Home ছায়াস্পর্শ ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৫

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৫

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৫
জান্নাত চৌধুরী

ঘরের মাঝে আরাধ্যের সেই আরাম খাওয়া চেয়ারটার শব্দ হচ্ছে। তবে আজ ওটাটে আরাধ্য বসে নি ইফরাহ বসেছে। বরাবরের মতো আটপৌরে শাড়ি পড়েছে সাথে হালকা পাতলা গহনা। লম্বা চুলগুলো ছেড়ে রাখা ,যেটা কিনা চেয়ার পেরিয়ে মেঝেতে পড়ে রয়েছে। আজ একটা জিনিস যুক্ত হয়েছে সাজের সাথে , ইফরাহ আলতা পড়ছে! সাদা পায়ে লাল রঙ্গা প্রলেপ বেশ স্নিগ্ধ। হাতে মোটা রুলির বালা, এ সাজ যেন বড্ড মানিয়েছে মেয়েটাকে। সাদা মনির চোখ জোড়া ইফরাহর আকর্ষণ;
| ব্যবচ্ছেদ |
“ও দাদিজান এইসব কী বলছেন আপনি? আপনার কথা আমার মাথায় ঠুকছেনা। এই তো ক‌ইলেন , ব‌উরানী নাকি ছোট খন্দকারের বন্দী ঘরে রয়েছে। তবে , ব‌উ রানী ঘরে এলো কী করে ? আর ওই অফিসার যে ছোট নবাবের ভাই এইসব ছোট নবাব জানলো কেমনে?
পাখির কথায় মুসকি হাসলো জামিলা বেগম। এক খিলি পান গালে গুজে চিবোতে শুরু করলো। বেশি করে খয়ের ,চুন দিয়ে পান খান জমিলা বেগম। কয়েকবার চিবিয়ে একটু থুতু ফেলে বললেন ,

-এতো সময়েও বুঝলি না মেয়ে , ছোট খন্দকারের মনচোরা ছিলো আমাদের ব‌উরানী। তাই তো তার ক্ষতি কিংবা আঘাতের করার কথা স্বপ্নেও কল্পনা নেই তার।
পাখি অবুঝের ন্যায় বলল , “সেসব নাহয় বুঝলাম দাদিজান তবে, ছোট খন্দকার যে প্রতিশোধের কথা বললো। সে প্রতিশোধের শাস্তি নিশ্চয়ই খন্দকার সাহেবের ও পাওয়া উচিত। কেনো না তিনিও তো ছিলেন ব‌উরানীর মাকে ধর্ষণ ও হত্যায়।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

-পাপ বাপ কে ছাড়ে না মেয়ে! এ কাহিনীর শেষ জানা অব্দি আমাদের অপেক্ষা করা উচিত।
ঘড়ির কাঁটায় রাত তখন তিনটে। জামিলা বেগম পানের পিচ ফেলে বললেন , “ ফ্যানের বাতাস টা খানিক বাড়িয়ে আয় তো পাখি।
বাকি কাহিনী আমি খানি আরামে বসে বলি।”
পাখি উঠে গিয়ে রেগুলেটর ঘুরিয়ে ফ্যানের পাওয়ার বাড়িয়ে এলো। জামিলা বেগম তখন খাটের পার্সিতে বালিশ ঠেকিয়ে বসেছে। পাখি গিয়ে তার সামনে বসলো। মনে অনেক প্রশ্ন খোঁচ খোঁচ করছে। অতঃপর মনের সকল প্রশ্ন কে প্রাধান্য দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ আইচ্ছা দাদিজান, একখান ক‌ই আপনেরে?”
জামিলা বেগম শুধু চেয়ে র‌ইল। পাখি বলল , “ এই যে ছোট খন্দকার ক‌ইলো ব‌উরানী সব জানে! তয় এটা কবে জানছে?
জামিলা বেগম গাঢ় এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। এরপর চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো,

সময় তখন সবে গ্রীষ্মের শুরু।
এক পূর্ণিমার রাতে খন্দকার সাহেব এলেন ইসমাইলের শেখের বাড়িতে। ইসমাইল শেখ সময় শহরে গিয়েছে কোনো এ দরকারি কাজে। রাত তখন প্রায় নয়টা নাগাদ। সবে মাত্র দশম শ্রেণীতে উঠেছে ইফরাহ। রাত জেগে পড়তে পড়তে এক ঘেয়েমি হয়ে উঠেছে মন। মনের স্বস্তির প্রয়োজন তার;
রাত বিরাতে আকাশের দিকে চেয়ে থেকে বড়বড় কিছু দীর্ঘ শ্বাস নিংড়ে ফেলা তার জন্য বড় স্বস্তির কাজ। সৃষ্টি কর্তা হয়তো মাথার উপর আকাশ দিয়েছেন তার সৌন্দর্যে মোহনীয় হয়ে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়তে।
এইযে বিশাল আকাশের গায়ে রাজত্ব করার জন্য একখান চাঁদ দিয়েছেন। চাঁদের কিরণ দিয়েছেন , নিশীথ রজনীকে আলোকময় করতে। একাকিত্ব চাঁদের সঙ্গিনী করতে দিয়েছে লক্ষ লক্ষ তারা। ইফরাহ বেশ গভীর চোখে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে , চাঁদের গায়ে দাগ রয়েছে। ওটা কিসের দাগ সুন্দর চাঁদের গয়ে কী তবে ওটা কলঙ্কের দাগা। আচ্ছা চাঁদে কলঙ্ক রয়েছে?

চাঁপা স্বরে কারা যেন তর্ক করেছে। কে করছে ?
ইফরাহ কান পেতে শুনতে চাইলো। তবে এখন আর তর্ক কানে আসছে না। খানিক বাদে আবারো কারো কন্ঠ শুনতে পেলো সে। এক পুরুষ কন্ঠ ইফরাহর কপালে ভাজ উদয় হলো। আব্বাজান নেই তবে এই বাড়িতে কি করে পুরুষ এলো। একটু বাদে জহুরা বেগমের ধরা কন্ঠ শুনতে পেলো। মহিলা কিছু নিয়ে কথা বলছেন সাথে কাঁদছেন তিনি।
ইফরাহর ধৈর্য্য হার মানলো , বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারলো না। উঠে দাঁড়িয়ে জানালার বাহিরে দৃষ্টি দিলো। পশ্চিম‌ দিকে ইসমাইল শেখের ঘরের কাছে একটা আইল আছে, সেথায় দুটো ছায়া নজরে এলো। ইফরাহ আন্দাজ করলো একটা হলেন সেই লোক যার কন্ঠ ইফরাহ শুনেছে, দ্বিতীয় জন জহুরা বেগম।

বেশ অনেক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চাইলো পরিস্থিতি। রাইসা গভীর ঘুমে তাকে জাগানোর ইচ্ছে থাকলেও ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আর ইচ্ছে জাগলো না। ইফরাহর বেড়িয়ে‌ গেলো ঘর ছেড়ে। লোকটাকে দেখা আবশ্যক,
গেট পেরিয়ে ক্ষেতের আইলের ধারে আসতেই দেখলো জহুরা বেগম কাঁদছে। কি আশ্চর্য ! ইফরাহ ঘর হতে একজন লোক দেখেছে অথচ এখানে তিনজন লোক রয়েছে। একজন খন্দকার সাহেব , অপরজন উড়ান খন্দকার আর তৃতীয় মানুষ টি হলেন মাতব্বর সাহেব। ইফরাহ জানে মীরপাড়ায় খন্দকার বাড়ির লোক আসা নিষিদ্ধ। ওই তো খুব প্রয়োজনে রাতে আঁধারে লুকিয়ে চুড়িয়ে যা একটু ঢুকতে পায় এতেই শান্তি। তবে বড় অবাকের বিষয় হলো খন্দকার বাড়ির সাথে মাতব্বর সাহেব যোগ সুত্র। ভাবনার মাঝে একটা কথা স্পষ্ট শুনতে পেলো ইফরাহ। ছোট খন্দকারের সাথে ইফরাহর বিবাহের প্রস্তাবনা;

ইফরাহ খানিক আড়ালে দাঁড়ালো , সম্পূর্ণ কথাগুলো শুনতে মন খোঁচাখুঁচি করছে তার। মধের বিরোধীতা তার ভীষণ অপছন্দের কাজ।
খন্দকার সাহেব বললেন , “ তোমার বড় মাইয়া আমার পোলার ব‌উ হ‌ইবো জহুরা ! এ কথা বেশি আর কোনো কথা নাই আমার; ”
জহুরা বেগম আপাত্তি জানালেন , “ইরার লাইগা চেয়ারম্যান সাহেব বহুত আগেই প্রস্তাব রাখছে খন্দকার সাহেব‌। আর ছোট নবাব ইরার উপ্রে নড়র রাখে। আমি নিজের মরণ ডাকতে এই কাজ করতে পারুম না !”
মাতব্বর সাহেব শুনলেন দুইজনের বক্তব্য , খানিক চুপ থেকে বললেন – শুনো জহুরা , ভুইলা যাইও না ইসমাইলের বড় ব‌উ তোমার ব‌ইন আছিলো এই কথা খান আমি জানি। গ্রামের কেউ না জানলেও এই সত্যি খান আমি জানি। আমি যদি যাইয়া ক‌ই তুমি পরিকল্পনা ক‌ইরা ওই ছেমরিরে দিয়া তোমার ব‌ইনের খুনের প্রতিশোধ নিবা তখন কি হ‌ইবো বুঝবার পারছো?

জহুরা বেগম ভীত হলেন না। তিনি শিক্ষিত নারী , ভয় পেলেই হেরে যেতে হয়। তিনি কড়া গলায় বললেন , “ ভুইলা যাবেন না ওই খুনের সাথে খন্দকার সাহেব আপনিও জড়িত। আপনারা দুইজন মিলে আমার আপারে খুন করছেন। দিনের পর দিন ধর্ষণ করছেন আমার আপারে।
খন্দকার ক্ষিপ্ত হয়ে চেপে ধরে জহুরা বেগমের গলা। উড়ানের এক চোখে অবাকের রেশ ,অপর চোখে ভয়। খন্দকার সাহেব বললেন ,
“ তোর আপারে মারছি ,তোরে মারতে কতক্ষন? ওই ছেমরি মীর ব‌উ হ‌ইলে তোরে জানে মা‌ইরা ফালামু শালি নষ্টার বংশ।
উড়ান দ্রুত এসে আটকে দেয় খন্দকার সাহেব কে। ভয়ার্ত গলায় বলে ,
আব্বাজান রাইত অনেক গ্রামের মানুষ জাগে গেলে সমস্যা হ‌ইবো শান্ত হন।
খন্দকার সাহেব বোধহয় বুঝলেন তিনি জহুরা বেগমের গলা ছেড়ে দিলেন। জহুরা বেগম কাশতে কাশতে কোনো মতে নিজেকে সামলে নিলো। মাতব্বর সাহেব বললেন , “ শোনো জহুরা , অতীত ঘাঁটে কী লাভ হ‌ইবো ক‌ও। চেয়ারম্যান সাহেব লালসায় তোমার ব‌ইনরে ভোগ করছে, আর খন্দকার সাহেব তোমার ব‌ইন রে ভালোবাসছে। কিন্তু তোমার ব‌ইন কি করলো ? খন্দকার সাহেব রে ছা‌ইড়া ইসমাইলের মতো এক চাষা রে বিয়া করলো। তোমরা তালুকদার বংশের মাইয়া , তোমাগো রানী কপাল , তোমরা দুই বোইন এক ইসমাইলের লাগি পাগল হ‌ইলা কেমনে?”

জহুরা বেগমের মুখে আলতো হাসি , “জানেন তো তালুকদার বংশের আভিজাত্য কী? কেমনে ভাবলেন আমরা ভয় পামু এই সামান্য হুমকিতে। যাই হোক , আমি ইসমাইলের লাইগা পাগল না! আমার আপার আমানত আমার ইরা। আর আমার ইরার জীবনের সিদ্ধান্ত আমি নিমু।
খানিক থেমে বলল , এই যে মাতব্বর সাহেল আপনার দুমুখো সাপের মতো স্বভাব। না জানি কবে ছোট নবাব আপনার গলা কাইটা করতোয়া ডুবায়।
-মায়াবতী কখন এলে আপনি?

উড়ানের ডাকে চমকে ওঠে ইফরাহ! সকলের দৃষ্টি তখন ইফরাহর উপর। খন্দকার সাহেব মূহুর্তে ঘোল পাল্টে মেকি এক হাসি দিয়ে কাছে ডাকলেন ইফরাহ কে। ইফরাহ এগিয়ে যায় সেদিকে, জহুরা বেগম ইফরাহ আগমনে শুষ্ক ঢোক গিললো খন্দকার সাহেব জিজ্ঞেস, “কেমন আছেন আম্মা? ”
ইফরাহ সৌজন্যে হাসলো। খন্দকার সাহেব আবার বললেন , “ শুনেছি মীর বাড়ি হতে আপনার বিবাহের প্রস্তাব এসেছে আম্মা। এ প্রস্তাবে আপনার ঘোর আপত্তি রাখা উচিত। মীর বাড়ির লোক আপনার আত্মাকে খুন করেছে। এ কথা জেনে নিন!

ইফরাহ শান্ত চোখে দেখলো জহুরার দিকে, খন্দকার হয়তো ঐ চাহনির কিছু টা বুঝলো।সে আবার বলল , “বিশ্বাস করছেন‌ না তাইনা আম্মা?না করলেন ; আমার জানানোর কাজ আপনারে জানাইলাম বাকিটা খান আপনার মর্জি।”
মাতব্বর সাহেব কিছু হয়তো বলতেন।‌তবে খন্দকার সাহেবের চাহনি তারে থামিয়ে দেয়। খন্দকার সাহেব সহ বাকি সকলেই চলে যায়।
জহুরা বেগম ডাকলেন , “ ঘরে চলো।”
জহুরা বেগম পা বাড়ালেন। ইফরাহ বলল , “ সব কিহ সত্যি আম্মা।”
জহুরা বেগম এসে মেয়ের মুখ চেপে ধরলেন , “ মরণে এত শখ কেন? যা শুনছোস মুখ বন্ধ রাখ।”
হিরহির করে টেনে ইফরাহ কে বাড়ির দিকে নিয়ে যায় জহুরা। তারা যেতে এক ছায়া আইলের দিকে এগিয়ে যায়। মাতব্বরের চতুর মস্তিষ্কের কাজে যেন সব ক্রিমিনাল বুদ্ধি ও হার মেনে যায়। সকলে চলে যেতেই এক বিশ্রী স্বরে হাসলো সে।

জহুরা বাড়ির উঠান পেরিয়ে ঘরের দিকে যাবে তবে তা হলো না। ইফরাহ প্রশ্ন করল , “ এতো লুকোচুরি কত কাল চলবে আম্মা! আপনি এড়িয়ে যেতে পারেন না আমায়।”
জহুরা বেগম থমকে দাড়ালো , “ যথা সময়ে সব জানবে এতো কৌতুহলী হলেই বিপদে পড়বে মেয়ে।”
ইফরাহ তাচ্ছিল্য হাসল , “বড় জোড় মৃত্যু আমায় আগলে নিবে , এর থেকেও বড় বিপদ কিছুই নেই আম্মা। ”
জহুরা বেগম ঘুরে তাকালো, “ তুমি হেরে গিয়ে মরবে বলে , তোমায় বাঁচাতে আমি এতো বছর কষ্ট করিনি মেয়ে। তোমায় প্রতিশোধ নিতে হবে।”

-কোন প্রতিশোধ আম্মা ?
-“আমার আপার মৃত্যুর প্রতিশোধ। তোমার আম্মার মৃত্যুর প্রতিশোধ ইরা!”
ইফরাহ অবুঝের ন্যায় চেয়ে থাকলো। জহুর বেগম এগিয়ে আসলো, ইফরাহর হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে বসলো বারান্দায়। মাটির নিচ হতে ঠান্ডা উঠছে , তবে এতে বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই তাদের। জহুরা বেগম ইফরাহ হাত নিজের হাতে মুষ্টিতে নিলো। শক্ত বাঁশ চেপে ধরলো ইফরাহর হাত। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল , “ আমরা তালুকদার বংশের মেয়ে ইরা। আমি আর তোমার আম্মা দুজনের বয়সের ফারাক বেশি একটা নয়। তালুকদার বংশে দুই পুরুষের কোনো কন্যা সন্তান নেই। শুনেছি যে বছর আপার জন্ম হলো সে বছরেই বড় আম্মার মৃত্যুর ঘটেছি। সদ্য দুগ্ধ জাত সন্তান দুধের লাগি কান্নায় ফেটে পড়তো‌ তাকে সামলানো ভীষণ রকমের মুশকিল হয়ে উঠেছিলো এরশাদ তালুকদারের কাছে। সন্তানের লাগি আবারো দ্বিতীয় বিয়ে করলেন এরশাদ তালুকদার। ঘরে এলো নাজমিন এরশাদ;
এ পর্যায়ে এসে দম নিলো জহুরা বেগম। ইফরাহ প্রশ্ন করল, নাজমিন এরশাদ কে আম্মা?

-আমার মা।
ইফরাহ এ পর্যায়ে চমকিত হলো। অবাক কন্ঠে বলল , “ আপনি আর আম্মা তবে সৎ বোন। ’
জহুরা বেগম খানিক হাসলো , “আমি আর রূপা আপা সৎ হলেও আম্মা কখনোই আমাদের তা বুঝতে দেয় নাই। বরং আমার থেকে বেশি রূপা আপারে বেশি সোহাগ করছে।”
ইফরাহ নিশ্চুপে শুনে থাকলো। জহুরা বেগম আবারো বলতে থাকে , “রূপা আপা রূপ, গুন সব দিকেই সেরা ছিলো। ঠিক যতখানি গুনবতী , রূপবতী তার থেকেও বেশি ছিলো মেধাবী। ধীরে ধীরে সকলের নজরে আকর্ষিত হয়ে উঠতে থাকলো রূপা। গ্রামের আনাচে কানাচে ছেলেদের নজর পড়তো তার উপর। অথচ ঘরের আরেক মেয়ের অযত্নে বেড়ে উঠতে লাগলো। আপা সুন্দর বলেই আম্মা সব কিছুতেগ বেশি গুরুত্ব দিতে লাগলো। আম্মা নিজের মেয়েকে দিনে দিনের পর দিন অবহেলায় তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে থাকলো‌।

সেবছর নবম শ্রেণিতে উঠেই আপার প্রেম হলো ইসমাইল খন্দকারে সাথে।
এই পর্যায়ে জহুরা বেগম কে থামিয়ে দিলো ইফরাহ। অবুঝের ন্যায় প্রশ্ন করল , “ ইসমাইল খন্দকার মানে আম্মা। আব্বা খন্দকার বংশের লোক। ”
জহুরা বেগম বুঝলো ইফরাহ কৌতুহল।‌ সে বলল , “ ইসমাইল খন্দকার, আর আজমাইন খন্দকার দুজনেই চাচাতো ভাই।”
এ পর্যায়ে বড় একখান শক খেলো ইফরাহ। জহুরা আবারো বলতে শুরু করলো।

ইসমাইল খন্দকারের সাথে প্রেম হলো রূপার , দুজনেই দুজনের লাগি পাগল।‌ তবে এই সম্পর্কের বিপরীতে ছিলো আজমাইন খন্দকার। আপার উপ্রে নজর ছিলো তার। আপার রূপে মজেছিলো আজমাইন খন্দকার। ইনিয়ে বিনিয়ে ইসমাইল খন্দকারের বাপ ইয়াকুব খন্দকারের কাছে আপার নামে ইনিয়ে বিনিয়ে হাজার খান কেচ্ছা কাহিনী শুনানো হলো। ইয়াকুব খন্দকার কড়া নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন এই প্রেমের , শত্রুতা আগমন ঘটলো দুই পরিবারের। আব্বাজান বহুবার আটকে রেখেছিলেন আপাকে। তবে আপা ছিলো তীব্র জেদি। সে তার প্রেম সফল করতে রাতের আঁধারে ইসমাইল খন্দকারের হাত ধরে পালিয়ে গেলো। দুজনের পরিচয় পাল্টালো , ইসমাইল খন্দকার থেকে ইসমাইল শেখ হলো পদবী। এইদিকে উত্তাল গ্রাম , আপার পালিয়ে যাওয়ার খবরে , আব্বা ভীষণ ভেঙ্গে পড়লেন। এলাকা শহর ভিন্ন ভিন্ন স্থানে আপার খোজ করা হলো‌। এক‌ই ভাবে ই খন্দকার বাড়ির লোকজন তাদের ছেলের খোজ খবর করতে লাগলো‌। তবে দুটো মানব যেনো উধাও হয়ে গেলো।

তবে , বিপদ যেনো ঘাড়ের উপর থেকে নামে না। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিপদেরর কাঁধেই আশ্রয় নিয়েছিলো তারা। মীর আহনাফ , বর্তমানের আমাদের গ্রাম্য চেয়ারম্যান যিনি। তার আশ্রয়েই পালাতক ছিলো আপা আর তোর আব্বা।
জহুরা বেগম আবারো দম নিলো। গলা ধরে আসছে তার , তবুও যেন
সত্যের জাল কাটতে অটল সে। খানি চুপ থেকে আবার বলল , “ মীর আহনাফ তাদের সাহায্য করেছিলেন। শুরু দিকে বেশ ভালো চলছিলো আপা আর তোর আব্বার সংসার। তবে বিপত্তি ঘটলো মাস দুয়েক পর, এক ঝড়ের রাতে যখন সদ্য বিবাহিত এক‌নারীর টসটসে চেহারায় নেশা ধরলো চেয়ারম্যানের। আপার রূপ তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিলো।

সাহায্যের আড়ালে আপারে ভোগ করার এক ভয়ংকর নেশা তার মস্তিষ্ক স্থান করে নিলো। এক ছাদের নিচে বসবাস করতে করতে আপার প্রতি তার লোভ বৃদ্ধি পেতে শুরু করলো‌। সুযোগ সন্ধানী চেয়ারম্যান ক্রমে ক্রমে ওত পেতে থাকতে শুরু করলো আপাকে এক বার কাছে পাবার জন্য। তবে তার আগেই গর্ভে আগমন হলো তোর।
বোধ হয় খানিক সময়ের জন্য বেঁচে গেলো আমার আপা। তবে ওই যে
বলেনা বাঁচাতে চাইলেই কী বাঁচা যায়। ঠিক যখন তোর আগমনী ঘটলো এই দুনিয়ায় তার ঠিক মাস খানেক বাদেই। নিখোঁজ হলো আমার আপা। কোথায় গেলো , কি করে হারালো কোনো খবর মিললো না। তোর আব্বা তোরে নিয়ে গ্রামে ফিরলো‌ , দেখাশোনার লাগি আমি এলাম এ ঘরে। মায়া জন্মে গেলো, আপার নিখোঁজের বছর পেরিয়ে এলো , আপার খোজ মিললো না। গোপনে খবর লাগালাম থানা পুলিশ , বহু কিছু খবরাখবর সংগ্রহ জানতে পারলাম। আমার আপার বন্দি দশার কথা। তাকে ছাড়ানো চেষ্টা করেছিলাম ; তবে সেটাই হয়তো আমার আপারে দুনিয়া ছাড়া করলো। জানোয়ারের দল সে রাতেই আপারে খুন করলো। লাশ দাফন করলো , মীর বাড়ির বাগানের জমিতে।

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৪ (২)

চোখ দিয়ে পানি ঝড়ছে জহুরার। ইফরাহ দৃষ্টি শান্ত তবুও শরীরের প্রতিটি লোমকূপ দাঁড়িয়ে পড়েছে তার। কথার মাঝেই ইফরাহ হাত আরো শক্ত করে চেপে ধরলো জহুরা , “ ওই মীর বাড়িতে আমার আপার লাশ দাফন হয়েছে ইরা।‌ তোর আম্মারে ওরা কষ্ট দিয়ে মারছে। তোর আম্মারে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে যৌন হয়রানি করেছে। ওই খন্দকার আর চেয়ারম্যান। আমার আপার মৃত্যুর শাস্তি ওদের দিতে হবে‌;
প্রতিশোধ নিতে হবে ইরা! প্রতিশোধ;
ইফরাহ সরল চোখে চেয়ে থাকলো শুধু। জহুরা বলল , মীর বাড়ির ব‌উ হয়ে ও বাড়িতে যেতে হবে। প্রস্তুতি নাও!

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৬