প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৬২
নওরিন কবির তিশা
—‘তুমি কোথায় রাওফিন? পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে আমায়। আম্মু বলছে পছন্দ হলে আজকেই বিয়ে! আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে রাওফিন প্লিজ ডু সামথিং। প্লিজ!
তিহু আর নীলের বিয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই মাহার জীবনে যেন অমাবস্যার কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে। এক সপ্তাহও পার হতে পারল না, এর মধ্যেই বাবা পাত্রপক্ষ হাজির করেছেন। মাহার ঘরে সাজসজ্জার ধুম পড়েছে, অথচ তার বুকের ভেতরটায় যেন কেউ তপ্ত লোহার শি”ক দিয়ে বিঁ*ধিয়ে দিচ্ছে।
মাহার উপলব্ধি কি তবে সত্যি কাজ করছে? সে লক্ষ্য করেছিল যে তিহুদের হলুদের পরবর্তী দিন থেকে বাবার আচরণে কিঞ্চিৎ পরিবর্তন মিলছিল। তবে কি সেই সন্দেহের রেশ ধরেই বাবা এত তড়িঘড়ি বিয়ের আয়োজন করল?
মাহা রীতিমতো প্যানিক অ্যাটাক শুরু হয়েছে, কম্পমান হাতে প্রকম্পিত কন্ঠে ঢোক নিলে সে আবার বলল,,
—-‘তুমি কি শুনতে পাচ্ছ?
এখনো নির্বিকার অপর প্রান্তের মানবটি। মাহার রীতিমতো নিজেকে পাগল পাগল লাগতে শুরু করেছে সে আবারও বলল,,
—-‘তুমি কিছু বলছ না কেন? আমি কি তবে অন্য কারো হয়ে যাব? প্লিজ স্পিকআপ রাওফিন প্লিজ!
এতক্ষণ যাবৎ নিশ্চুপ রাওফিন হুট করেই ফোনের ওপাশ থেকে দুষ্টুমি ভরা কন্ঠে বলল,,
—‘অনেকক্ষণ ওয়েট যাবৎ করছি ম্যাডাম, আপনি কি আদৌ আসবেন, নাকি আমরা এভাবেই বসে থাকব?
মাহা থমকে গেল। চোখের পানি মুছতে ভুলে গিয়ে সে বিড়বিড় করল,,
—‘মানে? তুমি কোথায়?
রাওফিন ওপাশ থেকে হেসে দিয়ে বলল,
—-‘আমিই উইথ ফ্যামিলি আপনাদের ড্রয়িংরুমে বসে আছি। আপনার হবু বর হিসেবে। এখন কি আসবেন, নাকি আমরা মিষ্টি পানি এগুলোই খেতে থাকবো।
নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না মাহা। নিশ্চিত হতে সে ফের বলল,,—‘সিরিয়াসলি রাওফিন?
রাওফিন এক গাল হেসে জবাব দিল,,—-‘জ্বি ম্যাডাম!
রাওফিনের কথাগুলো মাহার কানে যেন কোনো স্বর্গীয় সুরের মতো আছড়ে পড়ল। এক মুহূর্তের জন্য তার হৃৎস্পন্দন থেমে গেল, পরক্ষণেই তা দ্বিগুণ বেগে ছুটতে শুরু করল। চোখের কোণে জমে থাকা নোনা জলগুলো গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল, তবে এবার আর তাতে বিচ্ছেদের দহন নেই, আছে প্রাপ্তির পরম প্রশান্তি। মাহা অস্ফুট স্বরে কি যেন বিড়বিড় করল।
অতঃপর ফোনটা বিছানায় ছুড়ে দিয়ে সে দ্রুত পায়ে আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কাঁপাকাঁপা হাতে তুলে নিল মেঝেতে পড়ে থাকা মায়ের দেওয়া শাড়িটা। কিছুক্ষণ আগেই অভিমানে, রাগে যে শাড়িটা সে অবহেলায় ছুড়ে ফেলেছিল, দৌড়ে গিয়ে শাড়িটা তুলেই বুকের মাঝে জাপটে ধরল সে। রেশমি সুতোর প্রতিটি ভাঁজে যেন সে রাওফিনের সান্নিধ্য আর ভালোবাসার ঘ্রাণ খুঁজে পাচ্ছে। মায়ার এক গভীর আবেশে তার চোখ বুজে এল।
মিনিট কয়েকের মধ্যেই মাহা নিজেকে গুছিয়ে নিল। সেই শাড়িটা পরে যখন সে আয়নার সামনে দাঁড়াল, দর্পণে ফুটে ওঠা নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে সে নিজেই থমকে গেল। মাহার ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখটা এখন অজানা আভায় উজ্জ্বল। চোখের কাজল যেন আজ একটু বেশিই কালো দেখাচ্ছে। কপালে ছোট একটা টিপ আর ঠোঁটে হালকা হাসির রেখা।
ঘর থেকে বেরিয়ে ধীর পায়ে ড্রয়িংরুমের দিকে এগোতে লাগল মাহা। প্রতিটি পদক্ষেপে তার নুপুরের নিক্বণ যেন এক নব সূচনার গান গাইছে। ড্রয়িংরুমে ঢোকা মাত্রই সবার দৃষ্টি তার ওপর নিবদ্ধ হলো। সোফায় বসে থাকা রাওফিনের চোখের কোণে তখন দুষ্টুমির আড়ালে একরাশ মুগ্ধতা। সবাইকে সালাম দিয়ে মাহা মাথা নিচু করে বসল, কিন্তু তার মনের কোণে তখন খুশির জোয়ার। যে ঘরটা একটু আগেও তার কাছে খাঁচার মতো মনে হচ্ছিল, এখন সেখানেই ভালোবাসার বসন্ত নেমে এসেছে।
কথাবার্তা সম্পন্ন। হক ম্যানশন এর সকলের আর মাহার বাবা মিনহাজ আহমেদের সম্মতিক্রমে বিয়ে আজকেই হবে। যেহেতু মাহার পরিবাররা ঐতিহ্যগতভাবে মেয়েদের বড় করে বিয়ে দেওয়া পছন্দ করেন না। তাদের পারিবারিক রীতি নিয়ম অনুসারে তাই ছোটখাটো ঘরোয়া অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আজকেই বিবাহ সম্পন্ন হবে। অতঃপর মাহা চিরস্থায়ী বাসিন্দা হবে হক ম্যানশন এর।
বড় বউ সম্মানে খ্যাত হবে।
ঘন্টাখানেকের মাঝে পুরো ড্রয়িং রুম টা ঢাকা পড়েছে নব উৎসবের আমেজে। চারিদিকে আতরের সুবাস আর মৃদু গুঞ্জনের কোলাহল। মাহার চাচারাও আজ বেশ প্রসন্ন। মাহার বড় চাচা গম্ভীর গলায় রাওফিনের বাবার সাথে আলাপ জমাচ্ছেন, আর ছোট চাচা ব্যস্ত হয়ে তদারকি করছেন যাতে মেহমানদের আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি না হয়।
ড্রয়িংরুমের এক কোণে মাহা মাথা নিচু করে বসে আছে। পরনে সেই লাল শাড়ির পরিবর্তে শুভ্র রঙা লেহেঙ্গা। যেটা কিছুদিন আগেই তিহুর বিয়ে উপলক্ষে রাওফিন তাকে গিফট করেছিল। তবে বিয়ের আয়োজন ৯০ শতকের মত হওয়ায় লেহেঙ্গাটা আর পড়া হয়ে ওঠেনি। তাই নিজের জীবনের শুভ সূচনায়;পরিণয় লগ্নে সে নিজেকে আবৃত করেছে সেই লেহেঙ্গাটাতেই। সাজগোজ যৎসামান্য। শ্যামাঙ্গিনী মাহা এক অভূতপূর্ব সৌন্দর্যের অধিকারী তাই লোক দেখানো সাজগোজ এর তত একটা প্রয়োজন হয় না তার।
তাই আজকেও বড্ড সাদামাটা সে। তবে এত কিছুর মাঝেও মনের নিভৃত কোনটা বড্ড শূন্য; যার জন্য এত কিছু যার সহায়তায় নিজের রাওফিনকে ফিরে পাওয়া সেই প্রাণসখীই আজ অনুপস্থিত। তবে শূন্যতার পাশাপাশি এক সংজ্ঞাহীন ভালো লাগাও কাজ করছে মাহার কেননা তিহু নিজের নেতা সাহেবের সাথে আছে।
বর্তমান তার দুই চাচি আর হক ম্যানশনের মহিলারা মিলে মাহাকে ঘিরে ধরেছে। ফিসফাস আর হাসাহাসিতে মাহার গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠছে বারবার।হুট করেই ড্রয়িংরুমে শান্ত নীরবতা নেমে এল। কাজী সাহেব খাতা খুলে বসলেন। রাওফিন সোফার ওপাশে ভাই আর বন্ধুদের সাথে বসে থাকলেও, তার নজরটা বারবার এসে থামছে মাহার নতজানু অবয়বে। সাজ্জাদ আড়চোখে রাওফিনকে খোঁচা দিয়ে মুচকি হাসল, যেন বলতে চাইলো,
—‘এবার তো হলো, এবার একটু শান্ত হ!
কাজী সাহেব গম্ভীর কণ্ঠে মাহার বাবার নাম আর বংশপরিচয় উচ্চারণ করে বিয়ের বয়ান শুরু করলেন। মিনহাজ আহমেদ এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। তিনি জানতেন, রাওফিনের মতো ছেলে মাহার জন্য যোগ্য। তাই হকদের এক কথাতেই রাজি হয়েছেন তিনি। মাহার মা মুবাশশিরা বেগম রাওফিন যাহার কৈশোরকালীন সম্পর্ক সমন্ধে অবগত ছিলেন।
তাই তিনিও সম্মত মেয়েদের সুখে।আর মাহা?সে তো লজ্জা-আনন্দ-বিস্ময়ে নিজের নখ দিয়ে শাড়ির আঁচলটা মুচড়ে ধরছে। হৃদস্পন্দনটা যেন গলার কাছে এসে ধকধক করছে তার।মনে হচ্ছে এ যেনো এক দিবাস্বপ্ন। ঘোর ভাঙতেই ভেঙে যাবে তা।
—‘মা মাহা, তিন লক্ষ টাকা দেনমোহর ধার্যে, মাহমুদুল হক রাওফিনের সাথে কি তোমার এই বিয়ে কবুল?
কাজী সাহেবের প্রশ্নের সাথে সাথে পুরো ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মাহার মনে হলো সময়টা যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। সে একবার চোখ তুলে তাকাল। ভিড়ের আড়ালে রাওফিনের সেই চিরচেনা আশ্বস্ত করা দৃষ্টি। মাহার ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপল। মনের নিভৃত কোন জানান দিচ্ছে এখানে যদি তিহু থাকতো তাহলে হয়তো কবুল বলাটা আর একটু সহজতর হতো তার পক্ষে। কিন্তু কি করার? কিছুক্ষণ বাদে খুব মৃদু, কিন্তু স্পষ্ট স্বরে সে বলে উঠল,,
—‘আলহামদুলিল্লাহ, কবুল!
মুহূর্তের মধ্যেই ঘরটা ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল। মাহা-রাওফিনের বাবা-মা আর চাচা চাচি রা মোনাজাত করলেন। বড় বড় পিরিচে করে মিষ্টি আর তবারক বিলানো শুরু হলো। চাচাতো ভাইবোনদের মাঝে তখন সেলফি তোলার ধুম পড়ে গেছে ইতিমধ্যেই। সারা,পিহু,তানহা, রাফা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে নববধূর সাথে সেলফি সেলফি তুলতে।
বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার কিছুক্ষণ পর যখন রাওফিনকে মাহার পাশে এসে বসার সুযোগ করে দেওয়া হলো, রাওফিন নিচু স্বরে শুধু বলল,,
—‘বললাম না ম্যাডাম, আপনাকে অন্য কারো হতে দেওয়াটা আমার সিলেবাসে নেই!
মাহা কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু চোখের এক কোণে জমে থাকা আনন্দাশ্রুটা নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ল তার হাতের ওপর। আজ থেকে সে শুধু মিনহাজ আহমেদের আদুরে মেয়ে নয়, সে হক ম্যানশনের বড় বউ। তার জীবনের প্রথম ভালবাসার মানুষটার সহধর্মিনী। জীবনের প্রনয়ের প্রথম পুরুষের অর্ধাঙ্গিনী।
স্নিগ্ধ দুপুরে ঘরের কাঁচের দেয়াল ভেদিয়ে দৃশ্যমান সমুদ্রতটে থেমে থেমে আছড়ে পড়া জলকল্লোলির দিকে তাকালে হৃদয়ে উচাটন হয়।তিহু জানালায় হেলান দিয়ে সেই স্নিগ্ধ ঢেউগুলো উপভোগ করতে ব্যস্ত। নীল একটা দীর্ঘ শাওয়ার সেরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে বরাবরের ন্যায় নীল রঙের স্লিভলেস শার্টার হাতা ফোল্ড করতে তৎপর।
কিছুক্ষণ আগেই মাহা-রাওফিনের শুভ পরিণয়ের সাক্ষী হয়েছে তারা। ভার্চুয়াল ভাবেই। তাই গোসলে এত বিলম্ব হল তার। যাই হোক নীল বেরিয়েই প্রেয়সীনির দিকে চাইল। ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে পিছন থেকে তিহুকে জড়িয়ে তার চুলগুলো কাঁধের ওপর থেকে সরিয়ে উন্মুক্ত কাঁধে মুখ লুকালো।
নীলের প্রশস্ত বুকের উষ্ণতা পিঠে অনুভব করতেই তিহু একটু শিউরে উঠল। জানালার ওপাশে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি যেন আজ একটু বেশিই উত্তাল। তবে সেই উত্তালের চেয়েও বেশি তীব্রতা এখন তিহুর শরীরের প্রতি কোণায়। নীলের ভেজা চুলের চুয়ে পড়া জলের কয়েকটা ফোঁটা তিহুর ঘাড়ের ওপর পড়তেই সে আলতো করে চোখ বুজল।
নীল ওর চিবুকটা তিহুর কাঁধে ঠেকিয়ে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
—‘ভাবা যায়?বজ্জাত রাওফিনটাও শেষমেশ একসেপ্টেড হয়ে গেল!
তিহু মুচকি হাসল। নীলের হাতের ওপর নিজের হাত রেখে উত্তর দিল,
—‘সত্যিই। তবে ব্রাদার যেভাবে পুরো সিনটা হ্যান্ডেল করল, আই মাস্ট সে, লোকটার সাহস আছে। হাজার হলেও আপনার মতো নেতা সাহেবের বেস্ট ফ্রেন্ড তো, এমন সারপ্রাইজ না দিলে কি চলে?
নীল ওর কাঁধে মুখ ঘষে একটু দুষ্টুমির স্বরে বলল,,
—‘তাহলে নেতা সাহেবের ট্রিট পাওয়া উচিত না?
—-‘কেমন ট্রিট?
——‘বেশি কিছু না এই একটা উষ্ণ চুমু।
নীলের এমন আবদার তিহু তৎক্ষণাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে নীলের চোখের দিকে তাকাল,,
—-‘আপনি দিন দিন বড্ড নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছেন মিস্টার!
নীল এক গাল হেসে তিহুর আরও কাছে সরে এল। ওর কোমর জড়িয়ে ধরে খুব মোলায়েম স্বরে বলল,,
—–‘আপনার জন্যই হচ্ছি বেগম সাহেবা, না হলে আমাদের নৌমি কিভাবে আসবে?তাকে পৃথিবীতে আনার দায়িত্বটা তো আর অবহেলা করা যায় না, তাই না?
‘নৌমি’র নাম শুনেই তিহুর গাল দুটো মুহূর্তেই সদ্য ফোঁটা কৃষ্ণচূড়ার ন্যায় রক্তিম আভা ধারণ করল।লজ্জার এক তীব্র আবেশে সে দিশেহারা হয়ে পড়ল। কথা হারিয়ে সে আলগোছে নিজেকে নীলের বাহুবন্ধন থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত পায়ে দরজার দিকে হাঁটতে লাগল। নীল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ওর এই লাজুক পলায়ন দেখে। কিছুটা দূর যেতেই নীল পিছন থেকে হাঁক ছাড়ল,,
—‘আরে ম্যাডাম! একা একা কোথায় যাচ্ছেন?
তিহু থামল না, দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে একটু ঝাঁঝালো স্বরে উত্তর দিল,,
—-‘সমুদ্রের তীরে যাচ্ছি! ঘরে দম বন্ধ হয়ে আসছে আপনার নির্লজ্জ কথাবার্তায়। ওখানে গিয়ে অন্তত নোনা বাতাসে মাথাটা ঠান্ডা করা যাবে।
নীল হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তিহু তখন করিডোর দিয়ে হনহন করে সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছে। তাড়াহুড়ো করে হাঁটতে গিয়ে ওর গায়ের পাতলা ওড়নার আঁচলটা বারবার মেঝেতে লুটিয়ে পড়ছে। নীল দ্রুত পা চালিয়ে এগিয়ে এলো বরাবরের ন্যায় তিহুর ওড়নার আঁচলটা হাতে নিয়ে হাঁটা লাগালো তার পিছু পিছু।
—‘ আমি শেহেরাজ চৌধুরী আর ও আমার একমাত্র ছেলে শেহেতাজ চৌধুরী। আপনাদের মেয়ে সানজিদা আফরাকে পছন্দ করেছে।আমরা আপনাদের বাড়ির মেয়েকে আমাদের বাড়ির বউ করে নিয়ে যেতে চাই।
ঢাকার অন্যতম সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্ব শেহরাজ চৌধুরী। আর তার পরিবার থেকেই এমন আকস্মিক প্রস্তাবে কিছুটা হকচকিয়ে উঠলেন খান মহলে সকলে। প্রথমত শেহেরাজ চৌধুরীর উপস্থিতিতে কিছুটা বিস্মিত হলেও পরবর্তীতে তারা ভেবেছিল হয়তো ব্যবসায়িক কোনো কারণে এসেছেন তিনি।
কিন্তু কিছুক্ষণের মাঝে এই তার পারিবারিক উপস্থিতি আর এমন প্রস্তাবে রীতিমতো থ সকলে । ওয়ালিদ খান মির্জা সূচনার দিকে তাকালেন, অতঃপর ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে পরপর বললেন,,
—‘না মানে এমন হুট করে?
—-‘জ্বী, আমরা বুঝছি যে ব্যাপারটা বড্ড আকস্মিক হয়ে গেছে কিন্তু আর কিছুদিনের মাঝেই শেহেতাজ হায়ার এডুকেশনের জন্য প্যারিস চলে যাবে। এজন্য আমরা চাচ্ছিলাম বিয়েটা দিয়ে রাখতে। যে ওরা একে অপরকে পছন্দ করে তাই আমাদের আর কোন আপত্তি নেই বাদবাকি এখন আপনাদের উপর।
শেহেরাজ চৌধুরীর এমন সরাসরি প্রস্তাবে ড্রয়িংরুমে এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা নেমে এল। ওয়ালিদ খান মির্জা সূচনা আর বাড়ির অন্য বড়রা একে অপরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলেন। এমন সম্ভ্রান্ত পরিবারের পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসাটা যেমন সম্মানের, তেমনি এত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কিছুটা দ্বিধারও।
এদিকে মুন্নি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। তার হৃদস্পন্দন যেন আজ নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। কাল রাতের কথাগুলো একে একে তার মনের পর্দায় ভেসে উঠছে। শেহেতাজ ফোনে খুব স্বাভাবিক ভাবেই বলেছিল,,
—-‘আপনাকে আমি চাইলে এক্ষুনি বিয়ে করে নিতে পারি ম্যাডাম, একদম এই মুহূর্তেই!
মুন্নি তখন হেসেই কূল পাচ্ছিল না। ও ভেবেছিল শেহেতাজ হয়তো বরাবরের মতোই ঠাট্টায় লিপ্ত হয়েছে। তাই সেও পালটা জবাব দিয়ে বলেছিল,,
—–‘আচ্ছা! তাহলে কাল সকালের জন্য ওয়েট করে থেকো।
কিন্তু সেই হাসি-ঠাট্টার কথা যে শেহেতাজ এতটা সিরিয়াসলি নেবে এবং সকালেই সপরিবারে হাজির হবে, তা মুন্নির কল্পনাতীত ছিল। পর্দার আড়াল থেকে সে চোরের মতো একবার শেহেতাজের দিকে তাকাল। শেহেতাজ তখন খুব শান্ত ভঙ্গিতে বসে থাকলেও তার ঠোঁটের কোণে ঝুলে এক চিলতে বিজয়ী হাসি। মুন্নি তাকাতেই শেহেতাজ ভ্রু নাচালো, যেন মুন্নিকে মনে করিয়ে দিল,,
—‘কথা দিয়েছিলাম না?
মুন্নি লজ্জায় মুখ নামিয়ে নিল। তার মনের ভেতর এখন হাজারো প্রজাপতি ডানা ঝাপটাচ্ছে।এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে ওয়ালিদ খান হাসিমুখে বললেন,,
—‘শেহেরাজ সাহেব, আপনার মতো মানুষের প্রস্তাবে অমত করার প্রশ্নই আসে না। আর বাচ্চারা যখন একে অপরকে পছন্দ করে, তখন আমাদের আর কী বলার আছে? আমরা রাজি।
মুন্নির বাবা-মায়ের চোখেও তখন খুশির ঝিলিক। বাড়ির পরিবেশে মুহূর্তেই উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ল। ঠিক হলো আজই ঘরোয়াভাবে তাদের আংটি বদল হয়ে যাবে।
কিছুক্ষণের মাঝেই আংটি বদলের আয়োজন শুরু হলো। বাড়ির ছোটরা দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিল। মুন্নিকে সাজিয়ে-গুজিয়ে যখন ড্রয়িংরুমের মাঝখানে আনা হলো, শেহেতাজ মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল তার হবু ঘরণীর দিকে। আংটি পরানোর সময় শেহেতাজ মুন্নির কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,,
—‘কী ম্যাডাম, বলেছিলাম না সারপ্রাইজ দেব? বিশ্বাস হলো তো এবার?
মুন্নি কোনো উত্তর দিতে পারল না, শুধু আড়চোখে শেহেতাজের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসল। সেই হাসিতে ছিল আজীবনের জন্য জড়িয়ে থাকার মৌন সম্মতি। পুরো খান মহলে এখন আনন্দের জোয়ার, যেন একের পর এক বিচ্ছেদের মেঘ কেটে গিয়ে ভালোবাসার রোদ্দুর উঁকি দিচ্ছে সবার জীবনে।
সমুদ্রের নোনা বাতাস তিহুর কপালের ওপর লেপ্টে থাকা ক’গাছি চুল উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পায়ের নিচে ভেজা বালু আর সামনে দিগন্তজোড়া নীল জলরাশি। নীল ওর ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল, তিহুর ওড়নার আঁচলটা এখনো তার হাতে পরম যত্নে ধরা।তিহু সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে এক গভীর নিশ্বাস নিল। হুটহাট ডেকে বলল,,
—‘বেগম সাহেবা?
তিহু নীলের আদুরে সে ডাকে পিছন ঘুরলো, রিনরিনে কন্ঠে বলল,,—‘হুম?
নীল আলতো করে তিহুর কাঁধে হাত রাখল । অতঃপর ফিসফিস করে বলল,,
—‘মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে ওই দিগন্ত বিস্তৃত নীল নদের সব নীল ছেঁকে এনে তোমার নামেই বিলিয়ে দিই।
তিহু হাসল। এক মিষ্টি স্নিগ্ধ হাসি। নীলের চোখের দিকে তাকিয়ে সে যখন কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই তার হাতে থাকা ফোনটা কেঁপে উঠল বেশ জোরে। একটি মেসেজ।স্ক্রিনে চোখ পড়তেই তিহুর সারা শরীর যেন বিদ্যুৎবেগে কেঁপে উঠল। চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল, মুহূর্তেই মুখটা এক অলৌকিক আভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার। নীল তখনো সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আপন মনেই বলছিল,,
—-‘আচ্ছা আমরা না হয় সমুদ্রের তীরেই একটা ঘর বাঁধবো, সেখানে তুমি আমি আর আমাদের ছোট রাজকন্যটি থাকবে…; তারপর যখন ও বড় হয়ে যাবে তখন শুধু তুমি আর আমি….
নীল কথা শেষ করার আগেই খেয়াল করল তিহু একদম নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে কিঞ্চিৎ চিন্তায় ভ্রু কুঁচকে তিহুর দিকে ফিরে তাকাল। তিহুর চোখগুলো তখন টলমল করছে কানায় কানায়।
—‘কী হয়েছে নূর? কার মেসেজ? এভাবে কাঁপছ কেন?
তিহু ফোনটা বুকের কাছে জাপ্টে ধরল। ওর কণ্ঠস্বর বুজে আসছে, ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে। নীলের হাত দুটো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে কম্পিত কণ্ঠে সে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,,
—-‘মোবারকবাদ মিস্টার পলিটিশিয়ান! আপনি… আপনি বাবা হতে চলেছেন।
মুহূর্তেই নীলের গোটা দুনিয়া যেন থমকে গেল। সমুদ্রের গর্জানি, বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ—সবই যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল এক লহমায়। নীল নিজের শ্রবণেন্দ্রিয়কেই বিশ্বাস করতে পারছে না। তার চোখের সামনে যেন হাজারো নক্ষত্র একসাথে জ্বলে উঠছে। এক অদ্ভুত বিস্ময় আর বুক চিরে আসা আনন্দের জোয়ারে সে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।
—-‘নুর! তুমি… তুমি সত্যি বলছ?
তিহু আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সামান্য এগিয়ে এসেই নীলের বুকে মুখ লুকিয়ে হু হু করে কেঁদে উঠল সে। তবে আজ এ কান্না দুঃখের নয়, এ কান্না এক পরম প্রাপ্তির, এক নতুন অস্তিত্বের আগমনের বার্তা। নীল দুই হাতে তিহুকে আগলে ধরে বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। তার নিজের চোখেও তখন আনন্দাশ্রু। যে মানুষটা হাজারো মানুষের সামনে নির্ভীক ভাষণ দেয়, সেই দাপুটে নেতা আজ তার অর্ধাঙ্গিনীর সামনে একদম নিঃসাড়।
নীল আলতো করে তিহুকে নিজের থেকে কিছুটা সরিয়ে নিল। এরপর ধীর পায়ে নতজানু হয়ে বসল তিহুর সামনে। কম্পিত হাতে তিহুর পেটের ওপর কান পাতল সে। সেখানে এখনো কোনো নড়াচড়া নেই, হয়তো মাত্র একটা কোষের স্পন্দন, তবুও নীলের মনে হলো সে পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র সুরটা শুনতে পাচ্ছে। তার আদরের নৌমি’ কিংবা তার উত্তরসূরি তো সেখানেই বেড়ে উঠছে।
পেটের কাছে মুখ নামিয়ে নীল খুব নিচু স্বরে বিড়বিড় করল,,
—‘স্বাগতম ছোট্ট প্রাণ আমার অস্তিত্ব। বাবা তোমার অপেক্ষায় চাঁদ। তোমায় দেখার জন্য সে প্রহর গুনতে শুরু করে দিল আজ থেকেই।
নীল উঠে দাঁড়িয়ে তিহুর কপালে এক দীর্ঘ চুমু আঁকল। সাগরের নোনা বাতাস আর তাদের আনন্দাশ্রু মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল সেই স্নিগ্ধ দুপুরে। এভাবেই অতিক্রান্ত হলো মুহূর্ত খানেক অতঃপর নীল ধীরে ধীরে তাকালো ক্রন্দনরত তিহুর সুশ্রী মুখাবয়বে। দুই হাতের পরম আদুরে স্পর্শে তিহুর শেষ অশ্রু কণাটা মুছে দিতে দিতে বলল,,
—-‘কখনো কাঁদবেন না ম্যাডাম, আপনার জন্য জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তির স্বাদ উপলব্ধি করছি আমি, আর কখনো যেন ওই ডাগর দৃষ্টিতে কাজল ব্যতীত আর কিছুর অস্তিত্ব আমি না দেখি, সেটা সুখে হোক কিংবা দুখে!
বাবা হওয়ার সংবাদে নীল যেন পাগল হয়ে গিয়েছে। বিকেলের মধ্যেই সমুদ্রতীরের প্রায় প্রতিটি মিষ্টির দোকান সে আক্ষরিক অর্থেই ফাঁকা করে দিয়েছে। প্রত্যেকটা রিসোর্ট থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র শিল্পের দোকানগুলোও বাদ যায়নি তার মিষ্টি বিতরণের হাত থেকে। বিশাল বিশাল ঝুড়িতে করে মিষ্টি বিলানো হচ্ছে পথে পথে। অনাগত সন্তানকে ঘিরে নীলের এই স্বপ্নালু দৃষ্টি আর অপার ব্যাকুলতা দেখে আশপাশের পর্যটকরাও থমকে দাঁড়াচ্ছে।
আর তিহুর প্রতি তার যত্নের কথা তো বলার কিছুই নেই। এক দন্ড নড়ছে না সে তিহুর কাছ থেকে। সার্বক্ষণিক আগলে রাখছে তাকে। ফল আর খাদ্যদ্রব্যে ঘর বোঝাই করে ফেলেছে একদম। ঠিক হয়েছে কালকেই ঢাকা ব্যাক করবে তারা। আর সুখবরটা সেখানে সশরীরে উপস্থিত থেকেই দিবে সবাইকে।
তবে নীলের এমন অতিরিক্ত যত্নে মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে উঠেছে তিহু। সে বুঝছে না;সবে হয়তো সপ্তাহ খানেক অতিক্রম হয়েছে প্রেগন্যান্সির তার মাঝেই এত কেয়ারের কি আছে? সে কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলল,,,
—-‘আরে মিস্টার! এখন তো থামুন! লোকজন ন্যাকা ভাববে আমাকে,সবে হয়তো এক সপ্তাহ হয়েছে!
নীল সবে আপেলটা তে ছু’রি বসিয়েছে হঠাৎ তিহুর এমন কথায় সে বলল,,
—-’বউ আমার যত্নটাও আমি করছি, তাতে কে কি বললো কে কি ভাবল তাতে নীল খান ডোন্ট কেয়ার!
—–‘হ্যাঁ জানি তবে মাঝে মাঝে কেয়ার করা উচিত জনাব!
নীল আপেলটা সযত্নে কে’টে তিহুর উদ্দেশে আসতে আসতে বলল,—-‘সেসব আমি বুঝে নিব, তার আগে ফলটা খান তো ম্যাডাম।
তিহু নাক কুঁচকে বলল —-‘এখন খাব না।
—-‘খেয়ে নিন ম্যাডাম না হলে আমার নৌমি…!
তাকে কথার মাঝেই থামিয়ে দিয়ে তিহু বলল,,—-‘আপনি কেন সার্বক্ষণিক নৌমি-নৌমি করেন হ্যাঁ? দেখবেন আমার নুহাশ আসবে, আপনার নৌমি না!
—-‘নুহাশ মানে?
—-‘নুহাশ মানে আপনার আর আমার ফিউচার প্রিন্স। আর ও-ই আসবে দেখে নিয়েন!
নীল এতক্ষণে বুঝলো তিহুর কথার মর্মার্থ। সে হেসে বলল,,—-‘না আমার নৌমি আসবে!
তিহু মুখ ফুলিয়ে বলল, —-‘না,নুহাশ!
প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৬১
—-‘না নৌমি!
—-‘নুহাশ!
——‘না নৌমি !
—-‘নাআআআআ নুহাশ!
