প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫৭
নওরিন কবির তিশা
দর্পণের সম্মুখে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে আজ নিজেরই চেনা দায় হয়ে পড়েছে তিহুর। নীলের দেওয়া সেই গভীর নীল শাড়িটা অঙ্গে জড়িয়ে মনে হচ্ছে, তন্বীদেহের ভাঁজে ভাঁজে যেন নীল সমুদ্রের চঞ্চল ঢেউ আছড়ে পড়ছে। মেঘবরণ কেশরাজ আজ আর কোনো বাঁধন মানেনি; অবাধ্য হয়ে পিঠের ওপর বিছিয়ে আছে একরাশ অন্ধকার হয়ে। প্রশস্ত ললাটে নীল টিপ আর দুহাত ভর্তি রিনঝিন করা কাঁচের চুড়িগুলো যখন এক সুরে বেজে উঠছে;তিহুর বুকের ভেতরটায় বসন্তের মাতাল বাতাসের মতো চঞ্চল হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে।
শ্রবণের ঝুমকাজোড়ার সামান্য আন্দোলনে হীরের দ্যুতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। যেন কোন স্বর্গীয় অপ্সরা ভুলবশত নেমে এসেছে ধরণীর বুকে।সাজ শেষ করে তিহু যখন পেন্টহাউসের বিশাল ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল, তখনো মনের কোনে বিদ্যমান একটাই প্রশ্ন
—কোথায় যেতে হবে তাকে? নীল কি তবে নিচে অপেক্ষা করছে?
সহসা এক প্রচণ্ড শব্দের গর্জনে ভাবতন্দ্রা ছুটলো তার নীলিমার বক্ষে বিদীর্ণ করে যেন শান্ত হাওয়ারা ঝড়ো রুপে এগিয়ে আসছে। তিহু ওপরের দিকে চেয়ে দেখল, একটা সুদৃশ্য হেলিকপ্টার ধীরে ধীরে অবতরণ করছে পেন্টহাউসের হেলিপ্যাডে।বাতাসের উদ্দাম ঝাপটায় তিহুর অবাধ্য কেশরাজ মুখে এসে পড়েছে অবাধ্য প্রেমিকের ন্যায়, শাড়ির আঁচল উড়ছে পতপত ছন্দে।
হেলিকপ্টারটি স্থির হতেই ভিতর থেকে এক মার্জিত রুচিসম্পন্ন নারী পাইলট বের হলেন, তিহুকে দেখে ঈষৎ হাস্যে সম্ভাষণ জানিয়ে বললেন,,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
—’গুড মর্নিং, মিস তিহু। মিস্টার নীল হ্যাজ সেন্ট মি টু এসকর্ট ইউ। ইওর ডেস্টিনেশন ইজ অ্যাওয়েটিং ইটস কুইন। প্লিজ, স্টেপ ইন।
তিহু বুঝল, এ সবই তার নেতা সাহেবের সূক্ষ্ম কারসাজি। লাজুক হেসে সে পা বাড়াল সেই উড়ন্ত যানের দিকে।
হেলিকপ্টারটা যখন মাটি ছেড়ে শূন্যে ভাসল, প্রকাণ্ড নিউইয়র্ক শহরটাকে ছোট্ট খেলনা রুপি বোধ হতে লাগলো। কিন্তু মুহূর্ত কয়েকের মধ্যেই সেই যান্ত্রিক নগরীর ধূলিধূসর ছবি মুছে গিয়ে উদ্ভাসিত হইল এক দিগন্তবিস্তৃত শ্যামলিমার সমারোহ। সমস্ত নগরীটাই যেন এক ক্ষুদ্র জনপদে পরিণত হইয়াছে।তিহুর বিস্মিত আখি জোড়া প্রকৃতির সেই অপরূপ সজ্জার দিকে চেয়ে রইলো নিষ্পলক।
খানিক বাদে যখন হেলিকপ্টারটি মন্থর গতিতে নিচে নামতে শুরু করল, তিহুর দুই চক্ষু বিস্ময়ে স্থাণু হয়ে গেল।
এটি কোনো সাধারণ উদ্যান নয়, এ যেন পৃথিবীর বুকে এক টুকরো স্বর্গ। চারিপার্শ্বে কেবল গোলাপ আর গোলাপের অন্তহীন লহরী। লাল, সাদা, হলুদ আর গোলাপি রঙের সেই পুষ্পসমুদ্র যেখানেই চোখ যায়; সেগুলো যেন দিগন্তের ওপারে গিয়ে মিশেছে। মধ্যস্থলে এক বিশাল গোলাকার চত্বর—মসৃণ সবুজ গালিচার ন্যায় ঘাস। আকাশযানটি যখন সেই তৃণভূমির ওপর অবতীর্ণ হলো, তিহুর হৃদস্পন্দন যেন নিজের কর্ণের কাছেই স্পষ্ট ধ্বনিত হতে শুনলো।
হেলিকপ্টার থেকে নামতেই এক অদ্ভুত সৌরভ তার ইন্দ্রিয়ে দোলা দিয়ে গেল। চরাচর নিস্তব্ধ, কেবল মলয় বাতাসের মৃদু শিরশিরানি। হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতার বুক চিড়ে ভেসে আসল গিটারের সেই চিরচেনা টুংটাং মূর্ছনা। কোনো এক মায়াবী আকর্ষণে তিহুর দৃষ্টি সেই সুরের অভিমুখে ধাবিত তৎক্ষণাৎ।
গোলাপকুঞ্জের অন্তরাল ছাপিয়ে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে নীলের অবয়ব।তপ্ত রোদে এক চিলতে প্রশান্তির ন্যায় তার অঙ্গ আজ শোভিত পাচ্ছে একটি রয়্যাল ব্লু রঙের প্রিমিয়াম সিল্কের পাঞ্জাবিতে। পাঞ্জাবির ওপর এক গভীর কালো রঙের মখমলি জহর কোট।চোখে সেই চিরচেনা নেশাক্ত দৃষ্টি। গিটারের তারে আঙুল বুলিয়ে হুট করেই নীল গেয়ে উঠল,,
🎶যখন খোলা চুলে…
হয়তো মনের ভুলে….
তাকাতো সে অবহেলে দুচোখ মেলে…
হাজার কবিতা বেকার সবিতা…
তার কথা কেউ বলে না….
সেই প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা…🎶
গানের প্রতিটা কলি যেন তিহুর হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধছে। নীল গাইতে গাইতে মন্থর পায়ে এগিয়ে এলেন তিহুর দিকে। তিহু তখন পুতুলের ন্যায় দাঁড়িয়ে। নীল তার ঠিক সামনে এসে এক পা ভাঁজ করে হাঁটু গেড়ে বসল। গীটারটা পাশে রেখে পকেট থেকে বের করে আনলো নীল হীরের এক আংটিটি।
ঠিক সেই মুহূর্তেই আন্তরিক হতে শুরু হলো এক অদ্ভুত বর্ষণ। না,জলবর্ষণ নয়; এ এক উন্মাদ প্রেমিকের সৃষ্ট পুষ্পবর্ষণ।ওপর থেকে হেলিকপ্টার দিয়ে ঝরছে শত সহস্র গোলাপের পাপড়ি। লাল-গোলাপি পাপড়িতে ঢেকে যাচ্ছে তিহুর নীল শাড়ি, ওর চিবুক আর চারপাশের ঘাস।
নীল আংটিটি তিহুর সম্মুখে ধরে প্রগাঢ় কণ্ঠে বলল,,
—’আমার অগোছালো শহরের রাজত্ব তোমার নামে লিখে দিতে চাই অর্কিড। থাকবে তো এই পলিটিশিয়ানের নীলাঞ্জনা হয়ে আমার তার অবিন্যস্ত প্রেমের নীলকাব্যের শেষ পাতা পর্যন্ত?
নীলের কণ্ঠস্বর যখন তিহুর কানে পৌঁছাল, তখন ওর চারপাশের জগতটা যেন এক লহমায় স্থির হয়ে গেল। ওপর থেকে ঝরে পড়া গোলাপের পাঁপড়িগুলো তিহুর চিবুক ছুঁয়ে গড়িয়ে পড়ছে,ঠিক যেমন ওর চোখের কোণ বেয়ে নামছে অবাধ্য নোনা জল। নব কিশলয়ের ন্যায় কাঁপছে তিহুর ওষ্টাধর,কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। বুক ফেটে কান্না আসছে ওর।তবে এ কান্না দুঃখের নয়; এ প্রাপ্তির পূর্ণতায় হাহাকার করে ওঠা এক আনন্দ।
বহু কষ্টে মাথা ঝাঁকিয়ে অস্ফুট স্বরে সে উচ্চারণ করল,,–‘হুম;জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আপনার সঙ্গে থাকতে চাই মিস্টার পলিটিশিয়ান। জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটাও আপনার বক্ষদেশ থেকেই ত্যাগ করতে চাই।
তিহুর অকপটে বলা স্বীকারোক্তিতে নীলের চোখের কার্নিশ বেয়েও ঝরলো এক ফোঁটা আনন্দ অশ্রু, যেখানে মিশে আছে একরাশ পূর্ণতা।
রাত তখন ১২টা কি একটা। গভীর রাতেও ঘুম না আসায় বিরক্ত লাগছে বেশ, বিছানা ছেড়ে উঠে বসলো রাফা। গলাটাও বেশ শুকিয়ে এসেছে। বেড সাইড টেবিল হাতরে দেখল আজ পানির পাত্রটা অনুপস্থিত তাই ভাবলো নিচতলায় যাবে একবার পানি আনতে। যেই ভাবনা সেই কাজ বিরক্তি নিয়ে বিছানা ছাড়ল রাফা। সারা বাড়ি নিঝুম অন্ধকারে ডুবে আছে। কেবল করিডোর দিয়ে টিমটিমে কিছু নাইট ল্যাম্পের আলো আবছা এক মায়া তৈরি করেছে। রাফা পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে নিচতলায় নেমে এল। কিচেনের দরজার কাছে আসতেই বুকটা কেমন ছ্যাঁৎ করে উঠল তার। অন্ধকার কিচেনের ভেতর থেকে কেমন একটা খসখস শব্দ ভেসে আসছে।
রাফা ভাবল, কোনো চোর-টোর ঢুকল না তো? সাহসে ভর দিয়ে সে কিচেনে পা রাখল। দেওয়ালের সুইচবোর্ডটা হাতড়াতে যাবে, ঠিক তখনই টের পেল তার পেছনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে শরীরের র*ক্ত হিম হয়ে এল রাফার। সে সর্বশক্তিতে চিৎকার দিতে যাবে, কিন্তু শব্দটা গলা দিয়ে বের হওয়ার আগেই এক জোড়া শক্ত এবং শীতল হাতের তালু তার মুখটা সজোরে চেপে ধরল।
পরক্ষণেই এক প্রবল টানে তাকে পেছনের দেয়ালের সাথে চেপে ধরল সেই আগন্তুক। অন্ধকারে রাফা শুধু তার দেহের ভারী গঠন আর তপ্ত নিঃশ্বাস অনুভব করতে পারছে। আতঙ্কে রাফার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এল, হৃৎপিণ্ডটা যেন ছিঁ*ড়ে বেরিয়ে আসবে।
—’উঁশশশ!
অন্ধকারে খুব পরিচিত একটা কণ্ঠস্বর কানে বাজতেই রাফা চমকে চোখ মেলল। পরক্ষণেই পাশে থাকা অন্য হাতটি দিয়ে আগন্তুক কিচেনের আলোটা জ্বালিয়ে দিল। তীব্র আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল রাফার। দৃষ্টি সইতেই সে দেখল, সামনে আর কেউ নয়,একগাল দুষ্টু হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিহিত।
রাফা রাগে-ক্ষোভে নিহিতের হাতটা নিজের মুখ থেকে সরিয়ে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
—’তুমি! তোমার কাণ্ডজ্ঞান বলে কি কিছু নেই? আমি তো হার্ট অ্যাটাক করতাম!
নিহিত একটুও না দমে বরং আলগোছে রাফার মুখের সামনে ঝুঁকে এল। তার চোখেমুখে তখন রাজ্যের কৌতুক। সে ফিসফিস করে বলল,,
—’বাঘিনীর গর্জনের গল্প শুনেছি, কিন্তু তোর এই ইঁদুরের মতো ভয় পাওয়াটা না দেখলে বিশ্বাস করতাম না মিস রাফা।
রাফা চোখ রাঙিয়ে বলল,,
—’এই মাঝরাতে অন্ধকার রান্নাঘরে তুমি ভূত সেজে কী করছিলেন শুনি?
নিহিত একটা আপেল হাতে নিয়ে কামড় বসিয়ে ক্যাজুয়ালি বলল,,
—’খিদে পেয়েছিল। কিন্তু তোর এই রণচণ্ডী রূপ দেখে তো আমার পেটের ইঁদুরগুলোও এখন গর্তে ঢুকে পড়েছে। তা, তুই কেন এসেছিলি? আমাকে খুঁজতে?
রাফার মুখটা রাগে লাল হয়ে গেল। সে তোতলামি করে বলল,,
—’আপ-আপনাকে খুঁজতে যাব কেন? আমি পানি খেতে আসছিলাম। আপনি একটা আস্ত জং*লি!
নিহিত ভ্রু কুঁচকে বলল,,
—’জং*লি? বাহ্! বাঘিনী যে এখন গালিগালাজেও নেমেছে দেখছি। তা মিস রাফা, মাঝরাতে পানি খাওয়ার নাম করে রান্নাঘরে এসে পরপুরুষের গায়ের ওপর আছড়ে পড়াটা কোন দেশের ভদ্রতা, শুনি?
রাফা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,,
—’আছড়ে পড়েছি মানে? তুমিই তো আমাকে দেয়ালের সাথে সেঁটে ধরেছিলেন! আর পর পুরুষ মানে কি হ্যাঁ? কিমিন করতে চাইছো? তমিজ কি একদম ধুয়ে খেয়েছো?
নিহিত এক পা এগিয়ে এসে রাফাকে আবারও কোণঠাসা করে ফেলল। নিচু স্বরে বলল,,
—’তুই তো তুই-ই। ছোটবেলায় যখন আমার সাইকেলের চাকা লিক করে দিয়েছিলি, তখন তমিজ কোথায় ছিল? আর শোন, চোর ধরতে না পারিস, অন্তত আয়নায় নিজের চেহারাটা গিয়ে দেখ। ভয়ে তো মুখটা একদম চুন হয়ে গেছে।
রাফা সজোরে নিহিতকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে বলল,
—’তোমার মুখ দর্শন করার চেয়ে আয়নায় নিজের ভূত দেখা ঢের ভালো! সরুন আমার সামনে থেকে, পানি খেয়ে বাঁচি।
নিহিত গ্লাসটা টেবিলের ওপর একটু দূরে সরিয়ে রেখে বলল,,,
—’উঁহু, এত সহজে না। আগে বল, কাল সকালে আমার জন্য কফি বানিয়ে দিবি কি না? দিবি বললে তবেই পানি পাবি।
রাফা দাঁতে দাঁত চেপে উত্তর দিল,,—’কভি নেহি! আপনার মতো অসভ্য লোকের জন্য আমি কফি বানাব? তার চেয়ে বিষ ঢেলে দেওয়া ভালো।
নিহিত শব্দ করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে সারা রান্নাঘর যেন গমগম করে উঠল। সে রাফার খুব কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,,
—’বিষ দিলেও তোর হাত থেকেই খাব অর্ধাঙ্গিনী… ওহ থুড়ি, হবু বাঘিনী! এখন পানি খেয়ে তাড়াতাড়ি ঘরে গিয়ে ঘুমা, নাহলে ডার্ক সার্কেল পড়লে কাল সকালে বাচ্চাগুলো তোকে দেখে ভয় পাবে। ভাববে ড্রাকুলা এসেছে।
বলেই নিহিত হাতের আপেলটা নাচাতে নাচাতে শিস দিতে দিতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রাফা সেদিকে তাকিয়ে রাগে পা ঠুকল। এই লোকটা কি কোনোদিন মানুষ হবে না? রাগে গ্লাসটা তুলে এক ঢোক পানি খেয়ে সে বিড়বিড় করল,,
—’দাঁড়ান মিস্টার নিহিত, কালকের কফিতে যদি লবণের বন্যা না বইয়ে দিয়েছি, তবে আমার নামও রাফা না!
রাত্রি নিস্তব্ধ পরিবেশ।নিউইয়র্কের ব্যস্ত শহরের বুকে পেন্টহাউসের এই বিশাল ব্যালকনিটা যেন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। নিচে নাগরিক কোলাহল স্তিমিত হয়ে এসেছে, আর ওপরে কালো মখমলের মতো আকাশে জ্বলজ্বল করছে অগুনতি নক্ষত্র। আজ যেন আকাশের তারাদের সভা বসেছে।
ব্যালকেনির প্রশস্ত কাউচে নীল আর তিহু পাশাপাশি বসে আছে। তিহুর পরনে এখনো সেই নীল শাড়িটা, যা চাঁদের আলোয় এক মায়াবী রূপ ধারণ করেছে। তিহু এতক্ষণ এক মনে আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজের সৌন্দর্য উপভোগ করছিল;হঠাৎ নীল তিহুর ডান হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তিহুর নরম আঙুলগুলো একে একে উঁচিয়ে সে আকাশের দিকে ইশারা করল।
নীল খুব মনোযোগ দিয়ে তিহুর আঙুল ধরে ধরে আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের তারা গুনছে। সে ফিসফিস করে বলছে,,
—’এক, দুই, তিন… ওই যে দেখ অর্কিড,
তিহু কোনো উত্তর দিল না। সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তারাদের দেখছিল ঠিকই, কিন্তু নীলের ছোঁয়ায় তার পুরো অস্তিত্বে তখন এক অন্যরকম বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে। সে আলতো করে মাথা ঘুরিয়ে নীলের দিকে তাকাল। রুপালি জোছনা নীলের তীক্ষ্ণ নাসিকাপল্লভ আর চোয়ালের ভাঁজে এসে পড়েছে। তার সেই নেশাক্ত চোখ দুটো এখন তারাদের খোঁজে ব্যস্ত।
নীলের এমন শিশুসুলভ আচরণ তিহুকে অবাক করল। যে মানুষটা দিনের আলোয় গম্ভীর মেজাজের দুর্ধর্ষ এক পলিটিশিয়ান, রাতের এই নির্জনতায় সে কতটা সরল! নীলের গভীর মনোযোগ লক্ষ্য করে তিহুর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে অপলক দৃষ্টিতে নীলের মুখের দিকে চেয়ে রইল।
নীল হঠাৎ খেয়াল করল পাশে থাকা মানুষটি একদম নিশ্চুপ। সে আঙুল গোনা থামিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তিহুর চোখের দিকে তাকাতেই থমকে গেল। দুজনের দৃষ্টির অঘোষিত মিলন ঘটল সেই তারাময় আকাশের নিচে।নীল মৃদু হেসে বলল,,
—’কি দেখছেন ম্যাডাম?
তিহু লাজুক হাসল, নীলের হাতের ওপর নিজের হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলল,,
—’আকাশের তারা তো সবাই দেখে নেতা সাহেব, কিন্তু এই পলিটিশিয়ানের মনের ভেতরের আকাশটা দেখার ভাগ্য ক’জনের হয়?
নীল কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল। তারপর তিহুর হাতটা টেনে নিয়ে নিজের ঠোঁটের কাছে ছোঁয়াল। সেই স্পর্শে রাতের নিস্তব্ধতা যেন আরও গভীর হলো,তিহু চোখ বুঝলো আবেশে। এভাবেই অতিবাহিত হলেও মুহূর্ত খানেক।হঠাৎ তিহু নীলের কাঁধে মাথা রাখলো;নির্জনতার বুক চিরে মুগ্ধ কন্ঠে বলল,,
প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫৬
—’জানেন মিস্টার পলিটিশিয়ান? প্রিন্সেস ডায়নার একটা উক্তি ছিল, আমি যাকে ভালবেসে ছিলাম সেই ব্যতীত পৃথিবীর সকলে আমাকে ভালোবেসেছিল। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সেটা সম্পূর্ণ বিপরীত কেন জানেন?
নীল ব্যগ্র দৃষ্টিতে তাকালো তিহুর দিকে গভীর কন্ঠে বলল,,
—’কেন?
তিহু মুচকি হাসলো খানিক, প্রাণভরে শ্বাস নিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে নীলের পানে চেয়ে বলল,,
—’কারণ আমি যাকে ভালবেসে ছিলাম, সে পৃথিবীর সমস্ত ভালবাসা কুড়িয়ে এনে আমাকে দিয়েছিল। সমগ্র ভালোবাসা সঞ্চয় করে শুধু আমাকেই নিজের করেছিল।
