Home তুই আমার বিশ্বাস ছিলি তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩২

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩২

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩২
জান্নাতি আক্তার জারা

সময় টা দশটা এগারোর ঘরে। শেখ বাড়ি রাফি আর আরিশা এত সকাল সকাল শেখ বাড়িতে এসে উপস্থিত। রাফি আইরার সঙ্গে ঘুরতে বের হবে বিধায় শেখ বাড়িতে আসা। আরিশা রাফির সঙ্গে আসার কারণ, বোন কে বুঝিয়ে দেওরের সঙ্গে বাহিরে ঘুরতে পাঠানো। আরিশা আইরার রুমে আর রাফি সোফায় বসে ফোন স্ক্রল করছে। আনহা শেখ কিচেনে রাফির জন্য কফি বানাচ্ছেন। আতিফ শেখ নিজের রুমে। আনহা শেখ এবং আতিফ শেখের মধ্যে মেয়ে কে নিয়ে দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে আছে। আতিফ শেখ নিজের অর্ধাঙ্গিনীর মতামতে এক হতে পারছেন না। আনহা শেখ একপ্রকার জেদী মহিলা। মুখ দিয়ে যা বের করবে ওটা করে ছাড়বে। আনহা শেখের জেদের কারণে আইরার ছোট্ট বেলা থেকে মায়ের সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব। রাফি ফোন স্ক্রল করতে করতে সময় দেখে নিলো। সময় দেখে একবার সদর দরজার দিকে উঁকি দিলো। ঠিক তখনই আনহা শেখ কফি নিয়ে এসে রাফির সামনে রাখতে রাখতে বললেন,

___” তোমার কফি?
___” জ্বি আন্টি ধন্যবাদ ।
রাফি আনহা শেখের হাত থেকে হাসি মুখে কফি টা নিয়ে নিলো। আনহা শেখ রাফি কে পুনরায় বলে উঠলেন,
___” রাফি তুমি হটাৎ এনগেজমেন্ট ক্যান্সেল করে কাবিন করে রাখতে চাইছো কেনো?
___” আন্টি আমি আইরা কে নিয়ে কোনো প্রকার রিস্ক নিতে পারবো না। শুধু কাবিন করে রাখবো দু’বছর পরে অনুষ্ঠান করে ঘরে তুলবো।
___” এটা না হয় বুঝলাম কিন্তু…
___” আন্টি প্লিজ লেট হয়ে যাচ্ছে। আইরা কে ডেকে দিবেন?
___” একটু ওয়েট করো আমি দেখছি?
আনহা শেখ আইরা কে ডাকতে আইরার রুমের দিকে গেলেন। আনহা শেখ কে যেতে দেখে রাফি বুকে হাত রেখে বড় করে নিঃশ্বাস নিলো। পুনরায় মুচকি হেসে কফি খেতে লাগলো। আরিশা আইরা কে অনেক বুঝিয়ে একটা পিংক কালারের থ্রি-পিস পড়িয়ে রেডি করে দিচ্ছে। আইরা চুপচাপ বিরক্ত মুখে বসে আছে। আনহা শেখ আইরার রুমে এসে বললেন,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

___” আরিশা আর কতক্ষণ লাগবে, রাফি
ওয়েট করছে?
___” হ্যাঁ আম্মু হয়ে গেছে, চল আইরা?
আরিশা বোনের ওড়না ঠিকঠাক করে দিচ্ছিল। মা’য়ের ডাকে আইরার হাত ধরে রুমের বাহিরে বের হয়ে এলো। আইরা নীরব চোখে ধীরে ধীরে হেঁটে আনহা শেখের দিকে তাকালো। আনহা শেখ পূর্বথেকেই মেয়ে কে লক্ষ করছিলেন। আইরা পুনরায় আতিফ শেখের রুমের দিকে তাকালো। আতিফ শেখ রুমে অথচ বাহিরে এলো না। আইরার আব্বুর প্রতি অভিমান জমলো। কেউ বুঝতে চায়না আইরার মনের কথা। রাফি হাসি মুখে সোফা থেকে ওঠে আইরার সামনে এসে দাঁড়ালো,

___” চলেন বিয়ান আজকে আপনার সঙ্গে শহর ঘুরবো। জানি না এই সুযোগ কখনো আর মিলবে কী না।
আইরা রাফির কথা অগ্রাহ্য করে কাউকে কিছু না বলে আগে আগে বড়বড় পা ফেলে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো। আইরার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আনহা শেখ রাফি কে বলল,
___” সাবধানে চলাফেরা করবে, আইরার হাসি খুশি ভালো থাকা সবকিছুর দায়িত্ব তোমাকে দিয়ে দিলাম।
___” আপনার মেয়ের ভালোমন্দ সবকিছুর দায়িত্ব নিয়ে নিলাম আন্টি। আপনার মেয়ে কে সুখী করতে আমাকে পুড়তে হলেও ইনশাল্লাহ নির্দ্বিধায় পুড়াবো নিজেকে।
রাফি আইরার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে আনহা শেখের উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলে আইরার পিছু পিছু বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো। আনহা শেখ বড়ো মেয়ে কে কাছে পেয়ে সোফায় বসে গল্পে মসগুল হয়ে উঠলো। এভাবে কেটে গেলো কয়েক মিনিট। মা মেয়ের গল্পের মধ্যে হটাৎ সদর দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো আনাস। কারো পায়ের শব্দে মা মেয়ে সেদিকে তাকালো, আনহা শেখ সোফা থেকে ওঠে আনাস এর সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

___” তুমি এই বাড়িতে কেনো?
___”ফুপি সব ভুলের শাস্তি কখনো না কখনো শেষ হয়ে যায়। আমার শাস্তি কবে শেষ হয়ে যাবে?
আনাস এর কন্ঠে আতিফ শেখ এতক্ষণে রুম থেকে বের হয়ে আসলেন। আরিশা আনহা শেখ অবাক চোখে তাঁকালো।
___”কী যা-তা বলছো আনাস!তোমাকে কে কোন ভুলের শাস্তি দিচ্ছে?
আনাস হটাৎ আনহা শেখের হাত ধরে বলতে শুরু করলো,
___” ফুপি তোমার মেয়ে কে আমার খুব ভালো লাগে। তোমার মেয়ের জন্য আমি আমার ভালোবাসা বুঝতে পেরেছি। ফুপি ইরা যদি আমাকে বকা দেয় আমি মেনে নিবো ও যদি আমার থেকে দূরে যেতে চাই আমি আমার কাছে ভালোবাসা দিয়ে আটকে রাখবো। আই রিয়েলি লাভ ইরা ফুপি, প্লিজ তোমার মেয়ে কে আমায় দিয়ে দেও।
আনহা শেখ আনাস এর হাত থেকে নিজের হাত বের করে বললেন,

___” আর সম্ভব না । আমি রাফি কে কথা দিয়েছি, আইরা মির্জা বাড়ির বউ হবে।
___” তোমার মেয়ে এই বিয়েতে রাজি না ফুপি। তুমি জোর করতে পারো না।
___” তোমাকে কে বলেছে আমার মেয়ে রাজি না! আমার মেয়ে রাজি তুমি শুধু শুধু ঝামেলা করছো আনাস?
___” আমি ইরার মুখে শুনবো, ইরা.. এই ইরা… বাহিরে আয় আমি তোর মুখে শুনে তবেই বিশ্বাস করবো। কই তুই বাহিরে আয় ইরা…
আনাস এলোমেলো পায়ে আইরার রুমের দিকে তাকিয়ে আইরা কে ডাকতে লাগলো। আনহা শেখ কঠিন চোখে কঠোর হয়ে আনাস কে দেখছেন। আরিশা আনাস এর কাছে এসে বললো,
___” ভাইয়া আইরা বাড়িতে নেই। আইরা আর রাফি ঘুরতে বের হয়েছে।
আনাস আইরা রুম থেকে চোখ ফিরিয়ে অবিশ্বাস্য চোখে আরিশার দিকে তাকালো। মুখে হাসি টেনে পুনরায় আরিশা কে বলল,

___” আমার সঙ্গে মজা করছিস! বিয়ে হয়ে গেছে ভেবে নিজেকে একদম বড়ো ভেবে নিয়েছিস। ভুলে যাস না আমি তোর বড়ো ভাই।
কথাটা বলে আনাস পুনরায় আইরা কে ডাকতে লাগলো।
___” ইরা রুম থেকে বের হ বলছি। আমার কথা তোর কানে যাচ্ছে না। আমি যদি রুমে যাই,তোর জন্য ভালো হবে না, বলে দিলাম?
___” ভাইয়া আমি মজা করছি না। কিছুক্ষণ আগে ওরা দুজন বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো।
আনাস এবার আনহা শেখের দিকে চোখ রাখলো। আনহা শেখ আগের ন্যায় কঠিন চোখে আনাস কে দেখছে। আনাস তাচ্ছিল্য হেঁসে বলে উঠলো,

