তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪১ (২)
জান্নাতি আক্তার জারা
তাকবীর আরাত গ্রামের উদ্দেশ্য বের হয়েছে, যদিও মিম দের বাড়িতে পৌঁছাতে দুই থেকে তিন ঘন্টা লেগে যাবে, তাকবীরের কাছে নতুন পথ, আরাতের কাছে ছোট্ট বেলায় চিরচেনা রাস্তা, নানুমনী বেঁচে থাকতে এই রাস্তা দিয়ে কতশত গ্রারামে ঘুরতে গেয়েছে, নানুমনী গত হয়েছে প্রায় বছর দশক হবে, তারপর থেকে আর আগের মতো যাওয়া হয় না, এই না যে রুপালী বেগম তাঁদের যাওয়া দেখতে পাড়ে না, রুপোলী বেগম মাঝেমধ্যেই ফোন করে আরাত দের যেতে বলে, আরাত যায় না, নানুমনী গত হওয়ার পর থেকে আর নানুবাড়ি তে মন বসে না, আর আনাস তো পড়াশোনা শেষ করে সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের অফিসের দায়িত্ব নিয়ে নেওয়ার পর থেকে কোনোদিকে বের হয় না প্রয়োজন ব্যতীত, তাকবীর একবারও আরাতের নানুবাড়ি যায়নি, যেখানে নিজের নানুবাড়ি শহরে হওয়ায় হাতেগোনা দুই থেকে তিন বার গেয়েছিল, যেখানে আরাতের নানুবাড়ি তো ধোয়াছোঁয়ার বাহিরে, আরাত প্রায় বছর দুয়েক পর নানুবাড়ি তে যাচ্ছে, তাও আবার নিজের সঙ্গে তাঁর হাসবেন্ড কে নিয়ে, ছোট্ট বেলা নানুমনীর সঙ্গে গ্রামে বের হইলে আশেপাশে অনেকেই মজা করে বলতো,
” কিরে সতিন, ভালো আছিস, উওরে আরাত শুধু বোকার মতো চেয়ে থাকতো, নানুমনী কে দেখতো মিটিমিটি হাসতে,আরাত কিছু বলতো না অবুঝের মতো চেয়ে থাকতো,পেরেকক্ষনে ভদ্রমহিলা তাঁর স্বামী কে ডেকে বলতেন, কী গো দেখে যাও আদিবার মাইয়া আইছে,তোমার ছোট বউ, ভদ্রমহিলার ডাকে এক ভদ্রলোক হাসি মুখে বের হয়ে বলতো,ওমা বউ আসছে দেখি, কিরে আমারে বিয়ে করবি, আমারে বিয়ে করলে তোকে কোনো কাম করা লাগতো না, উত্তরে আরাত ভ্যা ভ্যা করে কান্না করে দিতো, আরাতের কান্না দেখে নানুমনী তাঁদের ধমক দিয়ে বলতো, চুপ কর তোর মতো বুড়োর লগে মোর নাতনীর বিয়ে দিমু না, মোর নাতনীর জন্য রুপকথার রাজকুমার মতো মেলা সুন্দর পোলার লগে বিয়ে দিমু, নানুর উত্তরে আরাতের মুখে হাসি ফুটে উঠতো, পুরাতন স্মৃতিগুলো ভাবতে ভাবতে আরাত শব্দ করে হেঁসে উঠলো, হটাৎই চলন্ত গাড়িতে নীরবতা ভেঙ্গে আরাত কে হাসতে দেখে, তাকবীর খানিকটা ভেবাচেকা খেয়ে গাড়ির ব্রেক কষে, আরাত খানিকটা সামনে ঝুঁকে পরতেই তাকবীর দ্রুত আগলিয়ে নেয় আরাত কে, আরাত নিজের ভাবনা থেকে বের হয়ে বেশ অবাক হলো,পরমুহূর্তে নিজের বোকামি বুঝতে পেয়ে তাকবীরের দিকে অসহায় ফেস করে ছোট করে বলল, সরি, তাকবীর আরাতের দিকে চেয়ে ছিলো, আরাতের মুখের চাহনিতে সামনের দিকে তাকিয়ে এক টুকরো মিষ্টি হাসি উপহার দিলো , পরমুহুর্তে কী যেন ভেবে নিজের কোলের মধ্যে আরাত কে ইশারায় মাথা রাখতে বলল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
___” এখানে মাথা রেখে ঘুমাও!
আরাত প্রথমে নাকচ করলো,তাকবীর স্বাভাবিক ভাবে আরাতের দিকে তাকিয়ে রইলো, তাকবীর কে নিজের দিকে তাকাতে দেখে আরাত কাচুমাচু করতে করতে তাকবীরের কোলে মাথা রাখলো, আর নিজের সিটে পা গুটুগুটু করে শুয়ে পরলো, তাকবীর এখন চোখ নিজের কোলের দিকে রাখতেই বিন্দাস আরাতের মুখটা দেখতে পারবে, তাকবীর পুনরায় গাড়ি স্টার্ট দিলো,গাড়ি চলছে আপন গতিতে তাকবীর একবার আরাতের মুখের দিকে তাকাচ্ছে তো আরেকবার ফোনে গ্রামের রাস্তার লোকেশন দেখছে, বিশ্বরোড থেকে গ্রামের ফাঁকা চিকন রাস্তা দিয়ে চলছে গাড়ি, এই রাস্তায় গাড়ি নেই বললেই চলে,মাঝেমধ্যে দু’একটা অটোরিকশা দেখা যাচ্ছে , আরাত তাকবীরের কোলে মাথা রেখে স্বস্তি পাচ্ছে না, কেমন যেনো অস্বস্তিগুলো এসে ভর করছে, তাকবীর যখন আরাতের দিকে তাকাচ্ছে আরাত সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করছে, কিছুক্ষণ পর চোখ খুলছে পুনরায় তাকবীর তাকাচ্ছে, তো আরাত চোখ বন্ধ করছে, আরাতের বাচ্চামিতে তাকবীর গম্ভীর মুখে মুচকি হাসি উপহার দিচ্ছে বারংবার,
আরাত এবার চোখ বন্ধ রেখে পুনরায় ডুব দিলো অতীতে, এখন কেমন যেন বুকটা হাহাকার করে উঠলো, নেই তাঁর নানুমনী, গ্রামে মজা করা নানা-নানি এখন বেঁচে আছে কি-না জানা নেই, হয়তো কেউ কেউ এখনো দুনিয়াতে রাজত্ব করেছে, আর কেউ হয়তো দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে, নিজেরা বড় হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে, সে সব দিনগুলো এখন সোনালী অতীত হয়ে গেছে, আরাত নিজের ভাবনায় হাহাকার করে উঠলো, যদিও কয়েকদিনের মানসিক চাপ নিজের মধ্যে তিতে করে তুলেছিলো, আজকে মায়ের মুখে নানুবাড়ির কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে মনটা আনন্দে খেলতে শুরু করে দিলো, তাই তো কেনো ভাবনা ছাড়া হটাৎই তাকবীর কে রাজি করিয়ে চলছে সেই চিরচেনা পথে, কিন্তু তাঁর রাজকুমারের মত মেলা সুন্দর রাজা যাচ্ছে, কিন্তু তাঁর সেই চেনা মুখ গুলোই নেই আর, আরাত নিজের ভাবনায় এতটা মগ্ন ছিলো, চোখ দিয়ে দুফোঁটা পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে সেদিকে তাঁর কোনো ধ্যান নেই, তাকবীর নিজের হাঁটুর উপরে গরম পানির ছোঁয়া পড়তেই পুনরায় গাড়ি ব্রেক কষে, আরাতের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে আরাতের গাল ভেজা,
___” এই পাগল কান্না করছো কেনো, তোমার কী শুয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে, আচ্ছা ঠিক আছে সরি,তুমি তোমার মতো বসো বা ঘুমিয়ে পড়ো!
