Home প্রেমের নীলকাব্য প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৬১

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৬১

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৬১
নওরিন কবির তিশা

রজনী শেষের ওই শান্ত প্রহর; যখন রজনীগন্ধার ঘ্রাণ ফিকে হয়ে আসে আর ভৈরব নদের বুক চিরে এক ফালি নতুন আলো চরাচর রাঙিয়ে দেয়। আশ্বিনের উদীয়মান রবি যেন আজ কিছুটা লজ্জা মেখেই নীলিমার বুকে উদয় হয়েছে। জানালার ভারী পর্দা ভেদ করে এক চিলতে সোনালি আভা এসে পড়েছে বাসর ঘরের মেঝেতে, যেখানে গত রাতের অজস্র গোলাপের পাপড়িগুলো এখনও এক মায়াবী বিশৃঙ্খলার সাক্ষ্য দিচ্ছে।
ঘরের ভেতরের নিস্তব্ধতা যেন এক প্রশান্তির চাদরে মোড়ানো। বিছানার একপাশে অগোছালো হয়ে পড়ে আছে সেই লাল বেনারসি আর নীলের ধবধবে সাদা পাঞ্জাবিটা। ভোরের এই শীতল হাওয়ায় যখন প্রকৃতি জেগে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন এই চার দেয়ালের ভেতর সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে।

বিশাল বিছানার মধ্যিখানে দুজনে একাকার হয়ে মিশে আছে। নীলের বলিষ্ঠ অনাবৃত বক্ষদেশের ওপর মুখ গুঁজে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে তিহু। তার এক হাত নীলের কোমরে শক্ত করে জড়ানো, যেন ঘুমের ঘোরেও সে তার এই চিরচেনা আশ্রয়টুকু হারাতে চায় না। গত রাতের সবটুকু ক্লান্তি আর দীর্ঘ অপেক্ষার পর পাওয়া পূর্ণতা আজ তার শান্ত মুখশ্রীতে এক স্বর্গীয় লাবণ্য এনে দিয়েছে।
নীল অনেকক্ষণ আগেই জেগেছে। কিন্তু বুকের ওপর রাখা এই অতি মূল্যবান ভারটুকু সরাতে মন চাইছে না তার। সে আধবোজা চোখে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার নূর-এর দিকে। তিহুর অবিন্যস্ত কেশরাজ অবাধ্য হয়ে ছড়িয়ে আছে নীলের বুকে, যা বিঁধতেই এক অদ্ভুত শিরশিরানি অনুভূত হচ্ছে তার। নীল তার বাঁ হাতটা বাড়িয়ে তিহুর কানের লতি ঘেঁষে থাকা কয়েক গাছি চুল আলতো করে সরিয়ে দিল।
উষ্ণ নিঃশ্বাসের আদান-প্রদান চলছে দুজনের মাঝে। নীলের হাতের তপ্ত স্পর্শ পেতেই তিহু ঘুমের ঘোরেই একটু নড়েচড়ে বসল। নিজের মুখটা নীলের গলায় আরও গভীরভাবে ঘষল সে। তিহুর এই বুনো আহ্লাদ দেখে নীলের ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল। সে তিহুর স্নিগ্ধ ললাটে দীর্ঘকালীন এক মায়াবী চুম্বন এঁকে দিলো।
অতঃপর ফিসফিস করে তিহুর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,,

— ‘ম্যাডাম?
তিহু তন্দ্রাচ্ছন্ন গলায় আধো আধো সুরে উত্তর দিল,,—‘হুম?
নীল এবার একটু দুষ্টুমি করে তিহুর নাকে নিজের নাক ঘষল। অতঃপর নেশাক্ত ভারী কন্ঠে বলল,,—‘অলরাইট?
তিহু বুঝলো না নীলের এমন হঠাৎ প্রশ্নের কারণ, চট করে দৃষ্টি মেলে জিজ্ঞাসু কণ্ঠে সে বলল,,–‘মানে?
নীল দুষ্টু হেসে বলল,,—‘না কিছুদিন আগেই…!
তিহু বুঝলো নীল কি বলতে চাইছে। তাই বাকি কথা শেষ করার আগেই সে সর্বশক্তিতে চেপে ধরল নীলের মুখখানা। কথাগুলো মুখের মাঝে এই বন্দী হতে নীল ভ্রু উঁচিয়ে হাসলো। তিহু নাক ফুলিয়ে বলল,,
—‘আর একটা কথা যদি বলেছেন না..!
নীল ভ্রু উঁচিয়ে বুঝালো তাহলে কি?তিহু ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়েই বলল,,
—-‘তাহলে আমি..!
নীল মুখ থেকে তিহুর হাত সরিয়ে বলল,,—‘ঠোঁটে চুমু দিবে নাকি? দিতে পারো বিশ্বাস কর এটা একটা ভালো ট্রিক্স একবারই মধ্য হয়ে যাবে মুখ!

নীলের এমন ঠোঁটকাটা মার্কা কথায় তিহুর মস্তক জ্বলে উঠলো। দাঁতে দাঁত চেপে সে বলল,,—-‘ইউ্য্…!
নীল এবার হো হো করে হেসে উঠল। সেই হাসির দমক যেন সারা ঘরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। তিহু আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। গায়ের চাদরটা সামলে নিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে বিছানা ছেড়ে নামল সে। তার এলোমেলো পা ফেলার ভঙ্গি দেখে নীল বিছানায় আধশোয়া হয়ে কনুইয়ে ভর দিয়ে বেশ মজা লুটতে লাগল।
তিহু হনহনিয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতেই নীল পেছন থেকে গলায় একরাশ নেশা ঢেলে টেনে টেনে বলল,,
—‘আরে শোনো তো! নিজের বরের ওপর এত রাগ দেখালে চলে? যাওয়ার আগে একটা মিষ্টি চুমু খেয়েই যেতে পারো বউ, দিনটা না হয় দুজনেরই আরও ভালো কাটত!

নীলের এই নির্লজ্জ আবদারে তিহু দরজার সামনে থমকে দাঁড়াল। পেছনে ফিরে একবার আগুনের মতো দৃষ্টিতে তাকাল সে। তপ্ত লাল গাল আর চোখের সেই অভিমানী চাউনি দেখে নীল মোহাবিষ্টের ন্যায় চেয়ে রইল।
তিহু আর কথা বাড়িয়ে নিজের হার মানতে চাইল না। নীলের দিকে একটা কাল্পনিক চড় দেখিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলল, আর তারপরেই সজোরে দরজাটা লাগিয়ে দিল সে।
সেই শব্দের রেশটুকু যেন ঘরের নিস্তব্ধতায় মিশে গিয়ে নীলের মনে এক অদ্ভুত তৃপ্তির ছোঁয়া দিয়ে গেল। নীল হাসিমুখে আবারও বালিশে মাথা এলিয়ে দিয়ে ভাবল, এই মেয়েটার এই ‘বুনো আহ্লাদ’ আর ‘মিষ্টি রাগ’ সামলাতেই তার বাকিটা জীবন কেটে গেলে নেহাতই মন্দ হয় না।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরতের সেই সোনালি রোদে যেন বিষণ্নতার এক প্রলেপ পড়ল। বিদায়ের সুর সবসময়ই বড্ড করুণ হয়। কমিউনিটি সেন্টারের যে প্রাঙ্গণ কাল রাত পর্যন্ত উৎসবের রঙে রঙিন ছিল, আজ সেখানে এক নিঃশব্দ হাহাকার। নীল-তিহুর আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আজই তাদের ঢাকা ফেরার পালা।
সেন্টারের বিশাল বারান্দায় সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সবাই। নীলকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে তার দলবল,তবে নেতা সাহেবের সবটুকু মন পড়ে আছে নিজের অর্কিডের ওপর। তিহু তার মা আর কাকিমনিদের কাছে বিদায় নিতে গিয়ে বারবার চোখ মুছছে। এই কদিন এই ভৈরব নদের পাড়ে যেন এক টুকরো জান্নাত খুঁজে পেয়েছিল সে।তিহুর বাবা-চাচার অগচরে চোখ মুঁচছেন।বা ভালোবাসা এমনই বড্ড লুকায়িত তবে খাদধীন।
তারা হয়তো মায়েদের মত ভালোবাসার প্রকাশে ব্যর্থ তবে তাদের ভালোবাসাটা বড্ড গভীর।তিনি মেয়ের কন্দরত মুখের দিকে চেয়ে হুহু করে কেঁদে দিলেন নীলের হাতে মেয়েকে তুলে দিয়ে বললেন,

—‘মেয়েটা আমার বড্ড আহ্লাদি;খুব যত্ন করে বড় করছি ওকে বাবা।ও ভীষণ অভিমানী তবে মনটা বড্ড সরল।ওকে একটু আগলে রেখো।
নীল তিহুর হাত আঁকড়ে;নওশাদ হকের দিকে তাকিয়ে বিনম্র কন্ঠে বলল,,—‘মৃত্যুর আগ মুহূর্ত অবদি ওকে আগলে রাখবো ইনশাআল্লাহ্ বাবা।
নওশাদ হক নিশ্চিন্ত হাসলেন।
এদিকে নিহিত একপাশে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে রাফার দিকে তাকাচ্ছিল। রাফাও আজ অন্যদিনের মতো চঞ্চল নয়। তার চোখেমুখেও এক মেঘলা দিনের ছায়া। নিহিত পকেটে হাত দিয়ে রাফার খুব কাছে এসে দাঁড়াল।
—‘কী রে? তোর আসমান ভাইয়ার কথা ভেবে খুব মন খারাপ?
নিহিতের গলার সেই চিরচেনা খোঁচাটা আজ যেন রাফার মনে অন্যরকম বাজল। সে নিহিতের দিকে অভিমানী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,,,

—‘আপনার সব সময় হাসি-তামাশা ভালো লাগে? সবাই চলে যাচ্ছে, আপনার বুঝি একদম মন খারাপ হচ্ছে না?
নিহিত কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রাফার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিচু স্বরে বলল,,
— ‘মন খারাপ করার অধিকারটুকু তো আমায় দিসনি রাফা। তবে মনে রাখিস, আমি ঢাকা চলে গেলেই কিন্তু এই পাহারাদারকে হারাবি না।
রাফা এবার আর পালটা জবাব দিল না, শুধু মুখ নামিয়ে নখ দিয়ে শাড়ির আঁচল খুঁটতে লাগল। হঠাৎ কান্নাভেজা কন্ঠে বলল,,
—‘আমার না খুব খারাপ লাগছে নিহিত ভাই!
হঠাৎ রাফার এমন কণ্ঠে নিহিত কিছুটা চিন্তিত স্বরে বলল,,
—-‘কেন?
‌ রাফা ভেঁজা ঢোক গিলে বলল,,—–‘সবাই চলে যাচ্ছে!
নিহিত মলিন হেসে বলল,,—‘ওহ!
কিছুক্ষণ পর নিহিত হঠাৎ বলল,,—‘ সবাই চলে যাচ্ছে বলে খারাপ লাগছে।আমার জন্য লাগছে না?
রাফা নিহিতের কথা না বুঝে বলা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,,—‘ মানে?
‘কিছু না’— নিহিত আর কিছু না বলে প্রস্থান করলো সেখান থেকে।এগিয়ে গেলো গাড়ির দিকে।তবে বেচারি রাফা বুজলই না তার নিহিত ভাইয়ের হঠাৎ এমন পরিবর্তনের কারন।

একে একে ছাড়া হচ্ছে‌ গাড়িগুলো। পিচ ঢালা মসৃণ পথটার উপর দিয়ে। ধীরে ধীরে সেটি এগিয়ে যাচ্ছে শহর ছাড়িয়ে। পিছনে ফিরে যাচ্ছি কিছু না বলা কথা মান-অভিমানে একরাশ কাব্য কথা।

দিনগুলো কেটে যাচ্ছে অজানা আবেশে। দেখতে দেখতে দুইটি দিন পার। পুরাতন সংসারে তিহু ফের প্রবেশ করেছেন নববধূ রূপে। বুঝে নিয়েছে সমস্ত দায়িত্ব। পাক্কা গিন্নির মত এবার কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে সে। গুনে গুনে পালন করবে নিজের ওপর বর্তিত সকল দায়িত্ব। সেই সঙ্গে নিজের পড়াশোনা।
এক স্নিগ্ধ দুপুর। খান মহলের বিশাল ডাইনিং টেবিলে আজ রাজকীয় আয়োজন। নীলের মা মির্জা সূচনা নিজের হাতে সব রান্না তদারকি করেছেন। ধোঁয়া ওঠা বাসমতী চালের ভাত, ইলিশের দোপিয়াজা আর কাঁচকলা দিয়ে ইলিশের ঝোল—সবই নীলের ভীষণ প্রিয়। তবে নীল আজ খাবারের চেয়ে বেশি মগ্ন পাশের চেয়ারে বসে থাকা তার অর্কিডকে নিয়ে। তিহুও ব্যস্ত খাবার পরিবেশনায়।

ওয়ালিদ খান গম্ভীর মুখে খেতে বসলেও তার চোখ দুটো আজ তৃপ্তিতে ভরা। রাজনীতির ময়দানে তিনি যেমনই হোন না কেন, অন্দরমহলে তিনি আজ একজন সুখী বাবা। হঠাৎ গ্লাস থেকে পানি খেয়ে গলাটা পরিষ্কার করে নিলেন তিনি। টেবিলের সবাই মুহূর্তেই চুপ হয়ে গেল। ওয়ালিদ খান নীলের দিকে তাকিয়ে বললেন,,
— ‘নীল, অনেক তো হলো নেতাগিরি আর দৌড়ঝাঁপ। তবে এবার কিছুদিন নিজেদের একটু সময় দেওয়া দরকার।
নীল অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল। তিহুও হাত থামিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইল। ওয়ালিদ খান মৃদু হেসে বললেন,,,
— ‘আমি সব ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আগামীকাল ভোরে তোমরা কক্সবাজার যাচ্ছ। দিন সাতেক ওখানেই থাকবে।
শশুরের মুখে এমন সরাসরি ‘হানিমুন ট্রিপ’-এর কথা শুনে তিহুর ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তেই টকটকে লাল হয়ে গেল। সে লজ্জায় মাথা নিচু পায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।নীল এক গাল হেসে তিহুর দিকে একবার আড়চোখে তাকাল। তারপর বাবার দিকে ফিরে বেশ রসিকতা করে বলল,,

— ‘বাহ বাবা! আপনি তো দেখি একদম টাইমলি ছক্কা হাঁকালেন। আমি তো ভাবছিলাম বাট আপনি তো দেখি রুট ম্যাপও রেডি করে ফেলেছেন!
মির্জা সূচনা হেসে উঠে বললেন,, — ‘তোর বাবা সব পারে নীল। আর নুরাইন মা, তুই কিন্তু একদম না করবি না। অনেক ধকল গেছে তোদের ওপর দিয়ে। এই কটা দিন শুধু নিজেদের মতো করে কাটা।
—‘কিন্তু আম্মু কালই? একদিনের ভিতর কেমনে কি?
তিহুর‌ উদ্বিগ্নতা দেখে মুচকি হাসলো মির্জা সূচনা। ওয়ালিদ খান ও হেসে বললেন,,—‘চিন্তা করো না মা, সবকিছু ঠিকঠাক করেই আছে তোমাদের সকল প্রস্তুতি আগে থেকেই সম্পন্ন করে রেখেছেন তোমাদের আম্মা। এখন শুধু তোমরা কাল ভোরে রওনা হবে।
তিহু আর কিছু বলল না। ফের মাথা নুইয়ে নিল সেভাবেই।এদিকে ডাইনিং টেবিলে উপস্থিত সকলে মুখ চেপে হাসছে‌। বিশেষত নাহা তখন থেকেই পাশ থেকে তিহুকে একটানা খুঁটিয়েই চলেছে। নিহিতও কম নয় সরাসরি কিছু না বললেও বিভিন্ন শব্দের মাধ্যমে সে খোটাচ্ছে তিহুকে।

—‘কি ম্যাডাম যেতে চান কক্সবাজার?
বিকেলের ম্লান আলো তখন জানালার কার্নিশ ছুঁয়ে ঘরের ভেতর মায়া ছড়াচ্ছে। তিহু আলমারি খুলে গুছিয়ে নিচ্ছিল সমুদ্রযাত্রার প্রয়োজনীয় টুকিটাকি। মনের ভেতর এক অদ্ভুত ভালোলাগার দোলাচল—কক্সবাজার! লোনা জলের ঘ্রাণ আর বালুকাবেলায় আছড়ে পড়া ঢেউয়ের গর্জনের কথা ভেবেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন শিরশির করে উঠছে।
এমন সময় নিঃশব্দ পায়ে নীল ঘরে ঢুকল। তিহু টের পাওয়ার আগেই পিছন থেকে দুটো বলিষ্ঠ হাত তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। ঘাড়ের ওপর নীলের তপ্ত নিঃশ্বাস পড়তেই তিহু শিউরে উঠে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। নীলের সেই চেনা পারফিউমের ঘ্রাণে ম ম করছে চারপাশ।নীলের চিবুকটা তিহুর কাঁধে আলতো করে ঠেকিয়ে ফিসফিস করে করা সেই প্রশ্নে তিহুর হাতের কাজ থমকে গেল। গলার কাছে নীলের উষ্ণ নিঃশ্বাস এক অদ্ভুত শিহরণ জাগাচ্ছে সারা শরীরে। তিহু কয়েক সেকেন্ড চোখ বুজে সেই আবেশটুকু অনুভব করল, তারপর একটা গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলে নিল।
নীল ওর কানের লতি ছুঁয়ে আবারও আদুরে গলায় শুধাল,,

—‘কী ম্যাডাম বলছেন না যে?
তিহু এবার আলতো করে নীলের হাতের বাঁধন শিথিল করার চেষ্টা করে ঘুরে দাঁড়াল। তার দু-হাত নীলের চওড়া কাঁধে রেখে চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে একটা মায়াবী হাসি দিল;কিছুটা আদুরে স্পর্শ নীলের কলারটা ঠিক করতে করতে বলল,,
—-‘সাগর তো সবাই দেখতে যায় মিস্টার। কিন্তু সেই সাগরের ঢেউয়ের গর্জনের মাঝে‌‌ আপনার হৃদস্পন্দন শোনাটা হবে আমার জন্য স্পেশাল। আর যেতে চাই কি না জিজ্ঞেস করছেন? যেখানে আপনি আমার রুট ম্যাপ ঠিক করে দেন, সেখানে আমার অমত করার সাহস কি আছে কোনো?
নীল তিহুর কোমরে হাত রেখে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। দুজনের মাঝে এখন এক চিলতে বাতাসেরও জায়গা নেই। নীল বাঁকা হেসে বলল,,

—‘বাবাহ! ম্যাডাম তো দেখি আজ বেশ গুছিয়ে কথা বলছেন। তা এই অর্কিডের কি জানা আছে যে, কক্সবাজারের নির্জন বিচে চাঁদের আলোয় তাকে নিয়ে হাঁটার জন্য আমি কতটা উন্মুখ হয়ে আছি?
তিহু লাজুক হেসে নীলের বুকে মুখ লুকাল। নিচু স্বরে বলল,,
—‘জানি না। তবে এটুকু জানি…!
কথাটা অসমাপ্ত থাকায় নীল তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন করে বলল,,—‘কি জানেন?
তিহু হেসে বলল,,—‘কিছু না!
নীল এবার তিহুর চিবুক ধরে মুখটা উঁচিয়ে ধরল। তার দৃষ্টি আজ আরও গাঢ়, আরও গভীর। সে ফিসফিস করে বলল,,,
—-‘ওকে।জানতে হবে না। তবে সমুদ্রযাত্রার আগে একটা অ্যাডভান্স স্যুভেনিয়ার পাওয়া যেতে পারে না?
তিহু কিছু বলার আগেই নীল তার ঠোঁটের খুব কাছে মুখ নিয়ে এল। ঘরের সেই ম্লান আলোয় দুজনের ছায়া এক হয়ে মিশে গেল দেওয়ালে।

আকাশের কোণে তখন কেবল সিঁদুরে আভা ফুটেছে। ভোরের স্নিগ্ধ কুয়াশা ঢাকা ঢাকা শহরের বুক চিরে নীলের পাজেরো গাড়িটা যখন তেজগাঁও হেলিপ্যাডের সামনে এসে থামল, তখন ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় ভোর ছয়টা। আজ কোনো বিশাল গাড়িবহর নেই, নেই নেতাকর্মীদের ভিড়। শুধু নীল আর তার অর্কিড।
হেলিপ্যাডের বিশাল খোলা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আছে দুধসাদা রঙের একটি প্রাইভেট হেলিকপ্টার। পাখনাগুলো স্থির হয়ে থাকলেও তার বিস্তর উপস্থিতি তিহুর মনে এক অজানা শিহরণ জাগিয়ে তুলল। সে এর আগে প্লেনে চড়লেও হেলিকপ্টারে চড়ার অভিজ্ঞতা এই প্রথম।

নীল তিহুর হাত শক্ত করে ধরে এগিয়ে গেল। পাইলট নীলকে দেখে স্যালুট দিয়ে দরজা খুলে দিলেন। নীল আগে নিজে উঠে তিহুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। তিহু যখন নীলের হাত ধরে ভেতরে পা রাখল, দেখল ভেতরটা বেশ আরামদায়ক। চারটে মাত্র সিট, সামনে কাঁচের বিশাল প্যানোরামিক ভিউ।
পাইলট নির্দেশ দিলেন হেডফোনগুলো কানে লাগিয়ে নিতে। নীল নিজ হাতে তিহুর মাথায় নয়েজ-ক্যানসেলিং হেডফোন সেট করে দিয়ে চোখের ইশারায় অভয় দিল। ইঞ্জিন স্টার্ট নিতেই এক গম্ভীর গুঞ্জন শুরু হলো। আস্তে আস্তে পাখনাগুলো ঘুরতে শুরু করল দ্রুত গতিতে। তিহু ভয়ে চোখ বন্ধ করে নীলের হাতটা খামচে ধরল।
নীল তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,,

—‘ভয় পেও না নূর, চোখ খোলো। আকাশ থেকে পৃথিবীটা আজ শুধু তোমার জন্য সেজেছে।
তিহু ধীরে ধীরে চোখ মেলল। ততক্ষণে হেলিকপ্টারটি মাটি ছেড়ে উপরে উঠে গেছে। নিচ দিয়ে ঘরবাড়ি, গাছপালা আর আঁকাবাঁকা রাস্তাগুলো যেন খেলনার মতো ছোট হয়ে আসছে। যত উপরে উঠছে, ততোই পরিষ্কার হচ্ছে দিগন্ত। মেঘের ছোট ছোট ভেলাগুলো যেন জানালার কাঁচ ছুঁয়ে যেতে চাইছে।
হেলিকপ্টারটি যখন সমুদ্র উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন সূর্য পুরোপুরি আকাশে। নিচ দিয়ে বয়ে চলা নদীগুলো যেন রূপালি ফিতার মতো চিকচিক করছে। নীল জানালার বাইরে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল,,
—‘ঐ দেখো নূর, সামনেই বঙ্গোপসাগর।
তিহু মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইল। আকাশ আর সাগরের নীল যেখানে একাকার হয়ে গেছে, সেই নীলিমার বুক চিরে তারা এগিয়ে যাচ্ছে এক নতুন গন্তব্যে। নীলের হাতের উষ্ণ স্পর্শ আর এই মেঘের ওপর দিয়ে ওড়ার অনুভূতি।

হেমন্তের মিষ্টি রোদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্ত চত্বর আজ উৎসবের রঙে রঙিন। চারদিকে বাহারি পিঠার ঘ্রাণ আর ছাত্র-ছাত্রীদের কলকাকলিতে মুখরিত ক্যাম্পাস। লাল ইটের দালানগুলোর মাঝে তৈরি করা হয়েছে এক বিশাল মঞ্চ। উৎসবের আমেজে সবাই যখন শাড়ি-পাঞ্জাবিতে সেজেছে, মুন্নি সেখানে একদম ব্যতিক্রম। মা একপ্রকার জোর করেই তাকে পাঠিয়েছে, তাই সে সাদামাটা পোশাকেই এক কোণে মুখ ভার করে বসে আছে। তার দুচোখে রাজ্যের বিরক্তি।
মঞ্চে তখন একের পর এক পারফরম্যান্স চলছে। হঠাৎ মাইকে ঘোষণা হলো,,
—-‘এবার মঞ্চে আসছেন আপনাদের সবার প্রিয় ছাত্রনেতা, আমাদের সবার ভালোবাসার মানুষ শেহেতাজ চৌধুরী!
মুহূর্তের মধ্যে পুরো প্রাঙ্গণ যেন ফেটে পড়ল। মেয়েদের গগণবিদারী চিৎকার আর করতালি শুনে মুন্নির মেজাজটা আরও তিরিক্ষি হয়ে উঠল। সে আড়চোখে দেখল, শেহেতাজ আজ ভিন্ন রূপে মঞ্চে আসীন হয়েছে। পাঞ্জাবির পরিবর্তে তার দেহ আবৃত স্লিভলেস শার্টে।
তবে হঠাৎ এই মুন্নির হৃদয়ের সুপ্ত আগ্নেয়গিরিকে জাগ্রত করলো চারপাশের মেয়েদের চোখের সেই মোহাবিষ্ট চাউনি। কেউ নাম ধরে ডাকছে, কেউ বা ইশারায় হৃদপিণ্ড দেখাচ্ছে।মুন্নি বিড়বিড় করে বলল,

—‘ডিসগাস্টিং; মেয়েগুলো এত বেহায়া‌ কেন?
হৃদয়ের অজানা আকুলতার কারণ জানা নেই মুন্নি। সে শুধু জানে, শেহেতাজের প্রতি মেয়েদের এমন দৃষ্টিতে গা পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে তার।বিরক্তিতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে। ভিড় ঠেলে বের হয়ে যাবে ঠিক তখনই স্পিকার থেকে গিটারের সেই চেনা ‘টুং-টাং’ শব্দটা ভেসে এল। একটা মায়াবী সুর মুহূর্তেই চারপাশের কোলাহলকে ছাপিয়ে গেল। ভরাট কণ্ঠের গানটা শুরু হলো হঠাৎ,,
🎶বেসামাল হয়েছি আজ বেসামাল,
তুই তাকালি এমন করে…
ও হো হো এই কদিন…
হয়েছে দেখা তোর আমার….
দিলি মনটাকে কেমন করে….🎶

মুন্নির পা দুটো যেন মাটির সঙ্গে গেঁথে গেল। এই সুর, এই কথাগুলো তো তার বড্ড চেনা! গত কয়েকটা দিন ধরে তার ফোনের ইনবক্সে এই গানের কলিগুলোই তো ভেসে আসছিল। তবে কি সেই অচেনা বার্তা প্রেরক…?মুন্নি ভিড় ঠেলে একবার মঞ্চের দিকে তাকাল। দেখল নিহিত হাতে গিটার নিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে আসছে সরাসরি দর্শকদের মাঝে। তার দৃষ্টি স্থির, নির্দিষ্ট একজনের দিকে। মুন্নি দ্রুত নিজের ওড়না সামলে চলে যেতে চাইল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই তার ওড়নার আঁচলটা পাশের একটা ভাঙা কাঠের বেঞ্চের কোণায় সজোরে আটকে গেল।
হঠাৎ করেই টান খেয়ে মুন্নি থমকে দাঁড়াল। পেছনে ফিরে ওড়না ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই দেখল, গান গাইতে গাইতে শেহেতাজ ঠিক তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। চারপাশের মানুষের চিৎকার তখন মুন্নির কানে পৌঁছাচ্ছে না। শেহেতাজ এক হাতে গিটারটা ধরে অন্য হাতে খুব সাবধানে মুন্নির ওড়নার আঁচলটা বেঞ্চের কাঁটা থেকে ছাড়িয়ে দিল।
ওড়নাটা ছাড়িয়ে দিয়ে শেহেতাজ সরলো না। বরং মুন্নির চারপাশ দিয়ে বৃত্তাকারে ঘুরতে ঘুরতে গানের পরের লাইনগুলো গাইতে লাগল,,

🎶 তোকে জানাতে জানাতে চাই…
আমি বেঁচেছি ভালবাসায়….
মনের কোনে আপন মনে ঠিকানা বানাতে চাই….
আওয়ারা আওয়ারা দিল ……
আওয়ারা রে….
আওয়ারা আওয়ারা দিল …..
আওয়ারা রে ……🎶
চারদিকের কোলাহল যেন এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল। হাজারো শিক্ষার্থীর কৌতূহলী চোখ এখন মঞ্চের সামনে ওই একটি বিন্দুতে স্থির;যেখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপুটে ছাত্রনেতা শেহেতাজ চৌধুরী আর তার সামনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় এক তরুণী, মুন্নি। গিটারের শেষ ঝংকারে যখন ‘আওয়ারা’ সুরের রেশটুকু বাতাসে মিলিয়ে গেল, তখন কেবল শোনা যাচ্ছিল মুন্নির হিয়া-কাঁপানো ধুকপুকানি।
মুন্নি পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে, মাটির তলায় যদি কোনো সুড়ঙ্গ থাকত, তবে সে এই মুহূর্তেই সেখানে আত্মগোপন করত। লজ্জায় তার ফর্সা মুখখানা শরতের দুপুরের আগুনের মতো রাঙা হয়ে উঠেছে। চারপাশের বান্ধবীরা যখন ওড়নায় মুখ চেপে হাসছে, আর জুনিয়র মেয়েদের চোখে হিংসে আর বিস্ময়ের ঝিলিক তখন মুন্নির মনে হচ্ছিল সময়টা যেন নিষ্ঠুরভাবে থমকে দাঁড়িয়েছে।
শেহেতাজ গিটারটা একপাশে রেখে এক পা এগিয়ে এল। তার চোখে সেই চেনা দুষ্টুমি নেই, বরং আছে এক গভীর আকুলতা। সে মৃদুস্বরে এমনভাবে কথা বলল যা কেবল মুন্নির কানেই পৌঁছাল,,

— ‘কী হলো? ওড়না তো ছাড়িয়ে দিয়েছি, এবার মনটা কি একটু ছাড় দেওয়া যায় না?
মুন্নি কোনোমতে নিজের ওড়নাটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তার বুকের ভেতরটা তখন উত্তাল সাগরের মতো ফুঁসছে। সে একবার আড়চোখে দেখল পুরো ক্যাম্পাস তাদের দিকে তাকিয়ে। সে কি রাগ করবে? নাকি কেঁদে ফেলবে? নাকি এই পাগলামিটার জন্য শেহেতাজকে সবার সামনে অপমান করবে?
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার! রাগের বদলে তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠতে চেয়েও যেন দমে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে নিচের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,,
— ‘আপনি বড্ড বেহায়া তো! সবার সামনে এমন করার মানে কী? লোকজন কী ভাবছে দেখছেন?
শেহেতাজ হালকা হাসল;গলার স্বর কিছুটা চড়িয়ে বলল,,

— ‘লোকজন কী ভাবল তাতে শেহেতাজ চৌধুরীর কোনো কালেই কিছু যায় আসেনি। আমি শুধু চেয়েছিলাম, আমার হৃদস্পন্দনের খবরটা তার কাছে পৌঁছাক, যার জন্য এই বেসামাল হওয়া।
মুন্নি আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ানোর সাহস পেল না। লজ্জার সেই চরম শিখরে পৌঁছে সে ভিড় ঠেলে ঝড়ের বেগে অডিটোরিয়ামের পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে গেল। তার পালানোর ভঙ্গিটা দেখে শেহেতাজ পেছন থেকে শব্দ করে হেসে উঠল। সে জানে, মুন্নি আজ হয়তো পালিয়েছে, কিন্তু তার হৃদয়ের দরজায় যে কড়া সে নেড়েছে, তার শব্দ মুন্নি সারা রাত নিজের কানে শুনতে পাবে।

তিহুদের কক্সবাজার এসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুরের রোদ ম্লান হয়েছে। আসন্ন শীতের পূর্বাভাসের দরুন বেলার সময়সীমা সংক্ষিপ্ত হয়েছে বেশ। নীল–তিহু আশ্রয় নিয়েছে কক্সবাজারের ‌ইনানী সংলগ্ন এক নিভৃত রিসোর্টে।রিসোর্টটি সাগরের একদম কোল ঘেঁষে। বিশাল ডাইনিং স্পেস পেরিয়ে গেলেই দেখা যায় নীল জলরাশির অবারিত বিস্তার। রিসোর্টের প্রতিটি কোণ যেন আভিজাত্য আর শান্তির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।
নীল সব ব্যবস্থা আগেই করে রেখেছিল। তাদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে রিসোর্টের সবথেকে সুন্দর সি-ভিউ স্যুইটটি। ঘরের কাঁচের দেয়াল ভেদ করে সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন সরাসরি কানে আসছে। ঘরে ঢুকেই তিহু অবাক হয়ে দেখল, বিছানাটা সাদা আর লাল গোলাপের পাপড়িতে একাকার হয়ে আছে। নীল তার পেছনে এসে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,,

— ‘কী বেগম সাহেবা? পছন্দ হয়েছে আপনার এই নীল কুঠুরি?
তিহু মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে বলল,,
—‘খুব, খুব, খুব পছন্দ হয়েছে নেতা সাহেব।কিন্তু, আমার না এখনই সাগরের কাছে যেতে ইচ্ছে করছে।
নীল হাসল। তিহুর এই চঞ্চলতা তার বড্ড প্রিয়। সে তিহুর চিবুক ছুঁয়ে; ললাটে প্রেমময় চুম্বন একে বলল,,
—‘যাব বউ, ঠিক এখনই যাব। আগে একটু ফ্রেশ হয়ে নাও।

গোধূলির আমন্ত্রণে কমলাভ রঙে রঞ্জিত নীল দিগন্ত।সূর্যটা যেন ক্লান্ত হয়ে ধীরে ধীরে মিশে যেতে চাইছে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশির অতল গহীনে। ফ্রেশ হওয়ার পর আর একটিও বিলম্ব করেনি তিহু। একপ্রকার জেদী আচরণেই সৈকতে পা রেখেছে। বর্তমান সমুদ্রের নীলাভ জলরাশির পাশ ঘেঁষে হাঁটছে নীল-তিহু।
ইনানী সৈকতের এই নির্জন কোণটিতে কোলাহল নেই বললেই চলে; শুধু আছে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর তটরেখায় আছড়ে পড়া ঢেউয়ের নিরন্তর গর্জন। সমুদ্রের লোনা বাতাসের ঝাপটায় তিহুর অবিন্যস্ত চুলগুলো উড়ছে,আর সে দু-হাতে নিজের সাদা জর্জেট শাড়ির আঁচল সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
নীল ক্যাজুয়াল শার্টের হাতা গুটিয়ে পকেটে হাত দিয়ে পাশে পাশে হাঁটছে। তার শিকারি চোখ দুটো আজ সমুদ্রের নীল ছাপিয়ে কেবল তিহুর রাঙা মুখে থমকে আছে। সমুদ্রের প্রতিটি ঢেউ কূলে এসে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।হঠাৎ করেই তিহু তার জুতা জোড়া সৈকতে রেখেই নগ্ন পায়ে বালুকাবেলায় দৌড় দিল। নীল হকচকিয়ে গিয়ে ডাকল,,
— ‘আরে নূর! কোথায় যাচ্ছ? শোনো…!

তিহু কোনো কথা না বলে সোজা গিয়ে দাঁড়াল যেখানে সমুদ্রের নোনা জল তার পায়ের পাতা ছুঁয়ে যাচ্ছে। প্রথম ছোঁয়ায় পানির শীতলতা অনুভব করতেই সে এক মায়াবী শিহরণে চোখ বুজে ফেলল। ঢেউগুলো যখন তার নূপুর পরা পায়ের গোড়ালিতে আলতো ধাক্কা দিয়ে ফিরে যাচ্ছে, তিহুর মনে হলো প্রকৃতির এই আদরটুকু কেবল তার জন্যই।
নিরুপায় নীল শেষমেষ তিহুর ফেলে রাখা জুতাজোড়া হাতে তুলে ধীরপায়ে তার পেছনে এসে দাঁড়াল। তিহু পেছন ফিরে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,,

—-‘দেখুন নেতা সাহেব! এই ঢেউগুলো যেন আমায় ডাকছে। কী অদ্ভুত শান্তি, তাই না?
নীল তিহুর পাশে দাঁড়াল। সাগরের ওপর বিছিয়ে থাকা সূর্যের শেষ কমলাভ আভা তখন তাদের দুজনের মুখে এক অপার্থিব দীপ্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে। নীল আলতো করে তিহুর একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,,
— ‘শান্তি সাগরে নয় নূর, শান্তি তোমার ওই হাসিতে। এই যে সূর্যাস্ত দেখছ,এটা প্রতিদিন হয়। কিন্তু তোমার পাশে দাঁড়িয়ে দেখাটাই আজ এই সন্ধ্যাটাকে সার্থক করল।

তিহু লাজুক হেসে নীলের কাঁধে মাথা রাখল। তারা দুজনে নিঃশব্দে প্রত্যক্ষ করল আগুনের গোলার মতো সূর্যটার সলিল সমাধি। আকাশটা যখন আবির মাখা রঙে আরও মায়াবী হয়ে উঠল, তখন নীল বলল,,
—‘অনেক তো কাব্য হলো, এবার কি পেটের কাব্য শুরু হবে? আমার অর্কিড নিশ্চয়ই ক্ষুধার্ত?
তিহু হাসল। সমুদ্রতীরের ছোট ছোট দোকানগুলোর দিকে পা বাড়াল তারা। সমুদ্রের ধারে বসে ফুচকা খাওয়ার আনন্দই আলাদা। নীল যখন নিজ হাতে ঝাল-টক মাখানো ফুচকাটা তিহুর মুখে তুলে দিল, তিহুর মনে হলো জগতের সবটুকু স্বাদ যেন এই সাধারণ ফুচকাতেই লুকিয়ে আছে। এরপর ডাবের মিষ্টতা মাখা পানি খেতে খেতে তারা যখন ঝাউবনের ছায়া ঘেরা পথে ফিরছিল, তখন তিহুর মনে হলো জীবনটা আসলে ছোট ছোট কিছু মুহূর্তের সমাহার, যা নীলের মতো কারও পাশে থাকলে স্বর্গীয় হয়ে ওঠে।

রাতের অন্ধকার নামার আগেই চাঁদের এক ফালি আলো সাগরের নোনা জলে চিকচিক করতে শুরু করল। সমুদ্রের পাড় দিয়ে ফেরার সময় হঠাৎ এক বিশাল ঢেউ এসে তিহুর পায়ের নিচের বালু সরিয়ে দিল। ভারসাম্য হারাতে গিয়ে সে নীলকে জড়িয়ে ধরল। নীল তাকে শক্ত করে ধরে কানে ফিসফিস করে বলল,,
–‘কী ব্যাপার ম্যাডাম? এতক্ষণে বুঝলেন যে পায়ের নিচের মাটিটা অতটা শক্ত নয়, যতটা শক্ত আমার এই হাত দুটো?
তিহু নিজেকে সামলে নিয়ে একটু গাল ফুলিয়ে বলল,,

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৬০

—‘আপনি বড্ড সুযোগসন্ধানী তো! সাগরের দোষ আর ক্রেডিট নিচ্ছেন আপনি?
নীল হাসল, তিহুর হাতটা নিজের পকেটে পুরে নিয়ে বলল,,
— ‘সাগরের দোষ নয় বেগম সাহেবা, এটা তো সাগরের ষড়যন্ত্র। সে জানে আমি আপনাকে আগলে রাখার বাহানা খুঁজি, তাই ও একটু সাহায্য করল আর কী!
তিহু নীলের বাহুতে চিমটি কেটে হেসে বলল,,
—‘আপনার এই নেতাগিরি মার্কা লজিকগুলো না… জাস্ট অসহ্য সুন্দর!

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৬২