Home তুই আমার বিশ্বাস ছিলি তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩১

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩১

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩১
জান্নাতি আক্তার জারা

আরাত মাথায় চুলগুলো হাত খোঁপা করে। পুরো বিছানায় এলোমেলো বইগুলো ব্যস্ত হতে গুছাতে লাগলো। বই গুছানোর মধ্যে মাহিরের ফোন আসায় আরাত মুচকি হেসে ফোনটা হাতে তুলে নিলো। ওড়না মাথায় ঠিকঠাক করে নিয়ে ফোনটা রিসিভ করতে ফোনের স্কিনে মাহিরের বিরক্তিমাখা মুখ ভেসে উঠলো।

___” মুড অফ?
মাহির পড়ার টেবিলে বইয়ের সামনে বসে আরাতের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতে লাগলো। আরাতের কথায় মাহির মুখে “চ জাতীয় শব্দ বের করে বলে উঠলো,
___” পড়াশোনা ভালো লাগছে না।
মাহিরের কথায় আরাত মুচকি হেসে ফোনটা বালিশের সঙ্গে রেখে বই গুলো পুনরায় গুছিয়ে টেবিলে রাখতে রাখতে বলল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

___”পড়াশোনা ভালো লাগছে না বিয়ে করেন।
___” বিয়ে করে বউ কে খাওয়াবো কী?
___” খাওয়া তে হবে না শুধু দু’বেলা ভালোবাসি বলবেন তাহলে পেট ভরে যাবে।
আরাতের দুষ্টুমিতে মাহির মুচকি হাসলো। আরাত বই গুলো গুছিয়ে রেখে ফোনের কাছে এসে দাড়ালো। মাহির আরাতের কথা উওর করে উঠলো,
___” না খেয়ে শুধু ভালোবাসা নিয়ে সারাজীবন থাকতে পারবে অদ্ভুত মেয়ে! আর কিছু চাওয়া পাওয়া থাকবে না?
আরাত সিরিয়াস হয়ে মুখে হাসি টেনে বলল
___” একজন নারীর জীবনে সবচাইতে বড় পাওয়া হলো, একজন বিশ্বস্ত পুরুষ। যে মৃত্যু অব্দি পাশে থাকবে। যে পৃথিবীর নিয়মে বদলাবে না আল্লাহর নিয়মে ভালোবাসবে।

___” আল্লাহর নিয়মে ভালোবাসবে মানে?
মাহিরের ভ্রু কুঁচকে বলা কথায় আরাত ফোনের স্কিনে মাহির কে দেখতে দেখতে পুনরায় বলল,
___” আল্লাহর নিয়মে মানে, হালাল সম্পর্ক হালাল ভালোবাসা,হালাল চাওয়া। শুনেন আমাকে কখনো ধোঁকা দিবেন না। যদি ভালো না লাগে সুন্দর ভাবে বলে দিবেন আপনার মন মতো হওয়ার চেষ্টা করবো।
___” তোমার ভালোবাসার প্রমান দিচ্ছো?
___”উঁহু ভুল ভাবছেন,ভালোবাসার প্রমান দিতে হয় না। প্রমানে কখনো প্রেম হয় না, প্রেম হয় সম্মানে। আর সম্মান মানে সবকিছু হালাল করা।
মাহির কিছু পলক চেয়ে থাকলো ফোনের স্ক্রিনে। পুনরায় সিরিয়াস মুখে বলে উঠলো,

___” এটুকু মেয়ে এত গুছিয়ে কথা বলতে পারো। তোমার সঙ্গে প্রেম না হলে তোমার চঞ্চলতার আড়ালে তুমি টাকে চিনতে পারতাম না, অদ্ভুত তুমি।
মাহিরের কথায় আরাত ফোনটা হাতে নিয়ে বিছানায় বালিশটা বুকের সঙ্গে জরিয়ে নিলো। শুয়ে থেকে মুচকি হেসে পুনরায় বলল,
___” হ্যাঁ আমি অদ্ভুত, কিন্তু একটা কথা সত্য। আমি আপনাকে এতটা ভালোবাসি যে। যদি কখনো আপনার খুশির জন্য আপনাকে ছেড়ে দিতে হয় খুব সহজে ছেড়ে দিবো।
___” ভালোবাসলে কখনো ছেড়ে দিতে পারবে না অদ্ভুত মেয়ে। আমার খুশির জন্য আমাকে ছাড়তে চাইলে কষ্ট পেতে হবে তোমায়।
___” মানুষ ভালোবাসার মানুষটা কে চায়। আর আমি চাই। আমার শখের পুরুষের সুখ হাসি খুশি ভালো থাকা।
মাহির দুষ্টু হেসে বলল,

___” তোমাকে পরিক্ষা করার জন্য হলেও, হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করছে আমার।
___” চেষ্টা করে দেখতে পারেন! আমার ভালোবাসার উপর বিশ্বাস আছে । আমার ভালোবাসা আমাকে ঠকাবে না কখনো।
মাহির ফোনের ওপাশ থেকে মুচকি হাসি উপহার দিলো। দুজনের প্রেমকথনের মধ্যে নিচে থেকে আদিবা তালুকদারের কন্ঠ ভেসে এলো,
___” আরাত রশ্মি এসেছে…..
মায়ের চিৎকার আরাতের কানে পরতে অবিশ্বাস্য হয়ে শুয়া থেকে দাড়িয়ে পরলো। পুনরায় মাহির কে লাইনে রেখে রুম থেকে এলোমেলো ভাবে দৌড়াতে লাগলো। এতে ফোনের ওপাশে মাহির বেশ অবাক হলো। অবাক চোখে ফোনে স্কিনে আরাতের এলোমেলো দৌড়ের দিকে তাকিয়ে বিরবির করলো।

___” এই রশ্মি টা আবার কই থেকে এন্ট্রি হলো। কে এই রশ্মি যার জন্য অদ্ভুত মেয়ে আমাকে কিছু না বলে এভাবে ছুটলো।
আরাত সদর দরজার দিকে তাকিয়ে। চোখে অবিশ্বাস্য চাউনি মুখে হাসি নিয়ে সিড়ি বেয়ে দৌড়ে নামছে। রাবেয়া তালুকদার রশ্মি কে জরিয়ে ধরে কপালে একটা ভালোবাসার পরশ রেখে দিলেন। আরাত রশ্মির দিকে যেতে আরাতের সামনে আলভী দৌড়ে এসে দুহাত শাহরুখ খান স্টাইলে মেলে দাঁড়ালো,

___” মায়াবতী আমি চলে এসেছি?
___” আরে হাট না সামনে থেকে ভন্ড কোথাকার।
আরাত আলভী কে হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে নিজের সামনে থেকে সরিয়ে পুনরায় দৌড়ে রশ্মির কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। রশ্মি কে মলিন মুখে দাড়িয়ে থাকতে দেখে। আরাত এতোদিনের অভিমান ভুলে মুখে চওড়া হাসি টেনে নিজের সঙ্গে জাপ্টে জরিয়ে নিলো। আরাতের ধাক্কায় আলভী পড়ে যেতে নিলে আহিন দুহাত দিয়ে ধরে ফেলে। আলভী মন ভার করে আহিনের দিকে তাকালো। আহিন এতক্ষণ মুখ চেপে হাসি আটকে রেখেছিল। আলভী কে মন ভার করে তাকাতে দেখে শব্দ করে হেঁসে দিলো এবার। আহিনের হাসিতে আলভী আহিনের হাত ঝাড়ি দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। আহিন হাসতে হাসতে আলভী কে ব্যঙ্গ করে বলল,

___” মায়াবতী আমি চলে এসেছি, মনে হচ্ছে তোর মায়াবতী তোর জন্য ছুটে আসছে তাই-না! বলদ কোথাকার।
রাহিমা সুলতানা সোফায় বসে পরলেন। আদিবা তালুকদার পানি এনে রাহিমা সুলতানা কে দিলেন। সবার নজর রশ্মিরাতের উপর। আরাত রশ্মি কে জরিয়ে ধরে বলে উঠলো ,
___” তোকে অনেক মিস করেছি রে রশ্মি। তুই ফিরে এসেছিস আলহামদুলিল্লাহ। আমি এতটা খুশি বলে বুঝাতে পারবো না। তুই আমি কী করবো ভেবে পাচ্ছি না।

মেয়ের পাগলামো দেখে সবাই হেঁসে উঠলো, রাবেয়া তালুকদার হেঁসে বললেন,
___” আরাত রশ্মি কে রুমে নিয়ে যাও, ফ্রেশ হতে দেও তারপর যা ইচ্ছা তাই জিজ্ঞেস করো যাও?
___” হ্যাঁ হ্যাঁ বড়মা, এই রশ্মি চল রুমে চল আগে ফ্রেশ হবি তারপর তোর সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দিবো চল।
___” আমি আমার রুমে যাবো।
আরাত রশ্মি হাত ধরে নিজের রুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে রশ্মির কথায় থেমে গেল। পুনরায় হেসে বলে উঠলো,
___” হ্যাঁ তোর রুমে তো যাবি, আমার রুম আর তোর রুম আলেদা নাকি চল আমার সঙ্গে।
___” আমি আমাদের বাড়ির কথা বলছি।
ড্রয়িং রুমের সবাই বেশ অবাক হলো। রাহিমা সুলতানা হেসে বললেন,
___” আচ্ছা ঠিক আছে চলো আমাদের বাড়িতে যাবো। আরাত তুমিও চলো আমাদের বাড়িতে?
___”আন্টি আমি একটু পড়ে আরছি।
___” ঠিক আছে।

রাহিমা সুলতানা রশ্মি কে নিয়ে নিজের বাড়িতে চলে গেলেন। আদিবা তালুকদার আর রাবেয়া তালুকদার মিলে রশ্মি দের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে লাগলেন। আলভী আহিনের সঙ্গে কানাডার কোথায় কোথায় ঘুরছে, সোফায় বসে দুজন গল্পের মসগুল হয়ে উঠলো। বাড়ির দুই কর্তা নিজেদের রুমে চলে গেলো। আরাত রুমে এসে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো মাহির ফোন কেটে দিয়েছে। পুনরায় মাহির কে ফোন লাগলো, ওপাশ থেকে মাহির ফোন রিসিভ করতে আরাত বলে উঠলো,
___” সরি সরি, আমি আপনাকে কিছু না বলে বাহিরে গেছিলাম। রাগ করেছেন নাকি ?
ফোনের ওপাশ থেকে মাহির মুচকি হাসলো। আরাতের কথায় নিজের সামনে বই বন্ধ করে হেসে বলে উঠলো,
___” ইটস ওকে ম্যাডাম, সরি বলতে হবে না।
দুজনের ফোনের মধ্যে হেসে দিলো, মাহির পর মুহূর্তে আরাত কে রশ্মির কথা জানতে চাইলো,

___” এই রশ্মি টা কে! যার জন্য তুমি এভাবে ছুটলে?
___” আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান। আমার খেলার সঙ্গী আমার ভালো থাকা আমার জান আমার বিশ্বাস রিদিতা জাহান রশ্মি ।
___”তোমার কাজিন?
মাহিরের কথায় আরাত মাথা ঝাকিয়ে বলল,
___” উঁহু বেস্ট ফ্রেন্ড।
আরাতের মুখের রিঅ্যাকশনের দিকে তাকিয়ে মাহির ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো,
___” বেস্ট ফ্রেন্ডের প্রতি এত ভালোবাসা, এতটা বিশ্বাস! আই লাইক ইট।
___” নিজের জীবনের থেকে ওকে বেশি ভালোবাসি।
___” আমার চেয়েও ?
আরাত মুচকি হাসলো,

___”ফ্যামিলি আমার ভালোবাসা, কারণ তাড়া আমাকে আদর যত্ন দিয়ে বড়ো করেছে। বেস্ট ফ্রেন্ড আমার জীবনের সুখ, কারণ ওর সঙ্গে আমার হাসি খুশি সুখ দুঃখ সবকিছু ভাগাভাগি করে বেড়ে ওঠা।
আপনি আমার জীবন, কারণ যে ফ্যামিলি আর বেস্ট ফ্রেন্ড আমাকে বড়ো করেছে হাসতে শিখাছে তাঁদের ছেড়ে আমি আপনাকে নিয়ে বুড়ী হওয়ার স্বপ্ন বুনছি।
মাহির আরাতের কথায় মুগ্ধ হয়ে বলে উঠলো,

___তুমি এক অদ্ভুত মেয়ে, তোমাকে যত দেখছি মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি। তোমার কথায় অদ্ভুত অদ্ভুত টান রয়েছে।
___” আমার কথায় প্রেমে পড়েছেন?
___” মেবি।
___” আমি আপনার কথার মায়ায় পড়েছি।
___” বি কেয়ারফুল, মায়া বড়ই ভয়ংকর।
___” আপনি তো সঙ্গে আছেন। এই মায়া কে নিজের সঙ্গে জরিয়ে নিলাম ক্ষতি কী।
দুজনের হেসে উঠলো, মাহির হেঁসে পুনরায় বললো,
___” আগে তো রশ্মির কথা তোমার মুখে কখনো শুনি নাই?
___” বলবো এক সময়, এখন রশ্মির সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দিবো আল্লাহ হাফেজ।
___” আল্লাহ হাফেজ।
ফোন কেটে গেলো, আরাত তৃপ্তির নিঃশ্বাস নিয়ে মুচকি হাসলো। ফোনটা বিছানায় রেখে দিয়ে হেলেদুলে নিচে নামতে নামতে আওলাজাওলা গান গাইতে লাগলো।

___”পড়েছি ভালোবাসায় আর কে আমাকে পায় আমিও এবার পার্কে বেড়াবো কখনো বা সিনেমায় এ।
আরাত কে গান গাইতে নামতে দেখে আহিন আলভী সোফা থেকে ওঠে দাঁড়ালো। আহিন আরাতের সঙ্গে যেতে যেতে গেয়ে উঠলো,
___” অটোতে বাসেতে সিট পাশাপাশি হবে ফিট,আমাকে সঙ্গে না নিলে হবে যে ব্রেকআপ…
আলভী আরাতের এক হাত ধরে গাইতে গাইতে নিজেদের বাড়ির দিকে এগুলো,
___” আমিও এবার রকিং রোমিও করবো মন যা চায়, ওহো দেখোনা রশ্মি আপুর রুমে যাইতে হচ্ছে লেট,গেয়েছে প্রেমেতে মাথার সিট। গিয়ে বের কর এবার।
তিনজন তিনজনের মুখ চাওয়া-চায়ি করে শব্দ করে হেসে উঠলো, পুনরায় তিনজন একি সুরে গাইতে গাইতে রশ্মির রুমে দিকে যেতে লাগলো,

___” না রে না এই ভন্ডরা আর ভালো হবে না। এখন করবি কী উপায়…..
তিনজন রশ্মির রুমে এসে দাঁড়াতে রশ্মি কে আগের পোষাকে বিছানার উপর হাঁটু জড়িয়ে বসে থাকতে দেখলো। আরাত আহিন আলভী কে চোখের ইশারায় বাহিরে যেতে বলল। দুজন বাহিরে যেতে নারাজ। আরাত রাগী চোখে পুনরায় বের হতে বলতে দুজন ঠোঁট উল্টে রুম থেকে বের হয়ে গেলো, আরাত ধীরপায়ে রশ্মির কাছে এসে রশ্মির পাশে বসে হাতে হাত রাখলো,
___” কী হয়েছে রে রশ্মি, তোকে এমন লাগছে কেনো! তোর তো বাংলাদেশে ফেরার কথা ছিলো না!
রশ্মি কে আগের ন্যায় নিস্তব্ধ হয়ে থাকতে দেখে আরাত পুনরায় বলে উঠলো,
___” কী রে কথা বলবি না! আমার ফোন রিসিভ করিস না। আঙ্কেলের ফোন দিয়ে ফোন দিলে কথা বলিস না। তোর কী হয়েছে সবকিছু খুলে বলবি প্লিজ এমন করছিস কেনো?

___” প্লিজ আরাত আমাকে একা থাকতে দে।
___” কানাডায় একা একা তো ছিলিস, এখন আর একা থাকা লাগবেনা। তোর এসব আর ভালো লাগছে না বাল?
___” তোর সমস্যা কী আরাত, আমি বলছি তো আমাকে একা থাকতে দে। তারপরও কেনো বিরক্ত করছিস আমাকে?
রশ্মির বিরক্তিমাখা কন্ঠে আরাত তাজ্জব বনে তাকিয়ে রইলো । পুনরায় রশ্মির গালে হাত রেখে বলে উঠলো,
___” এমন করছিস কেনো, আমাকে তোর বিরক্ত লাগছে?
___” হ্যাঁ হ্যাঁ বিরক্ত লাগছে। আমি তোকে বলেছি আমার কাছে এসে বসতে। আমি তোকে বলেছি আমার কী হয়েছে জিজ্ঞেস করতে। না বলে নি, তারপরও কেনো ডিস্টার্ব করছিস। আমার রুম থেকে চলে যা প্লিজ আর আমাকে একা থাকতে দে।
রশ্মি আরাতের হাত ঝাড়া মাড়াতে আরাত অবাক চোখে মলিন মুখে তাকালো রশ্মির দিকে। আরাত রশ্মির কথা গুলো নিতে পারলো না। কয়েকমাস আগেও যে রশ্মি আরাতের থেকে দূরে থাকতে হবে ভেবে কান্না করেছিলো। সেই রশ্মির মুখে আরাত কে নিয়ে বিরক্তি। আরাত রশ্মির বিরক্তিতে মলিন মুখে রশ্মি কে একা ছেড়ে দিয়ে অভিমান করে বিছানা থেকে নামলো। রুম থেকে বের হওয়ার আগে অভিমানী গলায় পুনরায় বলল আরাত,

___” আজকে রাতটা সময় দিলাম, একা থাক। সকাল থেকে তোর নিস্তার নেই তোকে সবকিছু বলতে হবে। আগের মতো হাসিখুশি হতে হবে। ভাবছিলাম তোর সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না। শুধু ফোনে যোগাযোগ থেকে যাবে। বছরের পর বছর পার হয়ে যাওয়ার পর কিছুদিনের জন্য হয়তো তোর মুখ দেখতে হবে। এভাবেই বুড়ী হয়ে যাবো আমরা। আমাদের দূরত্ব বুঝি সেদিনই সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমি ভুল। তুই আবার ফিরলি আমার জীবনে। হ্যাঁ এতটুকু বুঝতে পেরেছি এতকিছুর পিছনে ওই পার্থর বাচ্চা রয়েছে। এখন ওই পার্থ মার্থ কে সাইটে রেখে দে বুঝলি। আমার অনেক কথা জমে গেছে সেগুলো তোকে শুনতে হবে। সকালে দেখা হবে গুড নাইট।

আনাস নিজের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ফোন লাগালো তাকবীরের কাছে। তাকবীর আনাস এর ফোন কেটে দিলো।তাকবীর কে ফোনে না পেয়ে কিছুক্ষণ নিজের রুমে পায়চারি করলো। প্রায় বারো মিনিট পর তাকবীর কে ফোন ব্যাক করতে দেখে আনাস এর মুখে হাসি ফুটে উঠলো, ফোনটা রিসিভ করে উৎফুল্লতার সহিত বলে উঠলো,
___” ভাইয়া কংগ্রাচুলেশন তালুকদার বাড়ির ছেলে থেকে হবু জামাই হওয়ার জন্য।
___” আজকে মনে হয় ছ্যাঁকা টা বেশি খেয়েছিস, যা লেবুর পানি খেয়ে ঘুমিয়ে পর।
তাকবীর মিটিং রুমে ছিলো বিধায় আনাস এর ফোন কেটে দিয়েছিলো। মিটিং রুম থেকে বের হয়ে ব্লুটুথ অন করে গাড়ির কাছে আসতে আসতে আনাস কে ফোন লাগালো। আনাস ফোন রিসিভ করে কথাটা বলতে তাকবীরের ভ্রু কুঁচকে এলো। তাকবীর ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর গলায় গাড়ির মধ্যে বসে গাড়ি স্টার্ট করে আনাস কে উত্তর দিলো। তাকবীরের কথায় আনাস পুনরায় জানতে চাইলো,

___” লেবুর পানি খাবো কেনো ?
___” মাতাল দের মতো কথা বলছিস এজন্য।
___” ভাইয়া শুধু আমি না, কথাটা শুনলে তুমিও মাতাল হয়ে যাবে। শেষে দুই ভাই কাঁদে হাত রেখে গান গাইবো, ওরে মাতাল হয়ে যাবো আমি মাতাল হয়ে যাবো।
___” এটা পাগল হবে ইডিয়েট।
___” ও সরি রং নাম্বারে ডায়াল হয়ে গেলো, ওরে পাগল হয়ে যাবো আমরা পাগল হয়ে যাবো।
তাকবীর বিরক্তি হয়ে বলে উঠলো,
___” বাজে বকা বন্ধ কর ইডিয়েট, কিছু বলার থাকলে বল নয়তো ফোন কাট।
___” ভাইয়া বাবা বড়আব্বু বুড়ীর বিয়ে তে রাজি হয়েছে।
কথাটা কানে পৌঁছাতে চলন্ত গাড়ি ব্রেক কষলো। তাকবীরের হাত সঙ্গে সঙ্গে বুকে চলে গেলো। মাথা ঝুকে চোখ বন্ধ করে বুকে হাত দিয়ে রইলো। কথাটা যেন বুকে গিয়ে লাগছে। আনাস গাড়ির ব্রেক কষানোর শব্দ হাসি মুখটা বন্ধ হয়ে গেলো।

___” ভাইয়া তুমি ঠিক আছো! কিছু হয়েছে, হটাৎ কিসের শব্দ শুনা গেলো?
তাকবীরের কথা শুনা গেলো না। শুধু ধীকে ধীকে নিঃশ্বাসের শব্দ শুনা যাচ্ছে। আনাস কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করে মুচকি হেসে পুনরায় বলে উঠলো,
___” তোমার আর বুড়ীর কথা বলছি ভাইয়া।
নিমেষেই বন্ধ চোখ খুলে গেলো। মনটা অস্থির হয়ে উঠলো। ব্যস্ত হতে শরীরে ব্ল্যাক কোর্ট টেনে খুলে বিপরীত সিটে ছুড়ে ফেললো। গলা উপর দিকে রেখে গলার টাই হাত দিয়ে ঢিলা করলো। গম্ভীর গলায় ছোট করে বলল,

___” তোর বোন কী চায়?
আনাস নিশ্চুপ কথা বলতে পারলো না। হতাশারা যেন পুনরায় ঘিরে ধরলো। তাকবীর ঠোঁটের কোনে এক টুকরা হাসি এনে সামনে ফাঁকা রাস্তায় দিকে চেয়ে রইলো। আনাস নীরবতা ভেঙ্গে বলে উঠলো,
___” বুড়ী তো ছোট্ট ভাইয়া, ও বুঝে না সবকিছু। পরিবার রাজি তাহলে বুড়ীর মতামতে কী আসে।
___” তোর বোন বয়সে ছোট, বাট ভন্ডামিতে সবার বস।
আনাস মুচকি হাসি দিলো তাকবীরের কথায়,পুনরায় দুজন কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করলো ফোনের দুইপাশে।
___” বিয়ের ব্যবস্থা কর আসছি আমি।
___” কবে আসবে?
___” এক সপ্তাহ।
___” আর কত দূরত্ব ভাইয়া?
তাকবীর ফোনের ওপাড়ে মুচকি হাসলো,

___” থাকুক কিছু দূরত্ব,অপেক্ষা হোক হালালের জন্য! তবুও সে আসুক আমার জীবনে হালাল সুখ নিয়ে।
তাকবীরের ফোন কেটে গেলো। আনাস মুচকি হেসে বাবা-মা রুমে গেলো কথাটা জানাতে। তাকবীর ফোন কেটে দিয়ে ফোন হাতে নিলো। গ্যালারি থেকে আরাতের পিক বের করে। পিকের সঙ্গে কথা বলতে লাগলো,
___” ভেবেছিলাম জোর করবো না। তোমাকে তোমার মতো ছেড়ে দিবো। বাট তোমার বেপরোয়া তোমাকে ক্ষতি করছে। তুমি যেটাকে ভালোবাসা ভাবছো এটা তোমার মোহ আবেগ। যেটা চিরস্থায়ী না। ভেবোনা তোমার মোহ কে মেরে ফেলছি আমি। তুমি যার পিছনে ছুটছো সে দুদিন পর নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবে। অপেক্ষা করলাম জানলাম নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করলাম। অতএব তোমাকে নিজের করে চাইলাম। বেশি না আর কয়েক টা দিন অপেক্ষা করো। তোমাকে আমি হালাল ভাবে নিজের ঘরে তুলবো। আমি আমার সবর কে ইবাদত বানিয়ে রাখবো এতদিন।

ভোরের আলো ছড়িয়ে পরার সঙ্গে সঙ্গে আরাত ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বের হয়ে এলো। শুক্রবার কলেজ নেই আজকে রশ্মির সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দিবে। সকালের ব্রেকফাস্ট করতে বসেছে। আনাস নিজের রুম থেকে নিচে নেমে সদর দরজা দিয়ে বের হতে যাবে। রাবেয়া তালুকদার পিছু ডাকলেন আনাস কে,
___” আনাস কই যাও বাবা?
___” বড়মা শেখ বাড়িতে, ফুপির সঙ্গে দেখা করতে।
আনাস এর কথায় আরাত স্বাভাবিক ভাবে ভাইয়ের দিকে তাকালো। আনাস যেন শেখ বাড়িতে যাবে এটা আরাতের জানা। আরাত দুষ্টু হেসে বলল,

___”ভাইয়া, বড় ভাই হিসাবে আইরা আপুকে একটু বুঝিয়ে এসো। বলবে রাফি ভাইয়ার সঙ্গে দারুণ মানাবে।
আনাস প্রথমে বিরক্তি চোখে তাকালো বোনের দিকে, পুনরায় কিছু মনে পরতে বাঁকা হেসে বলে উঠলো,
___” যেখানে বুঝানোর সেখানে বুঝিয়ে বলছি বুড়ী, তুই রেডি হ।
কথাটা বলে আনাস বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো। আরাত আনাস এর কথায় অর্থ বুঝতে না পেয়ে অবাক চোখে রাবেয়া তালুকদারের দিকে তাকালো। রাবেয়া তালুকদার মুচকি হেসে আরাতের দিকে এগিয়ে এলেন। আরাত চেয়ার থেকে উঠে পরলো। রাবেয়া তালুকদার কিছুক্ষণ আরাতের মুখের দিকে চেয়ে থেকে মাথায় হাত রাখলেন,

___” রশ্মিদের বাড়িতে যাচ্ছো?
___” হ্যাঁ বড়মা।
___” সাবধানে চলাফেরা করবে। একদম লাফালাফি করবে না, পড়ে গিয়ে ব্যাথা পাবে।
রাবেয়া তালুকদারের কথায় আরাত মাথা ঝাকিয়ে অবাক চোখে তালুকদার বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো, রশ্মি দের বাড়িতে এসে প্রথমে কিচেন রুমের দিকে চলল আরাত। রাহিমা সুলতানা সকালের রান্না বসিয়ে দিয়েছেন।
___” আন্টি এতটা লেট কেনো?
রাহিমা সুলতানা মাথা উঠিয়ে আরাত কে দেখতে পেয়ে হাসি মুখে বলে উঠলেন,
___” ও আরাত তুমি। আর বলো না, বাড়িতে কিছু ছিলো না। এজন্য একটু বাজারে গিয়েছিলাম।
___” রশ্মি কই আন্টি?
___” রুমে।
___” ঠিক আছে আন্টি।
আরাত রশ্মির রুমের উদ্দেশ্য পা বাড়াতে রাহিমা সুলতানা আরাত কে বললেন,

___” আরাত শুনো?
___” হ্যাঁ আন্টি?
___” রশ্মি তো তোমার সঙ্গে সবকিছু শেয়ার করে। রশ্মির সঙ্গে কথা বলো কী হয়েছে জানতে চাও দেখো কিছু বলে কী না?
___” হ্যাঁ আন্টি আমি দেখতেছি, ওর নীরবতা ভাঙতে হবে। আমি বিরক্তিকর তাই না দাঁড়া আরছি।
আরাত একা একা বিরবির করতে করতে রশ্মির দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। দরজায় দাঁড়িয়ে মাথাটা রুমের ভিতরে উঁকি দিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে লাগলো। রশ্মি বিছানায় হাঁটু জড়িয়ে বসা। কানে হেডফোন, বন্ধ চোখ। আরাত চুপিচুপি পা ফেলে রুমের ভিতরে গিয়ে রশ্মির কান থেকে একটা হেডফোন নিজের কানে গুঁজলো,

“___কাটিয়েছি সাথে তোর
কিছু দিন বড়ো জোর
ভুলে গেছি রাত ভোর.. কখন কী হয়
চাওয়া দের শেষ নেই
বলে ভালোবাসবোই
যেখানেই থাকি যতো ফুরুক সময়
চাইলে চলে যা যদি না থাকে উপায়।
সুতোর বাঁধা জীবন ছেড়ে দৌড়বি কোথায় পার্থ
সুতোর বাঁধা জীবন ছেড়ে দৌড়বি কোথায়…
আরাত দুষ্টু হেসে শেষের লাইন বলতে, রশ্মি রাগ করে আরাতের কান থেকে হেডফোন খুলে নিয়ে নিলো।

___” এই হেডফোন নিয়ে নিলি কেনো! গানটা ছ্যাকা খাওয়ার সময় তো দারুণ লাগছে?
___” সকাল বেলা চলে এসেছিস! কী চাই এখানে?
___” আমার বান্ধবী কে লো।
আরাত রশ্মি কে দুহাত দিয়ে জরিয়ে ধরে বলল,রশ্মি বিরক্তি মুখে তাকালো আরাতের দিকে,
___” সবকিছু খুলে বল না রশ্মি, তোর কী হয়েছে। পার্থ কী তোর সঙ্গে চিট করছে! যদি করে থাকে তাহলে ভুলে যা ওকে।

___” যদি ওকে শুধু ভালোবাসতাম তাহলে ভুলে যাইতাম। কিন্তু ও আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
আরাত চেয়ে আছে রশ্মির দিকে। রশ্মি এতক্ষণে কিছু বললো। আরাত পুনরায় রশ্মির দিকে চেয়ে বলল,
___” পার্থর সঙ্গে তোর লাস্ট কবে দেখা হয়েছিলো?
___” যার সঙ্গে সারাজীবন কাটানোর জন্য নিজের দেশ,নিজের বাড়ি, নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড কে রেখে ওই দেশে পারি জমাই ছিলাম। তার সঙ্গে কতবার দেখা হয়েছে জানতে চাস তিনবার, হ্যাঁ তিনবার। তার ওই মায়াবী মুখটার পিছনে বেইমানি ছিলো রে।

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩০

___” ওকে ওকে শান্ত হ, আমরা এগুলো নিয়ে পড়ে কথা বলতে পারবো। চল আজকে তোকে নিয়ে ঘুরতে বের হবো।
___” আমি কোথাও যাবো না আরাত।
___” তোকে যেতেই হবে, কান্নাকাটি বাদ দিয়ে খাবার খেয়ে নে। দুপুরে ঘুরতে বের হবো।

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩২