাক চেপে অভিনয় করল ইসাবেলা। তাতিয়ানা দ্রুত পায়ে ওর জানালার কাছে এলো। দুহাতে ঠেলে জানালা খুলতে শো শো করে কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস ঘরে ঢুকলো।
“কী করছো তুমি!”
“বন্ধ ঘরে গন্ধ একটু বেশি লাগে। এখন আরাম পাবে তুমি।”
ইসাবেলা স্পষ্ট দেখতে পায় তাতিয়ানার ঠোঁট বেঁকে গেছে। রাগে চেঁচিয়ে ওঠে,
“তাতিয়ানা, আই হেইট ইউ।”
“অ্যান্ড আই লাভ ইউ মাই ডিয়ার সিস্টার।”
হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল তাতিয়ানা। কী যেন বলতে এসেছিল ইসাবেলাকে? ধ্যাৎ! পরে মনে করবে।
রাতে নিকোলাস এলো। কেন যেন খুব লজ্জা করছিল ইসাবেলার। নিকোলাস ওর ঠোঁটে চুমু দিয়ে বলল,
“চলো আজ তোমায় আমার দুর্গে নিয়ে যাব।”
“যেখানে তুমি থাকো।”
“হুম।” নিকোলাসের বলতে ইচ্ছে করছিল, যেখানে আমরা থাকব। কিন্তু রিয়েলিটি হলো, ইসাবেলা ওখানে কেবল বেড়াতে যাবে থাকতে নয়। প্রাচীন নির্জন, ভুতূরে বাড়িতে কি মানুষ থাকতে পারে!

নিকোলাস ওকে নিয়ে চললো নিজের আবাস্থলে। এই প্রথম স্বামীগৃহ যাচ্ছে। ভীষণ এক্সাইটেড ফিল করছে ইসাবেলা। দুর্গে পৌঁছে সরাসরি বাগানে নিয়ে এলো নিকোলাস ওকে। প্রাচীন, জড়-জীর্ণ এই দুর্গে একমাত্র এই স্থানটিতে প্রাণের রেশ আছে। বাতাসে ফুলের সুবাস। দিনের বেলা পাখির কিচিরমিচির শোনা যায়। নিকোলাস দূরে দাঁড়িয়ে রাতে ঝিঁঝির ডাক শোনে। কাছে গেলে ওরা চুপ করে যায়। পিশাচকে বুঝি ওরাও ভয় করে। ওদের সাথে কথা বলা গেলে নিকোলাস বলত,

“ভয় কেন পাস রে তোরা? আমার রুচি অনেক হাই বুঝলি? তোদের খাব না। ডাক, প্রাণ খুলে ডাক।”
ইসাবেলার হাত ধরে বসল একপাশের বেঞ্চে। কোনো এক কারণে খুব বেশি ঠাণ্ডা নয় এ স্থান। এখন তুষার পড়ছে না। মেঘমুক্ত আকাশে তারার মেলা। রূপোলী থালার মতো চাঁদ। এখানে বসে দূরের সাদা বরফের সমতল সাদা চাদরের মতো মনে হয়। অন্যপাশে বিশাল ঘন বন। রাতের সৌন্দর্যে অভিভূত হয় ইসাবেলা। নিকোলাস ফের ওর শীতল ঠোঁটে চুমু দেয়। ইসাবেলা দীর্ঘ করে সেই চুমু। হঠাৎ নিকোলাসকে চমকে দিয়ে বিয়ের ব্যান্ড পার্টির মতো বেজে ওঠে ঝিঁঝি পোকা। আজ নিজের ভেতরের শূন্যতা টের পায় না নিকোলাস। বড্ড সম্পূর্ণ,সন্তুষ্ট মনে হয়। ইসাবেলা যদি আরও আগে আসত ওর জীবনে! সেই মানব যৌবনবেলায়!
এক হাতে ইসাবেলার কোমর জড়িয়ে টেনে নিলো খুব কাছে। আদুরে বেড়ালের মতো গুটিশুটি হয়ে রইল ইসাবেলা। মাথাটা নিকোলাসের কাঁধের কাছে, মুখ গলায় লুকানো। ভালোলাগায় দুচোখ বুঁজে এলো ওর। নিকোলাস মাথার ওপর চুমু খেয়ে বলল,