___” ফুপি তুমি বড্ড জেদি। আমার বাবা বড়আব্বু এতটা জেদ করে না যতটা তুমি করো। তুমি তোমার জেদ নিয়ে আছো একবার মেয়ে আর ভাতিজা কে নিয়ে ভাবছো না। তোমার জেদ টা কে প্রাধান্য দিচ্ছো। তুমি হয়তো ভুলে গেছো আমার শরীরে তোমার রক্ত বয়ে চলছে। আমিও আজকে এখান থেকে তোমার মেয়ে কে আমার নামে না করে একপা নড়বো না।
আনাস জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো। আনহা শেখ কথা বললেন না। চুপচাপ নিরবতায় কেটে গেলো প্রায় পনেরো মিনিট। কারো মুখে কথা নেই। কেউ কঠোর তো কেউ জীবন নিয়ে হিসাব নিকাশ মেলানোর ব্যস্ত। তো কেউ মেয়ের আগামী দিন গুলো কল্পনা করছে। আরিশা আনহা শেখের কাছে গিয়ে নরম সুরে বললো,

___” আম্মু প্লিজ নিজের জেদ ছেড়ে দেও। এখানে আমার বোনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। আনাস ভাইয়া নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে আইরা কে ভালোবাসে। এখন তো সবকিছু ভুলে গেয়ে মেনে নেও প্লিজ?
আনহা শেখ এখনো কথা বললেন না চুপচাপ নিজের রুমে চলে গেলেন। আরিশা আনহা শেখ কে বুঝাতে বুঝতে পিছু নিলো। আনাস আনহা শেখের যাওয়ার দিকে হতাশা চোখে তাকালো। আতিফ শেখ এতক্ষণে নিজের জায়গা থেকে নড়লেন। আনহা শেখের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মলিন হেসে আনাস এর কাছে এসে দাঁড়ালো।

___” চলো মসজিদে যাওয়া যাক। আজান পড়বে এখন।
___” ফুপা আমি আইরার সঙ্গে সরাসরি কথা বলবো তবেই এ বাড়ি ছাড়বো।
আনাস এর কথায় আতিফ শেখ মুচকি হাসলেন,
___” আইরা কখন ফিরবে জানি না। চলো নামাজ শেষে আইরার সঙ্গে কথা বলবে। আমি আমার মেয়ের ইচ্ছা তে চলবো। আমার মেয়ে যদি তোমাকে চায় তাহলে আজকেই তোমাদের কাবিন করে রাখবো।
আনাস হটাৎ আতিফ শেখ কে জড়িয়ে ধরলো। আতিফ শেখ আহাম্মক হয়ে গেলেন। আনাস খুশীতে আতিফ শেখ কে জড়িয়ে ধরে হেঁসে বলে উঠলো,
___” ফুপা আমার বিশ্বাস আমার ইরা আমাকে চাইবে। আমাকে আর ফেরাতে পারবে না?

সময় টা ১:২৩ এর ঘরে, আইরা রাফি শেখ বাড়িতে ফিরলো মাএ। রাফি আইরা কে বাড়িতে রেখে আনহা শেখ আর আরিশার থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলো শেখ বাড়ি থেকে। আরিশা শেখ বাড়িতে থেকে গেলো। রাতে আমান শেখ বাড়িতে আসবে। আতিফ শেখ আনাস কে নিয়ে মসজিদে নামাজে। আইরা চুপচাপ নিজের রুমে পা বাড়াতে আনহা শেখ মেয়ে কে পিছু ডাকলেন,

___”আইরা দাঁড়াও?
আইরা মায়ের ডাকে চুপচাপ জায়গায় দাঁড়িয়ে গেলো। আনহা শেখ আইরার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
___” তুমি আজকে রুম থেকে বের হবে না। তোমার রুমে খাবার পাঠিয়ে দিবো।
আইরা মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। আরিশা বোনের হয়ে বলল,
___” আমার বোন রুম থেকে বের হয় না তুমি খুব ভালোভাবে জানো আম্মু! ইভেন তুমি আইরা কে রুম থেকে না বের হওয়ার জন্য বকা পর্যন্ত দিয়েছো।
___” হ্যাঁ আমি জানি আইরা রুম থেকে বের হয় না। আমি আনাস এর সামনে দাঁড়াতে বারণ করছি। তুমি আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলছো কেনো?
___” বিরক্ত হয়ে উঠেছি আম্মু। তোমার জেদের কাছে বিরক্ত হয়ে উঠেছি। চল বোন?
আরিশা আনহা শেখের সঙ্গে তর্ক করে আইরার হাত ধরে রুমে চলে গেলো। আনহা শেখ মেয়ের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছু মুহূর্ত। পুনরায় নিজের রুমে চলে গেলো। আরিশা আইরা কে নিয়ে রুমে এসে আইরা কে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো,

___” তুই আম্মুর কথা বাদ দে। শোন আব্বু তোর চাওয়াতে আটকে আছে। আনাস ভাইয়া তোকে সত্যি সত্যি ভালোবাসে রে। আমার শশুর বাড়ির কথা তোকে ভাবতে হবে না আমি ম্যানেজ করে নিবো। রাফি খুব ভালো ছেলে ও সহজে বুঝবে সবকিছু। রাফি কে নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। তুই আনাস ভাইয়া কে আর ফিরিয়ে দিস না বোন।
___”আপু আমি বেহায়া, আমার মায়া ফুরায় না কেনো?
___” মায়া ফুরানোর জিনিস না বোন, মায়া জীবন টা শেষ করার অস্ত্র।
___” তাহলে আম্মু আমাকে মায়া করে না কেনো?
আরিশা আইরা কে ছেড়ে দিয়ে আইরার মুখের দিকে তাকালো। আইরা নিশ্চুপ ভঙ্গিমায় মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে। আরিশা আইরার মুখটা দু’হাতে মুঠোয় নিয়ে বলল,

___” আম্মু বরাবরই জেদি। আনাস ভাইয়ের কথাটা আম্মুর ইগো তে লেগেছে। এজন্য মানতে চাইছে না। তুই আম্মুর কথা না ভেবে নিজেকে নিয়ে ভাব। আম্মু একদিন না একদিন ঠিক মেনে নেবে কিন্তু..
___” মায়া শেষ হওয়ার অস্ত্র তাইনা! আমি শেষ হয়ে যাবো বলে, আম্মু আমাকে মায়া করে না। কিন্তু আম্মু তো আম্মুর জেদ দিয়ে শেষ করে দিচ্ছে আমাকে।
___” কে বলছে আম্মু তোকে মায়া করে না। আম্মু তোকে ভালোবাসে।
___” ভালোবাসলে আমার প্রতি এতটা কঠোর হতে পারতো না আপু?
___” ভালোবাসে বলেই এতটা কঠোর।
দুবোন চুপচাপ নীরবতা পালন করলো। আরিশা আইরার জন্য খাবার আনতে রুম থেকে বের হয়ে এলো। আইরা বিছানায় বসতে হটাৎ আনাস এর কন্ঠ ভেসে এলো,

___” ইরা রুম থেকে বের হয়ে আয় তোর সঙ্গে আমার কথা আছে?
আনাস এর কন্ঠ কানে পরতে আইরা বিছানা থেকে মেঝেতে নেমে দাঁড়ালো। আরিশা আনাস আর আতিফ শেখ কে ড্রয়িং রুমে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পুনরায় আইরার রুমে এলো। আইরা কে মুখে এক হাত রেখে পুরো রুম-জুড়ে পায়চারি করতে দেখে বলল,
___” আনাস ভাইয়া তোকে ডাকছে। আনাস ভাইয়ার পাশে আব্বু আছে যা কথা বল।
___” আম্মু?
___” আম্মুর কথা ভাবতে হবে না তোকে।
___” ইরা দু সেকেন্ডের ভেতর রুম থেকে বের না হয়ে এলে আমি রুমের ভিতরে চলে আসবো?
___” আরে সাব্বাশ এই না হলো পুরুষ মানুষের কথা।
আতিফ শেখ আনাস এর ঘাড়ে হাত রেখে বলল কথাটা। আনাস হাসি মুখে আতিফ শেখের দিকে তাকাতেই। আইরা রুম থেকে দ্রুত পায়ে বের হয়ে এসে আনাস এর এক হাত ধরে বাড়ির বাহিরে নিয়ে গেলো। আইরার পিছু পিছু আরিশা ড্রয়িং রুমে এসে আতিফ শেখের পাশে দাঁড়িয়ে বাহিরে উঁকি দিতে লাগলো। আইরা বাহিরে এসে আনাস এর হাত ছেড়ে দিয়ে বলল,

___” হিরো সাজতে এসেছেন! বাড়ির ভিতরে এভাবে চিল্লাচ্ছেন কেনো?
___” তুই আমার ডাকে রুম থেকে বের হচ্ছিস না এজন্য?
___” আপনার ডাকে আমাকে বের হতে হবে কেনো?
___” ভালোবাসিস এজন্য।
___”আমি আপনাকে আর ভালোবাসি না।
আনাস আইরা কাছাকাছি এসে আইরার থুঁতনিতে আঙ্গুল দিয়ে হাসি মুখে আইরার নিচু মাথা নিজের মুখোমুখি করে বলল,
___” মিথ্যা বলছিস তুই। তোর চোখ বলছে তুই এখনো আমাকে ভালোবাসিস।
___”এখান থেকে চলে যান আনাস ভাই প্লিজ।
___” চলে যাবো আগে বল ভালোবাসিস আমায়।
আইরা কথা বললো না। মুখ ঘুড়িয়ে অন্যদিকে রাখলো। আনাস আইরা কে উওর করতে না দেখে পুনরায় বলে উঠলো,

___”আমি তোকে অনেক ভালোবাসি ইরা! বিয়ে করবি আমায়?
___” প্রেম ভালোবাসা এগুলো আমার উপন্যাসে মানায় আপনার জীবনে না।
___” আমি আমার জীবন কে মানাতে বাধ্য করেছি শুধু মাএ তোর কারণে!
আইরা আনাস এর দিকে তাকালো। আপনা-আপনি চোখের পানি গাল গড়িয়ে পড়তে লাগলো। আনাস আইরার দুহাত ধরে বলতে লাগলো,

___” আমি এতটাই বা কী ভুল করে ফেলেছি, দেরি করে অনুভূতি বুঝতে পাওয়া টা কী আমার অপরাধ বল। আমার তোর জন্য বুকে ব্যাথা হয় ইরা। আমি খেতে পারছি না ঘুমাতে পারছি না। বাবা আমাকে অফিসে কাজের বাহানা দিয়ে ব্যস্ত রাখে। ফুপির সঙ্গে কথা বলতে চাইলে ফুপি আমার থেকে দূরত্ব বজায় রাখে। তোকে বুঝাতে বুঝতে আমি হয়রান হয়ে যাচ্ছি। আমিও তো মানুষ বল?
দুজনের কথাকথনের মধ্যে হটাৎ বাড়ির ভেতর থেকে আনহা শেখ কে রাগী চেহারায় বের হয়ে আসতে দেখা গেলো। আনহা শেখের পিছনে আতিফ শেখ আর আরিশা এসে দাঁড়ালো। আনহা শেখ এসেই আইরা কে থাপ্পড় দিলেন। সবাই বেশ চমকে উঠলো এতে। আনাস আর আতিফ শেখ নিস্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে আনহা শেখের দিকে। আরিশা বোন কে আগলিয়ে নিয়ে বলল,

___” আম্মু তুমি আমাদের রাগ আইরার উপর কেনো ঝারছো। আমি আর আব্বু আইরা কে আনাস ভাইয়ের সঙ্গে আলেদা কথা বলতে পাঠিয়েছি। তোমার যদি থাপ্পড় দেওয়ারি ছিলো আমাকে দিতে?
___” এখানে কোনো সিনেমা চলছে না। এখানে শেখ বাড়ি তালুকদার বাড়ি দুই বাড়ির মান সন্মান জড়িয়ে আছে। সঙ্গে আমার দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ। রাস্তায় দাঁড়িয়ে বেপরোয়াগিরি করছে মানুষ জন এগুলো নিয়ে দুদিন পড়ে হাসাহাসি করবে তখন কী বলবে?
আনাস এর ফর্সা চোখের পাতাগুলো লাল হয়ে গেলো মুহূর্তেই। মুখে রাগ ফুটে উঠলো, আনহা শেখের কথায় হাত মুষ্টিবদ্ধ করে একনজর আইরার কান্নাভেজা মুখের দিকে তাকালো। সেদিকে তাকিয়ে মুখে ক্ষোভ নিয়ে আনহা শেখের কথায় বলে উঠলো,

___” ফুপি তুমি তোমার সমাজ ইগো জেদ নিয়ে থাকো। আজকের পর থেকে আইরার আশেপাশে আমাকে আর দেখতে পাবে না। তুমি ওর বিয়ে দিবে তাইনা দেও বিয়ে। আমি দূর থেকে আমাকে বিনা তোমার মেয়ের সুখী সংসার দেখতে চাই। সুখে রাখো তোমার মেয়েকে।
আনাস বড়বড় পা ফেলে চলে গেলো। আইরা আনাস এর যাওয়ার পথে চেয়ে থেকে কান্না করতে করতে বাড়ির ভিতরে দৌড়ে চলে গেলো। আতিফ শেখ এতক্ষণে কথা বলে উঠলেন,

___” তুমি আজকে তোমার সীমা অতিক্রম করেছো। এটাও আমার কারণে। প্রথম থেকে যদি আমার মেয়ের বিষয়ে তোমাকে কথা বলতে না দিতাম । তাহলে আজকে আমার মেয়েকে থাপ্পড় দেওয়ার মতো দুঃসাহস হতো না তোমার। আজকে একটা কথা মাথায় গাঁথে রাখো,আমার মেয়ের কোনো প্রকার ক্ষতি যদি হয়ে যায়। তাহলে তোমার আমার সংসার এখানেই সমাপ্ত।
আতিফ শেখ বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন। আরিশা তাচ্ছিল্য সুরে বলে উঠলো,

___” তোমার জেদের কারণে তুমি তোমার নিজের হাতে বড়করা দুজন কে মেরে ফেললে। দুদিন পড়ে যখন বুঝতে পারবে তুমি তোমার জেদ ইগো সমাজের জন্য তিনটি জীবন নষ্ট করছো সেইদিন নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে তো আম্মু?
আনহা শেখ চুপচাপ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। আরিশা বাড়ির ভেতরে চলে গেলো। আইরা রুমে চিৎকার দিয়ে কান্না করতে লাগলো। আজকে আর মানুষের কথার ভয়ে মুখে কাপড় গুঁজে কান্না করতে হলো না। রুমের মেঝেতে বসে কান্না করতে করতে ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলে উঠলো,

___” কেনো আম্মু! কেনো, তুমি কী তোমার মেয়ের চাওয়া গুলো দেখতে পারছো না! আমার আনাস ভাই কে ছাড়া কাউকে চাই না কাউকে না। তোমার জেদের কাছে তোমার মেয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে আম্মুওওও…
ড্রয়িং রুমে আতিফ শেখ মেয়ের চিৎকার দিয়ে কান্না করে বলা কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনলেন।
___”আমি আনাস ভাই কে ছাড়া মরে যাবো আম্মু …..
আনহা শেখ চুপচাপ বাড়ির ভিতরে আসতেই মেয়ের শেষের কথাটা শুনতে পেলো। ব্যস্ত পায়ে আইরার রুমে যেতে নেবে আতিফ শেখ আটকালেন,
___” আমার মেয়ে কে একা ছেড়ে দেও। আমার মেয়ের আশেপাশে যেন তোমাকে না দেখি।
আনহা শেখ থেমে গেলেন অবাক চোখে তাকালেন আতিফ শেখের দিকে। আজকেই প্রথমবার আতিফ শেখ কে এতটা কঠিন এবং রাগী হতে দেখছে আনহা শেখ। আতিফ শেখ ব্যস্ত পায়ে বাড়ির বাহিরে যেতে নিলে আরিশা পিছু ডাকলো,

___” আব্বু আপনি কই যান?
___” তালুকদার বাড়িতে।
আতিফ শেখ ব্যস্ত পায়ে বেড়িয়ে গেলেন। আরিশা আইরার জন্য খাবার প্লেট সাজাতে গেলো। ড্রয়িং রুমে আনহা শেখ সোফাতে ফাঁকা চোখে ফুলদানির দিকে তাকিয়ে থেকে আজকের ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো ভাবতে লাগলো। আনাস বাড়িতে ফিরে কাউকে কিছু না বলে নিজের রুমে এসে দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছে। শুক্রবার বিধায় আহাদ তালুকদার আদনান তালুকদার বাড়িতে ছিলো। আনাস কে সবার সামনে এলোমেলো হাত-পায়ে বড়বড় পা ফেলে নিজের রুমে যেতে দেখে বাড়ির সবাই বেশ অবাক হয়ে তাকালো। আরাত রশ্মি কে সঙ্গে নিয়ে প্রায় এক ঘন্টা আগে বাড়ি থেকে বের হয়েছে। রশ্মি প্রথমে রুম থেকে বের হতে চাইছিলো না। রাহিমা সুলতানার বকাবকিতে রশ্মি আরাতের সঙ্গে বের হতে বাধ্য হয়েছে। আরাত স্কুটিতে রশ্মি কে নিয়ে আগের আড্ডা দেওয়ার জায়গা গুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে । প্রায় কয়েক মাস পড়ে রশ্মিরাত আগের ন্যায় ঘুরতে বের হয়েছে। আরাতের চোখমুখে খুশির আভা রশ্মির মুখে বিষন্নতা। দুজন ঘোরাঘুরির শেষে স্কুটি এসে থামালো একটা পার্কের সামনে। রশ্মি স্কুটি থেকে নেমে আশেপাশে তাকালো আরাত রশ্মির কাছে নিজের ফোনটা দিয়ে স্কুটি পার্ক করতে সাইটে গেলো। রশ্মি আশেপাশে তাকিয়ে দেখার মধ্যে হটাৎ কেউ একজন রশ্মির মাথায় গাট্টা মারলো। রশ্মি ভ্রু কুঁচকে মানুষটাকে দেখতে মাথা টা ঘুরাতেই,
___” হাই অদ্ভুত মেয়ে….

রশ্মি মাথাটা ঘুরাতেই মাহিরের বুকের মধ্যে হার্টবিট গুলো ধিকধিক শব্দ করতে লাগলো। চোখেমুখে মুগ্ধতা মনের মধ্যে কিছু খুঁজে পাওয়ার খুশি। সবমিলিয়ে এক ঘোরের মধ্যে মাহির। মাহির রশ্মি কে মুগ্ধ চোখে পরখ করতে দেখলো। আজকে আর চোখে কাজল নেই। মুখটা কেমন শুকনো শুকনো লাগছে মাহিরের কাছে। রশ্মি পিছু ফিরে একটা শ্যাম বর্ণ ছেলে কে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে কিছুটা পিছুপা হয়ে দাঁড়ালো। আরাত স্কুটি পার্ক করে এসে মাহির কে দেখে হাসি মুখে এগিয়ে এসে বলে উঠলো,
___” আমি ফিরে আসার আগেই দুজনের দেখা হয়ে গেলো?
রশ্মি মাহির দুজনে আরাতের দিকে তাকালো। আরাত দুজনের পরিচয় করিয়ে দিতে আরাত রশ্মির হাতে হাত রেখে বলল,

___” মাহির আপনাকে বলছিলাম না আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের কথা! ও আমার বেস্টফ্রেন্ড রিদিতা জাহান রশ্মি বাট সবাই রশ্মি বলে ডাকে। আপনিও রশ্মি বলে ডাকতে পারেন।
মাহির আরাতের কথায় ছোট করে একটা হাসি উপহার দিলো। আরাত পুনরায় রশ্মি কে বলতে লাগলো,
___” তোকে ফোনে মাহিরের কথা বলছিলাম না! এটাই সেই মাহির। কেমন বলতো আমাদের জুটি টা বেস্ট হবে তাইনা?
আরাত রশ্মির হাত ছেড়ে দিয়ে মাহিরের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে জানতে চাইলো। মাহির রশ্মির দিকে এখনো মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে। রশ্মি চোখ তুলে দুজন কে দেখতে মাহিরের চোখে চোখ পরল। মাহির কে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে চোখ পুনরায় নামিয়ে ছোট করে বলল,

___” হুম সুন্দর।
___” সুন্দর হতেই হবে আফটার অল আমার ভালোবাসা ।
আরাত হাসি মুখে বলল কথাটা। রশ্মি মাহিরের দিকে একনজর তাকিয়ে পুনরায় অন্যদিকে তাকালো। আরাত মাহির কে বলল,
___” কী হয়েছে আপনি কথা বলছেন না কেনো?
___” হুম বলছি তো, চলো টেবিলে বসে কিছু অর্ডার দেওয়া যাক।
___” চল রশ্মি।

আরাত রশ্মির হাত ধরে সামনে এগুলো। মাহির রশ্মিরাতের পেছনে আসতে আসতে রশ্মির দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকে একটা মুচকি হাসি দিয়ে টেবিলের দিকে এগুলো। শুক্রবার জন্য আজকে মানুষের ভীর বেশি বা অনেক দোকান বসেছে। আরাত মাহিরের সঙ্গে দেখা করতে আরাতের ফোনের লোকেশন দিয়েছিল। সঙ্গে বলেছিলো আজকে একজনের সঙ্গে দেখা করাবে। মাহির আরাতের ফোনের লোকেশন অনুযায়ী বাইক নিয়ে পার্কে এসে বাইক টা পার্কের বাহিরে পার্ক করে এসে। ফোনের লোকেশন মতো এসে দেখে একটা কালো থ্রি-পিস পরিহিতা মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে। পেছন থেকে আরাত ভেবে মাহির মাথায় গাট্টা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন মাহিরের দুনিয়া ঘুরে গেলো।

এতক্ষণে তিনজনের জন্য অর্ডার দেওয়া ফুচকা বটভাজা ভুট্টা পোড়া সঙ্গে গরম গরম ভাপা পিঠা চলে এসেছে। ভাজাপোড়া রশ্মিরাতের জন্য ভাপা পিঠা মাহিরের জন্য। আড্ডায় ভাজাপোড়া না থাকলে জমে না। আড্ডা জমানোর আগেই আরাতের ফোনটা শব্দ করে বেজে উঠলো। আরাত ফোনটা হাতে নিতে দেখে রাফির ফোন। আরাত রশ্মি আর মাহির কে একনজর দেখে নিলো। দুজনেই আরাতের দিকে প্রশ্নবোধক চাওনি দিয়ে তাকানো। আরাত চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে দুজনের উদ্দেশ্যেই বলল,
___” বাড়ি থেকে ফোন এসেছে, এক মিনিট আমি কথা বলে আসতেছি।
আরাত দুজনের থেকে কিছুটা দূরে এসে রাফির ফোন রিসিভ করল,
___” হ্যাঁ ভাইয়া আজকের আপডেট কিছু…
আরাত পুরো কথা শেষ করতে পারলো না। তাঁর আগেই ফোনের ওপাশ থেকে রাফি ব্যস্ত গলায় বলে উঠলো,
___” আরাত জলদি হাসপাতালে চলে আসো,
আইরা অসুস্থ।

___” আপু অসুস্থ মানে! আপুর কী হয়েছে?
___”আমি বলতে পারলাম না, হাসপাতালে পৌঁছে জানতে পারবো ফোন কাটলাম।
রাফি ফোন কেটে গেলো। আইরার বেশ রাগ লাগলো রাফির উপর। কোন হাসপাতালে যেতে হবে কিছুই বললো না। আরাত বাড়িতে ফোন লাগাতে লাগাতে তাড়াহুড়োয় স্কুটি দিকে যেতে নিলো। রশ্মির কথা মনে পড়তেই দ্রুত পায়ে মাহির রশ্মির কাছে এসে দাঁড়ালো। দুজনেই আগের ন্যায় আরাতের দিকে চেয়ে আছে। আইরা মাহির কে ব্যস্ত গলায় বলল,

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩১

___” আপনি প্লিজ রশ্মি কে রিকশায় তুলে দিবেন। আমাকে এখনই বের হতে হবে?
___” তুই কোথায় যাচ্ছিস?
রশ্মির কথায় আরাত রশ্মির দিকে তাকিয়ে বলল,
___” আমি হাসপাতালে যাবো। তুই মাহিরের সঙ্গে আড্ডা দে। মাহির প্লিজ রশ্মি কে একটা রিকশা ধরে দিবেন।
আরাত মাহিরের উওরের আশা না করে দ্রুত পায়ে স্কুটির কাছে এসে স্কুটি নিয়ে দুজনের চোখের আড়ালে চলে গেলো। রশ্মি আরাতের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে চেয়ার থেকে উঠতে যাবে। মাহির রশ্মি কে বলে উঠলো,
___” প্লিজ উঠবেন না।

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩৩