Home তুই আমার বিশ্বাস ছিলি তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫২

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫২

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫২
জান্নাতি আক্তার জারা

টকটকে লাল সুতির শাড়িতে মিম কে দেখে আরশ স্তব্ধ হয়ে জায়গায় দাঁড়িয়ে গেলো, মিম কে একদম নতুন বউ বউ লাগছে, আরশের চাহনি দেখে মিম রাগী গলায় বলল,
___” একদম তাকাবেন না, বদ নজর লেগে যাবে।
মিমের কথায় আরশ কয়েক সেকেন্ড নীরব চোখে মিম কে ভ্রু কুঁচকে দেখলো, পরমুহূর্তে মিমের পা থেকে মাথা অবধি চোখ বুলিয়ে বাঁকা হেঁসে চোখ টিপ দিয়ে দু-এক পা করে আগাতে আগাতে বলল,
___” বদ নজর না হালাল নজর, পুরো অধিকার আছে তোমাকে দেখার এন্ড ক্যাচ করার জান…!
আরশ কে অদ্ভুত নজরে নিজের দিকে দু-এক পা করে আগাতে দেখে মিম কিছুটা ঘাবড়ে গেলো, আরশ কে নিজের ভিতর কার ঘাবড়ানো বুঝতে না দিয়ে পিছিয়ে যেতে যেতে তেজি কন্ঠে বলল

___”আপনি বেশি বাড়াবাড়ি করছেন!
মিমের কথায় আরশ পুনরায় বাঁকা হেঁসে মিমের পুরো শরীর চোখ বুলাতে বুলাতে বলল,
___” এখনো তো কিছু শুরুই করি নি জান..?
মিম পিছু পা হতে হতে আলমারির সঙ্গে ধাক্কা খেলো, মাথা ঘুরিয়ে পিছনে আলমারি দেখে নিয়ে সামনে তাকাতেই দেখলো আরশ মিমের খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আলমারির সঙ্গে এক হাত রেখে মিমের সামনে অদ্ভুত নজরে চেয়ে আছে, মিম মুখ অন্ধকার করে বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

___” আপনি এমন করতে পারেন না।
আরশ নিজের আরেকটা হাত মিমের গালে রাখলো, মিম দুহাত দিয়ে শাড়ির আঁচল চেপে ধরে আছে, মিম এবার পুরোপুরি আরশের দু’হাতে বন্দী, সামনে আরশ পিছনে আলমারি, মিমের পালানোর কোনো পথ নেই, আরশ মিমের কথায় মিমের পুরোমুখ আঙ্গুল দিয়ে কপাল গাল আলতু ভাবে ছুঁয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল,
___” কেনো করতে পারবো না বউ তুমি আমার, তোমার উপর সবকিছু করার অধিকার আছে আমার?
মিম আরশের মুখে অধিকার আর বউ শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে গেলো, আরশ কে নিজের এত কাছে সহ্য হলো না, তিরতির মেজাজে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলল,
___” আপনি আমাকে ফাঁসিয়ে বিয়ে করছেন, আমি আপনাকে স্বামী হিসাবে মানি না সরেন সামনে থেকে।
আরশ আগের ন্যায় বাঁকা হেঁসে ফিসফিস করে বলল,
___” ওকে মানিয়ে নেওয়ার ব্যবস্তা করে নেই চলো?
কথাটা বলে আরশ বিছানার দিকে তাকালো, আরশ কে বিছানার দিকে তাকাতে দেখে মিম ঘেন্না ভরা চোখে আরশ কে দাঁত চেপে বলল,

___”আমার তো মনে হয় আপনার চরিত্র ঠিক নেই ছিহ হ নোংরা মস্তিষ্কের ছেলে, ঘেন্না লাগছে আপনাকে আমার ঘেন্না!
মিমের কথায় আরশের এবার মুখে রাগের রেশ ভেসে উঠলো, হুট করে মিমের কোমর দু’হাতে চেপে ধরে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে রাগী গলায় বলল,
___” কী বললে তুমি, আমার চরিত্র ঠিক না, ওকে চরিত্র ঠিক না হলে কী হয় এবার আমি তোমাকে দেখাবো।
কথাটা বলে আরশ মুখ মিমের ঠোঁটের দিকে আগালো, আরশের এমন কান্ড মিম রাগের মাথায় আরশের বুকে শরীরে সর্বশক্তি দিয়ে ধাক্কা মেরে আরশের গালে কোষে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো, আরশ কয়েক পা পিছনে গিয়ে গালে হাত রেখে এক হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিয়ে মিম কে রাগী চোখে দেখছে, মিম আরশ কে ধাক্কা দিয়ে আঙ্গুল তুলে কাঁপা কাঁপা গলায় হিসহিসিয়ে বলল,

___” আমি এমন মেয়ে না যে আপনি ভয় দেখাবেন আর আমি ভয় পেয়ে যাবো, আপনি আমার সঙ্গে যেমন আমিও আপনার সঙ্গে তেমন,লজ্জা করে না বিয়ে করার কয়েক মিনিট পড়ে বউ কে ডিভোর্স দেওয়ার কথা বলতে,লজ্জা করে না বিয়ে করে বউ কে রাস্তায় ফেলে যেতে, এখন বউ অধিকার ফলাতে এসেছেন কোন লজ্জায়, এত অপেক্ষা কিসের ডিভোর্স দিচ্ছেন না কেনো আমাকে, আর কি করার বাকি আছে, আমাকে সবার সামনে ভাঙতে চেয়েছিলেন আমি ভেঙ্গে গেছি, কারো সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলতে পারি না, আমাকে কলঙ্ক করতে চেয়েছেন আজ আমি কলঙ্কিত, আর কী চান আপনি হ্যাঁ, আমার দেহ, যেটার জন্য বউয়ের অধিকার ফলাতে এসেছেন, নিন আমি বাঁধা দিবো না আপনি আপনার চাহিদা পূরণ করেন, আর আমাকে এই জাহান্নাম থেকে মুক্ত করেন প্লিজ, আমি আর কলঙ্কের ভার সহ্য করতে পারছি না প্লিজ।
মিমের শেষের কথাগুলো তে আরশ নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারলো না, মিমের দিকে তেড়ে গিয়ে মিমের হাত মুচড়ে ধরল, নিজের বুকের সঙ্গে মিমের পিঠ চেপে ধরে, আরশ মিমের হাত মুচড়ে ধরায় মিম মুখ থেকে ব্যথায় আহহ জাতীয় শব্দ বের করে ব্যাথা হজম করতে চোখ বন্ধ করে কান্না করতে লাগলো, আরশ রাগী গলায় বলল,

___”তোদের মতো মেয়েদের প্রবলেম কী জানিস, প্রথম দেখাস কোন ইন্টারেস্ট নেই ইগনোর করবি, তারপর বড়োলোক সুদর্শন ছেলেদের সব কিছুই পছন্দ হয়ে যায়,তুই না কিছু দিন আগে বললি আমার ভাই কে বিয়ে করবি না, এখন নাচতে নাচতে বিয়েতে রাজি হয়ে গেলি,ও যখনই দেখলি আমি তোকে ডিভোর্স দিবো, তখনই মন মানলো না বড়োলোক ছেলেকে হাত ছাড়া করতে তাই না, আর কী যেন বললি তোর দেহ,মাই ফুট তোর মতো দেহ পেতে আমাকে জোর করতে হবে, হাজারো মেয়ে এই আরশের এক ডাকে বেডে আসার জন্য অপেক্ষায় থাকে, শুধু মাএ একটা ডাকে বুঝতে পারছিস, আমি চাইলেই তাঁদের সঙ্গে বেড শেয়ার করতে পারতাম, কিন্তু তোর মতো নিচু মনমানসিকতা এই আরশের না। স্বামী রেখে বিয়ে করবি তাই-না, খুব শখ, আমিও দেখি এই বিয়ে তুই কিভাবে করোস, তোর জায়গা এই আরশের মনে কখনো হবে না,আর না ডিভোর্স কখনো মিলবে, দেখি তুই কিভাবে বিয়ে করোস।

রাগী মুখে মিম কে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় উপর ফেলে দিলো, রুম থেকে বড় বড় পা ফেলে বের হতে যাবে, আরশের টনক নড়ে উঠলো, পুনরায় পিছনে ফিরে মিমের দিকে তাকাতেই দেখলো, মিমের হাত থেকে তাজা রক্ত পড়ছে, মিম বিছানায় উপর উপুড় হয়ে হাত ধরে মুখ চেপে কান্না করছে, আরশ নিজের হাতের দিকে তাকালো, নিজের হাতেও কিছুটা রক্ত লেগে আছে, আরশ দ্রুত পায়ে পুনরায় মিমের কাছে এসে এক টানে মিম কে বিছানা থেকে তুলে নিজের বুকে ফেললো, মিমের হাত আরশের বুকে বারি খেতেই মিম চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে নিলো ব্যাথায়, আরশ প্যাকেট থেকে রুমাল বের করে মিম কে নিজের বুক থেকে সোজা করে দাঁড় করালো, মিম আরশের থেকে সরে দাঁড়াতে নিলে আরশ মিমের হাত টেনে ধরে হাতের মধ্যে থেকে ভাঙ্গা কাঁচের চুড়ি এক টানে বের করলো, মিম ব্যাথায় চোখ বন্ধ করে নিলো,বন্ধ চোখ থেকে পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পরলো, আরশ রুমাল দিয়ে মিমের কেটে যাওয়া জায়গা টা বেধে দিয়ে, হনহন পায়ে রুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য দরজা খুললো, দরজা খুলতেই রাগটা আরো বেশি বেড়ে গেলো দরজার সামনে নিজের ভাই কে দেখে, হানিফ আর আরাত মিমের রুমে আসছিল, হানিফ মিমের সঙ্গে দেখা করবে বলে, রুমের সামনে এসে দরজায় টুকা দিতে যাবে তখনই বন্ধ দরজা খুলে গেলো, মিমের রুমে আরশ কে দেখে হানিফ বলল,

___” তুই এখানে?
আরশ হানিফের কথায় উওর না করে উল্টো হানিফের দিকে আঙ্গুল তুলে হিসহিসিয়ে বলল,
___”আমার বউয়ের থেকে দূরে থাকবি তুই !
হানিফ কে শাসিয়ে আরশ হানিফের পাশ কেটে যেতে নিয়ে, হানিফের কথায় পুনরায় জায়গায় দাঁড়ালো,
___”মেনে নিয়েছিস মিম তো বউ ?
আরাত দ্রুত মিমের রুমে ঢুকে গেলো, রুমে ঢুকে মিম কে কান্না করতে দেখে নিজের সঙ্গে জরিয়ে ধরলো, হানিফ আরশের সামনে এসে দাঁড়ালো, আরশ দাঁতে দাঁত চেপে মেঝের দিকে চেয়ে আছে, হানিফ আরশ কে উত্তর করতে না দেখে রাগী গলায় আরশ কে শাসিয়ে বলে উঠলো,
___” যদি মেনে নিতিস আমি মিম কে ছেড়ে দিতাম, বাট এখন প্রশ্নই ওঠে না মিম কে ছাড়ার,আজ থেকে আমি না তুই মিমের থেকে দূরে থাকবি মাইন্ডেট
আরশ হানিফের চোখে চোখ রাখলো, চোখ থেকে যেন আগুন বের হচ্ছে, হানিফ আরশের দিকে চেয়ে মিম কে ডাকলো,

___” মিম বাহিরে বের হয়ে আসুন?
দু’ভাই মুখোমুখি দাঁড়ানো, দুজনের চোখে রাগ ক্ষোভ ভেসে উঠে আছে, হানিফের ডাকে মিম আর আরাত রুম থেকে বের হয়ে এলো, হানিফ আরশের থেকে চোখ ফিরিয়ে মিমের দিকে রাখলো, মেয়েটার চোখমুখ কান্নার কারণে ফিকে হয়ে গেছে, হাতে রুমাল পেঁচানো, সাদা রুমালের উপরে রক্ত লাল দাগ লেগে আছে, হানিফ পুনরায় আরশের হাতের দিকে তাকালো, দেখলো আরশের হাতেও কিছুটা রক্ত, হানিফ বুঝলো দুজনের হাত থেকেই রক্ত বের হচ্ছে, কাঁচের টুকরো দুজনের হাতে বিঁধে গেয়েছিল, হানিফ মিমের কাছে এসে মিমের কব্জি আলতো করে ধরে বলল,
___” আসুন আমাদের জন্য সবাই অপেক্ষা করছে।

হানিফ মিম কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মিমের কব্জি ধরে নিচে নিয়ে যেতে লাগলো, মিম ফাঁকা চোখে হানিফের সঙ্গে হাঁটতে লাগলো,আরাত আরশ কে একনজর দেখে মিম আর হানিফের পিছনে পিছনে চলে গেলো, আরশের অগ্নিগিরি চোখ হাফিনের ধরে রাখা মিমের হাতের দিকে, হাত মুষ্টিবদ্ধ চোখ থেকে আগুন ঝলছে, আরশের ফোন বেজে চলছে অনগর, পকেট থেকে ফোন বের করে নাম্বার টা দেখেই চিনে ফেললো, ফোনটা আজকে সকালে নতুন কিনেছে, আগের ব্যাবহার করা সিম নতুন ফোনে তুলছে বিধায় নাম্বার পুরো বন্ধুমহলে কাছে ছিল, আরশ ফোন রিসিভ করে বিপরীত পাশে মানুষটা কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজে শাসিয়ে বলে উঠলো,
___” তোর বয়ফ্রেন্ড কে সামলা নয়তো আমি ভুলে যাবো সে আমার বড়ো ভাই হয়।
বিপরীত পক্ষে মানুষ কী কারণে ফোন করছে কি বলতে ফোন করছে না শুনেই আরশ ফোন কাটলো, ফোন কেটে নিজের হাতের দিকে তাকালো,রক্ত হাতে জমাট বেঁধে গেছে, আরশ নিজের রাগ আসবাবপত্র উপর তুলতে না পেয়ে নিজের কেটে যাওয়া অংশ চেপে ধরে নিজের রাগ কমাতে লাগলো, কেটে যাওয়া জায়গা থেকে পুনরায় হুলহুল করে রক্ত বের হতে লাগলো,

ছাঁদে একপাশে দাঁড়িয়ে আদিল আমান রাফি আশিক আনাস হাবীব দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে, তাঁদের আড্ডার মূল কেন্দ্রবিন্দু বউ, তাঁদের মধ্যে চারজন ম্যারেড চারজন মিলে দু’জন কে বিয়ের জ্ঞান দিচ্ছে, আনাস এক সাইটে চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাঁদের কথা শুনছে শুধু ,আর আশিক আমান বিয়ের পর বউ কে কিভাবে সামলাতে হয় আদিল আর রাফি কে শিখিয়ে দিচ্ছে, তাঁদের সঙ্গে হাবীবও কম যাচ্ছে না, তাঁর ঘরে যে একটা ফাজিল আছে, তাঁকে সামলাতে সামলাতে হাবীবের মতো বৃদ্ধিমান ছেলেটাও বাচ্চাদের স্বভাব পেয়ে গেছে,আদিল সবার কথা শুনলেও বেচারা রাফি বিবাহিত ছেলেদের মধ্যে ফেঁসে গেছে, না পারছে সবাই কে অগ্রহ করে চলে যেতে, না পারছে সবার সঙ্গে সঙ্গ দিতে, বউ কে কিভাবে কন্ট্রোল করতে হয় আশিকের মুখে শুনে আনাস সাইট থেকে ব্যঙ্গ করে বলল,

___” বউ কে কন্ট্রোল করিস নাকি বউ তোকে কন্ট্রোলে রাখে সবার জানা আছে ।
আনাস এর ব্যঙ্গ করে বলা কথায় আশিক আদিলের ঘারে হাত রেখে ব্যঙ্গ করে বলল,
___” বিয়ে করবে না বলা ছেলেটাও বউয়ের কথায় উঠবস করে, কতকিছু যে দেখতে হবে চারপাশে।
আশিকের কথায় আনাস রেগে গেলো, রাগী মুখে আশিক কে বলে উঠলো,
___” তাও তোর মতো বউয়ের হাতে সবসময় ঝাড়ু পিটানি খাইনা।
আশিক আনাস এর কথায় আরশের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” শোন, না জেনে মিথ্যা রটাবি না, সবসময় না ইয়ার, মাঝেমধ্যে ঝাড়ু নিয়ে দৌড়ানি দেয়, বাট ধরতে পারে না।
আশিকের কথায় বাকি সবাই শব্দ করে হেঁসে উঠলো, আনাস বিরক্ত হলো, আশিক আর আনাস একখানে থাকলে তাঁদের টুকিটাকি ঝগড়া লাগবেই, হাবীব যতক্ষণ না তাঁদের আটকাবে ততক্ষণ ঝগড়া করতেই থাকবে দু’জন, স্বামী স্ত্রী যেমন হাসতে হাসতে ঝগড়া লেগে যায়, ঠিক তেমনি এদের দুজনের সম্পর্ক এমন, হাবীব প্রতিবারের মতো দু’জন কে থামাতে বলল,

___” দু’জন থামবি তোরা?
হাবীবের ধমকে দু’জন চুপ হয়ে গেলো, হাবীব রাফির দিকে তাকিয়ে বলল,
___” তোমার খবর কী ব্রো?
রাফি এতক্ষণ তাঁদের থেকে সাইটে দাঁড়িয়ে তাঁদের খুনসুটি দেখছিলো, হাবীবের প্রশ্নে নিজের ভাইয়ের দিকে একনজর তাকিয়ে গম্ভীর গলায় ছোট করে বলল,
___” সবকিছু মিলে আলহামদুলিল্লাহ ।
আনাস প্রথম থেকে রাফি কে লক্ষ করছে, ছেলেটা আশিকের মতো হাসিখুশি ছিলো সবাই কে সবসময় মাতিয়ে রাখতো, অনেকদিন পড়ে দেখা তাঁদের, রাফি কে এতটা গম্ভীর হয়ে যেতে দেখে আনাস এর নিজের মধ্যে খারাপ লাগা কাজ করলো, মনে হলো রাফির এত চুপচাপ হয়ে যাওয়ার পিছনে আনাস নিজে দায়, তালুকদার বাড়িতে আসার পর থেকে রাফির এখনো আইরার সঙ্গে দেখা হয়নি, আইরা কে দেখার মতো তেমন ছটফটানি দেখা যাচ্ছে না তাঁর মধ্যে, আনাস রাফির দিকে তাকিয়ে বলল,

___” ঠিক আছো ?
রাফি আনাস এর দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে হাসার চেষ্টা করে বলল,
___” ইয়া অলরাইট।
আমান সবাই কে উদ্দেশ্য করে বলল,
___” অনেক আড্ডা হয়েছে,চলো নিচে যাওয়া যাক।

ঘরোয়া ভাবে আন্টি বদলের আয়োজন হলেও, এত অল্প সময়ের মধ্যে তালুকদার বাড়িতে মানুষ জন গিজগিজ করছে, সবাই তালুকদার বাড়ির মেহমান, মিম কে আরশের বাবা-মায়ের মাঝখানে বসানো হয়েছে, সামনের সোফাতে হানিফ বসা আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদারের সঙ্গে, আশিক হাবীব আদিল আনাস আইরা মায়া সন্ধ্যা রশ্মি আরাত হানিয়া সবাই দাঁড়িয়ে দেখছে, আর বাড়ির বড়রা সোফাতে বসে গল্প করছে, হানিফের পিছনে আরশ রাফি দাঁড়িয়ে আছে,আরশের নজর মিমের দিকে, মিম আসার পর থেকে মাথা নিচু করে বসে আছে, মাথা আর উপরে তুলে নি, আরাত বারবার সিড়ির দিকে তাকাচ্ছে,মন বলছে আনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে তাকবীর নিচে আসবে, সবার সঙ্গে বসে আড্ডা দিবে, সময় চলে যাচ্ছে এদিকে হানিফের মা হানিফের হাতে আন্টি দিয়ে বলল, মিম কে পড়িয়ে দিতে, হানিফ মায়ের থেকে আন্টি নিয়ে মিমের দিকে তাকালো, মিমের পাশে বসে সামনে আরশের দিকে তাকালো একবার, আরশ সেই থেকে মিমের দিকে রাগী চোখে চেয়ে আছে, হানিফ আরশের থেকে চোখ ফিরিয়ে মিম কে বলল,

___” হাত বাড়িয়ে দেন?
মিমের কোলের মধ্যে হাত দুটো কাঁপছে,হানিফের কথায় একনজর চোখ তুলে সামনে আরশের দিকে তাকিয়ে, আরশ কে নিজের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে মিম হানিফের দিকে কাঁপা কাঁপা হাতটা বাড়িয়ে দিলো,হাতের উপর ফোঁটা ফোঁটা পানি দেখে বুঝা যাচ্ছে মিম এতক্ষণ মাথা নিচু করে চোখের পানি বিসর্জন দিয়েছে, বাড়ির বড়রা দেখলো কিন্তু কেউ কিছু বলল না, তারা তো আগে থেকে জানে মিম এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করবে না, এজন্য হয়তো কান্না করছে, মিমের হাতে রুমাল বাঁধা দেখে সবাই চমকে উঠলো, সাদা রুমালে রক্তের দাগ বলে দিচ্ছে, বেশিক্ষণ আগের ক্ষত না, আদিবা তালুকদার ভাতিজির কাছে এসে ভীতু কন্ঠে জানতে চাইলো,

___” হাত কিভাবে কেটে গেলো ?
মিম ফুপির কথায় আঁড়চোখে আরশের দিকে চাইলো, হানিফ আরাতের নজর আরশের উপর,আরশ মিমের উত্তরের অপেক্ষা করছে, মিম আরশের দিকে তাকিয়ে ছোট করে মিথ্যা কথা বলে উঠলো,
___” চুড়ি ভেঙ্গে হাতে বিঁধে গেছে।
রুপোলী বেগম তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলল,
___” কিভাবে হাতে চুড়ি বিঁধলো?
মিম আরশের থেকে চোখ ফিরিয়ে হাতের উপর রেখে বলল,
___” মেঝেতে পড়ে গিয়েছিলাম।
রাবেয়া তালুকদার হাসি মুখে বলে উঠলেন,
___” দেখো মেয়ের কান্ড, মেঝেতে পড়ে হাত কেটে ফেলসে, আচ্ছা ঠিক আছে রাতে মেডিসিন খেয়ে নিবে তাহলে ঠিক হয়ে যাবে, আর দেরি করো না হানিফ, তুমি আন্টি টা পড়িয়ে দেও।
রাবেয়া তালুকদারের কথায় হানিফ মুখে মেকি হাসি টেনে মিমের হাত ধরল, মিম আরেক হাতে শাড়ি মুট পাকে ধরলো, হানিফ মিমের হাতে আন্টি পড়িয়ে দিতে যাবে,আরশ হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে নীরবতা ভেঙ্গে বলল,

___” দাঁড়াও ভাইয়া…?
আরশের কথায় সবার নজর আরশের দিকে হলো, মিম চোখ খুলে আরশের দিকে আশাভরা চাহনিতে তাকালো,মনের মধ্যে কিছুটা আশা ফিরে এলো, এই বুঝি আরশ সবকিছু সবার সামনে বলে দিবে, এ-সব ঝামেলা থেকে মিম মুক্ত পেয়ে যাবে, হানিফও ছোট ভাইয়ের দিকে তাকালো, আরশের রিঅ্যাকশনের অপেক্ষা করছিল, কখন আরশ সবকিছু আটকাবে, মিম আর হানিফের ভাবনা ভঙ্গ করে দিয়ে আরশ ওর মা’কে বলে উঠলো,
___” মা কী সব নিয়ম বের করছো, এতগুলো মুরব্বিদের সামনে দেখছো না তোমার ভোলাভালা ছেলে ওই মেয়েকে রিং পড়িয়ে দিতে লজ্জা পাচ্ছে, তোমরা এসেছো কী কারণে, তুমি তোমার ছেলের বউ কে রিং পড়িয়ে দেও।
আরশের কথায় মিম হানিফ হতভম্ব হয়ে গেলো, আরশের মা ছেলের ব্যবহারে অসন্তুষ্ট হলেন, তালুকদার বাড়ির বড়রা আরশের দিকে অবাক চোখে তাকালো, তাঁরা এর আগেও আরশ কে আরিশা আমানের বিয়েতে দেখেছে, বেশ ভালো ছেলে কিন্তু আজকে কথার মধ্যে কেমন একটা তিক্ততা খুঁজে পাচ্ছে, আনহা শেখ আরশের কথায় বলে উঠলেন,

___” এই নিয়মে তো তোমাদের দ্বিমত থাকার কথা না, আজকালকার ছেলেমেয়ে তো এটাই করে, নিজেরা একিউপর কে আন্টি পড়িয়ে দেয়?
আরশের তীক্ষ্ণ নজর মিম হানিফের উপর, কন্ঠে লেগে আছে তিক্ততা, মুখে মেকি হাসি টেনে আনহা শেখের কথায় উওর করলো,
___” আন্টি আপনাদের চয়েস, আমি জাস্ট আমার মনোভাব টা জানালার,ভাইয়া আমাকে মেসেজ করে বলল কথাটা জানাতে, ভাইয়া তুমি বলো না মেসেজ করে কী বলতে বলছো?
হানিফ আরশের কথায় অবাক হয়ে সবাই কে দেখে অবাক কন্ঠে কে বলল,
___” আমি….
___” হ্যাঁ তুমি তো, আমাকে মেসেজ করে বললে না,মা যেন তাঁর ছেলের বউ কে রিং পড়িয়ে দেয়।
হানিফের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে আরশ বলল কথা গুলো, আরশের মা হাসি মুখে সবাই কে উদ্দেশ্য কে বলল,

___” আমার ছেলেটা লাজুক প্রকৃতির, লজ্জা পাচ্ছে হয়তো, একটা কাজ করি না আমি বরং মিম কে আন্টি পড়িয়ে দেই।
কেউ আর দ্বিমত করলো না, রাজি হয়ে গেলো, আর মেয়ে পক্ষ থেকে আদনান তালুকদার হানিফ কে আন্টি পড়িয়ে দিবে বাড়ির মুরব্বি তিনি, হানিফ মিমের থেকে দূরে গিয়ে বসলো, হানিফের পাশে হানিফের মা মিম কে আন্টি পড়িয়ে দিলেন, হানিফ তীক্ষ্ণচোখে আরশের দিকে তাকাতেই দেখলো,আরশ বাঁকা হেঁসে তাকিয়ে আছে মিমের দিকে, নিজের ছোট ভাইয়ের এরুপ দেখে হানিফ হাতাশ হলো, মনে মনে ভাবতে লাগলো, ভুল করছিস ভাই, তোকে অনেক সুযোগ দিয়েছি কিন্তু তুই নিজের অনুভূতি গুলো বুঝতে সক্ষম হচ্ছিস না, তোর অনুভূতি বুঝতে না পারার কারণে ভিষণ কষ্ট পেতে হবে, রাফি আরশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

___” কী চাইছিস তুই?
রাফির কথায় আরশ স্বাভাবিক মুখে রাফির দিকে তাকালো, অবাক হওয়ার ন্যায় বলল,
___” কী চাইবো!
রাফি আরশ কে অবুঝের মতো প্রশ্ন করতে দেখে বিরক্ত মুখে বলল,
___” সবার সামনে মিথ্যা বললি কেনো?
আরশ আগের ন্যায় বলে উঠলো,
___”তোরা মিথ্যা জেনে প্রতিবাদ করলি না কেনো?
রাফি আরশের ত্যাড়ামিতে কিছুটা হতাশ হলো, হতাশ কন্ঠে পুনরায় বলে উঠলো,
___” আমাদের প্রতিবাদের আশা তুই করছিস কেনো, নিজের ভালো পাগলও বুঝে, তুই তো পাগল না?
রাফির কথায় আরশ উওর না দিয়ে, রাফির ঘারে এক হাত রেখে রাফির মতো ফিসফিস করে আইরার দিকে ইশারায় দেখিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,
___” আচ্ছা আইরা কে দেখে তোর কেনো ফিলিং কাজ করছে না?
আরশের মুখে আইরা কে নিয়ে এরূপ কথা শুনে রাফির মুখে রাগ ফুটে উঠলো, রাগী কন্ঠে জানতে চাইলো,

___” মানে ?
আরশ রাফি কে ছেড়ে দিয়ে নিঃশ্বাস ফেলে মিমের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” মানে একটাই নিজের চরকায় তৈল দে।
রাফি দূর থেকে আইরা কে একনজর দেখে নিয়ে বিরক্ত মাখা কন্ঠে আরশ কে বলল,
___” তোর খামখেয়ালির জন্য অনেক বড় আফসোস করবি, থাকতে মূল্য দিতে শেখ, আর তোকে কী বলছি, তুই তো মিম কে ধ্বংস করার খেলায় নেমেছিস, বিশ্বাস কর তোদের বন্ধু বলতে লজ্জা করে।

কথাটা বলে রাফি চলে গেলো,আরশ চুপচাপ আরশের যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলো শুধু। আরাতের মনে তাকবীরের প্রতি অভিমান জমে গেলো, তাকবীর নিচে আসেনি , আরাত নিজের উপর কনফিডেন্স ছিলো তাকবীর নিচে নামবে, আরাত পুরো অনুষ্ঠান টা মলিন মুখে দেখলো আন্টি পড়ানোর সাবজেক্ট শেষ করে খাওয়ার পর্ব শুরু করলো, আরশ চলে গিয়েছে, থেকে গেছে হানিফ হানিফের মা-বাবা আর ছোট নূরফিহা, আন্টি পড়ানোর শেষে মিম নিজের রুমে চলে গেছে আর নিচে নামে নি, রুপালী বেগম একবার মিমের রুমের সামনে এসে বকাবকি করে গেলেন, নিচে নামার জন্য, হানিফ রা চলে যাওয়া পর্যন্ত নিচে থাকতে বলল, কিন্তু মিম না রুপোলী বেগমের কথায় জবাব দিলো, না নিচে নামলো, খাওয়া দাওয়া শেষ করে রাতে রাতে মেহমান রা বিদায় নিয়েছে,
মিমের জীবন টা আরো এলোমেলো হয়ে গেলো,
অন্ধকার রুমে কম্বল শরীরে জরিয়ে শুয়ে আছে, ফোন বেজে যাচ্ছে বারংবার, মিম একপর্যায়ে ফোনটা হতে নিয়ে নাম্বার দেখে ফোন সাইলেন্ট করে রাখলো, হানিফের নাম্বার দেখে হানিফের প্রতি বিরক্ত লাগছে, বিরক্ত মুখে বিছানায় উঠে বসে হাতের দিকে তাকালো, রুমাল টা এখনো হাতে আছে, মিম দাঁতে দাঁত চেপে এক টানে রুমাল খুলে মেঝেতে ফিকে মারলো, ক্ষত জায়গা টা টান ধরে গেছে, ব্যাথাটা বেড়েছে, আন্টির দিকে তাকিয়ে বিরবির করে উঠলো মিম,

___” আপনাকে আমি অনেক পুড়াবো,আপনি বিশ্বাস করতে পারছেন না সামনে আপনার জন্য কী অপেক্ষা করছে,আমাকে আপনার ভালোবাসতেই হবে , এটা আমাকে দেওয়া আমার চ্যালেঞ্জ, আমার মূল্য তখন বুঝতে পারবেন যখন আমার জন্য ছটফট করবেন, তাই আপনাকে ছটফট করাতে আমি কোনো কমতি রাখবো না।
মিম পুনরায় বিছানায় শুয়ে পরলো, না রাতের খাবার খেলো, না ব্যাথার মেডিসিন নিলো, আরাত তাকবীরের রুমে না এসে নিজের রুমে ঢুকলো, দরজা লাগিয়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পরলো, অভিমানে কপালে হাত রেখে তিরতির মেজাজে চোখ বন্ধ করল,কিন্তু চোখে ঘুম ধরা দিলো না, পেতে খিদা মনে তাকবীরের প্রতি রাগ, সব মিলিয়ে অসহ্য অনুভূতি, তাকবীর ফোনে সময় দেখলো, রাত প্রায় বারোটার ঘরে, আরাত কে এখনো রুমে আসতে না দেখে তাকবীর কোল থেকে ল্যাপটপ বেডসাইডে রেখে দিয়ে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালো, অন্ধকার রুমের লাইট জ্বালিয়ে রুম থেকে বের হলো, পরনে বিকালের সাদা পাঞ্জাবি চেঞ্জ করে কালো টাউজার টি-শার্ট মাথায় তাঁর বরাবরির মতো ক্যাপ, করিডরে দাঁড়িয়ে নিচে ড্রিয়ং রুম লক্ষ করলো, পুরো ফাঁকা শুধু কিচেন রুমে থালাবাসনের শব্দ শুনা যাচ্ছে, তাকবীর আরাতের রুমের সামনে এসে গম্ভীর গলায় ডেকে উঠলো,

___” রাত?
আরাত তাকবীরের কন্ঠ শুনলো ঠিকই কিন্তু উত্তর করলো না, তাকবীরের পুনরায় গম্ভীর কন্ঠ ভেসে এলো ,
___” রাত ওপেন দা ডোর ?
আরাত এখনো সাড়া দিলো না, তাকবীর কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে নিজের রুমে চলে এলো, বিছানায় উপর থেকে ফোন নিয়ে আরাত কে ফোন লাগলো, আরাত তাকবীরের আর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়লো, গুটিগুটি পায়ে দরজার কাছে আসতেই ফোন বেজে উঠলো, আরাত হটাৎ ফোন বাজার শব্দ চমকে উঠে বুকে হাত দিলো, আরাত ফোনের কাছে আসতে আসতে একবার কল বেজে কেটে গেলো,দ্বিতীয় বার কল আসতেই আরাত একটু সময় নিয়ে ঘুমুঘুমু কন্ঠে ফোন রিসিভ করে সালাম দিয়ে উঠলো,

___” আসসালামু আলাইকুম।
তাকবীর আরাতের কন্ঠে ভ্রু কুঁচকালো, কিছুটা সময় নিয়ে মুচকি হেঁসে সালামের উত্তর করলো,
___” অলাইকুম আসসালাম বিবিজান ?
আরাত কী বলবে ভেবে পেলো না, হুট করে ফোন তো রিসিভ করলো, আরাত তো রাগ করে আছে কিন্তু তাকবীর ফোন দিতেই রাগ ভুলে গিয়ে ফোন রিসিভ করে নিলো, এখন নিজের উপর নিজেরই বিরক্ত লাগছে, তাকবীর আরাতের আর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
___” আপনাকে ডিস্টার্ব করলাম ?
___” না না হুম..
আরাতের নিজের কথায় চোখ বন্ধ করে কপালে হাত রেখে বলল,
___”না মানে আমি ঘুমিয়ে ছিলাম তো এজন্য।
আরাতের কথায় বিপরীতে তাকবীরের গম্ভীর সর ভেসে এলো,
___” আপনার হাজবেন্ড কে ভুলে গেছেন?
আরাত চুপ করে গেল, আরাত তো রেগে আছে, রাগ ভাঙ্গানোর আগেই আরাতের রাগ ভানিস হয়ে গেলো, আরাত যে রাগ করেছে তাকবীর বুঝতেই পারলো না, না এই মেয়ে কে দিয়ে হবে না এ-সব, আরাত এবার কোনো ভনিতা ছাড়ায় গাল ফুলিয়ে বলল,

___” আমি রাগ করেছি আপনার উপর, এজন্য আপনার রুমে যাই নাই, আর যাবোও না মনে করেন আমি রাগ করে আমার বাবার বাড়িতে এসেছি।
তাকবীর ফোনের ওপাশে মুচকি হাসলো,আরাতের পাগলামিতে বিরবির করে বলল,
___” ইয়া মাবুদ কোন পাগলের পাল্লায় ফেললেন।
তাকবীরের বিরবির করে বলা কথা আরাত শুনতে না পেয়ে ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
___” কিছু বললেন ?
___” হুও নো,আপনার রাগ ভাঙতে হবে?
আরাত ফোনের ওপাশে মাথা ঝাকিয়ে ছোট করে বলল,
___” হ্যাঁ।
তাকবীর এই গভীর রাতে বেলকনিতে এসে দাঁড়ালো, পকেটে এক হাত গুঁজে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,

___” তা ম্যাম আপনার রাগ ভাঙ্গাতে আপনার বাবার বাসাতে যাবো, বাট আপনার বাবা ভাই যদি তাঁদের মেয়েকে রাগানোর কারণে আমাকে জেলে পুড়ে দেয়, তখন আমার কী হবে,আমার রিক্স নিতে পারবেন তো ?
তাকবীরের কথায় আরাত কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করলো, বুঝতে পারছে না তাকবীর কী আরাতের সঙ্গে মজা নিচ্ছে,যদি মজা নিয়ে থাকে আরাতও মজা নিবে, আরাত দুষ্টু হেঁসে বলল,
___” আমার বাবা ভাই থেকে আপনাকে বাঁচাতে পারবো, বাট একটা প্রবলেম আছে।
আরাতের কথায় তাকবীর ভ্রু কুঁচকালো, বউয়ের সঙ্গে একি বাড়িতে থেকে আলেদা রুমে গভীর রাতে ফোনে কথা বলতে মন্দ লাগছে না, তাকবীর ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলো,
___” বলেন ম্যাম কী প্রবলেম?
আরাত বিছানায় কম্বলের নিচে শুয়ে দুষ্টু হেঁসে বলল,
___” আমার একটা কাজিন আছে, অনেক গম্ভীর, আমার কী মনে হয় জানেন?
তাকবীর গম্ভীর কন্ঠে বলল,
___” নো কখনো বলো নাই, জানবো কীভাবে?
আরাত মাথা ঝাকিয়ে বলল,

___” হুম তাও ঠিক, না বললে জানবেন কিভাবে, জানেন, সে একটা মেন্টাল পাগল।
তাকবীর আরাতের কথায় বিষম খেলো, বউয়ের মুখে নিজের নামে খুব যত্ন সহকার আজেবাজে কথা শুনছে বাহ এত রাতে এর থেকে মজাদার ফিলিংস আর কই পাওয়া যাবে, তাকবীর কে বিষম খেতে দেখে আরাত দুষ্টু হেঁসে ফোনের ওপাশ থেকে পুনরায় বলে উঠলো,
___” আচ্ছা আপনি বলেন তো, কোনো সাধারণ মানুষ একটা রুমে একা একা থাকতে পারে?
তাকবীর আরাতের কথায় গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
___” একদম না, তোমার উচিত তোমার কাজিনের রুমে গিয়ে তাঁকে সঙ্গ দেওয়া,সে নিশ্চয়ই তাঁর বউ শূন্যতায় ভুগছে, তাঁর বউয়ের অভাব পূরণ করা!
আরাত তব্দা খেয়ে গেলো, নিজের কথায় নিজেই ভেসে গেলো, গাল ফুলিয়ে তাকবীরের কথায় বলে উঠলো,
___” আমাকে এসে কোলে তুলে নিয়ে যান, রাগ ভাঙ্গাতে হবে না!
তাকবীর বাঁকা হাসলো বউ তাঁর লাইনে এসেছে, এতটুকু তেই একদম কোলে উঠতে চাইছে, তাকবীর ভীতু ভীতু ভয়েস এর বলল,

___”ইম্পসিবল তোমার মেন্টাল কাজিন যদি আমাকে আক্রমণ করে?
আরাত আগের ন্যায় মুখ ফুলিয়ে বলল,
___” তাঁকে বেঁধে পাগলা কারদে রেখে আসবো।
তাকবীর আরাতের অভিমানী গলায় বলা কথায় মুচকি হাসলো, পর মুহূর্তে গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের গম্ভীর্য বজায় রেখে বলল,
___” আই এম সরি আমি আসতে পারবো না, একচুয়ালি আমার বাসাতে হটাৎই একটা প্রবলেম হয়ে গেলো।
আরাত ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো,
___” মানে?
তাকবীর আফসোসের ন্যায় পুনরায় বলে উঠলো,
___”আমার কাজিন এসেছে তাঁর হাজবেন্ডের উপর অভিমান করে, আমি ভাবছি আজকে রাতটা তাঁকে দিয়েই চালিয়ে দিবো….
তাকবীর পুরো কথা শেষ করার আগে আরাত চিৎকার দিয়ে বলল
___” কীহহহ….
আরাতের চিৎকারে তাকবীর ফোনটা কান থেকে সাইটে সরালো, মুখে দুষ্টু হাসি, বউ কে জ্বালাতে ভালোই লাগছে, তাকবীর ইনোসেন্ট কন্ঠে নিজেকে এক্সপ্লেইন করতে বলে উঠলো,

___” বিলিভ মি জান কাজিনের উপর আমার কেনো ইন্টারেস্টেড নেই, বাট বউ কাছে নেই কাজ চালাতে তো হবে।
আরাত কে আর কে সামলায়, বিছানা থেকে উঠে বসে রাগী গলায় হিসহিসিয়ে বলল,
___” এক্ষুনি এই মুহূর্তে আপনি আমার রুমে আসবেন বলে দিলাম, নয়তো আমি আপনার সঙ্গে সত্যি সত্যি রাগ করবো।
আরাতের ব্ল্যাকমেইলে তাকবীর মুচকি হেঁসে বলল,
___” ম্যাম প্লিজ ওপেন দা ডোর?
আরাত অবাক হলো, এত তাড়াতাড়ি তাকবীর কয় পায়ে এলো কথাগুলো ভাবতে ভাবতে বিছানা থেকে নেমে দরজার কাছে এসে, একটু সময় নিয়ে দরজা খুলে দিলো, তাকবীর দরজার সামনে এক হাত পকেটে গুঁজে আরেক হাতে ফোন কানে তুলে দাঁড়িয়ে আছে, আরাত কে দরজা খুলতে দেখে, কান থেকে ফোনটা নামালো, আরাত ফোনের কথোপকথন গুলো মনে করে কাচুমাচু করলো, আরাত তাকবীর কে পা থেকে মাথা অবধি পরক করে গম্ভীর কন্ঠে বলল,

___” লেটস গো।
তাকবীর রুমে না গিয়ে সিড়ি বেয়ে নামতে লাগলো, আরাত পিছু ডেকে বলল,
___” আপনি রুমে না গিয়ে নিচে যাচ্ছেন কেনো?
তাকবীর দাঁড়ালো না নিচে নামতে নামতে বলল,
___” তুমি তো বলছিলে নিচে নামতে, সবার সঙ্গে আড্ডা দিতে?
তাকবীরের কথায় আরাতের রাগ লাগলো, নিচে নামতে বলছিলো সন্ধ্যার দিকে এখন রাত প্রায় একটার কাছাকাছি, এখন মনে পড়লো তাঁর, নিচে নামতে হবে, আরাত তাকবীরের কাছে সিড়ি বেয়ে দৌড়ে এসে নামতে নামতে মুখ ফুলিয়ে বলল,
___” হ্যাঁ আপনার জন্য সবাই অপেক্ষা করছে এত রাতে!
তাকবীর সামনে হাঁটতে হাঁটতে আরাতের কথায় জবাব দিলো,
___” হ্যাঁ এজন্য তো নিচে আসলাম!

তাকবীরের উওরে আরাত ভেবাচেকা খেয়ে গেলো, আরাত তো ব্যঙ্গ করে কথাগুলো বলল,তাকবীর বুঝতে পেয়ে আরাত কে আরো রাগাচ্ছে, আরাত এবার সিড়ির সামনে দাঁড়িয়ে গেলো গাল ফুলিয়ে, সে আর জায়গা থেকে নড়বে না,তাকবীর নিজের কথার জালে আরাত কে বারবার বোকা বানাচ্ছে, আর আরাত বোকা সেজে যাচ্ছে, তাকবীর ডাইনিং টেবিলের কাছে এসে লাইট জ্বালিয়ে দিলো, এতক্ষণ দুজন অন্ধকারে নেমে এসেছিলো, নিজেদের বাড়ির অলিগলি সব জানা, তারউপর করিডোরের লাইটের কিছুটা আলো নিচে ড্রয়িং রুমে ছড়িয়ে পড়েছে, তাকবীর লাইট জ্বালিয়ে পিছনে ফিরে আরাত কে সিড়ির কাছে হাতে হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুঝলো ম্যাম গাল ফুলে আছে, তাকবীরের কেনো যেনো আরাতের এই ছোট ছোট রাগ অভিমান গুলো ভালো লাগে, মনে হয় বউ অভিমান করে কথা বলবে না, সে মানিয়ে নিবে, বউ বাচ্চামো করবে তাকবীর সেটাতে সায় জানাবে, এটাই না একটা স্বামী স্ত্রীর বন্ধন, এভাবে স্বামী স্ত্রীর খুনসুটি গুলো জন্য একটা সম্পর্ক টিকে থাকে, বউ ছোট ছোট কথায় রাগ করবে আর স্বামী প্রতিবার সরি বলে বউয়ের রাগ ভাঙ্গাবে, তাকবীর আরাত কে একনজর দেখে নিয়ে কিচেন রুমে এলো, আরাত এখনো জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো, তাকবীর কে নিজের কাছে আসতে না দেখে রাগটা আরো বেড়ে গেলো, তাকবীর ফ্রিজ থেকে খাবার বের করলো, আঁড়চোখে আরাত কে দেখতে দেখতে গরুর মাংস গরম করল, পুনরায় একটা প্লেট সাজিয়ে ডাইনিং টেবিলে এসে প্লেট টা রেখে দিলো, আরাত আঁড়চোখে দেখছে শুধু, গরুর মাংস ঘ্রাণ এসে নাকে বাজতেই আরাতের পেতে খিদা যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো, তবুও ডাইনিং টেবিলের দিকে এগুলো না, তাকবীর আরাতের আড়ালে মুচকি হেঁসে ধীর পায়ে আরাতের কাছে এসে দাঁড়ালো,

___” চলেন ম্যাম খুব খিদা লেগেছে?
আরাত নিজের সামনে তাকবীর কে দেখে অন্য দিকে মুখ ঘুরালো, তাকবীর আরাতের কান্ডে মুচকি হাঁসলো, পরমুহুর্তে আরাতের দিকে ঝুঁকে আরাতের কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে বলল,
___” রাগটা একটু কমানো যায় না?
আরাত নিজের কপালে তাকবীরের ঠোঁট ছুঁয়ে দেওয়া জায়গা হাত দিয়ে মুছে ফেললো, এমন ভাবে মুছে ফেললো যেন তাকবীরের ঠোঁট তাঁর কপালে লেগে আছে, তাকবীর হেঁসে পুনরায় আরাতের বাম গালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো, আরাত পুনরায় হাত দিয়ে গাল মুছতে লাগলো,আরাত মুছতেই তাকবীর পুনরায় ডান গালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো, আরাত পুনরায় একি ভঙ্গিমায় গাল মুছতে লাগলো, তাকবীর আঙ্গুল দিয়ে আরাতের থুতনি উপরে তুলে থুতনিতে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো, আরাত পুনরায় থুতনিতে হাত ঘষতে লাগলো, তাকবীর এবার নিজেই বেসামাল হয়ে যাচ্ছে, ভিতরকার অস্থিরতা বুঝতে না দিয়ে আরাতের সামনে দুই কান ধরে ইনোসেন্ট ফেসে ছোট করে বলল,

___” আই এম সরি…?
তাকবীরের এরূপ সরি বলা দেখে আরাত কিছুপলক চেয়ে থেকে শব্দ করে হেঁসে উঠলো, আরাত কে হাসতে দেখে তাকবীর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজেও হেঁসে উঠলো, আরাত হাসতে হাসতে তাকবীর কে দু-হাতে জরিয়ে ধরে,তাকবীর নিজের বুকের মধ্যে আরাত কে নিয়ে কিছুক্ষণ এভাবেই কেটে দিলো, আরাত চুপচাপ আরাতের বুকে থাকাতে তাকবীর ফোনে সময় দেখলো, রাত প্রায় ১:৪৭ এর ঘরে, তাকবীর আরাত কে নিজের বুক থেকে উঠাতে উঠাতে বলল,

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫১

___” তুমি বাবার বাড়িতে এসে তোমার হাজবেন্ডের টাকাগুলো বাঁচাচ্ছো, আর আমাদের টাকা গুলো খেয়ে শেষ করছো কেনো?
আরাত প্রথমে বুঝলো না তাকবীরের কথায় মানে কপাল কুঁচকে কয়েক সেকেন্ড ভাবার পর বুঝতে পারলো তাকবীর ফোনে কাজিনের ব্যাপারটাই খ্যাপাচ্ছে, আরাত কিছু না বলে লজ্জায় তাকবীরের বুকে মুখ লুকালো, তাকবীরের মুখে হাসি,

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫৩