কাজলরেখা পর্ব ৫২
তানজিনা ইসলাম
চাদনীর জন্য অসম্ভব চিন্তায় পর্যবসিত ছিলো সবাই। রাত বিরেতে, একটা ১৭ বছর বয়সী মেয়ে জমকালো পার্টি থেকে নাই হয়ে গেলো। সিসিটিভি ফুটেজ চেক করতে গিয়ে দেখা গেলো, পার্টির কোণাতে কোণাতে লাগানো সব সিসিটিভি ক্যামেরা একসাথে বন্ধু হয়ে গেছে। বাকি আর সব ফুটেজ থাকলেও শুধু সে ফুটেজটাই নেই, যে সময়টাতে চাদনী নিখোঁজ হয়েছিলো। দলের ছেলেরা তন্যতন্য করে খুঁজ ছিলো ওঁকে। সাদিক এহসানও বড্ড চিন্তায় পরলো, যখন জানলো চাদনী শাবিহার ফ্রেন্ডের ওয়াইফ। এভাবে তারই বাড়ি থেকে একটা মেয়ের গায়েব হয়ে যাওয়া এলাকাবাসী ভালোভাবে নেবে না। বিপক্ষ দল তিলকে তাল বানিয়ে এলাকায় রটাবে। এমনিতেই রাতের সাথে তার ঝামেলাপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে সবাই আড়ালে খুব হাসি তামাশা করে। এসবে রেপুটেশন আরো খারাপ হবে। রাত আরো সমস্যায় পরবে। আর অদৃষ্টে দ্বায়ী করবে তাকে। এমনিতেই তার ছেলের ধারণা এ দুনিয়াতে যতো খারাপ ঘটনা ঘটে সব তার বাবার জন্য।
সে তার সব ফোর্স লাগিয়ে দিলো চাদনীকে খোঁজার জন্য।
সবাই খুজছিলো চাদনীকে।
রাতের ছেলেরা দৌড়াদৌড়ি করে এসে খবর দিচ্ছিলো ওঁকে। এহসান বাড়ির পুরো এরিয়া চষে ফেলেও যখন চাদনীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না, সাদিক এহসান বাইরে সোর্স লাগালো। সে একটু প্যাচিয়ে, পরোক্ষভাবে আঁধার কে বললো চাদনী হয়তো নিজেই বাইরে গেছে। সে এতোটাও ছোট না যে তাকে কেও তুলে নিয়ে যাবে। আঁধার তার কথার মিনিং বুঝতে পেরে তাকে কিছু বললো না, কিন্তু শাবিহাকে ঝারলো অনেক্ক্ষণ। ওর বাবা কেন চাদনীকে নিয়ে উল্টাপাল্টা ইঙ্গিত দেবে! চেনে না জানে না একটা মানুষকে নিয়ে হুট করেই একটা মন্তব্য করে দেওয়া যায়? সবাই বললেও আঁধার মানতে নারাজ চাদনী বাইরে গেছে। ওর মন বলছে, চাদনী এখানেই কোথাও আছে। ওর আশেপাশে। ও ফিল করতে পারছে, চাদনী বিপদে পরেছে।
রাত দেখলো ওর উৎকন্ঠা। চাদনীকে নিয়ে পাগলামো। ওর মনে হলো, নাহ এই ছেলেটা আর যায় হোক চাদনীকে সন্দেহ করতে পারে না। চাদনী আছে, এখানে কোথাও আছে। কিন্তু ওঁদের চোখের আড়ালে।
রাত খুব বিপদে চিন্তিত হয় না। খুব শান্ত থেকে, টেকেল দেয় সবকিছু। আজ ওর চিন্তায় মাথা ফেটে যাচ্ছিলো। ও চাদনীকে খুজে না পেলেও চাদনীর খুব মূল্যবান কিছু খুঁজে পেলো।সবুজ ঘাসের উপর রূপালি পায়েল পরে আছে। সাদা,সোনালি আলোয় চকচক করলে পায়েল খানা। রাত চাদনীর পায়ে দেখেছিলো এটা। এতোবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছিলো যে পায়েলের ডিজাইন পর্যন্ত মুখস্থ হয়ে গেছে।
রাত দাঁড়িয়ে বুঝতে পারলো, ও পার্টির জায়গাটা থেকে কিছুটা দূরে চলে এসেছে।
রাত অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো বাগান বাড়িটার দিকে। ওর ভয় লাগে এখানে আসতে। ট্রমা কাজ করে। উল্টাপাল্টা দৃশ্য ভাসে চোখের সামনে। এমন অনেক স্মৃতি মনে পরে যা রাত মনে করতে চায় না।
রাত পা বাড়াতে যাবে তার আগে সুহাশ দৌড়ে এলো তার কাছে। ডাকলো
-“ভাই।”
-“হু।”
রাত সামনে তাকিয়ে অন্যমনষ্ক হয়ে জবাব দিলো।
-“আমাদের বাইরে খোঁজ লাগানো দরকার, ভাই। বাড়ির কোণায় কোণায় খুঁজে ফেলেছি আমরা তাকে।”
-“উহু! এখনো এক জায়গা বাকি। বাগান বাড়িটা আমরা বাড়ির বাইরে রাখছি কেন?”
সুহাশ কপালে ভাজ ফেলে বললো
-“এখানে কেন? পার্টির বাইরে সে কেন আসবে?”
-“হয়তো সে আসেনি, তাকে নিয়ে আসা হয়েছে।”
বলতে বলতে রাত এসে দাঁড়ালো দরজার সামনে। দরজায় তালা দেওয়া। রাত খুব শান্ত কন্ঠে বললো
-“দরজা ভাঙো।”
-“বাইরে থেকে তো তালা দেওয়া। শ্যামাঙ্গিনী এখানে নেই।”
রাত নিষ্প্রভ দৃষ্টিতর তাকালো সুহাশের দিকে। তড়িঘড়ি করে মুখে হাত দিলো ও। রাতের মুখ থেকে শ্যামাঙ্গিনী শুনতে শুনতে, সুহাশও ডেকে ফেলেছে। যা রাতের পছন্দ হয়নি। এ নামটা শুধু রাত ডাকে ওঁকে। এটা চাদনী ব্যাতিত শুধু সুহাশ জানে।
দরজা ভাঙার জন্য ছেলেপেলেদের নিয়ে আসা হলো। রাত দাঁড়িয়ে থাকলো, একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো বাগানবাড়িটার দিকে। মনে মনে খুব করে চায়লো চাদনীকে এখানে পাওয়া না যাক। ও নিতে পারবে না চাদনীর কিছু হলে। চাদনীর ভাগ্য আর যায় হোক ওর মায়ের মতো না হোক।
আঁধারের বিপি হাই হয়ে যাচ্ছে, টেনশনে। পুলিশও চলে এসেছে ইতোমধ্যেই। ও পুলিশকে স্টেটমেন্ট কি দেবে, ও কথায় বলছে না কারো সাথে। কেও কথা বলতে গেলেও ঝাড়ি মারছে তাকে। কিছুক্ষণ পরপর শুধু পায়চারি করছে। স্হির থাকতে দিচ্ছে না পা দু’টোকে একটুও।
রেহান ওর কাছে খবর নিয়ে এলো, বাগান বাড়ির দরজা ভাঙা হচ্ছে। চাদনী হয়তো ওখানে থাকতে পারে। ও জানে না, চাদনী আদোও আছে কি-না। ও অর্ধেক কথা শুনেই দৌড় দিয়েছে। আঁধারের চিন্তা দেখে ভয় লাগছিলো। ও যদি আরেকটু খেয়াল রাখতো চাদনী এভাবে হারিয়ে যেতো না।
রাত আর ওর দলবল দরজা ভেঙে ঢোকার পর পর, আঁধার ঢুকলো বাগান বাড়িতে। ওর পিছু পিছু শাবিহা, ওর বন্ধুরা, চাদনীর প্রেস ব্রিফিং সবাই গেলো সেখানে।
চাদনীকে খুঁজে পাওয়ার পর, শাবিহা অনেক ঘাবড়ে ছিলো। রাত ওঁকে কিছু বলেনি। কিন্তু ওর নার্ভাসনেস বরাবরই দেখছিলো ও। এসির মধ্যেও মেয়েটা ঘামছিলো। হাত কচলাচ্ছিলো। মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে ও মানুষেে মনোভাব বুঝে যায়। সেখানে শাবিহা তো ওর বোন।
রাত দুইয়ে দুইয়ে চার মেলালো। চাদনী কে নিয়ে রিক এখানে যাওয়ার পর, বাইরে থেকে কেও দরজা লক করে দিয়েছে। যাতে মনে হয় এখানে কেও নেই। শাবিহা করেছে এটা?ওর ছোট বোন! ছিহ! এতোটা নিচে নেমে গেছে ও। ও জানে কাজটা কে করেছে।
সে বাড়িটাকে ছোটখাটো এাট্ বাগানবাড়ি বলা চলে। ওদিকে প্রয়োজন ছাড়া তেমন কেও যায় না। ঘরের মানুষগুলো ব্যাতিত ওই ঘরের চাবি আর কারো কাছে থাকে না। ইভেন দারোয়ানের কাছে পর্যন্ত না। শাবিহা দিয়েছে ওই চাবি রিককে। রাত তিক্ত ঢোক গিললো। চাদনীকে হসপিটালে নিয়ে গেছে ওরা। আঁধারের বন্ধুরা, চাদনীর বন্ধুরা সবাই গেছে। রাত যায়নি। ওখানে চাদনীর সবাইকে প্রয়োজন। রাতের দায়িত্ব অন্য। হলো না মেয়েটা ওর। অন্যের মানুষের মায়ায় পরার মতো ভুল যখন করে ফেললো, তখন কিছু দায়বদ্ধতা তো ওরও আছে। ও চায়লেই তো যেতে পারে না। যারা শ্যামাঙ্গিনীর সাথে এমন নিচু একটা কাজ করেছে, তারা তো এমনি এমনি ছাড় পেয়ে যেতে পারে না।
চাদনীকে হসপিটালে এডমিট করা হয়েছে।
অচেতন চাদনীর পাশে বসে আছে আঁধার। ।চোখ দুটো ওর টকটকে লাল।কেঁদে দেবে কেঁদে দেবে ভাব, অথচ সে কাঁদতে পারছে না। ওর বুকের মধ্যে কেমন যেন করছে।কী যে বিশ্রী যন্ত্রণা হচ্ছে, আঁধার বোঝাতে পারছে না কাওকে।নার্সরা অনেক বলেছে চাদনীর রেস্টের প্রয়োজন আঁধার যাতে বেরিয়ে যায়।আঁধার অনেক তর্কাতর্কি করে থেকেছে এখানে।বলেছে শুধু নিঃশব্দে বসে থাকবে ও টু শব্দ করবে না।চাদনীর ডিস্টার্ব হবে না।
চাদনীর অসাড় হাতটা আলতো হাতে আঁকড়ে নিলো আঁধার।ওর ঘাড়ে,গলায় হাতে অনেক কাটা-ছেঁড়ার দাগ। লাল রক্তের ছোপ স্পষ্ট! আঁধারের চোখে পানি টলমল করছে।ওর ভীষণ ভাবে খারাপ লাগছে চাদনীর জন্য। তখন ওর শরীরের এতো ক্ষত বোঝা যায়নি। হসপিটালে আনার পর, ডাক্তারের চেকআপ করতে গিয়ে সব ক্ষত দৃশ্যমান হলো। পায়ের জখম টা সবচেয়ে বেশি ওর। সাদা বেন্ডেজ পেচানো পায়ে। আঁধারের বুক ভেঙে এলো।
ইশ! এটা কেনো হলো! কেন ও চাদনীকে সবসময় সাথে সাথে রাখলো না। ও কি জবাব দেবে ওর চাচ্চুকে! চাদনীকেই বা কিভাবে স্বাভাবিক করবে। মেয়েটার মধ্যে যে সারাজীবনের ট্রমা ঢুকে গেলো। চাদনীর এই অবস্থা ও কখনো ভাবতেই পারে না। চাদনীকে কখনো ওভাবে প্রেমিক-প্রেমিকার মতো ভালোবাসা হয়নি ওর।বউয়ের মতোও না হয়তো।
তবে ও ভালোবেসেছিলো চাদনীকে, অন্যরকমভাবে! সে ভালোবাসার কথা কখনো বলা হয়নি ওর। স্বামী হিসেবে অধিকার দেখিয়েছে,ডিসিশন চাপিয়ে দিয়েছে। নিজ তাগিদে অনেক কষ্ট দিয়েছে ও চাদনীকে। কিন্তু অন্য কারো দেওয়া কষ্ট চাদনীকে সহ্য করতে হবে সেটা আঁধার মানতে পারে না।
চাদনীর হাতটা বেডের উপর নামিয়ে রাখলো আঁধার।তার উপর আলতো করে কপাল ঠেকালো পাছে চাদনী ব্যাথা না পায়। স্যালাইন চলছে। মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে ও। ঘুমের মধ্যেও আতঙ্ক কমছে না ওর। আঁধার ভাঙা গলায় আওড়ালো
-“আই এম সরি চাঁদ।আই এম সো সরি!তুই জানিস, আমি ভীষণ রকমের ভিতু! আমি খুব সাহসী দেখাই নিজেকে, আসলে আমি না। জানিস আমার খুব ভয় লাগছিলো, মনে হচ্ছিলো হারিয়ে ফেলবো তোকে। দোকে হারিয়ে আমি কি করে থাকতাম বল! খুব কষ্ট দিয়েছে ওরা তোকে। আমি আরেকটু দেরি করে পৌঁছালে কি হতো বলতো! আমি কী করে মানতাম? কী করে সহ্য করতাম তোর অবস্থা। এটুকুই তো আমার হৃদয় খানখান করে দিচ্ছে। আই প্রমিজ চাদনী, আমি প্রতিশোধ নেবো। যারা তোকে কষ্ট দিয়েছে, তোর সম্মানহানি করেছে, তোকে সমাজের চোখে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, আমি কাওকে ছাড়বো না। কথা দিচ্ছি তোকে, যতোটা কষ্ট ওরা তোকে দিয়েছে তার চেয়ে বেশি যন্ত্রণা আমি ওঁদের ফিরিয়ে দেবো।
আঁধারের চোখের কার্ণিশ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরলো চাদনীর হাতের উপর।
টানা ৬ ঘন্টা সেন্সলেস থাকার পর চাদনী চোখ মেললো।
কোথায় আছে, ওর অবস্থান কোথায় কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না চাদনী। চোখ জ্বলছে। গলা ব্যাথা। শরীরে অসংখ্য ব্যাথা টের পাচ্ছে ও। সাথে টের পাচ্ছে ও কথা বলতে পারছে না। গলা দিয়ে একটা শব্দ বের হচ্ছে না ওর। একটা সাদা বিছানায় শুয়ে আছে ও। রুমে মৃদু আলো জ্বলছে। সে নরম আলোতেও চাদনীর চোখ খুলতে বড্ড বেগ পোহাতে হলো।কেবিনে কেও নেই।
শরীরে আধারের দেওয়া সেই গাউনটা নেই।তার বদলে একটা সাদাসিধা নীল রঙের পোশাক। হসপিটালে পরণে থাকে এ পোশাকটা। আচ্ছা ও কী এখন হসপিটালে? চাদনী মনে করার চেষ্টা করলো। মুহুর্তেই একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা মস্তিষ্কে গিয়ে হিট করলো ওর। চাদনী মাথা উচিয়ে পায়ের দিকে তাকালো। ওর পায়ে সাদা বেন্ডেজ করা। ঘাড়ে, হাত জুড়ে অসংখ্য দাগ। শরীরের অন্যান্য জায়গায়ও হবে হয়তো। চাদনী দেখতে না পারলেও, চিনচিনে ব্যাথায় অনুভব করতে পারছিলো। চোয়াল ব্যাথা। ঘাড়ও নাড়াতে পারছে না। হাতে ক্যানুলার স্ট্রিপ লাগানো। সেলাইন প্রায় শেষের পথে।
ওর সেই চিৎকার মনে পরলো। গলা বসে গেছে।ব্যাথা পাচ্ছে, কিন্তু শব্দ করতে পারছে না। আচ্ছা, এখানে কে এনেছে ওঁকে? চাদনীর মনে কেন পরছে না? ওই বিভীষিকাময় মুহুর্তের কি ঘটেছিলো। চাদনী অনেক জোর দিয়েও মনে করতে পারলো না। কীসের জন্য আজ ওর এই অবস্হা? অন্যের ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করেছে সেটা? না, ওর বোকামির মাশুল চুকিয়েছে ও, কোনটা?
বাইরে থেকে কারো পায়ের আওয়াজ স্পষ্ট হচ্ছে। কেও আসছে এদিকে।চাদনী চঞ্চল দৃষ্টিতে তাকালো।‘ঘরপোড়া গরু সিদূরে মেঘ দেখলে ভয় পায়!’ চাঁদনীর হয়েছে সেই অবস্থা! কোনো উলোটপালোট শব্দ কানে আসলেও ভয়ে সিটিয়ে যাচ্ছে মন।
ওর জ্ঞান ফিরতে দেখে একজন নার্স এগিয়ে এলো ওর কাছে। চাদনীর মাথায় হাত রাখতেই ও দৃষ্টি ফিরিয়ে চায়লো।
নার্স ডাক্তার কে ডাকলো। ডক্টর এসে ওর পালস চেক করে জিজ্ঞেস করলো
-“ঠিক লাগছে? কোথাও সমস্যা হচ্ছে?”
উত্তরে কিছু বলতে চায়লো চাঁদনী। কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বের হয় না ওর। প্রচন্ড শকে ওর গলা দিয়ে শব্দ বের হওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলে সাইকোজেনিক মিউটিজম। প্রচন্ড ভয় বা শক পাওয়ার কারণে মানুষ সাময়িক ভাবে কথা বলতে পারে না।
চাদনী অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো ডাক্তারের দিকে। ডাক্তার বুঝলো ওর অবস্থা।বললো
-“কথা বলতে পারছো না?”
চাদনী দুপাশে মাথা নাড়ে।
-“উঠতে পারবে?”
চাদনী বেডে হাত ঠেকিয়ে উঠতে চায়লো, কিন্তু পারলো না।
একজন নার্স ওঁকে ধরে তুললো। চাদনী শক্ত করে চেপে ধরলো ওনার হাত। নার্স ওর পিঠের পেছনে একটা বালিশ দিয়ে বসালো ওকে।
-“স্টেটমেন্ট দিতে হবে তোমাকে। কী হয়েছিলো তোমার সাথে?”
চাদনী বলার চেষ্টা করেও পারলো না। একটু পর সবাই এলো কেবিনে। চাদনী চঞ্চল দৃষ্টিতে খুঁজলো কাওকে। পেলো না। পরপর তটিনী, আমান, মাহাদী, রাবিব সবার দিকে তাকালো। রেহান আর সিয়ামও আছে। বৃষ্টি আর হাসনা নেই। ওরা হয়তো ওঁদের মা বাবার সাথে বাড়ি চলে গেছে। এতো রাতে ওঁদের এখানে থাকার কথা না। আচ্ছা এখন রাত কয়টা বাজে? তটিনী ওর কাছে এসে, ওঁকে চেপব ধরলো। চাদনী জড়িয়ে ধরলো ওঁকে। তটিনী বললো
-“কিছু বলো চাদনী। কী হয়েছিলো তোমার সাথে?”
চাদনী উত্তর দিতে পারে না। ওর চোখ দু’টো সেই তখন থেকে একজন কে খুঁজে যাচ্ছে। সে নেই। কোথাও নেই। চাদনীর একমাত্র সাহারা কোথাও নেই। ঢাকা শহরে ওর একমাত্র আশ্রয়, যাকে সে সময়ে পাগলের মতো ডাকছিলো চাদনী। ডাক্তার একটা লেখার প্যাড আর কলম এগিয়ে দিলো চাদনীর দিকে।বললো
-“সাময়িক ভাবে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারবে না। এটা নরমাল। লিখে দাও। পুলিশ স্টেটমেন্ট খুঁজছে তোমার।”
চাদনী সাদা কাগজের দিকে অবুঝের মতো তাকিয়ে থাকলো। কী লিখবে ও? কীভাবে লেখা শুরু করবে? ওর হাত চলছে না। লিখতেই তো ভুলে গেছে মনে হয়, এ পরিস্থিতে। আঁধার ভাই কোথায়? কোথায় সে? চাদনীকে একা ফেলে চলে গেলো। ভুল বুঝলো ওঁকে? ওদের উল্টাপাল্টা কথা বিশ্বাস করে নিলো! চাদনী উত্তর পায় না। ও কিছু লিখতেও পারে না। জিজ্ঞেসও করতে পারে না আঁধারের কথা। সাদা প্যাডটা ডক্টরের দিকে এগিয়ে তিয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকে ও।
ডক্টর বললো
-“রেস্ট নাও। সময় নাও একটু। খারাপ লাগছে বুঝতে পারছি।”
কথা শেষ করে নার্সকে নিয়ে কেবিন থেকে চলে গেলো ডক্টর।
-“ভাই।”
সুহাশের ডাকে রাত পেছনে ফিরলো। সুহাশ দাঁড়িয়ে আছে। ও পুলিশ স্টেশন থেকে এসেছে। রাত প্রশ্ন করলো
-“ওদিকের খবর কী?”
-“রিক আর তার দু’জন সঙ্গী কে এরেস্ট করেছে পুলিশ।”
-“ভালোভাবে খাতির করতে বলেছো তো না!”
-“তা আর বলতে! পুরো রাত জামাই আদর হবে।”
-“ভালো। আধমরা হয়ে গেলে ট্রিটমেন্ট করিয়ে আবার মারতে বলবে। থামাথামি নাই।”
-“রিকের বাবা অনেক পাওয়ারফুল ভাই। সকালের মধ্যে ছাড়িয়ে নেবে ওঁকে।”
রাত শব্দ করে হাসলো। পরক্ষণে ক্ষুব্ধ স্বরে বললো
-“আমার চেয়ে বেশি পাওয়ার নিয়ে এখানে কেও এক্সিস্ট করে না। আমার নিজের বাপও না। আমিও দেখি কিভাবে ছাড়ায়। এ কেস ডিসমিস হবে না সুহাস। শ্যামাঙ্গিনী কে কষ্ট দেওয়া একটা মানুষ কেও আমি ছাড়বো না। এর শেষ পর্যন্ত দেখবো আমি।”
সুহাশ কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। একটু পর মিনমিন করে বললো
-“আপনি শাবিহা ম্যাম কে কি করে শাস্তি দেবেন ভাই? সে কিন্তু এখানে পরোক্ষভাবে ভাবে জড়িয়ে আছে!”
রাত তাকালো সুহাশের দিকে। কপালে পুরু ভাজ ফেলে বললো
-“তোমার কী মনে হয় আমি ওঁকে শাস্তি দিতে পারবো না? আমার বোন বলে পার পেয়ে যাবে।”
-” তা না। কিন্তু আপনার সৎ মা…
-“চুপ। রাত কথা কেড়ে নিলো ওর মুখ থেকে।
-“তাকে আমি সৎ মা তো দূর মানুষই ভাবি না। মা শব্দ টা ওনার কাছে গিয়ে অপমানিত হয়। শব্দ টা এতো সস্তা না যে যার তার জন্য ব্যবহার করবে। শাবিহার ব্যাপার আমি পরে দেখছি। আগে এঁদের ব্যাপারটা শেষ করি।”
রাত পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে নিজের কক্ষে। কাঁচ দেওয়ালের সামনে। নির্নিমেষ তাকিয়ে আছে চাঁদের দিকে। সুহাশ জানে রাত জোৎস্না রাত খুব অপছন্দ করে। তেমন একটা ঘর থেকে বের হয় না এ রাতে। আজ ও জোৎস্নার আলো গায়ে মেখে দাঁড়িয়ে আছে। সুহাশ গেলো না ওঁকে ছেড়ে। রাত দেখাচ্ছে না, কিন্তু ওর মন খারাপ।অসম্ভব খারাপ। একমাত্র মন খারাপ হলেই ও বেলকনিতে এভাবে উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
-“চাদনী কেমন আছে?”
রাত প্রশ্ন করলো।
-“হসপিটাল থেকে খবর এসেছে। জ্ঞান ফিরেছে তার।”
-“হু।”
-“চাদনী কে দেখতে যাবেন, ভাই?”
-“না। আমি কেন ওঁকে দেখতে যাবো? ও আমার কে হয়। কেও না, ও আমার কেও না।
-“কেও না?”
-“নাহ।”
-“এতো কিছু যে করছেন তার জন্য।”
-“অন্য মেয়ে হলেও করতাম। করতাম না? বলো তুমি! এই চিনেছো আমাকে?”
-“অন্য মেয়ে হলে তার নুপুর আপনি পাঞ্জাবির পকেটে রেখে দিতেন না। তার একটা ছেড়া ওড়না নিজের আলমারিতে ভাজ করে রাখতেন না। হসপিটালের সামনে বারবার গিয়েও ফিরে আসতেন না। অন্য কারো চিন্তায় টানা ৪ ঘন্টা আপনি বেলকনি তে দাঁড়িয়ে থাকতেন না। এই ৬ ঘন্টায় আপনি বিশবার হসপিটালের সামনে গিয়ে ফিরে এসেছেন। শুধু দেখতে যেতে পারলেন না, অন্যের বউ বলে।”
সুহাশ অপেক্ষা করলো রাতের উত্তরের জন্য। রাত বললো না কিছু। ওর সামনে পিঠ করে দাঁড়িয়ে থাকলো। গম্ভীর স্বরে বললো
-“ও এখন খুব ডিপ্রেসড থাকবে। আমি নিজেই ডিপ্রেশনের পেশেন্ট। কি কথা বলবো আমি ওর সাথে।”
-“সে সারাক্ষণ ডিপ্রেশনে কেন থাকে? সবসময় মুখ কালো করে বসে থাকে।”
-“জানা নেই আমার। জানার চেষ্টা করবোও না।তার ডিপ্রেশনের কারণ জানার জন্য, তার স্বামী আছে। আমি কে হই এসব জানার।
-“ভাই, ভালোবাসেন ওঁকে?”
রাত কেমন করে যেনো বললো
-“মায়া লাগে রে, খারাপ লাগে শুধু।ভালোবাসা শব্দটা খুব সস্তা মনে হয় ওর জন্য। সারাক্ষণ বিষন্ন হয়ে থাকা একটা মানুষ, তার বিষন্নতা বাড়িয়ে দেওয়া কী খুব দরকার ছিলো?মেয়েটাকে পুরো ট্রমাটাইজ করে দিলো ওরা!”
-“মায়াটা কী ভালোবাসা না? আমার তো মনে হয়, এটা ভালোবাসারও উর্ধ্বে।”
-“নাহ।আবরার এমন নিচু না।সে অন্যের বউকে ভালোবাসার মতো জঘন্য কাজ করতে পারে না।আমি বরংচ দূর থেকে তার ভালো থাকা টুকু চাইতে পারি। ভালোবাসতে পারি না। এটা পাপ!”
-“ভাই,
-“আমার বোনটা এমন ছিলো না সুহাশ। এতোটা নির্লজ্জ কখন থেকে হয়ে গেলো ও? ওর মায়ের থেকে এসবের সাহস পাচ্ছে ও।”
-“ওঁকে দেখতে যাবেন ভাই?”
-“এতো রাতে?”
-“আপনার মনের ছটফটানি কমে যাবে। নয়তো পুরো রাত ছটফট করবেন আপনি। ছয় ঘন্টায় আপনি যে পরিমাণ ছটফট করেছেন, এতোটা ব্যাকুল হতে আমি আপনাকে ছয় বছরেও দেখিনি। ম্যাম অসুস্থ হলে এমন করেন আপনি।”
-“যাবো। একবার দেখে আসলে কী সমস্যা হবে, সুহাশ? পাপ হবে সেটা? একবারই তো বলো। মানুষ তো একটা অচেনা, অসুস্থ মানুষকেও একবার দেখে আসে। তাতে কি আমার আত্মমর্যাদা কমে যাবে?”
কাজলরেখা পর্ব ৫১
-“যাবে না ভাই।”
-“চলো তাহলে আমার সাথে। আমার বোনের অন্যায়ের মাশুল, পিচ্চি একটা মেয়ে দিচ্ছে। তাকে দেখে আসি।”
রাত তিনটা বাজে, রাত আর সুহাশ বেরোলো হসপিটালের উদ্দেশ্যে।উদ্দেশ্য চাদনীকে একনজর দেখা। রাতের গাড়িটা গেইট দিয়ে বেরোনোর পর আঁধারের গাড়ি ঢুকলো এহসান বাড়ির গেইট দিয়ে। রাত হিসাব চোকাতে দেরি করলেও, আঁধার কখনো মাশুল চোকাতে কার্পন্য করে না।

Apu tumake onek onek thanks 😘.Next Part Taratari dio
Next part
Next part please
Plz Next part
আপু দয়া করে নেক্সট পার্টটা দিন আপনার পায়ে পড়ি আপু
Plz next part den…koto je opekkha korte hoi…