“ঠিক আছো তুমি?”
“হুম।”
“সত্যি?”
ইসাবেলা চোখ খুললো। নিকোলাসের শার্টের বোতাম নিয়ে খেলতে খেলতে নিচু গলায় বলল,
“উমম..ঠিক আছি আমি।”
“কাল নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলাম। আ’ম সরি, লাভ।”
“নিকোলাস! বললাম তো ঠিক আছি। চিন্তা করো না।” মনে মনে বলল,”তুমি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলে? আমিই ছিলাম যে তোমাকে নিয়ন্ত্রণ হারাতে বাধ্য করেছিল। নির্লজ্জ নতুন বউ।”
নিকোলাস হাত বাড়িয়ে দেয় ওর মুখের কাছে।
“কামড় দাও।”
“হুঁ?” কিছুটা চমকে তাকায় ইসাবেলা।
“ভয় পাচ্ছো? ভেবেছো তোমাকে আমার মতো করতে চাচ্ছি?”
মাথা দুদিকে নাড়িয়ে পরিহাসসূচক মুচকি হাসল ও। আবার বলল,

“তা যদি পারতাম তবে বোধহয় ভালো হতো। কিন্তু তোমাকে ভালোবেসে সাধুপুরুষ হচ্ছি। না, কোনো অভিযোগ করছি না। তোমার ভালোবাসা সত্যি যেন ঈশ্বরের দূত। যে আমার মাঝের পাপীকে ধীরে ধীরে একজন সাধু পুরুষে বদলে দিচ্ছে। আমি বুঝেও এবার চুপ করে আছি। কোথাও না কোথাও ঈশ্বরকে জিতিয়ে দিতে সাপোর্ট করছি। কেন করছি জানো? তোমার ভালোর জন্য। তোমার জন্য সব করতে পারি, বেলা। সাধুপুরুষের মতো নিঃস্বার্থ হওয়া সেখানে কিছুই না।”
ইসাবেলা ওর হাতটা ধরে কামড় দিলো। ও যদি ওর জন্য পিশাচ থেকে সাধুপুরুষ হতে পারে, ইসাবেলা পিশাচ হতে পারবে না? তাছাড়া ওর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের ওয়াদা করেছিল।

“যথেষ্ট, বেলা।”
নিকোলাসের রক্তের ঝাঁঝালো ধাতুরূপ স্বাদ ক্রমশ মিষ্টি আর নেশাযুক্ত হতে লাগল। ইসাবেলা নেশাগ্রস্তের মতো চুষছে।
“বেলা, থামো।” সতর্ক করল নিকোলাস। ইসাবেলা যেন শুনতেই পায়নি। বাধ্য হয়ে ইসাবেলার ওর পেছনের চুল ধরে টেনে ওর মুখ থেকে হাতটা সরিয়ে নেয়।
“থামতে বলেছি।”
রক্তমাখা ঠোঁটটা জিহ্বাতে চেটে মুখটা পছন্দের খাবার না পাওয়া শিশুর মতো করুণ করে।
“টের পাচ্ছো কিছু?”
ইসাবেলা সপ্রশ্নে ওর দিকে তাকায়। কী টের পাবে?
“ব্যথা। তোমার দেহের ব্যথা কি টের পাচ্ছো?”
আশ্চর্য হয়ে অনুভব করল ওর দেহের সেই ব্যথাগুলো উপশম হয়েছে। নিকোলাস হাসল। আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বলল,
“তোমার স্বামীর রক্তের ম্যাজিক দেখলে তো?”
পুরো দু সপ্তাহ ঘুরানোর পর অবশেষে দেখা দিলো ড্যামিয়ান। রিচার্ড বসা থেকে উঠে দাঁড়ান। দু সপ্তাহের চেপে রাখা ক্ষোভ চোখেমুখে প্রকাশ পেল। ভয় পান বলে তা চেপে রাখবেন না। তাঁকে এভাবে অপদস্ত করার কোনো হক ড্যামিয়ানের নেই। নেহাৎ সিংহাসনটা চান বলে ওর কাছে নত হয়েছেন। নিকোলাসটা যদি তাঁর প্রতিপক্ষ হয়ে না যেত তবে কি এই ড্যামিয়ানের সাহায্য ভিক্ষা চাইতেন? সিংহাসন একবার দখলে আসুক সব শালাকে দেখে নেবেন।
ক্ষমতা, লোভ মানুষকে যেমন নীচ করে তেমনই মস্তিষ্কের সুস্থতা বিনষ্টেও বড়ো ভূমিকা রাখে। লোভের চাকচিক্যে নিজের বোকামিও দেখতে পায় না।

“তুমি নিজেকে কী __”
“পার্টনার, পার্টনার, ভীষণ মিস করেছি তোমাকে আমি।”
এমনভাবে ড্যামিয়ান তাঁকে আলিঙ্গন করল যেন পুরোনো কোনো বন্ধুকে বহুদিন পর দেখতে পেয়েছে। রিচার্ড রাগটা বাধ্য হয়েই গিলে ফেললেন। স্বার্থের জন্য এইটুকু না করে উপায় কী। রাগটা জমা থাক ভেতরে। সিংহাসনের জন্য কত কীই না করতে হবে। আলিঙ্গন মুহূর্ত বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। রিচার্ডকে আসন দেখিয়ে নিজ চেয়ারে গিয়ে বসল ড্যামিয়ান। টি টেবিলের দুপাশে দুজন। রিচার্ড কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ভেতর ঘর থেকে একজন সুশ্রী তরুণীর আগমনে থেমে গেলেন। তরুণীটির পরনে খোলামেলা দু টুকরো ছোটো পোশাক। উৎকট সাজ। হাতে মদিরা ও পানপাত্রের ট্রে। মেয়েটি তাঁকে একটি সুরা পাত্র ধরিয়ে দিয়ে আরেকটা নিয়ে বসল ড্যামিয়ানের উরুর ওপর। আদর সোহাগ দিয়ে সুরা পাত্রটি ড্যামিয়ানের ঠোঁটের ওপর ধরছে। লক্ষী ছেলের মতো সেও বসে বসে মেয়েটিকে সন্তুষ্ট করছে বলে মনে হবে। লক্ষী ছেলে! মনে মনে শ্লেষের সাথে হাসলেন রিচার্ড। লক্ষী ছেলেদের গুন থেকে লক্ষ ক্রোশ দূরের চরিত্র এই শয়তানটার। সুদর্শন চেহারার আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর এক শয়তান। খুব সাবধানে ওদেরকে দেখছিলেন রিচার্ড। কোনো তরুণীকে এখন পর্যন্ত দ্বিতীয়বার ড্যামিয়ানের সাথে দেখেননি। এই মেয়েটি নতুন। বাকিদের মতো এর ভবিষ্যতে কী লেখা আছে তার কিছুটা হয়তো ধারণা করতে পারছেন তিনি।

“তারপর বলো পার্টনার, হঠাৎ কী মনে করে?”
“হঠাৎ? তুমি কি ভুলে গিয়েছো আমাদের মাঝের চুক্তি? আজ একটা বছর হতে চললো অথচ, নিকোলাসকে হারানোর কোনো লক্ষণ বা চেষ্টা কিছুই দেখছি না৷ তুমি যদি ভাবো আমাকে ধোঁকা দেবে তবে মনে রেখো তা অত সহজ নয়।”
“চুক্তি, ধোঁকা? শব্দদুটো বলার আগে একবার ভেবে নিলে না পার্টনার?”
“হেঁয়ালি শুনতে আসেনি। যা বলবে পরিষ্কার করে বলো।”
“চুক্তির শর্তমতে তোমারও কিছু দেওয়া ছিল, দিয়েছ?”
রিচার্ডের মাঝে এখনও তিল পরিমাণ অবশিষ্ট থাকা পিতৃত্ব তাঁকে বাধা দিয়েছে। বলেছে এ অন্যায়, পাপ! রিচার্ড থমকে গেছে। মেয়েটা তাঁদের মতো হয়েও তাঁদের একজন না। ওর মুখটা দেখলে প্রিয়তমা মৃত স্ত্রীর কথা মনে পড়ে। কিন্তু লোভ তাঁকে এমনভাবে দাস বানিয়ে ছেড়েছে যে সকল আত্মীয়তা আজ তুচ্ছ। তুচ্ছ হয়েছে বার বার।নোভালিকে উৎসর্গ না করলে সিংহাসন মিলবে না।
মানুষকে ম্যানুপুলেট করতে তাঁর জুড়ি নেই। কেন যেন ড্যামিয়ানের বেলাতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন। এই ড্যামিয়ানের মস্তিষ্ককে কেন বশ করতে পারেন না? সন্দেহ জাগলেও তা ভেদ করতে গিয়ে বিপাকে পড়েন৷ ভয় তখনই পান তিনি। যা ভয় জাগায় তা না ঘাটায় ভালো। নোভালির বিনিময়ে যদি কার্যোদ্ধার হয় তাহলে খামোখা ওত ঘাটাঘাটির দরকার কী। ওর মতো দুর্বল মেয়ে পিতার কিছু তো উপকারে আসুক। ভেতরের শয়তানটার আবারও জিত হয়। বলেন,

“বলেছি যখন নোভালিকে তুমি পাবে।”
“পাবে বললে হবে না যে পার্টনার। এই সপ্তান্তে নোভালিকে আমি চাই।”
“তবে সিংহাসন কবে পাব সেটাও নির্দিষ্ট করে বলে দাও। চুক্তি মতে দুজনই সমান লাভ করব। সপ্তাহ শেষে তুমি লাভ করবে আর আমি আশায় থাকব? তা তো হবে না। নির্দিষ্ট দিন চাই।”
ক্লিনসেভ চোয়াল চুলকে ড্যামিয়ান বলল,
“যদি নির্দিষ্ট দিন না দিই কী করবে? চুক্তি ভেঙে দেবে? চলো তাই করি।”
ভড়কে যান রিচার্ড।
“চুক্তি ভাঙবে! না না।”
“কেন নয়? লাভটা যখন আমার বেশি তখন শুধু শুধু তুমি লস করবে কেন? চলো চুক্তি ভাঙি।” বেশ সিরিয়াস শোনাল ড্যামিয়ানের গলা।
“চুক্তি ভাঙলে নোভালিকে তুমি পাবে না।”
“দরকার নেই। ও আর কী! সামান্য এক পিশাচ নারী।”
রিচার্ড দেখলেন প্রয়োজনটা ওঁরই বেশি। যার প্রয়োজন তাকে তো একটু নত হতেই হবে।
“ঠিক আছে, ঠিক আছে।” হতাশা ও অসহায়ত্বে দুহাত শূন্যে তুলে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। দাঁতে দাঁত পিষে বললেন,
“তুমি নোভালিকে পাবে। যে সময় বলেছ তার মধ্যেই। কিন্তু মনে রেখো তারপর আমারটাও চাই। যত তাড়াতাড়ি দেবে ততই মঙ্গল। শুধু আমার একার নয় তোমার জন্যও। কারণ বেশিদিন বোনের নিখোঁজ সংবাদ গোপন থাকবে না নিকোলাসের কাছে৷ ও জানলে কী হবে আর বোধহয় তোমাকে মুখে বলার প্রয়োজন হবে না। আসি।” একপ্রকার ক্ষুব্ধতার সাথে দরজার দিকে হেঁটে গেলেন।

“ডার্লিং, নোভালিটা কে?” কোলের তরুণীটি আহ্লাদিত গলায় প্রশ্ন করতে ড্যামিয়ান রিচার্ডের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে জবাব দেয়,
“আমার মিস্ট্রেস।”
রিচার্ডের পা থামে। ড্যামিয়ান মুচকি হাসল তাই দেখে। রিচার্ড বেরিয়ে যেতে তরুণীর ঠোঁটের ওপর ঠোঁট বসিয়ে দিলো।
দিনের চাইতে রাত এখন বেশি প্রিয় ইসাবেলার। কেমন শান্ত আর সুন্দর। সূর্যের প্রখরতার চেয়ে চাঁদের মেদুর আলো ভালো লাগে। পাখির কলতান মিষ্টি কিন্তু নিশাচর আর ঝিঁঝিরডাক মাদকতা মেশানো। রাতটাকে আরও বেশি রোমান্টিক করে। নিকোলাসের সঙ্গ আর নিশীথের এত আয়োজন ইসাবেলার ভাবনা বন্য করে তোলে। কিছুটা নির্লজ্জ, কিছুটা বেপরোয়া। নিজেকে ভিন্ন ভিন্নভাবে আবিষ্কার করে তখন।
আর পাঁচটা কাপলের মতো হানিমুন হয়নি বলে মোটেও আপসোস নেই। নিকোলাস রোজ নতুন নতুন মনোরম স্থানে নিয়ে যায়। চাঁদের আলোয় পরস্পরের কাছে আছে। আজকাল আর ওই কয়েকটা উষ্ণ চুমু আর আলিঙ্গনে মন ভরে না। আরও কাছে চায়। মন ছাড়িয়ে দেহের সেই তীব্র আকর্ষণকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা কার? আদিম শরীরি উন্মত্ততা ওদেরকে সবকিছু ভুলিয়ে দেয়। মনে রাখে কেবল নিজেদের এবং একে ওপরের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা।

গভীর রাতের আঁধার ফিকে হতে লাগল। এবার ঘরে ফেরার পালা। কিছু সময়ের বিচ্ছেদ। ওইটুকু যে কী অসহ্যের তা কেবল ওরাই জানে। গ্রীষ্মের দাবদাহের চেয়েও প্রবল। এত যে কাছে পায় তবুও মন ভরে না। তবুও কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর হয়। এই রাতটাকে যদি মন্ত্র বলে স্থির করতে পারত নিকোলাস! কোথায় গেলো সেই মন্ত্র পাবে? নির্জন রাস্তা ধরে হাঁটছে দুজন। রাস্তার পাশে প্রাচীন বৃক্ষসারি। মাথাটা ভারে ওপর পাশের জমিনে নুয়ে পড়েছে। ছাউনির ন্যায় তৈরি হয়েছে। খানিক দূরে দূরে গাছগুলোর অবস্থান হওয়াতে চাঁদের আলো মাঝে মাঝে আলোকিত করেছে পথটা। পথ চিনতে কষ্ট হয় না। ইসাবেলার হাত নিকোলাসের মুঠোর মধ্যে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটা শুকনো ডালের আচর লাগতে উঁহু করে উঠল ইসাবেলা। সামান্য একটা ডালের আচরে আর কী হয়? কিন্তু নিকোলাস তা মানবে না৷ প্রিয়সীর পা আর ছোঁবে না এই পথ।

তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ৭৯+৮০

“তোমার ভর আমার পিঠের ওপর দাও।”
ইসাবেলা জানে প্রতিবাদ করে লাভ হবে না। ভালো বউয়ের মতো কাঁধ জড়িয়ে স্বামীর পিঠে চড়ে বসল। দুজনে আবার পথ চলতে শুরু করে। এই পথ পায়ে হেঁটে না চললেও হয়। কিন্তু তাতে ইসাবেলার সান্নিধ্যে আরেকটু থাকা হবে না যে। পথের সঙ্গিনী হিসেবে ইসাবেলার চেয়ে আর কে উত্তম।
“নিকোলাস।” ইসাবেলা কাঁধের একপাশে মাথা রাখল। ঘুম ঘুম পাচ্ছে ওর। আবেশে চোখের পাতা ভারি হয়। নিকোলাস সামনের পথপানে চেয়ে বলল,
“হুম?”
“আই লাভ ইউ।”
মুচকি হাসল নিকোলাস। ইসাবেলার বলা এই তিনটি শব্দ অধিক প্রিয় নিকোলাসের। তারচেয়েও প্রিয় ইসাবেলা। ঘাড় ঘুরিয়ে প্রিয়তমা স্ত্রীর ঘুমন্ত মুখ দেখে কপালে আলতো করে চুমু দিলো। তারপর বলল,
“আই লাভ ইউ মোর দ্যান আই ক্যান সে, মাই অ্যাঞ্জেল।”

তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ৮৩+৮৪