তুই আমার বিশ্বাস ছিলি ঈদ স্পেশাল
জান্নাতি আক্তার জারা
রশ্মি মাহির দুজন, ছোট তিথি কে বাড়িতে রেখে শপিংমলে এসেছে বাড়ির সবার জন্য টুকিটাকি শপিং করতে, রশ্মি এদিক ওদিক তাকিয়ে দোকানের কাঁচের ভিতর দিয়ে ঝুলানো পোষণ গুলো দেখছিল ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে,করিডোর দিয়ে হেঁটে যেতেই এক দোকানের সামনে পরিচিত কয়েক জোরা মুখ দেখে রশ্মির পা থেমে গেলো, মুহূর্তের জন্য যেন রশ্মির সময়টা থমকে গেল, আনাস এর কোলে ছোট একটা বোরকা পরিহিত বাচ্চা, বোরকা পড়ার কারণে ছোট বাচ্চা টা কে দেখতে একদম সাজানো পুতুলের মতো লাগছে , তাঁদের সামনে একটা মেয়ে বোরকা পড়ে আনাস এর কোলের বাচ্চা টা কে বোরকার উপরে স্কাট ধরে দেখছে আর এটা ওটা বলছে, রশ্মির আর আরাত কে চিনতে অসুবিধা হলো না, বোরকা পরিহিত আরাত কে এক দেখায় চিনে ফেললো, রশ্মি কে দাঁড়াতে দেখে মাহির নিজেও দাঁড়িয়ে রশ্মির চোখ অনুসরণ করে আরাত দের দিকে তাকালো, মাহির নিজেও খানিকটা অবাক হয়ে তাকালো, রশ্মির কাঁপা কাঁপা ঠোঁট থেকে আপনাআপনি আরাত নাম টা বের হয়ে এলো,
___”আরাত।
নামটা খুব আস্তে বেরিয়ে এলোও, আরাতের কানে ঠিকই পৌঁছেছে, সাতটা বছর পর দেখা, দুই প্রান্তে দুজন একিউপরের দিকে চেয়ে আছে, মুখে কেনো কথা নেই, একজনের চোখে কিছুটা অস্থিরতা, আরেক জনের চোখে নেই কেনো অনুভূতি, যেন সামনের মানুষ টা কে সে চেনেই না, আরাত এক ঝলক রশ্মির দিকে তাকিয়েছিল,চোখ দুটো এক সেকেন্ডের জন্য মিলেছিল,পর মুহূর্তেই আরাত মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে চেয়ারে বসে কাপড় দেখতে লাগলো যেন সে রশ্মিকে দেখেইনি, আনাস কিছুটা অবাক হলো এতে, মাহা কে কোলে তুলে দাঁড়িয়ে গেলো, রশ্মি মাহির আরাত এর থেকে চোখ ফিরিয়ে আনাস আইরা মিম কে দেখতে লাগলো, সবার চোখে আজ একি চাহনি, মুখে প্রশ্ন নাকি আনন্দ বুঝা মুসকিল, শুধু একমাত্র আরাত ব্যতিক্রম, তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে শপিং করতে এসেছে তাঁর শুধু জামাকাপড় দেখায় একমাত্র লক্ষ, রশ্মি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল পা সামনে এগুচ্ছে না, মাহির শক্ত করে ধরলো রশ্মির হাত, হয়তো রশ্মি কে আশ্বাস দিচ্ছে ভরসার হাত বাড়িয়ে দিয়ে, রশ্মির বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন ভারী হয়ে গেল আরাত এর চাহনি দেখে,
সে ভেবেছিল হয়তো আরাত অবাক হবে, হয়তো ব্যাকুলতা হয়ে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করবে রশ্মি তুই এখানে, এত বছর তুই কোথায় ছিলি, কেমন আছিস রশ্মি, কিন্তু কিছুই হলো না, আরাত মুখ ফুরিয়ে নিলো, আচ্ছা রাগ অভিমান কী একটা মানুষের উপর এতটা বছর জমিয়ে থাকে? হয়তো থাকে রশ্মির জানা নেই, রশ্মি কে দেখে আইরা আনাস এর মুখ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এলো, আইরা মুখে কিছুটা হাসি ফুটে তুলে রশ্মির দিকে এগিয়ে যেতে নিলেই হটাৎ কোথাও থেকে হন্তদন্ত হয়ে পার্থ, মিম আর আইরার সামনে এসে হতাশা কন্ঠে মিমের হাত টানতে টানতে বলল,
___” এই শপিংমল থেকে চল লেডি গুগল।
হটাৎ পার্থর কান্ডে আইরা আনাস রশ্মি মাহির সবাই অবাক হয়ে পার্থ মিমের দিকে চেয়ে রইলো, মিম পার্থর হাত থেকে নিজের হাত বের করে জানতে চাইলো,
___” বাট হোয়াই?
পার্থ মিমের হাতে বাঁধা পেয়ে পিছু ফিরে হতাশা কন্ঠে পুনরায় বলতে লাগলো,
___” আমার একটা গর্জিয়াস থ্রি পিস চোখে পড়ে বাট রেট 15k, আমি রেট কমাতেই দোকান দার রাজি হয়ে যায়।
মিম পার্থ কে ছোট ছোট চোখে দেখছে, পার্থর কথার অর্থ ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না, আইরা পার্থর কথায় খুশি হয়ে বলে উঠলো,
___” দারুণ, কই দেখাও থ্রি পিস টা?
আইরার প্রশ্নে পার্থ আমতা আমতা করে বলতে শুরু করলো ( ফ্ল্যাশব্যাক….
আরাত রা যখন শপিং করতে ব্যস্ত, পার্থ একপাশে দাঁড়িয়ে থাকতে বোর হচ্ছিল, পার্থ আরাত দের রেখেই একা একা পুরো শপিংমল ঘুড়ে দেখতে লাগলো, ঘুড়তে ঘুড়তে একটা দোকানে চোখ আটকে গেলো, থ্রি পিস টা দেখেই মিমের কথা মাথায় এলো, গর্জিয়াস একটি থ্রি-পিস সাদা রঙ, ডিজাইন আর কাপড়ের কাজ যেন একেবারে নজর কাড়ার মতো, পার্থর খুব পছন্দ হয়ে যায় থ্রি পিস টা,পার্থ একপর্যায়ে দোকানে ঢুকে পড়ে, থ্রি পিসের রেট দেখে দোকানদার এর সামনে দিয়ে বলল,
___” ব্রো ড্রেসটা প্যাক করো।
বলেই পার্থ ওয়ালেট বের করতে পকেটে হাত গুঁজে দেয়, পকেটে হাত গুঁজে দিয়ে পার্থ বারংবার পকেট হাতড়াতে লাগে, বেশকিছুক্ষণ পকেট হাতড়ানোর পড়েও যখন কাঙ্ক্ষিত জিনিস টা খুঁজে পেল না, পার্থ বেকুব হয়ে কপালে হাত স্লাইড করতে করতে মনে করার চেষ্টা করে, অসুস্থ শরীর নিয়ে মিম পার্থ কে নিজেদের সাথে নিয়ে আসতে না চাওয়ায় পার্থ তাড়াহুড়ায় ওয়ালেট আনতেই ভুলে গেছে, ওয়ালেটে ডেবিট কাট এবং ক্যাশ ছিল, যা পার্থ হাসপাতাল থাকা আবস্থাতেই আমেরিকার ডলার বাংলাদেশের ক্যাশ করে নিয়েছিল, পার্থ নিজের বোকামির জন্য নিজের উপর রাগ লাগছে, তাঁর থেকে বড়কথা ড্রেস প্যাকিং পর্যন্ত করে ফেলছে, এখন কী করবে বুঝতে না পেয়ে পার্থ একটু দ্বিধা নিয়ে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করে উঠে,
___” ভাই ড্রেসটার রেট কত?
পার্থর আজগুবি কথায় দোকানদার পার্থর মুখের দিকে চেয়ে পুনরায় তাঁর পাশে বসা আরেকটা ছেলের মুখের দিকে তাকালো, পার্থ তাদের দুজন কে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে দেখে লজ্জায় পড়ে গেলো, প্রথমত থ্রি পিস এর সঙ্গে দাম লেখা আছে, এবং পার্থ দাম দেখেই প্যাক করতে বলছে, দ্বিতীয়ত এখানে কেনো দাম দড়াদড়ি করা নেই, পার্থর থতমত মুখের দিকে চেয়ে দোকানদার হাসিমুখে বলল,
___” ১৫ হাজার ।
থ্রি পিসের দাম শুনে পার্থর মুখ একটু ম্লান হয়ে যায়, কারণ পার্থ আগে থেকেই দাম জানে, তার কাছে টাকা বা ডেবিট কাট নেই, উপায় না পেয়ে বলে বসলো,
___” ১৫ হাজার না, ১৫০০ হলে নিতাম!
কথাটা বলেই দোকান থেকে বের হতে দ্রুত পা বাড়ালো, কিন্তু দোকানদার পার্থ কে যেতে দেখে পুনরায় ডেকে বলে উঠলো,
___” রাজনবি?
___” ইয়েস।
পার্থ ভেবেছিল দোকানদার হয়তো সঙ্গে সঙ্গে না করে দেবে, কিন্তু অদ্ভুতভাবে দোকানদার কিছুক্ষণ চুপ থেকে পার্থ কে দেখে হাসি মুখে বলে উঠলো ,
___”ঠিক আছে, আপনি যেহেতু নিতে চাচ্ছেন, ১৫০০ টাকাতেই নিয়ে যান, রাজনবি হিসাবে বাকি ১৩৫০০ আপনাকে হাদিয়া দিলাম।
পার্থ যেন মুহূর্তেই তাজ্জব বনে গেল, তার মাথায় যেন বাজ পড়েছে, পার্থ তো ১৫০০০ থেকে একবারে ১৫০০ বলছে, যেন দোকানদার না করে দেয় আর এই সুযোগে পার্থ দোকান থেকে বের হয়ে আসতে পারে, কিন্তু পার্থর পুরো প্ল্যান বদলে গেলো এক নিমেষেই, এখন দোকানদার সত্যিই রাজি হয়ে গেছে, কিন্তু তার কাছে তো এক টাকাও নেই,এখন কি করবে, না কিনে চলে গেলে লজ্জা,চারপাশের মানুষজন দোকানদারের তাকিয়ে থাকা, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি একেবারে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে পার্থর, উপায় না পেয়ে হঠাৎ করেই পার্থ গম্ভীর গলায় “আইম নট ইন্টারেস্টেড বলে দ্রুত পায়ে দোকান থেকে বেরিয়ে আসে, বলতে গেলে লজ্জার হাত থেকে বাঁচতে মুখে গম্ভীর্য ফুটিয়ে দ্রুত পা চালিয়ে সে ভিড়ের মধ্যে দিয়ে বের হয়ে আসে,
ব্যাক টু দ্য প্রেজেন্ট )
পার্থর হতাশা ভরা কণ্ঠে কথাগুলো শুনে আইরা প্রথমে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, তারপর নিজের হাসি চাপতে চেষ্টা করে, আর মিম রাগী গলায় পার্থর হাতে কিল মেরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো,
___” তোকে আমার জন্য কে ড্রেস চ্যাুজ করতে বলেছে ডাফার?
ভোলাভালা মুখে পার্থ হাত স্লাইড করতে করতে বলল,
___” আমি তো ভেবেছিলাম, ১৫০০০ ড্রেস ১৫০০ তে না করে দিবে, বাট উল্টা ১৫০০ টাকাতেই দিতে রাজি হয়ে গেল,আমি কি করবো বল,কে জানতো তোদের দেশের মানুষ এতটা দয়াল, গিফট যখন দিতে চাইলো পুরো ড্রেস টা দিতে পারতো।
পার্থর কথায় মিম আরো রেগে গেলো,
___” চল, সেই দোকানে নিয়ে চল।
পার্থ গম্ভীর গলায় বলল,
___” নিতে হবে না, আমি ম্যানেজ করেছি ব্যাপারটা।
___” হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি, কতটা ম্যানেজ করেছেন, এবার চলেন।
মিম আগে আগে পা বাড়ালো, পার্থ একবার আইরা কে দেখে পুনরায় মিমের পিছু নিলো, আইরা এবার কিছুক্ষণ একা একা হেঁসে রশ্মির কথা মাথায় আসতেই, পিছনে ফিরে তাকালো, কিন্তু পিছু ফিরে রশ্মি মাহির কাউকেই দেখতে পেলো না, আইরা এদিক ওদিক তাকিয়ে রশ্মি কে খুঁজলো, খুঁজে না পেয়ে আনাস আইরা দের কাছে আসলো, আনাস আইরা এতক্ষণে প্রায় অনেক শপিং করে নিয়েছে, আইরা আরাত কে রশ্মির কথা জিজ্ঞেস করতে নিয়েও কিছু বললো না, এটা সঠিক সময় না কারণ চারদিকে ঈদের শপিংয়ে জন্য মানুষের ভীড় অনেক, আহিন বারবার শপিং ব্যাক, নিজেদের গাড়িতে রেখে আসছে, আর বিরক্তিকর নিঃশ্বাস ফেলছে, কেনো না
আনাস আইরা মিলে পুরো তালুকদার বাড়ি এবং শেখ বাড়ির জন্য শপিং করছে, আর আরাত তো সেম, মিম নিজেও নিজের টাকা দিয়ে তালুকদার বাড়ি এবং নিজের বাবা মা’র জন্য ঈদের শপিং করছে, সবাই একসঙ্গে শপিং করতে এলেও, সবাই নিজেদের টাকা দিয়ে আলেদা আলেদা সবার জন্য শপিং করেছে, বলতে গেলে ঈদের ড্রেস একেকজনের চারপাঁচ টা করে হবে, কেনো না আতিফ শেখ এবং আদনান তালুকদার, আহাদ তালুকদার ও পুরো ফ্যামিলির ঈদের শপিং করেছে, পুরোদিন রোজা রেখে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঈদের শপিং শেষ করে সন্ধ্যার আগে আগেই বাড়ি ফিরছে আরাত রা,
রাত প্রায় সাত টার ঘরে, আরাত ইফতার করে রুমের মেঝেতে মাগরিবের নামাজ আদায় করে জায়নামাজে বসে কোরআন তিলাওয়াত করছে, আরাতের সঙ্গে ছোট মাহা ছিলো বেশ কিছুক্ষণ, আরাতের দেখাদেখি ছোট মাহা নামাজে উঠবস করছিলো বারংবার, কিছুক্ষণ আরাত কে নামাজে সঙ্গ দিয়ে একা একাই নিচে নেমে যায়, আরাত নামাজ আদায় করে ক্লান্ত শরীর নিয়ে কোরাআন শরিফ তিলাওয়াত করছে, এতেই যেন সারাদিনের ক্লান্ত শরীর থেকে কোথাও একটা মিলিয়ে গেছে, আরাতের কোরাআন শরিফ তিলাওয়াত করার মধ্যে
সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত তাকবীর আর ছোট বীরাত রুমে ঢুকলো, বীরাত তাকবীরের হাতের এক আঙ্গুল শক্ত করে ধরে পাপার সঙ্গে মসজিদ থেকে ফিরলো, শরীরে তাঁর তাকবীরের সঙ্গে ম্যাচিং করা সাদা পাঞ্জাবি পাজামা জড়ানো, দুজন রুমে ঢুকে আরাত কে কোরআন তিলাওয়াত করতে দেখে ধীর পায়ে আরাতের পাশে এসে বসলো, তাকবীর মনোমুগ্ধকর নয়নে আরাতের কোরাআন তিলাওয়াত শুনছে, আর ছোট বীরাত একবার পাপা তো আরেকবার মাম্মা কে ছোট ছোট চোখে দেখছে, আরাত নিজের পাশে স্বামী সন্তানের উপরিস্থিত বুঝতে পেয়ে আয়াত শেষ করে কোরাআন শরিফ বন্ধ করে প্রথমে ছেলের দিকে হাসিমুখে তাকালো,ছেলের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসতেই ছোট বীরাত মায়ের কোলে মাথা দিয়ে মেঝেতে শুয়ে পরলো, ঠিক যেন তাকবীর, আরাতের এক নিমেষেই মনে হলো, ছেলেটা তাঁর পাপার মতোই কার্বন কপি হয়েছে, যেমন ভাবে তাকবীর আরাতের কোলে মাথা রাখে, ঠিক সেই ভাবে ছোট বীরাত তাঁর মাম্মার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে, আরাত ছেলের কপালে আলতো চুমু রেখে দিয়ে, স্নেহভরে হাতে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, তাকবীর নীরবে সেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্যটা দেখছে, দেখতে দেখতে তাঁদের বিয়ে প্রায় সাড়ে সাত বছর হয়ে গেছে, এই সাড়ে সাত বছরে আরাতের মধ্যে বাচ্চামি স্বভাব আর নেই, হুট করে যখন জানতে পারে তাঁদের দু’জনের অস্তিত্ব এই পৃথিবীতে আসতে চলছে,হটাৎ করে যেন সেই বাচ্চামি স্বাভাবের আরাত বড় হয়ে গেলো, ধীরে ধীরে স্বামী সংসার নিয়ে নিজেকে গুছিয়ে নিতে লাগলো, একসঙ্গে জমজ দুই বাচ্চার মা হয়ে একদম তাকবীরের ঘরের পাক্কা গিন্নি হয়ে উঠলো, ছেলে মেয়ে কে মায়ের সাদ আর সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিতে শিখে গেছে, শুধু ঘরে তাঁর স্বামীর খেয়াল রাখতে হয় না, উল্টো সারাদিনের অফিসের কাজ শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে তাকবীর ঘরে ফিরে নিজের বউয়ের খেয়াল রাখে, তাঁর ছোট ছোট বাচ্চার মা’য়ের খেয়াল রাখাটা নিত্যাদিনের কাজের মধ্যেই পড়ে, আরাত একদিন হটাৎ করে গভীর রাতে তাকবীরের বুকে মাথা গুঁজে তাকবীর কে প্রশ্ন করেছিলো,
___” আচ্ছা আপনি ক্লান্ত হয়ে যায় না?
___” কেনো?
আরাত একটু সময় নিয়ে বলেছিল,
___” এইযে সারাদিন অফিস সামলে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরে এসে, আমার খেয়াল রাখেন, আমাকে খাইয়ে দেন, আমার শরীরের যন্ত নেন, আমার কাজে হেল্প করেন, আমার সঙ্গে রাত জেগে বাচ্চাদের খেয়াল রাখেন, এতকিছুর মাঝে আপনার ক্লান্ত শরীর কে বিশ্রাম দেওয়ার সুযোগ হয়ে উঠে না, আপনার তো এসবে ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার কথা?
সেদিন তাকবীর আরাতের ঘারে মুখ গুঁজে উওরে বলেছিলো,
___” ঘরে ফিরে সর্বপ্রথম তোমার দেখা পেলেই আমার সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়ে যায়, শরীরে এক অদ্ভুত শান্তি নেমে আসে, তুমি একটু কাছে এলেই পৃথিবীর সব ক্লান্তি ঘুমিয়ে পড়ে নিঃশব্দে, তোমাকে বুকে জড়িয়ে নিলে আমার মনে হয়, এটাই আমার সবচেয়ে বড় কোমল বিশ্রাম।
তাকবীর আরাত কে নিজের বুকের ভিতর আরো গভীর ভাবে জরিয়ে নিয়ে আরাতের গালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে পুনরায় বলেছিল,
___” আর যদি তুমি বলো তোমার খেয়াল রাখার কথা, তাহলে আমি বলবো,তোমার খেয়াল রাখা আমার সবচেয়ে প্রিয় দায়িত্ব আর অভ্যাস,তুমি ভালো থাকলেই আমি ভালো থাকি,আমার পৃথিবীর ঠিক থাকে, তোমার পাশে থেকে তোমাকে ভালো রাখাই আমার শান্তির সবচেয়ে সুন্দর কারণ,তোমার হাসিতে আমার সব ক্লান্তির ওষুধ মিশানো রাত।
তাকবীরের আবেগময় কথায় আরাত শান্তিতে চোখ বুজে তাকবীরের বুকে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়েছিল, আরাতের ঠোঁটের আলতো স্পর্শে তাকবীর আরাও অস্থির হয়ে উঠেছিল, কিন্তু নিজেকে সামলানোর তালে দুষ্টামির ভঙ্গিতে বলেছিল,
___” আমার ছেলেমেয়ে কে সামলানোর দায়িত্ব আপনার, আর আপনাকে সামলানোর দায়িত্ব আমার, বুঝলেন ম্যাম?
তাকবীরের দুষ্টুমি ভরা কথায় আরাত তাকবীরের বুক থেকে মাথা তুলে তাকবীরের দিকে চেয়ে নাক ছিটকে বলেছিল,
___” আমি কী ছোট বাচ্চা নাকি ?
আরাত কে নাক ছিটকাতে দেখে তাকবীর মুচকি হেঁসে আরাতের নাকে নাক ঘষে আদুরে গলায় বলেছিল
___” না, ছোট বাচ্চা না, তুমি আমার দু বাচ্চার মা।
এবার আরাত তাকবীর দুজনেই একসঙ্গে মুচকি হেঁসে উঠেছিল, আরাত বীরাত এর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তাকবীরের দিকে তাকালো, তাকবীর কে কিছু নিয়ে ভাবতে দেখে আরাত চোখের ইশারায় জানতে চাইলো,
___” কী ভাবছেন?
তাকবীর আরাত কে চোখের ইশারা করতে দেখে মুচকি হেঁসে আরাতের কপালে চুমু রেখে দিয়ে বুকের সাথে জরিয়ে নিলো, বীরাত এতক্ষণে মায়ের ভালোবাসা পেয়ে চোখ বুঝিয়ে নিয়েছে, আরাত নিজেও তাকবীরের বুকে মাথা থেকিয়ে চোখ বুঝলো, ঘরের ভেতর টা যেন ভালোবাসা, মায়া আর দোয়ায় ভরে উঠেছে, তাকবীরের চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, যেন এই ছোট্ট পরিবারটাই তাকবীরের পুরো পৃথিবী, বেশ কিছুক্ষণ যাওয়ার পড়ে তাকবীর হটাৎই বলে উঠলো,
___” রশ্মির সঙ্গে দেখা হয়েছিল?
আরাতের বন্ধ চোখের পাতা খুলে গেলো, তাকবীরের কথায় এতক্ষণে বুঝতে পেয়েছে, আনাস শপিংমলে রশ্মির সঙ্গে দেখা হওয়ার বিষয়টি তাকবীরের কাছে বলে দিয়েছে, আরাত ছোট করে উওর করলো,
___” হুম ।
তাকবীর পুনরায় একি ভঙ্গীমায় বলল,
___” ইগনোর করছো কেনো?
আরাত ঠিক হয়ে বসতে বসতে গম্ভীর গলায় বলল,
___” ইগনোর করবো কেনো, সে আমার কে?
আরাতের কথায় তাকবীরের ভ্রু কুঁচকে এলো,
___”রশ্মি তোমার কেউ না?
আরাত একনজর তাকবীর কে দেখে কিছু না বলে, ঘুমন্ত বীরাত কে কোলে তুলতে তুলতে বলল,
___” ছিলো একসময়, বাট আমি তাঁর কেউ ছিলাম না, বর্তমান আমার বলতে শুধুই আপনাকে বুঝি, কেনো থার্ড পার্সন কে না।
আরাত বীরাত কে নিজের কোলে তুলে নিতে নিলে, তাকবীর আরাত কে বাঁধা দিয়ে নিজেই ঘুমন্ত বীরাত কে কোলে তুলে নিলো আহিনের রুমে রেখে আসার জন্য, আরাত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কোরাআন শরিফ মেঝে থেকে তুললো রেখে দেওয়ার জন্য, তাকবীর বীরাত কে নিয়ে দরজার সামনে এসে পুনরায় পিছু ফিরে তাকালো, আরাত কে কোরাআন শরিফ রেখে দিতে দেখে নীরব চোখ মেঝেতে রাখলো, কয়েক সেকেন্ড মেঝের দিকে চোখ রেখে পুনরায় আরাতের দিকে চেয়ে ঠান্ডা কন্ঠে বলে উঠলো,
___” পৃথিবীতে শত্রুের সঙ্গেও ভালোভাবে কথা বলতে হয়, কারণ তাঁদের সঙ্গে দ্বিতীয় বার আর দেখা হওয়ার সুযোগ থাকে না।
তাকবীর রুম থেকে বের হয়ে গেলো, আরাত তাকবীরের কথায় কোরাআন শরিফ রেখে দিয়ে মলিন হেঁসে বিরবির করে উঠলো,
___” এই পৃথিবীতেই সে আমার খেলার সঙ্গী ছিলো, আমাকে হারানোর ভয়ে সে কেঁদেছিল, যাকে নিজের থেকেও বেশি বিশ্বাস করেছিলাম, আমি তাকে-ও বদলে যেতে দেখেছি, সে-ও নিজের স্বার্থের জন্য আমাকে ছেড়েছে, এই দুনিয়াতে একমাত্র বিশ্বস্ত হাত বলতে আমি শুধু আপনাকেই জানি।
আরাত বিছানা ঠিকঠাক করে নিচ্ছে, মাহা বেশিভাগ আদিবা তালুকদারের কাছে থাকে, আর বীরাত এরান আহিন এক রুমে থাকে, যদিও তাঁদের জন্য আলেদা রুম আছে, তবে এতটুকু বাচ্চা দের একা আলেদা রুমে রাখে না, আরাত মাহা কে নিজের সঙ্গে রাখে, কিন্তু মাহা পাপা মাম্মার চেয়ে বেশি ভাগ রাতে দাদিমা( রাবেবা) তো নানিমা র ( আদিবা) কাছেই থাকে, আজকেও সেম, আদিবা তালুকদার এর কাছে মাহা, এতক্ষণে ঘুমে তলিয়ে গেছে, আরাত আর মেয়ের খোঁজ করলো না, কেনো না আরাত জানে মাহা এখন কোথায়, বরং চে আরাতের থেকে আদিবা রাবেয়া তালুকদার এর কাছে বেশি থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে মাহা, মাহার সব আবদার মুখ থেকে বের হওয়ায় আগেই তাড়া পূরণ করে দেয় কি-না, আরাত বিছানা ঠিক করতেই আনমনে সোফার দিকে চোখ গেলো, সন্ধ্যার আগেই শপিংমল থেকে ফিরেছে, বাড়ির সবার জন্য শপিং করেছে, এখনো কাউকে দেখানো বা দেওয়া হয় নি, সময় হয়ে উঠে নি, আরাত ধীর পায়ে সোফার কাছে এসে এক এক করে ব্যাগ গুলো দেখতে লাগলো, মনে মনে ঠিক করে নিলো আগামীকাল সবাই কে শপিং গুলো দিয়ে দিবে, আরাত শপিং ব্যাগগুলো দেখার মধ্যেই তাকবীর বীরাত কে আহিনের রুমে রেখে রুমে আসলো, আরাত কে সোফাতে বসে শপিং দেখতে দেখে তাকবীর আরাতের কাছে এসে গলা খাঁকারি দিলো, আরাত চোখ তুলে একনজর তাকবীর কে দেখে তাকবীরের জন্য নিয়ে আসা শপিং তাকবীরের সামনে ধরে হাসিমুখে বলল,
___” আপনার জন্য।
তাকবীর কিছু বললো না,শুধু গম্ভীর গলায় আরাতের হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে দেখতে লাগলো, কেনো না আজ নতুন না, এই কয়েক বছরে আরাত তিন বছর আগে থেকে এমন করে আরছে প্রতি ঈদে, তাকবীরের ক্রেডিট কার্ড বা ডেবিট কার্ড নিয়ে শপিং মলে গিয়ে পুরো তালুকদার বাড়ির জন্য শপিং করে আনবে, সঙ্গে তাকবীরের জন্য শপিং করতে ভুলবে না, তাকবীরের জন্য শপিং করে তাকবীর কে এমন ভাবে গিফট দিবে, যেন আরাত নিজের টাকা দিয়ে তাকবীর কে শপিং করে দিচ্ছে, আর তাকবীর তাঁর বউয়ের গিফট পেয়ে খুব আনন্দিত, তাকবীর আরাত এর হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে নিজের জন্য আনা সাদা পাঞ্জাবি টা দেখতে লাগলো, আরাত প্রতি ঈদে তাকবীরের জন্য অন্য পোষাক না সাদা পাঞ্জাবি নিয়ে আসবে, এই-যে বর্তমান তাকবীরের শরীরে সাদা পাঞ্জাবি জড়ানো, এটাও আরাতের কেনা, তবে খারাপ লেগে না, আরাত তাকবীরের জন্য সাদা পাঞ্জাবি এবং নিজের জন্য সাদা শাড়ি এবং বোরকা নিবে, এবারও সেম কাজটাই করেছে, তাকবীর গম্ভীর মুখে পাঞ্জাবি দেখছিলো, আরাত হটাৎই তাকবীরের সামনে তাকবীরের ডেবিট ক্যার্ড এগিয়ে দিয়ে বলল,
___” বেশি না, বউ হওয়ার মানবতার খাতিরে মাএ দুই লক্ষ টাকার শপিং করেছি।
তাকবীর ডেবিট ক্যার্ড দেখতে দেখতে বলল,
___” তুমি বউ নাকি আওয়ামীলীগ?
তাকবীরের কথায় আরাত ভ্রু কুঁচকালো, চেতে উঠা গলায় বলে উঠলো,
___” মানে?
তাকবীর ডেবিট কার্ড থেকে চোখ ফিরিয়ে আরাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” মানে আওয়ামিলীগ যেমন দেশের বাহিরে টাকা পাচাঁর করেছে, ঠিক তেমনই এক নিমেষেই তুমিও আমার দু লক্ষ টাকা শপিংমলে পাচাঁর করেছো।
আরাত চোখ ছোট ছোট করে বলল,
___” আমি কী নিজের জন্য শুধু শপিং করেছি, আমি তো পুরো বাড়ির জন্য শপিং করেছি।
___” এনাফ এনাফ এনাফ, আর না, যেমন লিডার তেমন তাঁর শিষ্য ।
আরাত কপাল কুঁচকে তাকবীর কে দেখতে লাগলো, আরাত ভুল কী বলেছে বুঝতে পারলো না, সে যা করেছে তাইতো বলছে, এখানে লিডার আর শিষ্য বা কই থেকে এলো, আরাত চিল্লিয়ে অবুঝের মতো বলে উঠলো,
___” মানে কী বলতে চাইছেন আপনি, কিসের লিডার আর কিসের শিষ্যর কথা বলছেন ?
তাকবীর আরাতের ভোলাভালা মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” আমি কী আমার জন্য কিছু করেছি, আমি তো পুরো দেশবাসীর জন্য করেছি, হাসিনা আফা কে কপি করে পুরোই কপিরাইটের মতো জঘন্য কাজ করছো রাত ।
তাকবীরের কথায় আরাত পুরো তাজ্জব বনে গেলো, আরাত এতকিছু ভাবেনি, অথচ তাকবীর কতকিছু ভেবে আরাত কে পাচাতে শুরু করছে, তাঁর থেকে বড় কথা গম্ভীর তাকবীর আজকে এত কথা বলছে, তাও অহেতুক কারণ নিয়ে, আরাত মুখ মলিন করে তাকবীর বলল,
___” আপনি সামান্য দুই লক্ষ টাকার জন্য আমাকে কথা শোনাচ্ছেন, যান আপনার টাকা আমি বাবা এর কাছে থেকে নিয়ে পরিশোধ করে দিবো।
তাকবীর যেন এতে আরো ক্ষিপ্ত হলো, ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
___” হোয়াট? তুমি দুই লক্ষ টাকা পাঁচার করেছো, আনাস দুই লক্ষ টাকা, তোমার শশুর দুই লক্ষ টাকা, তোমার বাবা দুই লক্ষ টাকা, এসব কই থেকে আসে শুনি, একমাত্র আমার অফিস থেকে আসে, আর তুমি আমার দুই লক্ষ টাকা আমাকেই ট্রান্সফার করে দিতে চাইছো ?
আরাত তাকবীরের কথায় দু-হাত ভাজ করে তাকবীর কে ভেঙ্গিয়ে বলতে লাগলো,
___” ফর ইউর ইনফরমেশন, বাবা এবং আমার শশুর আব্বু দু লক্ষ না, ছয় লক্ষ টাকার শপিং করেছে, আর হ্যাঁ শুধু তালুকদার বাড়ির জন্য না, শেখ বাড়ি, মির্জা বাড়ি, এবং রাহিমা সুলতানা আন্টিদের বাড়ি আর গ্রামের মামামামী, আর আপনার নানুবাড়ি সন্ধ্যা দের বাড়ির জন্য, সবমিলিয়ে প্রায় ছয় লক্ষ টাকার ঈদের শপিং করেছে, আর আনাস ভাইয়া নিজের ইনকামের এক লক্ষ টাকার শপিং করেছে, আর আমি আমার হাজবেন্ডের দুই লক্ষ টাকার শপিং করেছি, নট টাকা পাচাঁর এটাকে বলে শপিং, ঈদের শপিং বুঝতে পারছেন?
আরাত রাগের মাথায় এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে নিশ্বাস নিলো, তাকবীর আরাতের কথায় কপাল কুঁচকে বলল,
___” অফিস টা তো আমার, সো তোমরা পুরো আওয়ামিলীগ মিলে যত টাকা পাচাঁর করছো, সব আমার অফিসের টাকা ছিলো।
___” আপনার অফিস মানে?
তাকবীর বাঁকা হেঁসে নিজের পাঞ্জাবির ওড়না দিয়ে হুট করে আরাতকে এক ঝটকায় নিজের বুকে টেনে ফেলে বলল,
___” অভিয়াসলি আমার অফিস, আমার শশুরের মেয়ে-জামাইয়ের অফিস, তোমার শশুরের ছেলের অফিস, এন্ড আজান তালুকদার তাকবীরের গড়ে তোলা অফিস,সো অফিস টা কার অভিয়াসলি আমার।
আরাত হা করে তাকবীরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো, তাকবীর কোথাও থেকে কোন যুক্তি খুঁজে বের করে তুলে ধরছে, আরাত সেসব মিলাতে ব্যাস্ত, তাকবীর আরাতের মুখের চাহনি দেখে আরাতের আড়ালে মুচকি হাঁসলো, তাঁর বউটা যে বেজায় রেগে গেছে তার চাহনি দেখেই বুঝা যাচ্ছে, আরাত কিছুক্ষণ ভেবে পুনরায় তেতে উঠে বলল,
___” আমরা যদি আওয়ামিলীগ হয়ে থাকি, তাহলে আপনি বিএনপি, অফিসের টাকা পুরো তালুকদার বাড়ি মালিকানা, আর আপনি শুধু আপনার নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছেন, যেমন করে বিএনপি পুরো বাংলাদেশ কে ক্ষমতার জোরে নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছে।
___” এই তুমি এতটুকু পিচ্চি মেয়ে হয়ে আফিসের মামলায় ডুকবে না, বলে দিলাম।
___” হ্যাঁ আমি এতটুকু হতে পারি, বাট দুই বাচ্চার মা, সন্মান দিয়ে কথা বলবেন।
___” আর সেই দুই বাচ্চার বাবা আমি।
দুজনের কথাকথনের মধ্যেই আনাস হামি তুলতে তুলতে রুমে ঢুকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে উঠলো,
___” কী হয়েছে ভাইয়া, তোমরা এত রাতে চিল্লাচিল্লি করছো কেনো?
আনাস এর হটাৎ আগমনে তাকবীর আরাত কে ছেড়ে দিয়ে রাগী গলায় আনাস কে এক ধাক্কায় ঘর থেকে বের করে শব্দ করে দরজা লাগাতে লাগাতে বলল,
___” তুই চুপ থাক, জামাতের মতো মাঝখান থেকে টক্কর দিতে হাজির, সালা জামাত-শিবির।
আনাস এর চোখ থেকে ঘুম শেষ, বেচারা বুঝতেই পারলো না, তাঁর সঙ্গে হলো টা কী, সে তো কাঁচা ঘুম থেকে উঠে এলো, বীর রাত এর চিল্লাচিল্লি শুনতে পেয়ে, ভেবেছিলো দুজন হয়তো ঝগড়া লেগেছে, এই খুশিতেই একটু তাড়াহুড়ায় রুম নক না করে রুমে ঢুকে পড়েছে, তাই বলে এভাবে জামাত শিবির বলে ঘাড় ধরে রুম থেকে বের করে দিবে, এটা তো ঘোর অন্যায়, এটার একটা বিহিত হওয়া দরকার, কোথাও ভাবলো বিয়ের সাতবছরেও কখনো বীর রাত কে ঝগড়া করা দেখার সুযোগ হয়ে উঠে নি, এটাই মোক্ষম সুযোগ, কিন্তু কে জানতো এভাবে অন্যের ঘরের ঝগড়া দেখতে গিয়ে অপমান হতে হবে, না এই অপমান আর নেওয়া যায় না, আনাস নিজের মনে কথা গুলো ভেবে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াতেই, আইরা কে হাতে হাত গুঁজে ভ্রু কুঁচকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আনাস গলা খাঁকারি দিলো, আনাস এর চেহারা এমন, ছেড়ে দে মা দৌড়ে পালাই, শেষমেশ ফুপুর পেতের বউয়ের সামনে অপমান হতে হলো, তাও কিনা বড় কাজিন আর ছোট বোনের ঝগড়া দেখতে এসে, আনাস গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
___” তুই এখানে?
আইরার কপালে শুঁকনো ভাজ যেন আরো গারো হলো,
___” আমার বাড়ি, আমিই তো থাকবো তাই-না,তুমি কাকে এক্সপেক্ট করেছিলে ?
আইরার কথায় আনাস নিজের মধ্যে গম্ভীর টেনে বলল,
___” কাউকে না, রুমে চল।
বলেই আনাস নিজেদের রুমের দিকে হাঁটতে লাগলো, আইরা পিছনে থেকে দেখে উঠলো,
___” তুমি তো তাকবীর ভাইয়ার রুমে এসেছিলে, কী হয়েছে ওঁদের এতো রাতে এত চেল্লাচিল্লি করছে কেনো দুজন?
আনাস আইরার কথায় জায়গায় দাঁড়িয়ে বলল,
___” আগে বল তুই কখন এসেছিস এখানে?
আইরা অবাক হয়ে,
___” কেনো মাএ তো আসলাম?
আনাস এর মুখে হাসি ফুটে উঠলো, বুকে হাত দিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে মনে মনে বলতে ভুললো না,
___” যাক আল্লাহ বাঁচাছে, বউয়ের সামনে অপমান হতে হয়নি।
আনাস বুকে হাত দিয়ে পিছু ফিরতেই, আইরা কে নিজের খুব নিকটে দেখে হুট করেই আইরা কে কোলে তুলে নিয়ে রুমের দিকে যেতে যেতে বলল,
___” তুই আবার ইনসিপির মতো আমার পাশে এসে দাঁড়ালি কেনো? চল রুমে চল।
আনাস এর হটাৎ আক্রমণে আইরা ভেবাচেকা খেয়ে গেলো, কোথায় থেকে কী হয়ে গেলো মাথায় ঢুকলো না, এই ইনসিপি আবার কই থেকে এলো, আর কেনো বা আনাস তাঁকে ইনসিপি বলল কিছুই বুঝতে পারলো না।
সময় টা দুপুর গড়িয়ে বিকালের ঘরে, শহর থেকে মিম পার্থ আর আহিন তিনজন তালুকদার বাড়ির গাড়িতে রওনা দিয়েছিল দুপুর দুটোই দিকে, প্রায় তিনঘণ্টা জার্নি করো গাড়ি গ্রামের চিকন রাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে মিম দের উঠানে এসে দাঁড়ালো, বিকেলের হালকা বাতাসে পুরোদিনের রোদে নেতিয়ে পড়া গাছের পাতা গুলো হালকা বাতাসে দুলছে, গাড়ি এসে উঠানে থামতেই তিনজন একসাথে নেমে পড়লো, মিম স্কার্ট এর উপর সাদা পাতলা ওড়না টা ঠিক করতে করতে চারপাশে তাকিয়ে হালকা মৃদু হাসলো,সবকিছু অনেকদিনের চেনা, তবুও নতুন লাগছে, হয়তো বাড়িতে নতুন করে রং করিয়েছে দেখে এমন লাগছে, সেই যে রুপোলী বেগমের উপর রাগ করে তাকবীর আরাতের সঙ্গে গ্রাম ছেড়ে ছিলো, প্রায় সাতবছর পড়ে গ্রামের মৃদু বাতাস গ্রামের ঠান্ডা আবহাওয়া শরীরে লাগছে, বিষন্ন মনটা নিমেষেই ফুরফুরে হয়ে গেলো, মনের মধ্যে আব্বু আম্মু কে নিয়ে হাজার ঘানি ভাবনা চলছে, আব্বু আম্মু এতবছর পড়ে তাঁদের আদরে একমাত্র মেয়ে মিম কে দেখে কেমন রিয়াকশন দিবে, কান্না করে দিবে, নাকি অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিবে, মিম মনের মধ্যে হাজারো ভাবনা নিয়ে বাড়ির দিকে এগুতে নিলে,ঠিক তখনই হঠাৎ করে মিমের ফুলের বাগান দিক থেকে ভেসে এলো এক ছেলের কণ্ঠে মধুমাখা সুর, গানের আওয়াজে তিনজনই থেমে গিয়ে একিউপরের দিকে তাকালো,
“দেখ না ইউঁ বেয়রুখি সে
আজ তো নজর মিলালে
হ্যায় কসম তুঝে দিওয়ানি
পেয়ার কা কোই সিলা দে
যব সে তেরি আঁখেঁ ঝুঁকি হ্যায়
তব সে মেরি সাঁসে রুকি হ্যায়
চোরি চোরি খ্বাবোঁ মে
আ ভি যা…
নয়ন সে নয়নো কো মিলা
নয়ন সে নয়নো কো মিলা
কাহে কো সাতায়ে হ্যায়
নয়ন সে নয়নো কো মিলা
তিনজনের মনের মধ্যে কৌতূহল শুরু হয়ে গেলো, কে বা গান গাইছে আর গানের সুর তো মিমের ফুল বাগান এর দিক থেকেই আরছে,গানের সুরের সঙ্গে ছোট ছোট বাচ্চার হাসির শব্দ ভেসে আসছে, আহিন বাগানের থেকে চোখ ফিরিয়ে মিম কে ধীরে বলে উঠলো,
___”কে গান গাইছে?
মিম কোনো উত্তর দিল না, একনজর আহিন কে দেখে চুপচাপ বাগানের দিকে হাঁটা ধরলো,পার্থ মিম কে বাগানের দিকে যেতে দেখে আহিনের ঘারে এক হাত রেখে বললো,
___” চলো দেখি।
আহিন পার্থর সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে লাগলো, তিনজনই দু’এক পা করে আস্তে আস্তে বাগানের দিকে এগিয়ে গেল, বিকালের ঠান্ডা মৃদু বাতাসে ফুলের গন্ধ, তাঁর পাশাপাশি পাখির ডাক আর সেই মিষ্টি কণ্ঠ সব মিলিয়ে এক শীতল অনুভূতি করে তুলছে, কিছুটা কাছে যেতেই তিনজন যা দেখলো, তাতে সবাই অবাক হয়ে গেল,বাগানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আরশ, তার চারপাশে পাঁচ-ছয়টা ছোট ছোট বাচ্চা, কেউ গাছে পানি দিচ্ছে,তো কেউ আগাছা পরিষ্কার করছে, কেউ আবার হাসতে হাসতে মাটিতে বসে ফুলের নতুন চারা লাগাচ্ছে, আরশ ছোট ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে হাতে হাত লাগিয়ে গান গাইছে, মিম নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো,চোখে তাঁর বিস্ময়, আরশ গ্রামে কী করছে, আর মিমের ফুল বাগানেই বা তাঁর কাজ কী, মিম বিস্ময় হয়ে পুরো ফুল বাগান দেখতে লাগলো, মিম যেমন রেখে গেড়েছিল তাঁর থেকে বেশিই সুন্দর করে তুলছে পুরো বাগান, এতটা বছর যত্ন না করলে তো এত সুন্দর বাগান সম্ভব হতো না, মিম ভাবতেই পারেনি তাঁর ফেলে রাখা ফুলের বাগান এভাবে জীবন্ত হয়ে আছে, আরশ এর গলায় গান বলে দিচ্ছে এতবছরে গম্ভীর্য থেকে কিছুটা হলেও বেরিয়ে এসেছে, আহিন অবাক হয়ে বলে উঠলো,
___” তোমার বাগান তো এখন পুরো বদলে গেছে মিম আপু।
আহিনের কথায় আরশ গান বন্ধ করে পিছনে ফিরে তাকালো, পিছু ফিরে তাকাতেই আরশের স্বাভাবিক মুখ পুনরায় গম্ভীর হয়ে উঠলো, বাচ্চা রা মিম কে দেখে আরশের দিকে তাকালো, আরশ তাঁদের চোখের ইশারায় জায়গা ত্যাগ করতে বলল,এবং বাচ্চা গুলো আরশের ইশারা বুঝতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে মিমের পাশ ঘেঁষে দৌড়ে চলে গেলো, আরশ বাগান থেকে গম্ভীর মুখে উঠানের দিকে হাঁটতে লাগলো, মিম আহির কে পাশ কেটে যেতেই পার্থ আরশের সামনে এসে হাসি মুখে দাঁড়ালো, পার্থ কে নিজের সামনে দাঁড়াতে দেখে আরশ ভ্রু কুঁচকালো, মিম আহিন পিছুু ফিরে দেখছে দুজন কে, পার্থ হাসি মুখে বলে উঠলো,
___”হাই ব্রো, তোমার ভয়েস নিয়ে বলার কিছু নেই, জাস্ট অ্যামেজিং।
আরশ খানিকটা বিরক্ত হলো, পার্থ পুনরায় আরশের সামনে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
___” ফ্রেন্ড!
আরশ নীরব চোখে পার্থ কে দেখলো,ছেলেটার স্টাইলে আধুনিকের ছোঁয়া থাকলেও দেখতে পুরো রাজকুমারের মতো, দুধে আলতা ফর্সা গঠনে মাথার চুলগুলো বাদামী, চেহারায় মায়া লেগে আছে, ঠোঁটের কোণে সবসময় কিছুটা হাসি হাসি ভাব লেগে থাকে বোধহয়, আরশ পার্থ কে পর্যবেক্ষণ করে পার্থর বাড়িয়ে দেওয়া হাত কে অগ্রহ করে গম্ভীর গলায় বলল,
___” আমি যার তাঁর সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ করি না।
আরশ বাড়ির দিকে পা বাড়ালো, পার্থ মুখে তাচ্ছিল্য তা ফুটিয়ে আহিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” হোয়াট, যার তাঁর সঙ্গে মানে কী, আমাকে হুদাই মনে হয়?
আহিন পার্থর কথায় বলে উঠলো,
___” জ্বলে জ্বলে।
মিম দুজনের কথায় কান না দিয়ে আরশের যাওয়ার পানে চেয়ে রইলো, আহিনের কথা বুঝতে না পেয়ে পার্থ অবাক হয়ে বলে উঠলো,
___” হোয়াট ইস জ্বলে?
___” হ্যাঁ জ্বলে, ভাই আমার সিঙ্গেল তো, চোখের সামনে কাঁপল দেখে বউয়ের কথা মনে পড়ে যায়, এজন্য বুকের বা পাশে জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছে।
পার্থ এখনো আহিনের কথা বুঝতে না পেয়ে আগের ন্যায় চেয়ে আছে,আহিন কাঁপল বলতে কাকে বুঝালো পার্থের মাথায় ঢুকলো না, পার্থ কে অবুঝের মতো চেয়ে থাকতে দেখে আহিন মুচকি হেঁসে মাথা ঘুরিয়ে আরশের যাওয়ার পানে চেয়ে দু-হাত উজাড় করে গলা স্বর উচ্চ করে বলতে লাগলো ,
___” রিসেন্টলি টিকটিকে একটা গান ভাইরাল হয়েছে না, এিশে দিছি পা, আর কবে বিয়ে করবাম, লেট করলে হবে দেরি, কবে ইস্টুকুল করবাম,ঘুম আসে না ভালো লাগে না, ব্যাকাইদা বেরাম, আমায় বিয়া দাও বিয়া দাও, বিয়া দাও বাজান… বেসিকালি আরশ ভাইয়া এিশ বছর পার করেও বউ না পেয়ে কাঁপল দেখলেই তাঁর জ্বলে।
আহিনের উচ্চ স্বরের কথা এবং ভেঙ্গিয়ে ভেঙ্গিয়ে গান আরশের কানে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরশের পা জায়গায় থেমে গেলো, আহিন আরশ কে দাঁড়াতে দেখে ঘাবড়ে গেলো, এই বুঝি আরশ রেগে গেছে ভেবে, আহিন নিজেও বুঝতে পারে নি আহিনের গান বা কথা আরশের কান অবধি পৌঁছিবে, আহিন ঘাবড়ানো মুখে পার্থর দিকে তাকাতেই দেখলো, পার্থ মুখ চেপে ধরে নিজের হাসি আটকাচ্ছে, আহিন পুনরায় মিমের দিকে তাকালো, মিম রাগী চোখে আহিনের দিকে চেয়ে আছে, আহিন এবার নিষ্পাপ ছেলের মতো মাথা টা নিচু করে নিলো, কেনো না মিম পাশেই রাগী চোখে চেয়ে আছে, আর সামনে যাকে নিয়ে উল্টোপাল্টা বলছে সে থম ধরে পিছু না ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে, আর পার্থর দিকে তাকালে তো আরো বেশি কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে, কারণ পার্থর হাসি দেখে নিজেও হাসি কন্ট্রোল করতে না পেয়ে শেষে মিম আরশের হাতে কেলানি খেতে হবে এই ভেবে, কিন্তু আহিনের হাজারো জল্পনা কল্পনা তুচ্ছ করে দিয়ে আরশ গমগম পায়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে গেলো, না পিছু ফিরে তাকালো, না আহিন কে ধমকে উঠলো, আরশ বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করার পরপর মিম আহিন কে বাঁকা চোখে একনজর দেখে নিজেও বাড়ির দিকে পা বাড়ালো, কেনোনা তাঁর অনেক অজানা কিছু জানার আছে, আরশ তাঁদের গ্রামে কেনো, তাঁর রেখে যাওয়া ফুলের বাগান এত যত্ন কেনো, এত বছরে তাঁর রেখে যাওয়া ফুলের বাগানের অস্তিত্ব যত্নের অভাবে অযত্নে ধুলোর সঙ্গে মিশে যাওয়ার কথা অথচ মিমের গড়ে তুলা বাগানের থেকেও রেখে যাওয়া তাঁর ফুলের বাগানের সৌন্দর্য দ্বিগুণ বেড়ে গেছে, পুরো বাড়ি নানারকম ফুলের সুবাস এর সংমিশ্রণে এক অন্য রকম অনুভূতি গড়ে তুলছে চারপাশে, আর আরশ কেনোই বা মিম দের বাড়িতে নির্দ্বিধায় প্রবেশ করলো, মিম কে বড় বড় পা ফেলে বাড়ির দিকে পা বাড়াতে দেখে পার্থ আহিন, দু’জনেই মিমের পিছনে পিছনে হাঁটতে শুরু করলো, মিম ব্যস্ত পায়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতেই নিজের মা আর আরশের কন্ঠ শুনে সদর দরজায় থমকে দাঁড়ালো,
___” কেনো চলে যাচ্ছিস বাবা, আর কতো এড়িয়ে যাবি, এবার তো নিজেকে প্রকাশ কর?
রুপোলী বেগমের কথায় আরশ তাচ্ছিল্য হেঁসে মাথায় হেলমেট হাতে নেড়ে চেড়ে দেখতে দেখতে বলল,
___” আর ইচ্ছাশক্তি নেই কারো কাছে নিজেকে এক্সপ্লেইন করার, কেনো কিছু প্রমান করার, সে সঠিক তাঁকে সঠিক থাকতে দেও আন্টি, খুব কষ্ট করে সামলিয়েছি নিজেকে, আমি একেলা আমাকে একাকিত্বর সঙ্গে সঙ্গী করতে দেও প্লিজ।
রুপোলী বেগম পুনরায় বললেন,
___” চলে যাবি?
রুপোলী বেগমের গলায় আবেগ জরানো, মিম অবিশ্বাস্য চোখে দেখছে এবং শুনছে তাঁর মায়ের আর আরশের কথপোকথন, মিমের বিশ্বাস হচ্ছে না যে ছেলের জন্য আজ এতটা বছর মিম নিজের পরিবার গ্রাম দেশ ছেড়েছে, সেই ছেলে কেই তাঁর মা আদুরে গলায় আপ্যায়ন করছে, আরশ হটাৎই রুপালী বেগমের কপালে চুমু রেখে দিয়ে বলল,
___” ইউ নো হোয়াট, আমি তো ফিরবো,টেনশন করে নিজের বিপি বাড়ায় না, নয়তো এই অধম ডাক্তার কে আজ গ্রামে থাকতে হবে।
আরশের কথায় রুপোলী বেগম মুচকি হাসি উপহার দিলেন, আরশ নিজেও খানিকটা মুখে মলিন হাসি টেনে আল্লাহ হাফেজ বলে হেলমেট মাথায় পড়ে কেনো দিকে না তাকিয়ে মিম কে পাশ কাটিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো, যেন এখানে শুধু রুপোলী বেগম কে ছাড়া কাউকেই চোখে পড়ে নি আরশের, রুপোলী বেগম আরশ কে হাসি মুখে হাত বিদায় দিতে সদর দরজার দিকে তাকিয়ে মিম কে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো, কিন্তু ভদ্রমহিলার মুখে সাতবছর পড়ে নিজের মেয়ে কে দেখে কেনো পরিবর্তন ঘটলো না, স্বাভাবিক ভাবে মিম কে দেখতে লাগলো যেন মিম এই বাড়িতে আসবে রুপোলী বেগম আগে থেকেই জানতেন, আরশ কে পাশ কেটে যেতে দেখে মিম এবার নিজের মায়ের দিকে তাকালো, এতবছর পড়ে নিজের মা’কে সামনাসামনি দেখে মিম আর নিজেকে আটকিয়ে রাখতে পারলো না, চোখে পানি নিয়ে দৌড়ে এসে রুপোলী বেগমের উপর ঝাপিয়ে পরলো, আহিন পার্থ চুপচাপ মিম আর রুপোলী বেগম কে দেখতে লাগলো, মিম রুপোলী বেগম কে জরিয়ে ধরে কান্না ভেজা কন্ঠে বলে উঠলো,
___” কেমন আছো আম্মু?
রুপোলী বেগম স্বাভাবিকভাবেই উত্তর করলো,
____” আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহপাক যেমন রেখেছে।
মিম পুনরায় কান্নাভেজা কন্ঠে বলল,
___” তোমাদের অনেক মিম করেছি আম্মু, তুমি আমাকে দেখে খুশি হয়নি?
রুপোলী বেগম নিজের গম্ভীর্য ধরে রেখে মিম কে ছেড়ে দিয়ে বলল,
___” হুম হবো না কেনো, ছেলেমেয়ে মা-বাবা কে ভুলে গেলেও মা-বাবা কখনো ছেলেমেয়ে কে ভুলতে পারে না।
মিম রুপোলী বেগম কে ছেড়ে দিয়ে বলল,
___” তুমি এভাবে কথা বলছো কেনো আম্মু, সাতবছর পড়ে তোমার মেয়ে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে, এতবছর পড়ে তোমার মেয়ে কে দেখার সেই আনন্দ টুকু মুখে দেখতে পারছি না কেনো?
রুপোলী বেগম এবার আহিন আর মাথায় ব্যান্ডেজ করা অসুস্থ পার্থ কে একনজর দেখে বললেন,
___”অনেক জার্নি করে এসেছো, ওঁদের দু’জন কে গেস্ট রুম দেখিয়ে দিয়ে রুমে গিয়ে একটু রেস্ট নেও, আমি তোমাদের খাবারের আয়োজন করছি।
কথাগুলো বলে রুপোলী বেগম কিচেন রুমের দিকে পা বাড়ালেন, এতে মিমের মন খারাপ হয়ে এলো, কই ভেবেছিলো এত বছর পড়ে রুপোলী বেগমের সামনে দাঁড়াবে, হয়তো রুপোলী বেগম মেয়েকে কাছে পেয়ে বুকের মাঝে জরিয়ে নিয়ে আবেগে কান্না করে বুক ভাসিয়ে দিবে, কিন্তু রুপোলী বেগম কিছুই করলেন না, না কেনো আগ্রহ দেখালেন, মিম মন খারাপ নিয়ে রুপোলী বেগমের যাওয়ার পানে চেয়ে রইলো, চোখ থেকে দু এক ফোঁটা পানি গাল বেড়ে গড়িয়ে পরছে অবনত, হটাৎই কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে মিম পিছু ফিরে তাকালো, পার্থ মিমের দুই কাঁদে হাত রেখে নিজের দিকে ঘুরিয়ে, দু-হাতে মিমের চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে নরম সুরে বলতে লাগলো,
___” ডোন্ট ক্রাই লেডি গুগল, তোর উপর আন্টির অভিমান জমে আছে, তুই তো বাংলাদেশে এসে পড়েছিস, ধীরে ধীরে আন্টির অভিমান ভেঙ্গে যাবে, এন্ড আন্টির অভিমান ভাঙ্গাতে তোর ডাফার তোকে হেল্প করবে সো ডোন্ট ক্রাই।
মিম পার্থর কথায় মাথা ঝাকিয়ে মলিন হাঁসলো, পার্থ পুনরায় বলতে লাগলো,
___” এনিওয়ে লেডি গুগল তুই কী, অসুস্থ এই আমি তাকে দাঁড়িয়ে রেখে মা-রা-র প্ল্যান করেছিস, এবার তো গেস্ট রুম টা দেখা রে মেরা মা।
মিম মুচকি হেঁসে পার্থর বুকে কিল দিয়ে বলল,
___” হুম চল ।
পার্থ কে কিল দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পার্থ মুখে আহ সূচক শব্দ বের করে হাত দিয়ে বুক স্লাইড করতে লাগলো, মিম পার্থ কে কিল মেরে আগে আগে রুমের দিকে পা বাড়ালো, পার্থ কিছুক্ষণ মিমের যাওয়ার দিকে চেয়ে থেকে মুখে মলিন হেঁসে ধীর পায়ে সেও মিমের পিছু হাঁটতে লাগলো।
ড্রায়িং রুম জুড়ে মাহা এরান বীরাত ছোটাছুটি করে খেলা করছে, আর তাঁদের কখনো আটকাচ্ছেন তো কখনো ধমক দিয়ে চুপচাপ নিজেদের পাশে বসতে বলেছেন, আদনান তালুকদার এবং আহাদ তালুকদার, তবুও নাতি নাতনী তাঁদের কথা শুনছে না, উল্টো বাড়ির দুই কর্তা কে নিজেদের খেলায় সামিল করেছে, আর বাড়ির দুই গিন্নি রান্না ঘরে শেষ রাতের জন্য রান্না তুলে দিয়েছে, কেনো না আজ শেষ রাতে সেহেরি খেলে পুনরায় এই দিন টার জন্য আরো এক বছর অপেক্ষা করতে হবে, দিনটা সত্যি স্পেশাল এবং আরো একটি বছর অপেক্ষা করার সাজ, যতটা সময় মিনিট যাচ্ছে রমাদান বিদায়ের সুর বেজে উঠছে হৃদয়ে, হটাৎ রাহিমা সুলতানার কান্নার আওয়াজে আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদার সজাগ দৃষ্টিতে রান্না ঘরের দিকে তাকালো, রান্না ঘর থেকে দুই জা একি দৃষ্টিতে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে গ্যাস বন্ধ করে ড্রায়ি রুমে এলো দ্রুত পায়ে, যত সময় কাটতে লাগলো ততই যেন রাহিমা সুলতানার কান্নার আওয়াজ আরো গারো হতে লাগলো, এবার আর কেউ মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো না, দ্রুত পায়ে তালুকদার বাড়ি থেকে বের হলো আহিন দের বাড়িতে যাওয়ার জন্য, কিন্তু রাবেয়া তালুকদার এর সামনে বাদ সাজে মাহা, মাহা দু-হাত উজাড় করে আধো আধো গলায় বলল,
___” দাদীমা কোলে।
রাবেয়া তালুকদার মাহা কে কোলে তুলে নিয়ে দ্রুত পায়ে তালুকদার বাড়ি থেকে বের হয়ে আহিন দের বাড়িতে প্রবেশ করে, বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতেই সবার মতো তিনিও থমকে যাওয়া চোখে সামনে তাকিয়ে থাকে, রাহিমা সুলতানা রশ্মি কে জরিয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না করছেন, রশ্মির চোখেও পানি, তাঁদের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে মাহির, মাহিরের কোলে তাঁদের ছোট তিথি, এত বছর পড়ে মেয়ে কে কাছে পেয়ে রাহিমা সুলতানা যেন নিজের হুঁশে নেই, রশ্মির কপাল গালে কান্নারত মুখে বারবার চুমু রেখে দিচ্ছে আর রশ্মি কে বকা দিচ্ছেন,
___” এতগুলো দিন কই ছিলো মা, আজকে তোর আম্মুর কথা মনে পড়ছে, এত অভিমানী তুই, আজকে কেনো এসেছিস, তোর আম্মু ভালো আছে তোদের ছেড়ে, চলে যায়, লাগবে না আমার কাউকেই।
রশ্মি রাহিমা সুলতানার কথায় অভিমানী গলায় বলল,
___” আচ্ছা ঠিক আছে আম্মু, ছেড়ে দেও আমি চলে যাচ্ছি।
রাহিমা সুলতানা রশ্মির কথায় রশ্মি কে আরো শক্ত করে জরিয়ে ধরলেন, যেন ছেড়ে দিলেই আবার হারিয়ে যাবে,
___” না ছাড়বোনা, একদম বাজে কথা বলবি না, এই বাড়ি থেকে বের হয়ে দেখ, তোর পা ভেঙ্গে দিবো, বলে দিলাম।
রশ্মির মায়ের কথায় কান্নারত মুখে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো, রাহিমা সুলতানা পুনরায় বলে উঠলেন,
___” তোদের জন্য মনটা সবসময় ছটফট করে, কিন্তু আমার ছেলেমেয়ে কেউ আমার পাশে নেই, আমার বুকটা খালি খালি লাগে, আমার ঘরের দরজা সবসময় তোদের জন্য খুলা থাকে, তোর পথ চেয়ে থাকি, কতগুলো বছর কেটে গেলো কিন্তু তুই আর ফিরিস নি, আমি এক মা, তোকে তো এই পেতে রেখেছি, এই হাতগুলো দিয়ে বড় করেছি, আমি কী করে এতগুলো বছর তোকে চোখের দেখা না দেখে, না কথা বলে থেকেছি বুঝতে পেয়েছিস,ছেলেমেয়ে যত ভুলই করুক না কেনো আমি তো মা, আর কতদিন সেই ভুল গুলো মনে থাকবে, আর কতদিন তোকে দূরে রাখবো,আমার বুকটা তো চায় আমার খালি বুকে আমার মেয়ে ফিরে আসুক, আমার বুকটা ভড়ে থাকবে,আমিও এই বুড়ো বয়সে এসে নাতিনের দের সঙ্গে খেলা করবো আদর করবো, তোকে আর দূরে যেতে দিবো না।
রাহিমা সুলতানা এর কান্না জড়ানো কথায়, সবার চোখেই পানি, সত্যি তো ছেলেমেয়ে যতই ভুল করুক না কেনো, বাবা-মার কাছে তারা কখনোই পর হয়ে যায় না,তারা থাকে ঠিক আগের মতোই নিজের, বুকের সবচেয়ে নরম জায়গাটায়, বাঁকি মানুষ গুলোর কাছে অপরাধী হলেও বাবা-মার কাছে কখনো অপরাধী হয়ে থাকে না, ভুল করলে বাবা-মা কষ্ট পায়, রাগ করে, হয়তো কঠিন কথাও বলে কিন্তু সেই রাগের ভেতরেও লুকিয়ে থাকে ভয়,আমার সন্তানটা ঠিক আছে তো, আর ভালোবাসা, বাবা-মা সন্তান দূরে চলে গেলে তারা অভিমান করে,কিন্তু দরজাটা কখনো বন্ধ করে না,কারণ তারা জানে, একদিন না একদিন এই পথ ধরেই তাদের ছেলে-মেয়ে আবার ফিরে আসবে, বাবা-মার ভালোবাসা এমন এক আশ্রয়, যেখানে হাজার ভুলের পরেও ছেলেমেয়ে মুখের এক ডাক, মা বা বাবা, এই একটা ডাকেই বাবা-মায়ের সব রাগ অভিমান গলে পানি হয়ে যায়, বাবা-মা তো এমনই, আজকে কতগুলো বছর পড়ে রশ্মি তাঁর মায়ের সামনে দাঁড়িয়েছে, অথচ রাহিমা সুলতানা রশ্মির দূরে যাওয়ার পর থেকে, মেয়ের ফিরে আসার পথ চেয়ে বসে ছিলো, এটা কেই হয়তো বলে মায়ের ভালোবাসা, সবাই কে চোখের পানি ফেলতে দেখে ছোট মাহা রাবেয়া তালুকদার এর চোখের পানি ছোট ছোট হাতে মুছে দিতে দিতে বলছে,
___” দাদীমা, কান্না করছো কেনো, এরান ভাইয়া তোমাদের চকলেট নিয়ে নিয়েছে?
মাহার আদুরে মাখা কথায় সবার কান্নাভেজা চোখ পড়লো মাহা আর রাবেয়া তালুকদার এর উপর, মাহার কথায় আহাদ তালুকদার এর হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এরান এর চোখমুখে ক্ষিপ্ততা দেখা গেলো, রাবেয়া তালুকদার সবাই কে একনজর দেখে নিয়ে মলিন মুখে হাসি টেনে মাহা কে বলে উঠলো,
___” না সোনামণি, তোমার এরান ভাইয়া চকলেট নেয়নি, তোমার খালামনী কে দেখে চোখের পানি এসে পড়েছে।
রাবেয়া তালুকদার খালামনীর কথা বলতেই মাহার মিমের কথা মনে পড়ে গেলো, মাহা সবার মতো মন খারাপ করো কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
___” খালামনী তো চলে গেছে দাদীমা?
রাবেয়া তালুকদার মাহার গালে চুমু রেখে দিয়ে নরম সুরে মাহার গাল ছুঁয়ে দিয়ে বললেন,
___” মিম খালামনীর কথা বলছি না সোনামণী, এটাও তোমার খালামনী হয়।
রাবেয়া তালুকদার হাত দিয়ে ইশারা করে দেখালেন রশ্মি কে, রশ্মি রাবেয়া তালুকদার এর কথায় নিজের মায়ের দিকে তাকালো, রাহিমা সুলতানা রশ্মির তাকানো দেখে ঠোঁটের কোণে হাসি রেখে মাথা ঝাঁকালেন, যার অর্থ তুই ঠিক ভেবেছিস এই ছোট মেয়ে টা আরাতের মেয়ে, রশ্মি মায়ের ইশারা বুঝতে পেয়ে অবিশ্বাস্য চোখে দেখছে মাহা কে, আজ প্রথম দেখছে না, প্রথমবার শপিং মলে দেখেছিলো, তবে আনাস এর কোলে দেখে, ভেবে নিয়ে ছিল হয়তো পিচ্চি টা আনাস আইরার মেয়ে, কিন্তু এই পিচ্চি যে আরাতের মেয়ে ভাবতেই রশ্মির আরাতের সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা টা দ্বিগুন বেড়ে গেলো, রশ্মি একে একে সবার দিকে তাকালো, রাহিমা সুলতানা একে একে, বীরাত এরান কে দেখিয়ে দিয়ে কে কার মেয়ে ছেলে পরিচয় করিয়ে দিলো, আদিবা তালুকদার এর কোলে বীরাত আর রাবেয়া তালুকদার এর কোলে মাহা, আহাদ তালুকদার এর হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে এরান,
রশ্মি কে নিজেদের দিকে তাকাতে দেখে আহাদ তালুকদার আদনান তালুকদার নিজেদের চোখের পানি আড়াল করলেন, কেনো না রশ্মি কে উনারা নিজের মেয়ের মতো দেখেছেন এবং বড় করেছেন, এত বছরে রাহিমা সুলতানা এর নীরবে কান্না করা, মেয়ে ফিরে আসার পথ চেয়ে থাকা, এতকিছু দেখতে দেখতে তাঁদের মনেও রশ্মি ফিরে আসার তীব্র লোভ জন্মিছে, হয়তো মাঝখানে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল, রশ্মি আরাত সবাই তো ভুল করোছিলো, আরাত কে যদি মেনে নিতে পারে, তাহলে রশ্মি কেও উনারা কাছে টেনে নিতে কেনো দিধা ছিলো না, যদিও আহাদ তালুকদার এর মনে নিজের কাজের প্রতি অপরাধ বোধ কাজ করে, কেনো না, যেভাবেই হোক মাহির ছিলো তাঁদের বাড়ির নতুন মেয়ে-জামাই, আর আহাদ তালুকদার সেই সময় রাগের মাথায় দোষগুণ বিচার না করে নতুন মেয়েজামাই কে বাড়ি থেকে ঘার ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিলো, রশ্মির অভিমান টা হয়তো সেসময় বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ঠিক ছিলো, কারণ কেউ চাইবে না, তাঁদের পবিত্র বন্ধনের উপর অন্যকে আঙ্গুল তুলে কথা বলতে দিতে, আর সেই সময় তো মাহির কে ঘার ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিলো,
এটাই ছিলো রশ্মি মাহিরের পবিত্র বন্ধনের জন্য সবচেয়ে অপমান, কারণ মাহির ভুল করেছিল এবং ভুলের জন্য মাফ চেয়েছিল, তারপরও আরাত কে মেনে নিয়ে, রশ্মি মাহির কে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলো, সেদিন আরাতের প্রতি রশ্মির রাগ লেগেছিলো, এতকিছুর জন্য আরাত কে অপরাধী মনে হয়েছিলো, কেনো না আরাত আহাদ তালুকদার এর মেয়ে, আর আহাদ তালুকদার নিজের মেয়ে কে মাহির ধোঁকা দিয়েছে, এই একটা কারণে রাগে মাহির কে ঘার ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিলো, রশ্মির আরাতের প্রতি রাগ করার জন্য একমাত্র কারণ ছিলো এটাই, কিন্তু নিজের পরিবার আর আরাতের থেকে দূরে সরে গিয়ে, এত বছরে সবকিছু ধীরে ধীরে বুঝতে পেয়েছিল, এতে আরাতের কেনো দোষ নেই এবং দিনকে দিন নিজের পরিবার ফ্রেন্ডের প্রতি রাগ অভিমান গুলো ফিকে হয়ে গেছে, আবেগি বয়সটা কেটে গিয়ে ম্যাচিউর হয়ে উঠেছে,
রশ্মি ধীরে ধীরে রাবেয়া তালুকদার এর কাছে এগিয়ে এলো মাহা কে কোলে নেওয়ার জন্য, মাহা কে হাত বাড়িয়ে কোলে নিতেই মাহিনের কোল থেকে হেলিয়ে ছোট তিথি তাঁর আধু আধু গলায় বলে উঠলো,
___” আমার মাম্মা, আমার মাম্মা।
তিথির ডাকে রশ্মি তাঁর মেয়ের দিকে ফিরে তাকালো, মাহা কে রশ্মি নিতে চাইলে তিথি বারবার আমার মাম্মা, আমার মাম্মা বলাতে সবার মুখে হাসি ফুটে উঠলো, রশ্মি হাসি মুখে রাহিমা সুলতানা কে অভিযোগের সুরে বলল,
___” দেখছো আম্মু, তোমার নাতনি কতটা হিংসুটে হয়েছে।
রশ্মির কথায় রাহিমা সুলতানা তিথির কাছে এগিয়ে এলো, এতক্ষণ কেউ তিথি কে সেভাবে খেয়াল করেনি, তিথির কথায় সবার নজরে আসে তিথি, রাহিমা সুলতানা কে তিথির সামনে এসে দাঁড়াতে দেখে মাহির নিজের কোল থেকে মেয়েকে এগিয়ে দিলো, কিন্তু কেনো কথা বলল না, রাহিমা সুলতানা মাহির কে একনজর দেখে নিজেও খুশি মনে তিথি কে কোলে তুলে নিয়ে চুমু রেখে দিতে দিতে আদুরে গলায় বলল ,
___” আমার নাতনি, আমার রশ্মির মেয়ে।
তিথি কে, আদনান আহাদ তালুকদার কে দেখাতে দেখাতে আনন্দমাখা কন্ঠ বলতে লাগলো,
___” দেখেন ভাইজান, আমার রশ্মির মেয়ে, আমার নাতনি, কত বড় হয়েছে, মাশাআল্লাহ কত ফুটফুটে দেখতে, আমার রশ্মির মেয়ে।
বলেই তিনি পুনরায় এলোপাথাড়ি চুমু রেখে দিতে লাগলো, রাহিমা সুলতানার পাগলামি দেখে সবাই হেঁসে উঠলো, রাহিমা সুলতানা নাতনি নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে গেলো, আদিবা তালুকদার হাসি মুখে রশ্মি কে বলল,
___” চল মা, ওই বাড়িতে চল, সবার সঙ্গে দেখা করবি।
আদিবা তালুকদার এর কথায় আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদার সায় জানালো, রশ্মি নিজেও ওই বাড়িতে যাবে, আরাতের সামনাসামনি হবে, এবং পার্থ কিভাবে বাংলাদেশে জানতে চাইবে, রশ্মির জানা মতো পার্থ কে শুধু মাএ আরাত আইরা আরিশা ছাড়া কেউ চেনে না, রশ্মি একনজর মাহিরের দিকে তাকালো, মাহির চোখের ইশারায় নিজেদের সঙ্গে নিয়ে আসা শপিং ব্যাগ গুলো দেখায়, রশ্মি মাহিরের ইশারা বুঝতে পেয়ে সোফার পাশে রাখা নিজেদের সঙ্গে নিয়ে আসা ঈদ শপিং ব্যাগ গুলো হাতে নিয়ে একনজর সবাই কে দেখল, আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদার রশ্মির দিকে চেয়ে আছে, রশ্মি প্রথমে ব্যাগ হাতে নিয়ে আদনান তালুকদার এর সামনে এসে দাঁড়ালো, দুই পাশে নীরবতা, রশ্মি নীরবতা ভেঙ্গে আদনান তালুকদার কে একটা শপিং ব্যাগ এগিয়ে দিয়ে ভীতু কন্ঠে বলে উঠলো,
___” বড় বাবা এটা আপনার জন্য।
রশ্মির দেওয়া শপিং ব্যাগের দিকে তাকিয়ে আদনান তালুকদার অবাক কন্ঠে বলল,
___” গিফট?
রশ্মি একনজর মাহিরের দিকে তাকিয়ে পুনরায় আদনান তালুকদার দিকে চেয়ে হাসি মুখে বলে উঠলো ,
___” হ্যাঁ, আমাদের দুজনের তরফ থেকে সামান্য গিফট, গ্রহণ করলে বুঝবো আপনি আমাদের দুজন কে মন থেকে মেনে নিয়েছেন।
আদনান তালুকদার শব্দ করে হেঁসে উঠে বলল,
___” ব্ল্যাকমেল করছো?
রশ্মি হাসি মুখে বলে উঠলো,
___” হ্যাঁ যদি ব্ল্যাকমেল মনে করেন, তবে এটা ব্ল্যাকমেল ধরে নিন, ছোট বেলায় তো আমাকে আরাত কে…
রশ্মি আনন্দমাখা কন্ঠে আরাতের কথা বলতেই কথা আটকে গেলো, যেন সবার সামনে আরাতের নাম নিতে দ্বিধা হচ্ছে, আদনান তালুকদার রশ্মি কে কথা বলতে বলতে আটকে যেতে দেখে ভরসার হাত রাখলো রশ্মির মাথায়, রশ্মি যেন এবার পুরোপুরি আশ্বাস পেল,পুনরায় আগের ন্যায় বলে উঠলো,
____” না মানে, ছোট বেলায় আপনি কাক্কু মিলে আমাকে আর আরাত কে শপিংমলে নিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন, আমাদের পছন্দ মতো ড্রেস চ্যাুজ করতে এখন তো আমরা বড় হয়ে গেছি, এখন থেকে আমাদের পালা।
___” অবশ্যই অবশ্যই।
আদনান তালুকদার শব্দ করে হেঁসে রশ্মির থেকে ব্যাগটা নিয়ে নিলেন, রশ্মি পুনরায় আহাদ তালুকদার এর সামনে দাঁড়ালো, মুখে খানিকটা আতঙ্ক, কেনো না আদনান তালুকদার খুব শান্ত আর দ্রুত সবকিছু মেনে নিলেও, আহাদ তালুকদার সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের একজন মানুষ, রশ্মি মাথা টা নিচু করে আহাদ তালুকদার এর সামনে ব্যাগটা ধরে গলার স্বর নিচু করে বলল,
___” এটা আপনার জন্য।
রশ্মির কথা বলতে দেরি, আহাদ তালুকদার উত্তর করতে দেরি হলো না, যেন আহাদ তালুকদার এতক্ষণ রশ্মির কথার জন্য অপেক্ষা করছিলো,
___” এগুলোর প্রয়োজন ছিলো না।
রশ্মি মাথা নিচু রেখেই বলল,
___” নিলে খুশি হবো।
আহাদ তালুকদার রশ্মির থেকে চোখ ফিরিয়ে একনজর মাহিরের দিকে তাকালো, সঙ্গে সঙ্গে মাহির মাথা নিচু করে নিলো, আহাদ তালুকদার গলা খাঁকারি দিয়ে রশ্মির হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে রশ্মির মাথায় হাত রেখে বললেন,
___” সুখে থাকো সারাজীবন।
কথাটা বলেই ভদ্রলোক রশ্মির মাথা থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে বীরাত কে কোলে নিয়ে নিজেদের বাড়ির দিকে পা বাড়ালো, রশ্মি এবার খুশিতে মাথা তুলে তাকালো, আহাদ তালুকদার কে যেতে দেখে রশ্মি খুশিতে একে একে রাহিমা সুলতানা, আদিবা তালুকদার, রাবেয়া তালুকদার, কে তাঁদের ব্যাগ দিয়ে দিলো, আদনান তালুকদার রশ্মি দের বাড়ি থেকে চলে গেলেন, রাবেয়া তালুকদার মাহা কে কোল থেকে নামিয়ে রশ্মির দেওয়া শাড়ি দেখতে লাগলেন, রশ্মি মাহার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে এরান কে কাছে ডাকলো, এরান রশ্মির সামনে এসে দাঁড়ালো, রশ্মি দুজনের গালে হাত রেখে আদুরে গলায় বলে উঠলো,
___” আমি তো অনেক বছর পড়ে আসলাম, আমার ছোট ছোট মাম্মা পাপা দের জন্য গিফট আনতে পারিনাই, বাট নেক্সটাইম আমার ছোট ছোট মাম্মা পাপার জন্য অনেক গিফট নিয়ে আসবো প্রমিস ?
মাহা রশ্মির কথায় কিছু একটা ভেবে, আধু আধু গলায় থেকে থেকে বলে উঠলো
___” মাম্মা বলে, কেউ যদি আমাকে গিফট করে, তাহলে তাঁকেও, গিফট করতে হয়, তুমি যদি, আমাকে গিফট করো, তাহলে আমিও, তোমাকে গিফট, করবো।
রশ্মি হাসি মুখে বলে উঠলো,
___” তাই?
মাহা মাথা ঝাকিয়ে ছোট করে বলল,
___” হ্যাঁ।
রশ্মি ভাবুক হয়ে জানতে চাইলো,
___” তো তুমি আমাকে কী গিফট করবে?
মাহা রশ্মির মতো ভাবুক হয়ে কয়েক সেকেন্ড ভেবে মুখে হাসি ফুটে বলে উঠলো,
___” হুম…. চকলেট।
মাহার কথায় রশ্মি তাল জুগিয়ে মাহার গালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে বলল,
___” ওকে মাম্মা।
মাহিরের কোল থেকে এতক্ষণ তিথি ছোট ছোট চোখে সবকিছু দেখছিলো, মাহা কে রশ্মি আদর করতেই মাহিরের কোল থেকে নেমে ছুটে এসে রশ্মির সামনে থেকে মাহা কে ধাক্কা মেরে বলে উঠলো,
___” এটা আমার মাম্মা, আমার মাম্মা।
বলেই তিথি রশ্মি কে জরিয়ে ধরলো, হটাৎ তিথির আতক্রমে কেউ প্রস্তত ছিলো না, মাহা মেঝেতে পড়ে গিয়ে কান্না করতে লাগলো, রাবেয়া তালুকদার দ্রুত এগিয়ে এসে মাহা কে কোলে তুলে নিলো, রশ্মি খানিকটা নিজের মেয়ের কাজে ধমকে উঠলো,
___” তিথি, এসব কেমন অভদ্রতা?
রশ্মি ধমকে কথা বলার মধ্যে দিয়েই হটাৎ এরান রেগে গিয়ে তিথি কে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিয়ে রাগে বলতে লাগলো,
___” আমার মেহেক কে ব্যাথা দিয়েছিস, তোর জন্য আমার মেহেক কান্না করছে, তোকেও আমি ব্যাথা দিবো।
এরান এর কান্ডে সবাই হতভম্ব হয়ে গেলো, আদিবা তালুকদার এরান এর সামনে এসে এরান কে আটকালো, মাহা কান্না বন্ধ করে ছোট ছোট চোখে এরান কে দেখছে, মাহির এসে মেঝে থেকে তিথি কে কোলে তুলে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কান্না বন্ধ করতে বলছে,এরান যেন এখনো রাগে ফুলছে, যেন তিথি কে ধাক্কা নিয়ে তাঁর কিছুই হয়নি, আদিবা তালুকদার এরান কে হাত ধরে টানতে টানতে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
___” তোমার মাম্মি কে তোমার নামে নালিশ দিবো, তুমি দিনে দিনে বেয়াদব হয়ে যাচ্ছ,চলো বাসায় চলো।
আদিবা তালুকদার এরান কে নিয়ে যেতেই, রাবেয়া তালুকদার রশ্মি কে নিজেদের বাড়িতে আসতে বলে সেও মাহা কে নিয়ে চলে গেলো তালুকদার বাড়ির উদ্দেশ্য, রশ্মি বসা থেকে উঠে রাহিমা সুলতানা এর দিকে তাকালেন, রাহিমা সুলতানা বললেন,
___” আমি তোমাদের জন্য রান্না তুলে দেয়, এতক্ষণে আইরা আরাত দের সঙ্গে দেখা করে এসো।
বলেই রাহিমা সুলতানা রান্না ঘরের দিকে পা বাড়ালেন, রশ্মি মাহিরের দিকে তাকাতেই মাহির তিথি কে ঘুম পাড়িয়ে দিতে দিতে চোখের ইশারায় রশ্মি কে যেতে বলল, রশ্মি কিছুক্ষণ সময় নিয়ে ধীর পায়ে চলল তালুকদার বাড়ির উদ্দেশ্য,
আজ বাদে কাল আরাত রা পুরো তালুকদার বাড়ি মিলে গ্রামে যাবে, পরশু ঈদুল ফিতর, ফার্স্ট টাইম ঈদ সবাই মিলে গ্রামে করবে, সবার মধ্যে ঈদের আনন্দ টা এবার দ্বিগুণ কাজ করছে, আরাত নিজের রুমে বসে, গ্রামে যাওয়ার উদ্দেশ্য তাকবীর আর ছেলেমেয়ে এবং নিজের জন্য লাগেজ প্যাক করছে, আজ অনেক দিন পর আরাত নিজের রুমে এসে পুরো আলমারির কাপড় বের করছে, কারণ গ্রামে যাবে, গ্রামের যাওয়ার জন্য পুরো আলমারি খুঁজে, বিয়ের আগের শাড়ি বের করছে, গ্রামে শাড়ি পড়ে গ্রামের বেশে নিজেকে শাড়িতে সাজাবে, একদম গিন্নি দের মতো করে, তাইতো আগের পুরাতন জামাকাপড়ে ভাঁজে খুঁজে চলছে সেই বিয়ের আগের শাড়ি, আলমারি টায় হাত দেওয়া হয় না অনেক বছর হলো, কেনো না যত পুরাতন জামাকাপড় যেগুলো ব্যাবহার না করে, সব গুলো এই আলমারি রাখে, পুরাতন জামাকাপড় জমা হতে হতে পুরো আলমারি ভড়ে গেছে, আরাত পুরো আলমারি ঘেটে বিয়ের আগের শাড়ি খুঁজে পেতেই খুশিতে শাড়িটা বের করতে নিলেই শাড়ির ভাজ থেকে কিছু একটা মেঝেতে পড়ে শব্দ হয়ে উঠলো, আরাত ভ্রু কুঁচকে শাড়ি এক হাতে নিয়ে মেঝের দিকে তাকাতেই, আলমারির পা-র কাছে দেখতে পেলো কিছু একটা সাদা ঝকঝক করছে, আরাত উপুড় হয়ে জিনিস টা হাতে নিতেই কুঁচকানো ভ্রু আরো কুঁচকে গেলো, কাপড়ের ভাজে এই বেসলেট টা কোথায় থেকে এলো, আর এটা কার বেসলেট হতে পারে, আরাত বেসলেট টা উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে খামখেয়ালী মনে পড়ে গেলো আজ থেকে প্রায় আট বছর আগের কথা,
আরাত নিজের খামখেয়ালী মনে আট বছর আগের কথা মনে পড়তেই আরাত কপালে হাত রাখলো, আরিশার বিয়েতে শপিং করতে গিয়ে আরাত জুয়েলারি মলে একটা বেসলেট চোখে আটকে যায়, আর সঙ্গে সঙ্গে তাকবীরের কথা মাথায় আসে, বেসলেট টা তাকবীরের ফর্সা হাতে দারুণ মানাবে ভেবে আরাত সবার আড়ালে লুকিয়ে কিনছিলো, অথচ যাঁর জন্য নিয়েছিলো, তাঁকে তো কখনো দেওয়া হয়ে উঠে নি, উল্টো আরাতের মনে ছিলো না, আজকে এই পুরাতন জামাকাপড় বের না করলে হয় আরো কয়েক বছর এভাবেই অজানা এক কাপড়ের ভাঁজে অযত্নে পড়ে থাকতো বেসলেট টা, আরাত নিজের পাগলামি মনের জন্য আনমনে হেঁসে উঠলো,
___” সেদিন হয়তো মনের অজান্তেই আপনাকে কল্পনা করে এই পাগলামি টা করেছিলাম, আমি সত্যিই আপনার পাগল বউ।
আরাত বেসলেট টা চোখের সামনে ধরে একা একা বিরবির করে মুচকি হাসতে লাগলো, আরাতের হাসির মধ্যে দরজা থেকে একটা পরিচিত কন্ঠ ভেসে এলো,
তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬২
___” আরাত…
আরাত হাসি মুখে দরজার দিকে তাকিয়ে, দরজার সামনে রশ্মি কে দাঁড়াতে দেখে হাসি বন্ধ হয়ে গেলো, মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠলো, বেসলেট পুনরায় শাড়ির ভাঁজে রেখে শাড়ি টা বিছানায় উপর রেখে দিয়ে গম্ভীর মুখে পুনরায় ফিরে তাকালো দরজার দিকে,
