ছায়াস্পর্শ শেষ পর্ব
জান্নাত চৌধুরী
আযানের পর একবার বদ্ধ কোঠার ঘরে এলো উড়ান। তাইয়্যেবা স্বামীর লাশের পাশে বসে রয়েছে। ঠিক যেন জ্বর বস্তুর ন্যায় ,আযানের চোখ গলে রক্ত পড়ছে। বুকে ভেতর সেই রূপার কাঠি ঠুকানো। উড়ান ঘরে প্রবেশ করেই চমকিত স্বরে ডাকল, “ আ.. আপা! “
তাইয়্যেবা তাকলো। তার চোখে কী বেদনা? নাকি অন্যকিছু, উড়ান বুঝলো না সে ভাষা। তাইয়্যেবা হাত ইশারায় ডাকতেই উড়ান ভাইয়ের লাশের কাছে এসে বসল , “ আপা , ভাইজান ? ভাইজানের কী হয়েছে আপা?”
তাইয়্যেবা কথা বলল না, উত্তরে কেবলি খানিক মলিন হাসল। উড়ান ঘরে চোখ বুলালো, ইফরাহ কোথাও নেই। রক্ত চোখে প্রশ্ন করলো ,
“ আমার প্রিয়তমা কোথায় আপা? “
-“পালিয়েছে!”
উড়ান অবাক কন্ঠে আওড়ালো , পালিয়েছে?
-“জ্বি!
উড়ান অপেক্ষা করলো না। তার সন্দেহ ইফরাহ খুন করে পালিয়ে সে উঠে দাড়ালো। একটুও অপেক্ষা না করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।
তাইয়্যেবা তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে কেবলি হাসল।
ছুটতে ছুটতে হাপিয়ে উঠেছে ইফরাহ। কোথায় ছুটছে জানা নেই। জঙ্গলের পথ পেরিয়ে নদীর ওইপার ছোট এক গ্রাম। তার কী গ্রামে যাওয়া উচিত ? উচিত ! একশ বার উচিত ! তার বাঁচতে হবে , ওই লোকটার সন্তান তার গর্ভে তাকে বাঁচাতে হবে।
পা দুটো ভেঙ্গে আসছিল ইফরার । জঙ্গলের পথেই ছুটে আসছে উড়ান, চেঁচিয়ে ডাকছে , “ প্রিয়তমা।”
ইফরাহর কানে বাজলো বোধ হয় সেই ডাক। না এটা ভালোবাসার ডাক নয় , এক অমানুষের ডাক। ইফরাহ হাঁপিয়ে যাওয়া শরীর টাহ টেনে টেনে আবারো ছুটলো। ডিঙ্গিতে পার হতে হবে তার। নদীর পার হতে হবে , সাঁতরে পার হবার শক্তি অবশিষ্ট নেই তার। ব্যতিক্রম ঘাটে এক ভাঙ্গা চোড়া নৌকা রয়েছে। ইফরাহ কোনো নৌকার কাছে এলো।!
হাফ ছাড়লো , পেটের নিচে ভীষণ ব্যথা করছে তার। নোকাতে বসার আগে ঘাঁটে এক বাঁশ টেনে ভাঙ্গলো। নৌকা চালাতে বাঁশ কাজে লাগাবে সে।
উড়ান ছুটছে, জঙ্গল পেরোনো আগে হঠাৎ কোমরের লোডেড পিস্তল পড়ে যায় তার। থমকে দাড়ালো সে, ঘাসের উপর থেকে আবারো পিস্তল তুলে ছুটতে লাগল।
‘ততক্ষণে নদী পাড় হয়েছে ইফরাহ। বালুর চর পেরিয়ে চরের বস্তির দিকে ছুটছে। ক্লান্ত দেহ টা সবর চাইছে , গলা শুকিয়ে এসেছে তার। দেহ টাকে টেনে টেনে গ্রামের দিকে ছুটলো।
আরাধ্যের কাছে খবর পৌঁছেছে চেয়ারম্যানের লোক , বেলা তখন ১০ টাহ , আজ কেস কোটে উঠার কথা তবে তার আগেই থানা থেকে আসামি হাপিস হয়েছে। রেজা , আরাধ্য , কাব্য তিনজনেই লাপাত্তা।
আরাধ্য জেল হতে বেরিয়েছে পুলিশ পিছু নিয়েছে। কাব্য প্রাণ পণ চেষ্টা করেছে গাড়ি চালিয়ে পুলিশের আড়াল হতে। পরপর আরো তিনটে গাড়ি ছুটছে তাদের পিছনে। পুরো ডিপামেন্টের আনাচেকানাচে খবর ছড়িয়েছে, আরাধ্য পালিয়েছে। কেস মজবুদ, এই কেসের জামিন হবার নয়। প্রায় দুই ঘন্টার মাথায় কাঁচা গলির পথ নিয়েছে কাব্যের গাড়ি। এদিকে গাড়ি ঢুকানোর পথ নেই।
মোড়ের শেষ মাথায় গাড়ি রেখেই ছুটছে তিনজন । জঙ্গলের পথ টাই একদম নিরাপদ তাদের পালানোর। রেজা ছুটছে প্রথমে , দ্বিতীয় স্থানে আরাধ্য এবং শেষ অবস্থানে কাব্য। জঙ্গলের পথে এসে দুই ভাগে ভাগ হলো তিনজন। রেজাকে থামল আরাধ্য,
হাতে একটা ছোট সেল ফোন দিয়ে খন্দকার বাড়ির পথে পাঠানো হলো তাকে। আরাধ্য কাব্য জঙ্গলের পথে ছুটলো। প্রথমেই খন্দকারের বদ্ধ কুঠিরের দিকে নজর বুলালো তারা। সেদিকে বন্দি নেই ,
আরাধ্য ঘা ঢাকা দিলো জঙ্গলের পথেই। কাব্য সঙ্গি হলো তার , ইফরাহর খোঁজ প্রয়োজন। ভীষণ রকমের প্রয়োজন !
গ্রামের এক কুঠিরে আশ্রয় পেয়েছে ইফরাহ। মহিলাকে চিনে না , এটা পল্লি , নিষিদ্ধ পল্লি। তবে মহিলা ইফরাহ ক্লান্ত শরীরটাকে ধরে ধরে ঘর অবদ্ধি নিয়ে গিয়েছে। ইফরাহ বলল , “ আ.. আমাকে কিছু খাবার দিবেন আম্মা ! আমার গা গুলিয়ে আসছে !
মহিলা করুণ গলায় ডাকল , “ বউরানী ! “
ইফরাহ চমকিত হলো , বিপদের ভয় যেন আরো আঁকড়ে ধরলো তাকে। ইফরাহ জিজ্ঞেস করল , “কে কে আপনি ?”
মহিলা হাসল , “ আমায় তুমি চিনবে না মেয়ে। তবে , আমি তোমার আপন ?”
-আপন হলেও পরিচয় প্রয়োজন ?
মহিলা হাসল , “ কোন পরিচয় নিবে মেয়ে ? এই পল্লীর সর্দানীর নাকি .. এর বাহিরের ?
ইফরাহ খানিক ভাবুক হয়ে বলল , “ দুটোই।”
-আগে খেয়ে নাও , ক্লান্ত তুমি !
-আগে পরিচয় !
মহিলা তাচ্ছিল্য হাসল , “ তোমার তেজ ঠিক তোমার আম্মার মতো!”
-কথা ঘুমাবেন নাহ !
-বিলাসী আমি! এর বাহিরে আর কোনো পরিচয় নেই আমার !
-এবারেও মিথ্যা আওড়াচ্ছেন।
বিলাসী অবাক হলো , “ কেনো বলো তো ?”
ইফরাহ খানিক গা এলিয়ে বসলো ,পেটে ওপর আলগোছে হাত রেখে বলল, “ খানিক আগেই বলেছেন দুটো পরিচয়! ”
বিলাসী আবারো হাসল , “ প্রথম পরিচয় হারিয়েছি বহু আগে। তবুও শুনতে চাইছো কেন ?
-যদি সেটা আপনার প্রথম পরিচয় হয়। তবে , ওই পরিচয়েই আপনি পরিচিত!
-নই।
ইফরাহ জিহ্ব দিয়ে মারি আটকালো , “ তবুও জানতে চাই ! ”
-অপরাজিতা মেসবাহ!
ইফরাহ খানিক চমকালো কী না সঠিক বুঝা গেলো না। তবে সে বিলাসীর পা থেকে মাথা অবধি ভালো করেই দেখে বিরবির করে আওড়ালো , “ মীর বাড়ির ছোট গিন্নী?”
বিলাসী পানসে মুখে বলল , “ বসো মেয়ে খাবার আনছি।”
খন্দকার বাড়ির পথ পেরিয়ে , রেজা ঢুকলো মীর বাড়ির পথে , ঘন জঙ্গল পেরিয়ে কালকুঠুরির গোপন পথে মীর বাড়িতে ঢুকেছে সে। রাইসা জানালার ধারে বসে কিছু একটা ভাবছিলো বোধ হয়। তরিঘড়িতে ঘরে ঢুকলো রেজা। ব্যস্ত হাতে ঘরের দরজা লাগিয়ে ডাকল, ”রাই”
রাইসার ধ্যান ভাঙ্গলো , ছুটে এসে আঁচড়ে পড়লো রেজার বুকে বুকে। খানিকক্ষণ পড়ে থেকে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে ,
-আপনি এসেছে , এসেছেন আপনিই?
রেজা হাত রাখলো তার কিশোরী বউয়ের মাথায় , “ আমায় তো ফিরতেই হতো রাই। ”
রাইসা বুক হতে মাথা তুললো। রেজা জখমকৃত মুখে হাত বুলিয়ে বলল, “ এতো দেরি করলেন কেনো আপনি ? ”
রেজা দ্রুত ভঙ্গিতে রাইসার ললাটে চুমু খেলো , “ পুলিশ খুঁজছে রাই , বউরানী লাপাত্তা। সব মিলিয়ে তোমার প্রশ্নের উত্তর করার সময় নেই। ”
রাইসার কান্নার জোড় বৃদ্ধি পেলো , “ আপা পোয়াতি বাজে ছেলে , এই অবস্থায় আমার আপার কিছু হবে না তো?
রেজা আবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,”কী বলছো ?”
– “ সঠিক বলছি, আপা পোয়াতি!”
রেজা খুশি হবে নাকি দুঃখ প্রকাশ করবে জানা নেই তার। তবে সে নিশ্চিত বউরানীর কিছু হলে আরাধ্য কে সামলানো যাবে না। রেজা বলল, “ দুটো ভাত হবে রাই। বড্ড ক্ষিদে পেয়েছে আমার, দাও না দুটো ভাত। “
রাইসা ব্যস্ত গলায় বলল, “ খানিক অপেক্ষা করুন বাজে ছেলে আমি আনছি। “
পুলিশের গাড়ির সাইরেন বাজলো। রাইসা ভাত আনতে পা বাড়ানোর আগেই রেজা বলল , ক্ষিদে বোধহয় শরীর অচলই হয়ে উঠবে এবার , তোমার হাতের ভাত আর গিলা হলো না রাই। “
রাইসার বুকে মোচড় কাটলো। রেজা বলল , “ আমায় যেতে হবে রাই !”
-একটু খানি অপেক্ষা করুন।
পুলিশের গাড়ি প্রায় সদরের কাছে এসেই পড়েছে বোধ হয়। রাইসা কয়েকটা শুকনো বিস্কুট সাথে এক বোতল পানি হাতে ধরিয়ে রেজা। রেজা পরক্ষনেই আবারো রাইসা ললাটে চুমু খেয়ে ছুটতে নিলেই আঁটকে দিলো রাইসা। আঁচড়ে পড়লো রেজার ঠোঁটের উপর। রিতিমত যুদ্ধ করলো রেজার ঠোঁটের উপর , কামড়ালো মূলত।
পুলিশ সদর কাছে আসার আগেই বাড়ি ত্যাগ করলো রেজা।
ইফরাহ কে খাইয়ে , খানিক বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ করে দিলেন বিলাসী। প্রায় সন্ধ্যা নামার আগেই ঘুম ভাঙ্গলো মেয়েটার। বিলাসী এসে পাশে বসলো , “ শরীর কেমন লাগছে মেয়ে।”
প্রতি উত্তরে কেবলি মলিন হাসল ইফরাহ। বিলাসী একটা ছোট সেল ফোন বের করে হাতে দিলো ইফরাহ , “ ছোট নবাব জেল পলাতক , আমার ছেলের কাছে খবর পেলুম। একখান কল করে দেখো।
আজ বোধহয় বিপদ ঘাড়ের উপ্রে আসার দিন ইফরাহ। আরাধ্য জেল পলাতক কথাখান কেবলি কানে বেজেই চলেছে তার। তবে লোকটাকে তার প্রয়োজন ভীষণ প্রয়োজন । আরাধ্য একবার বলেছিলো সে না থাকলে এই সমাজ তাকে ছিড়ে খেতে চাইবে। হচ্ছে তাই আজ তার সন্তান কে বাঁচাতে কত লড়াই করতে হচ্ছে তার। ইফরাহ কী এতো সাহসী নাকি!
ইফরাহ কাঁপা কাঁপা হাতে আরাধ্য নম্বর ডায়াল করলো। দুবার বেজে বেজে কেটে গেলো কল , তৃতীয় বারে রিসিভ হলো। দুপাশেই কেউ কথা বলছে না। ইফরাহ নিঃশ্বাস ছাড়লো , সঙ্গে সঙ্গেই অপাশ হতে আরাধ্যের ব্যাকুল কন্ঠ ভেসে , “ ইরা।”
ইফরাহ নিশ্চুপ থেকে শুনলো কেবলি। আরাধ্য বলল , তোমার নিঃশ্বাসে কেবলি উদাসীনতা , এতো উদাসীন হওয়া ঠিক নয়। কঠোরতায় পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। আমি ঘাঁটে পৌছেছি, আসছি।
ইফরাহ ডুকরে উঠলো! আরাধ্য ধমকে বলল , “ কাঁদবে না, একদম না। আসছি আমি ! ”
ফোন কেটে গেলো। দরজায় কড়া পড়ছে , বিলাসী উঠে দরজা খুলতেই দেখলো উড়ান দাড়ানো সেথায় , বিলাসী খানিক চমকিত কন্ঠে বলল , “ ছোট খন্দকার আপনি ? ”
উড়ান কেমনে জানি হাসল , “ আরে বিলাসী রানী যে ? কি খবর রানী।”
বিলাসী মলিন হেসে বলল , “ জ্বি ভালো , তা হঠাৎ এ পথে, মেয়ে লাগবে নাকি ছোট খন্দকারের ?”
উড়ান খানিক হেসে বলল , “ পুরুষের জন্য নারীর প্রয়োজনীয়তা কতখানি ?”
বিলাসী পানের পিচ মাটিতে ফেলে ডাকল , “ চম্পা , এই চম্পা! ”
পশ্চিম ঘরগুলো থেকে এক মেয়ে হেলে দুলে এসে হাজির হলো , পড়নে একটা খয়েরি শাড়ি। পেটে অর্ধেকাং উলঙ্গ। শাড়ির আঁচল বুকের খানিক নিচে। ধীরে ধীরে এসে গালে হাত ছোঁয়ালো উড়ানের!
বিলাসী বলল , “ সাহেবের মনোরঞ্জন করো চম্পা !
চম্পা উড়ানের পা থেকে মাথা অবদ্ধি দেখে। উড়ানে সগঠিত দেহের উপর যে কোনো নারী ললসায় তাকাবে। চম্পা বলল , “ চালো সাহেব মেরে কামড়া মে চালো!”
উড়ান কেমন করে জানি তাকলো ! চম্পা উড়ানের দেহে হাত দেবার আগেই উড়ান এক ঝটকায় ছুড়ে ফেললো চম্পাকে। চম্পা ব্যাথায় আহ সুচক আওয়াজ করলো। উড়ান রাগী কন্ঠে বলল, “ ছুঁতে আসবি তো যৌনাঙ্গে পেরেক দেবো শালি। পরে হাতরেও লাভ হবেনা !”
চম্পা খানিক অপমানিত হলো বোধহয় , তবুও নিজেকে সামলে উঠে এলো সে। এবারে আর হিন্দি নয় খাটি বাংলায় বলল , “ নারী সঙ্গ চাও না তো এই পল্লি কী তোমার?”
উড়ানের শান্ত মস্তিষ্ক বিগড়ে দিতে আর কোনো বাক্যের প্রয়োজন হলো না। তেড়ে গিয়ে চেপে ধরলো চম্পা গলা। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল , “ তবে রে চুতমারানি , এতো জ্বালা শরীরে। একবার যখন বলেছি কাছে আসবিনা তবুও মুখ বন্ধ থাকে না তাই না?”
চম্পার দম কমে আসছিলো। বিলাসী দরজা হতে সরে এসে থামালো উড়ান কে , “ কি করছেন খন্দকার সাহেব মরে যাবে ছেড়ে দিন ওকে।”
উড়ান কে টেনে সরিয়ে আনলো বিলাসী। চম্পা কাঁশতে কাঁশতে ঘরের দিকে গেলো। উড়ান নিজেকে সামলে বলল ,“ বউ রানী এসেছে এই পথে।”
বিলাসী চোরা দৃষ্টিতে ঘরের দিকে তাকলো একবার তার দম নিয়ে বলল , “ বউ রানী বলতে আপনি কী মীর বাড়ির বউরানীর কথা বলছেন খন্দকার সাহেব? “
-জ্বি ! এসেছে সে ?
বিলাসী হাসল , “ বড় বাড়ির বউরা কী এই পল্লিতে আসে খন্দকার সাহেব?”
-বিপদে পড়লে আসে , এসেছে কিনা বলুন?
-আসে নি!
-কথাটা বিশ্বাস যোগ্য হলো না বিলাসী মাসি !
ইফরাহর বেড়িয়ে যাবার কথা এতক্ষণে। বিলাসী শুষ্ক ঢোকে গলা ভিজিয়ে বলল , “ঘর তল্লাশি করুন তবে!”
উড়ান খানিক চুপ থেকে বলল , ওদিকে কারো ঘরে কী এসেছে? বলতে পারেন ?
বিলাসী মাথা ঝাঁকালো , “উহু”
উড়ান খানিক বিলাসী মুখে দিকে তাকিয়ে থেকে বলল , “ চলুন তবে আপনার ঘরেই গিয়েই বসি। “
বিলাসী খানিক চমকিত হলো , “ কিহ !”
উড়ান বাঁকা হাসল , “ কিহ নয় জ্বি চলুন। ”
-হ্যা চলুন।
বিলাসী ভীত হয়ে ধীরে ধীরে পা বাড়ালো ঘরের দিকে।উড়ান পিছনে এলো তার। ঘরে এসেই উড়ান পুরো ঘরে চোখ বুলালো। ইফরাহ কোথাও নেই। বিলাসী হাফ ছাড়লো। মেয়েটা পালাতে পেরেছে বড় বোধ হয়।
বিলাসী ঘরের পর্ব দিকে এক দ্বিতীয় দরজা রয়েছে। এদিকটা পুরোটাই ঘাঁটের দিকে যায়। উড়ানের চোখ দরজার দিকে পড়তেই সে আর দাঁড়ালো না এক মূহুর্ত ছুটে বেড়িয়ে গেলো ঘরে ছেড়ে।
চারদিকে মাগরিবের আযান পড়ছে। আরাধ্য ,কাব্য দুজনেই সাতরে ঘাট পাড় হয়েছে। ভেজা কাপড়ে ঘাটে আসতে নজর পড়লো ইফরাহর দিকে। আরাধ্য ছুটে গেলো সেদিকে। তবে তার চোখ জোড়া আবদ্ধ হলো উন্মাদের মতো ছুটে আসা উড়ানের উপর।
উড়ান পিছনে আসছে ইফরাহর। আরাধ্য গিয়ে ইফরাহ কে ধরলো , ইফরাহ ঘনঘন দম ছাড়ছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে মেয়েটার। আরাধ্য তাকে বুকে সাথে চেপে ধরলো যেন ছাড়লেই কোথাও পালিয়ে যাবে মেয়েটা।
ইফরাহ ব্যস্ত গলায় বলল , “ চলুন ! চলুন পালাতে হবে উনি উনি উন্মাদ , শেষ করে দিবে সব। ”
আরাধ্য বুঝলো না ইফরাহ কথা। আরাধ্য প্রশ্ন করলো , ”হয়েছে কী ইরা?”
উড়ান বোধহয় এই সময়ে আরাধ্য আগমন মোটেও আশা করেনি। খানিক দূরে থেমে গেলো সে , ইফরাহ আবারো বলল , “ আপনি পালিয়েছেন কেনো ?”
-তুমি বলো কী হয়েছে ?
ইফরাহ নিঃশ্বাস নিতে পারছেনা আরাধ্য মুখে মুখ লাগিয়ে খানিক শ্বাস দিলো মেয়েটার। উড়ানের সহ্য হলো হয়তো , হাওয়াতে গুলি ছুড়লো সে। আরাধ্য চমকিত হয়ে সরে দাড়ালো খানিক। কাব্য নিজের রিভালবার বের করে তাক করলো উড়ানের দিকে। উড়ান গা দুলিয়ে হাসল , “ অপরাধী কে বাঁচাচ্ছেন অফিসার? ”
কাব্য দাঁতে দাত চেপে বলল , “ সে অপরাধী হলে আপনিও সমান। ”
উড়ান গুলি ছুড়লো , তবে গুলি মিস হলো। বিপরীতে কাব্য গুলি ছুড়লো সেটা মিস হবার নয়। একদম বাম হাতের মাংস ছুয়ে গেছে গুলিটা। অথচ ব্যথার বিন্দুমাত্র ছাপ প্রকাশ পেলো না উড়ানের মুখে। উড়ান হাসছে , কাব্য খানিক অবাক হয়ে অন্যমনস্ক হতেই। উড়ান ঠিক কাব্যের হাতের সই গুলি করল। মূহুর্তেই হাতেই রিভালবার মাটিতে পড়লো। আরাধ্য ছুটে গিয়ে কাব্য কে আগলে নিলো।
এবারে উচ্চস্বরে হেসে উঠলো উড়ান। দ্বিতীয় দফায় আরাধ্যের দিকে পিস্তল তাক করলো সে। তবে গুলি চালালো না, তার কানে বাজলো ইফরাহ মিনতি ভরা কন্ঠ , “ না , গুলি চালাবেন না খন্দকার সাহেব। থেমে যান ! শুনুন ! ”
উড়ান দৃষ্টি ঘুরিয়ে করুণ চোখে কেবলি দেখলো ইফরাহ কে। নিঃশব্দে খানিক মুসকি হেসে বলল , “ এতো ব্যাকুলতা কেনো প্রিয়তমা ?
শুধুমাত্র সে তোমার স্বামী বলে ?”
ইফরাহ বলল , “ আপনি শুনুন আমার কথা , ওটা চালাবেন না! শুনুন!”
উড়ান বালির উপর মাথা চেপে বসে পড়ল। ইফরাহ এতো ব্যাকুলতা কেনো ওই মীর বংশের উপর। সে হাঁটু ভাজ রেখে এবারে গুলি তাক করলো ইফরাহর দিকে। আরাধ্যের বুকে মোচড় কাটলো যেনো , সে কাব্য কে ছেড়ে ইফরাহ কাছে আসতে নিলেই উড়ান ঠিক আরাধ্যের পায়ে গুলি চালালো। ইফরাহ আঁতকে উঠলো , তার চোখ উপচে পানি পড়ছে। উড়ান কাতর গলায় বলল , “ তুমি কাঁদছো প্রিয়তমা ? কেনো কাঁদছো? ভালো বলে কাঁদছো তাইনা? কই আমিও তো তোমাকে ভালোবাসলাম কখনো এভাবে আমার জন্য তো কাঁদলে না!”
উড়ান কথা শুনলো না ইফরাহ। আরাধ্য দিকে ছুটতে গেলো সে , উড়ান আদেশের গলায় বলল , “ ছুটবে না একদম কাছে না। ওদিকে আর এক পা বাড়াবেনা , ওকে স্যারেন্ডার করতে বলো। নয়তো মনে রেখো তুমি আমার না থাকলে কারো হতে পারবে না ! ছুটবে না , তবে আমি তোমায় আঘাত করবো প্রিয়তমা ! “
ইফরাহ দাড়ালো না । সে ছুটছে আরাধ্যের দিকে , উড়ান গুলি তাক করছে। আরাধ্য সে দিক খেয়াল করেই চিৎকার উঠল , “ গুলি চালাবিনা উকিল, একদম গুলি চালাবিনা। আমার ইরা’র কিছু করবিনা তুই।আমি স্যারেন্ডার করবো দেখ। এখনি করবো, এই কথা দিচ্ছি।
আরাধ্য কাব্যের দিকে তাকালো , “ এই অফিসার হ্যান্ডকাফ লাগা। জলদি লাগা।”
পরক্ষনেই ইফরাহ দিকে তাকালো , ইফরাহ তখনো ছুটে আসছে। আরাধ্য ধমকে বলল , “আমার কসম থমকে যাও ইরা।”
ইফরাহর পা থেমে যাবার আগেই উড়ন্ত এক গুলি এসে লাগলো ইফরাহ গায়ে। পরপর তিনটে গুলি তিন স্থানে লাগে তার। আরাধ্য চেঁচিয়ে ওঠে , “ এই শালা! “
ইফরাহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিলো। শেষবার কাতর এক দৃষ্টিতে উড়ানের দিকে তাকাতে ঠিক চতুর্থ নাম্বার গুলি এসে ইফরাহ পেটে লাগলো। এবার আর অপেক্ষা করতে পারলো না। আরাধ্য মাটিতে পড়ে থাকা রিভালবার হাতে তুলে। সব কটা গুলি ঠিক উড়ানের বুকের সই মারলো। উড়ান হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়লো মাটি।
শেষ চাহনিতে কেবলি ইফরাহ প্রতিচ্ছবি ভাসছে। মাটির বুকে পড়তেই মাটি খাচমে ধরলো। শেষ বাক্যে কবেলি বলল ,
“ এ পৃথিবী থাক তুমি আর চলছি প্রিয়তমা !”
আরাধ্যরক্তাক্ত পায়ে ছুটে এলো ইফরাহ কাছে। ইফরাহর ছোট খাটো দেহ টাহ নেতিয়ে পড়ার আগেই মাথাটা কোলে তূলে নিলো সে।
ঘাটের ওপারে পুলিশ এসে পৌঁছেছে। কাব্য ভায়ার্ত চোখে সেদিকে দেখলো ওপারে নৌকা নেই পুলিশ পৌঁছাতে খানিক দেরি হবে। আরাধ্য ইফরাহর গালে হাত রেখে ডাকল , “ ইরা এই ইরা ”
ইফরাহর প্রায় নিঃশ্বাস কমে আসছে আরাধ্য কাঁপা কাঁপা কয়েকবার ঝাঁকুনি দিলো দেহটা। একবার হেঁচকি তুলে ইফরাহ তাকিয়ে হাসল। আরাধ্য কাঁদছে , গলা ধরে আসছে তবুও কাপা কাঁপা গলায় আবারো ডাকলো ,“ ইরা এই মেয়ে কথা বলো ? এসব কী হয়ে গেলো ইরা! ”
ইফরাহ কাঁপা গলায় খানিক কষ্ট করে বলল , “ভীষণ তৃষ্ণার্ত আমি একটু পানি খাইতাম। পানি নাই তাইনা ?”
আরাধ্য চোখ মুছলো। ইফরাহ মাথাটা চরে বালুতে শুইয়ে ছুটে গেলো সামনে করতোয়া নদীতে। দুই একবার হাতে করে পানি তুললো। তবে ইফরাহর কাছে আনার আগেই পানি ফুরিয়ে এলো। আবারো ঘুরে গিয়ে নদীর ধারে বসলো। হাতের তালুতে পানি নিয়ে ছুটে আসার আগেই পানি পড়ে গেলো। চোখ দিয়ে অঝরে পানি পড়ছে লোকটার! আশেপাশে তাকিয়ে কিছু একটা খুঁজতে চাইলো। ইফরাহ তখনো মাটিতে বসে কাতরাচ্ছে। নিজের গায়ের শার্টের দিকে নজর পড়তেই খুলে হাতে নিলো। এরপর নদীর পানিতে ডুবিয়ে ছুটে এলো ইফরাহর কাছে। শার্ট কাঁধের ওপর রেখে মাথাটা আবারো কোলে তুলে নিলো। ইফরাহ নিভু নিভু চোখে রক্তাক্ত হাতে আরাধ্যের গাল স্পর্শ করলো। আরাধ্য ভেজা গলায় ডাকল , “ইরা”
ইফরাহ একবার হেঁচকি তুলল। বেশ কষ্টে জবাব নিলো , – হুম।
আরাধ্য কাধ থেকে শার্ট নামিয়ে নিলো। ইফরাহ বলল , “পানি এনেছেন? গলা শুকায় আসছে আমার !”
ইফরাহ পানি খাওয়া জন্য মুখ মেলল। আরাধ্য শার্ট চিপে একটু খানি পানি ইফরাহ মুখে দিলো। তৃষ্ণা মিটলো না তবে, একটুও হলেও তৃপ্তি পেলো মেয়েটা। ইফরাহ হেসে উঠলো। আরাধ্য আবারো কোলে তুলো নিলো মাথাটা পুলিশ রা আসছে , একে নদী পার হচ্ছে। ইফরাহ আরাধ্যে হাত নিয়ে ঠিক তার পেটের উপর রাখলো।
আরাধ্য খানিক চমকিত হয়ে ডাকল , “ ইরা!”
ইফরাহ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল , “ আ আমায় মাফ করবেন ছো.. ছোট নবাব। আ .. আমি বাঁচাতে পারলম না আপনার অস্তিত্ব। “
আরাধ্য আবাক কন্ঠে বলল , “ আমার অস্তিত্ব? “
ইফরাহ আবারো হেঁচকি তুলল , “ আপনি বাবা হতেন ছোট নবাব।”
আরাধ্য চোখ যেন আজ আর বাঁধ মানছে। অনাবরত পানি পড়ছে। চোখ ঝাঁপসা হয়ে আসছে পালা ক্রমে। কাব্য ডেকে উঠলো , “ ভাই পালাও , পালাও ভাই।”
ইফরাহ দেখলো। নীল ড্রেস পড়া পুলিশ ছুটে আসছে, ইফরাহ খানিক দম নিয়ে বিরবির করে আওড়ালো , “ আ .. আপনি পালিয়ে যান ছোট নবাব। পালিয়ে জান ; আমায় ভেবে থেমে গেলে বিশাল একখান সমস্যা হয়ে যাবে। চলে যান।
আরাধ্য কান্নারত গলায় কথা আসছে না। সে ভেজা শার্ট ! পায়ে বেঁধে ইফরাহর নেতিয়ে পড়া দেহ টাকে কোলে তুলে নিয়ে খুড়িয়ে খুড়ি এলো ঘাটে।
পুরো পুলিশ ফোর্স উপস্থিত সেথায়। একদল রেজার পেছনে লেগেছে আরেক দল এদিকে, আরাধ্য অসহায় কন্ঠে নূরুজ্জামানের উদ্দেশ্যে বলল , “ আমায় ধরো অফিসার তবুও আমার স্ত্রী কে বাঁচাও। আমি স্যারেন্ডার করতেছি। করতেছি স্যারেন্ডার;
ইফরাহর চোখ বুজে আসছে। বেশ কষ্টে কেবলি দুটো বাক্য আওড়ালো সে , “ ওপারে আমি অপেক্ষায় থাকবো ছোট নবাব। আপনি পৃথিবীর সকল পাপ মুছে আসবেন। আমি অপেক্ষায় কর…. করবো! ”
শেষবারে এক হেঁচকি তুললো ইফরাহ আর সাড়া মিললো না। আরাধ্য স্তব্ধ হয়ে গেলো। ইফরাহর দেহ টাকে কোলে করেই আবারো বসে পড়লো সে। কাব্য এসে দাড়ালো পাশে কাঁধে হাত রাখলো তার। দুজন পুলিশ ধরাধরি করে উড়ানে লাশ পাড় করছে। আরাধ্য ভেজা চোখে কেবলি ইফরাহ নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে থাকলো।
ইফরাহ ক্লান্ত মুখটা শান্ত হলো। সে ঘুমালো , আরাধ্য চেয়ে থাকলো।তা্র বুকে ক্ষতবিক্ষত হয়ে রক্ত ঝড়তে শুরু হয়েছে।
ব্যবচ্ছেদ!
বেলা ৭ টা নাগাদ সময়। পাখির চোখের কোণে জমা হওয়া পানিটুকূ মুছলো নীরবে।এত নির্মম মৃত্যু কী সত্যিই বউরানীর প্রাপ্য ছিলো ? জমেলা বেগম কয়েকবার শুষ্ক ঢোক গিলে গলা ভেজালো। পাখির কি জানি হলো সে জানে না। তার আর মন টিকছে না এই গল্পে। সে উঠে চলে গেলো বসা ছেড়ে। জামিলা ডাকলো , “ পাখি!”
পাখি থামলো। জামিলা বেগম বলল , “ কাহিনী সমাপ্তি না শুনেই যে উঠলে?
পাখি না ঘুরেই কেবলি প্রশ্ন করলো , “ এ গল্পে সমাপ্তি নেই। যে কাহিনী বাকি রয়েছে তাতে আমার হৃদয় সায় দিবে না দাদি জান।”
জামিলা বেগম হাসল , “ সমাপ্তি শুনবে না তবে ?”
পাখি গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলো , “ ছোট নবাব কী তবে বেঁচে রয়েছে?”
জামিলা বেগম খানিক চুপ থেকে বলল, “ তার পাপ কি কম মনে হয়েছে তোমার কাছে?”
এ পর্যায়ে পাখি ঘুরে তাকলো , “পুরো গল্পে তাকে আমার পাপি মনে হয়নি। তবুও জানতে চাই সে কী বেঁচে আছে দাদিজান ?”
জামিলা বেগম পাখির লাল হয়ে যাওয়া চোখ দু’টো দিকে তাকিয়ে বলল , “ নেই!”
তবে এই গল্পের সমাপ্তি এখানেই দাদিজান। আমার আর কিছু শোনার নেই।
পাখি ছুটতে ছুটতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলো। নিজের বারাদ্ধকৃত ঘর খানায় গিয়ে দরজা লাগিয়ে আয়নার সামনে দাড়ালো।
সাজ সজ্জায় কী সত্যিই বউরানী হতে পেরেছে পারেনি। তবে একটা গল্প শুনে কী করে সে ওই পুরুষের মায়ায় পড়ছে?
ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৯
পাখির নিজের আবরণ করে ভয় পাচ্ছে। মাথায় থাকা গাজরা টেনে ছিঁড়ে নিলো সে। আরাধ্য নেই , ছোট নবাব নেই , তবে এই গল্পের সমাপ্তি এমন কেনো? এটা সমাপ্তি নয়। এই গল্পে সমাপ্তি শোনতে চায়নি সে। হাঁটু ভেঙ্গে ফ্লোরে বসে সে। হু হু করে কেঁদে উঠলো , ফ্লোরে মাথা ঠেকিয়ে সিজদায় শুয়ে মালিক কে ডাকল ,
” ইয়া আমার রব ! অজান্তে প্রেমে পড়াই হয়তো জীবনে শ্রেষ্ঠ দহন , আর সেই দহনেই জ্বলছে আমার হৃদপিন্ড। এ কেমন তিক্ত সমীকরণ মালিক , যার সর্বশেষ সমাধান শুন্য।”
