ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৬
জান্নাত চৌধুরী
ব্যবচ্ছেদ
পাখি নীবরে সব শুনছিলো , কখন জানি ভোর হয়েছে সে দিকে খেয়াল নেই। আজ পঞ্চগড় যাবার কথা তাদের। মীরদের সেই জমিদার বাড়িতে যেতে হবে। ফজরের আযান পড়ছিলো চারদিকে –
জামিলা বেগম। এখন নামাজে যাবে , ৬টার গাড়িতে পঞ্চগড়ের উদ্দেশ্য রওনা হবে তারা।
গল্প স্থগিত রেখে পাখি নিজের ঘরে এলো। আয়না নিজেকে একবার দেখে নিলো। কোঁকড়ানো চুলগুলো দিকে কিয়ৎ সময় তাকিয়ে থেকে ইফরাহর জায়গায় নিজেকে কল্পনা করতে থাকলো।
ইফরাহ রূপে বর্ণনা শুনেছে সে। বউরানী মতো রূপবতী না হলেও খানিক রূপবতী পাখি। আলমারি হতে লাল পাইরের এক সাদা শাড়ি বের করলো সাথে লাল রঙ্গের এক ব্লাউজ।
একটু খানি তাকিয়ে থেকে নাক ঘুষলো শাড়িতে। বউরানী সাজলে খুব একটা অন্যায় হবে বলে মনে হয়না তার! একটুখানি ভেবে নিয়ে , “ শাড়ি পড়ে নিলো সে। সাজ ফুটিয়ে তুলতে ছোটখাটো কিছু গহনা পড়লো গায়ে। পায়ে আলতা দিলো ;
ঘড়িতে সময় তখন , ৬টা ছুঁই ছুঁই –
জামিলা বেগম তখন অপেক্ষা করছেন পাখির জন্যে। মিনিট পাঁচেক পর পাখি এলো। সিঁড়ি দিকে তাকাতেই চোখ জোড়া তার থমকে যায়। জামিলা বেগম বিড়বিড় করে আওড়ায় .. “ বউরানী”
পাখি এসে সামনে দাড়ালো জামিলা বেগমের। দুই নয়নে এক মোহনীয় মুগ্ধতা জামিলার। চোখ বুজে নিজকে সামলে , পা থেকে মাথা অব্দি দেখে নিলো পাখির। এরপর ধীরস্তে স্থান ত্যাগ করে ঘরেরে দিকে গেলো। পাখি পেছন থেকে বেশ কয়েকবার ডাক ডাকলো ,
” দাদিজান , দাদিজান শুনছেন ?”
জমিলা বেগম পাত্তা দিলো না। গটগট করে ঘরে ভেতর ঢুকে গেলো। পাখি তখনো অবুঝের ন্যায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। খানিক বাদেই আবারো এলো জামিলা বেগম হাতে একখান বাক্স! পাখির সামনে এসে দাড়ালো , বাক্সখান খুলে এক সোনালী চেইনের কোমড় বন্ধনী বের করে বাক্স পাখির হাতে চাপিয়ে দিলো।
পাখি শান্ত চোখে দেখছে জামিলা বেগমের কার্যক্রম। জামিলা বেগম কাঁপা কাঁপা হাতে শাড়ির উপরেই কোমড় পড়িয়ে দিলো জামিলা বেগম। পাখি দেখলো জামিলা বেগমের চোখ দুটো চকচক করছে, চোখের কোণে পাখি, এ ধ্যানে তাকিয়ে দেখছিলো জামিলা বেগম!
পাখি ডাকল , “দাদিজান!”
জমিলা বেগম সাড়া দিলেন না এ দফায় গা কিছু ঝাকিয়ে ডাকল , “ ও দাদি জান , বাকি গল্প কবে বলবে ? আমার হৃদয় যে উতলা হয়ে রয়েছে গো !”
এ পর্যায়ে ধ্যান ভাঙ্গল। চোখের পানি টুকু মুছে নিলেন জামিলা বেগম। চেইন লাগানো এক চশমা খানি পরিষ্কার অরে চোখে লাগাতে লাগাতে আবারো বলতে লাগলেন
বদ্ধ শুনশান ঘরে কেমন মাত্রই বেলকনিতে জ্বলতে থাকা হলুদ মিটমিটে আলোটুকু প্রবেশ করছে। আজ রাত টা অমাবস্যার রাত। ঘুটঘুটে অন্ধকার চারদিকে। ফিনফিনে এক শীতল হাওয়া এসে ছুয়ে দিচ্ছে গায়ের প্রতিটি ভাজ। ইফরাহ তখনো দোল খাচ্ছে চেহারে বসে। নীবর ঘরে কেমন চেয়ার ঘোষার এক ক্যার ক্যার শব্দ আর দূরের জঙ্গলে থেকে শেয়ালের হাঁক ডাক কানে বাজছে। কী ভয়ংকর এক নিশীথ, অমাবস্যার রাতে নাকি পেত্মীর দল রক্ত শুষে খায়। কথাটা হাস্যকর মনে হলেও ভয়ংকর।
হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ হলো। মেঝেতে পা ঘষে ঘষে কেউ রুমে ঢুকছে। ইফরাহ একটু খানি ও নড়লো না , এই পায়ের শব্দ তার ভীষণ চেনা। পা ঘষে ঘষে হেঁটে আসছে আরাধ্য। মেঝের সাথে তাল হীন পায়ের ঘর্ষণ বলে দিচ্ছে নেশাগ্রস্তের মতো এলোমেলো হেটে দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করলো আরাধ্য। ইফরাহর ভাবনা এখন আরাধ্য তার কাছে আসবে এসে ডাকবে তাকে। হলো তাই ,আরাধ্য টলতে টলতে এসে দাড়ালো তার কাছে নরম স্বরে ডাকল , “ ইরা”।
ইফরাহ কাজলকালো চোখে একটু চোখ মেলালো আরাধ্য কালো মনির চোখে। আরাধ্য খানিক তাকিয়ে দেখলো চোখজোড়া , কাজল পড়েছে মেয়েটা , সেজেছে । কিছু টা সরে এসে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আরো মনোযোগ দিয়ে দেখলো তাকে। এরপর এগিয়ে গিয়ে ইফরাহ পায়ের কাছে বসে পড়লো। ইফরাহর চমকিত হবার কথা ছিলো তবে , আজ চমকিত হলো না সে। কেনো হলো না জানা নেই। আরাধ্য আলগোছে মাথা রাখলো ইফরাহর কোলে ছোট বাচ্চার মতো ঠোঁট ভেল্টালো লোকটা। আজকে নেশার পরিমাণ তীব্র হয়েছে। আরাধ্য নেশা করলেও মাতাল হয়ে ফিরে না। এটা তার গুন ! একটু আরামে থেকে মাথা তুললো পকেট থেকে সিগারেট বের করে আশেপাশে পাশে ম্যাচকাঠি খুঁজতে শুরু করলো। পাচ্ছে না !
ইফরাহ উঠে দাড়ালো ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে ম্যাচ কাঠি এনে আরাধ্যের পাশে বসল। এরপর সযত্নে সিগারেট জ্বালিয়ে দিলো। আরাধ্য পরপর দুটো টান দিলো। এখন ভালো লাগছে , মীর বাড়ির নবাব বউয়ের সামনে মাতলামি করলে মান থাকবে না। যথেষ্ট শক্ত থেকে প্রশ্ন করল , “ কখন ফিরলে ?”
ইফরাহ দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “ খানিক আগেই।”
সিগারেটে টেনে মুখ ভর্তি ধোঁয়া ইফরাহ মুখে ছুড়লো আরাধ্য ,
“ ছাড়লো তোমাকে!”
-“কে ?”
আরাধ্য হো হো করে হেসে উঠলো। ঘনঘন সিগারেট টানছে আর হাসছে। ইফরাহ কারণ খুঁজলো না এই হাসির , সত্যি বলতে ইচ্ছে জাগলো না। আরাধ্য বেশ কিছুক্ষণ হেসে নিয়ে বলল , “আমায় কত খানি বোকা ভাবো ইরা?”
-“যে শব্দ আপনার সাথে যায় না তা ভাবার প্রশ্নই ওঠে না ছোট নবাব। ”
-”বলছো?
-“হুম।
দু’জনের মাঝে অনেকটা সময় নীরবতায় কাটলো। আরাধ্যের সিগারেট প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। শেষ অংশে আরো দুটো টান দেওয়া যাবে তবে না আরাধ্য আরো তিন থেকে চারখান টান দিবে। তার মনে হয় যেহেতু জিনিসটা অপ্রয়োজনীয় তাই আরো বাড়িয়ে টানলে খুব একটা ক্ষতি নেই তবে স্বাদ পাবেনা । এই জিনিসের আদতেও কোনো স্বাদ নেই। এ পর্যায়ে ইফরাহ বলল , “ রাতে খাবেন, আনবো কিছু?”
-“তুমি খেয়েছো?”
-“এটা আমার প্রশ্নের উত্তর নয় ছোট নবাব।”
আরাধ্য ঘাড় বাঁকা করে তাকালো , “ তোমায় কে বললো আমি তোর প্রশ্নের উত্তর করলাম।”
ইফরাহ হাসল , “ সব কথা যদি মুখে বলে দিতে হয় ,তবে আমি কিসের ঘরওয়ালি হলাম আপনার।”
নারী ছলনায় পারদর্শী এরা কত নিখুঁত ভাবেই না ছক কোষে। আরাধ্য ইফরাহর মুখে দিকে তাকিয়ে উপলব্ধি করছে তার ধ্বংস। তার ঘরেই বাস করা এক কিশোরী তাকেই তার জালে মারছে। ইফরাহ কি কিশোর? তাকে কিশোরী ডাকা ভুল হবে। সে কিশোরী নয় পাক্কা রমনী। ইফরাহর ওষ্ঠ জুগল তিরতির করছে। মৃদু আলোতে গোলাপি ওষ্ঠজোড়া বড্ড টানছে আরাধ্য কে। একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে ইফরাহর দিকে , এক হাতে চেপে ধরে ইফরাহর চুলের গোছা। হালকা টানে চোখ বন্ধ করে নেয় মেয়েটা। আরাধ্য সিগারেট আঙ্গুলে চেপেই বৃদ্ধা আঙ্গুলে লেপ্টে দেয় ইফরাহর গোলাপি রঙ্গের লিপস্টিক।
আরাধ্য আরো ঝুঁকে যায়, আলতো করে চুমু খায় ঠোঁটের কোনে। ইফরাহর কি হলো কে জানে? অ্যালকোহলে কড়া গন্ধ সাথে নাকের কাছে সিগারেটের বিকট ঘ্রাণ টুকু আসতেই, এবারে গা গুলিয়ে এলো তার। এক ঝটকায় আরাধ্য কে সরিয়ে ছুটে গেলো ওয়াস রুমের দিকে।
পেটের সকল খাদ্যকণা এক নাগারে বমি করে বের করলো। পরপর দুইবার বমি করতেই শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ল। আরাধ্য শুধুই চেয়ে দেখলো ইফরাহর অবনতি। তার নিশ্চয়ই উচিত ছিলো ইফরাহর কাছে তবে গেলো না।
ইফরাহ বেড়িয়ে এলো। একই ভাবে আবারো আরাধ্যের পাশে গিয়ে বসল। আরাধ্য বলল , “ শরীর খারাপ বলো নি কেনো ?”
ইফরাহ স্লান হাসল , “ ঠিক আছি।”
-“নেই!”
আজ আরাধ্য ভীষণ রকমের শান্ত। এই যে ইফরাহর অসুস্থতা তাকে অস্থির করে তুললো না। সব কিছুই কী কেবল নেশার প্রভাব ? আরাধ্য হঠাৎ ইফরাহ কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। শিরশির এক বাতাসেবেলকনির পর্দাটা খানিক কেঁপে উঠলো। ইফরাহ শান্ত চোখে আরাধ্য ভোলাভালা মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। আরাধ্য খানিক নড়ে চিত হয়ে শুয়ে বলল , “ আমার কাছে তোমার চাওয়া কী ইরা?”
-হঠাৎ এই প্রশ্ন ?
-জানতে ইচ্ছে হলো তাই।
ইফরাহ স্লান হাসল , যা চাইবো দেবেন ?
-নিশ্চিত থাকো।
ইফরাহ গাঢ় এক দীর্ঘশ্বাস নিংড়ে বলল , “ দীর্ঘতম জীবনের পুরো পথের সঙ্গী হিসাবেই আপনি থাকুন। ”
আরাধ্য দীর্ঘশ্বাস নিগড়ে বলল , “একটা সময়ের পর বোধ হয় তুমি বুঝবে। আমাকে নিজের করে চাওয়াটাই তোমার ব্যক্তি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ইরা। ”
ইফরাহ হাত রাখলো আরাধ্যে মাথায়। তাচ্ছিল্যের এক হাসি দিয়ে বলল , “ মানুষ এখন আর মানুষ খোঁজে না তারা খুঁজে সুবিধা। তবে আমিই বা ব্যতিক্রম কী করে হই। যখন মনে হবে তখন নাহয় আপনিই ভুলটা সুধরে দিবেন।
আরাধ্য স্বল্পতায় হাসল , “তুমি লাবণ্যে সেরা , গুণে রহস্যময়ী। তোমার মাঝেই ডুবেছি আমি। আপতত আমি ধ্বংসের পথযাত্রী।
-“ভাবনায় আবিষ্কৃত ভাবনা গুলো লুকায়িত সুন্দর ছোট নবাব।”
ইফরাহ থেমে গেলো। মনে মনে বিড়বিড় করলো , আমি আপনাতেই সীমাবদ্ধ , আপনাতেই আসক্ত। আপনি ব্যতিত সব ঘোলাটে বদনাম।
ইফরাহ ঘুমে গেছে। ইফরাহ তখনো চুলে হাত বুলাচ্ছে বেশ লাগছে কিন্তু। খানিক বাদে গুণগুণ করে গান ধরলো ,
ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৫
“যখন পড়বে নি মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,
আমি বাইব না , আমি বাইব না আর মোর খেয়াতরী এই ঘাটে গো
যখন পড়বে নি মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,
চুকিয়ে দেব বেচা কেনা,
মিটিয়ে দেব গো, মিটিয়ে দেব লেনা দেনা বন্ধ
হবে আনাগোনা এই হাটে।
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,
তাঁরার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে।
যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে।”