তাকবীরের ব্যাকুলতায় আরাত চোখ মেলে তাকালো, কান্নাভেজা কন্ঠ ছোট্ট ছোট্ট করে বলল,
___” নানুমনীর কথা খুব মনে পড়ছে!
কথাটা বলতে বলতে আরো দুফোঁটা পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পরলো, তাকবীর কিছুক্ষণ আরাতের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো,একহাত আরাতের গালে পানি মুছে দিতে দিতে আদুরে গলায় গাড়ি চালাতে চালাতে বলল,
___” দুনিয়াতে কেউ চিরস্থায়ী না, দুনিয়া মাএ আমাদের পরীক্ষার হল, যেখানে আমরা পরীক্ষা দিতে এসেছি, যেমন তুমি বুঝতে পাড়লে পরীক্ষার অ্যানসার ভুল লেখেছো, সঙ্গে সঙ্গে উত্তরটা কেটে প্রথম থেকে লেখতে পারবে, পুনরায় ভুল হবে পুনরায় কেটে ফেলবে, যখন টাইম ওভার হয়ে যাবে, তুমি তারাহুরো করে লেখতে থাকবে,তাড়াহুড়ো করে লেখতে গিয়ে তোমার অনেক ভুল হয়ে যাবে, তুমি বাড়িতে এসে প্রশ্ন উত্তরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে, তুমি তো অনেক ভুল লেখেছো, তখন তুমি শুধু আফসোস করতে থাকবে যদি আরেকটা বার চান্স পাইতাম, সবকিছু সঠিক লেখতাম,কিন্তু আফসোস সে সুযোগ আর আসবে না।
আরাত তাকবীরের মুখের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইলো, কিছু কথা বুঝলেও সব কথা বুঝতে পারলো না, তাকবীর আরাতের মনোভাব বুঝতে পেয়ে মুচকি হেঁসে পুনরায় বলতে লাগলো,
___” পৃথিবীটা আমাদের পরিক্ষার হলের মতো, তুমি আমি শত ভুল করার পড়েও মোনাজাতে মহান রব্বুল আলামীনের নিকট মাফ চেয়ে দেখো, রব তোমাকে আমাকে হাসতে হাসতে মাফ করে দিবে, পুনরায় তুমি আমি ভুল করবো,সেই ভুলের জন্য তওবা পড়লে, রব আমাদের পুনরায় হাসতে হাসতে মাফ করে দিবে, যতদিন ভুল করে মাফ চাইতে থাকবো আমাদের রব হাসতে হাসতে মাফ করে দিবে, কিন্তু তুমি আমি এই বয়সে জেনে-বুঝে ভুল করছি, বয়স যখন শেষের কোটায় ঠেকবে তুমি তোমার আমল ঠিক রাখতে পারবে না মেবি, তুমি দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে ইহকালের জন্য চলে যাবে,তখন তোমার ভুল গুলো বুঝতে পারলেও ফিরতে পারবেনা সবকিছু ঠিক করতে, যেমন করে আমরা পরীক্ষার হলে পরীক্ষা শেষে ফিরতে পারিনা,
আরাত তাকবীরের মুখের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে, কত সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলো সবকিছু, আরাত কে তাকিয়ে থাকতে দেখে তাকবীর মুচকি হেঁসে পুনরায় বলল,
___”পরীক্ষা হলে যেমন আমাদের সঙ্গীরা থেকে যায়, পরীক্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অচেনা সঙ্গী পুনরায় অচেনা হয়ে যায়, আর দেখা হয় না তাঁদের সঙ্গে, ঠিক তেমনই আমাদের আপনজন রা, পরীক্ষা হলের সঙ্গীর মতো এই দুনিয়াতে, একবার দুনিয়া থেকে চলে গেলে আর দেখা হবে না তাঁদের সঙ্গে। হয়তো পরীক্ষা হলের সঙ্গীদের মতো হটাৎ রাস্তায় কয়েক সেকেন্ডের মতো সামনাসামনি দেখা হয়ে গেলো, মুখের দেখা দেখেই পুনরায় অচেনা হয়ে যাবে,তখন মনে শুধু একটা কথায় বাজবে, একদিন এই মেয়ে এই ছেলেটার সঙ্গে এক রুমে বসে পরিক্ষা দিয়েছিলাম, ঠিক সেভাবে হয়তো আমাদের রব আমাদের আপনজন দের সঙ্গে দেখা করিয়ে বুঝিয়ে দিবেন, দুনিয়া তে এই তোমার মা বাবা আত্মীয়-স্বজন ছিলো, কিন্তু সেদিন শুধু পরিক্ষা হলের সঙ্গীর মতো দেখেই যাবো, কেউ কারো জন্য কিছু করতে পারবো না, যে যার যার পাপ কে মুক্ত করতে আল্লাহর কাছে মাফ চাইতে লাগবো, যেমন করে দুনিয়াতে অচেনা সঙ্গীরা নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়।
তাকবীর কথাগুলো বলতে বলতে, নিজের চোখের কোঠায় পানি অনুভব করলো, বা হাতের বৃদ্ধঙ্গুলি
দিয়ে নিজের চোখের পানি টুকু মুছে নিয়ে আশেপাশে দেখতে লাগলো, সামনে একটা ছোট বাজার দেখা যাচ্ছে, বাজারটা পেরিয়ে গেলেই মিম দের বাড়ি,যদিও দশ-বারোটার মতো দোকান নিয়ে বাজারটা, তবুও এত গভীর রাতে চারটা দোকান খুলা দেখা যাচ্ছে, তাকবীর বাজারটায় গাড়ি ব্রেক করলো, আরাতের দিকে তাকাতেই দেখলো, আরাত চুপিসারে তাকবীরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, তাকবীর ভেবেছিল আরাত কথাগুলো শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ছে, কিন্তু না তাকবীর কে ভুল প্রমাণ করে আরাত তাকবীরের দিকে চেয়ে আছে, তাকবীর আরাতের চাহনি দেখে মুচকি হেঁসে মুখ নিচু করে আরাতের কাঁপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো, আরাত নিমেষেই চোখ দু’টো বন্ধ করে নিলো, তাকবীর আরাতের মুখের কাছে মুখ রেখেই ভয়েস স্লো করে বলল,
___”তোমার সাথে সবার তুলনা হয় না, তুমি হাজার না লাখে না পুরো পৃথিবীতে একজন আমার কাছে, আমার রব কে এতএত শুকরিয়া তোমার মতো হুর কে আমার অর্ধাঙ্গিনীর রুপে এই দুনিয়াতে পাঠিয়ে দিয়েছে।
সম্ভবত পুরুষের ঘুম জড়ানো কন্ঠস্বর নেশাকেও হার মানায়, কিন্তু তাকবীরের গম্ভীর গলার স্লো ভয়েস আরাত কে মাতলামো করে তুলতে বাধ্য করছে, লাজলজ্জা ভুলে গিয়ে নেশা নেশা চোখে তাকবীরের দিকে তাকিয়ে আছে আরাত, তাকবীর আরাতের চাহনিতে বেসামাল হয়ে উঠলো, হুট করে আরাতের ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে বিরবির করে বলে উঠলো,
___”আমি আমার সবটা দিয়ে তোমাকে ভালোবাসবো বিনিময়ে তুমি শুধু পাশে থেকো?
আরাত একি সুরে বলে উঠলো,
___”আপনি আগলিয়ে রাখলে আমি থাকতে বাধ্য!
হটাৎই কোনো বাচ্চার খিলখিলিয়ে হাসির শব্দে দুজনের ধ্যান ভেঙ্গে গেল, তাকবীর দ্রুত সোজা হয়ে গেলো ,আরাত তাকবীরের কোল থেকে মাথা উঠিয়ে নিজের সিটে ঠিকঠাক হয়ে বসতে বসতে লজ্জাতে মাথা নিচু করে হাত কঁচলাতে লাগলো, তাকবীর এত রাতে বাচ্চার হাসির শব্দ খুঁজতে গাড়ির কাঁচ নামিয়ে বাহিরে তাকালো,একটা ছোট বাচ্চা টং দোকানের সামনে একটা চেয়ারে দাঁড়িয়ে তাঁদের দিকে তাকিয়ে হেঁসে যাচ্ছে, মূলত তাকবীর গাড়ির ভিতরে লাইট জ্বালিয়ে রেখেছিল যেন আরাতের মুখটা স্পষ্ট দেখতে পারে, এতে রাতের অন্ধকারে বাহিরে থেকে গাড়ির ভিতরে স্পষ্ট সবকিছু পরিস্কার দেখা যাচ্ছে, তাকবীর একনজর আরাত কে দেখলো, আরাত মাথা নিচু করে আছে, তাকবীর পুনরায় বাচ্চাটাকে দেখে গাড়ি থেকে নামতে নামতে আরাতের উদ্দেশ্য বলল,
___ ওয়েট আ মিনিট!
তাকবীর গাড়ি থেকে নেমে গেলো, আরাত চুপচাপ তাকবীরের যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলো, তাকবীর গাড়ি থেকে নেমে প্রথমে বাচ্চাটার কাছে দাঁড়ালো, এক হাত কোমরে রেখে আরেক হাত কুঁচকানো কপালে ঘষতে লাগলো, পুনরায় সামনে তাকাতেই দেখতে পেলো, এক ভদ্রলোক দোকান বন্ধ করছে, আর তাঁর অর্ধাঙ্গিনী ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে সেদিকে ধরে আছে, তাকবীর যা বুঝার বুজে গেলো এই বাচ্চাটা তাঁদের হবে, এবং ভদ্রলোকরা দোকান বন্ধ করছেন বাড়িতে ফিরার জন্য, তাকবীর বাচ্চা কে পাশ কাটিয়ে সামনে আরেকটা দোকানে গেলো, বাচ্চাটা চেয়ার থেকে নেমে আরাতের সামনে এসে গাড়ির সঙ্গে হেলিয়ে দুষ্টু হেঁসে ভ্রুরু নাচাতে নাচাতে গেয়ে উঠলো,
~~ওও ধোয়াতে কুয়াশা ভরা রাস্তার
মাঝখানে…
“কোনো যে দাঁড়িয়ে প্রেম হাতরাস,
কে জানে…?
___” হোয়াট ননসেন্স?
তাকবীরের ধমকে বাচ্চাটা চমকে উঠলো, আরাত বাচ্চা টাকে দেখেই বুঝে ফেলবো, বাচ্চাটা চঞ্চল এবং দুষ্টু প্রকৃতিকে, তাকবীরের ধমকে বাচ্চাটা এতক্ষণে গাড়ি থেকে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়িয়ে পড়েছে, তাকবীর দোকান থেকে কিনা আনা সদায়ের প্যাকেট আরাতের দিকে এগিয়ে দিলো,পুনরায় তেমন কিছু না ভেবে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিলো,আরাত চোখ বড়বড় করে তাকবীরের দিকে তাকিয়ে আছে, যে তাকবীর নিজের ছোট ভাই আহিনের সঙ্গে ঠিকমতো কথা পর্যন্ত বলে না, সেই তাকবীর রাস্তায় একটা অচেনা বাচ্চাকে কোলে তুলে নিয়ে সামনে দোকানের দিকে যাচ্ছে, এতক্ষণে বাচ্চার বাবা-মা দোকান বন্ধ করে মেয়েকে নিতে পিছনে ঘুরে চমকে উঠলেন,এত রাতে তাদের মেয়ে একটা অচেনা ছেলের কোলে তাঁদের দিকে আসছে,বাচ্চা মেয়েটার হাত ভরে সদয়ের প্যাকেট, তাকবীর গাড়ির কাছে এসে আগের চেয়ারের উপরে বাচ্চা টাকে নামিয়ে দিয়ে গাড়ির মধ্যে বসতে ধরলো,বাচ্চা মেয়েটার মা কিছু না বুঝে তাঁর মেয়েকে জরিয়ে নিয়ে অবুঝের মতো দেখতে লাগলো সবকিছু, বাচ্চা মেয়েটা তাঁর মায়ের কাছে থেকে তাকবীর কে ডেকে উঠলো ,
___” ভালো আঙ্কেল?
তাকবীর গাড়িতে বসে বাচ্চা মেয়েটার দিকে তাকালো বাচ্চা মেয়েটা তাকবীর কে তাকাতে দেখে মুখে মিষ্টি হাসি টেনে বলল,
___” তোমার বউ অনেক সুন্দর, আমার মতো।
তাকবীর আরাতের দিকে তাকালো,আরাত এতক্ষণ বাচ্চা তো তাকবীর কে দেখছিলো, বাচ্চা মেয়েটার কথা শোনে আরাত হেঁসে উঠলো, তাকবীর কে গাড়ি স্টার্ট করতে দেখে আরাত হাত বাড়িয়ে মেয়েটা কে বিদায় জানাতে জানাতে বলল,
___” থ্যাঙ্ক ইউ কিউটি।
বাচ্চাটা মায়ের কোল থেকে হাত নাড়িয়ে হাসি মুখে বিদায় জানালো, বাচ্চাটার মা-বাবা কিছুই বুঝলো না এখানে হলোটা কী, তাকবীর গাড়ি চালাতে চালাতে আরাতের দিকে তাকিয়ে, আরাত কে চুপচাপ পিছনে তাকিয়ে থাকতে দেখে এক হাতে প্যাকেট থেকে কেক বের করে মুখ দিয়ে কাগজ ছিড়ে আরাতের সামনে ধরল,
___” খেয়ে নেও।
আরাত সামনে তাকিয়ে নিজের সামনে কেক দেখতে পেয়ে কথা বাড়ালো না, চুপিচুপি তাকবীরের হাত থেকেই মুখে পুড়ে নিলো,তাকবীর সামনে থেকে চোখ ফিরিয়ে আরাতের দিকে একনজর তাকিয়ে পুনরায় গাড়ি ড্রাইভ করতে মনোযোগী হয়ে গেলো, কয়েক মিনিট পড়ে গাড়ি টা এসে দাঁড়ালো, একটা বড় উঠানের সামনে, উঠানে লাইট জ্বলছে তবুও চারপাশ কুয়াশার জন্য অন্ধকার হয়ে আছে, রাত প্রায় দুটোর কাছাকাছি, তবুও মিম মিমের বাবা এবং রুপোলী বেগম বীর রাতের অপেক্ষা করছে, কখন নতুন জামাই বাড়িতে প্রবেশ করবে তাঁর প্রহর গুনছে, গাড়ির শব্দে মিমের বাবা এবং মি উঠানে দৌড়ে বের হয়ে এলো, আরাত এতক্ষণে গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে, চারপাশ অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না তবুও চারপাশে চোখ বুলালো, কতটা আপন এই উঠান, সময়ের ব্যবধানে জায়গা গুলোই পা ফেলা হয় না বহু বছর, তাকবীর গাড়ি থেকে নেমে পিছনে সিট থেকে, কিছু ফলের ঝুঁকি বের করছে, তা দেখে মিমের বাবা এগিয়ে এসে হাসি মুখে তাকবীরের হাত থেকে নিয়ে নিলো, মিম এসে আরাত কে জরিয়ে ধরে বাড়ির ভিতরে হাঁটতে লাগলো, তাকবীর সবার পিছনে হাঁটতে হাঁটতে বাড়িটাই চোখ বুলালো,
এক তলা বিল্ডিং, বাড়ির বাহিরটা ঠিক মতো চোখে না পড়লেও বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতেই বুঝতে পারলো বাড়িটা পূর্বের, দেয়ালে কিছু কিছু অংশে রং ধসে গেছে, কিন্তু আসবাবপত্রে লেগে আছে নতুন ধাস, আরাত মিম সোফাতে বসে গল্পে মগ্ন, তাকবীর আশেপাশে দেখতে দেখতে আরাতের কাছে এসে দাঁড়াতেই রুপালী বেগম হাতে করে কফি নিয়ে এলো, তাকবীর কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রুপোলী বেগম সোফাতে বসতে বললেন, তাকবীর রুপালী বেগম কে গম্ভীর গলায় সালাম দিয়ে সোফাতে বসলো, মিমের বাবা এসে টুকিটাকি কুশল বিনিময় করলেন, পুনরায় রাতের খাবার খাওয়ার কথা বললে তাকবীর কিছু বলার আগেই আরাত রুপোলী বেগম কে বলল,
___” হ্যাঁ মামি খাবার দেন, আমার প্রচুর খিদা পেয়েছে।
তাকবীর আরাতের কথা শুনে আর কথা বাড়ালো না, চুপচাপ ডাইনিং টেবিলে সবাই মিলে রাতের খাবার শেষ করল, মিম, আরাত আর তাকবীর কে থাকার রুম দেখিয়ে দিয়ে গেলো, তাকবীর বিছানায় বসে হাতের ঘড়ি খুলছে, আরাত রুমটা চারপাশ দেখছিলো, কতদিন পড়ে রুমটাতে থাকবে, আগে মায়ের সঙ্গে ঘুড়তে আসলে তো এই রুমটায় বরাবর থেকেছে, ওই তো এখনো দেওয়ালে নেলপালিশ দিয়ে স্পেশাল পেন্ডিং করা চিহ্ন রয়েই গেছে, ছোট্ট বেলা দুষ্টুমি করে দেওয়ালে নেলপালিশ দিয়ে ইংরেজিতে নিজের নামের প্রথম অক্ষর A লেখেছিলো,এখনো রয়েই গেছে স্মৃতিগুলো, তাকবীর বিছানায় বসে পা থেকে কেস খুলতে খুলতে আরাত কে ছোট করে বলল,
___”ম্যাম আপনার অতীতের ভ্রমণ শেষ হয়ে থাকলে বলবেন,আপনাকে নিয়ে চান্দের দেশে ঘুরতে যাবো!
আরাত নিজের ভাবনা থেকে বের হয়ে তাকবীরের দিকে তাকালো, তাকবীর কী ব্যঙ্গ করে বলল কথাটা বুঝলাম না আরাত, না বুঝে তাকবীর কে বলে উঠলো
___” আপনি ঘুমিয়ে যান
তাকবীর দুষ্টু হেঁসে বলল,
___” কাছে আসো, বিয়ে করার পর বউ কে ছাড়া চোখে ঘুম ধরা দেয় না।
___”বিয়ের আগে কিভাবে ঘুমাইছেন?
তাকবীর হুট করে বসা থেকে দাঁড়িয়ে আরাত কে টেনে নিজের সঙ্গে জরিয়ে ধরে বলল,
___” বউয়ের কথা ভাবতে ভাবতে কোলবালিশ কে জরিয়ে ধরে ঘুম এসেছি।
তাকবীরের নির্বিকার উত্তরে আরাত ভেবাচেকা খেয়ে গেলো, পুনরায় তাকবীরের বুক থেকে নিজেকে ছুটাতে কাচুমাচু করতে করতে নিচু স্বরে বলে উঠলো,
___” ছাড়ুন, ঘুমাবো আমি!
___” হ্যাঁ আমিও ঘুমাবো চলো।
তাকবীর আরাত কে ছেড়ে দিলো, আরাত মাথা নিচু করে ঘুমাতে বিছানায় যায়, গভীর রাত বাড়ি নীরব, আরাতের চোখে ঘুম লেগে গেছে, তাকবীর আরাতের পাশে শুয়ে আরাত কে দেখছে, এভাবেই কেটে গেলো কিছু মুহূর্ত কিন্তু তাকবীরের চোখে ঘুম ধরা দিলো না,অজানা কারণে নতুন রুম নতুন পরিবেশে মনটা ছটফট করছে, আরাতের থেকে চোখ ফিরিয়ে পুরো রুমে চোখ বুলালো, ডিম লাইটে রুমের সবকিছু পরিস্কার দেখা যাচ্ছে, তাকবীর পুনরায় আরাত কে দেখতে দেখতে আরাতের মুখের উপরে কয়েক টা এলোমেলো চুল হাত দিয়ে পেঁচাতে লাগলো , এতে ঘুমের মধ্যেই আরাতের মুখে বিরক্ত ফুটে উঠেছে, আরাত কে বিরক্ত হতে দেখে তাকবীর মুচকি হেঁসে আরাত কে লুটেপুটে দেখতে লাগলো, আরাত ঘুমের মধ্যে নড়াচড়া করে পিছনে ঘুরে ঘুমালো,এতে আরাত কে দেখায় তাকবীরের ব্যাঘাত ঘটলো, তাকবীর বিরক্ত হয়ে বিছানা থেকে নেমে বিছানার বিপরীত পাশে এসে আরাতের মুখোমুখি হয়ে পুনরায় বিছানায় শুয়ে পরলো, আরাত ঘুমের মধ্যে নিজের অতি কাছে কাউকে অনুভব করে নিভু নিভু চোখ মেলে তাকালো, দু সেকেন্ড তাকবীরের দিকে তাকিয়ে থেকে ঘুমজরানো কন্ঠে বলল,
___” আপনার মাথায় কী চলছে?
তাকবীর আরাতের কপাল ছুয়ে দিতে দিতে বলল,
___”আমার মাথায় যা চলছে, তোমার উপর এপ্লাই করলে ঘুমাতে পারবে না।
আরাত কথা না বলে মন ভার করে সোজা হতে হতে চোখ বন্ধ করল, তাকবীর আর কিছু বলল না, এভাবেই শেষ রাতের দিকে তাকবীরের চোখে ঘুম ধরা দিলো, ফজরের আজান আর তাকবীরের কানে পরলো না, না নামাজ পড়া হলো, আরাতের ঘুম ভাঙ্গে সকাল সাড়ে আটটার দিকে, নিজের পুরো শরীর বন্দী বন্দী অনুভব হতেই চোখ মেলে তাকালো, চোখের সামনে সাদা ধপধপা লোমহীন বুক দেখতে পেয়ে আরাতের কপাল কুঁচকে এলো, নড়াচড়া করতে নিয়ে দম আটকে এলো, আরাতের ছটফটানি তে তাকবীরের ঘুম চোখ থেকে পালিয়ে গেলো, আর সঙ্গে সঙ্গে আরাত কে ছেড়ে দিয়ে শুয়া থেকে বসে পরলো বিছানায়, আরাত কে কখন যে এতটা কাছে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে ঘুমিয়েছে বুঝতে পারলো না তাকবীর, আরাত এতক্ষণে যেন নিজের জান ফিরে পেলো, তাকবীর একনজর আরাত কে দেখে নিয়ে কিছু না বলে বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমে চলে গেলো, আরাত তাকবীর কে ওয়াশরুমে যেতে দেখে দ্রুত পায়ে বিছানা থেকে নেমে মিমের রুমে চলে গেলো ফ্রেশ হতে,
আরাত ফ্রেশ হয়ে কফি নিয়ে রুমে ঢুকতেই দেখলো তাকবীর নেই, আরাত কফি হাতে নিয়ে ওয়াশরুমে খুঁজলো না তাকবীর রুমেই নেই, তাকবীর ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বের হয়ে বাড়ির উঠানে এসেছে, পুরো বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখছিলো, বাড়িটা একতালা হলেও অনেক বড় বাড়ি, কয়েকটা রুমে তো জমি চাষ করার যন্ত্রপাতি দেখা গেলো, তাকবীর উঠানের বা সাইটে বড় একটা পুকুর দেখতে পেলো, যদিও এখনো কুয়াশা পড়ছে, তবুও আকাশে মিটিমিটি রোদের ঝিলিক দেখা যাচ্ছে, তাকবীর উঠানের ডান পাশে দেখলো বড় একটা রক্তজবা ফুলের গাছ, অনেক ফুল ফুটে আছে, তাকবীর দু এক পা করে সেদিকে এগুলো, চারপাশ গ্রামের পরিবেশ গাছগাছালি দেখতে লাগলো, শহরের পরিবেশ আর গ্রামের পরিবেশ টোটালি ভিন্ন, বিজনেস এর সূত্রে এদেশ ওদেশ ঘুড়িয়ে বেড়ানো তাকবীর গ্রামের চারপাশ এনজয় করতে লাগলো, পরিবেশ টা মন্দ না মন ভালো করে দেওয়া জন্য গ্রামের প্রকৃতি যথেষ্ট। আরাত পুরো বাড়ি তাকবীর কে খুঁজে না পেয়ে তাকবীর কে খুঁজতে খুঁজতে বাড়ির বাহিরে এলো, তাকবীর কে জবা ফুলের গাছের সামনে গম্ভীর মুখে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরাত সেদিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
___”ও আপনি এখানে, আমি আপনাকে পুরো
বাড়ি খুঁজলাম, এই নিন আপনার কফি…
আরাত তাকবীরের দিকে কফি বাড়িয়ে দিয়ে বকবক করতে লাগলো, কিন্তু তাকবীর সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে ফুলের গাছ থেকে জবা ফুল ছিড়ে আরাতের কানে গুঁজে দিলো, আরাত কথা বলতে বলতে তাকবীরের কান্ডে কথা বন্ধ হয়ে গেলো, তাকবীর আরাত কে দেখতে দেখতে ছোট করে বলল,
তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪১
___” পারফেক্ট।
আরাত অবাক হয়ে কানে হাত দিয়ে ফুলটা ছুঁয়ে দিলো, তাকবীর আরাতের হাত থেকে কফি নিয়ে এক হাত পকেটে গুঁজে আরাত কে দেখতে দেখতে কফিতে চুমুক বসালো, আরাত মুখে মুচকি হাসি টেনে বলল,
___” ফুলটা সুন্দর তাইনা?
তাকবীর কফিতে চুমুক দিয়ে বলল,
___ ফুল যতই সুন্দর হোক না কেনো, আমি তো আমার ব্যক্তিগত ফুলের মধ্যেই আটকে যাই বারংবার
