Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩৬

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩৬

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩৬
সানজিদা আক্তার মুন্নী

মেয়েটি হাপাতে হাপাতে রাস্তায় টলে ওঠে, মনে হয় এখনি লুটিয়ে পড়বে পিচঢালা পথে। উপস্থিত সবাই লজ্জায় বা সংকোচে চোখ নামিয়ে নিলেও, নাযেমের দৃষ্টি স্থির থাকে মেয়েটির উপর। সে এক মুহূর্ত দেরি করে না। ঝড়ের বেগে ছুটে গিয়ে নিজের গায়ের চাদরটি খুলে মেয়েটির শরীরে জড়িয়ে দেয় তার কন্ঠে এখন আকাশভাঙ্গা আর্তনাদ, “পুষ্প! কী হয়েছে তোমার? এই পুষ্প!”

পুষ্প এই মেয়েটির নাম পুষ্প নাযেম চাচার এককালের হৃদস্পন্দন । তাদের গ্রামের স্কুলের হেডমাস্টারের মেয়ে। সময়ের স্রোতে সম্পর্কটা মলিন হলেও, নাযেমের বুকের গভীরে পুষ্পর জন্য ভালোবাসা আজও অমলিন, ঠিক আগের মতোই তীব্র। তাদের বিচ্ছেদ হয়েছে তিন বছর হলো। টলে পড়ে যাওয়া পুষ্পকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে নাযেম। ভয়ে আর উৎকণ্ঠায় গলার স্বর কেঁপে ওঠে তার, বসে থাকা অবস্থাতেই চিৎকার করে ওঠে সে, “কী হয়েছে তোর সাথে? ও পুষ্প বল কে করেছে এমন? ও পুষ্প কথা ক পাখি আমার। বল আমারে, বল না কী হইছে তোর?”
তৌসির গাড়ি থেকে পানির বোতল নিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসে। তাদের সামনে বসে পড়ে ধমকের সুরে বলে, “বাইনচ*দের নাতি, আগে পানি খাওয়া। ও হাপাচ্ছে, একটু সময় দে।”

নাযেম পুষ্পের গায়ে চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে দিতে দিতে বলে, “দাঁড়া, ও বলুক।”
পুষ্প এতক্ষণ পর মুখ খোলে। কাঁপা কাঁপা হাতে নাযেমের পাঞ্জাবির গলা খামচে ধরে সে হু হু করে কেঁদে ওঠে, “নাযেম ভাই, আমাকে বাঁচাও নাযেম ভাই, আমি আজ আসরের পর স্কুল থেকে প্রাইভেট পড়িয়ে আসছিলাম… আসছিলাম আসছিলাম
কান্নায় কথা আটকে যায় পুষ্পের বলতে পারে না কি বলতে চায়। তাকে এমন ভেঙে পড়তে দেখে নাযেম পরম মমতায় তার গালে হাত রাখে, আশ্বাস দিয়ে বলে, “এই, বল না কী হইছে? আমাকে বল।”

পুষ্প ডুকরে কেঁদে ওঠে এবার। চোখ বুজে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে একটা ভয়াবহ সত্য উচ্চারণ করে, “আমাকে তিনজন… গ্রামের ঐ পোড়াবাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়ে… ধ ধ ধ র্ষণ করেছে। আমি তাদের মুখ দেখিনি, তারা মুখ ঢেকে এসেছিল। আমাকে শেষ করে দিয়েছে নাযেম ভাই! আমি অনেক কষ্টে পালিয়ে এসেছি। আমাকে বাঁচাও!”
কথাটা শুনে নাযেমের মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দ বের হয় না। সবাই স্তব্ধ হয়ে যায় এ কথা শুনো। কলিজায় ঘা লাগলে যেমন তীব্র জ্বালা হয়, ঠিক তেমন এক যন্ত্রণায় নীল হয়ে যায় নাযেম। পুষ্পের এই আর্তনাদ তার পৃথিবী কাঁপিয়ে দিচ্ছে। নাযেম কালবিলম্ব না করে পুষ্পকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নেয়। উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে চোয়াল শক্ত করে বলে, “কাঁদিস না পুষ্প। ওদের সবকয়টাকে আমি খুঁজে বের করে পিস পিস করব। তুই কাঁদিস না ফুল।”

পুষ্প ফুপিয়ে ফুপিয়ে বলে, “আ…আমার কী হবে? আমি তো এখন নষ্ট হয়ে গিয়েছি। আমাকে তো সবাই কলঙ্কিত বলবে, ধর্ষিতা বলবে।”
নাযেমের চোখে আগুন, অথচ কন্ঠে অদ্ভুত দৃঢ়তা, “তোকে ওরা স্পর্শ করছে, কেউ জানব না। ওদের বিচার আমি করব, আমার আদালতে আমি একান্তে। আর এই মুহূর্তে আমি তোকে বিয়া করমু। বউ হবি তুই আমার? বল না, বউ হবি? বিয়ে করব আমি তোকে, এক্ষুনি করন।”
কথাটা বলেই নাযেম মিনহাজের দিকে তাকায়, “মিনহাজ, গাড়ি টান। সোজা কাজি অফিসের দিকে।”
এটা বলে মর্মাহত, নিথর পুষ্পকে গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে বসিয়ে দেয় নাযেম। তৌসির নাযেমের পাঞ্জাবির কলার পেছন থেকে টেনে ধরে তাকে একটু দূরে নিয়ে যায় আর ফিসফিস করে বলে, “মাথা খারাপ হইয়া গেছে তোর ছোট চাচা? তুই একটা ধর্ষিতা মেয়ের বিয়ে করবি বলছিস? তিন ব্যাটা যাকে হাতিয়েছ ওরে তুই..,,,,,

তৌসিরের কথা শেষ হতে দেয় না নাযেম তার আগেই জোরে শ্বাস নিয়ে কড়া গলায় বলে দেয়, “ওকে আমি ভালোবাসি। এবার যদি ও একশো পুরুষেও হাতানো হয়, তারপরও আমি ওরেই বিয়া করমু। কাজি অফিসে চল।”
তারপর সবার দিকে তাকিয়ে হুমকি দেয় একপ্রকার, “কেউ যেন জানতে না পারে ও ধর্ষিতা। আম্মা যেন জানতে না পারে। সবাইকে বলব, পছন্দ হয়েছে, বিয়ে করছি। চল তাড়াতাড়ি, আগে কাজি অফিস, তারপর হাসপাতালে।”
কারো কোনো কথার তোয়াক্কা না করে নাযেম গাড়িতে উঠে পুষ্পের পাশে বসে। তৌসির আর কী বলবে? যার জীবন তার ইচ্ছে। আর পুষ্প তো নিজে যেচে কলঙ্কিত হয়নি, তাহলে পুষ্প কেন নাপাক হবে? পুষ্প তো পবিত্রই আছে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ড্রাইভিং সিটের পাশে গিয়ে বসে তৌসি তার পাশ ঘেঁষে বসে রুদ্র জায়গা নেই তো কি আর করার।
গাড়ির ভেতর পুষ্পকে নিজের বুকে শক্ত করে টেনে ধরে নাযেম। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে পানির বোতলটা এগিয়ে দেয়। দু’কুলি পানি খেয়ে পুষ্পের প্রাণটা একটু স্থির হয়। সে স্থির চোখে নাযেমের বুক থেকে মাথা তুলে তাকায়। এই মানুষটাকে সে কত খারাপ ভাবতো, অথচ এই ‘খারাপ’ মানুষটাই আজ তাকে নষ্ট জেনে-বুঝে তাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করছে। পুষ্প নাযেম কে অস্ফুট স্বরে বলে, “আমার মতো ধর্ষিতা নারীকে কেন বিয়ে করছ? আমি তো এখন কলঙ্কিত।”

নাযেম পুষ্পের কপালে আলতো চুমু খেয়ে তাকে বুকের সাথে আবারও মিশিয়ে নিয়ে বলে, “প্রিয়তমারা কখনো কলঙ্কিত হয় না।”
নাযেমের বুকের ভেতর এখন তুমুল ঝড় চলছে, যা সে কাউকে বোঝাতে পারছে না। হঠাৎ দাঁত চেপে তৌসিরকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে, “তৌসির, আগামীকাল যেন ঐ জানোয়ারগুলো তোর নরখাদকদের খাবার হয়।”
তপ্ত শ্বাস ছেড়ে তৌসির উত্তর দেয়, “হয়ে যাবে, চিন্তা করো না। চলো আগে কাজি অফিস। এখানে পুষ্পের কোনো দোষ নেই, পুষ্প পুষ্পই রয়েছে। তাই এই বিয়েতে আমি নিজে তোমার উকিল বাপ হব। এখন থাইকা পুষ্প আমার মাইয়া।”

তৌসিরের কথা শুনে গাড়িতে থাকা সবার মুখের মেঘ কেটে যায়। সবাই ভেবেছিল তৌসির হয়তো এই বিয়েতে রাজি নয়, কিন্তু তার এই সমর্থন সবার কাছে এক পশলা বৃষ্টির মতো স্বস্তি নিয়ে আসে।
বিয়ে পড়িয়ে শিকদার বাড়িতে নিয়ে ফিরেছেন এখন।
হুটহাট বিয়ে পড়িয়ে শিকদার বাড়ির ছেলে বউ নিয়ে ফিরেছে এমন খবরে সচরাচর যেখানে ঝড় নেমে আসার কথা, সেখানে উল্টো সবার মুখে স্বস্তির হাসি। সবার মুখে মুখে এখন একটাই বুলি ফিরছে”আলহামদুলিল্লাহ”।
কারণটাও অবশ্য পরিষ্কার। এই ছেলেকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো যে প্রায় অসাধ্য সাধন ছিল! তার ওপর এভাবে ঘরোয়া বিয়েতে বেঁচে গেল বিশাল অঙ্কের খরচ। বাড়ির সবার মনের ভাবটা এমন যাক, যেভাবেই হোক, অবশেষে বিয়েটা তো হলো!

তবে এই উৎসবমুখর পরিবেশের আড়ালেই তো চাপা পড়ে আছে এক অজানা গল্প। পুষ্পর ওপর দিয়ে গত কয়েক ঘণ্টায় কী ঝড় বয়ে গেছে, তা এই বাড়ির কেউ জানে না। কাজী অফিস থেকে ফেরার পথে কাজীর বাড়িতেই তাকে ফ্রেশ করানো হয়েছে, গায়ে জড়ানো হয়েছে কাজীর মেয়ের কাপড়। শিকদার বাড়ির মানুষ জানল, ছেলের পছন্দ করা বউ এই পুষ্প। পুষ্প কোনো কথা বলে না, কোনো প্রতিবাদ করে না। পাথরের মূর্তির মতো সে কেবল নিঃশব্দে সবকিছু গিলে নিচ্ছে। তার বলার মতো শব্দভান্ডার যেন ফুরিয়ে গেছে। আপাতত তাকে আলাদা একটি ঘরে বিশ্রামে রাখা হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামীকাল সকালে ছোটখাটো আয়োজনের মাধ্যমে সবার সামনে তাকে বরণ করে নেওয়া হবে।

ওদিকে পুষ্পর বাবাকেও খবরটা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। মেয়ে নিখোঁজ হওয়ায় যিনি কি না একটু আগেও পুলিশ স্টেশনে অস্থির হয়ে ঘুরছিলেন, বিয়ের খবর শুনে তিনি আকাশ থেকে পড়লেন না, বরং অদ্ভুত এক প্রশান্তি অনুভব করলেন! রাগে ফেটে পড়ার বদলে তিনি উল্টো খুশি। বিবিজানকে জানালেন, কাল সকালেই তারা মেয়ে-জামাইকে দেখতে আসবেন।
বিবিজান ফোনটা রেখে গভীর ভাবনায় ডুবে যান। দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তিনি এমনটা আগে দেখেননি। মেয়ে পালিয়ে বিয়ে করেছে শুনে কোনো বাবার এমন নির্লিপ্ত, এমনকি খুশি হওয়ার নজির কি আছে? কোনো উত্তেজনা নেই, কোনো রাগ নেই ভদ্রলোকের এমন আচরণ বিবিজানকে ভাবাচ্ছে। তিনি ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন, এই সহজ সমীকরণের পেছনে কোনো জটিল অঙ্ক নেই তো?

দোতলার করিডরে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে নাজহা। নিচে নামেনি সে। করিডরে দাঁড়িয়েই সব দেখছে। এই বাড়িতে হঠাৎ পুষ্পকে দেখে বিস্ময়ে তার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। পুষ্প এখানে কেন? পুষ্পর উপস্থিতি মুহূর্তের জন্য নাজহার হৃদয়ে তোলপাড় তোলে। একই সাথে শান্তি আবার এক অশান্তি অনুভব করে নাজহা। তবে সব দোটানা ছাপিয়ে শেষমেশ তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক চিলতে স্বস্তির হাসি। নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে ওঠে সে,
“তাহলে কি আমি মুক্ত? স্বার্থের এই অদৃশ্য শিকল থেকে আমি কি ছাড়া পেলাম? এখন কি আমি নিজের মতো করে সংসার করতে পারব?”
গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নাজহা নিজেই নিজেকে উত্তর দেয়, “আলহামদুলিল্লাহ, এখন আমি মুক্ত।”

অনেক্ষন পর তৌসির সবকিছুর শেষে ঘরে ফিরে। ঘরে প্রবেশ করে দেখে, নাজহা আয়নার সামনে বসে চুল আঁচড়াচ্ছে। তৌসির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নাজহার পিছনে গিয়ে দাঁড়ায়। নাজহা মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। এবার কেন মুখ ফুলাচ্ছে এ নারী, তা তৌসির জানে না। এতকিছু হয়ে গেল, তারপরও নাজহা নিচেও নামেনি।
তৌসিরের নজর আটকে যায় নাজহার উপর আজ তার কৈতরি শাড়ি পরেছে, একটা কালো জর্জেটের শাড়ি। শাড়িটা বেশ খোলামেলা অবস্থায় পরা। নাজহার ধবধবে ফর্সা পিঠ-পেট স্পষ্ট চোখে ধরা দিচ্ছে। কপালে ছোট্ট একটা কালো টিপ দেওয়া, তার কালচে সবুজ আভা-ওয়ালা নয়নজোড়া অরণ্যরহস্যে মোড়া, চোখের নিচে চিকন করে কাজল আঁকা। দুই হাত ভর্তি কালো আর সাদা রেশমি চুড়ি। নাজহাকে এভাবে সাজিয়ে দিয়েছেন বিবিজান, আর এই কারণেই সে মুখ ভার করে বসে আছে। তার মধ্যে তৌসির দেরি করে ঘরে ফিরেছে। আজ কথা দিয়েছিল তাড়াতাড়ি ফিরবে, কিন্তু এতে নাজহা রাগ করেনি তার মন বিষাদে ছুঁয়ে আছে। এটা নিয়ে বিবিজান কেন তাকে কয়দিন পর পর এমন সং সাজান? কী জন্য সাজান? কেন তিনি এমন করেন নাজহা বোঝে না। উল্টো প্রশ্ন করারও সাধ্য নেই, করলেই নাৎসিদের মতো বকাবকি করতে থাকেন।

তৌসির নাজহাকে খুঁটিয়ে বিমোহিত দৃষ্টিতে বারবার দেখতে থাকে। ভেতরটা ধড়ফড় করছে, আজ নিজেকে দমিয়ে রাখা বোধহয় বেশ কষ্টদায়ক হয়ে যাবে। তৌসির ধীরে ধীরে ঝুঁকে নাজহার দুই বাহুতে হাত রাখবে বলে উদ্যত হয়, কিন্তু তা আর হয় না। নাজহা বসা থেকে হুট করে উঠে দাঁড়ায় আর বলে, “হাত শরীরে লাগলে হাত কেটে ফেলব কিন্তু!”

এমন হুমকি দিয়ে নাজহা আলমারির দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। তৌসির এখনো বুঝতে পারল না ঠিক কী জন্য নাজহা রেগে আছে। কে তাকে সাজিয়ে দিল তৌসির ভালো করেই জানে, নাজহা নিজে এমন সুন্দর করে সাজার পাত্রী নয়। তৌসির নাজহাকে আটকাতে চট করে তার শাড়ির আঁচল টেনে ধরে ফিসফিসিয়ে ওঠে, “ফ্যাতফ্যাত করিস না। শরীরটা বড্ড ক্লান্ত, আয় না! একটু বুকে আয়। এমন করতাছোস ক্যান, সাউয়ার নাতিন?”
এটা বলতে বলতে তৌসির নাজহার শাড়ির আঁচল হাতের মুঠোয় নিয়ে গুটিয়ে, নাজহার একদম নিকটে গিয়ে তার ঘাড়ের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলে, “কী হইছে? কে এত্ত সুন্দর কইরা সাজাইয়া দিছে? কে আমারে মারার লাইগা এত বাড়ছে যে, তোরে সাজাইয়া অস্ত্র বানাইয়া আমার সামনে দিছে?”

এটা বলে তৌসির নাজহার চিকন কোমরে দুদিকে নিজের হাত শক্ত করে রাখে। নাজহা চিল্লিয়ে ওঠে, “আর কে দিবে শুনি? আপনার যে প্রথম বউ আছেন, যাকে আমার আগে সাঙা করেছেন, সে সাজিয়ে দিয়েছেন! আমাকে যখন মন ধরে তখন আপনার বিবিজান শাড়ি পরায়, তাও এত অশ্লীলভাবে পরায় যে সবকিছু দেখা যায়! নিজের দিকে নিজেই তাকানো সম্ভব হয় না। উনি কেন এমন করেন? আমি থাকব না আপনার সংসারে, আমি চলে যাব আমি চলে যাব উনার যন্ত্রণায়!”

তৌসির নাজহার অভিযোগগুলো শুনেও কিছু বলে না। বলার তো পরিস্থিতি এখন তার নেই, তার যে ভারী নেশা লেগেছে! তার নাজহার নেশা লেগেছে অন্তরে। তৌসির নাজহাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ধীরলয়ে নাজহার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। নাজহার পেটের উপর থেকে শাড়ির অংশ সরিয়ে, নাজহার উন্মুক্ত উদরে নিজের ঠোঁট-মুখ চেপে ধরে জোরে জোরে শ্বাস ছাড়ে। তারপর উন্মাদের মতো একের পর এক চুমু খেতে থাকে। নাজহা চোখ বুজে দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে। হাঁটু পর্যন্ত কাঁপছে, তৌসিরের এই উন্মাদনায় পায়ের তালু ঘেমে যাচ্ছে, স্নায়ু টানটান হয়ে আসছে।

তৌসির নাজহার কোমরে শক্ত করে হাত রেখে তার উদরে নাক-মুখ ঘষতে ঘষতে বলে, “কৈতরি, তুই এভাবে প্রতিদিন শাড়ি পরিস। আমি এক বেলা ভাত কম খাইয়া তোর পেটে চুমু খাইয়া নিজের পেট ভরাইয়া নিমু।”
এটা বলে আবারো তৌসির পাগলামিতে ডুবে যায়। নাজহা এবার আর সহ্য করতে পারে না, ধৈর্যচ্যুত হয়ে কড়া গলায় দাঁত পিষে উচ্চারণ করে, “আমার রাগ আরো তীব্র হওয়ার আগে আমার কাছ থেকে সরে যান ভালোয় ভালোয়।”

তৌসির কি এসব শোনার পাত্র? না, সে তো এসব শোনার বান্দা নয়। তৌসির উঠে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে নাজহার মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে, চিলের মতো টান মেরে নাজহার পাতলা শরীরটা নিজের বাহুডোরে বন্দী করে নিয়ে বিছানার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলে, “রাগ করিস না সাউয়ার মাইয়া, আইজ তোর লগে কিছু একটা মনে হয় হইয়া যাইব আমার।”
নাজহা এসবের জন্য অন্তত আজ প্রস্তুত নয়। তাই ও ছটফট করতে করতে বলে, “ছাড়ুন তৌসির! আজ মন চাচ্ছে না এসব।”

তৌসির নাজহাকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে তার পায়ের কাছে বসে। তার ডান পায়ের পাতা হাতে তুলে নিয়ে তার পায়ের পাতায় চুমু খায়। নাজহা দুই হাতে বিছানার চাদর খামচে ধরে বলে, “তৌসির, কী করছেন? পা থেকে সরুন না!”
তৌসির নাজহার কথাটা মানে। সে ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে বসে নাজহার ব্লাউজের ফিতেটা খুলে দিতে দিতে ফিসফিসিয়ে ওঠে, “খুলে নেই কৈতরি সব?”
তৌসিরের ঠান্ডা আঙুলের ছোঁয়া নাজহার অনাবৃত পিঠ ছুঁয়ে যায়। ব্লাউজ কাটিংয়ের ফাঁকে নাজহা ছটফটিয়ে বলে, “হাত সরান না! কেমন করছে শরীর ঝিনঝিন করে কাঁপছে।”

তৌসির নাজহার পরিধেয়র বাঁধনগুলো একে একে খুলে দিতে শুরু করে। তৌসিরের হাত দুটো ধীরলয়ে উঠে আসে। ওর আঙুলের ডগা যখনই নাজহার পিঠের একেকটা ফিতে স্পর্শ করে, অমনি এক বিদ্যুৎচমকের মতো শিহরণ খেলে যায় নাজহার মেরুদণ্ড জুড়ে। নাজহা কাঁপছে। থরথর করে কাঁপছে ওর চোখের পাতা, কাঁপছে হাতের আঙুলগুলো। সে চাইলেও এই কাঁপুনি থামাতে পারছে না।
তৌসির খুব আলতো করে, পৃথিবীর সবচেয়ে দামি কোনো কাঁচের জিনিস ছুঁয়ে আছে, ঠিক সেভাবেই ফিতের বাঁধনটা ধরে। একটা টান বাঁধনটা আলগা হয়ে যায়। ফিতেটা খুলে যাওয়ার সাথে সাথেই তৌসিরের তপ্ত আঙুলগুলো নাজহার পিঠের মসৃণ ত্বক ছুঁয়ে দেয়।

সেই ছোঁয়ায় নাজহার শরীরের কাঁপুনি আরও বেড়ে যায়। ওর মনে হচ্ছে, পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। তৌসিরের আঙুলগুলো পিঠের ওপর দিয়ে খুব ধীরে ধীরে চলাফেরা করছে, আর প্রতিটি স্পর্শে নাজহার বুকের ভেতর তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। সে শক্ত করে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে, চোখ দুটো বুজে ফেলে আবেশে। তৌসিরের এই স্পর্শে কোনো তাড়া নেই, আছে শুধু এক গভীর সম্মোহন, যা নাজহাকে এই মুহূর্তের কাছে পুরোপুরি অবশ করে দিচ্ছে। নাজহার এমন কাঁপুনি দেখে ধমকে ওঠে তৌসির, “সাউয়ার মাইয়া এমনে কাঁপস ক্যান?”
এটা বলেই তৌসির নাজহার বক্ষবন্ধনীর বাঁধন ফসকে দেয়। তৌসির নাজহার নিরাভরণ শুভ্র কোমরে দুই হাত শক্ত করে রেখে নিজের ঠোঁট-মুখ চেপে ধরে নাজহার রক্তাভ, শুভ্র, অনাবৃত পিঠে। নাজহা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। এমন স্পর্শে দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। নাজহা তরতর করে কেঁপে ওঠে চিৎকার করে বলে,

“তৌসির আর না! অনেক হয়েছে।”
এ শুনে তৌসির তো তব্দা খেয়ে যায়। এই মেয়ে কি বলে? এখনো কিছু করলও না, বলে ‘আর না’! তৌসির তিক্ত সুরে বলে, “দূর ছিনাল! ছুইলাম, ধরলাম, কিছু করলাম না তুই শেষ মারাস কিতা?”
এটা বলেই তৌসির তাকে বালিশে শুইয়ে দিয়ে তার দিকে ঝুঁকতে ঝুঁকতে বলে, “চল, এসব সাউয়া-মাউয়া বগা-জাতি কথা বাদ দে। শাড়ির পিনটা কোথায় ক? খুলি।”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩৫

এটা বলে তৌসির পুরোটা বিছানায় উঠে নাজহার উপর ঝুঁকে যায়। নাজহার হাত-পা এতটুকুই কাঁপতে শুরু করেছে, নাজহা কাঁপা হাতে বিছানার চাদর খামচে ধরে চোখ বুজে মিনমিনিয়ে বলে, “পিন নেই তো।”
এ শুনে তৌসির মহা খুশি হওয়ার জোগাড়। ও মুচকি হেসে বলে, “যাক! সাউয়া-মাউয়া হেনতেন খুলতে হইবো না, এক টানেই শাড়ি হাতে আনতে পারমু।”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩৭